Monday, April 20, 2026

Panchpoksho -17

পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রত্নপক্ষ

~~~~~~

প্রত্যেকটা নতুনরকম ব্যবসা যেই শুরু করতে যাবে মণিবাবুর নাতি-নাতনিরা অমনি তাদের জালে ফেলা হবে দিলীপের মতো করে। এইসব ছেলেমেয়েরা নিজেদের পছন্দের দোসর খুঁজে নিলে যদি পারিবারিক অসন্তোষের কারণ দেখা দেয়, তখন টুকুন রায়রা তার মধ্যে নিজেদের জড়াবে। যতগুলো পক্ষ থাকবে এই বিবাদে সব পক্ষকেই মাজা ভেঙে বসাবার জন্য মিথ্যের পর মিথ্যে বলবে। মিষ্টি কথায় কাজ না হলে ভয় দেখাবে। যে মিষ্টি কথায় ভুলে যাবে বা ভয় পাবে তাকেই নিজেদের তাঁবেতে নিয়ে বাকিদের শাসানি আর হুমকি দিতে থাকবে তাদের অপকর্ম খুঁজে বার করে বা নিছক অপকর্মের গুজব ছড়িয়ে।


সে রাতে সুরচিতার মতো রুক্ষ, উদ্ধত মেয়ে নিজের কাছে নিজেই দূর্বোধ্য হয়ে উঠেছিল। ভীষণ লজ্জা করছিল সেদিন ওর, নিজের অক্ষমতা দেখে। যত লজ্জা করছিল তাকে ছাপিয়ে উঠেছিল নিয়তির পরিহাসে পাওয়া দুঃখ। 

নিয়তি মানে মৃত্যু নয়, জন্ম। না হলে অমন তীক্ষ্ণ মেধার ছেলে কেন এমন করে এক অর্বাচীনের ঔরসে আরেক নির্বোধের গর্ভে জন্মাবে আর তার তুচ্ছ জীবনের একান্ত যাপনটা কিছু লোকের জীবনধারণের প্রকোপে অনন্ত নরকযন্ত্রণা হয়ে দাঁড়াবে? নিজের শৈশব, কৈশোর উপভোগ করতে পারবে না? কেন? কেন? কেন? ইচ্ছে করছিল টুকুন রায়কে ছিঁড়ে কুটি কুটি করে ফেলতে; নিদেনপক্ষে ওদের কাগজগুলো।


সেই থেকে নিয়তির সাথে যুদ্ধ শুরু সুরচিতার। জীবন যেমন করে আসে তাকে সেইভাবে না মেনে নিয়ে, তার সাথে পাঞ্জা কষে লড়াই করার শুরু জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য। আক্ষেপ আর হাহাকার করা ছেড়ে দিয়ে প্রতিকারের খোঁজ শুরু। প্রথমবার, নিজের ইচ্ছেয়।

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Sunday, April 19, 2026

Panchpoksho - 16

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~


প্রত্নপক্ষ

~~~~~~

তখন সুরচিতা যেন হাঁফ ছেঁড়ে বেঁচেছিল নটে গাছ মুড়োতে। আজ জানে যে এরকম নটে গাছের মুড়ো হয় না, সবটাই ধড়; তো মুড়োবে কী! সেদিন অবশ্য বেশ নাটুকে কায়দায় বলেছিল, “তা হলে তো এবার টুকুন রায়দের খপ্পর থেকে মুক্তি আসন্ন, যাক বাঁচা গেল।” 

বাবা ঠোঁটের কোণে মলিন হাসি মেখে বলেছিলেন, “দারিদ্র্য বড়ো কঠিন অভিশাপ। তার সাথে যদি অবিমৃষ্যকারিতা যোগ হয় তাহলে বেঁচে থাকা কঠিনতর হয়ে যায়। দিলীপ যদি ওর ছাত্রী দীপ্তিকে নিয়ে এখানে পালিয়ে না আসত, অন্তত লেখাপড়া শেষ করে একটা চাকরি করা অবধি অপেক্ষা করত--তা না, দীপ্তির বাবা নাকি ওকে অন্য লোকের সাথে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছিলেন। এখন দীপ্তির হেল্‌থ সেন্টারের কাজটাও তো ধামা ধরে। নিজেরা জোরালো হওয়ার আগেই জমকালো হয়ে গেল--যাক বাদ দে। আমি আমার মতো করে ভাবছিলাম যদি ওদের ছেলেটাকে ওদের ভুলের মাশুল দেওয়ার জোয়াল থেকে বাঁচানো যায়।”


সুরচিতার মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছিল। এরকম হতো মাঝে মাঝে, যখন বাবাকে ওর বেশ ভিনগ্রহের লাগত। কিন্তু ও তখনও জানত যে অভিকে বাবা ভালোবাসেন কিনা বা অভির জন্য খামকা বাবা কেন ভাবছেন এসব কথা ও বাবাকে জিজ্ঞেস করলে বাবা উত্তর দিতে পারতেন না। এটাও সত্যি সেই প্রশ্নের উত্তর সেদিন তার নিজেরও জানা ছিল না। সেই উত্তর সে আজ জানে যে শুধু নিজের ভালো লাগবে বলে, কখনও নিজেকে নিজের খুব খারাপ লাগবে না বলে, বা নিজেই নিজের চোখে হীন হয়ে পড়লে নিজেকে অন্তত একটু ভালো লাগার মতো একটা কীর্তি খুঁজে পাবেন বলেই বাবা অভিকে সহজতর একটা জীবন দিতে চেয়েছিলেন।


সেদিন অবশ্য সুরচিতা বাবার থেকে টাকাটা ফেরত নেয় নি। বলেছিল, “টাকাটা আমাকে দিতে হবে না। আমার রোজগার বাড়লে পুরো বিলটাই আমি দেব। তোমার এই ব্যবস্থাটা আমাকে দায়িত্বশীল করেছে। অন্তত আমি বুঝে গেছি যে খেয়ে পরে বাঁচার, এমনকি রোজগার করারও কিছু খরচ আছে।” 

সব যন্ত্রণা ছাপিয়ে বাবার মুখে ফুটে উঠেছিল শান্তির হাসি।


আর সারা রাত সুরচিতা কেঁদে ভাসিয়েছিল। কেন? অভির জন্য। তার নিজের জন্য। কিছুটা দিলীপের জন্য, কিছুটা মণিবাবুর জন্য। দিলীপের শুধু উদ্যমটুকুই ছিল। কিন্তু মণিবাবুর পয়সা আর বনেদীয়ানাও আছে। তবু যে ছকে সক্কলে বাধা পড়েছে তাতে মণিবাবুর ব্যবসাটা চেটে চুষে চিবিয়ে খেতে টুকুনদের বেশি দিন লাগার কথা নয়। 

#sanhitamukherjeeoriginals
পাঁচপক্ষ
~~~~~~
প্রত্নপক্ষ
~~~~~~
তখন সুরচিতা যেন হাঁফ ছেঁড়ে বেঁচেছিল নটে গাছ মুড়োতে। আজ জানে যে এরকম নটে গাছের মুড়ো হয় না, সবটাই ধড়; তো মুড়োবে কী! সেদিন অবশ্য বেশ নাটুকে কায়দায় বলেছিল, “তা হলে তো এবার টুকুন রায়দের খপ্পর থেকে মুক্তি আসন্ন, যাক বাঁচা গেল।”
বাবা ঠোঁটের কোণে মলিন হাসি মেখে বলেছিলেন, “দারিদ্র্য বড়ো কঠিন অভিশাপ। তার সাথে যদি অবিমৃষ্যকারিতা যোগ হয় তাহলে বেঁচে থাকা কঠিনতর হয়ে যায়। দিলীপ যদি ওর ছাত্রী দীপ্তিকে নিয়ে এখানে পালিয়ে না আসত, অন্তত লেখাপড়া শেষ করে একটা চাকরি করা অবধি অপেক্ষা করত--তা না, দীপ্তির বাবা নাকি ওকে অন্য লোকের সাথে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছিলেন। এখন দীপ্তির হেল্‌থ সেন্টারের কাজটাও তো ধামা ধরে। নিজেরা জোরালো হওয়ার আগেই জমকালো হয়ে গেল--যাক বাদ দে। আমি আমার মতো করে ভাবছিলাম যদি ওদের ছেলেটাকে ওদের ভুলের মাশুল দেওয়ার জোয়াল থেকে বাঁচানো যায়।”

সুরচিতার মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছিল। এরকম হতো মাঝে মাঝে, যখন বাবাকে ওর বেশ ভিনগ্রহের লাগত। কিন্তু ও তখনও জানত যে অভিকে বাবা ভালোবাসেন কিনা বা অভির জন্য খামকা বাবা কেন ভাবছেন এসব কথা ও বাবাকে জিজ্ঞেস করলে বাবা উত্তর দিতে পারতেন না। এটাও সত্যি সেই প্রশ্নের উত্তর সেদিন তার নিজেরও জানা ছিল না। সেই উত্তর সে আজ জানে যে শুধু নিজের ভালো লাগবে বলে, কখনও নিজেকে নিজের খুব খারাপ লাগবে না বলে, বা নিজেই নিজের চোখে হীন হয়ে পড়লে নিজেকে অন্তত একটু ভালো লাগার মতো একটা কীর্তি খুঁজে পাবেন বলেই বাবা অভিকে সহজতর একটা জীবন দিতে চেয়েছিলেন।

সেদিন অবশ্য সুরচিতা বাবার থেকে টাকাটা ফেরত নেয় নি। বলেছিল, “টাকাটা আমাকে দিতে হবে না। আমার রোজগার বাড়লে পুরো বিলটাই আমি দেব। তোমার এই ব্যবস্থাটা আমাকে দায়িত্বশীল করেছে। অন্তত আমি বুঝে গেছি যে খেয়ে পরে বাঁচার, এমনকি রোজগার করারও কিছু খরচ আছে।”
সব যন্ত্রণা ছাপিয়ে বাবার মুখে ফুটে উঠেছিল শান্তির হাসি।

আর সারা রাত সুরচিতা কেঁদে ভাসিয়েছিল। কেন? অভির জন্য। তার নিজের জন্য। কিছুটা দিলীপের জন্য, কিছুটা মণিবাবুর জন্য। দিলীপের শুধু উদ্যমটুকুই ছিল। কিন্তু মণিবাবুর পয়সা আর বনেদীয়ানাও আছে। তবু যে ছকে সক্কলে বাধা পড়েছে তাতে মণিবাবুর ব্যবসাটা চেটে চুষে চিবিয়ে খেতে টুকুনদের বেশি দিন লাগার কথা নয়।
~~~~~~
Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml
(চলবে)

Saturday, April 18, 2026

Panchpoksho - 15

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রত্নপক্ষ

~~~~~~

হিসেব বোঝাতে লাগলেন বাবা, “পাঁচ বছরের কাগজের দাম ধার করে চোকালে ওর প্রেসটার খোলনলচে বদলের কাজটা হতোও না; প্রেসটা ধুঁকত, মার খেত ব্যবসা। এখনই প্রযুক্তি বদলেছে; এখনই তার সাথে তাল মিলিয়ে না চলতে পারলে পিছিয়ে পড়তেই হবে। খদ্দেরের ডিমান্ড আপ-টু-ডেট টেকনোলজি দিয়ে মেটাতে না পারলে খদ্দের অন্য ব্যবসাদারের কাছে চলে যাবে। প্রেসে প্রযুক্তিগত অদলবদলগুলো এখনই না করতে পারলে পরে পারার সম্ভাবনা কম, সংস্থান জোটানোই যে দুঃসাধ্য হয়ে যাবে। তারপরেও যদি বা সুযোগ আসে তখনও যে একইভাবে ও বাধা পাবে না তার নিশ্চয়তা কী? ক্রমশঃ শেষের দিকে এগিয়ে, যুদ্ধটাকে আরও বিধ্বংসী করে তুলে তারপর আত্মসমর্পণ করে নাকাল হওয়ার থেকে ও ভেবেছে আত্মহত্যাই শ্রেয়। তাই প্রেসটা বেচেই দিল ও।”


বুদ্ধি দিয়ে সুরচিতা বোঝার চেষ্টা করছিল সত্যি নিস্তার কিছু আছে নাকি। ও বেশ দুশ্চিন্তায় হাবুডুবু খেতে খেতে জানতে চাইল, “বাবা, এই বয়সে দিলীপকাকু তো চাকরিও পাবে না, তাহলে এখন ওদের চলবে কী করে?” 

বাবা ভাঙা গলায় বললেন, “দীপ্তির কাজ আছে। তবে সেটা তেমন জোরালো কিছু নয়। দিলীপের কিছু বাঁধা খদ্দের তো ছিল। সেই কাজগুলো ও ধরবে; মণিবাবুর ওখানে বা অন্য কোথাও, মানে যেখানে সবচেয়ে সস্তায় হবে, সেখানে কাজগুলো করিয়ে তুলে দেবে--” 

দারুণ ষড়যন্ত্র টের পেয়ে গেছে যেন এমন করে সুরচিতা বলল, “মানে দালালি করবে। চেনা ছকে আরেকটা স্বাধীন ছোট ব্যবসাদারকে দালাল বানানো হলো। রোজগারের পরিমাণের কথা ভাবলে স্পষ্ট দেখা যায় যে ব্যবসাদার থেকে দালাল হয়ে যাওয়া লোকগুলো বেশ গরীব আর দুর্বল হয়ে পড়ে। ব্যবসায় লোকগুলোর আয়ের পরিমাণ অনিশ্চিত ছিল, কিন্তু আয়টা নিয়মিত ছিল। এখন আয়টা যেহেতু অন্য দুটো লোক বা সংস্থা পরস্পরের সঙ্গে ব্যবসা করবে কিনা তার উপর নির্ভরশীল, তাই সেটা অনিয়মিত হয়ে গেল। লোকগুলো বেশ মাজা ভেঙে হাঁটু মুড়ে বসল। এতো তামাম জনসাধারণকে চেটে-চুষে-চিবিয়ে খাওয়ার দুর্ধর্ষ বন্দোবস্ত গো বাবা!” 

মেয়েকে ছদ্ম মুগ্ধতায় অকপট নিন্দে করতে দেখে হেসে ফেললেন সুরচিতার বাবা, “তবে এই মাজাভাঙা অশক্ত লোকগুলোর ঘাড়ে সমাজ বল আর রাজ্যপাটই বল, সে তো আর শতক ধরে নেত্য করতে পারবে না। দুর্বল লোকগুলো সে বোঝা বইতে পারবে না। খুব শিগগির মুখ থুবড়ে পড়বে। এটাই নিশ্চিন্তির কথা।”

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)


Friday, April 17, 2026

Panchpoksho - 14

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রত্নপক্ষ

~~~~~~

সুরচিতা ঝলসে উঠেছিল, “তারপরেও এদের তুমি চাঁদা দাও? তোমার লজ্জা করে না? নিজের রোজগারে ক্রিমিনাল পোষো আর আর নিজের মেয়েকে--” থেমে গিয়েছিল বাবার দুই ভ্রূর মাঝে জমে ওঠা যন্ত্রণা দেখে। 

তখন বাবা বলেছিলেন, “করে। তাই তো তোর টাকাটা ফেরত দিতে এসেছি। ওদের আমি ছেড়ে দিয়েছি তা বেশ কয়েক বছর হলো। তবু দিলীপের মতো কটা ছেলেকে ছাড়তে পারছি না। হয়তো এই দুর্বল ছেলেগুলোকে দিয়েই ওরা আমাকেও একদিন দুর্বল করতে চাইবে, যদিও আমি ওদের সহমর্মিতা, মধ্যস্থতা, সহৃদয়তার ফাঁদে কখনও পড়ি নি। কিন্তু অনেকেরই দুর্বলতার হদিশ রাখি তো।”


সুচরিতার সন্দেহ ছিল আরও অনেক, “মণিবাবু আর টুকুন রায়ের কোনো--” 

বাবা ওকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, “মণিবাবু এ শহরে বনেদী আর টুকুন বেনো জল, ভুঁইফোঁড়। মণিবাবু ছাড়া দিলীপের প্রেস কেনার হিম্মত এ শহরে কোনো লোকের নেই এখনও।” 

ধাঁধায় পড়ে গেল সুরচিতা, বলল, “তাহলে?” 

বাবা বললেন, “দিলীপ কাগজ বেচতে পারুক না পারুক, তোলা কাগজের দাম ওকে চুকিয়ে দিতে হবেই। সে জন্য ধার করলেও ওকে শুধতে হোতো। আবার প্রেসটা থাকলে নামে হলেও ওর রোজগার থাকবে, ফলে ওকে চাঁদাও দিতে হবে, দালালিও দিতে হবে, কৃতজ্ঞতার কর্জের মহাজনি সুদ বাবদ কাগজ তুলতেও হবে; বেচা না গেলে বিলোতেও হবে। তার ওপর নেতৃত্বের কুনজরে পড়েছে বলে, ব্যাপার এমন দেখানো হচ্ছে যেন লোকে যে কাগজ নিতে চাইছে না সেটাও দিলীপেরই দোষে বা ওরই উস্কানিতে, যেন ও যথেষ্ট উদ্যম নিয়ে কাগজটার জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারছে না। তার কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে যেন ও নিজের ব্যবসাটাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই মাশুল হিসেবে ধরা হচ্ছে ওর ব্যবসা থেকে করা রোজগারটা।” 

বাবা বলে চললেন, “যতোদিন প্রেস থাকবে, ততোদিন পরিবার প্রতিপালনের জন্য আর প্রেসটাকে রাখার জন্য ওকে সময় বা শ্রম দিতেই হবে। তাছাড়া ও ভাবছিল যে এবারে প্রেসের খোলনলচে বদলে সমসাময়িক করে তুলবে ছাপাখানাটা। তাহলে হয়তো ও আর ছোটোখাটো ব্যবসাদার থাকতো না অদূর ভবিষ্যতে। ওর বাড়বৃদ্ধি বা স্বাবলম্বী হওয়ার মূলে যে প্রেসটা! তাই দিলীপের প্রেসের রোজগারটাই নিংড়ানোর পরিকল্পনা হচ্ছে, হবেও পরে, ওকে দুর্বল করে নিজেদের তাঁবেতে রাখার জন্য।”

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Thursday, April 16, 2026

Panchpoksho -13

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রত্নপক্ষ

~~~~~~


বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, “একরকম তাই-ই। ওকে কোনোদিনই টুকুন বা পার্টি—কেউই--ছাপার কাজগুলোর পয়সা দেয় নি, টুকুনের জনসেবায় বা পার্টির জনপ্রিয়তা-বর্ধনের কাজে উদ্যোগী স্বনিযুক্ত সফল যুবকের চাঁদা বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল সেসব। তারওপর গত পাঁচবছরে কাগজের বিক্রি বাবদ যা দাম হয়, সবই ওকে একসাথে চোকাতে হলো, নিজের পকেট থেকে।”


আবার প্রশ্ন করেছিল সুরচিতা, “যেসব লোকে কাগজের দাম দেয় না তাদের কাগজ দেওয়া বন্ধ করে দিলেই তো হতো, তাই না?” 

বাবা একটু যেন অন্যমনস্ক হয়ে গিয়ে বলেছিলেন, “দিয়েছিল। কিন্তু ওর কোটার কাগজ ওকে তুলতে হতো। পার্টির শিক্ষা হচ্ছে যে লোকে দাম না দিলেও কাগজটা লোককে দিতে হবে, তাদেরকে না হলে আদর্শ বোঝানো যাবে কী করে? কী করে তাদের ঠিক-ভুল বাছতে শেখানো যাবে? পার্টির আদর্শ কর্মীকে তাই লোকের বাড়ি বাড়ি কাগজ পৌঁছে দিয়ে জনসেবা করতে হয়, পার্টিকে জনপ্রিয় করার কাজ করতে হয়, পার্টির আদর্শ প্রচার করতে হয়। কিন্তু পার্টির কাগজ আর কেউ পড়তে চাইছে না। যাদের জোর করে কাগজ দিচ্ছে দিলীপ, তারা দাম দিতে চাইছে না। তবুও কিছু কাগজ বিলোচ্ছে ছেলেটা; কিন্তু বেশিরভাগ কাগজই ও আর বিলোচ্ছে না। সেই জন্যই ও বিষ-নজরে পড়েছে। ওকে জানিয়েও দেওয়া হয়েছে যে ও নিয়ম মানছে না বলে ওর ওপরে নেতৃত্ব বিরক্ত। তার মাশুল হিসেবেই পার্টির প্রতি দিলীপের নিষ্ঠার প্রমাণ চাওয়া হলো। ওকে একসাথে পাঁচ বছরের কাগজের দাম চুকিয়ে দিতে বলা হলো। তাই প্রেসটা বেচতে হলো।”


সুরচিতা বেশ অবাক হলো। রোজগারের একমাত্র উপায় বলতে যে প্রেসটা সেটা বেচে দিলে এতো বড়ো খরচের ধাক্কা দিলীপ চোকাবে কী করে? প্রেসটা থাকলে যা হোক রোজগার হতো। কাগজের দাম বাবদ যদি ধারও করতে হতো সেটাও শোধ করতে পারত সেই রোজগার থেকে। কিন্তু এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছিল না সুরচিতা। সেই কথা সে বাবাকে বলেও ফেলেছিল। বাবা বললেন, “দলের প্রতি নিষ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে মানে এবার ওকে ভাতে মারার আরও অনেক চেষ্টা হবে, যাতে ও আরও বেশি করে দলের ওপর নির্ভরশীল আর তার ফলে দলের আরও বাধ্য হয়ে পড়ে। সুরোজগারের আত্মবিশ্বাস আর তার ফলে জেগে ওঠা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য যাতে ভেঙে পড়ে তার ব্যবস্থা করা হবে--” 

সুরচিতা অধৈর্য হয়ে জানতে চাইল, “মানে?”

 বাবা একটা বড়ো শ্বাস ফেলে বললেন, “মানে এরপর কাগজ না তুললে প্রেসে হয়তো ডাকাতি করাবে বা আগুন ধরিয়ে দেবে।” বাবার গলা বুজে এসেছিল ক্ষোভে, দুঃখে।

#sanhitamukherjeeoriginals
পাঁচপক্ষ
~~~~~~
প্রত্নপক্ষ
~~~~~~
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, “একরকম তাই-ই। ওকে কোনোদিনই টুকুন বা পার্টি—কেউই--ছাপার কাজগুলোর পয়সা দেয় নি, টুকুনের জনসেবায় বা পার্টির জনপ্রিয়তা-বর্ধনের কাজে উদ্যোগী স্বনিযুক্ত সফল যুবকের চাঁদা বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল সেসব। তারওপর গত পাঁচবছরে কাগজের বিক্রি বাবদ যা দাম হয়, সবই ওকে একসাথে চোকাতে হলো, নিজের পকেট থেকে।”

আবার প্রশ্ন করেছিল সুরচিতা, “যেসব লোকে কাগজের দাম দেয় না তাদের কাগজ দেওয়া বন্ধ করে দিলেই তো হতো, তাই না?”
বাবা একটু যেন অন্যমনস্ক হয়ে গিয়ে বলেছিলেন, “দিয়েছিল। কিন্তু ওর কোটার কাগজ ওকে তুলতে হতো। পার্টির শিক্ষা হচ্ছে যে লোকে দাম না দিলেও কাগজটা লোককে দিতে হবে, তাদেরকে না হলে আদর্শ বোঝানো যাবে কী করে? কী করে তাদের ঠিক-ভুল বাছতে শেখানো যাবে? পার্টির আদর্শ কর্মীকে তাই লোকের বাড়ি বাড়ি কাগজ পৌঁছে দিয়ে জনসেবা করতে হয়, পার্টিকে জনপ্রিয় করার কাজ করতে হয়, পার্টির আদর্শ প্রচার করতে হয়। কিন্তু পার্টির কাগজ আর কেউ পড়তে চাইছে না। যাদের জোর করে কাগজ দিচ্ছে দিলীপ, তারা দাম দিতে চাইছে না। তবুও কিছু কাগজ বিলোচ্ছে ছেলেটা; কিন্তু বেশিরভাগ কাগজই ও আর বিলোচ্ছে না। সেই জন্যই ও বিষ-নজরে পড়েছে। ওকে জানিয়েও দেওয়া হয়েছে যে ও নিয়ম মানছে না বলে ওর ওপরে নেতৃত্ব বিরক্ত। তার মাশুল হিসেবেই পার্টির প্রতি দিলীপের নিষ্ঠার প্রমাণ চাওয়া হলো। ওকে একসাথে পাঁচ বছরের কাগজের দাম চুকিয়ে দিতে বলা হলো। তাই প্রেসটা বেচতে হলো।”

সুরচিতা বেশ অবাক হলো। রোজগারের একমাত্র উপায় বলতে যে প্রেসটা সেটা বেচে দিলে এতো বড়ো খরচের ধাক্কা দিলীপ চোকাবে কী করে? প্রেসটা থাকলে যা হোক রোজগার হতো। কাগজের দাম বাবদ যদি ধারও করতে হতো সেটাও শোধ করতে পারত সেই রোজগার থেকে। কিন্তু এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছিল না সুরচিতা। সেই কথা সে বাবাকে বলেও ফেলেছিল। বাবা বললেন, “দলের প্রতি নিষ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে মানে এবার ওকে ভাতে মারার আরও অনেক চেষ্টা হবে, যাতে ও আরও বেশি করে দলের ওপর নির্ভরশীল আর তার ফলে দলের আরও বাধ্য হয়ে পড়ে। সুরোজগারের আত্মবিশ্বাস আর তার ফলে জেগে ওঠা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য যাতে ভেঙে পড়ে তার ব্যবস্থা করা হবে--”
সুরচিতা অধৈর্য হয়ে জানতে চাইল, “মানে?”
বাবা একটা বড়ো শ্বাস ফেলে বললেন, “মানে এরপর কাগজ না তুললে প্রেসে হয়তো ডাকাতি করাবে বা আগুন ধরিয়ে দেবে।” বাবার গলা বুজে এসেছিল ক্ষোভে, দুঃখে।
~~~~~~
Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml
(চলবে)

Wednesday, April 15, 2026

Panchpoksho -12

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~


প্রত্নপক্ষ

~~~~~~

বাবা গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলেন। তারপর চৌকি থেকে ঝুলে থাকা পা দুটোকে খানিকক্ষণ মন দিয়ে দেখেছিলেন। তারপর পায়ের একটা পাতা অন্য পাতাটায় ঘষতে ঘষতে বলি-কী-না-বলি করে বলে ফেলেছিলেন, “দিলীপের প্রেসের ঘরটার ব্যবস্থা করার জন্য ওকে কাউন্সিলর টুকুন রায়ের কাছে যাতায়াত করতে হয়েছিল। দিলীপের তখন বছর পঁচিশেক বয়স, টগবগে ছেলে। টুকুনের মনে ধরেছিল ওকে। তারপর ওর চ্যালারাও দিলীপের ওখানে আড্ডা দিতে শুরু করে। সবার মতো দিলীপও নিজের প্রেসে টুকুনদের পার্টির কাগজ রাখতে শুরু করে। তারপর ঘরটা পাইয়ে দিয়েছে বলে টুকুন দিলীপকে বলে ওদের লিফলেট ছাপিয়ে দিতে, ব্যানার বানিয়ে দিতে। তারপর বলে ওদের হয়ে কাগজ বিক্রি করতে।” 

সুরচিতার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য প্রশ্ন তুলেছিল, “করল কেন? না করলে কী হতো?” 

বাবা নিরুপায় স্বরে বলেছিলেন, “তুই বুঝবি না সে কথা।”


বুঝবি না বললে তখন বেশ গায়ে লাগত সুরচিতার। ফলে তৎক্ষণাৎ বলেছিল, “বুঝিয়ে বললে নিশ্চয়ই বুঝব।” 

বাবা বলেছিলেন, “কারুর কথা--এমন সব কথা--আলোচনা করা ঠিক নয়।” 

সুরচিতা তর্ক করেছিল, “বেঠিক তখন যখন তুমি পরচর্চায় সুখ পাবে--ধরো কিনা পাড়ার লোকের কাছে এসব কথা বলে নিজের বুদ্ধির বড়াই করবে আর অহঙ্কারে ঝলমলাবে। আমাকে বললে ব্যাপারটা শিক্ষামূলক জীবনীপাঠ হবে।” 

বাবা একটু চুপ করে থেকে বলতে শুরু করেছিলেন, “দিলীপের অল্প বয়স তখন। সংসার করে ফেলেছে ... সংস্থান তো করতে হবে। ঘরটার জন্য টুকুন রায় মধ্যস্ততা করেছিল, না-হলে যে-দরে ও পেয়েছিল ঘরটা সেই দরে পাওয়া সম্ভব ছিল না। তাছাড়া ঘরটার মালিকানা নিয়েও অস্পষ্টতা ছিল। সব শরিক বা দাবিদারকে চেনাই দায় ছিল, তায় তুষ্ট করা তো দুরূহ কল্পনা। একজনের সাথে রফা হলে আরেকজন এসে বলে ‘আমিও শরিক। সুতরাং আমাকেও সমান টাকা দিতে হবে ঘরটা পেতে হলে।’ স্টেশন রোডের ওপর, বাজারের মধ্যে ব্যবসার জন্য একটা ঘর--বুঝতেই পারছিস অনেক লোকেরই নজর ছিল।” 

খিক খিক করে হেসে সুরচিতা বলেছিল, “বোঝো, একে বলে দালালির দাম চোকাতে দাসত্ব! এঁরা আবার সমাজের বঞ্চনা বেচে রাজনীতি করেন!” 

প্রত্যাশিত বিরক্তি প্রকাশ করে বাবা বলেছিলেন, “লেখাপড়া শিখে ভাষার এ কী অবস্থা! কাদের সঙ্গে মেশো আজকাল?”

সুরচিতা তখন উদ্ধত ছিল, তাই বলেছিল, “যাদের সঙ্গে মিশলে টুকুন রায়কে এড়িয়ে চলা যায় তাদের সাথে। এখনও তো ঝুড়ি থেকে বেড়াল বেরোল না। সেই ঘর ভাড়ার দালালি চোকাতে দিলীপকাকুর ব্যবসা বিকিয়ে গেল নাকি?”

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)



Tuesday, April 14, 2026

Panchpoksho - 11

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~

প্রত্নপক্ষ

~~~~~~

বাবা বলেছিলেন, “তুই যখন পছন্দ করছিস না এই টাকাটার ব্যাপারটা--” 

সুরচিতা দুম করে বলেছিল, “দিলীপকাকুর প্রেসটা চলছে না কেন? ফাল্গুনীর সামনের পুরোনো প্রেস তো এখনও ঘটাং ঘটাং করে চলছে?” 

বাবা খুব দ্বিধা করে বলেছিলেন, “সে অনেক কথা। ফাল্গুনীর প্রেস তো শুধু প্রেস নয়, ওদের মুদিখানা আছে, সিনেমা হলটা আছে, আরও আছে কাপড়ের দোকান। অনেক বড়ো পুঁজি। ওঁরা একটা ব্যবসার টাকা অন্যটায় এনে লাগাতে পারেন। সে কারণেই ওঁরা চটপট ম্যানুয়াল কম্পোজ ছেড়ে কম্পিউটারে কম্পোজ করার কাজ শুরু করে দিয়েছেন। ফাল্গুনীর বুড়ো মালিক-–কী যেন নাম--বল না?” 

সুরচিতা মনে করিয়ে দিয়েছিল বাবাকে, “মণিভূষণ গুঁই।” 

বাবা আবার ফিরে গিয়েছিলেন তাঁর আত্মগত কথোপকথনে। সুরচিতাও যেন এক বোয়া কন্সট্রিকটরের গল্প শুনছিল গোগ্রাসে।


“হ্যাঁ। ওঁর সাথে ওঁর ছেলেরা তো ছিলই এখন আবার মেজছেলের বড়োছেলেটাও কাজকম্ম করছে। ও তো কম্পিউটার শিখেছে, একটা ইন্টারনেট কাফে খুলেছে। ও-ই সব কম্পোজের কাজগুলো করে এখন।” 

সুরচিতা বোঝার চেষ্টা করছিল যে দিলীপের প্রেস বন্ধ হওয়ার পিছনে আধুনিক প্রযুক্তির সাথে পুরোনো প্রযুক্তির পাঞ্জা লড়াই নাকি সিআইএ বা গুঁই কোম্পানির কোনো ষড়যন্ত্র আছে। তাই ফস্‌ করে বলল, “তো ওরাই কী দিলীপকাকুর প্রেস বন্ধ করার জন্য কিছু করেছে?” 

বাবা মুচকি হেসে বলেছিলেন, “ওঁদের কিচ্ছু যায় আসে না দিলীপের মতো দু তিনটে লোকের ছাপাখানাতে। মণিবাবুই তো দিলীপের প্রেসটা কিনলেন, কোনো দরাদরি ছাড়াই। দিলীপ তো ওঁদের ওখানেই কাজ শিখেছে। তারপর উনিই গ্যারেন্টার হয়ে দিলীপের লোনের ব্যবস্থা করে ওর প্রেসটা খুলে দিয়েছিলেন। শুরুর দিকে কাজও দিতেন। বিয়ের কার্ড ছাপা, ক্যালেন্ডার, ডাইরি, পরে পরে পাঁজি, শারদীয়ার স্যুভেনির, বই।” 

সুরচিতার বেশ জটিল লাগছিল এবার। তাই বলে ফেলেছিল, “তাহলে, দিলীপকাকু প্রেসটা চালাতে পারল না কেন?”

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)



Monday, April 13, 2026

Panchpoksho -10

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রত্নপক্ষ

~~~~~~

সুরচিতা কোনো উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়েছিল বাবার চোখের মধ্যে সরাসরি। বাবা তখন বলেছিলেন, “পার্টি তো ফ্রি স্কুল দেখিয়ে দিয়েছে, সেখানে পড়তে তো পয়সা লাগে না। কিন্তু আঁকার মাস্টারের কাছে টিউশন না নিলে ছেলেরা সব আঁকাতেও ফেল করে। যে-ছেলের বাবা আর্ট কলেজের মাস্টার তার ছেলেও ফেল করে। মাস্টারও পার্টির লোক, মাস গেলে সে সংগঠনকে, দলকে চাঁদা দেয়; দিলীপের থেকে বেশিই দেয় হয়তো। কী করবে দিলীপ? ছেলেটার ক্লাস নাইন। তুই যদি দেখিয়ে দিলে ওর মাধ্যমিকটা উতরে যায়।” 

সুরচিতা বলেছিল, “আমি দেখালে ও পাশ করবে? জানলে কী করে?” 

বাবা বলেছিলেন, “ছেলেটা ক্লাসে র‍্যাঙ্ক করে। এতকাল ইস্কুলের মাস্টারের কাছেই পড়তো। তাঁদের কেউ কেউ ওকে এখন বিনাপয়সায় পড়াতেও রাজি; কিন্তু ছেলে পড়বে না।” 

সুরচিতা একটু অবাক হলো। তারপর ভাবলো সেও তো বাবা-মায়ের অবাধ্য, মত ও পথের বিরোধী। আরেকটা ছেলে তেমন হতেই পারে। কিন্তু বাবা-মায়ের সাথে দরাদরিটা সে ছাড়তে পারবে না। এতো অবিচার, অন্যায়ের শোধ তোলার একটা সুযোগ তার এসেছে; সে ছাড়বে না। তখন বলল, “বেশ ওকে ফ্রি-তে পড়াতে পারি। কিন্তু তোমাকে ফ্রি-তে মহান হতে দেব না।” 

বাবা বললেন, “বেশ আসছে মাস থেকে ইলেক্ট্রিকের বিল তোমাকে দিতে হবে না।”


তারপর একদিন সকালে অভি এসেছিলো। সেদিন নাইনের অঙ্কের ক্লাস। ক্লাসের সাথে অভি তাল মেলাতে পারবে কিনা দেখার জন্য সেদিন ওর পরীক্ষা নিয়েছিল সুরচিতা। ছেলেটা একশোয় পঁচানব্বই পেয়েছিল। বিনেপয়সায় বেশি খাটতে হবে না দেখে সুরচিতা খুশি হয়েছিল। কিন্তু পরের দিন অভি আসে নি। তারপরের দিনও না। এদিকে ইলেক্ট্রিকের বিল এসে গিয়েছিল। সুরচিতা কেঁচে যাওয়া যুদ্ধটার জন্য বেশ খেপে গিয়েছিল। তবু বিলটা দেখে ও একমাসের টাকাটা বাবার টেবিলে রেখে দিয়েছিল।


সন্ধে পেরিয়ে প্রায় রাত তখন। সুরচিতা খাটে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ছিল। বাবা এসেছিলেন ওর কাছে, ইলেক্ট্রিক বিল বাবদ যে টাকাটা ও বাবার টেবিলে রেখে এসেছিল সেই টাকাটা ওকে ফেরত দেবেন বলে। সুরচিতা বলেছিল, “সে ছোকরা তো আসছে না। অতএব আমাকেও ফোকটে খাটতে হচ্ছে না।” 

বাবা বলেছিলেন, “সে ছেলের আত্মসম্মান বোধ তীব্র। সে তোর বাকি ছাত্রদের থেকে জেনে গেছে তারা মাইনে দিয়েই পড়ে। তাই ও দিলীপকে বলে দিয়েছে যে ও নিজেই যা পারে তার জন্য টিউটরের দরকার নেই ওর।” 

সুরচিতা বলেছিল, “তাহলে আর টাকাটা ফেরত দিচ্ছ কেন?”


~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)


Sunday, April 12, 2026

Panchpoksho - 09

পাঁচপক্ষ
~~~~~~



প্রত্নপক্ষ
~~~~~~
সুরচিতা বলে, “থাকো মফস্বলে; যেখান থেকে হাতখরচের টাকায় রেজাল্ট দেখতে যাওয়ার পথখরচ ছিল না আমার সেদিন। তার ওপর পথখরচের ব্যবস্থা করলাম তো বিপদ-আপদের আশঙ্কায় আমাকে একা যেতে না দেওয়ার ড্রামাবাজি করে সময় মতো রেজাল্ট দেখতে যেতে দাও নি, নিজেরাও দেখে আসো নি। অন্য লোকে নিজের ছেলের রেজাল্ট দেখতে গিয়েছিল, সে তোমাদের অনুরোধ রাখতে আমার রেজাল্টও দেখে আসবে বলেছিল; সে এসে যা বলেছিল সেটাই বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছিলে; এই অন্য লোকটা কে? না যে তোমার মেয়ের স্কলারশিপের দরখাস্ত জমা দেবে বলে দেয় নি এমন সন্দেহ তোমাদেরও হয়েছিল। বলিহারি তোমাদের মানুষে বিশ্বাস!”
মা তখন সুর বদলেছিলেন, “তোর সব ব্যাপারে পুরোনো কথা টেনে আনা--”
সুরচিতা বলেছিল, “ঘটনাগুলো ভুলে গেলে দুঃখ লাঘব হয়, কিন্তু তার থেকে পাওয়া শিক্ষাটা ভুলে গেলে আবার একই ঘটনার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। তোমাদের চোখে ঠুলি, তোমরা বুদ্ধিকে অস্বীকার করে নির্বোধ আর নির্বিবাদী আদর্শবাদ দেখিয়ে যাও। বাস্তব বুদ্ধিতে যারা বাচ্চা মানুষ করল তাদের নিন্দে করো; তাদেরকে আত্মকেন্দ্রিক আর স্বার্থপর বলো। তোমরা নিজেরা নিজেদের মতো করে, নিজেদের বিচারে, ভালোমানুষটি থাকো। আমাকে ভালো মানুষ বানানোর চেষ্টা কোরো না খবর্দার। তোমার বাচ্চার দায়িত্ব তুমি না নিতে পারলে কে নেবে? সমাজ? পার্টি? আমাকে বঞ্চিত করে পার্টি আর সমাজ পোষণ করে চলেছ আমি কিচ্ছু বলি নি, এবার যে সমাজের আর পার্টির হাবিজাবি লোককে পুষতে আমাকে শোষণ করতে চাইছ! দেব সব ভেঙে, পুড়িয়ে তোমাদের মতো, তোমাদের প্রিয় বিপ্লবী কায়দায়?”
মায়ের ধৈর্যের বাধ ভেঙেছিল। হাতের কাছে ডিকশনারিটা ছিল, শব্দজব্দ করছিলেন, সেটা দিয়ে সুরচিতার পিঠে এক ঘা দিয়ে বলেছিলেন, “কী করবি তুই? কী করতে পারিস?”
সুরচিতা বলেছিল, “তোমার শাড়িটা দিয়ে তোমার ঘরের পাখা থেকে ঝুলব, হাতের মুঠোয় চিঠিতে লেখা থাকবে তোমাদের গুণপনা।” তারপর মায়ের হাত থেকে খবরের কাগজটা কেড়ে নিয়ে কুটিকুটি করে ছিঁড়ে দিয়েছিল। তাকে যে বাবা-মা লাগাম পরিয়ে রাখতে পারেন নি সেটা প্রমাণ করার জন্য তক্ষুনি কিছু একটা করা জরুরি হয়ে পড়েছিল যে।
সেদিন রাতে খেতে বসে বাবা বলেছিলেন, “দিলীপের প্রেসটা বন্ধ করে দিতে হয়েছে। ওর ছেলেটার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার দাখিল। পার্টি যদি এসব দেখত তাহলে কি আর তোকে বলতাম পড়াতে?”
~~~~~~
Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml
(চলবে)

Saturday, April 11, 2026

Panchpoksho -08

 পাঁচপক্ষ
~~~~~~



প্রত্নপক্ষ
~~~~~~
বাবা যেদিন বলেছিলেন, “মামন, দিলীপের ছেলেটাকে একটু পড়াস তো।”
সেদিন সুরচিতা মায়ের কাছে গজগজ করেছিল, “কেন পড়াবো? একটা টিউশনও কি বাবা দেখে দিয়েছে? কলেজের সিনিয়ররা দিয়েছে না হলে মাস্টারমশাইরা; কিংবা আমার রেজাল্ট ভালো, আমি পড়াই ভালো শুনে বাচ্চাদের বাবা-মায়েরা নিজেরাই এসেছেন। তাঁরা মাস গেলে পয়সা দেন। তাই তুমি আমার ট্রেনের কোয়ার্টার্লি টিকিটের ভাড়া দাও না। আর বাবা ইলেকট্রিক বিলের প্রত্যেক মাসের পয়সা নিয়ে নেয় যেহেতু বাবার বাড়ির ইলেকট্রিসিটি আর বারান্দা ব্যবহার করি টিউশন পড়ানোর জন্য। দিলীপ মানে তো কাগজওয়ালা?”
মা তেড়ে এসেছিলেন, “ফের অমন করে কথা বলছিস ঝগড়াটে মেয়ে? বাপ-মা লেখাপড়া না শেখালে এতো হিসেব দেখাতিস কী করে? দিলীপকে বলে কিনা খবরের কাগজওয়ালা! কেন? না ও রবিবারগুলোতে পার্টির কাগজটা বিলি করে। অসভ্য মেয়ে কোথাকার। এই ব্যবহার হবে বলে পেটে ধরেছিলাম তোকে!”
সুরচিতাও ফুঁসে উঠেছিল, “সে পার্টির হোক আর ভাটির, সপ্তায় সাতদিন হোক আর একদিন, খবরের কাগজ বিলি করলে তাকে কাগজওয়ালাই বলে। শেখার কথা কী বলছ? কতটা বাস্তব চিন্তা করেছ আমার শিক্ষা নিয়ে? পার্টির শিক্ষা অক্ষরে অক্ষরে মেনে তোমরা আমাকে না পড়িয়েছ ইংলিশ মিডিয়ামে না পড়তে দিয়েছ ইঞ্জিনিয়ারিং, পাছে তোমাদের পার্টির লোকে তোমাদের অপছন্দ করে, আত্মীয়রা মিথ্যুক বলে বা পাড়াপড়শিরা তোমাদের দ্বিচারণ দেখে মুখ বেঁকিয়ে হাসে, গুছিয়ে তোমাদের নিন্দে করে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে আমার স্বার্থপর আর আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখে। আরও বেশি করে ভয়ে; যদি আমি তোমাদের লাগামছাড়া হয়ে যাই আর তাতে তোমাদের এই সব আত্মীয়-বন্ধু-পার্টি-পরিজন যাদের আপনজন বলার ভান করে সাজানো আনন্দে বেঁচে আছো তারাও তোমাদের ত্যাগ করে তোমরা ভণ্ড বলে--”।
মা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন, “তুই কী চান্স পেয়েছিলি এন্ট্রাসে?”

~~~~~~
Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml
(চলবে)

Friday, April 10, 2026

Panchpoksho - 07

পাঁচপক্ষ
~~~~~~



প্রথমপক্ষ
~~~~~~
সুরচিতা বলল, “কেন? অভিকে গোরা সাহেবের গরমের রাজধানী দেখাতে পারি।”
মা বললেন, “তোর ঢং তুই রাখ। নিজে তো ধিঙ্গি শিরোমণি, ছাত্রকে যে সকাল সকাল সংসারে মন দিতে বলবে তেমন দুরাশা আমি করি না। এবার রাখো।”
মা ফোন কখনও রাখেন না। কথা বলতে না ইচ্ছে করলে, সুরচিতাকেই বলেন লাইন ছেড়ে দিতে। মিশনে আসার আগে থেকেই মা-বাবা চাইছিলেন সুরচিতা সংসারী হওয়ার কথা ভাবুক। কিন্তু সুরচিতার যথেষ্ট কারণ ছিল সেসব এড়িয়ে পালিয়ে বেড়ানোর। সেই হেতু সে ধিঙ্গি শিরোমণি ও মা-বাবার শিরঃপীড়ার কারণ। আজ কিন্তু মায়ের কথায় সুরচিতা মোটেই আহত হলো না। বরং এতদিন পরে অভির দেখা পাবে ভেবে কেমন একটা নতুন অনুভূতিতে একসাথে উদ্দীপিত আর আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল যেন।

আজ পূর্ণিমা নয়। পরশু পূর্ণিমা। তাই তারারা সব অস্পষ্ট। কোনো একটা ক্রিপ্টোমেরিয়ার ডালপাতার ঘেরাটোপ থেকে একটা ইন্ডিয়ান ব্রেনফিভার একটানা ডেকে চলেছে “চো-ও-খ গেলো-ও”, “চো-ও-খ গেলো-ও”, “চো-ও-খ গেলো-ও”- - -। সুরচিতা বাগান থেকে ঘরে এসে টান টান শুয়ে পড়ল খাটে।
আজ রাঁধবেও না; খাতাও দেখবে না; বইও পড়বে না। খিদে পেলে? দুধ বিস্কুট খাবে। কিন্তু আজ আর কিচ্ছু না। এতো দিনের অপেক্ষা তার সত্যি হতে চলেছে। যে কিশোরকে সে ছেড়ে এসেছিল তার যৌবনের ফটকে, সে আজ পূর্ণ পৌরুষে প্রেমের দাবি নিয়ে এলো বলে সুরচিতার দরজায়। অবাক সুরচিতা ফিরে দেখতে চাইছিল ফেলে আসা বছর মাস দিন ক্ষণ।

আর শেষ প্রস্তুতি নিচ্ছিল আসন্ন ঝড়-ঝঞ্ঝার জন্য। তবুও মন জুড়ে সেই প্রথম যৌবনের গোধূলির রক্তরাগ; “সে আসছে, সে আসছে--”। মগজ জুড়ে কঠিন পরীক্ষার উত্তেজনা, আর হৃদয় দ্রবীভূত প্রেমের ম্যাগমা স্রোতে। আর মন? তার জন্যই তো এতো জটিলতা--এতো পেয়েও নিঃস্ব থাকার সাধনা, সর্বস্ব সঁপে দিয়ে স্বার্থপরের তকমা নেওয়া; সব দান, সব উপহার গ্রহণ করতে না পারার অক্ষমতায় অহঙ্কারীর পরিচয়ে বাঁচা; লাভ-ক্ষতির হিসেব না করে, জীবনটা যাপন করে যাওয়া; সত্তাকে ভাগ-যোগ-বিয়োগ না করে, তার কয়েকগুণে প্রকাশ করা; যা গেল তার দুঃখ না পেয়ে যা আছে তার আনন্দে মত্ত থাকা।
~~~~~~
Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml
(চলবে)

Thursday, April 9, 2026

Panchpoksho - 06

 পাঁচপক্ষ
~~~~~~



প্রথমপক্ষ
~~~~~~
সুরচিতার মা শুধু বাইরের খোলসটার কথাই জানেন। তাঁর মনে হয় যে পড়াশুনায় অনুৎসাহী একদল ছেলেমেয়েকে লেখাপড়ায় তুখোড় করার চেষ্টা করে বাজে সময় নষ্ট করছে তাঁর মেয়ে। তাঁর ধারণা যে সুরচিতা হাজার চেষ্টা করলেও অমনোযোগী ছাত্রদের কিছুতেই কিছু শেখাতে পারবে না। তাঁর মতে এই ভস্মে ঘি-ঢালা পরিশ্রমে সুরচিতা মিশনের উদ্দেশ্যসিদ্ধির একটা যন্ত্র হয়ে উঠেছে মাত্র। বরং ঝকঝকে দু-চারজন ছাত্রকে প্রাইভেট টিউশন দিলে তার সংসার-খরচ আর বাড়িভাড়া উঠে আসত, মাইনেতে হাতই পড়ত না, সেটা জমত ভবিষ্যতের জন্য। কিছু সুনামও বাড়ত তাঁর মেয়ের। তাই তিনি সুরচিতার সপ্তাহান্তের কাজ নিয়ে তাঁর অপছন্দ আর বিরক্তি মাঝে মাঝে ব্যক্ত করে থাকেন।
আজ কিন্তু তিনি ভীষণ উত্তেজিত, আহ্লাদিত। এমনটা হয় তখনই যখন তিনি ভাবেন যে তিনি সুরচিতার নিস্তরঙ্গ জীবনে এক ঝলক খুশির তুফান তুলে দিতে চলেছেন। তাই সুরচিতার রান্নার পদাবলী শুনেও তিনি বললেন, “ভালো। কাল বাদ পরশু একটু ভালো করে বাজার করে রাখিস। ভালো করে রান্নাও করিস।”
সুরচিতা কৌতুক করে বলল, “তুমি আসবে বুঝি?” মা বললেন, “রক্ষে করো। তোমার অমন হাঁটুভাঙা পাহাড়ের মাথায় আমি আবার যাব? তাও এই চৈত মাসের বৃষ্টির পরে, শীতশীত স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ায়? তারওপর তোমার আবার আদরের ইস্কুলের কোয়ার্টারখানা পাথুরে গোমড়ামুখো বাড়ি। কতো বছরের শ্যাওলা আর হাঁপানির ব্যামো বাসা করে আছে যেন!”
মা থামলেন। হয় কথা হারিয়েছেন, না হলে খেই। না হলে দম, না হলে সাহস। এই বুঝি সমালোচনা অসহ্য হলো বলে মেয়ে তাঁর ফোন কেটে দিল। কিন্তু মেয়ের এসব কথা গায়ে লাগে না। যেদিন সময় থাকে না সেদিন ফোন কেটে দেয়; বা ইচ্ছে করে না পুরোনো রেকর্ড শুনতে সেদিন ফোন কেটে দেয়।
কিন্তু আজ মায়ের কথায় ভণিতা আছে। মানে তার পেছনে একটা চমকপ্রদ খবর আছে। বা আপাত চমকপ্রদ খবর আছে। তাই সে বলল, “কিন্ত পরশু দিনটা হঠাৎ বিশেষ রান্নার দিন হতে যাবে কেন?”
মা বললেন, “সে তুমি জানবে কী করে? কাউকে তো ফোন নম্বর দাও না। অমন ছায়ার মতো ছাত্র তোমার, তাকেও দাও নি।”
সুরচিতার সব রক্ত যেন দুগালে এসে জমা হলো, বুকের মধ্যে হাতুড়ি পিটতে লাগল। গলাটা শুকিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু গলা জুড়ে আনন্দ খেলিয়ে বলল, “অভি আসছে, মা?”
মা বললেন, “হ্যাঁ। সে ছেলে যে আবার একটা নতুন চাকরি জুটিয়েছে তা তো তোকে বলেইছিলাম। এবার একটু লম্বা ছুটিতে এসেছে। তোর কাছে যাবে কদিনের জন্য। ভালোমন্দ খাওয়াস। আর কোনো সুকর্ম তো তোকে দিয়ে হবে না।”
~~~~~~
Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml
(চলবে)

Wednesday, April 8, 2026

Panchpoksho - 05

পাঁচপক্ষ
~~~~~~



প্রথমপক্ষ
~~~~~~
একবার কৈশোর যৌবনের এই দ্বন্দ্বে প্রবৃত্তির কাছে বোধের হারটা সুরচিতার কাছে ব্যক্তিগত আঘাত হয়ে উঠেছিল। এই হার তার থেকে কেড়ে নিয়েছিল তার এক মেধাবী ছাত্রীকে। তার স্বভাবগত প্রতিশোধস্পৃহা থেকে সে প্রতিজ্ঞা করেছিল যে বোধ আর প্রবৃত্তির লড়াইতে বোধকে জিতিয়ে দেওয়ার জন্য সে আপ্রাণ চেষ্টা করবে। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে সে ছল আর কৌশলের হাত ধরবে।
হয়তো ভাবতো না এমন করে। কিন্তু ঘটনার পারম্পর্যে তার মনে পড়ে গিয়েছিল তার নিজের কৈশোরের অসহায়তার কথা, মরিয়া হয়ে প্রতিকার খোঁজার কথা। তার প্রথম যৌবনের ইচ্ছে আর আবেগ অবদমনের কথা। তার জীবনে পাওয়া যাবতীয় যৌনাঘাতের কথা, সেসব কাটিয়ে ওঠার চেষ্টার কথা। তার প্রেমের কথা।
সেসব কথার নৈর্ব্যক্তিক বিশ্লেষণে সে বুঝেছিল যে নিজের আবেগ আর বুদ্ধি দিয়ে যে জগৎ সে বানিয়েছে, সেদিন থেকে তার বর্তমান অবধি, সেটাই তার আর তার সাথে নানা সম্পর্কে জড়িয়ে থাকা নিকটতম মানুষগুলোর জীবনের বর্ম, সামাজিক আক্রমণের প্রতিরোধে, সামাজিক আগ্রাসন থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্যও। এর থেকে তার বিশ্বাসও জন্মেছে যে দুর্বুদ্ধি যদি মানুষের আবেগকে উস্কে মানুষের মধ্যে দলাদলি আর দাঙ্গা বাধাতে পারে, তাহলে বুদ্ধি দিয়েই মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে তাকে বিবেচক আর সংযতও করে তোলা যায়।
এই কৌশলের নাম চরিত্র গঠন বা চরিত্রে গিঁট পাকানো--যাই হোক না কেন। সুরচিতা জীবনকে আরও বোধ, আরও বিবেচনা, আরও স্বস্তি, আরও সন্তোষ দেওয়ার জন্য কোমর বেঁধে নেমেছে সেই থেকে। প্রকাশ্যে অঙ্ক শেখালেও, ভেতরে ভেতরে তার কারখানা যুক্তি বোনে ছাত্রদের ভাবনায়, যথাযথ প্রশ্ন করতে আর যুক্তিভিত্তিক উত্তর উপলব্ধি করতে শেখায়, সামাজিক আগ্রাসনের থেকে ব্যক্তি হয়ে টিঁকে থাকতে শেখায়। শুধু তাই নয়। টিঁকে থাকার এই লড়াইতে কী করে হাতের কাছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অস্ত্র চিনে নিতে হয়, কী করেই বা তা ব্যবহার করতে হয় সে সম্বন্ধেও কাজে লাগার মতো তথ্য ছড়ায়।
~~~~~~
Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml
(চলবে)

Tuesday, April 7, 2026

Panchpoksho - 04

 পাঁচপক্ষ
~~~~~~



প্রথমপক্ষ
~~~~~~
আবাসিক পালানোটা তাই তাদের কাছে ভয়ঙ্কর দুর্যোগের সামিল, না হলে দুর্যোগের প্রাদুর্ভাব। তাই এসব দুর্যোগের মোকাবিলা করার জন্য, বিশেষ করে, স্থানীয় মানুষের মনে মিশনের অস্তিত্ব আর কাজ নিয়ে সন্দেহ, অসন্তোষ, ক্ষোভ বা সেসব তৈরি হওয়ার মূল নিড়িয়ে ফেলার চেষ্টায় নিয়মিত আশেপাশের গ্রামগুলোতে যান মিশনের সন্ন্যাসিনীরা। তাঁরা চেষ্টা করেন স্থানীয় ভাষাটা রপ্ত করে আশেপাশের গ্রামের লোকেদের দৈনন্দিন যাপনের সুখাসুখের খবরাখবর রাখার। তাঁরা মনে করেন যে এভাবে তাঁরা মিশনের প্রতিবেশিদের অবিশ্বাস জিতে বিশ্বস্ত হয়ে উঠতে পারবেন, আশা ভরসার আধার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবেন, আর তার ফলে নিজেদের জনপ্রিয়তা ও পৃষ্ঠপোষকের সংখ্যাও বাড়াতে পারবেন।

গ্রামে নানা ধরনের কাজ করে মিশন। তার মধ্যে যেমন আছে রুগীর আর আহতের শুশ্রূষা, ধাত্রীর সেবা, ভূত তাড়ানো, ভূত ছাড়ানো তেমনই আছে আচার বানানোর, সেলাই করার, গরম কাপড় বোনার বা জৈব চাষ করার কৌশল শেখানো, আরও আছে শিশুকিশোরদের পড়াশোনা শেখানোর কাজ আর চরিত্রবিকাশের উদ্যোগ। সুরচিতা যোগ দিয়েছে পড়াশোনা শেখানোর কাজে। শুরুতে চরিত্রবিকাশ ব্যাপারটা কী-কেন এসব নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু তার ছাত্রদের মতিগতি বুঝতে গিয়ে সে ক্রমে সামিল হয়ে গেছে চরিত্র রূপায়নের উদ্যোগে।

তার বেশ হাসিই পেত প্রথম প্রথম নামগান শুনিয়ে, জপমালা ধরিয়ে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের ধার্মিক করে তোলার নামে ধর্মভীরু করে তোলার চেষ্টা দেখে। কিন্তু যত দিন কেটেছে তার কাছে স্পষ্ট হয়েছে এই চেষ্টার মূলে আছে নিতান্ত জান্তব জৈবিক জীবনকে অতিক্রম করে মনুষ্যত্ব অর্জনের এক অধ্যবসায়। কিন্তু জৈবিক প্রক্রিয়ার অমোঘতার সাথে সংঘাতে বেশিরভাগ সময়েই সে অধ্যবসায়ের হার হতে দেখেছে। বার বার অনুশীলন, অধ্যবসায়ের শৃঙ্খলা কাটিয়ে বয়ঃসন্ধির নতুন যৌনাকর্ষণ টেনে নিয়ে গেছে ছেলেমেয়েগুলোকে অকালে প্রাপ্তবয়স্ক দায়িত্বের দিকে, নেহাৎ প্রাকৃতিক খেয়ালে।
অপরিণত যৌবন আর অনুদ্‌যাপিত কৈশোরের যুদ্ধে শেষ হয়ে গেছে কিছু জীবন নেহাৎ অল্প বয়সে। কিছু জীবন নড়বড়ে দুর্বল অস্তিত্ব নিয়ে গড়িয়ে গেছে প্রথম ভ্রান্তি থেকে পরবর্তী ভুলে, তার থেকে বৃহত্তর অপরাধের কবলে। কিছু জীবন নড়বড়ে অস্তিত্বে টিঁকে থাকার লড়াইকে করে ফেলেছে ভয়ানক জটিল। কিছু জীবন বঞ্চিত হয়েছে সুস্থ পারিবারিক জীবন থেকে। কিছু জীবন আত্মঘাতী হয়েছে, কিছু হয়েছে সন্তানঘাতী। কিছু সদ্যজাত প্রাণ নিভে গেছে অবহেলায়, পরিত্যাগে।
~~~~~~
Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml
(চলবে)

Readers Loved