Monday, May 11, 2026

Panchpoksho - 38

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রতিপক্ষ

~~~~~~


ধৃতিকান্তর চোখে ‘ফির কেয়া হুয়া’ জাতীয় প্রশ্নের ছায়া দেখে, বলে চোলে, “এতক্ষণে তাঁরা কাজ শেষ করে ফেলে নিজের নিজের জপমালা বা ধর্মগ্রন্থ নিয়ে বসে গেছেন বাগানে বা বারান্দায় বা বসার ঘরে। বারোটার ঘন্টা বাজলে আবার হেঁসেলে যাবেন, ডাল-ভাত-তরকারি খাবেন, বাসন-কোসন মাজবেন ফের দিবানিদ্রা দেবেন, বা আচার শুকোবেন কী লেস বুনবেন, কিংবা সোয়েটার। কেউ কেউ পাড়াও বেড়াতে বেরোন। বিকেলে উপাসনাকেন্দ্রে গিয়ে পিয়ানো বাজিয়ে গান-টান গাইবেন। তারপর রাতের খাওয়া সেরে নেবেন।”

বিস্তারিত বিবরণের পর এলো উপসংহার, “তাহলে বুঝেছ? এখানে তুমি চাও বা না–চাও ভোররাতে ঘুম ভাঙবেই। তবে দিনের কাজে কেউ কেউ আবার আপোশও করবেন। সরেজমিনে দেখতে আসবেন আপ হামারে হ্যাঁয় কৌন?” 

ব্যাজার মুখে ধৃতিকান্ত বলেছিল, “আমি তোর ভেতরের ঘরে ঘুমোতে যাচ্ছি।” 

ঝটিতি জবাব দিয়েছিল সুরচিতা, “বাব্বা শুধু পুরুষবন্ধু নয়, এক্কেবারে বেডরুমে! কী মশলা গো সন্ন্যাসিনীদের পানসে জীবনে! ওঁরা বচ্ছরভরের খোরাক পাবেন রে, আমাদের দুহাত তুলে আশির্বাদ করবেন।” 

ধৃতিকান্ত ঘরের ভেতর থেকে গজগজ করে কী বলেছিল শুনতে পায় নি সুরচিতা।


স্নান সেরে ব্রেকফাস্ট বানিয়ে তৈরি হয়ে নিয়েছিল সুরচিতা। তারপর আবার চা নিয়ে বসে ও খবরের কাগজ উল্টেপাল্টে দেখতে দেখতেই ধৃতিকান্ত স্নান সেরে তৈরি হয়ে গিয়েছিল। খাওয়া সেরে বেরোনোর মুখে দেখা হয়ে গিয়েছিল একদল সন্ন্যাসিনীর সাথে। ওঁরা গুহামন্দিরের বাগানের পরিচর্যা সেরে ফিরছিলেন বাসায়। ওঁদের অনেকেই আবার সুরচিতার সহকর্মী। ওঁদের সাথে ধৃতিকান্তের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল সে। 

সন্ন্যাসিনীরা পরামর্শ দিয়েছিলেন জেলাশহর টৌলিং দেখতে যাওয়ার। কারণ সেটা পুরোনো দিনের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী হওয়ায় ঐতিহাসিক শহর। তারওপর স্থানীয় মানুষের উৎসাহে ইতিহাস সেখানে এখনও জেগে আছে গলিঘুঁজি থেকে রাজপথে। ফলে বেশ আকর্ষণীয় গম্ভীর জায়গা। আবার পুরোনো রঙে রাঙা হলেও বেশ ঊজ্বল। 

তারপর ওঁরা ঘুরে ঘুরে ধৃতিকান্তকে দেখিয়ে ছিলেন গুহামন্দির, উপাসনাকেন্দ্র, আর আবাসিক অংশ বাদে মঠের আনাচকানাচ। সিঁড়ি দিয়ে হাইওয়েতে নেমে সুরচিতারা ট্রেকার পেয়ে গিয়েছিল টৌলিং-এ যাওয়ার। চকে গিয়ে ঘুরতে ঘুরতে বকবক করতে করতে বাছাই করা রেস্তোরাঁতে পৌঁছে ওরা খাওয়া-দাওয়াও সেরেছিল।

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Sunday, May 10, 2026

Panchpoksho - 37

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রতিপক্ষ

~~~~~~

ধৃতিকান্তর উত্তর সুরচিতার অজানা ছিল না। সে বলেছিল, “না, তোর বাবা ফোন ধরেছিলেন। তোর মোবাইল নাম্বার দিলেন, ঠিকানা দিলেন। আজ এলে তোকে পাব কিনা সেটা আমিই জিজ্ঞেস করেছিলাম। আমি যদিও তিনটে হাওয়াই আড্ডা পার হয়ে তবে তোর এখানে এলাম, কিন্তু তোর বাবাকে ফোন করেছিলাম ইউসিএলএ থেকেই।” 

সুরচিতা পুরোনো দিনের মতো উচ্ছসিত হয়ে বলেছিল, “বস! তুমি তো হলিউডের কোলের ছেলে এখন।” 

ধৃতিকান্ত হেসেছিল মুচকি। সুরচিতা আবার বলেছিল, “বাবা কী জানেন যে তুই আইএসডি করছিলি?” 

ধৃতিকান্ত নেতিবাচক মাথা নেড়েছিল। তারপর বলেছিল, “চিতা, তুই সত্যিই ডিজিট্যাল পৃথিবীর বাইরে। এখন আইএসডি করার দরকার পড়ে না। ভিওআইপি দিয়েই সস্তায় কথা বলা যায়।” 

শ্রোতার গোল গোল চোখ দেখে আবার বলতে শুরু করেছিল, “ভিওআইপি মানে--” 

তাকে মাঝপথে থামিয়ে সুরচিতা বলেছিল, “নে এবার ঘুমো। আমার পড়শিরা আবার চারটে থেকে উঠে ঘন্টা বাজাতে শুরু করবে।”


সকাল বেলা দুকাপ চা হাতে বসার ঘরে এসেছিলো সুরচিতা। ধৃতিকান্ত তখনও ঘুমোচ্ছিল। সুরচিতা ওকে ডেকে তুলতে ও উঠে বসল ধড়মড়িয়ে। তারপর হাই তুলতে তুলতে বলল, “ওরে বাবা চারটের সময় অতো ঘন্টা বাজল কেন? তারপর গুনগুন করতে করতে লোকজন যায় আর আসে, যায় আর আসে। ঘুমের দফারফা।” 

সুরচিতা ‘আগেই-তো-বলেছিলাম’ জাতীয় একটা ভঙ্গিমায় জবাব দিয়েছিল, “সন্ন্যাসিনীরা ছটায় ডিনার খেয়ে শুয়ে পড়েন। অন্ধকার থাকতে উঠে ধম্মকম্মে লাগেন। ঊষালগ্নে গুহার মধ্যে রাখা জাগ্রত দেবতার মূর্তিতে অর্ঘ্য অর্পণ করে জপতপ সারেন। তারপর উপাসনাকেন্দ্রে গিয়ে ভগবানের অবতারদের গানটান শোনান। ফের পুরুত শান্তির জল ছেটান আর সবাই মাথা পেতে নেন; তারপর “নবজন্মের আরক” বা “এলিক্সির অফ রিজুভেনেশন” নামে ভগবানের প্রথম অবতারের আঙুলের ডগা ছোঁয়া চিনির জল খেয়ে নিজেদের হেঁসেলে ঢোকেন।”

শ্রোতার মনোযোগে ইন্ধন দিয়ে বলে চলে, “বরাদ্দ মতো দুধ বা চা, পাঁউরুটি, কলা, ডিম, আপেল যে যা খান তাই খেয়ে যার যা কাজ তাতে লেগে পড়েন। মানে কেউ রান্না করেন, তো কেউ করেন মশলা, কেউ বাসন মেজে ধুয়ে মুছে তাকে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখেন, কেউ কেউ কাপড় জামা চাদর লেপ বালিশের ওয়াড় পিছনের বাগানের উনুনে সাবান দিয়ে সেদ্ধ করে কেচে ধুয়ে শুকোতে দেন, কেউ বা আবার ঘর বারান্দা উঠোন সব ঝাড়ু দিয়ে মুছে সাফ করেন। মানে সন্ন্যাসিনীরা সব কাজ সারেন, একা একা বা দলে দলে।”

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Saturday, May 9, 2026

Panchpoksho - 36

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রতিপক্ষ

~~~~~~

ধৃতিকান্ত অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছিল, “তবে কী? তুই সন্ন্যাসিনীদের নিয়ে খোরাক করবি, যাকে ভালোবাসিস তাকে বিয়ে করবি না...কী ন্যাকামি এসব?” 

সুরচিতা ধাঁধার সমাধান করে দিয়েছিল, “দেখ ধৃতি, যখন কলেজে পড়তাম তখন একটা ছেলের সাথে একটা মেয়ের একটু মেশামিশি হলে যদি একজনের অন্যজনকে ভালো লাগত তাহলে সে কথা জানাজানিও হয়ে যেত। জানার পর কিছুদিন কী করি কি না করি করে অন্যজন একটা সম্পর্কে রাজিও হয়ে যেত বেশিরভাগ সময়েই। তারপরে সেসব সম্পর্ক টিঁকে গেছে বা ভেঙে গেছে, বা ভেঙে জোড়াও লেগেছে। সেরকম সময়ে যদি বলতিস, তাহলে হয়তো আমিও ধানাইপানাই করে রাজি হয়ে যেতাম। কিন্তু--” 

ধৃতিকান্ত গর্জে উঠেছিল, “আমি সেদিন বলি নি বলে--” 

সুরচিতাও বাধা দিয়েছিল, “আমি মোটেও বলছি না যে সেদিন না বলে এতোদিনে বলছিস বলে আমি রাজি নই।” 

ধৃতিকান্ত হতাশ গলায় বলেছিল, “আমি জানি, তৈরি হয়ে কোমর বেঁধে আসতে গিয়ে আমি দেরি করে ফেলেছি। আমার আগে কেউ তোকে--। ছাড়। কলেজে তুই সারাক্ষণ খিঁচিয়ে থাকতিস। কিচ্ছু পছন্দ নয় তোর। শুধু নম্বর পেতে হবে। ফার্স্টক্লাস পেতে হবে। ফার্স্টক্লাস পেয়ে কী করবি? কোথায় মাস্টার্স করবি? কোথায় পিএইচডি করবি? কিচ্ছু দিশা নেই। শুধু ছুটছে দম দেওয়া পুতুলের মতো। কাউকে বিশ্বাস করতিস না। আমি তোকে তাই বলতে পারিনি, যদি আমার বন্ধুত্বও বাতিল করিস! তারপর আমরা সবাই শহর ছেড়ে চলে গেলাম। তোকে দিয়ে কোনো ইন্‌স্টিটিউশনের ফর্ম পর্যন্ত তোলানো যায় নি। তোকে নাকি তোর বাবা-মা যেতে দেবেন না। এতোদিন পরে যখন দ্বিধার বয়স পেরিয়ে আমরা ধৈর্য ধরতে শিখেছি মনে করলাম তখন দেখি--। তোর বিয়েতেও কি বাবা-মায়ের আপত্তি?”


প্রশ্নটা না পেলে সুরচিতার জবাব দেওয়ার কিছু ছিল না। সবটাই সে বুঝেছিল। খুব শান্ত গলায় উত্তর দিয়েছিল, “তোর পুরো ভাবনার ওপর আমি শ্রদ্ধাশীল। যা করেছিস তার থেকে ভালো কিছু হয় না আমার বিবেচনায়। তোর প্রশ্নের উত্তর হলো যাকে ভালোবাসি তাকে বিয়ে করব শুনলে বাবা-মার সেরিব্রাল থ্রম্বোসিস হবে। তবে বিয়ে না করার সেটা কারণ নয়। সেটা কাল বলব। তোকে বিয়ে করলে বাবা-মার আপত্তি হয়তো হতো না। অন্তত তোকে ঠিকানা দিয়েছেন; আজ তুই আসতে পারিস মনে করে মা আজ ফোনও করল না। এসব দেখে তো তাই মনে হচ্ছে। কিন্তু তুই কী আমার বাড়িতে জানিয়েছিস যে তুই কোথায় থাকিস এখন, কী কাজ করিস আর আমার কাছে কেন আসছিস?” 

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Friday, May 8, 2026

Panchpoksho - 35

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রতিপক্ষ

~~~~~~

সুরচিতা বলেছিল, “এতো দিন পরে তোর সাথে আড্ডা, তাতে হাড্ডিগুলো জড়ো হলে আমি সহ্য করব না।” 

ধৃতিকান্ত সওয়াল করার সুযোগ পেয়েছিল, “আমাকে মিস করেছিস এতোদিন তো যোগাযোগ করিস নি কেন?” 

সুরচিতার জবাব যেন শানানো ছিল, “তুইই তো চিঠি লেখা বন্ধ করে দিয়েছিলি, চেন্নাই ছাড়ার পর।” 

ধৃতিকান্ত নাছোড়, “ই-মেল ছিল, গ্রুপ মেল ছিল...” 

সুরচিতার কারণ জোরালো, “ডিজিটাল ডিভাইড। তোর হস্টেলের ঘরে ইন্টারনেটের প্লাগ ইন ছিল; আমি মাসে একবার সাইবার কাফে গিয়ে যখন লগ ইন করতাম তখন গাদা গাদা বিজনেস মেল মুছে আঙুলে ব্যথা হয়ে যেত, সময় আর পয়সা দুই-ই নষ্ট হতো, তার থেকেও বেশি খারাপ হতো মেজাজ। তার ওপর গুঁইবাবুর নাতি সারাক্ষণ নজরদারির অছিলায় আমার স্ক্রিন পড়তো, গায়েও পড়তো। মফস্বলের গায়েপড়ামি তো আর জীবনে বুঝতে হলো না, হলে বুঝতিস প্রাইভেসির অ্যাইসি কী ত্যাইসি কাকে বলে।”


ধৃতিকান্তর ‘এমনি’ অমলেটও খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। সুরচিতা বলেছিল, “কী খাবি-–আইসক্রিম না চিলড রসগোল্লা?” 

ধৃতিকান্তর পছন্দ ছিল অন্য, বলেছিল, “গরম পান্তুয়া পেলে ভালো হতো।” 

ফ্রিজ থেকে পান্তুয়া বার করে সুরচিতা মাইক্রোওয়েভে দিয়ে তাতিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ধৃতিকান্ত পান্তুয়া রেখে বাসন মেজেছিল। আর গুম হয়ে গিয়েছিল।


ছেলেটা জামাকাপড় বদলে যখন বসার ঘরে ফিরে এসেছিল, ততক্ষণে ডিভান দখল করে বিছানা পাতা হয়ে গিয়েছিল। সুরচিতা একটা মোড়ায় বসে বই পড়ছিল। ওর সামনে হাঁটু মুড়ে বসে ধৃতিকান্ত বলেছিল, “কেটে যাওয়া দিন আর ফিরবে না। আস্ত আমি তো এসেছি, তোর অভিমান কী করে জিতি বল?” 

সুরচিতার গলা বুজে এসেছিল। বলেছিল, “তুই আমার আকৈশোরের একটা স্বপ্নকে সত্যি করে দিলি!” 

উৎসাহ পেয়ে ধৃতিকান্ত বলেছিল, “তাহলে তুই আমাকে বিয়ে করবি?” 

সুরচিতা এবার খুব স্নেহে ধৃতিকান্তর হাতের তালুতে নিজের হাত বুলিয়ে বলেছিল, “না, করব না। জানি তুই কষ্ট পাবি। কিন্তু তবু--করব না। করতে পারব না। করলে আমি কষ্ট পাব।” 

ধৃতিকান্ত বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে বলেছিল, “কষ্ট পাবি কেন? তুই কি অন্য কাউকে--” থেমে গিয়েছিল তার প্রশ্নে সুরচিতার ইতিবাচক ঘাড় নাড়া দেখে।


ধৃতিকান্ত ডিভানে ধপ করে বসে পড়তে সুরচিতা নীরবতা ভেঙেছিল, “অন্য কাউকে ভালোবাসি বলে তোকে বিয়ে করব না এমন নয়। জানি একদিন তোর মতোই সে উদয় হবে তার ভালোবাসার দাবি নিয়ে...”

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Thursday, May 7, 2026

Panchpoksho - 34

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রতিপক্ষ

~~~~~~

সুরচিতা বলেছিল, “এতো দিন পরে তোর সাথে আড্ডা, তাতে হাড্ডিগুলো জড়ো হলে আমি সহ্য করব না।” 

ধৃতিকান্ত সওয়াল করার সুযোগ পেয়েছিল, “আমাকে মিস করেছিস এতোদিন তো যোগাযোগ করিস নি কেন?” 

সুরচিতার জবাব যেন শানানো ছিল, “তুইই তো চিঠি লেখা বন্ধ করে দিয়েছিলি, চেন্নাই ছাড়ার পর।” 

ধৃতিকান্ত নাছোড়, “ই-মেল ছিল, গ্রুপ মেল ছিল...” 

সুরচিতার কারণ জোরালো, “ডিজিটাল ডিভাইড। তোর হস্টেলের ঘরে ইন্টারনেটের প্লাগ ইন ছিল; আমি মাসে একবার সাইবার কাফে গিয়ে যখন লগ ইন করতাম তখন গাদা গাদা বিজনেস মেল মুছে আঙুলে ব্যথা হয়ে যেত, সময় আর পয়সা দুই-ই নষ্ট হতো, তার থেকেও বেশি খারাপ হতো মেজাজ। তার ওপর গুঁইবাবুর নাতি সারাক্ষণ নজরদারির অছিলায় আমার স্ক্রিন পড়তো, গায়েও পড়তো। মফস্বলের গায়েপড়ামি তো আর জীবনে বুঝতে হলো না, হলে বুঝতিস প্রাইভেসির অ্যাইসি কী ত্যাইসি কাকে বলে।”


ধৃতিকান্তর ‘এমনি’ অমলেটও খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। সুরচিতা বলেছিল, “কী খাবি-–আইসক্রিম না চিলড রসগোল্লা?” 

ধৃতিকান্তর পছন্দ ছিল অন্য, বলেছিল, “গরম পান্তুয়া পেলে ভালো হতো।” 

ফ্রিজ থেকে পান্তুয়া বার করে সুরচিতা মাইক্রোওয়েভে দিয়ে তাতিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ধৃতিকান্ত পান্তুয়া রেখে বাসন মেজেছিল। আর গুম হয়ে গিয়েছিল।


ছেলেটা জামাকাপড় বদলে যখন বসার ঘরে ফিরে এসেছিল, ততক্ষণে ডিভান দখল করে বিছানা পাতা হয়ে গিয়েছিল। সুরচিতা একটা মোড়ায় বসে বই পড়ছিল। ওর সামনে হাঁটু মুড়ে বসে ধৃতিকান্ত বলেছিল, “কেটে যাওয়া দিন আর ফিরবে না। আস্ত আমি তো এসেছি, তোর অভিমান কী করে জিতি বল?” 

সুরচিতার গলা বুজে এসেছিল। বলেছিল, “তুই আমার আকৈশোরের একটা স্বপ্নকে সত্যি করে দিলি!” 

উৎসাহ পেয়ে ধৃতিকান্ত বলেছিল, “তাহলে তুই আমাকে বিয়ে করবি?” 

সুরচিতা এবার খুব স্নেহে ধৃতিকান্তর হাতের তালুতে নিজের হাত বুলিয়ে বলেছিল, “না, করব না। জানি তুই কষ্ট পাবি। কিন্তু তবু--করব না। করতে পারব না। করলে আমি কষ্ট পাব।” 

ধৃতিকান্ত বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে বলেছিল, “কষ্ট পাবি কেন? তুই কি অন্য কাউকে--” থেমে গিয়েছিল তার প্রশ্নে সুরচিতার ইতিবাচক ঘাড় নাড়া দেখে।


ধৃতিকান্ত ডিভানে ধপ করে বসে পড়তে সুরচিতা নীরবতা ভেঙেছিল, “অন্য কাউকে ভালোবাসি বলে তোকে বিয়ে করব না এমন নয়। জানি একদিন তোর মতোই সে উদয় হবে তার ভালোবাসার দাবি নিয়ে...”

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Wednesday, May 6, 2026

Panchpoksho - 33

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রতিপক্ষ

~~~~~~

সুরচিতা আবার যেন ফিরে গেল অন্য এক দৃশ্যে, “ক্রিপ্টোমেরিয়ার কালচে ভেজা গায়ে রমণীর খোঁপায় লাগান জুঁইয়ের মালার মতো ঝুলে থাকা সাদা সাদা অর্কিডের গোছা, গোধূলির পীতাভায় দিন শেষের দীর্ঘশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে থাকে অতল খাদে, যেন কার অপেক্ষায় ছিল, সে বুঝি আসে নি; আর ভোরের রক্তিমায় লজ্জারুণ হয়ে জেগে ওঠে নতুন অপেক্ষায়, অক্লান্ত চেয়ে থাকে সারাদিন পথের দিকে, যদি সে আসে, যদি সে আসে।” 

ধৃতিক্লান্ত অবাক গলায় বলল, “বাব্বা পাহাড়ে যাদু আছে দেখছি! তোর মতো ঝগড়ুটে, মুখরা মেয়েকেও কবি বানিয়ে ফেলল।” 

বাস্তব আর বর্তমানে ফিরতে ফিরতে সুরচিতা বলল, “না, কাব্য আর হলো কই--। তবে তখন এমন তারাভরা আকাশ দেখতে পেতিস না। গাছভরা রডোডেনড্রন আর গোলাপ দেখতে পেতিস না।” 

গ্লাসের গায়ে চামচ বাজিয়ে প্রিয় বন্ধুর খোঁজে অনেকগুলো বছর উজিয়ে আসা ছেলেটা গাইতে শুরু করেছিল, “মাশরুমের বদলে তারা পেলুম তাই রে নাই রে না...”


সুরচিতা আঁতকে উঠেছিল, “করছিস কী? থাম থাম। এখানে চারপাশে চিরকুমারীরা থাকেন। তোর পৌরুষের গন্ধে তাদের এমনিই ঘুমের ব্যাঘাত হয়েছে আজ রাতে; তার ওপর তুই এমন মেটিং কল দিলে ওঁদের যে নরকেও জায়গা হবে না?” 

গল্পের গন্ধে থেমে গিয়েছিল ধৃতিকান্ত। তারপর একটা অমলেট একটা প্লেটে সাজিয়ে আরেকটা বোল দিয়ে ঢেকে রেখেছিল টেবিলের একধারে। তারপর একমুখ গরম খিচুড়ি জিভে লোফালুফি করতে করতে জিজ্ঞেস করেছিল, “তুই কী সন্ন্যাস নিবি নাকি? দুবেলা মালা নিয়ে জপা প্র্যাকটিস করছিস? নাকি এরা অন্য কিছু নিয়ে জপে? কিন্তু খেতে বসে প্রেয়ার করলি কই?” 

সুরচিতা চামচ দিয়ে নেড়ে নেড়ে পাতের খিচুড়িটা ঠাণ্ডা করতে করতে জবাব দিয়েছিল, “আমি এদের মাইনে করা অঙ্কের মাস্টার। ধম্মকম্ম করলেই এরা শত্রুতা শুরু করবে। ভাববে আমিও বুঝি হেডমাস্টারনি হতে চাই, ক্ষমতার দখল নিতে চাই।” 

এই খানে ফস করে ধৃতিকান্ত বলে বসে ছিল, “এই ধ্যাধ্‌ধ্যাড়া পাহাড় চুড়োয় আবার ক্ষমতা কী রে? অগুণতি মেঘলা দিন, আর পাগলা করা মনখারাপ, এখানে ক্ষমতার লোভ তাও আবার...কেউ থাকে!” 

বাকি কথাগুলো অট্টহাসিতে ঢেকে গিয়েছিল। আবার সুরচিতা, “শ্‌শ্‌শ্‌শ্‌শ্‌...” করে উঠেছিল। তারপর বলেছিল, “যেখানে পাইয়ের সাইজ যেমন, খেয়ে হজম করার লোকের পাকস্থলীর মাপ আর স্বাস্থ্য তো তেমনই হবে। কাল খুব ভোরে উঠে শহরে যাবো আর রাত করে ফিরব। না হলে তোর মতো ডবকা ছোকরার আওয়াজ পেয়ে কুমারীরা সারা দিন ভ্যান ভ্যান করবে এখানে।” 

ধৃতিকান্ত খেই ফিরে পেয়েছিল, “তাতে তোর হিংসে হবে?” 

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Tuesday, May 5, 2026

Panchpoksho - 32

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রতিপক্ষ

~~~~~~

একটু পরে আবার বলেছিল ধৃতিকান্ত, “তের বছর আগে তুই ছিলি আমার প্রিয় বন্ধু। সেদিন আমি তোকে যেমনটা ছেড়ে রেখে গিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম তুই এখনও তাই আছিস। আমার প্রিয় বন্ধু। কিন্তু এই মুহূর্তে আমরা পরস্পরের কাছে প্রায় ভিনগ্রহী।” 

তারপরের নৈঃশব্দ দীর্ঘতর হয়েছিলো। একসময় বাস্তব বিবেচনা করে সুরচিতাকে বলতে হয়েছিলো, “বস, তুমি শহর থেকে পাঁচ মাইল দূরে, পাঁচশো ফুট উঁচুতে পাহাড়ের মাথায় বসে রোমান্টিক হতে পারো, কিন্তু তোমার পেট তো তাতে সায় দেবে না; এই গণ্ডগ্রামে তালি বাজালে ভূতের রাজার প্যান্ট্রিওয়ালাও আসবে না। আমি গেলাম খিচুড়ি, ডিম ভাজা রাঁধতে। এখন তুমি বসে অন্ধকার দেখবে, না আকাশের তারা গুণবে, নাকি খিচুড়ি ডিম ভাজার গন্ধে খিদে চাগাবে সেটা তোমার ব্যাপার।”


খিচুড়িটা হয়ে যেতে, সুরচিতা ডিম ভাজতে শুরু করেছিল। ঠিক তখনই ছুট্টে ঘরে ঢুকে পড়েছিল ধৃতিকান্ত। রান্না ঘরের দরজায় একটা টুল পেতে বসে বলেছিল, “আমাকে একটা অমলেট এমনি দিবি তো?” 

সুরচিতা হেসে ফেলেছিল, “বর্ষা কালে এলে এতে বেশ মাশরুম ঠেসে খাওয়াতে পারতাম। কিন্তু এখন পেঁয়াজ, লঙ্কা দিয়েই খেতে হবে। কাল থাকবি তো?” 

পাল্টা প্রশ্ন করেছিল ধৃতিকান্ত, “কেন, না হলে কী তোদের মুর্গিরা কাল স্ট্রাইক করবে?” 

সুরচিতা বলল, “না, কাল আমরা টৌলিং শহরে যাব এমুলুকের নুডুলের সেরা স্বাদ নিতে।” 

ধৃতিকান্ত তখন প্রায় অন্য যুগে; কলেজবেলার বাচালতায় মত্ত। বলেছিল, “না তুই বর্ষাকালের কথা কী বলছিলি? তখন এলে কী ভালো হতো? মাশরুম?” 

সুরচিতা বলল, “বটে। তার সাথে আরও অনেক কিছু।” 

ধৃতিকান্ত বলেছিল, “যেমন?” 

সুরচিতার দুচোখ যেন অনেক দূরের কিছু দেখছিল, “কোনো কোনো বাগানে জিঙ্গোবাইলোবার ডালে ঝোলা আনারসের মতো হলুদ অর্কিডের গোছা, হাসন্তমুখ ঘাস ফুল, আর ক্যালেন্ডুলার মতো অজস্র সাদা হলুদ ম্যাজেন্টা তারাফুলের গোছা।” 

ধৃতিকান্ত চোখ নাচিয়ে বলল, “এই ভ্যাপসা ভেজা এলাকাটাও সুন্দর হয়ে ওঠে বর্ষাতে? বসন্তকালে না হয় সব জায়গাতেই ফুল ফোটে। কিন্তু এখানে বর্ষাকাল সুন্দর বলছিস কী করে? সারাক্ষণ সবটা মেঘে ঢাকা থাকে না? ঘরের মেঝে থেকে জল ওঠে না বিন্দু বিন্দু!”

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Monday, May 4, 2026

Panchpoksho - 31

পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রতিপক্ষ

~~~~~~

সুরচিতা তিনপাহাড়ি আসার পর থেকেই মা ভীষণ ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন তার বিয়ে দেওয়ার জন্য। সুরচিতা মাকে বোঝাবার চেষ্টা করে নি যে বিয়েটা মা দেবেন না, দরকার পড়লে সে নিজেই করবে; বরং সোজাসুজি বলে দিয়েছে অনেকবার। ততোবার, যতোবার মা প্রসঙ্গটা তুলেছিলেন।

তারমধ্যে একটা শুক্রবার সন্ধের মুখে ধৃতিকান্ত এসে পৌঁছেছিল। এতোদিন পর এসে ছিল যে ধৃতিকান্তকে চিনতে সুরচিতার কয়েক মিনিট সময় লেগেছিল। তারপর খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতে সাল কটা গাঁটে গুনে সে বলেছিল, “তের বছর! আমি তো ধরেই নিয়ে ছিলাম যে তুই আমাকে ভুলে গেছিস।” 

ধৃতিকান্ত গোলাপ বাগান, পাথরের দেওয়াল, বাগানের কোণে রডোডেনড্রন দেখতে দেখতে বলেছিল, “ভুলে যে যাই নি তোকে সেটা প্রমাণ করে দিয়েছি বল?” 

সুরচিতা খুশিতে মাথা নাড়তে নাড়তে বলেছিল, “পয়েন্ট। তর্কের সুযোগ নেই।” 

তারপর বলেছিল, “ভিতরে চল, এখন আর এখানে বসে কিছু দেখা যাবে না।” 

ধৃতিকান্ত বলেছিল, “কেন? না হয় অন্ধকারটাই দেখব!” 

সুরচিতা বলেছিল, “তাহলে একলা বসে দেখ। আমি চা নিয়ে আসি। আরেকটা চেয়ার নিয়ে আসি।” 

ধৃতিকান্ত বসে পড়েছিল খালি চেয়ারটাতে।


একটু পরে একটা বাটিতে করে কুচো পেঁয়াজ আর চানাচুর দিয়ে মাখা চিঁড়েভাজা আর ধোঁয়াওঠা চায়ের দুটো কাপ একটা তেপায়া টুলে বয়ে নিয়ে এসেছিল সুরচিতা। তারপর আবার ভেতর থেকে আরেকটা চেয়ার নিয়ে এসে বসেছিল ধৃতিকান্তর পাশে। চুপ করে দুজনে চা আর চিঁড়েভাজা খাচ্ছিল। ধৃতিকান্তই বেশিটা খেয়েছিল। মাঝে মাঝে একটু একটু নিচ্ছিল সুরচিতা।


ধৃতিকান্তই বলেছিল, “আমরা যেন প্রৌঢ় দম্পতি। বাগানে পাশাপাশি বসে চা খাচ্ছি।” 

সুরচিতা বলেছিল, “আর অন্ধকার দেখছি, দুচোখে।” 

বলে ধৃতিকান্তর দিকে তাকিয়ে বাঁ চোখটা টিপতে গিয়ে কী যেন একটা দেখে ফেলেছিল ধৃতিকান্তর চোখে, সেই আধো অন্ধকারে।


ধৃতিকান্ত লুকোনোর চেষ্টা করেনি। চেয়ারের হাতলে আলতো রাখা সুরচিতার বাঁ হাতের তালুটা নিজের ডান হাতের মুঠোয় নিয়ে বলেছিল, “যেন এটা সত্যি হয়।” 

সুরচিতা শিউরে উঠেছিল যদিও, তবুও অকম্পিত গলায় বলেছিল, “বলিহারি তোর শখ, দু চোখে অন্ধকার দেখব বুড়ো বয়সে? কেন? চাওয়ার মতো আর কিছু ছিল না?” 

ধৃতিকান্ত কিন্তু মুঠো আলগা করে নি। জবাবে বলেছিল, “তুই ভালো করেই বুঝেছিস আমি প্রৌঢ় দম্পতি হতে চেয়েছি তোর সাথে। কিন্তু...ভুলটা আমারই। এতোদিন পরে সব আবার নতুন করে শুরু করতে হতো।” 

থেমে ছিল ধৃতিকান্ত। সুরচিতা চুপ করে শুনছিল, বলতে দিচ্ছিল ধৃতিকান্তকে।

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)


Sunday, May 3, 2026

Panchpoksho - 30

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রাক্‌পক্ষ

~~~~~~

অভির প্রথম ক্লাসের দিন সুরচিতা ওর সাথে দেখা করেছিল, ইস্কুলে ছুটি নিয়ে। দুজনে সন্ধে অবধি এখানে সেখানে আড্ডা দিয়েছিল। বাড়ি ফেরার সময় তুমুল বৃষ্টিতে ভিজে গিয়েছিল সুরচিতা। মনসাতলার মুখে এতো জল হয়েছিল যে ওর পা থেকে চটি খুলে ভেসে গিয়েছিল। তবু সেদিন কোনো দুঃখ তো দূর বিরক্তিও হয় নি। 

অসম্ভব আনন্দ হয়েছিল জীবন কানায় কানায় ভরে যাওয়ায়, অনেক দুঃস্বপ্নের পরে একটা স্বপ্নকে সত্যি হয়ে উঠতে দেখে। এতো আনন্দ যে চোখ ভরে উঠছিল উচ্ছাসে। গালে গড়িয়ে আসা অশ্রু ধুয়ে যাচ্ছিল বৃষ্টির জলে। পুরো রাস্তা খালি পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরেছিল মেয়েটা। 

কপালে, চিবুকে, দুহাতের দশ আঙুলে, কনুই জুড়ে একশ কুড়ি ডিগ্রি জ্বর ছিল তার, বৃষ্টি আরও বাড়িয়ে তুলেছিল সেই জ্বর আর তার ঘোর। অভি তাকে ছুঁয়েছিল কপালে, চিবুকে, আঙুলে, কনুইতে, স্তনসন্ধিতে, চেনা রেস্তোরাঁর অচেনা কেবিনের পর্দাঘেরা আবছায়াতে।


শীতকালে সুরচিতা শ্যামশরণের সাথে তিনপাহাড়ি এসেছিল প্রথম বার। সরকারি সাহায্যে চলা একটা মিশনারি স্কুলে চাকরিও জুটিয়ে নিয়েছিল। শ্যামশরণ ফিরে গিয়েছিল সুরচিতার শহরে; আর সুরচিতা ফিরে এসেছিল শ্যামশরণের শহরে। তারপর ক্রমশঃ মত্ত হয়েছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন নির্মাণে। 

অভির সাথে যোগাযোগ মানে মাসান্তে কটা টাকা পাঠানো আর একটা পোস্টবক্স নম্বর। কখনও যে মনপ্রাণ দুজনের কারুরই ক্ষেপে ওঠে নি দেখা করার জন্য তা নয়। কিন্তু জগতের নজর আর কৌতূহল এড়াতে দুজনেই স্বীকার করে নিয়েছিল স্বেচ্ছা বিরহ। দোল-দূর্গোৎসবে অভির শহরে ফেরাটা অনিবার্য ছিল। তাই সুরচিতা সেসব সময়ে মিশনে উৎসব উদযাপনে সামিল হওয়ার অছিলায় বাড়ি ফিরত না। কিংবা বেড়াতে চলে যেত কোনো সমুদ্রের তীরে বা জঙ্গলের গভীরে। মা-বাবা কখনও সঙ্গী হতেন, কখনও হতেন না। চার ছ বছর থেকে কিছু বেশি বছর কিংবা অনির্দিষ্টকাল, বিরহের দীর্ঘ অভ্যেসে তারা দুজনেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল।


~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)


Saturday, May 2, 2026

Panchpoksho - 29

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রাক্‌পক্ষ

~~~~~~

শীতের ছুটিতে সুরচিতা একদিন লাইব্রেরি গিয়েছিল। দেখেছিল ওখানে স্টাডিরুম খোলা হয়েছে। ব্যবহার করতে পারে যে কেউ সোম থেকে শুক্র, দুপুর থেকে রাতে লাইব্রেরি বন্ধ হওয়া অবধি। লাইব্রেরির বইয়ের দেখাশোনা করতেন রুনুদি, সেবাদি আর পুবের পাহাড় থেকে আসা শ্যামশরণদা। তাদের সাথে সুরচিতার খুব ভাব ছিল। ওঁরা সুরচিতাকে পুরো লাইব্রেরির যত্রতত্র যেতে দিতেন, বই সাজাতে গোছাতে দিতেন, ধুলো ঝাড়তে দিতেন, আর যে বইটাই তার চাই সেটা খুঁজে রাখতেন; অনেক সময়ে বইয়ের বদলে দিতেন শুধু খবর যে কবে নাগাদ কাঙ্ক্ষিত বইটা বা বইগুলো সুরচিতা হাতে পাবে। 

অতএব দিদিদের বুঝিয়ে অভির ট্রেন যাত্রার উপায়ান্তর পাওয়া গেলো। সে এসে দিদিদের সাহায্যে দুপুরের অনেক আগে থেকে স্টাডিরুমে ঢুকে পড়ত। আর বিকেলে হল্লা শুরু হলে বা তার আগেই নিজের গন্তব্যে রওনা হতো। কর্তৃদের কেউ যদি জানতে চাইতেন যে অসময়ে স্টাডিরুমের পাঠক কে, শ্যামশরণদা কিংবা দিদিরা জানাতেন যে অভি রুনুদির বোনপো; বাড়িতে পড়াশোনার অসুবিধে থাকায় ও লাইব্রেরিতে বসে পড়ে।


অভি লাইব্রেরিতে বসে পড়তে শুরু করার আগে রুনুদি বা অভি কেউ কাউকে চিনতও না। সরকারি মহকুমা লাইব্রেরিতে গ্রুপ ডি গ্রন্থাগার সেবিকার চাকরিটা পেতে রুনুদির ক্লাস এইট পাশের সার্টিফিকেট লেগেছিল একটা; আসতেনও মহকুমা শহরের বাইরে, দূরের একটা গ্রাম থেকে, বাসে করে। শাড়ি-জামাতে অনটনের ছাপটা স্পষ্ট ছিল। কিন্তু মনে কোনো কার্পণ্য ছিল না। সে-কথা বলতে গেলে বলতেন, “ওরে মেয়ে আমার কী এতে কোনো খরচা আছে? ছেলেটা তো আলোপাখাও জ্বালায় না যে ইলেকট্রিক পুড়বে সরকারের; উল্টে আমাদের সুবিধে হয়, ও যেখানে বসে সে জায়গাটার ধুলো ঝাড়তে হয় না।” 

তারপর খুব যেন রসিকতা হয়েছে এমন করে তিনমূর্তি হেসে উঠত। সুরচিতা চাকরি পেয়ে রুনুদি আর শ্যামশরণদাকে পান খাইয়েছিল; সেবাদি চা-পান খান না; তাই তাঁর জন্য ছিল টফি।


তারপর কখন যে দুটো বছর কেটে গিয়েছিল টের পাওয়া যায় নি। অভির ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের আর হোস্টেলের ফি মকুব হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু খাতা পেন পেন্সিল, অল্প হলেও ইন্সট্রুমেন্টস, দিন গেলে অসুখ-বিসুখ, জামাকাপড় বাবদ খরচ এসবের ব্যবস্থা করার জন্য মাসে মাসে ওর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা ভরার দায়িত্ব সুরচিতা নিয়েছিল। যদিও ওর বাবা-মা জানতেন ওঁদেরই খরচটা চালাতে হবে। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টও খোলা হয়েছিল ওর কলেজের ব্রাঞ্চে। তারপর ক্রমে অভি টিউশন জুটিয়ে নেবে কয়েকটা এমনটাই ঠিক হয়েছিল।

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Friday, May 1, 2026

Panchpoksho - 28

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রাক্‌পক্ষ

~~~~~~

তারপর পুলিশ অফিসার গলা তুলে হুঙ্কার দিতেই, বড়দি তার ওপরে গলা তুলে বলেছিলেন, “আমার নির্দেশ মেনেই মেয়েরা থানায় এসে এসব বজ্জাতকে জমা দেয় তাই আপনি কেরামতি দেখানোর সুযোগ পান। তা না করে যদি এগুলোকে রাস্তায় ফেলে দিত পারতেন আমার মেয়েদের ওপর দারোগাগিরি ফলাতে? আমার মেয়েদের না ছাড়লে পুরো ইস্কুল আমি এখানে বসাব। আপনাকে, আপনার নেতাকে, তার বাবাকে, তার বিরোধী নেতাকে সক্কলকে বসিয়ে ক্লাস করাবো আর বেয়াদবি দেখলেই--” 

কথাটা আর শেষ হয় নি, তার আগেই মিনমিন করে অফিসারটি বলেছিলেন, “যান, যান আপনার মেয়েদের নিয়ে যান।”


আজ এসব কথা ভাবলে সুরচিতার মনে হয় যে বড়দি না থাকলে, তাঁর একটা বিশিষ্ট পরিচিতি না থাকলে, সেদিন কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের খপ্পরে গিয়ে পড়ত থানায় আটকে পড়া মেয়েগুলো। তারপর তাদের নিত্য নিরাপত্তার অভাববোধ থেকে, বা পুলিশের অসহযোগ ও বিরোধিতায় তাদের অবুঝ অভিমানী কিশোর মনে সমাজ আর শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ নিশ্চয়ই জমা হতো। আর সেই অভিযোগ থেকে ক্ষোভ তৈরি করে, সেটা ব্যবহার করে হয়তো নিতান্ত আঞ্চলিক বা আরো বড়ো কিছু একটা রাজনৈতিক গণ্ডগোল বাধিয়ে তোলা হতো। মেয়েগুলোকেও হয়তো ব্যবস্থা অমান্য করতে আর অপরাধে অভ্যস্ত করে তোলা হতো। নিরবচ্ছিন্ন সামাজিক জীবনপ্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হতো।


সামনে থেকে আসা আঘাত ঠেকানোর জন্য হাত ওঠে নিতান্ত স্নায়বিক কারণে। তবু মানুষ সহ্য করে, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবধি, বিশেষত সামাজিক যাপনের সবটুকুই যখন দূষিত হয়ে যায় রাজনীতির জবরদখলে। এরকম একটা অবস্থায় অব্যবস্থার যাঁতাকলে কোন কাজের যে কী কী পরিণতি হতে পারে তা আঁচ করা গেলেও নিয়ন্ত্রণ করা তো যায় না। তাই হয়তো অব্যবস্থা রেখে দেওয়া হয়, তার থেকে ঘোলাজলে মাছও ধরা হয়। 

ব্যবস্থাপকদের নিশ্চয়ই মুনাফা হয় এতে। আর বার বার কৈশোর সে যাঁতাকলে বলি হয়ে যায়, কিছুটা অসংযমে, কিছুটা অনভিজ্ঞতায়, কিছুটা আবেগে, কিছুটা স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদে, কিছুটা প্রতিবর্তগত আত্মরক্ষার চেষ্টায়।

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Thursday, April 30, 2026

Panchpoksho - 27

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রাক্‌পক্ষ

~~~~~~

কিন্তু এক বিপদের মোকাবিলা করতে গিয়ে মেয়েদের অন্য বিপদ ঘনিয়ে ঊঠেছিল। প্রথম যেবার ফন্টের মতো কাউকে থানায় নিয়ে গিয়েছিল সুরচিতারা সেবার তো ওদের বলা হয়েছিল, “ছিছি, ছিছি, ছিছি! তোমরা ইস্কুলে যাও, লেখা পড়া শেখো আর এটুকু জানো না যে মারপিট করে আইন হাতে তুলে নিতে নেই?” 

কিন্তু তাতে লজ্জা পাওয়ার উপায় ছিল না সুরচিতাদের। উপদ্রব এতো বেড়েছিল, বিশেষতঃ বাড়ি থেকে ইস্কুল যাওয়ার সময় আর ইস্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময়। সময়দুটো নির্দিষ্ট হওয়ায় সেই সময়দুটোতে উপদ্রব হতো নিয়মিত। 

কখনও একমুখ কাঁচাপাকা দাড়ি নিয়ে একটা লোক রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে পড়ত প্যান্টের চেন খুলে। কখনও তার সাথে চীৎকার করে মেয়েদের শরীর নিয়ে ছড়া কাটত। কখনও শরীরের নানা অংশে খিমচে দিয়ে, খাবলে দিয়ে চলে যেত সাইকেল চেপে সাঁ করে। 

মেয়েরা একেক দিন দলে দলে ওঁত পেতে থেকে মোকাবিলা করত এসব আক্রমণের। কখনও নিয়মিত আক্রমণকারীকে দেখা মাত্র উলু দিয়ে রাস্তার সকলকে সচকিত করে দেওয়া হতো। আক্রমণ হলে “বাঁচাও” “বাঁচাও” চীৎকারে জানান দিত আক্রান্ত। আর তার আগে পিছের মেয়েরা গুলতিতে ঢিল নিয়ে তৈরি হয়ে যেত। আক্রমণকারীকে দেখা মাত্র ঢিল মেরে তার মাথা ফাটিয়ে দিত। ধরাশায়ী করা গেলে হাত-পা কিছু একটা ভেঙে দেওয়া হতো। তারপর তাকে নিয়ে যাওয়া হতো থানায়।


এরকম আরেকবার হতে যে মেয়েরা থানায় গিয়েছিল তাদেরকে দায়িত্বে থাকা পুলিশরা বলেছিল, “বাঁদর মেয়ের দল, ফের যদি এমন করবি তো তোদের জেলে ভরে দেব।” 

বলাবাহুল্য আলাদা করে ভয় পাওয়ার কিছু ছিল না সুরচিতার বা তার সতীর্থদের। তারপর একবার তো থানায় আটকেও রাখা হয় কিছু মেয়েকে। কিছু মেয়ে পালিয়ে গিয়ে ইস্কুলে খবর দিয়েছিল। কারণ সেসময়টা ইস্কুল বসার সময় ছিল। 

বড়দি নিজে থানায় এসে ডিস্ট্রিক্‌ট ম্যাজিস্ট্রেটের চিঠি দেখিয়ে বলেছিলেন, “এই অর্ডার পাওয়ার পরেও আপনারা মেয়েদের ইস্কুল যাতায়াতের পথে টহলের ব্যবস্থা নেন নি।” 

জবাবে থানার বড়োবাবু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু হতাশ, ক্লান্ত বড়দি হাত তুলে বলেছিলেন, “থাক আর বলতে হবে না; আমি জানি, আপনাদের নাকি সব মেয়েকে বাড়ির থেকে ইস্কুলে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া ছাড়াও আরও বেশি জরুরি কাজ আছে। তা আমার মেয়েরা নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য যদি একটা লোফারকে দুঘা দিয়ে ফেলে সেটা আইনভঙ্গ হলো, আর সাক্ষী সমেত দশ-বারোটা মেয়ে আপনাকে আসামী এনে দিলে আপনি মেয়েগুলোকেই জেলে ভরেন? আপনি নিশ্চয়ই মেয়ের বাবা নন। বোধ হয় মায়ের পেটেও জন্মান নি।” 

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Wednesday, April 29, 2026

Panchpoksho - 26

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রাক্‌পক্ষ

~~~~~~

ফন্টে যখন মাস্তানও হয় নি তখন ইস্কুল ফেরতা মেয়েদের টোন টিটকিরি করত, সুযোগ পেলে গায়েও হাত দিত। ওর বিশ্বাস হয় নি যে ওর বিরুদ্ধ গোষ্ঠীর লোকেরা ইস্কুলের মেয়েদের হাতেই মার খেয়ে হাড় ভেঙেছে।

একদিন ওর এলাকায় সুরচিতা অ্যাণ্ড কোম্পানি হাজির হয়েছিল। ও স্বভাব মতো টোন, টিটকিরি করে যখন বুঝে নিয়েছিল যে দুটো মেয়েই ভীতু তখন মেয়ে দুটোর কাছে গিয়েছিল রাস্তার ধারের মেয়েটার থুতনি নেড়ে বুকে ধাক্কা দিয়ে চলে যাবার মতলবে। 

কিন্তু থুতনিতে হাত দিতেই মেয়েটা ওর হাত ধরে এমন প্যাঁচ দিয়েছিল যে ও সাইকেল সুদ্ধ পড়েছিল মাটিতে। তারপর রে রে করে আরও কিছু মেয়ে ছুটে এসে মেরে ওর হাত ভেঙে দিয়েছিল, সাইকেলের দুটো চাকার রিম ভেঙে দিয়েছিল, সিট খুলে নিয়ে গিয়েছিল; সব শেষে নালার জলে মুখ গুঁজে দিয়ে নাকানি চোবানি খাইয়ে বলিয়েছিল আর কোনোদিন যদি ও কোনো মেয়েকে জ্বালিয়েছে তো মেয়েগুলো নাকি ওর এমন হাল করবে যে ও নিজের বউকে ছুঁতেও ভয় পাবে। 

তারপর ফন্টেকে ওরা নাকে খত দিতে দিতে থানায় জমা করে দিয়েছিল। সে বাবদে ফন্টের মাথায় যে ঘা-টা হয়েছিল সেটা শুকোতে বছর ঘুরে গিয়েছিল। এখন ওর ভাগনেটা সেই ঘায়ের গর্তে হাতের আঙুল ঢুকিয়ে আঙুলটা পাকাতে পাকাতে জিজ্ঞেস করে, “তোমার পিস্তলের গুলি কি এখানেই লাগাবো?” 

শুনলেই ফন্টের পায়খানা পেয়ে যায়। যাই হোক ফন্টে আর আসে নি অভির কাছে কখনও।


কিন্তু সেই জখম তৈরি হওয়ার পরেই ফন্টে ক্রমশঃ এলাকার ত্রাস হয়ে ওঠে। কারণ সেদিন ফন্টের নামে থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ নেওয়া হয় নি। শুধু ফন্টের বেলাই এমন হয়েছিল তাতো নয় তার আগে বা পরেও যাদেরকে সুরচিতারা থানায় নিয়ে গিয়েছিল তাদের কারুর বিরুদ্ধে কখনও অভিযোগ নেওয়া হয় নি। 

ফন্টেরা ক্রমে জেনে গিয়েছিল যে তারা অবধ্য। তাদেরকে থানায় দাখিল করা হলেও তাদের কোনো ক্ষতি নেই। বরং যতো বেশিবার যেতে পারবে ততো লাভ, কোনো না কোনো ভাবে তাদের পুরস্কৃত করা হবে, ক্ষতিপূরণে। ফলে ফন্টেরা ক্রমশঃ খুচরো অন্যায় থেকে বড়ো অপরাধে হাত পাকাতে থাকে নির্ভয়ে। হয়তো সেই মেয়ের দলকে নিয়ে ব্যক্তিগত অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল কারুর কারুর মনে। কিন্তু তাদের অধিকাংশেরই স্বভাব বদলায় নি, তারা শুধু মেয়েদের আক্রমণের এলাকা বদলে ছিল।

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)


Readers Loved