পাঁচপক্ষ
~~~~~~
প্রথমপক্ষ
~~~~~~
এখানে সন্ধে নামে ক্রমে। প্রথমে ঘাসে, তারপর উপাসনা কেন্দ্রের ছাদে, সব শেষে ক্রিপ্টোমেরিয়ার চূড়ায়। স্তরে স্তরে অন্ধকার জমা হয় তলা থেকে ওপরে। জলের মতো। নিজের কোয়ার্টাস্-এর বাগানে দুসারি মাছি গোলাপের মধ্যে বসে একটু একটু করে এভাবে অন্ধকারে ডুবে যেতে ভালো লাগে সুরচিতার। এসময় কিচ্ছুটি না করে গুটিসুটি প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে থাকতে ভালো লাগে তার।তারপর তারারা আকাশে জাগে একে একে। কিংবা জাগে না। আকাশ মেঘের চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে থাকে। তারা শুদ্ধু আকাশটা জাগলে ঝাঁপ দেয় সামনের খাদে। নানা রঙের তারার আলোয় সন্ধেটা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। মনে হয় ওরা সবাই হাসছে, খেলছে। আর আকাশ ঘুমোলে খাদের কোলের উপত্যকাও কুয়াশার কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। সেখানে প্রাণ আছে কিনা বোঝার জো থাকে না। এই অনিশ্চিত মেঘ-কুয়াশার খেলায় কিন্তু নিশ্চিত ঘটনা হলো সুরচিতার মায়ের ফোন। সেটা রোজই আসে, সন্ধে নামার পরে।
আজও এলো। মা জানতে চাইলেন, “আজ রান্না করলি না আছে?”
আছে কি নেই জানে না সুরচিতা। কিন্তু বলল, “কালকের ভাত আছে। আজ ডাল করব আর মাছ ভাজব।”
এরপর প্রত্যাশিত দুখি দুখি সুরে মা বলবেন, “কেন, একটা ঢেঁড়সের ছেঁচকি কেন করলি না?”
সুরচিতা বলবে, “ক্লাস টেস্টের খাতাগুলো দেখতে হবে মা। এতো হাঙ্গাম করে রান্না করার সময় কই?”
মা দুঃখ করবেন, “তোদের ইস্কুলে তো আবার দিদিমণিরও কাজের লোক রাখার নিয়ম নেই। কী দরকার অমন চাকরিতে? অন্য আর ইস্কুল নেই দুনিয়াতে? তারপর আছে যতো বাউণ্ডুলে মেয়েমানুষের মাথায় অঙ্ক ঢোকাবার পাগলামি--”
এইখানে সুরচিতা মাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, “এখন রাখছি।”
তারপর পায়ে পায়ে ঘরে ঢুকে পড়ে। চালে-ডালে খিচুড়ি চাপিয়ে দেয় বা খাবার কী আছে কী নেই দেখে যা খুশি তাই রেঁধে নেয়। তারপর ক্লাসটেস্টের বা যে কোনো খাতা নিয়ে বসে যায় দেখতে বা কোনো বই পড়তে।
সুরচিতা একটা মিশনারি ইস্কুলে অঙ্ক শেখায়। মিশনের অনুশাসন অনুযায়ী তাকে মিশনের দেওয়া কোয়ার্টাস্-এ থাকতে হয় এবং গেরস্থালির কাজ নিজে হাতেই করতে হয়। মিশনের আশ্রিতা বা সন্ন্যাসিনী হলে অবশ্য আশ্রমের আবাসনে থাকতে হতো। বদলে মাস-মাইনের পুরোটা মিশনকে দান করে দিতে হতো। মিশনই অথর্বকালের আর পরকালের দায়িত্ব নিত। এখন শুধু ঘরভাড়াটুকু দিতে হয়, আর স্ব-সহায়তার নজির হতে হয় ছাত্রদের এবং সমাজের সামনে।
Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml
(চলবে)
