পাঁচপক্ষ
~~~~~~
আত্মপক্ষ
~~~~~~
কতো ছবি যে তুলল তার ঠিক নেই। সুরচিতা বুঝিয়ে পারে না ফেরা পর্যন্ত ইলেক্ট্রিসিটির সাথে মোলাকাত হবে না। অতএব যখন তখন ছবি আর ভিডিও তুলে ব্যাটারি খরচ করা চলবে না। দু-এক জায়গায় ওরা দাঁড়িয়ে চা, কোলড্রিঙ্ক খেল। এটা সেটা কিনল। দুপুরের আগে হিংরু নামে গ্রামটায় পৌঁছতে পারলে ভালো হয়। কিন্তু অভিকে সে কথা বোঝায় কে।
ঘুরেফিরে সেই প্রশ্ন এলো, “তুমি মিশন ছেড়ে গেলে প্রজেক্টের কী হবে?”
সুরচিতা অভিকে বলল, “আমি মিশন ছেড়ে যাব কেন?”
অভি দম নিতে নিতে বলল, “আমরা কী কখনও একসাথে থাকব না?”
সুরচিতা বলল, “না”।
অভি থমকে গেল। কিন্তু সুরচিতা তখন অনেকটা এগিয়ে গেছে। রংপুকুর দেখে অবশ্য কথারা আবার পুকুর, খাদ, পাহাড় আর উপত্যকায় ফিরে গেল। আন্তর্জাতিক সীমা এড়িয়ে সরকারি নার্সারির মধ্যে দিয়ে কখনও জঙ্গলের বুনো গন্ধের মধ্যে দিয়ে, কখনও ন্যাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে চলা মেঠো রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে দেখা হতে লাগল নানা অভিযাত্রীদলের সাথে।
অসংখ্য চূড়াওয়ালা বেঁটে মন্দির হাঁটু মুড়ে বসে যেন প্রার্থনা করছে নৈঃশব্দ আর নির্জনতা। সেই মন্দিরগুলোকে ঘিরে রেখেছে জাগরুক পাহারাদারের মতো মন্ত্রমাখা পতাকার ঝাঁক। কোথাও সে পতাকার রং উজ্জ্বল নীল হলুদ, কোথাও ঘোলাটে সাদা। তারপর মেঘেরা যখন কুয়াশার মতো ঘিরে ধরতে লাগল, জ্যাকেটের গায়ে বিন্দু বিন্দু জমে ওঠা জলের কণা মুহূর্ত পরেই সপসপে করে গেল জ্যাকেট তখন বোঝা গেল হিংরু এসে গেছে।
এই সময় হঠাৎ মেঘ সব জল হয়ে ঝরে গেল বা জোরালো হাওয়ায় উড়ে গেল। রাস্তার ধার বরাবর খাড়া নেমে যাওয়া উপত্যকায় ফুলন্ত রডোডেনড্রন বন যেন সবে স্নান সেরে দাঁড়িয়েছে রোদে। তার গা থেকে ঝরে পড়া জলে, গায়ে লেগে থাকা জলে ঠিকরে পড়া রোদ পুরো উপত্যকাকে রূপসী করে তুলেছে।
তাদের ফুলপাতার ঠাসাঠাসি বুনোট দেখে মনে হয় যেন কেউ ধানগমের মতো রডোডেনড্রন চাষ করেছে উপত্যকাময়। মুগ্ধতা কাটিয়ে জ্যাকেটের গভীর থেকে ক্যামেরা বার করে ছবি তোলার প্রস্তুতি নিতে নিতে উপত্যকার আধখানা ঢেকে গেল নিচে থেকে হু হু করে ছুটে আসা মেঘের লেপের নিচে। ক্যামেরার লেন্স বন্ধ করা মাত্র হয়ে গেল আরেক প্রস্থ ধারাস্নান।
অবশেষে হিংরুতে ভাত ডাল বাঁধাকপি দিয়ে লাঞ্চ। তারপর তিন প্রস্থ কম্বলের নিচে ডরমিটরিতে। সুরচিতা পিট্ঠু থেকে পত্রিকা বের করে পড়তে লাগল। দিনের আলো থাকতে ঘুমোতে পারবে না সে। আর করতে লাগল পায়ের পাতার ব্যায়াম। অভি ঘুমিয়ে পড়ল কিছুক্ষণের মধ্যেই।
~~~~~~
Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml
(চলবে)
