Saturday, September 14, 2024

JPDA - Chapter 39

 ৩৯. ঘড়ি



আধ ঘন্টা পরে মিন হুয়ে ফিরিয়ে দিলো শিন ছির ল্যাপটপ, “এটা ঠিক হয়ে গেছে।”

“ড্রপবক্স?” শিন ছি খুললো উইন্ডোটা। মিন হুয়ের কম্পিউটারটা ওর হাতে দিয়ে বললো, “শিয়া লা।”

ও বসে ছিলো মিন হুয়ের পাশে। ওর গায়ে হালকা লেবুর গন্ধ তখনো লেপ্টে আছে। মিন হুয়ের মনে হতে লাগলো যে ও যেনো একটা ফলের বনে হেঁটে বেড়াচ্ছে ঘোরের মধ্যে। যাই হোক, মিন হুয়ের সাথে কথা বলার কোনো ইচ্ছে শিন ছি দেখালো না। ও টাইপ করতে লাগলো যেনো ওর আঙুলগুলো উড়ে যাচ্ছে। মন দিয়ে উত্তর দিয়ে যাচ্ছে ইমেলগুলোর।

বেশ খানিক ক্ষণ পরে, ও ঘুরে তাকিয়ে এক ঝলক দেখলো মিন হুয়েকে। মিন হুয়ে যেনো চুপ করে বসে আছে হতবুদ্ধি হয়ে। মিন হুয়ের হাতে নিজের ফোনটা দিয়ে বললো, “এটা ঠিক করে দিতে পারবি?”

“আমি চেষ্টা করতে পারি।”

“পাওয়ার অন পাসওয়ার্ডটা 0627।”

শিন ছি বললো কোনো বিশেষ গুরুত্ব না দিয়েই। মিন হুয়ের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেলো, হিম বয়ে গেলো যেনো ওর শিরদাঁড়া দিয়ে। 

মিন হুয়ে কল্পনা করলো যে শিন ছির আঙুলের ডগায় সংখ্যা চারটে ঘুরেছে অসংখ্যবার আর একই সঙ্গে ওর মনের চোখে ঝলসে উঠলো সু তিয়াঁর পিঠের দিক থেকে ধরা ওর লাইফবয়টা জলে ফেলে দিয়ে মুশুই নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ার দৃশ্যটা।

যে দুটো ক্যামেরায় সু তিয়াঁ ধরা পড়েছে, সেগুলো ওর থেকে অনেক দূরে ছিলো, কিছুতেই ওর মুখটা দেখা যাচ্ছিলো না পরিষ্কারভাবে। শুধু পরিষ্কার দেখা গেছে ওর পিঠটা।

শিন ছি নিশ্চয়ই অনেকবার ধরে দৃশ্যটা ঘুরে ফিরে দেখেছে মিন হুয়ের মতোই, সূত্র খোঁজার চেষ্টা করেছে। যেদিন সু তিয়াঁ হারিয়ে যায় সেদিন ছিলো জুন মাসের সাতাশ তারিখ। বোঝা যাচ্ছে যে শিন ছির কোনো ইচ্ছেই নেই মিন হুয়েকে ক্ষমা করে দেবার সারা জীবনে কখনো, কোনো দিনও। নিঃশব্দে মিন হুয়ে একবার তাকালো শিন ছির দিকে। নিশ্চয়ই মিন হুয়ে খুব বেশি ভাবছে। এই সংখ্যাগুলোর উচ্চারণ হয়তো একটা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত ঘটানা।

শিন ছি মন দিয়ে ছিলো কাজের ইমেলগুলোর উত্তর দেওয়াতে। ঝটপট টাইপ করে চলেছে, আর কখনোই কিছু মুছছে না। ওর আই-ফোনটা রুপোলি ধূসর, হালের মডেল, কোনো আবরণ নেই আঘাত থেকে রক্ষা করার, কোনো পাতলা পর্দাও নেই স্ক্রিনের ওপরে, খুব সরু আর সামান্য ভারি। আর শিন ছির গায়ের উষ্ণতা তখনো লেগে আছে ফোনটার গায়ে। মিন হুয়ে ফোনের পর্দাটা ছুঁল নিজের আঙুল দিয়ে। পর্দায় দুটো ফাটল। হয়েছে যখন শিন ছি ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ছিলো। হালকা টোকা দিলো মিন হুয়ে, একটা নীল পর্দা জেগে উঠলো। একটা ইউএসবি এঁটে দিলো ফোনে, আইটিউন মোডে রিস্টার্ট হলো ফোনটা, স্ক্রিনের আলো জ্বলে উঠলো, আর স্বাভাবিক পেজগুলো এসে গেলো।

“এটা এখন ব্যবহার করা যাবে।” মিন হুয়ে ফোনটা ফেরত দিয়ে দিলো শিন ছিকে। ফোনটা নিয়ে ও সেটা ছুঁড়ে দিলো কম্পিউটারের পাশে। 

“এবার সময়।”

“বারোটা তো বেজে গেছে।” শুধরে নিলো মিন হুয়ে, “তোর ঘড়িতে কী উত্তর আমেরিকার সময় দেয়?”

শিন ছি আবার একঝলক দেখলো মিন হুয়ের দিকে, বললো, “হওয়া উচিৎ বেজিং-এর সময়, কিন্তু মনে হচ্ছে যে ঘড়িটাও ভেঙে গেছে।”

“একটা যান্ত্রিক ঘড়ি কী ভাঙতে পারে?”

শিন ছির পরনে যা যা আছে, তার কোনোটাই সস্তা নয়। ঘড়িটাও কোনো ব্যতিক্রম নয়।

“আমি ওটা কয়েকবার ফেলেছি মেঝেতে।”

ও ঘড়িটা খুলে ফেললো, গুঁজে দিলো মিন হুয়ের হাতে, “রাখ।”

সু ছন হাত ঘড়ি কিংবা বড়ো ঘড়ি সবই খুব পছন্দ করে। মিন হুয়ে ভাবলো শিন ছি ঘড়িটাকে আর চায় না, তাই বোধ হয় সু ছনকে দিয়ে দিলো খেলার জন্য।

মিন হুয়ে ধন্যবাদ জানাতে যাচ্ছে এমন সময়, অপ্রত্যাশিতভাবে শিন ছি বলে উঠলো, “সারিয়ে দে।”

মিন হুয়ে অনেক ক্ষণ চুপ করে আছে দেখে, আবার বললো, “যেহেতু তুই কম্পিউটার আর মোবাইল ফোন সারাতে পারিস, তুই নিশ্চয়ই হাতঘড়িও সারাতে পারবি, তাই না? তোর বাড়িতে সবাই, তোর বাপ-ঠাকুর্দা, ওঁরা কারিগর ছিলেন। তার মানে তোর নিশ্চয়ই জোরদার হাতে-কলমে কাজ করার দক্ষতা আছে।”

 “এর আগে আমি সারিয়েছি … কয়েকজন সহপাঠীর হাতঘড়ি।”

ঘড়িটা সাদামাটা, রুপোলি ডায়াল আর কালো চামড়ার স্ট্র্যাপ। ভেতরে চারটে ছোটো ডায়াল আছে। এমন একটা ব্র্যান্ডের ঘড়ি যার নাম মিন হুয়ে কখনো শোনে নি। একটা পয়েন্টার যেটা দিয়ে তারিখ, সপ্তাহের বার এসবের কোনো একটা মাপা যায় সেটা থেমে গেছে। মিন হুয়ে খুব জোর দিয়ে ঘড়িটার খোলসটায় চাপড় লাগাতে লাগলো, “মনে হয় এটা আটকে গেছে কোথাও। আমার কাছে স্ক্রুড্রাইভার নেই। এটা আমি বাড়িতে নিয়ে গেলে তবে সারাতে পারব।”

“আস্তে আস্তে সারা। কোনো তাড়া নেই।”

“এই ঘড়িটা … এটা খুব দামী তো।”

“এটা দামী নয়।”

“আমি যদি এটা ঠিক করে সারাতে না পারি তাহলে তুই … রেগে যাবি না?”

“আমি চাই তুই এটা সারিয়ে দে।”

“...”

“যদি তুই এটা সারাতে না পারিস, তাহলে ক্ষতিপূরণ করতে তুই ঠিক একই রকমের একটা ঘড়ি আমাকে কিনে দিবি।”

“শিন ছি, তুই অযৌক্তিক কথা বলছিস।” অনুযোগের সুরে বললো মিন হুয়ে, “আমি তো ঘড়িটা ভাঙি নি।”

“এই ঘড়িটা আমি একদিন বাথরুমে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ছিলাম। কারণ সেদিন আমি জানতে পেরে ছিলাম যে আমার একটা ছেলে আছে।”

মিন হুয়ে চমকে উঠলো, উদ্বিগ্ন স্বরে জানতে চাইলো, “শিন ছি, তোর কী কোষ্ঠকাঠিন্য চলছে?”

শিন ছির মুখটা সবুজ হয়ে গেলো যেনো, “আমি তোকে একটা ঘড়ি সারাতে বলেছি, তুই এতো ভাট বকছিস কেনো?”

বলেই ও আবার টাইপ করতে শুরু করলো।


মিন হুয়ে নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইলো খানিক ক্ষণ। হঠাৎ ওর কী যেনো মনে পড়ে গেলো, নরম স্বরে বললো, “যা হোক, আমার কাছে সু তিয়াঁর জীবনের নানা সময়ের কিছু ছবি আছে। আমি ওর সার্ক্ল অফ ফ্রেন্ডস-দের থেকে ওগুলো জোগাড় করেছি। তুই কী দেখতে চাস?”

হঠাৎ কি-বোর্ডের শব্দ থেমে গেলো। শিন ছি একটা চেয়ার নিয়ে তৎক্ষণাৎ এগিয়ে এলো, “সু তিয়াঁর নানান বয়সের ছবি? আমি তো দেখি নি কিছুই। কোথায় সেগুলো? আমাকে দেখতে দে।”

মোমেন্টস-এর পনেরটা ছবিতে কেবল মাত্র পাঁচটায় সু তিয়াঁর হেডশট আছে। আর দুটো ছবি আছে আপাদমস্তক মানুষটার। তিনটে সেলফিও আছে। সব হাই-ডেফিনিসন।

মিন হুয়ে ছবিগুলো শিন ছিকে পাঠাতে চেয়ে ছিলো সেদিনই, চার বছর আগে যেদিন ওদের সম্পর্ক ভেঙে যায়। কিন্তু শিন ছি ব্লক করে দিয়ে ছিলো মিন হুয়েকে। মিন হুয়ে তাই কোনো দিনই ছবিগুলো পাঠাতে পারে নি। মনে করে ছিলো যে দেঁ চেনের তদন্ত করার যেমন প্রতিভা, তাতে শিন ছি নিশ্চয়ই ছবিগুলো পেয়ে যাবে। ও মোটেই আশা করে নি যে শিন ছি ঐ ছবিগুলো দেখতে পাবে না।

মিন হুয়ে সব কটা ছবি তখনই শিন ছির মোবাইল ফোনে পাঠিয়ে দিলো। শিন ছিও ফোনটা মুঠোয় ধরে দেখতে লাগলো আগ্রহ নিয়ে।

“হারিয়ে যাবার আগে সু তিয়াঁ কাজ করতো ল্যান জিন গতে। তুই ওখানে গেছিস কখনো?” জানতে চাইলো সু তিয়াঁ।

“গিয়ে ছিলাম। তিন বছর আগে একটা গ্রীষ্মে।” বললো শিন ছি, “দেঁ চেন নিয়ে গিয়ে ছিলো আমাকে। দুঃখের কথা হলো যে ওখানে যাবার কাজটা করতে বড্ডো দেরি করে ফেলে ছিলাম, কাজটা আমার আরো আগে করা উচিৎ ছিলো, ল্যান জিন গ ভেঙে দেওয়া হয়ে ছিলো।”

“ভেঙ্গে দেওয়া হয়ে ছিলো?”

“ওটা একটা গুয়ান্দং হুয়া রেস্টুরেন্ট হয়ে গেছে তখন। ল্বব্যানিয়াঁ এক ব্রাজিলের বাসিন্দা অনাবাসী চিনে লোককে বিয়ে করে দক্ষিণ আমেরিকায় চলে গেছে বরাবরের মতো। গুয়াংঝুয়ের মানুষজন খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব চিনের ঐ সমস্ত এলাকায় বাইরে থেকে কাজ করতে আসা মেয়েদের কোনো রকমের কোনো ফর্দ রাখার ব্যবস্থা নেই যে সেই ফর্দ থেকে কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে। পরিবার খুঁজে বার করার ওয়েবসাইটের শও ওয়ানকে আমি জিজ্ঞেস করেছি, ও বলেছে সু তিয়াঁ ওখানেই ছিলো। প্রাইভেট মেসেজ, ফোন কল এসব থেকে তাই দাঁড়ায়। আমার নিজের উইচ্যাট নেই। আমি জানি যে সার্ক্ল অফ ফ্রেন্ডস ব্যাপারটা গত দু বছরে হয়েছে …”

একটা ব্যাপার নিশ্চিত যে সু তিয়াঁর কথা বলার সময়ে শিন ছি অনেক কথা বলে। সেটা খুব চটপট বুঝে গেলো মিন হুয়ে। যদিও মিন হুয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছে বলেই মনে হচ্ছিলো, তবুও হঠাৎ করে কথা বলার উৎসাহ হারিয়ে ফেললো শিন ছি, দুম করে থেমে গেলো কথা শেষ হবার আগেই। মাথা নিচু করে ছবিগুলো দেখতো লাগলো মন দিয়ে।



খুব আস্তে আস্তে দেখছিলো। পনেরটা ছবি দেখতে সময় নিলো তিরিশ মিনিট। যখনই সু তিয়াঁর ছবি এলো তখনই ও জুম ইন আর জুম আউট করে করে দেখলো বার বার।

“ছবির সাথে আগেকার সু তিয়াঁর কোনো ফারাক আছে?” জানতে চাইলো মিন হুয়ে।

“কি করে জানবো আমি?” বাঁকা হাসি নিয়ে বললো শিন ছি, “তখন আমি চোখে ভালো দেখতে পেতাম না, আমি তো কোনো দিন স্পষ্ট করে ওর মুখ দেখতেই পাই নি। অনেক সময় মাথার পিছনের সাথে সামনে মুখের দিকের তফাতই করতে পারতাম না।”

“ও ভীষণ প্রাণবন্ত আর অনেক কথা বলে।”

“আসলে ও ছিলো খুবই অন্তর্মুখী। বেশি কথা বলতো না। যেহেতু আমি চোখে দেখতে পেতাম না ভালো, ও আমাকে অন্ধ মানুষ মনে করতো, আমাকে অভ্যস্ত করে তুলে ছিলো ওর নিজের গলার স্বরে আমার জন্য সব কিছুর বিবরণ দিতে দিতে। তার জেরে ও ক্রমশ এমন একটা মেয়ে হয়ে গেছিলো যে অনেক কথা বলে।”

“তোর স্বভাব নিয়ে ও প্রচুর অনুযোগ করেছে ওর ডায়েরিতে।”

“তার কারণ ওর নিজের স্বভাবটা খুব ভালো ছিলো।” হালকা সুরে বললো শিন ছি, “যদি কারুর স্বভাবটা খুব ভালো হয়, তবে চারপাশের হাঙরেরা সেটার গন্ধ টের পেয়ে যায় চট করে আর চলে আসে তার সুযোগ নিতে।”

“তাহলে, তুই তাদের মধ্যে একজন।”

“আমি একটা কুকুর, ওকে সারাক্ষণ পাহারা দিতাম। কেউ ওর ভালোমানুষীর সুযোগ নেবার সামান্য চেষ্টা করলেই আমি দৌড়ে গিয়ে তাদের কামড়ে দিতাম।”

মিন হুয়ের দুঃখ ঘনিয়ে উঠলো, “তুই ঠিকই বলেছিস, আমি সব চুরি করে নিয়েছি, সব ধ্বংস করে দিয়েছি।”

শিন ছি শ্বাস ফেলে বললো, “আমিও চুরি করেছি, এটা একটা ষড়যন্ত্র।”

মিন হুয়ে অবাক হয়ে গেলো।

“অনেক দিন পর্যন্ত আমি জানতাম না যে ব্রাউনরা, যাঁরা আমাকে দত্তক নিয়ে ছিলেন, তাঁরা আসলে একটা মেয়েকে দত্তক নিতে চেয়ে ছিলেন। কারণ ওঁদের তখনই এক দত্তক পুত্র ছিলো, যাঁকে ওঁরা চোঙ্গুয়ো থেকেই নিয়ে গিয়ে ছিলেন, সে আমার ভাই এরিক। চোঙ্গুয়ো সরকারের দত্তক নেবার পদ্ধতি খুবই কড়া। ওঁরা পুরো এক বছর অপেক্ষা করে ছিলেন সু তিয়াঁর সাথে দেখা করার জন্য। সু তিয়াঁর জন্যই অনাথাশ্রম থেকে সুপারিশ করা হয়ে ছিলো। অপ্রত্যাশিতভাবে যখন ওঁরা সু তিয়াঁর সাথে দেখা করেন, তখন সু তিয়াঁ মত বদলে ফেলে, আর বলে যে একটা ছেলে আছে যাকে কেউ দত্তক নিলে বেশি ভালো হয়। ওমেগুওয়াযেতে চায় না কারণ ওকে চুরি করে আনা হয়েছে সেই জন্য ও অনাথাশ্রমে থেকে ওর মায়ের জন্য অপেক্ষা করতে চায়। ব্রাউনরাও মত বদলে ফেলে।”

“বিদেশীরা চোঙ্গুয়ো আরতং দত্তক নেবে, নিজেদের পছন্দ মতো নিতে পারে না?”

“অনেক সময় লাগে, লাইনে অপেক্ষা করতে হয় অনেক দিন একটা স্বাস্থ্যবান বাচ্চাকে দত্তক নেবার জন্য। কিন্তু ব্যাপারটা অনেক তাড়াতাড়ি মিটে যায় যদি দত্তক নেওয়া বাচ্চা প্রতিবন্ধী হয় আবার তার ওপরে তার হৃদরোগ থাকে। অনাথাশ্রমের শিক্ষকেরা সবাই বলতেন যে আমি ভাগ্যবান আমার শরীরের বেহাল অবস্থাটার হাল ফেরানোর জন্যমেগুওয়াউপযুক্ত জায়গা, আর ব্রাউন পরিবারও অবস্থাপন্ন। ওঁরা নিশ্চিতভাবে আমার চোখটা সারিয়ে তুলবেন। আমার জন্য চোখে দৃষ্টি ভালো হওয়াটা একটা নিশ্চিত ভালো ব্যাপার। কিন্তু আমি সু তিয়াঁর থেকে আলাদা হয়ে যেতে চাই নি। এটা নিয়ে আমাদের ভীষণ ঝগড়া হয়ে ছিলো। সু তিয়াঁ বার বার আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করে ছিলো যে এই বিচ্ছেদ তো সাময়িক। হ্যাঁ, ও আমার জন্য অপেক্ষা করবে, বড়ো হয়ে আমার চোঙ্গুয়োতে ফিরে এসে ওকে খুঁজে বার করা পর্যন্ত। ওর ভয় ছিলো যে আমার মন খারাপ হবে, তাই যাবার দিন ও আমার সঙ্গে দেখা করতেও চায় নি …”

“তাই তুই ঐ চিঠিটা লিখে ছিলি।”

শিন ছি ঘাড় নাড়লো, ওর চোখ দুটো হালকা লাল হয়ে উঠেছে, “দশ বছরেরও বেশি, আমি দিন রাত ভেবে চলেছি, যে মানুষটামেগুওয়াগেলো সে যদি সু তিয়াঁ হোতো, তাহলে নিশ্চিতভাবে ও-ও আমার মতো একটা আরামের জীবন পেতো, যেমন আমি পেয়েছি, ভালো শিক্ষা পেতো, পয়সা রোজগার করার জন্য খুব কষ্টকর শারীরিক পরিশ্রম করতে হতো না, তার জায়গায় আমার নিজেকে দেখতে আমার একদম ভালো লাগে না। ও আমাকে একটা বহুমূল্য সুযোগ দিয়ে ছিলো আজকে আমি যা হয়ে উঠেছি তা হয়ে ওঠার জন্য। যখন আমি ওর প্রতিদান শোধার অবস্থায় এলাম, তখন ও আর নেই …”

“আমার তা মনে হয় না।”

“হুহ্‌?”

“তোর জন্য তোর চোখের সেরে ওঠাটা জরুরি ছিলো। ওর জন্য জরুরি ছিলো ওর মায়ের সাথে ওর দেখা হওয়াটা। তুই মেইগুয়োতে সুখে ছিলিস। ও-ও সুখী হয়ে ছিলো যখন ওর সাথে ওর মায়ের দেখা হয়ে ছিলো। ও মায়ের সঙ্গে ছিলো, মায়ের দেখা শোনা করেছে ও যতো দিন না ওর মা মারা গেছেন, ওর মনে কোনো অনুতাপ ছিলো না। তোরা প্রত্যেকেই যার যার প্রাপ্য পেয়েছিস, কারুর কাছেই কারুর কোনো পাওনা বাকি নেই।”

“কারুর কাছেই কারুর কোনো পাওনা বাকি নেই?” শিন ছি মাথা তুলে বিদ্রুপ করলো, “এমনটাই মনে করিস তুই? মিন হুয়ে, কেনো তুই মরতে গিয়ে ছিলি শুরুতে?”

“...”

“চেং ছিরাং-এর কারণে, তাই তো?”

মিন হুয়ে গালের পেশি শক্ত হয়ে উঠলো হঠাৎ করে, ওর চোয়ালে ব্যাথা করতে লাগলো, “হ্যাঁ, চেং ছিরাং-এর জন্য।”

“তাহলে আবার তুই ওর কোলে বসতে গেলি কেনো এখন?”



“তুই যা ভাবছিস, ব্যাপারটা তা নয়।”

“আমি তোর কথা ভাববো, এতো উৎসাহ আমার নেই।”

ওর রাগ আবার চড়ে গেলো, “তুই সু তিয়াঁর যোগ্য নস! দেখ তাকিয়ে, তোর জীবন বাঁচিয়ে ও কী পেলো! তুই তো ফের চেং ছিরাং-এর শরীরই আঁকড়ে ধরলি আবার, সু তিয়াঁর মরে যাবার কোনো মানে রইলো না।”

“আমি এই নিয়ে কাউকে কখনো কিছু বলি নি, কিন্তু তুই লোকটাকে চিনলি কী করে?” মিন হুয়ে প্রতি প্রশ্ন করলো, “ওরকম একটা লোকের সাথে কখনো ব্যবসা করিস না, লোকটা ভালো নয়! লোকটার মিথ্যাচারের কোনো সীমা নেই!”

“লোকটার মিথ্যাচারের কোনো সীমা নেই? উম্‌, তুই কী তোর নিজের কথা বলছিস?”

“আমি …”

শিন ছি আবারও মিন হুয়েকে উপেক্ষা করলো, ফোন বন্ধ করে দিয়ে, ইমেলের উত্তর দিয়ে চললো। 

“শিন ছি, তোর সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।” বেহায়ার মতো বললো মিন হুয়ে, “আমি আর আমার টিম একটা প্রোডাক্ট তৈরি করছি, যেটা আসছে মাসে প্রথামাফিক বাজারে আসবে। বেশ কিছু কাজ এখনো বাকি আছে। আমাকে আগামী পনেরো দিন ওভারটাইম কাজ করতে হবে। তুই কী আমাকে সাহায্য করবি? সু ছনের খেয়াল রাখার ব্যাপারে?”

এটা একটা কাজ যেটা মিন হুয়ে কিছুতেই চব্বিশ ঘন্টার জন্য ফেলে রাখতে পারে না। প্রথম যে মানুষটার কথা ওর মনে হয়ে ছিলো সে হলো ঝৌ রু জি, যাই হোক ঝৌ রু জির সাথেই সব থেকে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ওর। কিন্তু হাসপাতালেই ঝৌ রু জির অগুণতি সার্জারি আছে, তার ওপর বাড়ি ফিরে ওকে ওর বউয়ের দেখাশোনা করতে হবে।

ও চেন জিয়া জুনের কথাও ভেবে ছিলো। খুব কঠিন হতো না চেন জিয়া জুনকে আধখানা মাস কাজের থেকে ছুটি নিতে বলতে, আর চেন জিয়া জুনও অনিচ্ছুক হতো না। কিন্তু চেন জিয়া জুনের কোনো অভিজ্ঞতা নেই বাচ্চাদের খেয়াল রাখার ব্যাপারে, তার ওপরে বাবা-মা হবার ব্যাপারে ও কিছুই জানে না, তার ওপরে ওর মধ্য এখনো খানিক “রাস্তার ছেলে” ভাবটা রয়ে গেছে। ওর স্বভাবটা এখনো ঝগড়াটে, মারকুটে আর নিষ্ঠুর। মিন হুয়ের ভয় আছে যে ওর ছেলে ইস্কুলে হয়তো ফেল করবে চেন জিয়া জুনের প্রভাবে বেশি থাকলে, তাই চেন জিয়া জুনের ব্যাপারে মিন হুয়ে স্বচ্ছন্দ নয়।

সাও মু-র বর য়িন শু সারা দিন বাড়িতেই থাকে। কিন্তু ওঁর নিজেরই দুটো বাচ্চা আছে। উনি এক দিন আধ দিন হঠাৎ দরকার পড়লে সু ছনের দায়িত্ব নিতে পারেন, কিন্তু এক মাসের জন্য সু ছনকে ওঁর কাছে রেখে দেওয়া … উনি নিশ্চিতভাবে পেরে উঠবেন না।

নার্স বা ন্যানি রেখে দেওয়া খুব কঠিন হবে না। পয়সারও অসুবিধে নেই। কিন্তু অপরিচিত লোকেদের ব্যাপারে সু ছন ভীষণ খুঁতখুঁতে। এদিকে মিন হুয়ে না থাকলে অপরিচিত মানুষের সাথে আলাপ করে নেওয়াটাও কঠিন সু ছনে পক্ষে। 

সব দিক ভেবেই মিন হুয়ে স্থির করেছে যে শিন ছিকেই বলবে একটা মাস সু ছনের দেখাশোনা করতে।

“আমি তো বলেছি যে ও যতোদিন না হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাচ্ছে আমি ওর দেখাশোনা করবো। তুই যদি খুব ব্যস্ত থাকিস, তবে এই দশদিন তোর এখানে সময় দেবার দরকার নেই।’

“পনেরো দিন।”

“আমি বেজিং-এ থাকি। ঘন ঘন নিউ ইয়র্কে যাই। তুই যদি মেনে নিস যে বাচ্চা আমার সঙ্গে থাকবে -” থামলো শিন ছি, “পনেরো দিন বলিস না। কিচ্ছু যাবে আসবে না যদি পনেরো বছরও হয়।”

“আমি দু;খিত, বিনচেং ছেড়ে কোথাও যেতে পারবে না সু ছন।”

“তাহলে তুই কী বলতে চাস? আমি আমার সর্বস্ব উজাড় করে দেবো, আর বদলে কিছুই পাবো না?”

“হ্যাঁ।”

“তোর এতো দুঃসাহস হলো কী করে এমন একটা অযৌক্তিক অনুরোধ - ?”

“কারণ তুই ওর বাবা।”

মিন হুয়ে আকাশের দিকে তাকালো, “এটাই দায়িত্ব। একবার কাঁধ পেতে দিলে, এটা তোর কাঁধেই রয়ে যাবে। ফেলে দিতে চাইলেও, ফেলে দেওয়া যায় না, কিছুতেই।”



~~~~~~~~~~~~

সম্পূর্ণ বই বিনামূল্যে : https://dl.bookfunnel.com/lcj5vznt96

Link to Previous Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/09/jpda-chapter-38.html

Link to following Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/09/jpda-chapter-40.html

Friday, September 13, 2024

JPDA - Chapter 38

 ৩৮. বরাহের বুদ্ধি



পরের দিন সকালে মিন হুয়ে কোম্পানিতে পৌঁছোনো মাত্র হে হাই শিয়াং-এর অ্যাসিট্যান্ট ডেকে নিয়ে গেলো মিন হুয়েকে। মিন হুয়ে নিজের ব্যাগটা রাখারও সময় পেলো না। 

কমিশনিং হয়ে গিয়ে ছিলো ডেডলাইনের আগেই। প্রজেক্ট হ্যান্ডওভারও হয়ে গিয়ে ছিলো। অবশেষে, মিন হুয়ের স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার অবকাশ এসেছে। হে হাই শিয়াং-এর ভালো মেজাজের সুযোগ নিতে চাইলো মিন হুয়ে। জানতে চাইলো ও বাচ্চা যে কদিন হাসপাতালে থাকবে সে কদিন দু ঘন্টা বা এক ঘন্টা আগে কাজ ছেড়ে বেরোতে পারে কিনা। যদিও শিন ছি বলেছে যে ও সারা দিন সু ছনের সঙ্গে থাকবে যতোদিন না সু ছন ছাড়া পাচ্ছে হাসপাতাল থেকে। ঝগড়ার পরে মিন হুয়ে টের পেয়েছে যে শিন ছির আপাত সুবিধেজনক প্রস্তাবটা উদার নিঃস্বার্থ দান নয়। শিন ছির উদ্দেশ্য হলো সু ছনকে একলা বড়ো করে তোলা, যে ব্যবস্থাতে মিন হুয়ে কিছুতেই রাজি হবে না, সেই জন্য এখন মিন হুয়ের ছেলেকে দেখা শোনা করার সমস্ত দায়িত্ব শিন ছির ওপর ছেড়ে দেওয়াটা মোটেই যুক্তির কথা নয়। তাছাড়া শিন ছিও কিছু ঘরে বসে নেই। একটা কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ওর ব্যস্ততা মিন হুয়ের থেকে বেশি বই কম নয়। যাই হোক, মিন হুয়েই বাচ্চাটার মা, সেই জন্যই মিন হুয়েই বাচ্চার দেখাশোনার কাজটায় বেশি স্বচ্ছন্দ, বেশি সড়গড়। কাজ শেষে ও সু ছনের সাথে আরো বেশি সময় কাটাবে বলে ঠিক করলো।

“হে জঁ, আপনি কী আমাকে খুঁজছেন?” জানতে চাইলো মিন হুয়ে।

“শও মিন, এখানে আসুন, বসুন আগে।” হে হাই শিয়াং-এর গলার স্বরটা একদম অচেনা যেনো, বেশ বন্ধুত্ব মাখা, “কাল রাতে সবারই খুব খাটনি গেছে।" এবারে নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলবেন।

যবে থেকে মিন হুয়ে বা’অ্যানে কাজ নিয়েছে, তবে থেকে হে হাই শিয়াং কোনো দিনই মিন হুয়েকে পছন্দ করেন নি বিশেষ। তিন মাসের অন্তঃস্বত্ত্বা, নতুন কাজ নিয়েছে, একটা রুগ্ন বাচ্চার জন্ম দিয়েছে, নানা রকম ছুটির বায়নাক্কা লেগেই আছে, সাও মুয়ের “সরাসরি যোগাযোগ”।

… এসব কিছু পরে। মিন হুয়েও হে হাই শিয়াং-এর প্রতি খুব উষ্ণ আনুগত্য দেখায় নি কখনো। ও কখনো হে হাই শিয়াংকে খুশি করার চেষ্টা করে নি, কিন্তু হে হাই শিয়াংও বেশ অসুবিধেই বোধ করেন মিন হুয়ের সাথে কাজ করতে। উনি মনে করেন যে মিন হুয়ে বড্ডো বেশি আত্মনির্ভরশীল মূল প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে। আর ও কিছুতেই হে হাই শিয়াং-এর ভূমিকাকে গুরুত্ব দেয় না। 

“আমই হেড কোয়ার্টার্সে জিএস১.০-এর ওপরে একটা বিশদ প্রতিবেদন পাঠিয়ে দিয়েছি। জানিয়ছি যে আমরা ওটার টেস্ট শেষ করেছি গত কাল। সান জঁ খুব খুশি হয়েছেন। আমাদের সকলের ব্যাপারে খুব ভালো ভালো কথা বলেছেন, প্রথা মাফিক প্রজেক্ট উদ্বোধনও করেছেন। এবার প্রোপাগান্ডা ডিপার্টমেন্ট প্রোডাক্টটাকে প্রচার করবে। সান জঁ আমাদের একটা অনুরোধ করেছেন, উনি আশা করছেন যে আমাদের ইন্টেলিজেন্ট অক্সিলিয়ারি ডায়াগনোসিস অ্যান্ড ট্রিটমেন্ট সিস্টেম যদি ডায়াবেটিস মেলিটাসের ও আগাম স্ক্রিনিং করতে পারে।”

মিন হুয়ে হতবাক হয়ে গেলো।

“সান জঁ হালেই দুটো টারশিয়ারি হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। ওদেরকে আমাদের প্রোডাক্টগুলোও দেখিয়েছেন। দুজন ডিরেক্টর খুব উৎসাহও দেখিয়েছে প্রোডাক্টগুলোর ব্যাপারে। ওঁদের আশা এই যে ডায়াগনোসিস অ্যান্ড ট্রিটমেন্ট সিস্টেম যদি আরো কয়েকটা রোগের ক্ষেত্রে কাজ করে বিশেষত ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথিতে - তুমি এই স্ক্রিনিং-এর কাজটা করো, আর আমার মনে পড়ছে যে দিঁ য়িফঁ এই কাজটা করতো এখান থেকে যাবার আগে। তাই না?”

ডায়াবেটিসের জন্য যে রেটিনোপ্যাথি হয় সেটাই ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি। রোগটা নির্ণয় করা কঠিন বিশেষত রোগটা যখন দানা বাধতে শুরু করছে তখন। কারণ রোগটা কোনো ব্যাথা দেয় না বা চুলকুনির মতো কোনো অস্বস্তিও দেয় না। রোগটা যখন ভীষণ রকম পেকে যায় তখন দৃষ্টিতে নানান অসুবিধে দেখা দেয়।

পরিসংখ্যান অনুসারে প্রায় তিন কোটি ডায়াবেটিক মানুষ আছে মিন হুয়ের দেশে। যদি ফান্ডাস স্ক্রিনিং করা যায় রোগীদের, আগাম নির্ণয় আর আগাম চিকিৎসা রোগটার অবনতি আটাকাতে পারবে যথা সময়ে।

মিন হুয়ে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো, “হ্যাঁ, উনি শুরুটা করে ছিলেন মাত্র। কাজটা বন্ধ হয়ে যায় উনি কোম্পানি ছেড়ে যাবার পরে। সাও মু গত বছরে কাজটা দিয়েছেন ওয়াং ছিং য়ুআঁকে। কাজটা এগোচ্ছে ভালোই কিন্তু কাজটা এখনো এতোটা তৈরি হয় নি যে সেটা জিএস১.০তে জুড়ে দেওয়া যাবে।”

জিএস১.০ ইন্টেলিজেন্ট অক্সিলিয়ারি ডায়াগনোসিস অ্যান্ড ট্রিটমেন্ট সিস্টেম হলো গত তিন বছর ধরে তৈরি করা বা’অ্যানের সমস্ত প্রোডাক্টগুলোর মধ্যে সামনের সারির প্রোডাক্ট। প্রোডাক্টটা লিভার, ব্রেস্ট আর ফুসফুসের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ থেকে মেডিক্যাল ইমেজ স্ক্যান করতে পারে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঐ সব অঙ্গে কোনো ক্ষত থাকলে তা নির্ণয় করতে পারে। তার থেকে রিপোর্টও দিতে পারে। এখনকার ভার্সানটা যেহেতু সবে কাজ করতে শুরু করেছে, সেহেতু কয়েকটা ডিসাইন ফাংসন এখনো সক্রিয় হয় নি। আবার সেগুলোকে অস্থায়ীভাবে জুড়েও দেওয়া যাবে না, যেমন ডায়াবেটিস মেলিটাসের স্ক্রিনিং, ব্রেন টিউমরের ইমেজ অ্যানালিসিস। মিন হুয়ের পরিকল্পনা হলো একটা আরো পরিপূর্ণ ভার্সান আর এক বছর পরে বার করা।

“সে তো অনেক কাজ। দশ দিনে শেষ করা যাবে না কিছুতেই।” মিন হিয়ে মাথা নাড়তে লাগলো জোরে জোরে।

“আমি তোমাকে আরো লোক দেবো। ডায়াবেটিসের স্ক্রিনিংটা ব্রোশিওরে থাকতেই হবে। এই প্রজেক্টটা তুমি লঞ্চ করবে।”

“হে জঁ, যে কোনো টিমের অন্তত তিন মাস লাগবে এই অংশটা জোড়া লাগাতে। দশ দিনে করা অসম্ভব।”

“অ্যাই, একটুও আত্মবিশ্বাস নেই তোমার! সবাই বলে তুমি নাকি জিনিয়াস, তুমি নাকি এক দিনে একটা প্রোগ্রাম লিখে ফেলতে পারো যেটা বাকিরা লিখতে মাসখানেক লাগাবে।”

হে হাই শিয়াং থার্মসের কাপ খুলে চায়ে একটা চুমুক লাগালেন। কাপের ঢাকায় একটা গোজি বেরি ফেললেন থু থু করে, “যদি তুমি তোমার সব চেয়ে সেরা কৌশলগুলো কাজে লাগাও তো দশ দিনই যথেষ্ট। সান জঁ-এর চাপড়টা আমি বুক পেতে নিয়েছি, এখন কাজের সময়ে তুমি সেই চাপড়টা আমার মুখে মেরো না।”

“দশ দিন সত্যিই অসম্ভব।” মিন হুয়ে প্রায় কেঁদেই ফেললো, “হে জঁ, জিএস১.০ ইতিমধ্যেই বাজারে যা প্রোডাক্ট আছে সে সবের থেকে অনেক বেশি এগিয়ে। ফলো-আপ অপেরেসনে যদি কোনো ভুল না হয়, আর হাসপাতালগুলোর সাথে যদি ভালো সহযোগিতা থাকে, তাহলে আমরা পায়ের তলায় শক্ত মাটি পাবো। আমরা সেই সব ফাংসনই বানিয়ে ফেলেছি, যেগুলো যতো দূর বানানো যেতো। তার সাথে ডায়াবেটিস জুড়ে দেওয়া? দরকারই নেই তো। আমরা ডায়েবেটিস আর ব্রেনের সিটি স্ক্যান তো রেখেছি ২.০ তৈরি করার সময়ে। পুরোটা আসছে বছর লঞ্চ করতে তো কোনো সমস্যাই নেই।”

“তাহলে আমি তোমাকে আরো পাঁচ দিন দেবো।” হে হাই শিয়াং ভান করলেন যেনো শুনতেই পান নি। ক্যালেন্ডারে মার্কার দিয়ে একটা লাইন টেনে কয়েকটা শব্দ লিখলেন, “যারা অনেক কাজ করতে পারে, তুমি তাদের একজন।”

“হে জঁ -”

“ঠিক আছে, ঠিক আছে। ঘ্যান ঘ্যান করা বন্ধ করো। মিন হুয়ে, বা’অ্যান তোমাকে অনেক দয়া দেখিয়েছে। যখন তুমি অন্তঃস্বত্তা, তখন তুমি সব সময়ে দেরি করে এসেছো, কখনো আগে আসতে পারো নি। আমি একবারও তোমাকে কিছু বলেছি? তোমার ছেলে অসুস্থ, কোম্পানি তোমাকে বাড়ি থেকে কাজ করতে দিয়েছে, পুরো মাস। তুমি বাড়ি থেকেই কাজ করেছো মূলত। তুমি কোথায় এমন অভূতপুর্ব যত্ন পাবে? আমি তোমাকে বা’অ্যানে চাই। আমি আশা করবো তুমিও পরিবর্তে কিছু ত্যাগ আর কিছু আত্মোৎসর্গ দেখাবে।”

“...”

মিন হুয়ে বেরিয়ে এলো হে হাই শিয়াং-এর অফিস থেকে পুরো অস্তিত্বে অসম্মান মেখে। সাও মুকে খুঁজে বার করলো, পুরো দশ মিনিট ধরে অনুযোগ করে গেলো। সাও মুয়ের কোনো উপায়ই রইলো না চুপ করে না শুনে। ফের বললো, “যেহেতু সান জঁ বলেছেন, হে জঁকে মনস্থির করতে হয়েছে, লক্ষ্যস্থির করতে হয়েছে। হেড কোয়ার্টার্সের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলাটাই বরাবরের নীতি।”

“কী করবো আমি? না খেয়ে, না শুয়ে খাটলেও আমি পনেরো দিনে শেষ করতে পারবো না কাজটা।”
মিন হুয়ের হাঁউমাঁউ আর কিছুতেই থামে না। ওভারটাইম কাজ করতে হবে তাতে ওর ভয় নেই। কিন্তু ওর কাছে যারা কাজ করে, তারা সবাই অনেক সপ্তাহ ধরে ওভারটাইম করে চলেছে, যাতে ডেডলাইনের আগে টেস্ট শেষ করা যায়। অবশেষে একটু দম ফেলার অবকাশ পেতে, মিন হুয়ে সকলকে পুরস্কার দেবার জন্য একটা তিন দিনের লম্বা সপ্তাহান্তে ফিনিক্স পাহাড়ে একটা রিসর্ট বুক করেছে টিম বিল্ডিং-এর জন্য।

এখন এর মধ্যে হে হাই শিয়াং দুম করে এরকম একটা ব্যবস্থা করে বসে আছে, এবার সবাইকে আবার ওভারটাইম কাজ করতে হবে। কাজের দায়িত্বে থাকা মূল মানুষগুলোকে সারা রাত কাজ করতে হবে …।

“বেশ, চলো, যতো দূর করা যায়, ততো দূর চেষ্টা করে দেখি। যদি আমরা শেষ করতে না পারি তো আমি নিজে গিয়ে সান জঁকে বুঝিয়ে বলে আসব।” সাও মু আরো বললো, “সবাইকে বলো যে বেশি রাত না জাগতে, ওরা সবাই জোয়ান মানুষ, আমাকে আবার রাত বারোটার আগে ঘুমোতে হবে।”

সাও মুয়ের এক আত্মীয়ের একটা ছেলে আছে। ছেলেটা একটা প্রযুক্তি কোম্পানিতে প্রায় রোজই সারা রাত জেগে জেগে কাজ করতো, ছেলেটার বয়স আঠাশ হবার আগেই অফিসে হঠাৎ মারা যায় সে। ছেলেটা একমাত্র সন্তান ছিলো মা-বাবার। ছেলেটা মারা যাবার পর থেকে ওর মা-বাবা ভীষণ উত্তেজিত থাকে সব সময়ে। তাঁদের মন এমন ভেঙে গেছে যে তাঁরা আর নিজেদের কাজে যেতে পারেন না, তাদের সময়ের আগেই কাজের থেকে অবসর নিতে হয়েছে। পুরো পরিবারটা ধ্বংস হয়ে গেছে।

সাও মুও ভয় পেয়ে ছিলো অনেকদিন। ও খুব কড়া হাতে কোম্পানির অল্প বয়সী কর্মীদের কাজের আর বিশ্রামের সময় নিয়ন্ত্রণ করতো। 

“এটা অন্তত এইটুকু দেখায় যে হেড কোয়ার্টার্স এখনো আমাদের কথা বেশ গুরুত্ব দিয়ে ভাবে।”

মিন হুয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, “আমরা আমাদের নিজেদের ওপরে বড্ডো বেশি আশা তৈরি করেছি। আবার আমরা এও চাই না যে বা’অ্যান বিক্রি হয়ে যাক।”

জিয়া জুন আর শিন ছির ফিরে আসাতে, আর সু ছনের অসুস্থতা, মিন হুয়ের মনে হচ্ছিলো যেনো এই কয়েকদিনে অনেক বেশি ঘটনা ঘটে গেছে আর ও এতো কিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছে না। কেবল মাত্র কাজই ওর মনোযোগ আর শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারে নিমেষে। যদি কাজ বদলে যায়, তাহলে ও জানেও না যে ও কী করবে।

“আমার মনে হয় ঠিক উল্টো কথা।”

সাও মু চিন্তায় পড়ে ছিলো, “হেড কোয়ার্টার্স আগে কোনো দিনও এআই-কে পাত্তাই দেয় নি, কেবল মনে করেছে যে এআই নিয়ে প্রতিযোগিতা বড্ডো বেশি আর এসব বাদ দেওয়াও যায়। আমাদের প্রতিও আচরণটা এরকমই ছিলো যে ওরা সব সময়ে আমাদের ব্যাপারটা রেখে ঢেকে চলতো, এমন করে যে কখনো যেনো আমরা চট করে কারুর নজরেই না পড়ি। খানিকটা উদাসীনও থেকেছে বরাবর। আমরা একটা ভালো প্রোডাক্ট বানিয়েছি। ওরা খুশি হতে নাও পারে, কারণ অদের কোনো পয়সা হচ্ছে না এটার থেকে। আমরা ভালো প্রোডাক্ট যদি নাও বানাতে পারি, তাতেও ওদের যে খুব দুঃখ হয় এমন নয়। কারণ এআই নতুন আর জনপ্রিয়, তাই ওরাও লোকজন জড়ো করেছে ব্যাপারটা নেড়ে ঘেঁটে দেখার জন্য। যাতে মনে হয় যে ইন্ডাস্ট্রির প্রসার ঘটছে। হেড কোয়ার্টার্স কখনো আমাদের কোনো কাজ করতে বাধ্য করে নি আগে। এখন যে হঠাৎ আমরা যে প্রোডাক্ট লঞ্চ করতে চলেছি সেটা নিয়ে খোঁজ খবর করছে, আর সেটা নিয়ে ব্যাপক প্রচারও করছে, হতে পারে বা’অ্যানের দাম বাড়ানোর জন্য।”

মিন হুয়ে অবাক হলো, “তাহলে য়ুআঁলাই সত্যিই না’অ্যান বেচে দিতে চাইছে?”

সাও মু চিন্তার চোখে তাকালো মিন হুয়ের দিকে, “এখনো অবশ্য কোনো নিশ্চিত খবর নেই। তবে এখন আরো অনেক অনেক গুজব চলছে।”

“হে জঁ ইতিমধ্যেই জানে না কিছু এ ব্যাপারে?” মিন হুয়ে জানতে চাইলো, “ওঁর কী ভয় করছে না যে উনি হেড কোয়ার্টার্সের সাথে হাত মেলালে আমরা চটে যাব?”

“এমন সময়ে, সমস্ত সিইও-ই ভাবতে শুরু করে যে যা ঘটতে চলেছে সেটা আটকাবে কী করে। হে জঁয়ের জন্য সব থেকে নিরাপদ পথ হচ্ছে আমাদের বেচে দিয়ে নিজে হেড কোয়ার্টার্সে ফিরে যাওয়া। দাম যদি ভালো পাওয়া যায় তো আমাদের পদোন্নতি হতে পারে। অবশ্যই হেড কোয়ার্টার্সে একটা ফোকর আছে কোথাও, আর যারা এর মধ্যেই ছেড়ে গেছে, তাদের জন্য খুব বেশি খালি পদ নেই। ওঁর জন্য এটা একটা জুয়াও বটে, আবার সংঘর্ষও।”

“তাহলে তো ভালো হয় আমাদের সবাইকে একসঙ্গে বেধে বেচে দেওয়া। কে বলতে পারে, হতে পারে বিয়েটা একটা ভালো পরিবারেই হলো।”

“হে জঁ এখনো রাস্তা করে নিতে পারবে আমলাতন্ত্রের মধ্যে।” বললো সাও মু, “চিন্তা কোরো না। মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা বলা তোমার ওস্তাদির মধ্যে পড়ে না। আমি জেনে আসবো। আর আমি তোমাকে জানাবোও যদি কোনো খবর থাকে।”

“প্রথমত -” মিন হুয়ে গম্ভীর মুখে তাকালো সাও মুয়ের দিকে, “আমাদের প্রজেক্ট আর টিম যাতে একসাথে থাকে তার ব্যবস্থা করতে হবে। এবং এভাবেই বহু বছরের কঠিন পরিশ্রম আর তার প্রাপ্তিগুলো সহজে এক ঝটকায় কেউ আত্মসাৎ করতে বা ভাগ করতে পারবে না।”

“মিন হুয়ে, তুমি সম্পূর্ণ ভুল ভাবছো। কার কাছে বা’অ্যান আমাদের বেচছে সেটা আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ! তাদের সঙ্গেই আমরা চলবো যারা আমাদের সম্মান করে, না হলে আমরা খুব বেশি দূর এগোতে পারবো না। আর আমাদের হয়তো সারাক্ষণ লড়াই করে যেতে হবে।”

মিন হুয়ের ফোনটা কেঁপে উঠলো। মিন হুয়ে ফোনটা বার করে দেখলো। বললো, “আমাকে যেতে হবে। উনি কাজ শুরু করার জন্য পিড়াপিড়ি করছেন।” 

***



ব্যস্ততার কাজটা শেষ হতে রাত এগারটা বাজলো। মিন হুয়ে ভেবে ছিলো শুরুতে যে কাজ থেকে বেরিয়ে পড়বে বিকেল চারটে বাজলেই। হাসপাতালে যাবে সু ছনের কাছে। যখন হাসপাতালের ওয়ার্ডে পৌঁছোলো, তখন সু ছন ঘুমিয়ে গেছে। শিন ছি নেই ঘরে, কেবল মাত্র একজন নার্স রাউন্ডে আছেন।

নিয়ম মতো কেবলমাত্র মা কিংবা বাবা - দুজনের যে কোনো একজনকে সু ছনের সঙ্গে হাসপাতালে থাকতে দিতে রাজি হয়ে ছিলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু শিন ছি নিজের জন্য একটা সাময়িক যাতায়াতের কার্ড কিভাবে যেনো বানিয়ে নিয়েছে। ও বাচ্চার সঙ্গে সারাক্ষণ আছে আর হাসপাতালের কর্মীদের সঙ্গে ভালোই আলাপ পরিচয় করে নিয়েছে।

নার্সেরা জেনে গেছে যে ও ‘সু ছনের বাবা’; এমন কী ওঁরা তো চিৎকারও করেন “ছনছনের বাবা” বলে। 

“শও ছিন, আজ সু ছন কেমন আছে?” জানতে চাইলো মিন হুয়ে।

“ভালো আছে। সব কিছু স্বাভাবিক।” নার্স আরো বললেন, “ওর বাবা তো সারাক্ষণ ওর সঙ্গে আছেন, খুবই বিবেকসম্পন্ন মানুষ বলেই মনে হয় ওঁকে, আমি যখনই এটা সেটা জিজ্ঞেস করি।”

“ওর বাবা?” মিন হুয়ে থতমত খেয়ে গেলো এক মূহুর্তের জন্য, কারণ ঝৌ রু জি প্রায়ই আসে, তাই ও জানতে চাইলো, “কোন বাবা?”

“নতুন জন।”

মিন হুয়ে যে ঝৌ রু জির প্রাক্তন স্ত্রী সে কথাটা ইন-পেসেন্ট ওয়ার্ডের নার্সেরা সবাই জানেন আর ওঁরা মনে করেন যে সু ছন ওদের দুজনের সন্তান। এখন হঠাৎ করে শিন ছি - একজন নতুন মানুষ - এসে উপস্থিত হয়েছে, যার দাবি যে সে নাকি সু ছনের জন্মদাতা, কিন্তু তাঁর সাথে আবার মিন হুয়ের সম্পর্কটা হিম ঠান্ডা আর ইন-পেসেন্ট ওয়ার্ডের জনপ্রিয়তম পরচর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে শিন ছি যা সব করলো আবার - একজন রাঁধুনি এলো একবার কিছুক্ষণের জন্য, একজন সহায়ক এলো একবার কিছুক্ষণের জন্য। সু ছনের ওয়ার্ড ভর্তি নানান সুখাদ্যে আর খেলনায় - যেনো শিন ছি সারা পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে জানান দিচ্ছে যে ও-ই সু ছনের সত্যিকারের জনক।

“শিন ছি কোথায়?” জিজ্ঞেস করলো মিন হুয়ে।

“খেলাধূলোর ঘরে।”

“খেলাধূলোর ঘর রাত দশটায় বন্ধ হয়ে যায় নি?”

“উনি তো ঘরটার চাবিটা চেয়ে নিয়েছেন। বললেন যে উনি সারাদিন বাচ্চার সঙ্গে ছিলেন, রাতে ওঁকে কাজ করতে হবে, বাচ্চা ঘুমিয়ে পড়ার পরে।”

মিন হুয়ে মুখে হাসি টেনে এনে বললো, “সে তো ওয়ার্ড থেকেও কাজ করা যায়।”

ও তো নিজেও তাই করেছে। ও সু ছনের সঙ্গে থাকতে থাকতেই প্রোগ্রামও লিখেছে। মাঝরাতে কেউ ওকে বিরক্ত করতেও আসে নি। ওর দক্ষতাও বেশ বেশির দিকেই ছিলো।

“এটা একটা কনফারেন্স কল। আমার ভয় একটাই যে কথাবার্তার আওয়াজে সু ছন জেগে যাবে।” শিন ছি বলেছে, “ও রোজ রাতে খেলাধূলোর ঘরেই কাটায় কারণ ঐ সময়টা উত্তর আমেরিকাতে দিনের বেলা।”

খেলাধূলোর ঘরটা করিডরের অন্যপ্রান্তে। অর ভেতরে অনেকগুলো ক্যানভাসের সোফাও আছে। একটা ষাট ইঞ্চি রঙিন টেলিভিসন সেটও আছে ঐ ঘরের পুব দিকের দেওয়ালে। মিন হুয়ে ঐ ঘরে প্রায় যায়ই না, কারণ ঘরটায় সব সময় শোরগোল চলে।

ও যেই ঘরটার দরজায় পৌঁছোলো, ‘দুম’ করে একটা শব্দ হলো, মিন হুয়ে বুঝতেই পারলো না যে কিসের শব্দ হতে পারে, তবে কোনো ভারি জিনিস মাটিতে পড়েছে সেটা নিশ্চিত।

তাড়াহুড়ো করে মিন হুয়ে দরজাটা খুললো খেলাধূলোর ঘরের। দেখলো যে মুখ লাল করে শিন ছি ঘরের মেঝে জুড়ে পায়চারি করে চলেছে। দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছে যেনো ও মেজাজ হারিয়েছে।

চারপাশে চোখ চালিয়ে কাউকে নজরে পড়লো না মিন হুয়ের। মিন হুয়ে বুঝে উঠতে পারলো না যে শিন ছি কার ওপরে চটেছে।

মেঝেতে ওর ল্যাপটপটা পড়ে আছে।

মিন হুয়ে ল্যাপটপটা তুলে নিয়ে টেবিলে রাখলো। নরম স্বরে জিজ্ঞেস করলো, “কী হয়েছে?”

“কিছু না।” শিন ছি তখনো পায়চারি করে চলেছে মিন হুয়ের সামনে। আর বিড়বিড় করে আপন মনে কথা বলে চলেছে।

“আমি দুঃখিত। আমার আসতে দেরি হয়ে গেছে।” বললো মিন হুয়ে, “তোর যদি কিছু করার থাকে তো তুই ফিরে যা। আমি রাতে থাকবো সু ছনের সঙ্গে।”

সু ছনের ঘুম খুবই পাতলা। অল্প নড়াচড়া টের পেলেই ও জেগে যাবে। আর জাগলেই কাঁদতে শুরু করবে। একবার জাগলে অনেক সময় লেগে যায় ওকে ভুলিয়ে ভালিয়ে ঘুম পাড়াতে। অপেরেসনের পরে ক্ষতটাতে ব্যাথা আছে। সেটা সামান্য ব্যাপার, তবু এগুলোই বাড়াবাড়ি হয়ে দাঁড়ায় মাঝরাতে ঘুম ভাঙলে। তাই সু ছনের সঙ্গে ঘুমোনো বেশ চাপের কাজ। অনেক সময়েই সু ছনকে ভুলিয়ে ঘুম পাড়ানোর পরে বাকি রাত আর ঘুমোতে পারে নি মিন হুয়ে, তাকিয়ে থেকেছে ছাদের দিকে ভোর হওয়া অবধি।



“আমরা একটা বোঝাপড়ার মধ্যে ছিলাম। সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কম্পিউটারটা গেলো অকেজো হয়ে।”

শিন ছি দাঁত কিড়মিড় করে উঠলো, ও জানেও না কিসের সাথে ওর লড়াই। 

টেবিলটা অস্থিরভাবে ঘুরে চলেছে একটানা একটা আবর্তে, যেনো একটা ফাঁদে আটকা পড়া জানোয়ার, কখনো ডান থেকে বামে, কখনো বাঁ থেকে ডানে। যারা জানে না কিছু তাদের বুঝি মনে হবে যে শিন যেনো সেনাবাহিনীর প্রধান, কোনো গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধকৌশল নিয়ে ভেবে চলেছে।

“গন্ডগোলটা কোথায়? কিছু ভেঙে গেছে?” প্রশ্ন করলো মিন হুয়ে, “নাকি কোনো ভাইরাস?”

“আমি জানি না। কোনো ব্যাখ্যাই নেই। হঠাৎ স্ক্রিনটা নীল হয়ে গেলো।”

অধৈর্য চোখে শিন ছি তাকালোমিন হুয়ের দিকে, যেনো মিন হুয়ে আসাতে ওর চিন্তার সুতোটা এলোমেলো হয়ে জট পাকিয়ে গেছে, “আমি আমার মোবাইল ফোনটা ব্যবহার করে ক্লাউডে শেয়ার করে রাখা একটা ফাইল খুলতে গেলাম। ফাইলটা একটা ড্রপবক্সের ভেতরে আছে, আর মেইনল্যান্ডে ওটা ব্লকড। আমি আর কিছুতেই ফাইলটা খুলতে পারছি না।”

“বসতে পারবি?” মিন হুয়ে বললো, “এরকম করে হাঁটাচলা করিস না, মাথা ঝিম ঝিম করবে।”

শিন ছি তক্ষুণি চিড়বিড়িয়ে উঠলো, “একটা কথা জানিস কী? এসব ঝামেলার মূলে হলো তোর সাথে আমার দেখা হওয়া …”

“...”

“আমাকে একটা রিসেপসনের নেমতন্ন দেওয়া হয়ে ছিলো। আর আমি দেখলাম যে তুই একটা অন্য লোকের কোলে বসে পড়লি। লোকটার বউ তোর সঙ্গে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করছে দেখে আমি কিছুতেই থাকতে পারলাম না, আমি তোকে সাহায্য করতে গেলাম। তারপরেই তুই হঠাৎ করে বললি যে তোর একটা বাচ্চা আছে, আর বাচ্চার বয়স এর মধ্যেই তিন পেরিয়েছে।”

“শিন ছি, শান্ত হ …”



“তুই জানিস আমার একটা জন্মগত হার্টের অসুখ আছে। কিন্তু তুই কক্ষণো ভাবিস নি যে ও এটা আমার থেকে পেতে পারে? আমি বুঝতে পারছি না, আমি তো বলব, কিছুই যায় আসে না, আমরা দুজনেই রাজি হয়ে গিয়ে ছিলাম সম্পর্কটা ভেঙে ফেলার জন্য, কোনো ঝুটঝামেলায় না গিয়ে, তাহলে তুই নিজের পেটটা খালি করে নিলি না কেনো,আর নিজের জীবন যাপণ করলি না কেনো? কেনো তোকে ওর জন্ম দিতেই হবে আর ওকে এই জন্মের অপরাধে মর্মান্তিক যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে? তুই কী কল্পনা করতে পারিস যে একটা তিন বছরের বাচ্চার কী ভীষণ ভয় করে এরকম একটা সাংঘাতিক অপেরসনের মুখোমুখি হতে? এটা পুরোপুরিই - কিভাবে তুই সহ্য করতে পারিস আর কিভাবে তুই সহ্য করতে চাস? তুই কী কখনো এই পরিণতিগুলোর কথা ভাবিস নি? তোর বুদ্ধি নয় তো, শুয়োরের বুদ্ধি!”

“...”

“আসলে এর মধ্যেই আমি আমার অবসরের টাকা জমিয়ে ফেলেছিলাম, আর কয়েক বছরের মধ্যেই আমি পৃথিবী দেখার জন্য বেরিয়ে পড়তাম, এখন হঠাৎ করে কোথা থেকে একটা ছেলে এসে উপস্থিত, আমি এতো ভয় পাচ্ছি যে কাজ ছেড়ে ছুটিতেও যেতে পারছি না, এমনকি ব্যবসার কাজেও কোথাও যেতে পারছি না!”

“এখনই কাজ ছেড়ে দেওয়াটা কী খুব তাড়াহুড়ো নয়?” মিন হুয়ের গলার স্বর কাঁপছে, “তোর তো সবে তিরিশ বছর বয়স …”

“এই মাত্র একটা - তাহলেই ডিল শেষ হয়ে যেতো।”

যতো কথা বলছে, ততো বেশি রেগে যাচ্ছে শিন ছি, “লোকে আমার জন্য অপেক্ষা করে বসে আছে, আমি একটা বক্তব্য রাখব। অনেক ক্ষণ কেটে গেলো, আমি কিছুই বলি নি, ওরা হয়তো ভাবছে যে আমি আর এই ডিলটা চাই-ই না।”

মিন হুয়ে চোখ পিটপিট করলো, “যদি এটা শুধু একটা মিটিং হয়, যদি কম্পিউটারটাই খারাপ হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে তুই তো ফোন থেকেও কথা বলতে পারিস।”

“সেল ফোনও ভেঙে গেছে।”

যতোক্ষণ না মিন হুয়ে কানে হাত চাপা দিলো ততোক্ষণ শিন ছি চীৎকার করতে লাগলো, খানিক ভেবে মিন হুয়ে বললো, “হুহ্‌” আবার বললো, “এতোগুলো ইলেকট্রনিক অ্যাপ্লায়েন্স তুই একসাথে ভেঙে ফেললি কী করে?”

“আমি ফেলে দিয়েছি।”

মিন হুয়ে তাকালো শিন ছির দিকে, ওর হাসি পাচ্ছিলো, কিন্তু হাসতে সাহস করলো না, “বেশ, সব আমার দোষ। সবই আমার দোষ। আমাকে ক্ষমা কর। আমাকে তোর কম্পিউটারটা দেখা।”

“আমার কম্পিউটার দেখবি? কে রে তুই?”

“দেখি, আমি সারাতে পারি কিনা …”

“পারবি সারাতে?”

“আমি কম্পিউটার ওস্তাদ। ভাবিসটা কী?”

মাথা ঝিমঝিম করা বন্ধ করতে শিন ছি অবশেষে মিন হুয়ের পাশে একটা চেয়ার দেখে বসে পড়লো। মিন হুয়ে কম্পিউটারটা অন করে চালালো। অনেক ক্ষণ ধরে কিছুই হলো না। “এটাতে একটা নীল পর্দা দেখা দেবার কথা না? এটা একটা কালো পর্দা দেখাচ্ছে কেনো?” 

কয়েকটা বিপের পরে পর্দায় আলো জ্বলে উঠলো, আবার নিভে সব অন্ধকার হয়ে গেলো, “আমি সারাতে পারব। ঘন্টা খানেক লাগবে।”

“আমার এখনই কাজে লাগবে এটা।”

“তাহলে আমার কম্পিউটারটা ব্যবহার কর। আমি তোকে ড্রপবক্সটা পেতে হেল্প করবো।”

মিন হুয়ে দৌড়ে গেলো ওয়ার্ডে, নিজের কম্পিউটারটা আনতে। কম্পিউটার খুলে, তাড়াতাড়ি কয়েকটা কাজ করে নিলো, “ড্রপবক্স পাওয়া গেছে। লগ ইন কর।”

শিন ছি এক ঝলক দেখলো মিন হুয়ের দিকে, চুপ করে, মন দিলো কম্পিউটারে টাইপ করায়। 

“যাই হোক, তোর কী মনে পড়ে যে তুই একবার দাবা খেলায় একবার জিতে ছিলি আর আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলি যে আমি তোকে ইচ্ছে করে জিতিয়ে দিলাম কিনা?”

“তুই বলেছিলি ওটা একটা কৌশলের ভুলে হয়েছে।” টাইপ করতে করতে, মাথা না তুলেই উত্তর দিলো শিন ছি।

“আমি তোকে ইচ্ছে করে জিততে দিয়ে ছিলাম।”

শিন ছি তাকালো মাথা তুলে, ভ্রুতে ভাঁজ, "কেনো?”

“কারণ বুদ্ধিটা আমার, শুয়োরের নয়।”



~~~~~~~~~~~~

সম্পূর্ণ বই বিনামূল্যে : https://dl.bookfunnel.com/lcj5vznt96

Link to Previous Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/09/jpda-chapter-37.html

Link to following Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/09/jpda-chapter-39.html

Readers Loved