Sunday, May 18, 2025

Bengali Story - 1 অধরা


কুসুমে কুসুমে চরণচিহ্ন   দিয়ে যাও, শেষে  দাও মুছে।
ওহে  চঞ্চল, বেলা   না যেতে খেলা  কেন তব যায় ঘুচে।


ঋক স্কুল থেকে ফেরার পথে অহেতুক দাঁড়িয়ে গেল বারোয়ারিতলার সামনে। নীল আর চিত্রল ছিল ওর সঙ্গে। তিনজনে সমান তালে সাইকেল চালিয়ে আসছিল। ফলে ওরাও প্যাডেল থেকে পা তুলে, মাটিতে কিছুদুর পা ঘষে ঘষে যত শিগগির সম্ভব থেমে গেল। ঋকেদের পাড়ায় একটা ফুটবল ম্যাচ খেলার জন্য ওরা আসছে একসাথে। নাহলে তো অন্যদিনের মতো ইংরেজি কিংবা ভূগোলের প্রাইভেট টিউশন পড়ে ফিরতে হতো যার যার বাড়ি। চিত্রল তড়বড় করে বলল, দাঁড়ালি কেন? মহাশ্বেতার ছুটি হয়ে গেলে ভিড়ে ফেঁসে যাব। মেয়েগুলো গুছিয়ে গরম নেবে শুধু দেরি হতে থাকবে। 

মহাশ্বেতা মানে মহাশ্বেতা বালিকা শিক্ষাভবন। ঋকেদের দ্বিজেন্দ্র স্মৃতি ইংলিস মিডিয়াম স্কুলের ছুটি হয় মহাশ্বেতা স্কুলের থেকে আধঘন্টা আগে। ফলে ঋকের স্কুলের ছেলেরা যারা মহাশ্বেতা স্কুল পেরিয়ে বাড়ি ফেরে তাদের সে কথাটা মাথায় রাখতে হয় নানা কারণে। ঋক বলল, আজ যখন এসে গেছি, তখন ছুটির ঘন্টা শুনে তবে যাব। 

নীল খ্যাক খ্যাক করে হেসে বলল, আজ কোন জন বাঁটুলদেবী না বরবটি? 

ঋক বলল, বেঁটেটা বহুত গায়ে পড়া, ওটাকে দেখলে চাঁদি তেতে ওঠে। 

চিত্রল বলল, বরবটি দেখে তেতে ঊঠিস তুই? তোর ভা- -

ঋক খেঁকিয়ে উঠল, কাউকে সম্মান দিয়ে কথা বলতে শিখিস নি? 

চিত্রল সামলে নিল; বলল, এহ্‌, তুই তো দেখছি খুব সিরিয়াস! 

ঋক মুখটা ব্যাজার করে বলল, জানিস ওর ফোরামেন ওভেল থেকে ফোসা ওভেলিস তৈরি হয় নি ঠিক-ঠাক। 

নীল বলল, তার মানে ডান দিকের অ্যাট্রিয়ামে ইন্টার-অরিকুলার পার্টিসানে ফুটো! মানে মেয়েটার শরীরে তাজা রক্ত নেই!”  

ঋক খানিক উৎসাহিত হয়ে আরও বলল, তাই ওর শরীর খুবই দুর্বল; তাও বেশ গুছিয়ে পড়াশোনা করে। কিন্তু ওর বাড়িতে ওকে লস্ট কেস ধরে নিয়েছে; ওর বোনকেই নজর দেওয়া হয় বেশি

ছুটির পর বাকি মেয়েদের গুঁতোগুঁতি বাঁচিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটছিল ইন্দ্রাণী। ও জোরে জোরে চলতে পারে না। রাস্তা পেরোবার জন্য যেই দাঁড়াল অমনি প্রায় ওকে ঠেলে দিয়ে দ্বিজেন্দ্রর ইউনিফর্ম পরা একটা ছেলে চলে গেল। চমকটা সামলাতে সামলাতে ওর কোমরে একটা সাইকেলের হ্যাণ্ডেল মারল এক ধাক্কা। দুর্বল মেয়েটা টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে যেতে শুনল ঠনাৎ ঠনাৎ করে ওকে ধাক্কা দেওয়া সাইকেলটা পড়ে যাচ্ছে। তারপরেই দুহাতে ওকে জড়িয়ে ধরল একটা ছেলে, দ্বিজেন্দ্ররই ইউনিফর্ম পরা। ততক্ষণে তিলোত্তমাদির রিক্সাটা এসে গিয়েছিল। ছেলেটা সেই রিক্সাতেই তুলে দিল ইন্দ্রাণীকে।

পরদিন স্কুল ছুটির পর নীল, চিত্রল, আর ঋক বসেছিল গঙ্গার ঘাটে। ঋকের খুব মন খারাপ। ফুটবল ম্যাচটা জেতার জন্য একবার ইন্দ্রাণীকে দেখতে পাওয়া খুব জরুরি ছিল ওর কাছে। কিন্তু যা ঘটল তারপর ম্যাচে জেতার আনন্দটা ছুঁতেই পারেনি ওকে। যদি অসুস্থ মেয়েটার সাংঘাতিক কিছু হয় ভেবে ভেবে সারারাত জেগে কেটেছে ওর। ইন্দ্রাণী তো ভাববে বেপরোয়াভাবে ঋকই ওকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। আসলে নীল মেয়েগুলোর মাঝখান দিয়ে রাস্তা করে নিয়ে কায়দা করে যেভাবে এগোচ্ছিল তাতে রাস্তা পেরোতে গিয়ে ইন্দ্রাণী ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। ঋকও দাঁড়িয়েই পড়েছিল, কিন্তু চিত্রল পিছন থেকে ওর সাইকেলে ধাক্কা দিল বলেই না কাণ্ডটা হল। চিত্রল বলেই চলেছে, সরি, আসলে পিছনে এক গাদা রিক্সার হর্ন, মেয়েদের সাইকেলের ঘন্টি শুনে আমি তাড়া খাওয়া কুত্তার মত কনফিউজড ছিলাম রে। আমি কি তোকে ইচ্ছে করে ধাক্কা দিয়েছি, বল? 

সন্ধের অন্ধকার নামার মুখে উঠে পড়ল তিনজনে। ভূগোলের ক্লাস কামাই করেও ওদের মনে শান্তি এলো না। বাড়ি ফেরার পথে চিত্রল একটা গোলাপ ফুল কিনে দিল ঋককে, বলল, ইন্দুকে দিস, সব ঠিক হয়ে যাবে। 

ঋকের খুব রাগ হলো। ওর মনে হলো চিত্রলও ইন্দ্রাণীর জন্য কিছু একটা অনুভব করে, ঋকের মতোই। ও চিত্রলকে বলল, তোর যখন ওথলাচ্ছে তুইই দেখাস ওকে। তবে গোলাপটা আমি নিলাম। আজ অবধি আমাকে কোনো মেয়ে গোলাপ দেয় নি। তুই দিলি- -

পরের শনিবার ইংলিশ মিসের বাড়ি পড়তে গিয়ে মহশ্বেতার তুহিনার মুখে শুনল, ইন্দ্রাণী নাকি শয্যাশায়ী, অতএব হাফ ইয়ার্লিতে ওর ফার্স্ট হওয়া কেউ আটকাতে পারবে না, বাড়ি থেকে বেরোবে না একদম মানে সারাদিন শুধু পড়বে। ও নাকি ওর সব ভাগ্য বিপর্যয়ের শোধ তোলে পরীক্ষায় নম্বর তুলে। সেদিনই বিকালে একটা গেট-ওয়েল-সুন কার্ড নিয়ে ঋক গেল ইন্দ্রাণীর বাড়ি। ইন্দ্রাণীর মা তো অবাক। এই ছেলেটা যে ইন্দ্রাণীর বন্ধু তিনি কখনও জানতেন না। ইন্দ্রাণীর ঘরে ঋককে পৌঁছে দিয়ে, খানিকক্ষণ ওদের সাথে কথা বলে উনি চলে গেলেন ঘরের কাজ সারতে। ঋকের সততায় উনি খুব অবাক হয়েছেন। ছেলেটা ঈন্দ্রাণীর চোটের দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছে। আজকাল এতো দৃঢ়চেতা ছেলে দেখা যায় নাকি!

মা চলে যেতে ইন্দ্রাণী বলল, কেন এসেছিস? তুই ভাবছিস তুই একটা গল্প দিলেই আমি খেয়ে নেব? 

ঋক কিছু বলল না। ইন্দ্রাণীর হাতদুটো নিজের দুই হাতের মধ্যে নিল, চুমু দিল। ঋকের চোখের জলে ভিজে গেল ইন্দ্রাণীর হাত। টিশার্টে হাত মুছে, ভারি গলায় ইন্দ্রাণী বলল, চলে যা। আর কক্ষণো আমার চারপাশে ঘুরঘুর করবি না। 

ঋক উঠে পড়ল, যেতে যেতে বলে গেল, আজ যাচ্ছি। কিন্তু আর কখনও তোর কাছে আসব না এমন কথা দিতে পারলাম না। 

ইন্দ্রাণীর রাগও হলো, আনন্দও হলো।

ইন্দ্রাণী হাফ ইয়ার্লিতে ফার্স্ট হলো। যদিও ওর মনে হচ্ছিল সারাদিন বই মুখে নিয়ে ও কেবল ঋকের কথাই ভেবছে, ঋকের পথ চেয়ে থেকেছে। কিন্তু ঋক আসে নি একবারও। যেদিন রেজাল্ট বেরোল সেদিন খুব ইচ্ছে হচ্ছিল ঋকের সাথে দেখা করার। কিন্তু ঋককে সেদিন কোথাও দেখা গেল না।

হঠাৎ একদিন স্কুল যাওয়ার সময় ঋক পাশ দিয়ে চলে গেল বেশ সেজেগুজে। সেদিন দ্বিজেন্দ্রর ফাউণ্ডেশন ডে; অতএব ঋকের ছুটি। আবার ঘুরে এলো ও একটু পরে। ঠোঁটে একচিলতে হাসি ঝুলছে, চোখে মিটমিটে চাউনি। ইন্দ্রাণীর বুকে তখন ঢেউ ভেঙে চলেছে, একের পর এক; একটু রাগ লাগছে, অধৈর্য লাগছে, ভীষণ ভালো লাগছে। তারপর আবার ঘুরে এলো ঋক। আবারও। এভাবে পাকের পর পাক, রাস্তার মধ্যে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল ইন্দ্রাণী, ওকে গোল করে ঘিরে সাইকেলে চক্কর কেটে চলেছে ঋক। পুরো জগতে যেন কেউ নেই, কিছু নেই, শব্দ নেই, বর্ণ নেই, গন্ধ নেই, অন্ধকার নেই; শুধু এক আলোর বৃত্তের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে ইন্দ্রাণী আর বৃত্তের পরিধিটা ক্রমশঃ দূরে সরে যাচ্ছে, ক্রমশঃ কাছে আসছে ঋক। একটা পলাশ ফুল ডালপাতা সমেত ঈন্দ্রাণীকে দিয়ে ঋক বলল, যা-আ, দেরি হয়ে যাবে যে স্কুলে পৌঁছতে। 

পলাশ পাতার হালকা রঙা দিকে ঋক লিখে রেখেছিল, আমার তুই। জবাব রাখিস পলাশ পাতায়, পার্কের হাতল ভাঙা বেঞ্চের খাঁজে। তোর আমি

তারপর নিয়মিত ঋক বেঞ্চটায় খোঁজাখুঁজি করে। কিন্তু জবাব পায় না ইন্দ্রাণীর। একদিন সন্ধের মুখে বেঞ্চ ছেড়ে উঠে যাওয়া বুড়োদের একজনের প্যান্ট থেকে একগোছা হলুদ পোস্ট-ইট ঝুলতে দেখে ছুট্টে গেল ঋক। হলুদ কাগজের গোছাটা টেনে নিয়ে বলল, এটা ফেলে গিয়েছিলাম বেঞ্চে, আপনার প্যাণ্টে আটকে গিয়েছিল। 

সেই কাগজে লেখা ছিল, পরশু ফুটবল মাঠের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পাড়ার বখাটে ছেলের দল ঋকেন্দ্রাণী বলে চেঁচাচ্ছিল। তুই এসব ন্যাকামি বন্ধ কর। পড়াশোনা কর। বড়ো হ। তারপর ভেবে দেখা যাবে

নিতান্ত কাগুজে জবাবে ঋকের মন ভেঙে গেল। এদিকে অঙ্ক ইংরেজি তুঙ্গ অবস্থায় থাকলেও, ভূগোল লাইফ সায়েন্সে মাজাঘষা হলেও, ইতিহাস আর ফিজিক্যাল সায়েন্সের অবস্থা সঙ্গীন হয়ে পড়েছে। পরীক্ষারও বেশি দেরি নেই, তায় মাধ্যমিক পরীক্ষা। তাই উচাটন থেকে মরণপণ হয়ে গেল ঋকের। সে কথা ইন্দ্রাণীকে জানাতে দেরিও করল না ঋক। এক লাইন জবাবে ইন্দ্রাণী জানিয়েছিল, "এই-ই তো ভালো, বিশেষতঃ আমার যখন বড়োবেলাটাই অনিশ্চিত

পরীক্ষা মিটতে ঋক বুঝল ইন্দ্রাণীকে আর তেমন লাগে না ওর। তারপর ও কিছুদিন দিল্লী, আগ্রা বেড়িয়ে এলো। ফের পড়াশোনা পরীক্ষার যাঁতাকল চালু হয়ে গেল। নতুন নতুন কোচিং ক্লাসে নতুন নতুন মেয়েদের সাথে আলাপ হলো। কারুর হাসি ভালো লাগল, তো কারুর বাচন ভঙ্গী। কিন্তু তার থেকে উচাটন হওয়া আর হলো না ঋকের। তারওপরে, নীল চলে গেল ব্যাঙ্গালোরে ইঞ্জিনিয়ার হতে, চিত্রল সুরাটে। মায়ের মতে, মানইজ্জত খুইয়ে, ঋক শুরু করল ইংরেজি অনার্স। ক্লাস ভর্তি অনেক মেয়ে, ছেলে ঋককে নিয়ে মাত্র তিনজন। তবে ঋকের ভালো লাগছিল সোসিওলজির দেবারতিকে। দেবারতিও ঋকের প্রেম স্বীকার করে নিয়েছিল।


চকিত চোখের অশ্রুসজল   বেদনায় তুমি ছুঁয়ে ছুঁয়ে চল
   কোথা সে পথের শেষ   কোন্‌ সুদূরের দেশ
        সবাই তোমায় তাই পুছে।।

কলেজ পেরিয়ে ঋক এম এ পড়তে ঢুকল। দেবারতি দিল্লী চলে গেল। তারপর সেখান থেকে আমেরিকা। এম এ পড়তে পড়তেই একটা টিভি চ্যানেলে নিউজ সাবএডিট করার কাজ পেয়ে গেল ঋক। এম এ শেষ করে বছরটাক সেই চাকরিটাই করল। তারপর সিঙ্গাপুরের একটা নিউজ চ্যানেলে কাজ করতে চলে গেল।

বিদেশে বাঙালি ঘোঁট যেমন হয়। একজনের পোষা মুরগির ডিম আজ সবাই মিলে কিনে খেলে তো, কাল অন্য কারুর বাগানের সবজি কিনে খাও আর আদিখ্যেতার ঢেকুর তোলো। এর মধ্যে দেশ, কাল, রাজনীতি সবকিছুতে প্রযুক্তির সর্বব্যপি আগ্রাসন ঘটে চলেছে অবিরাম। এইসব মহাযজ্ঞের আগুনে ইচ্ছেয়, অনিচ্ছেয় জ্বলতে জ্বলতে ঋক কলম ধরেছে। কলম ঠেলে প্রবাসের বোরডম-এও জোর ঠেলা দেওয়া যায়। ফলে ঋকের সাথে কলমের প্রায় প্রেম জমে উঠল। প্রবাসী ইন্টেলেকচুয়ালদের মধ্যে তার যাতায়াত বাড়তে লাগল; বাড়তে লাগল ঠোকাঠুকিও; বাড়তে লাগল ভক্ত, অর্পিত ভোগ।

আন্তরিকতা আর একাকীত্বের তীব্র  যুগলবন্দীতে ঋক যা সৃষ্টি করল, তার সুবাদে ওর জীবনে তৈরি হলো এক সামাজিক আবর্ত। নতুন করে জীবন, জীবিকা আবিষ্কার করতে করতে তরতর করে কেটে যাচ্ছে ঋকের। একদিন ভোররাতে একটা ফোন পেল। একটা অপরিচিত, ফ্যাঁসফ্যাঁসে দুর্বল গলায়, ক্ষীণ স্বরে কোনো একটা মেয়ে কিছু বলল। ঘুমের ঘোরে নিজের স্বর স্থির করে কোনো মতে ঋক বলল, কুড ইউ বি লাউডার?। 

কন্ঠস্বর সবটুকু জোর উজাড় করে দিয়ে বলল, ইন্দ্রাণী বলছি। তুই কি ব্যস্ত? 

শব্দকটার আকুলতায় ঘুম ছুটে গেল ঋকের। স্বভাবসিদ্ধ ঠাট্টায় বলল, ব্যস্ত না ঘুমন্ত। 

তারপর অন্যদিকের নিস্তব্ধতায় চকিত হয়ে বলল, হ্যালো? আছিস। 

ক্ষীণস্বরে ইন্দ্রাণী বলল, এখনও আছি। 

কিছুক্ষণ থেমে আবার বলল, সরি রে; আসলে ঘরে লোক থাকলে তোর সাথে কথা বলতে লজ্জা করে, এখনও। 

তারপর হঠাৎ গলায় জোর এনে বলে, সেই লজ্জারই মাথা খেয়ে, পরশু যখন তোর মা-বাবা এসেছিলেন আমার কেবিনে, তখন ওঁদের থেকে তোর কনট্যাক্ট নাম্বারটা নিয়ে ফেলেছি। তোকে ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে। দেখতে তো আর পাব না তাই তোকে শুনলাম। 

তারপর আবার ইন্দ্রাণী কেমন যেন নিজের ভেতর তলিয়ে যেতে যেতে বলল, জানি আজ বলা অবান্তর; তোর জীবন অন্য সমুদ্রে; সেদিন আনন্দ দিতে চেয়েছিলি; কিন্তু দুজনেই পরে দুঃখ পেতে পারি ভেবে আমি তোর আনন্দও সেদিন মাটি করে দিয়েছিলাম, আমারটাও। কারণ আমি জানতাম আমি শিগগির মরে যাব। দেখ আজ কেমন লোভ হলো, মরে যাব শিগগির, জানি, তবু তোকে বলতে মরিয়া হয়ে উঠেছি তোর আমি; বুঝলি? 

এসব কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে না পেরে ঋক বলল, তুই কি বলছিস বলতো? আমার এতো ভেগ লাগছে কেন? 

ইন্দ্রাণীর দীর্ঘশ্বাসের শব্দ এলো ঋকের কানে। তারপর ক্ষীণ কিন্তু গাঢ় স্বরে ইন্দ্রাণী বলল, মিথ্যে জানি, তবু একবার বলবি যে তুই আমার? 

ঋক হেসে ফেলল, তারপর জিজ্ঞেস করল, তুই আমার? মানে? 

ইন্দ্রাণী ভাঙা গলায় বলল, তোর কিছু মনে নেই। আসলে আমার তো শুধুই তুই একবার মাত্র প্রেম ---। বাদ দে। ভালো থাকিস

দিন তিনেক পরে অফিস যাওয়ার সময় রোজকার মতো মাকে ফোন করল ঋক। কি খবর? 

প্রশ্নে মা কেমন ডুকরে উঠলেন। 

ঋক বলল, কি হয়েছে? কোনো খারাপ খবর? 

মা বললেন আমি বোসেদের বাড়ি যাব এখন। তুই কাল কথা বলিস।

বাবার সাথে মনোমালিন্য হলেও মা কান্নাকাটি করেন। ঋক বিশেষ মাথা ঘামাল না। পরদিনও মা ফোঁপাচ্ছিলেন ফোনে। শেষে ঋক জিজ্ঞেস করে ফেলল, মা? কোনো খারাপ খবর আছে? 

মা বললেন, বোসেদের বড়ো মেয়েটা মারা গেছে কাল ভোরে। 

মাকে স্বান্তনা দেওয়ার চেষ্টায় বলল, কী হয়েছিল ওর? 

মা বললেন, ওর একটা কনজেনিটাল সমস্যা ছিলই হার্টে, তারপর চাকরির ধকল আর নিতে পারল না। আপিসে কখনও নাকি ও বলেই নি অসুখের কথা পাছে কেউ কমজোর ভাবে ওকে। 

একটু থেমে, উথলে ওঠা কান্না গিলতে গিলতে আবার বললেন, কোনো দিন কারুর সাথে গল্পগাছা করত না। হাসপাতালে গেছে শুনে একবার দেখতে গিয়েছিলাম। আমার হাত দুটো জড়িয়ে খুব কাঁদল, আর বলল, আমার যে খুব ইচ্ছে ছিল তোমাদের মতো মা হব। আমার কেবল ওর শেষ কথাগুলো মনে পড়ছে। তোর থেকে বছর দুয়েকের ছোটো ছিল। তোর ফোন নম্বর নিয়েছিল......। 

আর কিছু কানে ঢুকল না ঋকের। শুধু মনের চোখে ভেসে উঠল স্কুল ইউনিফর্ম পরে পিঠে ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইন্দ্রাণী, ওকে ঘিরে বেড়ে চলেছে একটা আলোর বৃত্ত; বৃত্ত যতো বাড়ছে ততো ওর থেকে দূরে চলে যাচ্ছে ঋক; চারপাশে কেউ নেই, কিচ্ছু নেই, শব্দ নেই, বর্ণ নেই, গন্ধ নেই, অন্ধকার নেই, পলাশ ফুল নেই, পলাশ পাতা নেই, পার্ক নেই, বেঞ্চ নেই, হলুদ পোস্ট-ইটের গোছা নেই, ফাইল নেই, স্টোরি নেই, খবর নেই; ঋকের সর্বস্ব জুড়ে কেবল নেই, নেই; আর আলোর বৃত্তে মোড়া ইন্দ্রাণীকে ঘিরে ঘিরে ফুলের মতো থোকায় থোকায় নেমে আসছে, তোর আমি, তোর আমি শব্দগুচ্ছ।




বাঁশরির ডাকে কুঁড়ি ধরে শাখে,  ফুল যবে ফোটে নাই দেখা।
তোমার লগন যায় যে কখন,  মালা গেঁথে আমি রই একা।


আরো অনেকের কথা ভাবতে চেষ্টা করল ঋক, যাতে ইন্দ্রাণীর অসহ্য অনস্তিত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে পারে ও। ঘুরতে গেল পাটায়া। কিন্তু আরাম পেল না। নতুন কাজের খোঁজে গেল লস এঞ্জেলেস। ব্লুমস বার্গে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতে শুরু করল। তারপর মত বদলে চলে গেল ফিলাডেলফিয়া। গবেষণা শুরু করল।

বছর দশেক এভাবে কেটে গেল। ক্যাম্পাসে অনেক ছেলেমেয়ে এলো, গেল। মিশল ঋকের সাথে। কিন্তু ঋক মিশতে পারল না। দূর থেকে কলমচির চোখ দিয়ে দেখল, মন দিয়ে বুঝল। কিন্তু মিলে মিশে আত্মহারা হতে পারল না আর। ক্যাম্পাসে কানাকানি চলত, মুখার্জিস লোনার। 

কিন্তু বং-দের পিকনিক, থেকে দূর্গাপুজো, বার্বিকিউ থেকে ক্রিসমাস কিছুতেই ঋকের উপস্থিতির কমতি নেই। কারণ মন্দিরাদি। বয়সে ঋকের মায়ের সমান হলেও বং মহলে মন্দিরাদি সর্ব্বজনীন দিদি। তাঁর সূত্রেই ঋক প্রবাসী বাঙালি মহলে এসে পড়েছে। তার নিষ্প্রাণ সামাজিকতা আশেপাশের সবাই  টের পেলেও তাকে ঠাঁই দিতে কেউ কসুর করে না। তার মূলে ঋকের কলমের খ্যাতি নাকি মন্দিরাদির পক্ষপাত তা ঋক বুঝতে পারে না। প্রত্যেক বছর কলকাতা বইমেলায় মন্দিরাদির বই বেরোয় একটা করে। একটা প্রজন্মের দেশি ও প্রবাসী বাঙালি সাহিত্যিকদের মধ্যে মন্দিরাদিই সেতু। ঋক লেখক বলেই হয়ত মন্দিরাদির বিশেষ স্নেহের পাত্র সে। কিন্তু স্বভাবে তিনি ঋকের থেকে আলাদা। ভীষণ সামাজিক। কারণ তিনিই ফিলাডেলফিয়ায় বাসন্তী রঙের গাঁদা জড়ো করে সরস্বতী পুজো করেন। আবার দোল, দূর্গোৎসবের হোতাও তিনি। তাই ঋকের সাথে বং মহলের যোগাযোগের সেতুও তিনিই। অবশ্য মন্দিরাদির চারপাশে যে বং মহল তা তাঁরই হাতে গড়া। তাঁর বহুমূখী ব্যক্তিত্বের কারণে বা তাঁর অন্য মানুষের সঙ্গে চট করে মেতে উঠতে পারার গুণেই মানুষকে তিনি অনায়াসে কাছে টেনে নেন। আর প্রবাসে এমন করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভাবে হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মতো স্বজন পাওয়া ভার। তাই তিনি সবার কাছের লোক।

আশ্চর্যের বিষয় হলো একাকাঙ্খী ঋকও মন্দিরাদির কাছে স্বছন্দ, ভানহীন, স্বতঃস্ফূর্ত। বলা যায় তিনিই ঋকের নির্জন প্রবাসের একমাত্র স্বজন। সে কথাটা ঋক প্রথম বুঝতে পারলো তখন যখন পড়ানোর কাজ পেয়ে ফিলাডেলফিয়া থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে কানসাস সিটি যাওয়ার সময় এলো। কিন্তু বেকারত্ব কিংবা ছাত্রদশা দুটোর থেকেই কাজটা তার কাছে বেশি লোভনীয়, জরুরিও। তাই সে চলল আবার নতুন শহরে। 

কানসাস সিটিতে এসে প্রথম একলা অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিল ঋক। এবং প্রথম আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টের পেল বয়সের ছাপ। কে জানে এর আগে একগাদা বিভিন্ন বয়সী ছাত্রদের সাথে ডর্মে থাকত বলে হয়তো বয়সটা সব সময়ই ছাত্রবয়সে আটকে থাকত। কিংবা বয়সের বাড়কে যতটা জায়গা দিতে লাগে, ততটা জায়গা এতোদিন ঋক নিজেকে দিতে পারে নি। 

চুলের রুপোলির থেকেও বেশি চোখে পড়ে দুবাসি দাড়ির সাদা ছোপ। মন্দিরাদিকেই মনে পড়ে যায় আবার। যেহেতু তিনিও ছাত্রী ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে, তিনি ঋকের হালহদিস জানতেন খুব ভালো করে। ঋকের তিন আর চার নম্বর গার্লফ্রেণ্ডের মাঝের ফাঁকা সময়টায় বলেছিলেন, অমর হবি কী করে? এভাবে ঘাটা-আঘাটায় ভাসলে, নোঙর ফেলার দরকার টের পাবি না, কিন্তু পিতৃত্ব তো প্রাকৃতিক, প্রকৃতি যেদিন চাইবে তোকে বাপ বানাতে, তোকে দিয়ে সন্তান চাওয়াবে, সেদিন কিন্তু তোর ক্ষমতা নাও থাকতে পারে। 

ঋককে সেদিন ছোঁয় নি কথাগুলো। আজ মনে পড়ল। মার্কেজের মত মানলে ঋক এখন সেই বয়সে যে বয়সে সব পুরুষকেই তার বাবার মতো দেখায়।

কিন্তু ঋক তো স্থায়ী সম্পর্ক বা চিরন্তন নারী কিছুই খোঁজে নি। খুঁজেছে উচাটনের উপলক্ষ্য। ইন্দ্রাণীর মতো। যার গোলাপ পাপড়ির মতো ঠোঁটটা পেনসিলে, রঙে, তুলিতে ফুটিয়ে নিয়ে বার বার তর্জনী দিয়ে ছুঁলেই শিহরণ; কিন্তু আসলে ছোঁওয়া যাবে কিনা সেটা অনিশ্চিত। সেই অনিশ্চয়তা আর ফিরে এলো না। 

দেবারতির শাঁখের মতো স্তন মধ্যমা-তর্জনীর আদরে শক্ত হয়ে উঠলে মাছের শরীরের মতো চোখ আঁকার আনন্দ ছিল, দেবারতির নাভিতে ছিল দেশকাল চাদরের মধ্যে দিয়ে মাধ্যাকর্ষণের তীব্রতায় অন্ধকূপে তলিয়ে যাওয়ার বিলাস। 

কিন্তু ইন্দ্রাণীর ভর্ৎসনাতে মগজের কোণে আলো ঝলমল করে ওঠার যন্ত্রণামেদুর তীব্র সুখ যেভাবে শরীর-মনে ছেয়ে যেত, তার প্রত্যাখ্যান জীবনকে যেমন উপলব্ধির উদ্বোধন দিয়েছিল, তেমনটা দেবারতি কেন কারও সঙ্গমই দিতে পারে নি। 

ইন্দ্রাণীর নামটাতেই একটা গম্ভীর অহংকার ছেয়ে থাকে, যেটা মনে পড়লে যন্ত্রণায় মগজ কুঁকড়ে ওঠে, হাহাকারে মন কাতরে ওঠে, অমোঘ আকর্ষণে মন শিউরে ওঠে। তাই সেই শেষ কৈশোরে, যৌবনের তোরণদ্বারে যেমনটা হয়েছিল তেমন নেশা আর হলো না। 

অথচ সেদিন ইন্দ্রাণী একটা সম্পর্ক বানাতে দিলেও সেই নেশা কেটে যেত হয়ত। এতোগুলো বছরে ঋক তো তাই দেখল যে সম্পর্ক - যেকোনো সম্পর্ক - স্থায়ী, চিরন্তন কিছু হয় না; নতুন হয়, পুরোনো হয়; হয় মধুর বা বেদনাবিধুর; তিক্ত কিংবা রিক্ত, মুক্ত হয় না।

আপাতত পেটের চর্বিটায় চোখ টাটাচ্ছে ঋকের। শহর বদলের হিড়িকে মাসদুয়েক জিমে যাওয়া হয় নি। ঝটপট তৈরি হয়ে গেল সাঁতারে। পুল থেকে উঠে রোবটা গায়ে জড়ানো মাত্র রোব পরা একটা মেয়ে এসে বলল, হাই মুখার্জি, আমি ক্যাথেরিন। আমিও এম্পোরিয়াতে সাহিত্য পড়াই। 

ঋক এরকম খেজুরে করতে কোনো আমেরিকানকে দেখে নি। কোনো মতে বলল, হেলো, হাউ আর ইউ ডুয়িং? 

এর একটাই জবাব হয়। ক্যাথিও সে জবাবটাই দিল, ফাইন। 

তারপর বলল, আসলে আমি প্রাচ্যের যত লেখক ইংরেজিতে লেখেন তাঁদের সাহিত্যকাল নিয়ে একটা গবেষণা করছি। তোমার লেখা সবেমাত্র পড়ছি। তুমি এম্পোরিয়া আসছ শুনে খুব অবাক হয়েছিলাম। তবে পুলে তোমায় দেখার চমকটা আরও ভয়ানক। 

এমন একটি আলাপি মেয়ে অবশ্যই এরপর অনেকবার ঋকের সাথে কফি খেতে গেল। ঋক নিজের গাড়ি কেনা অবধি তাকে নিজের গাড়িতে চাপিয়ে ইউনিভার্সিটি নিয়ে গেল এবং সেখান থেকে নিয়ে এলো; ঋকের বেঁচে থাকার জন্য যা যা প্রয়োজন মুদিখানা, ওষুধ, জামাকাপড়, আসবাব সবকিছুর জোগাড়যন্তরে হাত লাগাল। ফলে দুজনের মধ্যে সখ্যতা গড়ে উঠতে খুব সময় লাগল না।

বছরখানেক ঘুরতেই দুজনে বুঝল যে এতোটা সময় ওরা একসাথে কাটায় যে দুটো আলাদা অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া গোণা, ইউলিটি বিল দেওয়া অনর্থক। দুজনে একটা ডাবল রুম অ্যাপার্টমেন্টে বাস করতে শুরু করল। ঘরের কাজও ভাগ হয়ে যাওয়ায় দুজনেই খুব খুশি হল। ক্রমে ক্রমে দুজনে জানল সাহিত্যের বাইরে দুজনের জীবনের অনুষঙ্গগুলো। জানতে জানতে একদিন ঋকও জেনে ফেলল যে তাদের সম্পর্ক থেকে ক্যাথি বিয়ে চায়, সন্তান চায়, নিটোল সংসার চায়। ঋক বলে ফেলল, তুমি তো আমার সঙ্গে তাও এক বছরের বেশি কাটালে, প্রায় দুবছর চেনো আমাকে তাই না? 

ক্যাথির উত্তরের অপেক্ষা না করেই আবার বলল, সব মেয়েই একরকম। ওয়ান-নাইট-স্ট্যাণ্ড না হলে, একবার না একবার তারা কমিন্টমেন্ট চাইবেই; এমনকি যে মুখে বলে, হয়তো বা মনে মানেও, যৌনজীবন তার কাছে খেলা কিংবা নগণ্য প্রয়োজন মাত্র, সেও একদিন শরীরের প্রয়োজন মিটে গেলে পর স্থায়ীত্ব, পরিণতির কথা তোলে। 

ঋক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অনেকক্ষণ চুপ থেকে ক্যাথি বলল, আমি ওহায়োর গ্রামে বড়ো হয়েছি, খুব রক্ষণশীল পরিবেশে। আমি প্রেম-বিয়ে-সন্তান শুদ্ধু সংসারে আস্থা রাখি, বিশ্বাস রাখি। তুমি রাখো কিনা না জেনেই ভেবে এসেছি তুমি আমাকে এসব দেবে। 

গলার কাছে পাকিয়ে ওঠা কান্নাটা ক্যাথি গিলতে লাগল। ঋক বলল, আমাদের সম্পর্কটা নিশ্চয়ই প্রেম। কিন্তু বিয়ে-সন্তান এসব তো প্রেম না থাকলেও হয়, তাই না? আমাদের প্রেমের সাথে আর পাঁচজনে প্রেম ভেবে যা যা করে সেসব গোলাচ্ছ -  

ঋককে থামিয়ে শান্ত, দৃঢ় স্বরে প্রশ্ন করল ক্যাথি, আর পাঁচজনে প্রেম বলে যা যা করে সেটা তো তুমি করো নি, তাহলে জানলে কী করে যে সেটা প্রেম নয়? 

চুপ করে গেল ঋক। ক্যাথি আবার বলল, তুমি কিছু সাহিত্য পড়েছ, কিছু দর্শন, কিছু বিজ্ঞান কেউ বলেছে তোমাকে যে কাকে বলে প্রেম?” 

ঋক এতোক্ষণে একটা উত্তর জানা প্রশ্নের মুখে পড়েছে এমনভাবে বলে উঠল, প্রেমে শরীরি অনুভূতি থাকে অবশ্যই, তবে শারীরিক সম্পর্ক মাত্রই প্রেম নয়। 

ক্যাথি বলল, একথা তুমি কোনো দর্শনে পড়েছ, কিন্তু বিজ্ঞান একেই প্রেম বলে। 

ঋক বলল, প্রেম অনেক ব্যপ্ত বিষয়, তা অবশ্যই মনের চোখ খুলে দেয়। 

ক্যাথি প্রশ্ন ছোঁড়ে, রাতারাতি? 

ঋক বলে, বেশ বিরক্তি নিয়েই, ক্লিশে, এসব নিয়ে অনেক কথা পৃথিবী জুড়ে চলেছে তো চলেছেই। 

ক্যাথি ধীর গলায় যোগ করে, কিন্তু সন্তোষজনক কোনো সংজ্ঞা, সিদ্ধান্ত, তত্ত্ব কেউ এখনো দিতে পারে নি। সমস্ত হয় আর নয় আমরা বুঝি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাজাত দৃষ্টিকোণ দিয়ে। এ সমস্ত কিছুই আপেক্ষিক, আলাদা। তুমি প্রেম বলতে যা বোঝ তা তোমার একার। আমার বোধ একা আমার। তুমি সন্তান চাওনা, বিয়ের দায়িত্বে ভয় পাও এসব কথা আর কোনোদিন উঠবে না

তবুও ক্যাথি কেন রয়ে গেল ঋকের সাথে ঋক বোঝে নি। ঋকের ইচ্ছায় কিংবা ক্যাথির ইচ্ছেয় দুজনে একঘরে শুলেও ক্যাথি বুঝত না কেন ঋক একসাথে শুতে চাইল, অথবা কেন তাকে ঋক প্রত্যাখ্যান করে বারবার, কখনও কখনও প্রত্যাখ্যানের পরেও কেন স্বমেহন সিক্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে ঋক; আর কেনই বা এসব রাতে ক্যাথির দুঃখ তার ঘুমটুকুকে তাড়িয়ে দেয়। 

কোনো শর্ত নেই বলে ঋক অন্য মেয়ের সাথে সম্পর্ক বানাতেই পারে। কিন্তু ক্যাথি চোখ-কান খোলা রাখে, তাই জানে তেমন কিছুই ঘটে নি। আস্তে আস্তে দুজনের মধ্যে অনেক নতুন বোঝাপড়া তৈরি হয়ে চলে; আর অন্য অনেক পুরোন বোঝাপড়া দূর্বোধ্য হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু শুরুর দিকের সম্পৃক্ততা ফিরে আসে না। 

দুজনেই বুঝে ফেলে ঋকের কাছে, হয়তো ঋকের মতো আরও অনেক মানুষের কাছে, সম্পর্ক আর বই একরকম। মোড়ক খুলে নতুন বইয়ের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে না-পড়া কড়কড়ে পাতা থেকে তথ্য-উপলব্ধি-জ্ঞান একটু একটু করে সেঁচে নেওয়া হয়; তারপর অন্য বই হাতে এলে, বা বইটা একঘেয়ে হয়ে গেলে, বা বইটার মধ্যের সবটুকু উপাদান বোঝা হয়ে গেলে বইটা তাকে পড়ে ধূলো খায়; তারও পরে বইটা থেকে নিয়মিত ধূলো ঝাড়া হয় বা হয় না; বইটার নির্যাস সবটুকু নিতে বাকি থাকলে বইটা হয়তো তাক থেকে নামে, আঙুলে লাগা ধূলো থেকে হয়তো বা কিছু বিরক্তি জমে, অনেকদিন না পড়া কোনো পাতা উল্টে ধূলোর গন্ধ পাওয়া যায়, বইটাকে কোনোভাবেই আর নতুন লাগে না, আকর্ষণীয়ও লাগে না; তবুও প্রয়োজনে যেটুকু দেখতে হয় শুধু সেটুকুই দেখা হয়।

এশিয়ার দক্ষিণপূর্বে একটা সম্মেলন সেরে ফেরার পর ক্যাথি টেক্সাসের অস্টিনে চলে গেল। ঋককে দিয়ে গেল বাকি বছরের বাড়িভাড়ার আধখানা। 


এসো এসো এসো আঁখি কয় কেঁদে।  তৃষিত বক্ষ বলে রাখি বেঁধে
   যেতে যেতে, ওগো প্রিয়,  কিছু ফেলে রেখে দিয়ো
        ধরা দিতে যদি নাই রুচে।


ক্যাথি যে এক্কেবারে চলে গেছে সেটা ঋক টের পেল ফোন-ইন্টারনেট কাটা পড়তে। ক্যাথিই সমস্ত মাসকাবারি লেনদেন খেয়াল রাখত। পরের ইউরোপ ট্যুরে যাওয়ার সময় বাক্স বাঁধতে হিমশিম খেল ঋক। মোজা, টুপি, জ্যাকেট যাও বা আছে, নেই কোনো রুমাল। রুমাল ছাড়াও নতুন স্যুট লাগত। সম্মেলনে বক্তৃতা করার সময় পরতে হবে বলে। কেনার সময় সঙ্গে যাওয়ার কেউ নেই। মাঝে মাঝে মাথাটা গরম হয়ে যাচ্ছে। রাগ হচ্ছে ক্যাথির ওপর। কিন্তু দুজনের কেউই তো একে অপরের কাছে দায়বদ্ধ নয়। তাই রাগ দেখাবারও কোনো উপায় রইল না। ধীরে ধীরে ক্যাথিকে ছাড়া দিনযাপণে ঋক অভ্যস্ত হয়ে উঠতে লাগল।

ইউরোপ থেকে ফিরে খবর পেল, ক্যাথি আসছে এম্পোরিয়াতে, গবেষণাপত্র পড়তে। ঋক ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়ল। বুঝে উঠতে পারল না কী করা উচিৎ। এবং ক্যাথি এসে পৌঁছে গেল। অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও ক্যাথি থাকল না ঋকের সাথে। উঠল হোটেলে। অনেক অনুনয়ের পর সে রাজি হলো ঋকের সাথে একদিন দুপুরে খেতে যেতে। ঋক শুধু দুজনের ভালোলাগাটুকু মনে রেখে, বন্ধুত্বটুকু রাখতে চেয়ে ডেকেছিল ক্যাথিকে। ক্যাথিও কেবল গবেষণার কথা, ঋকের লেখালিখির কথা এসবই বলছিল। কিন্তু ওঠার মুখে কী যে হলো! ঋক বলে ফেলল, শিখছি কী করে তোমাকে ছাড়াও বাঁচা যায়। 

উত্তরে ক্যাথি বলল, আমিও শিখলাম, পুরুষ ছাড়া সন্তান ধারণ করতে। 

ঋক শিউরে উঠল, তুমি ডোনারকে চেন? 

ক্যাথি প্রতিপ্রশ্ন রাখল, অনেক মিশেও কী সবকটা মানুষকে সম্যক বুঝেছ? 

ঋক বলল, কেবল তর্ক করো। পরে কোনো বিপদ হলে? 

একটু থেমে, আবার বলল, আমাকে একবার জিজ্ঞেসও করলে না এতো বড়ো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে? 

ক্যাথির চোখে একটু আগুন এসেই সরে গেল। চোখে, ঠোঁটে হাসি মাখিয়ে সে বলল, বললে কী তোমার বীজ দিতে না বিয়ে করতে আমাকে? 

তারপর আবার বলল, তোমার পার্সোনাল মেলবক্সটা দেখো, তিন মাস ধরে মেল বাউন্স করায়, অটোমেটিক্যালি ফুল মেসেজ আসায় হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম তোমার পরামর্শের। একথা নিশ্চয়ই সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে বলতাম না। 

একটু থেমে আবার বলল, চার বছর তো ছিলাম একসাথে। প্রথম তিন মাসের পর আর কবেই বা আমরা ঘনিষ্ঠ হয়েছি? 

একটু থেমে সে আবার বলল, তাছাড়া কতো অপেক্ষা করব? তোমার মত বদলের আশায় আড়াই বছরের বেশি ছিলাম তোমার কাছে। তুমি যেমন চিরন্তন নারী খোঁজো নি, আমিও তেমন অনন্তকাল অপেক্ষায় কাটানোর কথা ভাবি না। তাছাড়া মনে হয়েছিল, আমি তোমার নতুন সম্পর্ক তৈরির ব্যাপারে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছি। 

হাঁ-হাঁ করে উঠল ঋক, এসব কী কথা! বন্ধু বলেও কি আমি - 

ওকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে ক্যাথি বলল, মা হওয়াটা আমার বায়োলজিক্যাল অধিকার। তেমনই কে হবে আমার সন্তানের বাবা সেটা সিদ্ধান্ত নেওয়াটা আমার বায়োলজিক্যাল স্বাধীনতা। তাও যদি আমি অস্টিন যাওয়ার আগে তোমার বন্ধুত্বের কথা ভাবতে - 

হঠাৎ থেমে যায় ক্যাথি। ঋক জানতে চায়, তাহলে কী? 

ক্যাথির চোখের কোণের চিকচিকে জলটুকু ডানহাতের তর্জনীর আগায় নেয় ঋক। ক্যাথি বলে, আজ আর এসব কথার কোনো মানে নেই। শুধু সময় নষ্ট

পরদিন ক্যাথি চলে গেল ফিলাডেলফিয়ার পথে। অস্টিন ফিরতে ওর কদিন বাকি জানে না ঋক। ইন্দ্রাণীর কথা ভাবলেই দেখতে পায় একটা অন্ধকার চোঙ, যার চওড়া মুখটা মাটিতে আর শীর্ষটা আকাশে, সেটা ক্রমশ গাঢ় থেকে গাঢ় হচ্ছে, আর চওড়া হচ্ছে। 

অস্টিনে একটা কাজ জুটিয়ে নেয় ঋক, ইউনিভার্সিটিতেই, অনুবাদকের, অধ্যাপনার সু্যোগ নেই বলে। তারপর মন্দিরাদির সাথে কথা বলে জানতে পারে ক্যাথেরিন আরও পনের দিন ফিলাডেলফিয়াতে থাকবে। তিন-চার দিনে পৌঁছনোর ঝুঁকি নিয়ে গাড়িতেই ফিলাডেলফিয়ার দিকে রওয়ানা হয়ে যায় ঋক।




 

Tuesday, April 22, 2025

Walmart Visitor Center - 4

 খরচা কমান ভালো থাকুন



ওয়ালমার্টের সাফল্যের মূলে আছে উদ্ভাবনী। মুদির দোকান চালানোর জন্য কেউ আগে যা করে নি, সেই সব কান্ড ভাবা এবং করে ফেলা। মুদির দোকানে নিত্য প্রয়োজোনীয় জিনিসের ঘাটতি থাকলে ক্রেতা ফিরে যায় এবং দোকানের ক্রেতার সংখ্যা আর বিক্রি কমে যায়। আবার ওয়ালমার্টের দোকান ছিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোটো ছোটো মফস্বলী আর গ্রামীন জনপদে যেখানে সাকুল্যে পাঁচ হাজার মানুষ থাকে। তাই জিনিসপত্রের যোগান অব্যাহত রাখতে ওয়ালমার্ট আশির দশকেই নিজেদের সমস্ত দোকানকে স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থায় জুড়ে ফেলেছিল। আজও ওয়ালমার্টের দোকান ছোটো শহরেই দেখা যায়। জনবহুল বড়ো শহরে এই দোকান প্রায় নেই বললেই চলে।

ওয়ালমার্ট ভিজিটর্স সেন্টারের সব থেকে মজার দ্রষ্টব্য কিন্তু তিনটি ফেরত মাল। তার মধ্যে একটা পেন্সিল শার্পনার যেটা ফেরত হয়েছিল যে সেটা দিয়ে কালির কলমকে ধারালো করা যায় না বলে, আরেকটা হলো একটা হ্যান্ড মিক্সার যেটা ফেরত হয়েছিল ভুতুড়ে বলে। আর আছে লিক করার কারণে ফেরত হওয়া স্ট্যানলি কোম্পানির একটা ভ্যাকুয়াম বোতল যেটা তৈরি হয়েছিল ১৯৫৪ সালে, ১৯৬২ সালে ওয়ালমার্ট তৈরি হওয়ার আট বছর আগে। 




ভিজিটর সেন্টারেই স্মারক পাওয়া যায় মিনিয়েচার ওয়ালমার্ট ট্রাকের, মেকানিক্যাল ক্যাশ রেজিস্ট্রারের, কোকাকোলা ও অন্যান্য পুরোনো পানীয়ের বোতলের, বিগত দশকের রাধুনীর অ্যাপ্রন আর নানান টুকিটাকির। দর্শকদের জন্য ভিজিটর সেন্টারের দরজা খোলা সোম থেকে শনি সকাল সাড়ে ছটা থেকে রাত নটা আর রবিবারে দুপুর বারোটা থেকে বিকেল পাঁচটা। মিউজিয়ামটি ঘুরে দেখে বেশ টের পাওয়া যায় শুধু মুদির ব্যবসা নয়, বিশ শতকের মফস্বলী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জীবনযাত্রার বিবর্তন। মিউজিয়ামটি শুধু ওয়ালমার্টেরই নয়, সমগ্র মার্কিনি মফস্বলী জীবনের সংগ্রহশালা।





After thoughts:

  1. Will the new US levies on imports from China raise the price of the goods of daily necessities? 

  2. Or, has the Us already started production of goods of daily necessities with the help of AI, automation and robotics at a cheaper cost than the cost of manufacturing in China (including Taiwan)? 

  3. Or, would the new US levies on imports from China would just balance out the cost of production with new automation technology with AI powered robotic tools? 

  4. Or, these levies would give a path to worldwide marketing of new automation technologies with AI powered robotics?



Sunday, April 20, 2025

Walmart Visitor Center -3

 খরচা কমান ভালো থাকুন



সাতের দশকেই সমস্ত দোকানের পরিচালন ব্যবস্থা দক্ষ এবং দ্রুত করার জন্য ওয়ালমার্ট সাহায্য নিয়েছিল কম্পিউটারের। সেকালের সেই বৃহৎ যন্ত্রটার ছবিও রয়েছে মিউজিয়ামে। ছবি রয়েছে স্যাম ওয়ালটন ব্যবহৃত ছোট্টো এরোপ্লেনটির, কোম্পানি একশো বিলিয়ন ডলার রোজগার করার পর ওয়াল স্ট্রীটে স্যাম ওয়ালটন প্রতিশ্রুত হুলা নাচের। ছবি রয়েছে সাতাশটা আলাদা আলাদা দেশে ছড়িয়ে পড়া বিশাল সংস্থাটির নানান দেশে কর্মকান্ডের ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার, পরিবেশ সংরক্ষণ প্রয়াসের, সামাজিক দায়িত্ব পালনের। 



কিন্তু উৎকর্ষের এই যাত্রা কিছুমাত্র মসৃণ ছিল না। ওয়ালমার্টের সংখ্যা সতের ছাড়াতে স্যামপত্নী হেলেন চেয়েছিলেন যেন দোকানের সংখ্যা আর না বাড়ে। কিন্তু ছিল আত্মীয়-বন্ধু ইত্যাদি লগ্নিকারদের তুষ্টি সাধনের আর ব্যাঙ্কের ধার শোধার দায়। একটা সময় অ্যারক্যানস, ওকলাহোমা, মিসৌরি আর টেক্সাসের উত্তরে ডালাস অবধি নানান ব্যাঙ্কে স্যাম ওয়ালটনের ব্যক্তিগত দেনা দাঁড়িয়েছিল আকাশছোঁয়া। 


তার থেকে নিস্তার পান কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে। ফলে বাড়ে মুনাফা বাড়ানোর চাপ, দোকানের সংখ্যা বাড়ানোর চাপ। ফলে তিনি একটা পুরোন প্লেন কিনে ফেলেছিলেন, সারাদিনে অনেকগুলো দোকান যাতে ঘুরেফিরে দেখতে পারেন সে জন্য। আর তাছাড়াও সস্তা জমির খোঁজ করতে সুবিধে হবে বলে। 

মুদি ব্যবসার প্রথম পাঁচ বছরেই খুব চড়া মূল্য দিয়ে ওয়ালটনরা জেনেছিলেন যে দোকানঘরের মালিকানা তাঁদের নিজেদের হওয়াটা জরুরি। তাই মফস্বলের ফাঁকা জমি দেখে সেখানে নিজেদের দোকান বানানো যাবে কিনা তার পরিকল্পনা করার জন্যই নিজের এয়ারপ্লেনকে যথাসম্ভব নিচু দিয়ে ওড়াতেন স্যাম। এভাবেই ওয়ালমার্ট ছড়িয়ে গিয়েছিল জনপদ থেকে জনপদে সস্তা দ্রব্য আর সন্তোষজনক পরিষেবার লক্ষ্য নিয়ে।



মিউজিয়ামে রাখা আছে বিভিন্ন সংবাদপত্রে নানা সময়ে প্রকাশিত ওয়ালমার্ট ও স্যাম ওয়ালটন সম্পর্কিত নানান খবরের সংগ্রহ। অধিকাংশ খবরেরই উপজীব্য হলো যে স্যাম ওয়ালটন ছিলেন মধ্যবিত্ত মার্কিনির আদর্শ ব্যক্তিত্ব। ওকলাহামার প্রত্যন্ত অঞ্চলে জন্মে, গভীর দক্ষিণের ফ্লোরিডা বা দক্ষিণের মিসৌরির নানা মফস্বল শহরে ঘুরে ঘুরে বেড়ে উঠে, মন্দার তিরিশের দশকের অভাব অনটন আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আঁচ সয়ে, মুদির ব্যবসায় কোটিপতি হয়েছিলেন স্যাম ওয়ালটন ও তাঁর ওয়ালমার্ট। মার্কিন মফস্বলের স্বপ্ন সফল হয়েছিল। আবার কিছু সংবাদপত্রে যে নিন্দে করা হয়েছিল কোটিপতি ব্যবসায়ী নিজের দোকানের সস্তা জামা গায়ে দেন বা পাড়ার সেলুনে চুল কাটেন সস্তায়, স্পোর্টস কার নয় নিতান্ত সাধারণ মজুরের পিক আপ ট্রাক চড়েন বলে সেসবও সাজিয়ে রাখা আছে মিউজিয়ামে।





(চলবে)



Readers Loved