Monday, September 23, 2024

JPDA - Chapter 48

 ৪৮. মিটিং-এর আগে



সেই রাতেই সাও মু বা’অ্যানের ম্যানেজমেন্ট টিমকে ফোন করে একটা কনফারেন্স করে নিলো। অল্প কথায় সকলকে বুঝিয়ে বললো শিন ছির প্রস্তাব। এক এক করে সবাই পর পর, নিজেদের মতামত জানালো।

“বিবিজির এসিয়া-প্যাসিফিক বিভাগের খুবই নামডাক আছে। যদি ওরা নিয়ে নেয় কোম্পানি, ওরা হয়তো ভবিষ্যতে নিয়ে নেবার কথাও ভাবছে। তেরো কোটির কথা না হয় বাদই দিলাম। আর দামটাও খারাপ নয়।” বললো ইয়ান চেং লি, “কিন্তু ম্যানেজমেন্ট টিমের অংশীদারী শুধু তেইশ শতাংশ - এটা একটু কম হয়ে যাচ্ছে। তুমি কী ওর সাথে আবার কথা বলতে পারবে? আমার মনে হয় পঁচিশ বা ছাব্বিশ শতাংশ হলে যথেষ্ট হয়।”

“এটা ওঁর শেষ কথা।”

“আমার মনে হয় ছাব্বিশ শতাংশও কম।” বললো হে হাই শিয়াং, “চূড়ান্ত বিশ্লেষণে দেখা যায় যে ম্যানেজমেন্ট টিমটাই কোম্পানির সমস্ত কর্মকান্ডের মেরুদন্ড, সেটা তো কোনো একবারে চুকে যাবে এমন ব্যাপার নয়। তাদের জন্য যথেষ্ট উৎসাহব্যঞ্জক কিছু নেই এই প্রস্তাবে। ফলে কেউই লড়াইটা করতে চাইবে না। আমি বলব আটাশ থেকে তিরিশ শতাংশ অংশীদারী। কার কাছে এই অংশীদারী চাওয়া হচ্ছে তাতে কিচ্ছু যায় আসে না। তোমার এই সংখ্যাগুলোই বলা উচিৎ।

“অন্য দুটো ব্যক্তিগত লগ্নিকারী আমাদেরকে কতো অংশীদারী দিচ্ছে?” জানতে চাইলো মিন হুয়ে।

“আটাশ শতাংশ।”

মিন হুয়ে ভাবতে লাগলো ব্যাপারটা নিয়ে। ম্যানেজমেন্ট টিমের জন্য পাঁচ শতাংশের পার্থক্যটা বড়ো পার্থক্য।

“আমি জানি না, হেডকোয়ার্টার্স কতো দাম আশা করছে।” বললো সাও মু, “হে জঁ, আপনি কী খোঁজখবর করতে পারবেন এ ব্যাপারে?”

“আমি চেষ্টা করেছি। কাজটা বেশ কঠিন।” বললেন হে হাই শিয়াং, “আমি কাই বিং জিয়েকে চিনি। যাঁরা বিক্রির জন্য কাজ করছেন, তাঁদের দলের নেতা। ওঁর পেশাদারী দক্ষতা আর্থিক ব্যবস্থাতে। কিন্তু মুখটা একদম বন্ধ। উনি খুব অভিজ্ঞও। ওঁর কাজই হলো সমস্ত ক্রেতাকে নিলামে অংশ নিতে উৎসাহিত করা। যতো লোক ওঁর সাথে যোগাযোগ করে ততোই ভালো। যদি তুমি কিছু জানতে চাও, তাহলে ওঁর উত্তর খুব গুরুত্ব দিয়ে নেওয়া যাবে না। বিশেষত, জিএস১.০ ঘোষণা করার পর আর্থিক পরিস্থিতি হেডকোয়ার্টার্সের অনুকূলে তাই ওঁর এখনকার কৌশল হলো চুপচাপ অপেক্ষা করা, সঠিক দরের জন্য।”

“আগামী কাল যে দুজন বিনিয়োগকারীর সঙ্গে কথা বলতে যাচ্ছো, তাঁদের মনোভাব কী?” প্রশ্ন করলো শু গুয়াং জিয়াঁ।

“দুজনেরই মনোভাব ইতিবাচক, তবে সবই নির্ভর করছে ওঁরা কী শর্ত দেন তাঁর ওপরে —-” জানালো সাও মু, “এই দুটো কোম্পানির কোনোটাই বিবিজির মতো বড়ো নয়। আর এঁদের অতো নামডাকও নেই শিন ছির মতো। আমি এঁদের সাথে আগেও যোগাযোগ করেছি, এঁরা খুবই বাস্তববাদী আর এঁরা কথার খেলাপও করেন না। এঁরা বলেছেন যে এঁরা পরে আমাদেরকে আমাদের মতো ছেড়ে দিতে ইচ্ছুক যাতে আমরা স্বাধীনভাবে এগোতে পারি। তা বাদে যে পরিমাণ লগ্নি আমরা চাইছি, সেটাও খুব বেশি নয়। আমার মনে হয় এঁদের সাথে বোঝাপড়া হয়ে যাবে। — যদি নাও হয়, বিনচেং-এর অনেকগুলো লগ্নি কোম্পানি আছে যাঁরা উৎসাহ দেখিয়েছে। এখানে কোনো রফা না হলে, ফিরে যাবো, গিয়ে ওঁদের সাথে কথা চালিয়ে যাবো।”

“তোমরা কী একটা কথা ভেবেছো?” বলে উঠলো ইয়ান চেং লি, “আমরা যদি বিবিজির সাথে আজ করি, তাহলে আমাদের শুধু শিন ছির সাথে বোঝাপড়া করতে হবে। আমরা যদি তিনটে আলাদা আলাদা কোম্পানির সাথে কাজ করি, তাহলে আমাদের তিনটে আলাদা লোককে জবাবদিহি করতে হবে। প্রত্যেকটা লোকের মেজাজ-মর্জি আলাদা আলাদা। যদি ওঁদের মধ্যে কোনো বিরোধ হয়, সেটা আমাদের জন্য ঝামেলার হয়ে যাবে। যদি যোগাযোগ রাখার খরচের দিকটা দেখি, তবে আমার ভোট যাচ্ছে বিবিজির দিকেই। আর্থিক পরিস্থিতি প্রায় রোজই বদলে যাচ্ছে, তাও শিন ছির সুনাম একটুও কমে নি ইন্ডাস্ট্রিতে। তাছাড়া, ও ইচ্ছে দেখিয়েছে যে পুরোটা ও একাই ব্যবস্থা করবে ওর সাহস আর মনোভাব দিয়ে। এটাই সব এখানে।”

“শিন ছি বিশ্বাসযোগ্য, আমি হলফ করে বলতে পারি।” মিন হুয়ে বলে উঠলো, “ভরসার যোগ্যও বটে।”

“ভরসার যোগ্য, কিন্তু কিপ্‌টে। তেইশ শতাংশ? বড্ডো ঝামেলার। দরকার নেই, চলো।” হে হাই শিয়াং-এর গলার স্বরে জোর ছিলো, “কেক একটাই, ও এক কামড় কম খেতে পারে না? আমাদের আরেকটু দিতে ক্ষতি কী? যাই হোক, আমরাই জোয়ালটা বইবো আর ওকে পয়সা রোজগার করতে সাহায্য করবো। এই তেইশ শতাংশে, আমি জোরের সাথে আপত্তি জানাচ্ছি।”

“তাহলে চলো ভোট নি। বিবিজি আমাকে শুধু মাত্র আজকের রাতটা দিয়েছে ভাবার জন্য।” সাও মু নিজের ঘড়িতে দেখলো, “এখন প্রত্যেকে নিজের নিজের মতামত জানাও।”

মিন হুয়ে জানালো, “উও থোঙ্গি।”

“উও বু থোঙ্গিয়া” বললো হা হাই শিয়াং।

“উও য়িএ বু থোঙ্গি।” বললো শু গুয়াং জিয়াঁ।

“উও থোঙ্গি।” বললো ইয়ান চেং লি।

দুই পক্ষে, বিপক্ষে দুই, সবাই অপেক্ষা করে আছে সাও মুয়ের জন্য।

“আমিও সমর্থন করি না।” 

শেষে সাও মু বললো, “তিন বিপক্ষে, দুই পক্ষে। আমি কাল ফোন করে জানিয়ে দেবো শিন ছিকে যে ওঁর প্রস্তাব আমরা গ্রহণ করছি না। মিন হুয়ে, কাল তোমাকে আসতে হবে আমার সাথে ঐ দু জন বিনিয়োগকারীর সঙ্গে কথা বলার জন্য। আজ যে রিপোর্ট আমরা দিয়েছি, সেটাই কাল ওঁদের দুজনকে আবার দিতে হবে।”

“কোনো অসুবিধে নেই।” জানালো মিন হুয়ে।

“মিটিং শেষ। ওয়া আ’ন সকলকে।”

***

ঘরে ফিরে এসে মিন হুয়ে তাড়াহুড়ো করে চান করে নিলো এটাই ভাবতে ভাবতে যে ব্যপারটা বোধ হয় ভালোই হলো যে ম্যানেজমেন্ট টিম কাজ করতে চাইলো না শিন ছির সঙ্গে। এখনো ওর আর শিন ছির মধ্যে অনেকগুলো অস্পষ্ট জট রয়ে গেছে। যদি একজন ঊর্ধতন আর অপরজন অধস্তন হিসেবে কাজ করতো, তবে ঐ সব জটিল আবেগ নিয়ে কাজ করা মুস্কিল হতো। শিন ছির প্রস্তাবটা সেরা নয়, কিন্তু খারাপও নয়। তেরো কোটি খুব কম নয়, হয়তো টাকাটা অন্য কাউকে দেওয়াও হবে না। আর টাকাটা তুলে আনতে অনেক পরিশ্রমও করতে হবে। ও যে রকম ঝট করে টাকাটার কথা বললো, যাই হোক, এটা এরকম সাহায্যই। 

সারা রাত ট্রেনে বসে, এক ঘন্টা ধরে একটা রিপোর্ট দিয়ে, মিন হুয়ে একটু যেনো ক্লান্তই হয়ে পড়েছে। বিছানায় শুয়ে ও যে পিপিটিটা মিটিং-এর জন্য তৈরি করেছে সেটা দেখছিলো।

ঝিমোতে ঝিমোতে ও প্রায় ঘুমিয়েই পড়ছিলো, এমন সময়ে ওর ফোন বেজে উঠলো খুব জোরে। ডিসপ্লেতে দেখলো, শিন ছি।

“ঘুমিয়ে পড়েছিস?” শিন ছি জানতে চাইলো।

“এখনো না।”

“এখানে আসতে পারবি?” ওর গলায় খানিক হতাশা। “ছন ছন কিছুতেই ঘুমোবে না। যে ভাবেই ভুলোনোর চেষ্টা করি না কেনো,ও তোকে ছাড়া ঘুমোবে না।”

ফোনের ওপাড় থেকে সু ছনের কান্নার শব্দ আসছে। অনেক ক্ষণ কাঁদার পরে ওর গলার স্বরটা কর্কশ হয়ে গেছে, শুকনো চিৎকারের মতো শোনাচ্ছে।

“সত্যিই? ওর তো চেনা অচেনা আছে বলে মনে হয় নি। এখন মনে হচ্ছে যে ও অচেনা লোক দেখলে ভয় পায়, বা অচেনা বাড়িতে থাকলে, বিশেষ করে প্রথমবার তো বটেই।”

“আমি এখনই আসছি।” মিন হুয়ে তক্ষুণি উঠে পড়লো।

“আমি ড্রাইভারকে বলছি তোকে নিয়ে আসতে।”

“আমি রাস্তায়।”

হয়তো কাজের সুবিধের জন্যই শিন ছির অ্যাপার্টমেন্ট ফিনান্সিয়াল স্ট্রিটের একে বারে মধ্যিখানে।

মিন হুয়ে এলিভেটরে করে একদম সব থেকে ওপরের তলায় উঠে গেলো। যেই এলিভেটরের বাইরে পা রাখলো দেখতে পেলো শিন ছিকে। শিন ছি ওকে নিতে এসেছে এলিভেটরের কাছে। কোলে ছন ছন। বাবা আর ছেলে দুজনেই কালো পাজামা পরে আছে, একই ধরনের। দুজনেরই কন্ঠার হাড়ের নিচে, বুকের ওপরে লম্বা ক্ষত দাগ। 

তার ওপরে, দুজনকার মুখশ্রীতে খুব মিল। দুজনে ঝকঝকে চেহারায় মিন হুয়ের সামনে এসে দাঁড়ালো যেনো তারা একই লোকের শিশু দশা আর প্রাপ্তবয়স্ক দশা। একটা ব্যাখ্যাতীত আনন্দের অনুভূতি।

“ম-অম!” সু ছন ডেকে উঠলো আর ঝাঁপিয়ে পড়লো মিন হুয়ের কোলে।

“ও এখনই ঘুমিয়ে পড়বে। ও ঘুমোনোর আগে বায়না করবেই, সবসময়।”

মিন হুয়ে ছেলে নিয়ে নরম গলায় বললো, “ছন ছন, মমি তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেবে।”

সু ছন দুবার হাই তুললো। মিন হুয়ের বুক ছুঁলো ওর ছোট্টো হাত দিয়ে। মিন হুয়ে একটা কালো রঙের বটমিং শার্ট পরে ছিলো। সু ছন ছুঁতে পারলো না, খামচাতে লাগলো রাগ করে।

শিন ছি তাড়াহুড়ো করে বললো, “দাঁড়া। এক মিনিট। আমি তোকে পাজামা দিচ্ছি।”

মিন হুয়ে বসার ঘরের মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে আছে। প্রচুর জায়গা অ্যাপার্টমেন্টটাতে। সাজগোজে একটা হিম হিম ভাব, সরল নকশা, একটা শীতল ঔদাসীন্য আছে। সদরের সামনেটা কালো মার্বেল দিয়ে ঢাকা মেঝে। বসার ঘরে অর্ধবৃত্তাকার রূপোলি-ধূসর সোফার সেট আছে, একটা ব্রোঞ্জের চায়ের টেবিল, ধবধবে সাদা কার্পেট, দুপাশে আধমানুষ উঁচু রূপোর মোমবাতিদান। সব আসবাবের পা গুলো ধাতুর, এমনকি দেওয়ালের ছবির ফ্রেমগুলোও ধাতুর আর খাবার ঘরের ঝুলন্ত আলোটাও ধাতুর - হিমেল জেল্লা সমেত। নানা জ্যামিতিক আকারের বাতি নানা রঙের আর নানান ঔজ্জ্বল্যের আলো আর ছায়া দিচ্ছে চতুর্দিক থেকে। পুরো দক্ষিণের দেওয়াল জুড়ে মেঝে থেকে ছাদ অবধি কাঁচের জানলা আর ফিনান্সিয়াল স্ট্রিটের রাতের পুরো দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।

শিন ছি নিয়ে গেলো মিন হুয়েকে শোবার ঘরে। মিন হুয়ে জামাকাপড় বদলে পাজামা পরে নিলো। ছেলেকে বিছানায় শুইয়ে, নিজে তার পাশে শুয়ে পড়লো। সু ছন নিজের দু হাত দিয়ে মায়ের দু হাত জড়িয়ে ধরলো, সন্তুষ্টির হাসি হেসে, বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিন ছিকে বললো, “পাপা, এখানে ঘুমোও।”

শিন ছিকেও শুতে হলো। মা-বাবা দুজনের মাঝে বাচ্চা যেনো স্যান্ডউইচ।

“বাবা, আমি তোমাকে একটা নার্সারি রাইম শোনাবো, এটা আমাকে আমার মা শিখিয়েছে -”

সু ছন শিশু কন্ঠে গেয়ে উঠলো, “দুধেল গাই ফুলে ভরা, আর দুধ দেয় হাজারো পরিবারকে। আমি রোজ খুব খাটি আর কাজে লাগি খুব, ঘাস কাটার জন্য ‘শিয়া শিয়া নিয়া’ -”

শুনে চোখ পাকিয়ে শিন ছি বললো মিন হুয়েকে, “এ কী ভুতুড়ে ছড়া?”

“খারাপ কী? আমি তো রোজ এই ছড়ার ভরসাতেই ওকে ঘুম পাড়াই।” মিন হুয়ে হাসতে হাসতে বললো, “বাচ্চা তো শুধু মায়ের গলার স্বর শুনতে চায়, ঘুমোনোর জন্য।”

“আমার মনে হয় যে ছেলেটা ঘুমিয়ে পড়ার বদলে আরো তেজী হয়ে উঠছে,” বাঁকা হেসে বললো শিন ছি, “বাবার জন্য আরেকটা গান, ছন ছন।”

“বড়ো চালকুমড়ো, ছুঁলে ঠান্ডা লাগে। ছোট্টো ভালুক ফুটি জড়িয়ে শুতে গেলো বিছানায়। খুব গরম কিনা, বড়ো ঠান্ডা ফুটি জড়িয়ে ছোট্টো ভালুক গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো।”

তার সঙ্গে হাত-পা নাড়িয়ে দোল দেবার ভঙ্গী করলো। 

“শুই জাও, আমার চালকুমড়ো।” দীর্ঘশ্বাস ফেললো শিন ছি।

সু ছন চোখ কুঁচকোলো, মুখ রাখলো মিন হুয়ের কাঁধে, শিন ছি যদি পালিয়ে যায় সেই ভয়ে, পা-টা তুলে দিলো শিন ছির পেটে, আর বিড়বিড় করতে লাগলো, “ছোট্টো হাঁস, সব হলুদ। চ্যাপ্টা ঠোঁটটা লাল। পায়ের তলাটাও। জোরে জোরে গান গেয়ে, নেচে বেড়ায় পুকুরে …”

শেষে, গলার স্বর আস্তে আস্তে পড়ে গেলো। 



হাঁসের কথা শুনে মিন হুয়ে অন্য মনস্ক হয়ে গেলো কিছুক্ষণের জন্য, আরো খানিক ক্ষণ পরে নরম ভঙ্গিমায় বললো, “শিন ছি, তোর কী এখনো মনে আছে আঁয়া গ্রামের গুহুয়া য়ুর কথা?”

শিন ছি হাই তুললো, “হ্যাঁ।”

“অনেক দিন খাই নি। চিরকাল মনে থাকবে স্বাদটা।”

শোবার ঘরের আলোটা নিস্তেজ। মিন হুয়ের শূণ্য দৃষ্টি গিয়ে পড়লো ছাদে, “সুগন্ধী আর মশলাদার।”

“ইয়ুন লু জানে কেমন করে রাঁধতে হয়। তোর খেতে ইচ্ছে করলে ওকে বললেই পারিস।”

“মাছটা আলাদা।”

“কেবল পোনা মাছই তো তাই না?”

“স্বাদে তফাৎ আছে। যে পোনাটা গুহুয়া খেয়েছে, আর যে পোনাটা উপত্যকার ফুল খায় নি তাদের স্বাদ এক রকম হয় না।”

“ওকে, আমি পরে আবার একবার খাবার সুযোগ করে নেবো।”

“শিন ছি?”

“হুহ,?”

“তোর কী নিফঁইয়ো আছে?”

“না।”

“কী করে? এতোগুলো বছর কেটে গেছে। আমি বিয়ে করেছি, ডিভোর্সও হয়ে গেছে। আর তোর একটা গার্লফ্রেন্ডও নেই?”

“না।”

“তাহলে কতোগুলো ব্যাপার … কী করে সমাধান হবে?” মিন হুয়ে পাশ ফিরলো, অন্ধকারে চোখ কুঁচকে তাকালো শিন ছির দিকে।

“এসব জিজ্ঞেস করছিস কেনো?" শিন ছির গলায় আলস্য।

“কৌতুহল।” মিন হুয়ে ঢোঁক গিলল, বললো, “আমি জানতে চাই তুই কী করে অটল অবিচল আছিস।”

“আমি অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকি।”

“অন্যান্য … ব্যাপারটা কী?”

“উদাহরণঃ টাকা করা।”

“আরেকটা উদাহরণঃ সু তিয়াঁর জন্য অপেক্ষা করা।”

মিন হুয়ে বেশ খানিক ক্ষণ চুপ করে থেকে বললো, “অপেক্ষা - সেটাও একটা ব্যাপার? তুই কিছুই করিস নি।”

“নিশ্চয়ই অপেক্ষা করা একটা ব্যাপার। সু তিয়াঁর জন্য অপেক্ষা করা আমার জীবনের সবচাইতে বড়ো ব্যাপার।”

ওর গলার স্বর চড়লো, ওকে দেখে মনে হলো যেনো ও প্রস্তুত যে কোনো মূহুর্তে ঝগড়া করার জন্য।

ও যেই বললো এটা অমনি মিন হুয়ের ইচ্ছে হলো ওর সামনে থেকে চলে যেতে। ছেলের দিকে একবার তাকালো, বললো, “আমার মনে হচ্ছে ছন ছন ঘুমিয়ে পড়েছে।”

“দাঁড়া। ও ঘুমিয়ে পড়ে ছিলো তুই আসার আগেই। তারপর জেগে উঠে ছিলো যেই আমি বিছানা ছেড়ে উঠতে গেলাম।”

“ঠিক আছে।”

একটা শব্দও ব্যয় না করে, দুজনে কথা বলে গেলো বিছানায়, আস্তে আস্তে চোখও বুজে এলো দুজনের।

ভোরে মিন হুয়ে টের পেলো যে ও কুঁকড়ে শুয়ে আছে শিন ছির বাহুপাশে। শিন ছি এমনভাবে আঁকড়ে আছে মিন হুয়েকে যেনো একটা মানুষ সমান বালিশ আঁকড়ে আছে।

গরম, মিন হুয়ে ঘামছে।

মিন হুয়ে অল্প চেষ্টা করলো নিজেকে ছাড়ানোর, কিন্তু ভেঙে বেরোতে পারলো না। শিন ছি গভীর ঘুমে ডুবে আছে। ওর চুলগুলো ঝামড়ে পড়েছে কপালে। মুখটা চেপে আছে মিন হুয়ের কানের ওপর। শ্বাস শান্ত আর দীর্ঘ। শ্বাসের হাওয়ায় মিন হুয়ের কানে হালকা কুটকুট করছে।



আর কোনো উপায় না দেখে মিন হুয়ে হাত দিয়ে শিন ছির গালে হালকা হালকা চাপড় দিলো, “শিন ছি, জাগ, ওঠ।”

হঠাৎ ও চোখ খুললো, আধা ঘুমে আচ্ছন্ন অবস্থায় মিন হুয়ের দিকে দেখলো, তারপর চারপাশে দেখলো, “হুহ? তুই চলে যাস নি?”

“তুই আমাকে একটুক্ষণ শুতে বললি। আমি ক্লান্ত ছিলাম, আগের রাতে ট্রেনে কাটিয়েছি, আমি ঘুমিয়ে পড়ে ছিলাম।”

“তুই …কিছু করিস নি তো, করেছিস?” বললো শিন ছি।

মিন হুয়ে রেগে গেলো। লেপের নিচে শিন ছিকে একটা কষে লাথি মারল, “আমি কী করতে পারি? আমি তো জিজ্ঞেস করি নি তুই কী করেছিস!”

“দ্যুইবুচি, আমি ঘুমিয়ে পড়ে ছিলাম।” ক্ষমা চেয়ে হাসলো, কোমর সোজা করে উঠে বসলো, আর ওর মুখের ফ্যাকাশে হয়ে গেলো, “ছন ছন কই?”

চমকটা গুরুত্বহীন। মিন হুয়ে লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়লো, চারপাশে দেখলো, কোথাও ছেলেকে দেখতে পেলো না, চীৎকার না করে পারলো না, “ছন ছন, কোথায় গেলে? যাহ্‌ চলে গেছে!”

“জলদি! জলদি! পুলিশে ফোন কর! এক এক শূণ্য!”

উদ্বেগে শিন ছি অসুস্থ বোধ করতে লাগলো হঠাৎ। বললো, “তাড়াতাড়ি কর! লেপটা ঝট করে তুলে দেখ। এর নিচে চাপা পড়ে যায় নি তো!”

শুরুতে মিন হুয়েও খুব ঘাবড়ে গেলো। কিন্তু শিন ছির ফ্যাকাসে মুখ আর বেগুনী ঠোঁট দেখে একটা জোর শ্বাস নিলো। তারপরে এক ঝটকায় লেপটাকে মেঝেতে ফেলে দিলো। খালি বিছানার দিকে আঙুল দিয়ে দেখালো, “ও লেপের নিচে নেই! শিন ছি, চুপ করে বোস। এখনই ফোন করিস না। আমি বসার ঘরে যাচ্ছি, গিয়ে দেখছি ও ওখানে আছে কিনা, হতে পারে বাথরুমে আছে।”

“বাথরুম তো সামনেই, ওর ভেতর থেকে কোনো শব্দও আসছে না।”

শিন ছি পাগলের মতো চেঁচালো, বুকটা খামচে ধরে, হাঁপাতে হাঁপাতে, “ও বাথরুমে নেই, বাথরুমে নেই ও, ও গেছে, আমার ছেলেটা গেছে, হারিয়ে গেছে, আমার নিজের বাড়ির বিছানা থেকে গায়েব হয়ে গেছে, হে ভগবান!”

ও লাফাতে লাগলো আতঙ্কে, চেঁচাতে লাগলো, প্রায় কাঁদতে লাগলো।

মিন হুয়ে ওর কাঁধ চেপে ধরে নরম সুরে বললো, “না, ছন ছন বেশ চালাক চতুর, অ্যাপার্টমেন্টটাও নিরাপদ, ও হারিয়ে যায় নি, আমি ওকে ঠিক খুঁজে পাবো। চিন্তা করিস না, শিন ছি, আমার দিকে দ্যাখ - - একটা লম্বা শ্বাস নে, শান্ত হ।”

ভয়ার্ত চোখে শিন ছি তাকালো মিন হুয়ের দিকে। ওর মুখ আরো ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ওর ঠোঁটের রং আরো গাঢ় যেনো, শ্বাস পরছে ঘনঘন।

মিন হুয়ে ভাবছে, সু ছনকে যদি খুঁজে পাওয়া না যায় তো, এ লোকটাও অসুস্থ হয়ে পড়বে। একটা গভীর শ্বাস নিয়ে মিন হুয়ে জোর করে ভাবতে লাগলো। দু সেকেন্ড পরে মেঝেতে লম্বা হয়ে শুয়ে খাটের তলাটা এক নজরে দেখে নিলো। সু ছন খাটের তলায়, অনেকটা ভেতর দিকে শুয়ে আছে। মিন হুয়ে জানে না যে ও কিভাবে ওখানে গেলো। মিন হুয়ে দুম করে চেঁচিয়ে উঠলো, “আমি পেয়েছি ওকে। আমি পেয়েছি, খাটের তলায়, ও আছে খাটের তলায়।”

শুনেই শিন ছি খাট থেকে নেমে এলো। খাটের নিচে দেখলো, আরো ঘাবড়ে গিয়ে প্রশ্ন করলো, “ও নড়ছে না কেনো? ওর কী হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, ও মরে গেছে? মিন হুয়ে, আমার ছেলে মারা গেছে … আমার ছেলে মারা গেছে …”

“না, মারা যায় নি, ঘুমিয়ে আছে, এখনো জাগে নি।”

“আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না। অনেকগুলো সেকেন্ড কেটে গেছে, ও একবার চোখ পিটপিটও করলো না …”

এতো ভয় পেলো শিন ছি যে ও মিন হুয়েকে কষে জাপটে ধরলো, কাঁপতে লাগলো থরথর করে, নিঃশ্বাস বন্ধ করে, যেনো শ্বাস ফেলতেও ওর ভয় করছে। 

মিন হুয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো, কোনো উপায় না দেখে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে গেলো খাটের নিচে। টেনে বার করে আনলো সু ছনকে।

অবাক কান্ড, ছেলেটা এতো গভীর ঘুমে মগ্ন যে ওকে যে টেনে বার করে নিয়ে এলো মিন হুয়ে খাটের তলা থেকে সেটা ও টেরও পেলো না। 

শিন ছির মুখ ক্রমে ক্রমে ধূসর হলো -

মিন হুয়ে তাড়াহুড়ো করে ছেলেকে বুকে আঁকড়ে নিয়ে এলো শিন ছির সামনে, “ও মরে যায় নি, দ্যাখ নিজে, ওর হাতগুলো গরম। আর, এই যে, ছুঁয়ে দ্যাখ, হৃদস্পন্দন।”

শিন ছি কাঁপতে কাঁপতে ওর হাতটা সু ছনের বুকে রাখলো। ওর হৃদস্পন্দন অনুভব করলো। তারপর স্বস্তিতে ঘাড় নাড়লো। কিন্তু তখনো হাঁপাচ্ছিলো।

মিন হুয়ে ছেলেকে ফের খাটে শুইয়ে দিলো। টেনে শিন ছি কে তুলে বসালো। নরম সুরে জিজ্ঞেস করলো, “অক্সিজেন কোথায়?”

শিন ছি ক্যাবিনেটের দিকে দেখালো। মিন হুয়ে ক্যাবিনেট খুলে একটা হালকা মেডিক্যাল অক্সিজেন সিলিন্ডার বার করলো, তার স্ক্রু খুলে ফেললো, শিন ছিকে একটা অক্সিজেন মাস্ক পরিয়ে শ্বাস নেবার ব্যবস্থা করে দিলো।

“ঠিক আছে?” মিন হুয়ে বসলো শিন ছির পাশে। চোখ বড়ো বড়ো করে দেখলো শিন ছিকে, “ডাক্তারকে ফোন করার দরকার আছে?”

শিন ছি মাথা ঝাঁকালো।

মিন হুয়ে দশ মিনিট চুপ করে শিন ছির পাশে বসলো। ওর মুখের রং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে দেখে একটা স্বস্তির শ্বাস ফেললো, হাসি মুখে বললো, “আমি বরং ছেলেটাকে নিয়ে যাই। সাও মু ওর খেয়াল রাখবে না হয়। তুই বরং আজকে ছেড়ে দে ওকে।”

“দরকার নেই। আমার তো বেশ ভালোই লাগছে। আমি খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবো।”

শিন ছি নরম স্বরে বললো, “আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না। ও খাটের তলায় গেলো কী করে?”

“মেঝেতে ঘুমোতে লাগল?”

মিন হুয়ে বললো, “সেই জন্যই আমার খাটের পায়াগুলো নিরেট। আমি ভাবতেই পারি নি যে তোর খাটের পায়াগুলো এতো উঁচু হবে আর নিচেটা এতো খালি হবে। ওখানে তো তিনটে —”

“আমি ভয়ে মরেই যাচ্ছিলাম।” শিন ছির চোখে মুখে তখনো আতঙ্কের ছাপ। 

ওর হৃদপিন্ডের অসুখটা সু ছনের অসুখের তুলনায় অনেক বেশি গুরুতর। ওর ভয়ে মরে যাবারই কথা।

উল্টোদিকের দেওয়ালে সূর্যের আলো এসে পড়লো। মিন হুয়ে টের পেলো যে ওখানে অনেকগুলো ছবি লাগানো রঙীন ফ্রেমে আছে। সবকটাতেই সু তিয়াঁর ছবি, যেগুলো সু তিয়াঁ পোস্ট করে ছিলো মোমেন্টসে। মিন হুয়ে অনেকক্ষণ বুঝতে পারে নি কারণ ছবিগুলো বড়ো করে তেলরঙে আঁকা ছবির ঢঙে বানানো হয়েছে।

হঠাৎ করে ওর পিঠে যেনো একটা কাঁটা বিধল।

“তোর মিটিং কখন?”

শিন ছি বিছানার পাশে রাখা ইলেকট্রনিক ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বললো, “তাড়াতাড়ি কর। আমি ড্রাইভারকে বলছি তোকে ছেড়ে দিয়ে আসতে।”

মিন হুয়ে চলে যেতেই চাই ছিলো, কিন্তু দুশ্চিন্তাও হচ্ছিলো ওর, “তুই একলা পারবি? তুই শেন হানকে ডেকে নিচ্ছিস না কেনো,তোর দেখাশোনার জন্য?”

“আমি ঠিক আছি।”

তারপর বললো, “এই মিটিংটায় আমিও যাবো। কিন্তু তার আগে আমাকে কোম্পানিতে যেতে হবে কয়েকটা ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে। যাবো তোর সঙ্গে সঙ্গেই, ঠিক আছি আমি।”

“তাহলে আমি আগেই চলে গেলাম। হুইতৌ জিয়াঁ।”

কোট হাতে নিয়ে ও উঠে দাঁড়ালো।

“ওকে।”




~~~~~~~~~~~~

সম্পূর্ণ বই বিনামূল্যে : https://dl.bookfunnel.com/lcj5vznt96

Link to Previous Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/09/jpda-chapter-47.html

Link to following Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/09/jpda-chapter-49.html

Sunday, September 22, 2024

JPDA - Chapter 47

৪৭. বেচা কেনা

 


শিন ছি ঠিক করে ছিলো যে মা আর ছেলেকে ফরাসী খানা খাওয়াতে নিয়ে যাবে। কিন্তু সু ছনের আপত্তি ছিলো। ওর ইচ্ছে ও চিকেন ম্যাকনাগেটস্‌ খাবে। সেই জন্য ওদেরকে যেতে হলো কাছাকাছি ম্যাকডোনাল্ডসে।

আশাতীতভাবে ভেতরে প্রচুর লোকের ভিড়। ওদেরই বয়সী মা-বাবাদের ভিড়। পনেরো মিনিট অপেক্ষা করতে হলো একটা বসার জায়গা পাবার জন্য।

মিন হুয়ে লুকিয়ে দেখতে লাগলো শিন ছিকে। শিন ছির অধৈর্য স্বভাবে এতো লোক দেখে ওর মেজাজ খারাপ হয়ে যেতে পারে। তার ওপরে একটা বাচ্চা ছেলে এক কাপ কেচাপ উল্টে দিলো শিন ছির জুতোতে। শিন ছি রাগ করে নি, শুধু মিন হুয়েকে বললো সু ছনকে আগলাতে। এগোলো সেলফ্‌-সার্ভিস অর্ডার দেবার মেশিনে গিয়ে খাবার অর্ডার করতে।

“কতো দিন চলবে তোর মিটিং?” শিন ছি জিজ্ঞেস করলো মুখের মধ্যে পোরা মাছ খেতে খেতে।

“দু দিন। আমার অংশ একদিনের, সেটা কালকে।”

“সকালে না দুপুরে?”

“সকালে একটা ফোরাম, দুপুরে রিপোর্ট।”

“ওয়াও, এআই ম্যাক্স বেশ বড়ো জাতের কনফারেন্স ইন্ডাস্ট্রিতে। তুই একলাই একটা রিপোর্ট দিবি, তার মানে তুই খুবই পটু।”

মিন হুয়ে ওর দিকে তাকালো আর হাসলো, “আমি খুবই পটু।”

    “কিন্তু যথেষ্ট বিনয়ী নস।” জুড়ে দিলো শিন ছি।

“তোর সামনে বিনয়ের দরকার নেই।" মিন হুয়ে একটা কামড় দিলো বিফ বার্গারে, “তোর চোখে আমি সব সময়েই খারাপ। তাই আমি নিজেকে একটু বেশি ভালো করে দেখাই, যাতে তুই একটা সঠিক গড় পাস।” ও বললো আবার। আর দু চোখ দিয়ে ঝলসে দিলো শিন ছিকে।

“বাবা, আমি আর খেতে পারবো না।”

সু ছনের এতো খিদে পেয়ে ছিলো যে ও চিকেন ম্যাকনাগেটস্‌-এর সাথে একটা চিজ বার্গারও অর্ডার করে ছিলো। কিন্তু ম্যকনাগেটস্‌ খেয়ে নিয়ে, চিজ বার্গারে কয়েক কামড় দিয়ে ও আর খেতে পারলো না।

শিন ছির হাতে গুঁজে দিয়ে বললো, “খেয়ে নাও এটা। নষ্ট কোরো না।”

শিন ছি আনমনে নিয়ে নিলো, বকি বার্গারটা দু কামড়ে চালান করে দিলো পাকস্থলীতে।

মিন হুয়ে এক মূহুর্তের জন্য অবাক হয়ে গেলো, ওর দিকে তাকিয়ে, ওর মন যেনো একটু টলে গেলো।

ঝৌ রু জির ভীষণ তীব্র সংস্কার আছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে। ও কোনো এঁটো খাবার খায় না, আধ-খাওয়া খাবারের কথা তো বাদই দেওয়া যায়, সেটা মিন হুয়েরই হোক আর সু ছনের।

কী খাবে তাই নিয়ে শিন ছির ভীষণ খুঁতখুঁতুনি। কিন্তু এইবারে ও দুবার ভাবলো না, কিছু মনেও করলো না।

“আমি ম্যাকডোনাল্ডসে খায় নি অনেক বছর। দশ বছর তো হবেই।" হঠাৎ দীর্ঘশ্বাস ফেললো শিন ছি, “যখন আমি হাইস্কুলে পড়ি, তখন আমাদের ইস্কুলের কাছেই ম্যাকডোনাল্ডস্‌ ছিলো। আমি তো রোজ খেতে যেতাম ওখানে। কিছুতেই অরুচি হতো না। আমার ওজন বেড়ে গিয়ে ছিলো এক সময়ে। আমার বাবা তাড়াহুড়ো করে ব্যবস্থা নিয়ে ছিলো।”

“তুই? মোটা?”

“হ্যাঁ। এদিকে আমি বেশি ধকলের ব্যায়াম করতে পারবো না। আমি বাড়িতে থাকতাম রোজ, আরো খেতাম, আরো মোটা হতাম।”

“তারপর?”

“আমার বাবা চটপট সিন্ধান্ত নিলো, আমার ইস্কুল বদলে দিলো। ইস্কুলে একটা গ্রীক রেস্টুরেন্ট ছিলো কেবল। তাও আমি রোজ খেতে যেতাম। আর আমার ওজন কমে গিয়ে ছিলো।”

শিন ছি কেবলমাত্র তখনই ফেলে আসা দিনের কথা বলে যখন ও খুব নিরুদ্বিগ্ন থাকে। মিন হুয়ে হাসলো, চুপ করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলো।

ও এখনো সুদর্শন, তাজা আর ঝলমলে যেখানেই বসুক না কেনো, একটা আত্মমগ্ন মহিমা থাকে ওর প্রত্যেক ভঙ্গিমায়।

আজ একটা ঘন নীল রঙের স্যুট পরেছে, হালকা নীল শার্ট, গাঢ় ধূসর রঙের চৌখুপি কাটা টাই, কালো অক্সফোর্ড জুতো। বুক পকেটে একটা সিল্কের স্কার্ফ ওয়ান-লাইন ভাঁজে সাজানো। চুল খুব গুছিয়ে আঁচড়ানো। ব্যবসার জন্য মানানসই প্রথামাফিক সাজগোজ যেনো এক্ষুণি বসে একটা চুক্তি করে ফেলবে যে কোনো সময়ে।

কালো অক্সফোর্ড জুতো


রোগা চেহারা হলেও ওর মুখটা ছোট্টো অ্যানিমে চরিত্রদের মতো। মুখের সমস্ত অঙ্গ খুব জীবন্ত। খুব নিষ্পাপ হাসিও শীতল আর উদ্ধত দেখায়।

নিচের ঠোঁট আর চিবুকের মধ্যে একটা গর্ত আছে। তার সঙ্গে একজোড়া স্পষ্ট কঠিন চোয়ালের হাড়, গোল আর মসৃণ করোটি। ত্রিমাত্রিক আর কৌতুকে ভরা। পাশের দিক থেকেও মুখটাকে সুন্দর দেখায়।

যাই পরুক না কেনো, ওকে যেমনই দেখাক না কেনো, চারপাশের সব কিছুর মধ্যে ওর ওপরে নজর পড়বেই।

এমনকি সু ছনও মনে করে যে ওর সঙ্গে থাকাটা মজার, একটা ব্যাপারেই ও খুব সজাগ, ও ওর বাবার সঙ্গে আছে কিনা।

মিন হুয়ে একটু খাপছাড়া বোধ না করে পারলো না।

“কোন হোটেলে আছিস?” জানতে চাইলো শিন ছি, “আমি বাচ্চাকে ফেরত পাঠাব যাবার সময়ে।”

“শেরাটন। আমি একটু পরে তোকে ঠিকানা আর ঘরের নম্বর দিচ্ছি।”

ও ঘাড় নাড়লো, টিস্যু দিয়ে মুখ মুছলো, জলে একটা চুমুক দিলো, হঠাৎ প্রশ্ন করলো, “তুই লিন শি য়ুয়ে কে চিনিস?”

মিন হুয়ে শুধু একটা “হুম্‌” শব্দ বেরোতে দিলো। আর নামটা শোনা মাত্রই ওর খারাপ লাগতে শুরু করলো।

“ও বিবিজির সেলস্‌ ডিরেক্টর। চেন য়ুআঁ ওকে চাকরি দিয়েছে।”

“ওকে চেং ছিরাং ছেড়ে দিলো কেনো?”

“তাহলে তুই জানিস যে ও কাজের?”

“হ্যাঁ।”

“আমরা ওকে কাজ দিয়েছি বেশি মাইনে দিয়ে।” শিন ছি কৌতুহল নিয়ে মিন হুয়ের প্রতিক্রিয়া দেখছিলো, “তোর কী কোনো অসন্তোষ আছে ওর প্রতি?”

“হ্যাঁ” মিন হুয়ে স্বীকার করলো, “কিন্তু তার সাথে তোর কোনো সম্পর্ক নেই।”

“আমি কী জানতে পারি এটা কী ধরনের অসন্তোষ?”

“আমার বলতে ইচ্ছে করে না। কেউ আমাকে বিশ্বাস করে না। আর ঐ দিনগুলো আমি কাটিয়ে এসেছি।” মিন হুয়ে এড়িয়ে গেলো শিন ছির সোজা দৃষ্টি, “আমরা বন্ধু ছিলাম।”

“তাহলে এখন -”

“আমাদের মুখ দেখাদেখি নেই।”

শিন ছি চমকে উঠলো, “এতো গুরুতর?”

মিন হুয়ে নাক ডাকিয়ে ঠান্ডা সুরে বললো, “পৃথিবীতে দু রকমের লোক হয়। প্রথম ধরনের লোকের স্বভাব অপরকে সন্দেহ করা। এদেরকে কিছু বিশ্বাস করানো খুব কঠিন, একবার বিশ্বাস করলে এরা শেষ পর্যন্ত সেই বিশ্বাসটাই আঁকড়ে থাকে। আর বিশ্বাস যাকে করেছে তার সাথে ঘনিষ্ঠতাও তৈরি করে। আর দ্বিতীয় ধরনের লোক ঠিক এর উল্টো। তারা সহজেই বিশ্বাস করে, সব কিছু বিশ্বাস করে, মনে করে অপরে যা বলছে তার সব সত্যি। কিন্তু একবার যদি তারা জানতে পারে যে তাদের মিথ্যে বলা হয়েছে, তারা আর মিথ্যেবাদীর একটাও শব্দ বিশ্বাস করবে না। আর সমস্ত ক্ষতি বন্ধ করার জন্য মিথ্যেবাদীর সঙ্গে সব সম্পর্ক তুলে দেবে। ঈশ্বরও ঠিক করেছেন, এই দু ধরনের লোকেদেরই ন্যায্য প্রাপ্য দেবেন। তাই এদের নিজের নিজের লাভও আছে, ক্ষতিও আছে। শেষে কারোরই বেশি ক্ষতি হয় না। আমি দ্বিতীয় ধরনের।”

“আমি প্রথম দলে।” শিন ছি ঘাড় ঝাঁকালো, “আমি শুনেছি তুই নাকি বা’অ্যানের এমবিও-তে আছিস? তোর বস সাও মু আজ রাতে আমার সাথে কথা বলতে চায় বলে জানিয়েছে।”

“এমবিও?”

“ম্যানেজমেন্ট বাই আউট, মানে হলো, ম্যানেজমেন্ট গ্রুপ বাই আউট।”

“হ্যাঁ।”

“আমি সাও মুকে বলেছি যে আমি বা’অ্যানের সায়েন্টিফিক রিসার্চ করার ক্ষমতার কথা বিশেষ জানি না। আমি আশা করছি যে তুই আমার একার জন্য একটা প্রেজেন্টেসন দিতে পারবি। সাও মু বললো যে তুই আসতে চাইছিস না। উনিই প্রেজেন্টেসনটা দেবেন যদিও পিপিটিটা তোর বানানো।”

“তা বটে।”

“মিন হুয়ে -” শিন ছি একটু যেনো ধাঁধায় পড়েছে, “আমি তোর মনোভাবের প্রশংসা করতে পারছি না। তোর আর আমার মধ্যের ব্যাপারটার সঙ্গে ব্যবসার কোনো সম্পর্ক নেই। তুই এমবিও চাস, আমি সম্ভাব্য ক্রেতা, এ নিয়ে এতো মাথাব্যাথা করছিস কেনো?”

“...”

“ – কারণ আমি তোকে অপ্রস্তুত করতে চাই না।”

শান্তভাবে বলে উঠলো মিন হুয়ে, “লগ্নিতে ঝুঁকি আছে। আমি চাই না যে তুই ভাবিস যে আমি তোর থেকে সুবিধে নিচ্ছি।”

“তুই সত্যিই বেশি ভাবছিস।”

“তাছাড়া, তোর এতো মাথা গরম, তুই প্রত্যেক পদে খোঁটা দিস, খুঁত খুঁত করিস। আমি কিছুতেই তোর জন্য বেশি দিন কাজ করতে পারবো না। যখন সময় ঘনাবে, তখন প্রবল রাগে আমি কাজ ছেড়ে দেবো … আমার ভয় এই যে তাতে তোর ক্ষতি হবে।”

“কী রকম ক্ষতি হবে?”

“আমি মূল প্রযুক্তিওবিদ।”

শিন ছি চমকে গেলো এক মূহুর্তের জন্য, তারপর হাসলো, বললো, “আমি বদমেজাজী। আর তোর মেজাজ ভালো। প্রত্যেকবার তুই ঝগড়া করিস, তাতে তুই আমাকে তোর ভেতরটা দেখতে দিস। অনেক দিন কেটে গেলে, তুই এটাতে অভ্যস্ত হয়ে যাবি। সত্যিই একবারও চেষ্টা করে দেখবি না? এমনও হতে পারে যে আমরা ভালো সহকর্মী?”



“আমিও বদমেজাজী।” সোজাসুজি বললো মিন হুয়ে, “আমি তোকে মেজাজ নিতে দিচ্ছি শুধু সু তিয়াঁর জন্য। আমি জানি না আমি আর কতো দিন এটা করতে পারবো।”

“তার দরকার নেই। তুই তোর মতো। সেই জন্য তোর অন্য কারুর ভূমিকা পালন করার দরকার নেই।”

“আমি অন্য কারুর ভূমিকা পালন করি নি। আমি সেই মানুষ যে বদমেজাজী আর আমিই সেই লোক যে মেজাজ হজম করে ফেলে সু তিয়াঁর ঋণ শোধ করার জন্য।”

“ওকে।” শিন ছি হেলান দিয়ে বসলো আর সরাসরি বললো, “তাহলে আমি এটাই বুঝলাম যে তুই আমার সাথে কাজ করতে অস্বীকার করছিস, তার মানে, আমি আজকে সাও মুয়ের সাথে কথা নাও বললে চলে?”

“তা নয় …” মিন হুয়ে মাথা চুলকে বললো, “তুই সাও মুয়ের সাথে কথা বলতেই পারিস, তুই বা’অ্যান কিনেও নিতে পারিস। আমি এটাই বলতে চাই যে আমি তোর কাছে কাজ করতে পারবো না বেশি দিন কারণ তুই বদমেজাজী। তাই ভালো করে মেপে নে। দুম করে বা’অ্যান কিনে ফেলিস না।”

“আমি কখনো কিচ্ছু দুম করে করি না যখন ব্যাপারটা ব্যবসার।”

“তা ভালো।”

ও অনেক ক্ষণ কথা বললো না, তারপরে প্রসঙ্গ বদলালো, “তুই যদি এমবিওতে আছিস, তাহলে ম্যানেজমেন্ট টিমের তো ব্যক্তিগত পুঁজি লগ্নি করতে লাগবে। পরিস্থিতি হলো মূল দামের দশ শতাংশ। তাতে তোর কুড়ি লাখ য়ুআঁর বেশি লাগবে। তোর কী টাকাটা আছে?”



“খানিকটা। না …কিছুটা, খুব বেশি নয়, আমি বন্ধুদের থেকে ধার নিয়েছি কিছু।”

“যেমন?”

“ঝৌ রু জি আমাকে দশ লাখ য়ুআঁ দিয়েছে।”

“তাই নাকি?”

শিন ছির মুখ হঠাৎ করে কালো হয়ে গেলো। তারপরে ও যখন কথা বললো তখন বিষন্নতার আবহাওয়া, “এখনো ওর বাড়িতে একজন রুগী আছে না? তোর সাহস হলো কী করে ওর থেকে টাকাটা চাওয়ার?”

“দুঃখিত। ও টাকাটা নিজে থেকেই দেবে বলে ছিলো। আর পরের দিনই টাকাটা আমি পেয়েও গেছি।”

শিন ছি অবিশ্বাসের চোখে তাকালো, “তুই টাকাটা খরচ করতে চাস?”

“আমি সুদ দেবো।”

“আর কতো বাকি?”

“দশ লাখ।”

“কার থেকে টাকাটা তুই ধার করতে যাচ্ছিস?”

“এমবিও হয়তো সফল হবে না। টাকাটা দরকারও লাগবে না হয়তো। তাই ভাবছি যে অল্প মেয়াদের ব্যক্তিগত ধার নেবো, যাতে সুদের হার কম, তাড়াতাড়ি মঞ্জুরি আর তাড়াতাড়ি টাকাটা পেয়েও যাবো।”

“ব্যবস্থা কর।” আকাশের দিকে তাকালো শিন ছি।

“চিন্তার কিচ্ছু নেই, এখনো সময় আছে।” বললো মিন হুয়ে, “কিছু না কিছু একটা রাস্তা হয়ে যাবে।”

“ঠিক কথা, রাস্তার কাটাকুটি তো কখনো হয় না।” শিন ছি কাগজের কাপটা গোলা পাকিয়ে ছুঁড়ে দিলো খাবারের পড়ে থাকা থালার ওপরে।

শেষে রাতে সাও মুয়ের লাগাতার ঘ্যানঘ্যানানি সহ্য করতে না পেরে, মিন হুয়ে সাও মুয়ের সঙ্গে গেলো শিন ছির সাথে দেখা করতে।

যাই হোক, বা’অ্যানের রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের দায়িত্ব ওরই। আবার পিপিটিটাও বানিয়েছে ও-ই। তাই ও বা’অ্যানের রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কথাগুলো বললে বলবে সাও মুয়ের তুলনায় অনেক বেশি আত্মবিশ্বাস নিয়ে। শিন ছিরও সুবিধে হবে প্রশ্নগুলো রাখতে আর উত্তর পেতে।

সাও মুকে লগ্নি জোগাড় করার জন্য ভীষণ পরিশ্রম করতে দেখে মিন হুয়ে মনে করলো যে ওরও কিছু দেবার আছে কারণ ও-ও তো ম্যানেজমেন্ট টিমের সদস্য। “এতো মানসিক চাপ নিতে হবে না তোমাকে।” বললো সাও মু।

“পুবে আলো নেই, পশ্চিমে তো আছে। আমি অন্যান্য লগ্নিকারীদের সঙ্গে কালকে দেখা করবো। কিছু যায় আসে না যদি শিন ছি রাজি না হয়। আমাদের জিএস১.০ আছে। অনেক লোকই আসবে আমাদের কাছে। আমরা তাদেরকে বেছে নেবো, যদি তারা আমাদের বেছে নেয় তো।”

কথাবার্তা হলো বিবিজির কনফারেন্স রুমে। বিবিজির তরফে শিন ছি ছাড়াও ছিলেন সিএফও চেন য়ুআঁ, চিফ টেকনোলজিক্যাল অফিসার লিং জিয়াঁ বো।

প্রথম দশ মিনিট সাও মু সাধারণ একটা পরিচিত দিলেন বা’অ্যানের। তারপরে চল্লিশ মিনিট ধরে মিন হুয়ে কোম্পানি মূল প্রোডাক্টগুলোর কথা বললো আর জানালো আর অ্যান্ড ডির কৃতিত্বের কথা।

তারপরে আরো দশ মিনিট সাও মু বললো কোম্পানির আর্থিক পরিস্থিতির কথা আর বিক্রিবাটা কেমন চলছে সেই সব।

প্রশ্নোত্তর পর্বে কুড়ি মিনিট ধরে মিন হুয়ে উত্তর দিয়ে গেলো লিং জিয়াঁ বোয়ের একের পর এক প্রশ্নের।

তারপরে শিন ছি জানতে চাইলো, “আপনাদের প্রোডাক্টগুলোর জন্য কী সিএফডিএ সার্টিফিকেটের দরখাস্ত জমা দেওয়া হয়েছে? ঐ সার্টিফিকেসন ছাড়া তো বাজারে বিক্রির কোনো যোগ্যতা থাকবে না। অনেক বড়ো হাসপাতালও কিনতে পারবে না, মেডিক্যাল ইন্স্যুরেন্স সিস্টেমে যে ঢুকতে পারবে না প্রোডাক্ট সে কথা না হয় বাদই দিলাম।”

“আপনাদের থেকে এইমাত্র এখানে বসে যা শুনলাম তাতে দেখা যাচ্ছে বা’অ্যানকে চালানোর খরচা অনেক। কোনো সার্টিফিকেসন না থাকলে আমাদের একটাই চিন্তা যে কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদী উন্নতিতে প্রভাব পড়বে।” জানালেন চেন য়ুআঁ।

শিন ছি সত্যিই দুম করে কেনে না। মিন হুয়ে ভাবলো যে যারা কেবল এই শিল্পক্ষেত্রকে খানিকটা বোঝে তারাই এই গিঁটগুলোর কথা বলবে, আর এই গিঁটগুলো নিয়েই সমস্ত মেডিক্যাল এআই কোম্পানিগুলোর যতো মাথাব্যথা।

সিএফডিএ মানে চায়না ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেসন। নিরাপত্তা আর দক্ষতা নিশ্চিত করতে দেশে কতকগুলো কড়া নিয়মনীতি আছে ওষুধ আর যন্ত্রপাতির গঠন ও ব্যবহার নিয়ে। মেডিক্যাল এআই একটা উঠতি শিল্পক্ষেত্র। তাই দেশে এখনো কোনো একটা মাপকাঠি তৈরি হয় নি। তৈরি হয় নি নিয়ম বা নীতি এই নতুন প্রযুক্তির প্রভাব মাপার জন্য।

“আমাদের প্রোডাক্টগুলোর ক্লাস টু মেডিক্যাল ডিভাইসের সার্টিফিকেট আছে। কতকগুলো প্রোডাক্ট ক্লাস থ্রি ডিভাইস হিসেবে ঘোষিত হবার পথে। আপনারা জানেন নিশ্চয়ই যে ক্লাস টু মেডিক্যাল ডিভাইস সরাসরি প্রাদেশিক ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেসনে দাখিল করা যায়। কিন্তু ক্লাস থ্রি ডিভাইসগুলোর জন্য আগে রাষ্ট্রীয় ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেসনের ছাড়পত্র পাওয়া আবশ্যিক। আর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালও লাগে। আমাদের প্রোডাক্টগুলো এখনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে আছে।” জানালো সাও মু।

“চলতি পদ্ধতি অনুযায়ী এআই প্রোডাক্টগুলোকে ছটা ধাপ পেরোতে হয় দরখাস্ত জমা দেওয়া থেকে - প্রোডাক্ট ফাইনালাইজেসন, টেস্টিং, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, রেজিস্ট্রেসন ডিক্লেরেসন, টেকনিক্যাল রিভিউ আর প্রশাসনিক সম্মতি। ছটা ধাপ একসঙ্গে পেরোনো যায় না। একে একে পেরোতে হয়। পরের ধাপের কাজ তবেই করা যাবে যদি আগের ধাপের কাজ সম্পূর্ণ হয়ে গিয়ে থাকে। এখন আমাদের সব ধরনের দরখাস্ত আটকে আছে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে। যেহেতু দেশে চিকিৎসার জিনিসের নিরাপত্তার আর দক্ষতার চাহিদা খুব বেশি এই মূহুর্তে, সে জন্য প্রশাসনিক সম্মতি দেবার ব্যাপারে খুব সাবধানতা অবলম্বন করা হয়। এখনো পর্যন্ত কোনো এআই কোম্পানি তিন ধরনের যন্ত্রেরই ছাড়পত্র পায় নি …” বললো মিন হুয়ে।

“কত সময় লাগবে আপনাদের প্রোডাক্টের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ হতে, গোণাগুনতি দিন, মাস, বছরের হিসেবে?” প্রশ্ন করলো শিন ছি।

“ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করা হয় দুটো ধাপেঃ প্রস্পেকটিভ আর রেট্রোস্পেকটিভ। আমাদের প্রোডাক্টের প্রয়োজন অনেক বেশি সংখ্যক কেসের, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালটা খরচ সাপেক্ষও -”

“খরচ কতো?” জানতে চাইলেন চেন য়ুআঁ। 

“প্রায় এক কোটি।” উত্তর দিলো মিন হুয়ে, “আরো দু থেকে তিন বছর লাগবে সব কাজ শেষ হতে।”

“একটা প্রতিষ্ঠিত মেডিক্যাল ডিভাইস কোম্পানি, যা বাইরে থেকে দেখে মনে হয়, এদের অনেক প্রোডাক্টও নিশ্চয়ই সিএফডিএর ছাড়পত্র পেয়েও যাবে। তবে, বিক্রি করা সহজ হবে যদি যন্ত্রগুলোতে এআই-এর সুবিধে থাকে।” বলে উঠলো শিন ছি।

“য়ুআঁলাই এই ব্যাপারে বিশেষ নজর দেয় নি। তবে আমরা সহযোগিতা করেছি জিনিসটা ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে। ভালো ফলও পাওয়া গেছে।”

একগোছা কাগজ ফোল্ডার থেকে বার করে শিন ছির হাতে তুলে দিলো মিন হুয়ে, “এগুলো হলো পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ। বিজনেস প্ল্যানের সাথে জুড়ে দেওয়া আছে।”

“বিবিজির দং চেং টেকনোলজি যে চিকিৎসার যন্ত্রগুলো বিক্রি করে সেগুলো বেশ দামী। ওরা তিন ধরনের ছাড়পত্রই পেয়েছে। আমরা এই দেশের বাইরেও কাজ করি, ইউনাইটেড স্টেটস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেসনের ছাড়পত্র মেডিক্যাল এআই-এর ক্ষেত্রে গতি আনতে পারে। যদি আপনাদের প্রোডাক্টগুলো বিবিজিতে যোগ হয়, তাহলে মেগুওয়াতে এফডিএ ছাড়পত্রের জন্য দরখাস্ত করা যেতে পারে আর বিক্রি করা যেতে পারে দং চেং টেকনোলজির যন্ত্রগুলোর সঙ্গে।” বললো শিন ছি।

“হ্যাঁ।” সাও মু হাসলো। প্রায় ঘন্টা দেড়েক কথা বলার পরে, শিন ছি বললো, “সাও জঁ, লগ্নির বন্দোবস্ত কেমন চলছে?”

“আমাদের এখনো ছ কোটি য়ুআঁর লগ্নি লাগবে।”

“বিবিজি তেরো কোটি য়ুআঁ লগ্নি করতে পারে, আর ম্যানেজমেন্ট টিমকে কুড়ি শতাংশ অংশীদারী দিতে পারে।”

শিন ছি খুব সংক্ষেপে জোর দিয়ে বললো, “কিন্তু আমরা লগ্নি করবো একচেটে হিসেবে। অন্য দুটো লগ্নিকারীকে সরে যেতে বলতে হবে।”

সাও মু একটু দ্বিধা নিয়ে বললো, “এ ব্যাপারে … আমাকে একটু ভাবতে হবে।”

“আমি আপনাকে কেবল একটা দিন দিতে পারি ভাবার জন্য।”

“আমাদের ম্যানেজমেন্ট টিমের তিরিশ শতাংশ অংশীদারী লাগবে।”

“যেহেতু আমরা এই মাত্র আলোচনা করলাম যে আপনাদের প্রোডাক্টগুলো এখনো ক্লাস থ্রি যন্ত্রের ছাড়পত্র পায় নি, আর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে আরো দু থেকে তিন বছর লেগে যাবে, তার মানে বেশি লগ্নি, কম ফলন। এটা লগ্নিকারীর জন্য ছোটো ঝুঁকি নয়। কুড়ি শতাংশটাই যুক্তিযুক্ত।” স্থির হয়ে বসে রইলো শিন ছি।

“আটাশ শতাংশ। আমি একজন লগ্নিকারীকে পিছিয়ে যেতে রাজি করে ফেলবো। অন্য দুটো লগ্নি সংস্থা আপনার থেকে বেশি অংশীদারী দিচ্ছে।”

“কিন্তু তাঁরা কেউ আমার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না। তেইশ শতাংশ, দুটো লগ্নি সংস্থাকেই চলে যেতে হবে।”

“যদি দুটো কোম্পানিই চলে যায় , পঁচিশ শতাংশ।”

“তেইশ শতাংশ, একচেটে, আমার শেষ প্রস্তাব। আগামী কাল রাত আটটার আগে আপনাকে উত্তর দিতে হবে। না হলে আমার প্রস্তাবটা মূল্যহীন হয়ে যাবে। আর আমি ভবিষ্যতে কখনো এটার কথা ভেবেও দেখবো না।”

মিন হুয়ে চুপ করে দেখছিলো শিন ছিকে। ওর মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। ওর চোখ শান্ত আর শীতল।

সাও মু কিছুক্ষণ ভাবলো আর বললো, “ধন্যবাদ। আমি ফিরে যাই, টিমের সাথে কথা বলি। আমি আপনাকে কাল উত্তর দেবো।”

“ওকে।”

সবাই করমর্দন করলো, মিটিং শেষ হয়ে গেলো বেশ বন্ধুত্বের আবহাওয়াতেই।

এটা বেজিং-এর একটা ঠান্ডা রাত। হোটেলে ফিরে সাও মুকে জিজ্ঞেস করলো মিন হুয়ে, “তুমি বিবিজির প্রস্তাব নিয়ে কী ভাবছো? মেনে নেওয়া যায়?”

ও বিত্ত, অর্থের ব্যাপারে বিশেষ জানে না। কিন্তু ওর মনে হচ্ছিলো যে তেরো কোটি য়ুআঁ, তেইশ শতাংশ অংশীদারী বেশ ভালো শর্ত।

“আমাকে ইয়ান চেং লির সাথে কথা বলতে হবে। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে যে আমাদের পক্ষে এই প্রস্তাবটা নেওয়া কঠিন হবে।” বললো সাও মু।

"কেনো?” অবাক হয়ে জানতে চাইলো মিন হুয়ে।

“এটা একটা প্রারম্ভিক প্রস্তাব। উনি বলেছেন তেরো কোটি য়ুআঁ। কিন্তু চূড়ান্ত চুক্তি এই সংখ্যাতে নাও হতে পারে। কারণ এখনো অনেক কাজ বাকি। ও বা’অ্যানে আর্থিক ব্যবস্থা আর বিক্রিবাটার ফাঁক-ফাঁকিগুলো খুঁজে বার করবে। সেসব ভিত্তি করে ও লগ্নির পরিমাণ কমিয়ে দেবে বা লগ্নি করবেই না। যেহেতু ও একচেটে লগ্নি করবে, সেহেতু ও ছেড়ে গেলে, আর কাউকে সময় মতো খুঁজে পাওয়া মুস্কিল হবে।” বললো সাও মু “এটা অনেক কারণের একটা।”

“তাছাড়া অন্য দুটো লগ্নি কোম্পানির ল্বব্যাঁদের সাথে আমার মৌখিক কথা হয়েছে। ওঁদের একজন আবার আমার পুরোনো বন্ধু। উনি আমাকে সাহায্য করেছেন আমার স্বভাব চরিত্রের জন্য। আমি এখন আমার নিজের দেওয়া কথা ফিরিয়ে নিতে পারি না, যাতে ওঁরা মনে করেন যে বড়ো মাছ পেয়ে আমি ছোটো মাছ ছেড়ে দিয়েছি।”

“তাও ঠিক।”

“কাল দুপুরে আমি আরো দুজন লগ্নিকারির সঙ্গে দেখা করবো আর দেখবো যে ওঁদের প্রস্তাব কী কী। সেই প্রস্তাবগুলো শিন ছির প্রস্তাবের থেকে ভালোও তো হতে পারে।”

“ভালো, শুনলাম তোমার যুক্তি।”

“সব দিক দেখলে, এটা একটা ভালো প্রস্তাবই বলা যায়।”

সাও মু একটা হাসি নিয়ে বললো, “অন্য দুটো ব্যক্তিগত লগ্নিকারীর ব্যাপার না থাকলে, আমি হয়তো তখনই রাজি হয়ে যেতাম।”




~~~~~~~~~~~~

সম্পূর্ণ বই বিনামূল্যে : https://dl.bookfunnel.com/lcj5vznt96

Link to Previous Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/09/jpda-chapter-46.html

Link to following Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/09/jpda-chapter-48.html

Readers Loved