Tuesday, August 20, 2024

JPDA - Chapter 14

 ১৪. হে শিয়ান গু



গেস্টহাউসে ফেরার পথে, ট্যাক্সিতে বসেই দুজনে গভীর আলোচনায় ডুবে গেলো। পরিবার অনুসন্ধানের ওয়েবসাইট থেকে যে সব সূত্র পাওয়া গেছে সেগুলোর সবটা বিবেচনা করে বোঝা গেলো যে সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সামনে তং তিয়াঁ হাই-এর মামাতো ভাইকে খুঁজে বার করা। নিশ্চয়ই তার সাথে বাচ্চা চোরেদের যোগাযোগ আছে। না হলে তং তিয়াঁ হাই ভাবা মাত্র দত্তক নেবার বাচ্চা চটপট করে পেয়ে ছিলো কী করে? তার ওপর আবার একাধিক বাচ্চার মধ্যে থেকে তার পছন্দ মতো বাচ্চা বেছে নিতে পেরে ছিলো। 

মিন হুয়ে তখনই তং তিয়াঁ হাইকে ফোন করলো, তার মামাতো ভাইয়ের ফোন নম্বর চাইবে বলে। মামাতোভাই এটাসেটা কথার পর জানালো যে বাচ্চা দুটোকে ঝৌ লুর কাছে দিয়ে ছিলো তার বউয়ের গ্রামের একজন লোক। মামাতো ভাই এও জানালো যে হে শিয়ান গু সারা বছর নানান জায়গায় ঘুরে ঘুরে বেড়ায়, নানারকম কাজ কারবার করে থাকে। গ্রামের লোকে বলে মহিলা বেশ ওস্তাদ। বয়স এখন প্রায় পাঁচের কোঠায়। সাধারণত থাকে ইউন্নান প্রদেশে তংবি কাউন্টির একটা গ্রামে। তখন ছেলেটার জন্য চল্লিশ হাজার য়ুআঁরও বেশি চেয়ে ছিলো প্রথমে। পরে দামটা বিবেচনা করে যেহেতু হে শিয়ান গুর জামাইকে মামাতোভাইয়ের বউ একটা কাজের বন্দোবস্ত করে দিয়ে ছিলো।

মিন হুয়ে স্পষ্ট করে জানতে চায়, “আসলে মহিলা মানুষ পাচারের কারবার করে, তাই তো?”

“স্বীকার করে না কখনো সে সব কথা। বলে যে এই বাচ্চারা অতিজন্মার ফল, এদের বাপ-মায়েরা এদের প্রতিপালনে অক্ষম। সেই জন্য তারা ওকে বাচ্চার জন্য একটা ভালো পরিবার খুঁজে দিতে বলে যাতে বাচ্চার খাওয়া-পরার অভাব না হয়।”

মামাতো ভাইয়ের গলার স্বর ফোনের অন্য পাড়ে গমগম করছে। কথা বেশ অস্পষ্ট শোনাচ্ছে নাকি স্বরের জন্য। 

মিন হুয়ে আবার জানতে চাইলো, “বলেছে কী কখনো যে কোথায় পেয়ে ছিলো অন্য বাচ্চাটাকে?”

“আমি জানতে চাই নি। যারা এ ধরনের কারবার করে, তারা সবকিছু খুব চাপা দিয়ে রাখে। কার সাহস আছে এতো কথা জিজ্ঞেস করার?”

অনেকক্ষণ ধরে মিন হুয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে চললো। চেষ্টা করলো হে শিয়ান গুয়ের ফোন নাম্বার জোগাড় করতে। কিন্তু মামাতোভাই বা তার বৌয়ের সাথে হে শিয়ান গুয়ের আর কোনো যোগাযোগ নেই বহুদিন। ওরা শুধু বলতে পারলো যে যে গ্রামে হে শুয়ান গু থাকে তার নাম “আঁয়া”। তাকে যদি মিন হুয়ে খুঁজতে যায়, তবে অসুবিধে হবে না নিশ্চয়, কারণ হে শিয়ান গুকে গ্রামের সক্কলে চেনে।

ফোন রেখে মিন হুয়ে খানিক ভাবলো। তারপর শিন ছিকে বললো, “এই শিয়ান গু - নির্ঘাৎ মানুষ পাচার করে। কিন্তু এ প্রথম সারির পাচারকারী নয়। দ্বিতীয় সারির।”

“কী করে জানলি?”

“দ্যাখ, তং মিংহাও-এর জন্মদাতা-জন্মদাত্রী থাকে হারবিনে। আমার ভাইকে চুরি করে ছিলো গুয়াঁইশি প্রদেশের হেচি থেকে। একটা উত্তরে, আরেকটা দক্ষিণে। কী করে এই দুটো বাচ্চা এক হাতে এলো? এর থেকেই বুঝলাম যে হে শিয়ান গু বাচ্চার খদ্দের আর যারা বাচ্চা চুরি করেছে তাদের মধ্যেকার বিন্দু। আমি জোর দিয়ে বলতে পারি যে এর হাত দিয়েই বাচ্চা বিক্রি হয়। না জানি কতো বাচ্চা এর হাতে মরেছে। চুরি, চালান, বিক্রি - এই তিনটে ব্যাপারই এই ব্যবসার অঙ্গ। একলা তো কেউ করে না। এটা বেশ এক গোছানো অপরাধ ব্যবস্থা। গ্যাং ছাড়া ভাবা যায় না।”

“তুই বলছিস প্রায় একটা শিল্পবাণিজ্য বানিয়ে ফেলেছে এরা - একটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল চেন?”

“হ্যাঁ, তাই।”

“মনে হচ্ছে আমাদের ইউন্নান যেতেই হবে এই হে শিয়ান গুয়ের সাথে দেখা করতে।”

শিন ছি ঝটপট ফোনটা নেড়ে বললো, “পাঁচ ঘন্টা লাগে হারবিন থেকে প্লেনে কুঁমিং যেতে। তোর আইডি কার্ড দে। টিকিট কিনে নি।”

মিন হুয়ে সামান্য ঘাবড়ে গেলো। আগে দুজনের ট্রেনের টিকিট কাটার সময়ে মিন হুয়ে ওর আইডি কার্ড শিন ছিকে দিতে চায় নি। এই ভয়ে যে না জানি কী ত্রুটি চোখে পড়ে যাবে শিন ছির। শিন ছি তখন পাসপোর্ট ব্যবহার করে ছিলো টিকিট কেনার জন্য, তাই মোবাইল ফোনে টিকিট কাটতে পারে নি তখন দুজনকে দুটো আলাদা টিকিট অফিসে যেতে হয়ে ছিলো আলাদা আলাদা করে টিকিট কাটার জন্য। তবে মিন হুয়ে নিজে সু তিয়াঁর থেকে মাত্র দুমাসের ছোটো। তাই মিন হুয়ের আইডি কার্ডে মিন হুয়ের ব্যক্তিগত তথ্য যা আছে, তাতে শিন ছির খুব সন্দেহ হবার কথা নয়। নিজের ওয়ালেট বার করার মূহুর্তে মিন হুয়ের মনে হলো আরেকটা মিথ্যের, ছলনার অপরাধ বাড়ানোর থেকে, একটা অপরাধ কম করা ভালো। তাছাড়া, মিন হুয়ে কোনো ভাবেই শিন ছির টাকা পয়সার সুবিধে নিতে চায় না। তাই বললো, “দরকার নেই। তোর পাসপোর্ট নম্বর বল। আমি বুক করছি টিকিট।”

কান টেনে ধরে শিন ছি বললো, “আবার! আমি থাকতে এ সব ছোটো খাটো ব্যপারে তোকে মাথা ঘামাতে হবে না। চল, দুজনে মিলে তোর ভাইকে খুঁজি। যদি খুঁজে পাই তো তার থেকে ভালো আর কিছুই হয় না। কিন্তু যদি খুঁজে না পাই, তবে ধরে নে এটা আমাদের হানিমুন।”

তং মিংহাও-এর জন্য কুড়ি হাজার য়ুআঁরও বেশি খরচ হয়ে যাবার পরে মিন হুয়ের ব্যাঙ্ক কার্ডে আর এক পয়সাও নেই। মিন হুয়েকে ওর আইডি কার্ড বের করে দিতেই হলো শিন ছির হাতে।

শিন ছি ওপরে লেখা ঠিকানাটা একঝলক দেখে বললো, “ওয়াও! তুই বিনচেং-এ থাকিস?”

“হ্যাঁ।”

“সে তো বেশ বড়ো শহর।”

“তা বটে।”

“ওখানে তুই কী করিস? পার্ট-টাইম কাজ?”

“হ্যাঁ।”

“যে -”

শিন ছি আরো অনেক কিছু জানার চেষ্টা করছিলো। কিন্তু মিন হুয়ে আটকে দিলো, “তোর কথা বল। তুই কোথায় থাকিস?”

“নিউ ইয়র্কে, আগেই বলেছি তো।”

“নিউ ইয়র্কের কোথায়?”

“পার্ক অ্যাভিনিউ।”

“কোথায় থাকিস?”

“অ্যাপার্টমেন্টটা আমার দাদার।”

“তাহলে … তোর এখন একটা দাদা আছে।”

“হ্যাঁ।”

“তিয়াঁ তিয়াঁ, তোর কী কৌতুহল হচ্ছে? তুই আরো জানতে চাস?”

“না। আমি কিচ্ছু জানতে চাই না।”

গেস্ট হাউসে ফিরতে দুজনের রাত দশটা বেজে গেলো প্রায়। মিন হুয়ের মনে হলো যে ওর স্নানঘরে রাখা হেয়ার ড্রায়ারটা কাজ করছে না। ফ্রন্ট ডেস্কে গিয়ে সেখানে যে কর্মী আছে তাকে বললো হেয়ার ড্রায়ারটা বদলে দেবার জন্য। তখন কর্মীটি এক মধ্যবয়স্ক দম্পতির সাথে কথা বলছে। কথোপকথনের মধ্যে গিয়ে যাতে না পড়ে, সে জন্য মিন হুয়ে একপাশে সরে দাঁড়ালো।

“... আজ রাতে একটাও ঘর খালি নেই। বু হাইসা। এক ভদ্রলোক বলে ছিলেন যে আজ চলে যাবেন, কিন্তু তিনি আরো দুদিনের জন্য থেকে গেছেন।”

ফ্রন্ট ডেস্কের কর্মী ধৈর্য ধরে ব্যাখ্যা করে চললো। “কাছাকাছি কোনো হোটেলও নেই। গাড়িতে চল্লিশ মিনিট গেলে, সব থেকে কাছের হোটেলে পৌঁছোতে পারেন। হোটেলটাকে ‘সানি হোটেল’ বলে। এই রইলো ঠিকানা। আগে থেকে ফোন করার দরকার নেই। ওখানে নিশ্চয়ই জায়গা পেয়ে যাবেন। আপনাদের গাড়ি আছে? নাকি, আমি আপনাদের জন্য একটা ট্যাক্সি ডেকে দেব?”

মধ্যবয়স্ক পুরুষটির বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে। লম্বা। স্বাস্থ্যবান। মুখটা লালচে। স্যুট পরে আছেন। দেখে মনে হয় কোনো বেসরকারী ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান চালান। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলা সম্ভবত তাঁর পত্নী। ভদ্রমহিলাও প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা। তাঁর সুশ্রী মুখে ক্লান্তির ছাপ। তাঁর জামাটা গোলাপির ছোঁয়া লাগা ধূসর-বাদামী রঙের। চোখে সোনালি রিমের চশমা। তাঁকে দেখে শিক্ষিকা বলে মনে হচ্ছিলো।

“আমরা নিজেরাই গাড়ি চালিয়ে এসেছি এখানে। ওহ্‌, যদি কোনো ঘর নাই থাকে, তাও কোনো সমস্যা নেই। আমরা যদি এই সোফায় রাতটুকু বসে কাটিয়ে দিতে পারি -”

রিসেপশনের ঘরে গোল করে পেতে রাখা সোফাগুলোর দিকে দেখালেন তিনি।

মহিলা সায় দিলেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমরা এখানে আমাদের সন্তানের সাথে দেখা করতে এসেছি। আমরা ভীষণ খুশি, উত্তেজিত। আমাদের ঘুমই হবে না। একটু বসতে পেলেই হবে।”

আরো বললেন, “ওঁর হাই ব্লাড প্রেসার। এখানে থাকলে চিন্তা হবে না। এমন সময়ে গাড়ি চালানো নিতান্ত মুস্কিল।”

শুনে সবাই চমকে উঠলো। হাসপাতালটা মানসিক রোগীদের। বাড়ির লোক যারা দেখা করতে আসে, সকলকে ভীষণ দুঃখী দেখায়। খুবই অদ্ভুত যে এই দুজন ভীষণ খুশি। 



মিন হুয়ের মনেও দোলা লাগলো। জানতে চাইলো, “শুশু, আপনি কী এখানে তং মিংহাও-এর জন্য এসেছেন?”

ব্যবসায়ী মাথা নাড়লেন চটপট, “হ্যাঁ, আমি ওর বাবা। তুমি - সু তিয়াঁ? তাই না? আমাকে বলেছে, যে তুমি এখানে এসেছ তোমার ভাইকে খুঁজতে, তুমি খুঁজেও পেলে এখানে, তুমি তাকে প্রায় ফিরিয়ে নিয়েই যাচ্ছিলে। কিন্তু ডিএনএ পরীক্ষার ফল থেকে জানা গেছে যে এখানে তোমার ভাই নেই। খুবই দুঃখের কথা।”

“আমরা অবশেষে ফিরে পেয়েছি আমাদের ছেলেকে। কী ভালো! হাল ছেড়ো না।”

কথা বলতে বলতে ব্যবসায়ী পুরুষটি জোরে জোরে মিন হুয়ের হাতে ঝাঁকুনি দিচ্ছিলেন। কথা বলতে বলতে তিনি চোখের জল ফেলতে লাগলেন। মিন হুয়ে খানিকক্ষণ দুঃখ পেলো। কিছুতেই দীর্ঘশ্বাস আটকাতে পারলো না। এঁরা আসল বাবা, মা। তাঁদের জীবনে ছেলের দেখা পেয়ে তাঁরা সন্তুষ্ট। তাঁদের কিচ্ছু যায় আসে না যে ছেলের মাথাটা খারাপ। তাঁদের মনেই হয় না যে ছেলে তাঁদের বোঝা।

“শুশু, আমরা দুটো ঘর নিয়েছি। আমরা একটা ঘর আপনাদের সাথে ভাগ করে নিতে পারি।”

শিন ছি হেসে বললো, “আমি ওর সাথে একঘরে থেকে যেতে পারি।”

“অসুবিধে হবে না? নাকি?” সলজ্জ ভঙ্গীতে বললেন ইস্কুল টিচারের মতো দেখতে মহিলা। “তোমাদের কোনো অসুবিধে হবে না?”

“কিচ্ছু অসুবিধে হবে না।” মিন হুয়ে বললো, “আমরা মাত্র দুজন। আমাদের দুটো ঘর লাগবে না।”

“আর” শিন ছি মিন হুয়ের কব্জি তুলে ধরে ওঁদেরকে মিন হুয়ের আঙুলের আংটি দেখিয়ে বললো, “আমরা বিয়ে করছি।”

“ওয়াও! দুর্দান্ত।”

দু ঘন্টা পরে দুজনে বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে হাঁপাতে লাগলো।

“শিন ছি, কাল আমাদের প্লেন ধরতে হবে। এবার আমাদের থামা উচিৎ। ভালো করে ঘুমোনো দরকার।”

“আমার আত্মসংযম বরাবর ভালো। কিন্তু আমি জানি না কেনো আমি কিছুতেই নিজেকে সংযত রাখতে পারছি না যখনই তোকে দেখছি।”

“মিথ্যে বলিস না। তুই ইউনাইটেড স্টেটসে ছিলি। তুই এখনো কৌমার্য ধরে রেখেছিস? সেটা কি সত্যি?”

“নিশ্চয়ই ধরে রেখেছি। আমি কথা দিয়েছি তোকে বিয়ে করবো। অবশ্যই আমি তোকে রক্ষা করবো যেমন করা উচিৎ।”

শিন ছি হঠাৎ পাশ ফিরে নিজের শরীরের নিচে চেপে ধরলো মিন হুয়ের শরীর, “তুই আমার সূর্য, তুই আমার চাঁদ, তুই আমার তারা …”

“দ্যগ্য, তুই কী আমাকে দিয়ে একটা আস্ত সৌরমণ্ডল বানাবি?”

“হ্যাঁ, আমি তোকে একটা ছোট্টো ব্রহ্মাণ্ড দেবো।”

কথা বলা শেষ করেই, মাথা নিচু করলো আর চুমুতে ডুবে গেলো। তার জেরে মিন হুয়ে অনেকক্ষণ কথাই বলতে পারলো না। পরস্পরের সঙ্গে শক্ত করে লেপ্টে রেখেছে পরস্পরের শরীর, কেউই মোটা নয়। পেশী পেরিয়ে পরস্পরের শরীরে হাড় বিধিয়ে দিচ্ছিলো দুজনে তীক্ষ্ণতায়, জোরে। মিন হুয়ের বুকের ওপরের ছোট্টো পায়রা লড়াইতে মেতেছে শিন ছির হাতের সাথে, মিন হুয়ের পুরো শরীর নিঙড়ে সব জল যেনো বেরিয়ে যাচ্ছে।

“আমার বিশ্বাস হচ্ছে না - তোর একটাও গার্লফ্রেন্ড ছিলো না এতো বছরে?”

মিন হুয়েকে জড়িয়ে ছিলো শিন ছির দু হাত। আশ্লেষে নতুন জোয়ার ধেয়ে এলো। মিন হুয়ে গলা তুলে আওয়াজ করতে সাহস পেলো না। আবার কামড়ে ধরলো চাদর। 

“ইস্কুলে, কলেজে মেয়েরা ছিলো, আমাকে ধাওয়া করতো। কিন্তু শেষ মূহুর্তে আমি পিছিয়ে এসেছি প্রত্যেকবার।”

নরম স্বরে শিন ছি বললো, “যদি তোর সঙ্গে প্রথমবার না হতো, তাহলে আমি ভীষণ অপরাধবোধে ভুগতাম।”

“আমি কিছু মনে করতাম না।” মিন হুয়ে একদিকে মাথা হেলিয়ে জানলা দিয়ে বাইরে দেখতে লাগলো।

“আমি মনে করতাম।” মিন হুয়ের মাথাটা টেনে ফিরিয়ে দিলো শিন ছি যাতে মিন হুয়ে ওর দিকে তাকাতে পারে, “তোর ব্যাপারটা কী? তুই কী তোর প্রথমবারটা কোনো উন্মত্ত বুনো জংলী লোককে দিয়েছিস?”

মিন হুয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে মাথা ঝাঁকাল।

“তা ভালো।” শিন ছি হাসলো, মিন হুয়ের নাকে টোকা দিলো, “না হলে আমার খুব হিংসে হতো।”

খাটের পাশের আলোটার জ্যোতি ক্ষীণ। ঘরে এয়ারকন্ডিশনারের আওয়াজ গমগম করছে। কিন্তু শিন ছির চোখ দুটো শান্ত। চোখের মধ্যে প্রেমের গোলা রয়েছে যেনো। তার আঁচে ওম পেলো মিন হুয়ে।

মিন হুয়েকে জড়িয়ে ধরে রাখলো শিন ছি শক্ত করে, শিশুর মতো। মিন হুয়ের হাতের মধ্যে মাথা রেখে, ঘুমিয়ে গেলো শিগগির।

মাঝরাতে নিঃশব্দে উঠে মিন হুয়ে ফ্রন্টডেস্কে গিয়ে এক প্যাকেট সিগারেট কিনল। পিছনের উঠোনের সিঁড়িতে একলা বসে তামাকের ধোঁয়া নিতে লাগলো।

ও নিজের কথাই ভাবছে। ভাবছে নিয়তির কথা।

ভাবছে সেই অদ্ভুত মেয়েটা কেমন একটা কথা ভেবে তার নিজের জীবনটা শেষ করে দিলো আর মিন হুয়েকে ঠেলে দিলো জীবনের আরেকটা খাতে।

কেন যে সে বাসে চড়ে ছিলো। কেনো যে সে মুশুই নদীতে ঝাঁপ দিয়ে ছিলো সব ঝাপসা হয়ে এলো। 

শিন ছির উদয় যেনো মৃত্যুপথযাত্রীকে দেওয়া মরফিনের আরক। মিথ্যে আনন্দে চাপা পড়ে গেলো তীব্র যন্ত্রণা।

যাই হোক, যন্ত্রণাটা যায় নি। আছে সারাক্ষণ। 

মিন হুয়ে কংক্রিটের সিঁড়িতে বসে রইলো, একটার পর একটা সিগারেট টেনে যেতে লাগলো। শেষ করে দিলো পুরো প্যাকেটটা। সে যখন ঘরে ফিরল তখন ভোর হয়ে গেছে। পরপর দুবার খুব যত্ন করে দাঁত মাজার পরে, শিন ছির পাশে বিছানায় ফিরে গেলো, ঠান্ডা শরীরে।

শিন ছি কিছুই টের পেলো না। মিন হুয়েকে জোরে জড়িয়ে ধরলো, আধো জাগা, আধো স্বপ্নের ঘোরে।

পরের দিন খুব সকালে দুজনে জিনিসপত্র গুছিয়ে তৈরি হলো গাড়িটা মিংশুইতে ফিরিয়ে দিয়ে হারবিনে যাবার বাস ধরার জন্য। 

গাড়িতে বসা মাত্র শিন ছি জিজ্ঞেস করলো, “তুই তো তং মিংহাও-এর হাসপাতালের খরচ বাবদ সাতাশ হাজার য়ুআঁ দিয়ে ছিলি? তোকে টাকাটা ফেরত পেতে হবে নাকি হবে না?”

মিন হুয়ে দুহাত ছড়িয়ে বললো, “কিভাবে পাবো এখন? কাকে বলব এমন সময়ে? বললে ব্যাপারটা দেখাবেই বা কেমন?”

“তাছাড়া আমাদের কাছে সেই শুশুর ফোন নাম্বারও নেই। এতোক্ষণে ওঁরা চলেও গেছেন হাসপাতাল থেকে। তং তিয়াঁ হাই আর কোনো দায়িত্ব নেবে না। তাহলে টাকাটা গেলো?”

মিন হুয়ে টাকাটা চাওয়ার কথা ভাবে নি। চাওয়ার কথা ভাবতেই অপ্রস্তুত লাগছে। সাতাশ হাজার য়ুআঁ তার জীবনের সবটুকু সঞ্চয়। আর টাকাটা তার তখনই দরকার তার ভাইকে ইউন্নানে খোঁজার সময়ে। সে দ্বিধায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে।

“আমি জানি না কী করা উচিৎ।” শিন ছিকে বলতেই হলো।

“গাড়িতে অপেক্ষা কর। আমি গিয়ে নিয়ে আসছি টাকাটা।”

মিন হুয়ে ডাকল, “অ্যাই -”

ততোক্ষণে শিন ছি চলে গেছে। পনেরো মিনিট পরে যখন ও ফিরল গাড়িতে, তখন ওর হাতে একটা খাম, “এই নে। আমি ফেরত এনেছি। ওঁরা অনেক ধন্যবাদ দিয়েছেন। আর জোর করছিলেন আরো দশ হাজার য়ুআঁ দেবার জন্য। কিন্তু আমি নিতে চাই নি।”

“তুই যে কী ভালোই করলি!” মিন হুয়ে খাম খুলে ব্যাঙ্ক নোটগুলো বার করে হাত বুলোতে লাগলো। 

“এটা দিয়ে দিলে ঠিকই ছিলো, যদি তং মিংহাও-এর বাবা-মার টাকা পয়সা না থাকতো। কিন্তু দেখে যখন ওঁদের আর্থিক অবস্থা খারাপ বলে মনে হলো না …”

“দুর্দান্ত।” মিন হুয়ে একটা থাম্বস আপ দিলো শিন ছিকে। “আমিও টাকার ওস্তাদ হতে চাই।”

“আমি জানি তুই কেনো সবার প্রিয় ছিলি ছোটো বেলায়। এখনো নিশ্চয়ই তোকে সবাই খুব পছন্দ করে।”

"কেনো?”

“কারণ আমি সব্বাইকে চটিয়ে দিতাম আর তুই তাদের রাগেরও উপশম করতিস। তোর দায়িত্ব ছিলো নালিশ করা। আমার কাজ ছিলো লড়াই করা। তোর কাজ ছিলো কাঁদা। আমার কাজ ছিলো শোধ তোলা। তোর কাজ ছিলো সুন্দর হওয়া, আমার কাজ ছিলো নিষ্ঠুর হওয়া। তিয়াঁ তিয়াঁ -”

হালকা হাসলো শিন ছি। মিন হুয়ের মুখ ছুঁয়ে দিলো, “তোর পাশে থেকে তোকে আমি সব ফিরে পেতে সাহায্য করবো, যা হারিয়ে তুই যন্ত্রণা পাচ্ছিস।”


~~~~~~~~~~~~

সম্পূর্ণ বই বিনামূল্যে : https://dl.bookfunnel.com/lcj5vznt96

Link to Previous Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/08/jpda-chapter-13.html

Link to following Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/08/jpda-chapter-15.html

Monday, August 19, 2024

JPDA - Chapter 13

১৩. স্বীকারোক্তি

 আধঘন্টা পরে অবশেষে শিন ছি আর মিন হুয়ে তং মিংহাওকে ফিরিয়ে নিয়ে গেলো হাসপাতালে। পরীক্ষা করে ডাক্তাররা বললেন যে হতে পারে যে অপরিচিত লোকেদের দেখে রোগী আতঙ্কিত হয়ে গিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ওঁরা শিন ছি আর মিন হুয়েকে আরো কিছুদিন থেকে যেতে বললেন গেস্ট হাউসে, বললেন তং মিংহাও-এর সাথে আলাপ জমানোর চেষ্টা করতে।

মিন হুয়ে জানতে চাইলো, “তাহলে ও কবে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবে?”

“সেটা নির্ভর করছে রোগের বাড়বৃদ্ধির ওপর।” ডাক্তার ভাবছে যে মিন হুয়ে হয়তো খরচের কথা ভাবছে। “আপনি যেহেতু বকেয়া টাকা মিটিয়ে দিয়েছেন, হাসপাতাল এখনো কিছুদিন রোগীকে রাখতে পারবে।”

বেশ কিছুদিন? …… কতো দিন? মিন হুয়ে অল্প হলেও উতলা হচ্ছিলো।

যা হোক, এটা বাড়ি নয়। হাসপাতালে রাখার খরচ বাবদ সাতাশ হাজার য়ুঁয়াঁ হাসপাতাল থেকে তং মিংহাওকে ছাড়ানোর জন্য দিয়ে দেবার পরে মিন হুয়ের সঞ্চয়ের সবটাই চলে গেছে। এরপর তং মিংহাও হাসপাতালে থাকলে মিন হুয়েকে হয়তো শিন ছির থেকে ধার করতে হবে।

বেরোনোর সময়ে, শিন ছি আগে বাথরুমে গেলো। ডাক্তার মিন হুয়ের দিকে তাকিয়ে একটু কেশে হঠাতই জিজ্ঞেস করলেন, “ওর কী হার্ট অ্যাটাক হয়েছে?”

মিন হুয়ে এক মূহুর্তের জন্য চমকে উঠলো। তারপর ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো।

“উনি যখন ঘরে ঢুকলেন, তখন ওঁর ঠোট বেগুনী হয়ে ছিলো।”

“...... অসুখটা জন্মগত।”

“তাহলে আপনাদের সজাগ, সাবধান থাকতে হবে। কোনো ধকলের ব্যায়াম ওঁর করা চলবে না।”

“কী ধরনের ব্যায়ামে ধকল হয়?”

“দৌড়োনো, সাঁতার কাটা, বক্সিং …”

ডাক্তার আর কিছু বললেন না। আর মিন হুয়ের মনে আরো দুশ্চিন্তা ঘনিয়ে এলো। তার কেবলই মনে হতে লাগলো যে শিন ছির হার্ট একটা টাইম বোমা আর মিন হুয়ে যেনো বোম নাশ করার ওস্তাদ। ও যদি কোনো ভুল করে তো বোম ওর সামনেই ফাটবে।

ঘরের বাইরে বেরিয়ে শিন ছিকে দেখে মিন হুয়ে খেয়াল করলো শিন ছির বেগুনী ঠোঁট। সে জানে না যে এটা তার অভিজ্ঞতার অভাব নাকি তার মনের ভুল। বেগুনী রংটা এতো উজ্জ্বল যেনো মনে হচ্ছে শিন ছি লিপস্টিক লাগিয়েছে। যেনো টোয়াইলাইটের এক ভ্যাম্পায়ার। 

“তোর শরীর ভালো তো?”

“কী হতে পারে?”

“ডাক্তার বলছিলো তোর কোনো ধকলের কাজ করা চলবে না।”

শিন ছি যেনো শুনতেই পেলো না কথাগুলো। মিন হুয়ের কাঁধ জড়িয়ে ধরে বললো, “যা, যা, আমার ঘরে গিয়ে ফুটি খা দেখি।”

“দ্যগ্য, খাবার আগে চান তো করবি?” বলে মিন হুয়ে জামায় লেগে থাকা কাদার কালচে ছোপগুলো দেখালো। 

দুজনে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসলো। আবহাওয়া খুব গরম। ফেরার পথে ভিজে জামা গরমের তাতে শুকিয়ে গেছে। শরীরে রেখে গেছে জোলো গাছগাছড়া আর মরা মাছের গন্ধ। 

“তুই অমন করে বললে আমার সারা গায়ে চুলকুনি দেয়।” শিন ছি চোখ পিটপিট করলো। “তাহলে, পরে দেখা হবে।”

তারপর মিন হুয়ের মুখে চুমু দিলো। একজন নার্স পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। ওদের দুজনকে পরস্পরের আদরমগ্ন দেখে মুখে হাতচাপা দিয়ে হাসলো।

মিন হুয়ে চোখ দিয়ে শিন ছিকে পুড়িয়ে দিলো আর কি। শিন ছি মিন হুয়ের আঙুলগুলো নিজের মুখে পুরে দিয়ে কামড় লাগালো, “আমি এগুলো সত্যিই খেতে চাই …”

“এতো লোকজন চারদিকে… এদের সবার সামনে একটু সংযত হতে পারিস না?”

“তার মানে একান্তে সংযমের দরকার নেই? তিয়াঁ তিয়াঁ, কী মিষ্টি, কী মিষ্টি, বেবি!”

মিন হুয়ে হাসতেও পারলো না। কাঁদতেও পারলো না। যতোক্ষণ ও চললো সাথে সাথে, পাশে পাশ্‌ ততোক্ষণ খুনসুড়ি করতে লাগলো।


ঘরে ফিরে, স্নানঘরে গিয়ে গরম জলের ধারার নিচে দাঁড়িয়ে মিন হুয়েকে আবার উৎকন্ঠা চেপে ধরলো। 

দ্বিধা দ্বন্দে সে বার বার বডিওয়াশ লাগিয়ে যেতে লাগলো গায়ে। ওর মুখ, ওর মাথা বার বার ডলে ডলে পরিস্কার করলো। জপতে লাগলো সু তিয়াঁর নাম। 

যদি সু তিয়াঁ স্বর্গে গিয়ে থাকে, ও আশা করলো যেনো সু তিয়াঁ ওর স্বপ্নে এসে ওকে বলে যায় ওর কর্তব্য কী। তং মিংহাও এখন বেশ কিছু দিন ছাড়া পাবে না হাসপাতাল থেকে। শিন ছির কোনো ইচ্ছেই নেই মিন হুয়েকে ছেড়ে যাবার আর ওর হার্টের সার্জারি পেছোতে থাকবে। এই এলাকাটা বড়ো কোনো শহরের থেকে অনেক দূরে। হার্ট অ্যাটাক হলে শিন ছিকে বাঁচানো মুস্কিল হবে। এখন মিন হুয়ে নিজেকে সু তিয়াঁ মনে করতে শুরু করলো। সু তিয়াঁ ঘনিষ্ঠ, একনিষ্ঠ আর আবেগপ্রবণ। শিন ছি যদি এখন সত্যিটা শোনে তাহলে নিশ্চয়ই ভীষণ রেগে গিয়ে চলে যাবে নিউ ইয়র্কে আর সার্জারি যথা সময়ে হয়ে যাবে।

স্বীকারোক্তি, না গোপণীয়তা?

মিন হুয়ে নিজের সঙ্গে এমন যুদ্ধ বাধালো যে ওর পেটে ব্যাথা শুরু হয়ে গেলো। ছটফট করে দেওয়ালে কিল মারার সময় মিন হুয়ে শাওয়ারটাকে পুরোদমে চালিয়ে দিলো। গায়ে ওর গরম জল পড়তে লাগলো মুষলধারে বৃষ্টির মতো। 

মিথ্যে বলা উচিৎ হয় নি। এমন কি ভালো করার মন নিয়েও মিথ্যে বলা উচিৎ হয় নি।

যুক্তির ঘোলা জল আরো গুলিয়ে উঠতে লাগলো। এক সময়ে গুলোনোর ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণও চলে গেলো। গরম জলের তোড়ে গলদা চিংড়ির মতো টকটকে লাল হয়ে যাওয়া নিজের ত্বকের দিকে চাইলো মিন হুয়ে। ভাবলো এই মূহুর্তে শিন ছি কী ভীষণ খুশি, কী বিরক্তই না হবে সত্যিটা জানতে পারলে, কী ভীষণ ঘেন্নাই যে তখন করবে। 

হঠাৎ মিন হুয়ে ভয় পেয়ে গেলো। ও ভয় পেতে লাগলো যে সত্যি বলার ফলাফল খুব সুখের হবে তো নাই, উল্টে প্রচুর দুশ্চিন্তার কারণ আছে। ও ভয় পেতে লাগলো ওর নিজের অপরাধবোধের যন্ত্রণার কথা ভেবে। 

যদি ও প্রথম আলাপের মূহুর্তেই শিন ছিকে সত্যিটা বলে দিতো, তাহলে ও শুধু দুসংবাদের বাহক হতো। শিন ছি খুব দুঃখ পেতো কিন্তু মিন হুয়েকে ঘেন্না করতো না এতো।

কিন্তু এখন কথাটা ভেবে মিন হুয়ে আর স্থির থাকতে পারলো না। ওকে এখনই সত্যিটা বলতে হবে। 

যেভাবে হোক বলে ফেলতেই হবে সত্যিটা।

ও গরম জল বন্ধ করে দিলো। বাথরুম থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এলো, শরীর শুকনো করে নিলো। কোনো বাছাবাছি না করে একটা টিশার্ট আর একটা শর্টস পরে নিলো। ভিজে চুল শুকোনোর দরকারই বোধ করলো না। চটপট পাশের ঘরে চলে গেলো।

এবারে দরজা খুলতে অনেক সময় লাগলো।

যেই শিন ছিকে দেখতে পেলো মিন হুয়ে অমনি মিন হুয়ে বললো, “তোকে কিছু বলার আছে আমার -”

বাকি কথা বলার আগেই মিন হুয়ে নজর করলো যে শিন ছির চোখ কোঁচকানো আর মাথার চুল ভিজে। একটা কালো সিল্কের পাজামা পরে আছে। ওকে দেখে মনে হলো যে ওর ঘুম এখনো ভাঙে নি।

“তুই কী ঘুমোচ্ছিস?”

“না, আয়। বল কী বলবি।”

শিন ছি মিন হুয়েকে সোফার কাছে নিয়ে গেলো। বসলো ওর সাথে। কফি টেবিলের ওপরে কেটে রাখা ফুটির দিকে দেখালো আঙুল দিয়ে, “ফুটি খাবি?”

“কী হয়েছে তোর?”

মিন হুয়ে বেশ জোর দিয়েই জানতে চাইলো, “কী হয়েছে বল তো?”

শিন ছি আশ্বস্ত করলো, “ঠিক আছে। বিশ্রাম নিতে লাগবে শুধু।”

শিন ছিকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে। কথাটুকু বলেই ও সোফায় ঠেসান দিয়ে বসলো। চোখ বন্ধ করে বললো, “তুই বল, আমি শুনছি।”

নিজেকে শান্ত রাখার জন্য মিন হুয়ে এক খন্ড ফুটি তুলে নিলো। একটা কামড় দিলো। তারপর খন্ডটা আবার প্লেটে রেখে দিলো। শিন ছির মুখের দিকে তাকাতে সাহস করলো না। শিন ছির পায়ের দিকে তাকানোর সাহস হলো শুধু, “আমি, আমি সু তিয়াঁ নই।”

“সু তিয়াঁ নদীতে পড়ে যায়, নিরুদ্দেশ হয়ে যায় আমাকে বাঁচাতে গিয়ে ……”

“যখন আমাদের প্রথম দেখা হয়ে ছিলো আমি তখনই তোকে বলতে চেয়ে ছিলাম। কিন্তু শুনলাম তোর হার্ট অ্যাটাকের কথা। আমি দুর্ঘটনার কথা ভেবে ভয় পেয়েছি। আমি কিছু দিনের জন্য সত্যিটা তোর থেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করি, পরে কোনো একটা সময় দেখে বলব বলে। সেই থেকে আমি কোনো সুযোগই পাই নি।”

“আমি এটা ইচ্ছে করে করি নি। আমি আমার জীবনের জন্য সু তিয়াঁর কাছে ঋণী। তোর যদি রাগ হয় তো তুই আমাকে মারতেও পারিস, আমার ওপর চেঁচাতেও পারিস - তোর যা খুশি।”

মিন হুয়ে যতোক্ষণ সত্যিটা বললো, ততোক্ষণ ফুঁপিয়ে কেঁদে চললো। শুরুর থেকে সেই মূহুর্ত পর্যন্ত সবটা বলে ফেললো। তারপর বসে বসে ভাবতে লাগলো যে সবটা বলেছে কিনা। এই ভাবার সময়েও অনেকক্ষণ শিন ছি চুপ করে আছে দেখে মিন হুয়ে ভাবলো যে শিন ছি এতো রেগে আছে যে কিছু বলতে পারছে না। শেষ শব্দটা বলার পরে, খানিকটা সাহস করে শিন ছির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো, “তুই কী আমাকে ক্ষমা করতে পারবি, শিন ছি?” 

“শিন ছি?” একটু ঠেলা দিয়ে দিয়ে আবার ডাকল, “শিন ছি?”

একটা ঝটকা দিয়ে সোজা উঠে বসলো শিন ছি, “হুঁ?”

মিন হুয়ে জানতে চাইলো, “তুই কী শুনলি আমি এতোক্ষণ তোকে যা বললাম?”

শিন ছি একটু অবাক হলো। গভীরভাবে মিন হুয়েকে দেখতে লাগলো, ওর কালো দু চোখ ঝিকমিক করছে। মাথা নেড়ে বললো, “সরি …… এই মাত্র আমি ঘুমিয়ে পড়ে ছিলাম।”

“আরেকবার বলবি?”

“এর মধ্যেই?”

“আমি ওষুধ খেয়ে ছিলাম। সাধারণত ওষুধের কোনো সাইড এফেক্ট হয় না। কিন্তু জানি না, এখন কেনো জানি না আমার খুব ঘুম পাচ্ছিলো।”

“এখন কী অবস্থা?”

“ঘুম পাচ্ছে এখনো।”

“তাহলে এখানে বসে ঘুমোতে নিশ্চয়ই অসুবিধে হচ্ছে। চল, আমি বেরিয়ে যাই। তুই গিয়ে খাটে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়।”

মিন হুয়ে ওকে খাট পর্যন্ত নিয়ে গেলো। শুইয়ে দিলো। গায়ে কম্বল চাপা দিয়ে দিলো। 

শিন ছি শক্ত করে মিন হুয়ের হাতটা ধরলো। কিছুতেই ছাড়বে না। মিন হুয়ের কোনো উপায় রইলো না শিন ছির পাশে শুয়ে পড়ে ওর পিঠে হাত দিয়ে ডলে দেওয়া ছাড়া, “এখানে অস্বস্তি হচ্ছে? এখানটায় টিপে দেব?”

“আমাকে ধরে থাক।”

মিন হুয়ে বাঁ হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরলো পিছন দিক থেকে। শিন ছি মুখ ফিরিয়ে শুলো, মিন হুয়ের দু হাতের মধ্যে মাথা গুঁজে দিয়ে। বিড়বিড় করে কিছু বললো, নিজেও জানে না কী বলছে।

ওহ্‌! আবার সব বৃথা গেলো। মিন হুয়ে একটা লম্বা শ্বাস ফেললো। শিন ছির চুলে ওর আঙুলের চিরুণি চালাতে লাগলো, আর গুনগুন করতে লাগলো, “আমি সু তিয়াঁ নই, তুই কী শুনতে পাচ্ছিস? শিন ছি, আমি সু তিয়াঁ নই। আমি সু তিয়াঁ নই। আমি সত্যিই সু তিয়াঁ নই।”

“আমি জানি, তুই সু তিয়াঁ নস।” বিড়বিড়িয়ে উঠলো শিন ছি, “তুই চাস যে আমি তোকে মিন হুয়ে বলে ডাকি, ঠিক তো?”

“না …”

“আমার তোকে সু তিয়াঁ বলে ডাকতেই ভালো লাগে এখনো …” 

হায় হায়, এর মানে কী!

মিন হুয়ে জোরে জোরে ধাক্কা দিলো শিন ছিকে, শিন ছিকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টায়, যাতে সু তিয়াঁর হারিয়ে যাবার কথাটা আবার বলতে পারে। কিন্তু শিন ছি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। বাচ্চাদের মতো দ্রূত ক্ষণস্থায়ী শ্বাস পড়ছে। যেনো নিজের বাড়ির আরামে ঘুমোচ্ছে শান্ত হয়ে।

ধীরে ধীরে মিন হুয়ের মনও শান্ত হলো।

সব মিলিয়ে, যা হোক, সে সত্যিটা বলেই ফেলেছে, তাই না? যদিও শিন ছি তার বিন্দু বিসর্গও শোনে নি, তবুও সাহস করে মিন হুয়ে যে বলতে পেরেছে, সেটাই তো বেশ সাহসের কাজ!

মিন হুয়ের অনেকটা হালকা লাগলো।

ঘরের ভেতরটা এয়ারকন্ডিশনারের জন্য ঠান্ডা বেশ। মিন হুয়েও অল্প সময়ের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লো। 

যখন মিন হুয়ের ঘুম ভাঙলো, তখন খাটের পাশের টেবিলে রাখা ইলেক্ট্রনিক ঘড়িতে রাত আটটা বেজে গেছে। এয়ারকন্ডিশিনারের শব্দটা বেশ কানে লাগছে। ঘরের পর্দাগুলো টান টান করে ঢেকে রেখেছে বাইরের দৃশ্য আর আলো।

শিন ছি আগেই জেগে উঠেছে। মিন হুয়ের পাশে শুয়ে চুপ করে দেখে চলেছে ওকে। 

মিন হুয়ে একটু অপ্রস্তুত হলো, শিন ছির চেহারা দেখে। অন্য পাশে ফিরে শুলো, কিন্তু শিন ছি ওকে ফের নিজের দিকে ফিরিয়ে নিলো।

“সেদিন তুই বললি - তুই চাস না যে আমি তোর ফেলে আসা দিনগুলোর কথা জানতে চাই। কারণ সেই দিনগুলোতে যা ঘটেছে তা মনে করলেই তোর দুঃখ হয়। আমি সেই থেকে ভেবে চলেছি, যখন আমরা একসাথে ছিলাম, তখন ওই বয়সের বাচ্চাদের সঙ্গে যা হয়েছে সেটা কী যথেষ্ট দুঃখের নয়? আমাদের ভাগ্য কী আমাদের যথেষ্ট উৎপীড়ন করে নি? তুই আমাকে কেবল জিজ্ঞেস করতিস ঈশ্বর আমাদের সঙ্গে এমন করছেন কেনো? কবে এমন জীবন - এমন জীবন যাতে ঘরবাড়ি নেই, আত্মীয় পরিজন নেই - কবে শেষ হবে?”

“আমি তোকে আজ বলছি, তিয়াঁ, তিয়াঁ, তোর যদি ফেলে আসা দিনের কথা বলতে খুব কষ্ট হয়, তুই যদি সে সব কথা বলতে না চাস, তবে আমাকে সেই সব কথা বলার দরকার নেই। যাই হয়ে থাক সেই দিনগুলোতে, যতোই খারাপ হোক না কেনো সেই সব দিনের পরিস্থিতি, আমি বুঝতে পারছি। আমি তোকে ক্ষমাও করে দিলাম। আমি তোকে ভালোবাসি। দুনিয়ার কিচ্ছু সেটা বদলাতে পারবে না। আমি এসেছি তোর কাছে তোকে এটাই বলতে যে দুর্দিন শেষ হয়ে গেছে। আমি এখানে থাকি বা না থাকি, আমি সব ব্যবস্থা করে দেবো যাতে তুই স্বাভাবিক জীবন পাস একটা, তুই যেনো সুখী হোস। আমি সারা পৃথিবীর সব্বার দুঃখ দূর করতে পারবো না, আমি শুধু তোর দুঃখ ঘোচাতে চাই।”

“শিন ছি -”

“সেই জন্যই বলছি, সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে আমাকে ভালোবাস, প্লিজ। আমাকে বিশ্বাস কর, আমার ওপর নির্ভর কর, আর বাকি জীবনটা কাটিয়ে দে। সব কিছু আমার ওপরে ছেড়ে দে। কারণ এখন আমি তোর চোঙ্গফু, তোর একমাত্র আত্মীয় এই পৃথিবীতে। বুঝলি?”

মিন হুয়ের গলাটা শুকনো। ওর চোখের কোণ দিয়ে একফোঁটা জলও গড়িয়ে পড়লো। ভারী গলায় ও বললো, “আমি বুঝতে পারছি, কিন্তু -”

“এভাবে ভাব, মৃত্যু খুব গুরতর কোনো ব্যাপার নয়। যতোক্ষণ আমরা বেঁচে আছি, বাকি সবকিছু তুচ্ছ।”

শিন ছি গভীর চোখে তাকিয়ে রইলো মিন হুয়ের দিকে। ওর কালো চোখ যেনো দেশকালের সুড়ঙ্গ। মিন হুয়ের সাহসে কুলোলো না ঐ চোখের দিকে চাইতে। ভয়ে, যদি ওর আত্মা ওই চোখের গভীরে ডুবে যায়, আর ব্যাখ্যাতীত কোনো অবস্থায় পৌঁছোয়।

মিন হুয়ের ইচ্ছে করছে ডুকরে কেঁদে ওঠে এবার। অথছ চোখ ওর শুকনো খটখটে। প্রত্যুত্তরে বলার মতো কোনো শব্দ খুঁজে পেলো না। আপন মনে বার বার নিজেকে বলতে লাগলো, মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই গুরুতর নয়, মৃত্যু ছাড়া আর কিছুরই গুরুত্ব নেই, কিন্তু অবুঝ শিন ছি, তোর সু তিয়াঁ মৃত।



মরিয়া হয়ে মিন হুয়ে তাকালো শিন ছির দিকে। কিন্তু ও আশা করে নি যে শিন ছির ঠোঁটের আলতো চাপ টের পাবে। সঙ্গে সঙ্গে শিন ছি গড়িয়ে এলো কাছে, মিন হুয়ের দুহাত জড়িয়ে নিলো নিজের গলায়, আলতো চুমু দিতে লাগলো সারা শরীর জুড়ে, তলপেটেরও নিচে পর্যন্ত।

শিন ছির দু পা জড়ানো মিন হুয়ের দু পায়ে, দুহাতে জড়ানো মিন হুয়ের দু হাত, ওর পুরো শরীর বিছিয়ে আছে মিন হুয়ের শরীরের ওপরে একটা জালের মতো। মিন হুয়ে কিছুতেই নড়াচড়া করতে পারছে না।

ধীরে ধীরে জালের বাধন কঠিন হলো, মিন হুয়ে যেনো জলের ভেতরে মাছের মতো উঠে এলো, শিন ছির দু হাতের মধ্যে ছটফট করতে করতে।

শিন ছি যতো দুঃসাহসী কান্ড করে চললো, আর কেবল জিজ্ঞের করতে লাগলো, “তোর ভালো লাগছে?”

শুরুতে মিন হুয়ে শুধু সায় দিয়ে যাচ্ছিলো, শুধু চাই ছিলো শিন ছিকে খুশি করতে। ক্রমশ ও নিজে এতো উদ্দীপিত হয়ে উঠলো যে সব ভুলে গেলো। বিছানার ওপরে দুজনে গড়াগড়ি খেতে লাগলো, অ্যাক্রব্যাটের মতো নানান ভঙ্গিমায় শরীর বাঁকিয়ে চুরিয়ে। এই খেলায় ওরা দুজনে যেনো স্বর্গীয় জুটি। জৈবিক প্রবৃত্তির দেওয়া উল্লাস পূর্ণ উপভোগ করছিলো। একটা অসম্ভব উৎক্ষেপ, প্রতিপক্ষের উস্কানির উপযুক্ত সাড়া দেওয়া - মিন হুয়ে প্রায় চীৎকার করে উঠলো একসময়ে, সামলাতে জোরে কামড়ে ধরলো বিছানার চাদর। 

দুজনে খেলতে লাগলো অনেকক্ষণ ধরে। গড়িয়ে গেলো খাট থেকে মেঝের কার্পেটে, কার্পেট থেকে বেয়ে উঠলো সোফায়। মিন হুয়ের আপশোস হতে লাগলো যে বাড়ির বাইরে ব্যবহারের চাদরটা আনে নি বলে।

শিন ছির মতে এমন খেলায় নোংরা হবার সুযোগই নেই। দুজনের হুঁশ ফিরলো পেট গুড়গুড় করতে। তখন মনে পড়লো যে ওরা দুপুরেও খায় নি, রাতের খাবারও বাদ পড়ে গেছে।

আবার স্নানে গেলো, দুজনেই, এবারে একসাথে, একই কলঘরে। শিন ছি ধীরে ধীরে ডলে দিতে লাগলো মিন হুয়ের শরীর। মিন হুয়ের শরীর আনাচে কানাচে শিন ছি ছড়িয়ে দিয়েছে নানান দাগ। সেগুলোর দিকে তাকিয়ে অপ্রস্তুত গলায় জানতে চাইলো, “তং মা?”

ঠোঁট কামড়ে ধরে মাথা ঝাঁকাল মিন হুয়ে। 

এই একটা ভঙ্গিমাই উস্কানির কাজ করলো। শিন ছি চুমু দিলো মিন হুয়েকে জলের ধারার মধ্যে, জড়িয়ে ধরলো, নির্নিমেষে, যেনো ভেবে কুল পাচ্ছে না যে আর কী করে প্রেম প্রকাশ করবে। 

পর মূহুর্তেই মিন হুয়ের সমস্ত শরীরে চুমুর বর্ষণ ডেকে আনলো। আর মিন হুয়ে স্বার্থপরের মতো ভাবলো, যদি সে সু তিয়াঁ হতো তবে জীবন কী সুখেরই না হতো। 

মিন হুয়ের রাজি হয়ে গেলো বাকি জীবনটা এমন করেই কাটাতে, পরিণতি যাই হোক না কেনো।

শুধু এটুকুই আশা করা যায় যে সে দিন আসতে যেনো অনেক দেরি হয়।



রাতের খাওয়া সারা হলো গেস্ট হাউস থেকে দশ কিলোমিটার দূরের একটা স্বাস্থ্যকর রেস্টুরেন্টে। গেস্ট হাউসের খাবার শিন ছির ভালো লাগে নি। সেই জন্য এই বদলি বন্দোবস্ত। 

এর আগে অবধি মিন হুয়ে টের পায় নি যে শিন ছি খাবারের ব্যাপারে ভীষণ খুঁতখুঁতে। কী দিয়ে খাবার রান্না হয়েছে সে ব্যাপারে তার পছন্দটা বেশ নাক উঁচু ধরনেরই বলা চলে।

পুষ্টি নিয়ে তার ধারণাটা বেশ স্পষ্ট। কী খাবার অর্ডার করা যায় সে ব্যাপারে বেশ ওস্তাদ শিন ছি।

মিন হুয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। ছোটোবেলা থেকেই সে পয়সা জমায়। তাই তার রেস্টুরেন্টে যাবার সুযোগ খুব একটা হয় নি। যদি সে অর্ডার করে খাবার তো সেগুলো সব বিশেষ পদই হবে যেমন সিচুয়ানের পদ, হুনানের পদ বা ইউন্নানের পদ। এই ধরনের খাবারের একটা বা দুটো পদ অর্ডার করলেই পেটও ভরে, মনও খুশি হয়ে যায়। আলে-কালে এমন খাবারের সুযোগ ঘটে বলে সে খায়ও বেশি, আই-ঢাই করে তারপর, এমন কি বুকও জ্বালা করে পরে।

যে পদগুলো শিন ছি অর্ডার করলো সেগুলো সবই হালকা। খাঁটি পুষ্টিগুণে ভরা। আবার প্রত্যেকটারই কোনো না কোনো বিশেষত্ব আছে।

যেমন মাশরুম স্যুপ। এতে কেবল মাশরুম আর ব্যাক্টেরিয়া আছে। এক প্লেট অ্যাসপারাগাস, জলে ফুটিয়ে ফর্সা করে দেওয়া। এমন কি মিন হুয়ে ঝালমশলা দেওয়া খাবার পছন্দ করে সেটা জানে বলে শিন ছি এক প্লেট সানশো মরিচ আর ঝিনুক দেওয়া বেগুন সেদ্ধও অর্ডার করলো।

কথা বলার আনন্দও আছে। শিন ছি খবু ভালো জানে কথা বলার জন্য কোনো বিষয় কিভাবে বেছে নিতে হবে। খুব ভালো জানে কী করে শব্দের মানে ধরতে হবে, সহজেই পাশ কাটিয়েও যেতে পেরে সেই সব বিষয়গুলো যেগুলো নিয়ে মিন হুয়ে কথা বলতে চায় না। 

কেউই অতীত নিয়ে কোনো কথা বললো না। কেউই অন্যের অতীত খুঁড়ে বের করার চেষ্টা করলো না। দুজনেরই হালের বন্দোবস্তটা বেশ আরামদায়ক লাগলো। 

মিন হুয়ে তো ঠাট্টাই করে ফেললো যে তারা যেনো একজোড়া নেটিজেন যারা ঘরের বাইরে পা রেখেছে যৌনতার সন্ধানে যতক্ষণ যৌনতা ভালো লাগবে ততক্ষণ পরস্পরের সঙ্গে থাকবে।

মিন হুয়ের আঙুলের আঙটিটা দেখিয়ে শিন ছি বললো যে যেই মিন হুয়ে সায় দেবে, অমনি শিন ছি যেখানেই হোক, যখনই হোক মিন হুয়েকে বিয়ে করবে। 

দাবা খেলা ছাড়াও দুজনের মধ্যে আরো অনেক মিল বেরোলো। দুজনেই ইউরোপের ইতিহাস পড়তে ভালো বাসে। দুজনেরই উৎসাহ ল্যাঙ্কাস্টার আর ইয়র্কের পরিবারগুলোর মধ্যে ১৪৫৫ থেকে ১৪৮৫-এর মধ্যে হওয়া যুদ্ধগুলোর বিষয়ে, যেগুলো ইতিহাসে দ্য ওয়ার অফ রোজেস নামে খ্যাত। দুজনেরই উৎসাহ জ্যাজ সঙ্গীতে আর আমেরিকান টিভি সিরিজে। ওরা ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলে গেলেও উৎসাহে বিন্দুমাত্র ভাঁটা পড়ে না।

দুজনেরই খিদে পেয়েছে। তাই খুব উৎসাহ নিয়ে খেলো দুজনেই। পড়ে থাকা বিন স্প্রাউটস মুখের মধ্যে ঠুসে দিয়ে শিন ছি বললো, “তিয়াঁ তিয়াঁ, তুই কী জানিস কিসে তুই আমাকে অবাক করে দিলি?”

“কিসে?”

“তুই আমার থেকে বেশি বুদ্ধিমান।”

“মোটেই না।”

“সত্যিই, তুই হয়তো নিজে নজর করিস নি, কিন্তু আমি নজর করেছি। তুই আমার থেকে অনেক বেশি বুদ্ধিমান। আমি খুব খুশি হয়েছি।”

মিন হুয়ে হেসে জানতে চাইলো, “খুশি কেনো? হিংসে নয় কেনো?”

“আমার মাথা গরম ছিলো … তার কারণ খানিকটা …… তুই ভীষণ স্লথ ছিলিস সব কাজে …… উম্‌ … তাতে আমার দুশ্চিন্তা হতো। অনেক সময় আমি অধৈর্যও হয়ে পড়তাম।”

“এখন?”

“প্রথমত, আমাকে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। আমার আর অতো রাগও হবে না। দ্বিতীয়ত, তোর ব্যাপারে আমার ভীষণ কৌতুহল হচ্ছে। কারণ আমি গোড়ার কথা কিছুই জানি না।”

“সে তো আমারও কৌতুহল হচ্ছে।”

“কী জানতে চাস আমার ব্যাপারে। জিজ্ঞেস করলেই পারিস।”

মিন হুয়ে তাড়াতাড়ি মাথা নাড়লো, “না, আমি কিছু জানতে চাই না।”

শিন ছি মৃদু হাসলো মিন হুয়ের দিকে তাকিয়ে, “তুই আরো বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছিস।”

ফোনটা বেজে উঠলো, একটা মেসেজ এসেছে। মিন হুয়ে উইচ্যাট খুলে দেখলো পরিবারের খোঁজখবর করার ওয়েবসাইট থেকে একজন ভলান্টিয়ার বলেছেন, “সু তিয়াঁ, ডিএনএ পরীক্ষার ফল এসে গেছে। আমরা দুঃখিত, তং মিয়াংহাও তোমার ভাই নয়। একটা ব্লাইন্ড কম্প্যারিসনে দেখা গেছে যে মিল আছে হারবিন শহরের কারুর সাথে। ওখানকার এক দম্পতি এখন মিংশুই কাউন্টিতে যাচ্ছেন।”

মিন হুয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ফোনটা শিন ছির দিকে বাড়িয়ে দিলো যাতে শিন ছি দেখতে পায় যে মেসেজে কী লেখা আছে। 

“ও তোর ভাই নয়?”

“কী করা উচিৎ আমার?”

“খুঁজতে থাক।”

“সব সূত্র কেটে গেলো। কতোদিন লাগবে খুঁজে পেতে কে জানে।”

মিন হুয়ে হঠাৎ শিন ছির হাত জড়িয়ে ধরলো আর খুব গম্ভীরভাবে বললো, “শিন ছি, তুই আগে নিউ ইয়র্ক ফিরে যা। দুজনে কাজগুলো ভাগ করে নি। তুই সার্জারি করে নে। আমি ভাইকে খুঁজতে থাকি এখানে। যখন তুই সুস্থ হবি, ফিরে আসবি এখানে, চোঙ্গুয়াতে। আর আমরা এক সাথে ভাইকে খুঁজবো।”

“না। তোর পক্ষে একা ওর খোঁজ করা নিরাপদ নয়। আমি তোর সঙ্গে থাকবো। আর সূত্র কিচ্ছু ছিঁড়ে যায় নি। তুই ভুলে গেছিস তং তিয়াঁ হাই কী বলে ছিলো। ও বলে ছিলো যে ও যখন ওর ছেলেকে নিতে গিয়ে ছিলো তখন দুটো বাচ্চা ছিলো, দুজনেরই বয়স এক বছর। একজন রোগা, কালো। অন্যজন ফর্সা আর স্বাস্থ্যবান। হয়তো রোগা, কালো ছেলেটা তোর ভাই?”

“হু, আমি একথা ভাবি নি কেনো?”





~~~~~~~~~~~~

সম্পূর্ণ বই বিনামূল্যে : https://dl.bookfunnel.com/lcj5vznt96

Link to Previous Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/08/jpda-chapter-12.html

Link to following Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/08/jpda-chapter-14.html

Readers Loved