Thursday, September 19, 2024

JPDA - Chapter 44

 ৪৪. দারুচিনি কেক



ডেডলাইনের চব্বিশ ঘন্টা আগেই, মিন হুয়ে সম্পূর্ণ তৈরি করে ফেললো জিএস১.০-র ডায়াবেটিস স্ক্রিনিং ফাংশন। টেস্টের জন্য একটা পুরো দিন পাওয়া গেলো। পরদিন য়ুআঁলাই হেডকোয়ার্টার্সে খুব ধুমধাম করে প্রোডাক্টটা বাজারে আনা হলো। সংবাদমাধ্যমকে ডাকা হয়ে ছিলো। নানান সংবাদ চ্যানেলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রোডাক্টটার কথা আলোচনা হতে লাগলো। শিল্পক্ষেত্রে হইহই শুরু হয়ে গেলো।

একই সময়ে য়ুআঁলাই যাঁরা বা’অ্যান কিনতে পারেন তাঁদের কাছে বা’অ্যান বিক্রি করার জন্য নানান প্রচারমূলক বিবরণ পাঠাতে শুরু করলো। উৎসাহী হবেন যাঁরা কিনতে তাঁরা যেনো প্রথম প্রস্থের নিলামের বিবরণের জন্য যোগাযোগ করেন।

কাজটা স্বচ্ছন্দে হয়ে গেলো, মিন হুয়ের মরিয়া ওভারটাইমের কারণে আর শিন ছির ‘ন্যানি’ টিমের পূর্ণ সহযোগিতায়।

দুজন ন্যানি সমান তালে দিনে দুবার তাঁদের কাজের সময়ে নিরলসভাবে উপস্থিত থেকেছেন। ইয়ুন লু দিনের তিনটে খাবার জুগিয়ে গেছে। তা ছাড়া টিউটররা এসেছেন সু ছনকে নানান বিষয়ে শিক্ষিত করতে। সু ছনের জীবনের শেখার আর খেলার সময় পুরো গোছানো হয়ে গেছে।

ন্যানিরা জানিয়ে ছিলেন যে শিন ছি রোজ দিনে একবার করে সু ছনের সাথে ভিডিও কলে কথা বলেছেন। কিন্তু মিন হুয়ে এতো ব্যস্ত ছিলো যে কিছুতেই সময় করে একবারও কথা বলতে পারে নি শিন ছির সাথে।

যখন মিন হুয়ে বাড়ি ফিরতো কাজের থেকে তখন বাচ্চা এমনিই ক্লান্ত হয়ে থাকতো। ঘুমোনোর জন্য অপেক্ষা কেবল। মিন হুয়ে মাত্র তিন মিনিটের জন্য গল্প পড়ে শোনালেই সু ছন ঘুমিয়ে কাদা হয়ে যেতো। 



জীবন বেশ সুন্দর।

গুড়ের ওপরে উড়তে থাকা মাছির মতো জেগে আছে একটাই ব্যাপারঃ য়িন শু এখনো স্বীকার করে নি ওর দোষ সাও মুয়ের কাছে। সাও মুকে খোশমেজাজে হাসতে আর কথা বলতে দেখে, রোজ স্বাভাবিক আচরণ করতে দেখে মিন হুয়ের কেবল মনে হতে লাগলো যে ও যেনো একটা ভুতকে পুষে রেখেছে নিজের মধ্যে।

য়ে শও ঝেনকে তাড়িয়ে দেবার পরের দিনই, মিন হুয়ে বিনচেং ইউনিভার্সিটির “ওয়ার্ক-স্টাডি সেন্টার”-এ ফোন করে ছিলো। ওঁদেরকে জানিয়ে ছিলো য়ে শও ঝেনের অসদাচরণের কথা। প্রমাণ হিসেবে রেকর্ডিং-টাও দিয়ে ছিলো।

তারপরে ব্যাপারটা সাংবাদিকতা বিভাগের প্রশাসনিক অফিসেও জানানো হয়ে ছিলো। ওঁরা জানিয়েছেন যে তদন্তের পরে গুরুত্বের সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিন দিন পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিষয়ক অধিকরণ মিন হুয়েকে ফোন করে জানালো যে য়ে শও ঝেনের আচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে আর অন্যদের ওপরেও একটা ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে, সেই জন্য য়ে শও ঝেনকে শাস্তি হিসেবে “একবারের জন্য কৃতিত্ব দেওয়া হবে না" তাছাড়া য়ে শও ঝেনকে আর কখনো টিউটরের কাজও করতে দেওয়া হবে না। তার সঙ্গে চলে গেলো ওর নানান পুরস্কার আর স্কলারশিপ পাবার যোগ্যতা, আর নানান অনুদান পাবার যোগ্যতা।

য়ে শও ঝেন আর কখনো জিয়া জুনের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে নি। সাও মুও কিছুদিনের অবকাশ নেবার অজুহাত পেলো। আর ঝামেলাটা কেটে গেলো।

কঠিন পরিশ্রমের দিনগুলো সবে পার হয়েছে। বা’অ্যানও মার্জার আর অ্যাক্যুইজিসনের প্রস্তুতি পর্বে। 

রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর হিসেবে মিন হুয়েকে ধাপে ধাপে এই বছরের কাজের পরিকল্পনাটা পূরণ করতে হবে আর তার সাথে পাব্লিসিটি আর ডেমনস্ট্রেসন ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে কাজ করতে হবে। সে নিজে কোনো অংশ নেবে না মার্জার আর অ্যাকুইজিসনের কাজে। এর জন্য হেডকোয়ার্টার্সের একটা বিশেষ গোষ্ঠী কাজ করছে।

যখন বা’অ্যানের কাছে কাজটা আসে, তখন হে হাই শিয়াং, সাও মু আর কোম্পানির চিফ ফিনান্সিয়াল অফিসার ইয়ান চেন লি নির্দিষ্ট টিমের সাথে যোগাযোগ করেন নানান জিনিসপত্র বানানোর জন্য, নানান তথ্যের স্মারক বানানোর জন্য, এরকম আরো অনেক কিছুর জন্য।

সেই জন্য রোজই সাও মু অভিযোগ করতে থাকে যে ওঁর সময় নেই ঘুরতে যাবার বা বেড়াতে যাবার। কিন্তু তুলনায় মিন হুয়ে অনেক নিরুদ্বেগে কাটাচ্ছিলো। বড়ো সপ্তাহান্তের সুযোগে মিন হুয়ে পুরো টিমকে পাহাড়ি রিসর্ট ফুংহুয়াং শানে নিয়ে গেলো।

পাহাড়ি রিসর্ট ফুংহুয়াং শান


সু ছন ওর সঙ্গে গেলো পুরো পথ। সবাই দারুণ সময় কাটালো খেলাধূলোর মধ্যে। মিন হুয়ে সোমবার কাজে ফিরল নতুন উৎসাহ নিয়ে। চোখের তলার কালি অনেকটাই মুছে গেলো যেনো।

নিয়মের মিটিং-এর পরে হে হাই শিয়াং ডাকলেন মিন হুয়েকে নিজের অফিসে। হাসি মুখে বললেন, “বেজিং-এ যাও। একটা বিজনেস ট্রিপে, আগামী শুক্রবার। এআই ম্যাক্স চোঙ্গুয়ো ইন্টেলিজেন্ট এলিট সামিট -এ। হেডকোয়ার্টার্সের দরকার জিএস১.০-এর প্রভাবটা আরো ছড়িয়ে দেবার। আমি একটা ফোরামের ব্যবস্থা করেছি যেখানে তুমি একটা প্রেজেন্টেসন দেবে। আচরণে সংযম রেখো আর বা’অ্যানকে গর্বিত কোরো।”

“অবশ্যই" উত্তেজিত হয়ে বললো মিন হুয়ে।

এআই ম্যাক্স চোঙ্গুয়োতে সবথেকে উঁচু দরের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সম্মেলন। প্রত্যেক বছর ওখানে যাবার জন্য মিন হুয়ে প্রচুর খাটে। 

প্রেজেন্টেসনের সুযোগটা বিরল ব্যাপার। সাধারণত, শিল্পক্ষেত্রের খুব নামী অভিজাত জনেরাই এই সুযোগ পেয়ে থাকেন। 

কপাল ভালো যে মিন হুয়ের খুব বেশি সময়ের দরকার নেই তৈরি হবার জন্য। এর মধ্যেই দুটো ছোটোখাটো ব্যবসায়িক মিটিং-এ ও একই রকমের বিষয়বস্তু নিয়ে বক্তব্য রেখেছে, হেডকোয়ার্টার্সের প্রচারের অংশ হিসেবে। সমস্ত বিষয়বস্তু, ছবি আর তথ্য ওর হাতের মুঠোতেই আছে।

***



কাজের শেষে অফিস ছেড়ে বেরিয়ে, রাস্তার কোণের একটা স্টারবাক্সের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো মিন হুয়ে। এক কাপ আমেরিকানো কিনে নিলো।

দোকানের ভেতরটা প্রায় ফাঁকাই আছে দেখে একটা বসার জায়গা পেয়ে বসে পড়লো, কম্পিউটার বার করে পিপিটি বদলে এআইম্যাক্সের উপযোগী করে নিচ্ছিলো।

ওর অজান্তে, আধঘন্টাটাক পরে কেউ ওর সামনে এসে দাঁড়িয়ে টেবিলের ওপরে আঙুলের টোকা দিয়ে ডাকল, “মিন হুয়ে”।

ও চোখ তুলে তাকিয়ে দেখলো চেং ছিরাং। মিন হুয়ের মুখের হাসি হঠাৎ মিলিয়ে গেলো।

“কী কাকতালীয়, তোমার সাথে আবার দেখা হয়ে গেলো,” দরাজ ভঙ্গিমায় বসে পড়লেন উনি, “তোমার সাথে কথা বলার মতো কতকগুলো বিষয় ঠিক এখনই আমার মনে এলো।”

“...”

“এখানে দারুচিনি কেকগুলো খুব ভালো। আমি দুটো অর্ডার করছি। ঠিক আছে, এখানে আসছে। আমার মনে আছে যে তুমি খেতে পছন্দ করতে -”

তার আগেই -

মিন হুয়ে উপহাস না করে পারলো না।

*****

“আর অ্যান্ড ডি-র বড়ো বুকওয়ালা মেয়েটা” ছিলো ওর প্রথম ডাকনাম। চৌত্রিশের সি খুব বড়ো নয়। কিন্তু পুরো ডিপার্টমেন্টে মাত্র চারটে মেয়ে ছিলো। আর অন্য তিনজন সবাই ‘এ’। ও যবে থেকে যাতায়াত শুরু করলো, ও হয়ে উঠলো সেই মেয়েটা যার স্তন বড়ো। যখনই ও রেস্টুরেন্টে যাবে খেতে, তখনই পিছন থেকে কেউ না কেউ সিটি দেবে। 

গুয়ান ছাও -তে ওর কাজ করতে শুরু করার দ্বিতীয় দিনেই, ও ভিড়ের মধ্যে দিয়ে হাঁটছিলো হাতে এক গোছা কাগজপত্র নিয়ে। কেউ ওর নিতম্ব ছুঁয়ে দিয়ে ছিলো। হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে ও দেখতে পেয়ে ছিলো চারটে ছেলে গা লাগালাগি করে হাঁটছে ওর পিছন পিছন। ওর মুখে রাগ দেখে ছেলেগুলো ভান করলো যেনো ঘাবড়ে গেছে। ও ওদের দিকে তাকিয়ে ছিলো আর ওরাও তাকিয়ে ছিলো ওর দিকে, হাসি মুখে, মাথা নাড়তে নাড়তে, কাঁধ ঝাকিয়ে।

ঐ টিমের দায়িত্বে ছিলেন ওয়াং তং য়ুআঁ। লোকটার বয়স তিরিশের ঘরে, শুরুর দিকে, ফর্সা মুখ আর হালকা দাড়ি। লোকটা হালকা মোটা ছিলো আর ওর মুখ ভর্তি হালকা বাদামী রঙের ছিটে ছিলো। কাজে যেতে শুরু করার প্রথম একমাসের মধ্যেই ওয়াং তং য়ুআঁ নানান অছিলায় মিন হুয়েকে অফিসে অনেক দেরী অবধি থাকতে বলতো ওভারটাইম করার জন্য।

ওভারটাইম হয়ে গেলেও , মিন হুয়েকে যেতে দিতো না। ওকে নিজের সঙ্গে রাতের খাবার খেতে বাধ্য করতো। আর তারপরে ওকে নিজের গাড়িতে চড়িয়ে বাড়ি পৌঁছে দিতো।

মানা করতে গেলে মিন হুয়ে বিব্রত হতো। সবটাই কাজ যা হোক। মাথার ঠিক ওপরে থাকা লোকটাকে চটালে চলে না।

খুব বেশি দিন কাটতে না কাটতেই ওয়াং তং য়ুআঁ খোলাখুলি মিন হুয়েকে প্রেম নিবেদন করতে লাগলো, ফুল দিয়ে, রাতে খেতে নিয়ে যেতে চেয়ে, নানান উপহার দিয়ে, যার সবটাই বিনয়ের সঙ্গে মিন হুয়ে প্রত্যাখ্যান করে ছিলো।

ওয়াং তং য়ুআঁ ভেবে নিয়ে ছিলো যে মিন হুয়ে বুঝি লাজুক। তাই সে আরো বেশি করে উঠে পড়ে লেগে ছিলো মিন হুয়েকে রাজি করানোর জন্য। কঠিন নিবের পেন দিয়ে সুন্দর ক্যালিগ্রাফি লিখে ছিলো, প্রতিদিন একটা করে প্রেমের কবিতা নকল করে আনতো মিন হুয়ের জন্য, আর সেটা সেঁটে দিতো মিন হুয়ের মনিটরে, যেটা একটা সময়ের পরে আর অ্যান্ড ডি ডিপার্টমেন্টে একটা রসিকতা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। 

হেনস্থা হতে হতে মিন হুয়ে একদিন ওয়াং তং য়ুআঁকে একটা ভীষণ কড়া ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে ছিলো আর জানিয়ে ছিলো যে ওয়াং তং য়ুআঁ নিজের কীর্তিকলাপ বন্ধ না করলে মিন হুয়ে হিউম্যান রিসোর্স ডিপার্টমেন্টে নালিশ করবে।

কেবল তারপরেই ওয়াং তং য়ুআঁ নিজেকে সংযত করে, কিন্তু ও অসন্তুষ্ট হয়ে ছিলো। কাজের জায়গায় নানা ভাবে মিন হুয়ে খাটো দেখাতে শুরু করে ওয়াং তং য়ুআঁ। মিন হুয়ের মূল্যায়নের নম্বর সব সময়ে কম দিতে থাকে। বলে যে মিন হুয়ে দূর্বল আর সংযোগ করতে পারে না। সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট থেকে মিন হুয়েকে বাদ দিয়ে দেয়।

পরের দু মাস, মিন হুয়ের প্রায় কোনো কাজ ছিলো না, অলস বসে ছিলো প্রায়, ঐ সময়ে ওয়াং তং য়ুআঁ ওকে পাঠাতে ওর কলিগদের জন্য কফি আনতে, বাক্সে ভরা দুপুরের খাবার নিয়ে আসার জন্য, এমনকি টাইপ করে নানান বিষয়ের নথি নকল করতেও দিতো। 

ঠিক এমন সময়ে মিন হুয়ের মায়ের ক্যান্সার ধরা পড়ে। 

মিন হুয়ে ভয় পাচ্ছিলো যে ও র কাজটা চলে যাবে, মাইনেটাও যাবে। সেই জন্য ও আরো সাবধানী হয়ে উঠছিলো। 

সেই সময়ে ওর সাথে দেখা হয় চেং ছিরাং-এর।

যখন চেং ছিরাং নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা প্রতিবেদন দিতে গিয়ে ছিলেন, তখন উনি একজন অধ্যাপকের থেকে মিন হুয়ের নাম শোনেন। 

গুয়ান ছাওতে ফেরার পরে উনি মিন হুয়ের তথ্য সব যাচাই করে দেখেন। উনি মিন হুয়েকে জিজ্ঞাসা করেন যে কেনো মিন হুয়ে আর অ্যান্ড ডি-এর মূল কাজগুলোতে অংশ নেয় নি। মিন হুয়ে জানতো না যে এই প্রশ্নের উত্তর দেবে কী করে। তাই উত্তরে ও জানিয়ে ছিলো যে ওর নিয়োগ তখনো পাকা হয় নি। 

“আমি তোমার লেখা প্রোগ্রাম দেখেছি। খুব ভালো। তোমাকে অলস বসিয়ে রাখার মানেই হয় না।” বলে ছিলেন চেং ছিরাং।

“তাহলে আমাকে কোনো একটা কাজে লাগিয়ে দিন।” মিন হুয়ে মনের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ সব চেপে রেখে ছিলো।

“কোন প্রজেক্টে কাজ করতে চাও?”

“ব্ল্যাক ডট।”

“ওয়াং তং য়ুআঁ এটার দায়িত্বে আছে না? তোমার টিম লিডার?”

“হ্যাঁ”

“আমি তোমার মূল্যায়ণ পড়ছিলাম, এতে লেখা আছে যে তুমি একেবারেই প্রোগ্রাম লিখতে পারো না।”

“আপনি যদি আমাকে টিম লিডার করে দেন তো আমি ওয়াং তং য়ুআঁর থেকে বেশি ভালো কাজ করবো।”

“তুমি যদি টিম লিডার হও তো ওয়াং তং য়ুআঁ কী করবে?”

“আমি জানি না,’ শান্তভাবে বলে ছিলো মিন হুয়ে, “সেটা আপনি ঠিক করবেন।”

মিন হুয়ের দিকে দেখে ছিলেন তাকিয়ে চেং ছিরাং, বেশ খানিক ক্ষণ পরে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে হাসতে হাসতে বলে ছিলেন, “বেহায়া মেয়ে, তুমি জানো তুমি সিটিও-র সাথে কথা বলছো?”

ওয়াং তং য়ুআঁকে পরের দিনই বদলি করে দেওয়া হয়ে ছিলো। চেং ছিরাং ব্ল্যাক ডটের টিম লিডার করে দেন মিন হুয়েকে। 

বেশ কিছু দিন, গুজব রটে গেলো, বলা হতে লাগলো মিন হুয়ে নাকি ‘বুক’ ব্যবহার করে জন সংযোগ করার জন্য।

*****



দারুচিনি কেকের গন্ধটা লোভনীয়।

মিন হুয়ে তখনই উঠে যেতে চাই ছিলো। কিন্তু ও সে কথা চেং ছিরাং-এর সামনে স্বীকার করতে চাই ছিলো না। 

“বাচ্চা সেরে উঠছে?” জানতে চাইলেন চেং ছিরাং, “আমার বাবা তো বললেন যে অপেরসনটা সফল।”

ওঁর কথার সুর খুবই দয়ার্দ্র। কিন্তু মিন হুয়ের জবাবটা কঠোর, “ও ভালোই সেরে উঠছে।”

“তোমার ছেলের পরিস্থিতি বেশ জটিল। আমার বাবা ওঁর সমস্ত শক্তি দিয়ে অপরেসনটা করেছেন। হয়ে যেতে, বাড়িতে এসে উনি জানতে চাইলেন আমার কাছে যে এই সু ছন ওঁর নাতি কিনা।”

অবাক হবার কিছুই নেই যে চেং গুয়াং য়ি সিঙ্গাপুর থেকে দৌড়ে আসতে দ্বিধা করেন নি। 

চারদিকে জোর গুজব ছড়িয়ে গেছে যে সু ছন নাকি চেং ছিরাং-এর অবৈধ সন্তান, আর ওঁদের দুজনেরই রক্ত বি গ্রুপের।

জানলার বাইরে আকাশটা হঠাৎ অন্ধকার হয়ে এলো। মিন হুয়ে কোনো কথারই উত্তর দিলো না। কিন্তু নিজের হাত ঘড়ির দিকে তাকালো, উঠে যাবার পরিকল্পনা করছে।

এমন সময়ে অনেক উৎসাহ নিয়ে চেং ছিরাং আসল কথাটা পাড়লেন, “য়ুআঁলাই উঠে পড়ে লেগেছে বা’অ্যান বেচে দেবে বলে। বেচার কাজটা হবে সর্বসমক্ষে নিলাম ডেকে। গুয়ান ছাও ইন্টারন্যাশন্যাল খুবই উৎসাহী বা’অ্যান কেনার ব্যাপারে। আমরা প্রোমোসনের নথি সব পেয়েছি, এখন আমরা প্রথম দফার নিলামের জন্য কাগজপত্র তৈরি করছি।”

মিন হুয়ের হৃদয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেলো, যেনো ওর সমস্ত হাড়ও ঠান্ডা হয়ে গেলো। 

মিন হুয়ে খুব অবাক হয়ে গেলো। ওর সাথে চেং ছিরাং-এর ঝগড়াটা শিল্পক্ষেত্রের সবাই ভালোই জানে। 

অনেকগুলো বছর কেটে গেছে, দুজনের মধ্যে কোনো যোগাযোগ নেই। যদিও জনসমক্ষে কখনো কখনো একে অপরের মুখোমুখি হয়ে গেছে, দুজনেই মুখোমুখি হয়ে পড়ার সম্ভাবনাটা সাধ্য মত এড়িয়ে গেছে ভয়ে। ওঁর স্ত্রী ঝেং য়ি তিং-ও ব্যাপারটা নিয়ে খুব চিন্তিত।

অপ্রত্যাশিতভাবে ইনিও বা’অ্যান কিনতে চান। 

“আমরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল চেনটার উন্নতি করেছি, এআই ব্যবহার করে একটা ডাক্তার আর রুগীর যোগাযোগের প্ল্যাটফর্মও বানিয়েছি। বা’অ্যান জুড়ে নিলে আমাদের পরিষেবার সংখ্যা বাড়বে। বিশেষত তোমাদের জিএস১.০। আমি আশা করবো এটাকে আমাদের প্ল্যাটফর্মে জুড়ে দেওয়া হবে।”

চেং ছিরাং আস্তে আস্তে বললো, “মিন হুয়ে, কিছু অশান্তি জমে আছে তোমার আর আমার মধ্যে। আমরা সেটা পেরিয়ে এসেছি। তুমি যদি তখন আমার জায়গায় থাকতে, তুমি বুঝতে পারতে আমি যা করেছি সেটা কেনো করেছি। তুমিই সেই সময়টাকে আঁকড়ে পড়ে আছো, ছাড়ছো না। এতে আমরা দুজনেই আহত হচ্ছি।”

“আপনি পেরিয়ে এসেছেন।” উদাস হয়ে বললো মিন হুয়ে, “আমি পেরোয় নি।”

“মানুষ ভুলো। যদি তুমি ভুলতে পারো, তবেই এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর চাপে তুমি গুঁড়িয়ে ছাতু হয়ে যাবে না।”

হালকা সুরে বললো চেং ছিরাং, “তাছাড়া, আমি তোমাকে কিচ্ছু করি নি। আমি তোমার কাছে যেতে চেয়ে ছিলাম কারণ আমি তোমাকে হৃদয়ের গভীরের অনুভূতিতে পছন্দ করতাম। কিন্তু তুমি যা করেছিলে তা আমাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতো।”

লোকটা একবার মিন হুয়েকে ধ্বংস করে দিয়েছে, ভাবলো মিন হুয়ে মনে মনে। 

চার বছর আগের সেই দৃশ্যটা ও কিছুতেও ভুলতে পারবে না …

কোনো আঁচ অবধি মিন হুয়ে কখনো পায় নি যে ওরকম ঘটতে চলেছে।

চেং ছিরাং-এর অফিসে একটা নিয়মিত রিপোর্ট দেবার সময় ছিলো তখন। মিন হুয়ে বাকপটুতার সঙ্গে বলে চলে ছিলো, ব্লু ডটের কাজ কতদূর এগিয়েছে সেই সব। লোকটা দাঁড়িয়ে ছিলো মিন হুয়ের মুখোমুখি। চুপ করে শুনছিলো। কখনো পায়চারি করছিলো, কখনো প্রশ্ন করছিলো।

চেং ছিরাং-এর পিছনে একটা বিশাল কাচের দেওয়াল। দুপুরের সূর্য তখন চকমকে, উল্টোদিকের দেওয়ালে টাঙানো তেল রঙে আঁকা হালকা ধূসর রঙের ছবিতে দু জনের ছায়া ফেলে ছিলো। 

কিন্তু যৌনতা হামলে পড়া মাত্র লোকটা হেসে ছিলো, নেচে ছিলো, কিন্তু টেরও পায় নি যে ওর অভিব্যক্তি বদলে গিয়ে ছিলো পুরোপুরি। 

হঠাৎ করে মিন হুয়েকে ঠেলে ধরলো দেওয়ালে, দুহাতে চাপ দিলো ওর বুকে, সমস্ত জোর দিয়ে নিঙড়ে দিলো।

মিন হুয়েকে চিৎকার করার জন্য মুখ খু্লতে দেখে, ওর মুখটাও বন্ধ করে দিয়ে টেনে নিয়ে ছিলো ওর জিভ, জোর করে চুমু দিয়ে ছিলো।

মিন হুয়ে মরিয়া লড়াই করে ছিলো - 

হঠাৎ দরজা খুলে গিয়ে ছিলো, সেলস ম্যানেজার লিন শি য়ুয়ে ঢুকে ছিলো। দৃশ্যটা দেখে সে শান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে দরজাটা বন্ধ করে চলে গিয়ে ছিলো। 

অবশেষে মিন হুয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পালিয়ে ছিলো, বাড়ি ফিরে গিয়ে ছিলো, জেগে ছিলো সারা রাত - রাগ, দুশ্চিন্তা, ভয় …

এই লোকটাই সে লোকটা যাকে মিন হুয়ে বরাবর নিজের পরামর্শদাতা আর গুরুজন ভেবে এসেছে - সারা রাত ভেবে ছিলো মিন হুয়ে, পরের দিন সকালে হিউম্যান রিসোর্স ডিপার্টমেন্টে নালিশ ঠুকতে গিয়ে ছিলো।

ঐ সময় থেকেই যাবতীয় দুঃস্বপ্নের শুরু …

মিন হুয়ের কানে স্বরটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে এলো, “... এসো, আমরা অতীতের কথা বলা বন্ধ করি। যা হোক, আমি খুবই খুশি এই জন্য যে তুমি এখনো মুস্কিলে পড়লে যে আমার কথা ভাবতে পারো। আমি আরো খুশি এই জন্য যে আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি। এরপর থেকে তোমার ছেলের কোনো শারিরীক সমস্যা হলে আমার বাবার সঙ্গে যে কোনো সময়ে ফোনে যোগাযোগ করতে পারবে।”

“...”

“আমি আশা করি যে তোমার আর আমার মধ্যেকার ক্ষোভ নিশ্চয়ই মিটে যাবে। তুমি একজন জাত প্রযুক্তিবিদ। তুমি যদি গুয়ান ছাওতে আসো, তবে আমি তোমার সঙ্গে মোটেই খারাপ ব্যবহার করবো না। আমি তোমাকে আর অ্যান্ড ডির ভিপি করে দেবো। তুমি সরাসরি সিটিও-কে রিপোর্ট করবে। তুমি যা দরকার তাই বলতে পারো - মাইনে, ইক্যুইটি, অন্যান্য পছন্দাপছন্দ। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করবো সে সব মেটানোর। আমি আশা করি যে তুমি আমকে গুয়ান ছাও আর বা’অ্যানের সহযোগটা প্রচার করার কাজে সাহায্য করবে।”

অনেক না ভেবেও মিন হুয়ে বুঝতে পারছে যে প্রস্তাবটা খুবই লাভজনক। গুয়ান ছাও ইন্টার ন্যাশনাল মহীরুহ ইন্ডারস্ট্রিতে। কি নেই ওদের - সংস্কৃতি আর বিনোদন, ই-কমার্স, করপোরেট সার্ভিসেস, মেডিক্যাল কেয়ার আর আরো অনেক কিছু। কেবলমাত্র এআই ইমেজিং ডিপার্টমেন্টেই যে সংখ্যায় লোক কাজ করে সেটা বা’অ্যানের তুলনায় তিনগুন। বোঝা যায় যে কতগুলো আলাদা আলাদা আর কতগুলো একই প্রজেক্ট সম্ভব দুটো আলাদা আলাদা সংস্থায়। গুয়ান ছাও যদি কিনে ফেলে বা’অ্যান, তাহলে বা’অ্যানের সব প্রজেক্ট তো ওরা রাখবে না। মিন হুয়ের হিসেব হলো যে বা’অ্যানের অর্ধেক লোককে গুয়ান ছাও বাদ দিয়ে দেবে যদি ওরা বা’অ্যান কিনে নেয়।

চেং ছিরাং চুপ করে তাকিয়ে রইলেন মিন হুয়ের দিকে। খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন মিন হুয়ের অভিব্যক্তি, প্রতিক্রিয়া, “তুমি এটা নিয়ে কয়েকদিন ভাবতে পারো, আমাকে একটা উত্তর দেবার আগে। আমি আদা জল খেয়ে লেগেছি এই অ্যাক্যুইজিসনটা জিতে নেবার জন্য। মিন হুয়ে, তুমি চমৎকার কাজ করো, একমাত্র তুমিই বা’অ্যানের সম্পদ যার বদলে কাউকে পাওয়া মুস্কিল। গুয়ান ছাওতে ব্যাপারটা অবশ্য এরকম নয়। আমাদের এখানে প্রতিভা অফুরান, সিংহুয়া ইউনিভার্সিটি, পেকিং ইউনিভার্সিটি, স্ট্যানফর্ড, এমআইটি, ইটিএইচ, ক্যালটেক - সব আছে। যদি তুমি নাও আসো - তবে আমরা তোমার প্রজেক্ট নিয়ে নিতে পারি। কিন্তু যদি তুমি ছেড়ে যেতে চাও, তোমাকে একটা চুক্তি করানো হবে যাতে আগামী দু বছর তুমি কোথাও কোনো কাজ না করতে পারো। তোমার বাচ্চা আছে, তোমার টাকার দরকার আছে। আশা করি, তুমি একটা যুক্তিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবে।”

মিন হুয়ে ধীরে ধীরে কফি গোলাচ্ছে দেখে, সেই সুযোগে চেং ছিরাং দারুচিনি কেকের প্লেটতে মিন হুয়ের দিকে ঠেলে দিয়ে বললো, “খেয়ে নাও, ঠান্ডা হয়ে গেলে এগুলো খেতে ভালো লাগে না।”

“আমি সিনামন কেক পছন্দ করি না।” বাঁকা সুরে বললো মিন হুয়ে, “এটা দেখতে একটা গুয়ের ঢিবির মতো, যদিও এর ওপরে ক্রিমের একটা স্তর আছে, ঠিক যে কথাগুলো এতোক্ষণ আপনি বললেন, সেগুলোর মতো।”

“...”

“কুকুরে আমাকে গু খেতে ডাকছে, আপনি কী মনে করেন, আমি খাবো?”

“জোর করে নিজের শত্রু বাড়িও না, মিন হুয়ে।” চেং ছিরাং শান্ত করার চেষ্টা করলেন মিন হুয়কে, “তোমার যথেষ্ট শত্রু আছে।”

“সিংহ কখনো তোয়াক্কা করে না যে তার পেছনে কটা খেঁকি কুকুর দাঁড়িয়ে আছে।”

“গলার জোর তো খুব বেড়েছে দেখছি। এটা কী একটা ঠেকনা পেয়েছো বলে?” হঠাৎ বলে উঠলো চেং ছিরাং, “তোমার আজকাল শিন ছি আছে, তাই না?”

“ওকে এর মধ্যে টানবেন না। ওর সঙ্গে আপনার কোনো লেনাদেনা নেই।”

“যেই আমার পথ আটকাবে, তার সাথেই আমার লেনাদেনা আছে।” সোজাসুজি বললো চেং ছিরাং, “ওকে বলো, পিছিয়ে যেতে, না হলে আমি ওকেও শেষ করে দেবো। আমি তোমাকে দেখিয়ে দেবো।”

কাফে ছেড়ে বেরিয়ে এসেই একটা নিরিবিলি কোণা দেখে মিন হুয়ে ফোন করলো সাও মুকে। ওকে জানালো যে গুয়ান ছাও নিতে চায় বা’অ্যান। আর চেং ছিরাং জেদ ধরে বসে আছে যে ও ঐ নিলাম জিতবেই।

“তোমার সাথে দং লির কথাবার্তা কেমন চলছে?”

ওর প্রজেক্ট আর টিম চেং ছিরাং নিয়ে নেবে ভাবলেই দূর্ভাবনায় পড়ছে মিন হুয়ে। ফোনেই চিৎকার করে উঠলো মিন হুয়ে, “আমি চেং ছিরাং-এর সাথে কিছুতেই কাজ করবো না! সাও জিয়ে! যদি গুয়ান ছাও-এর অ্যাক্যুইজিসন সফল হয়, তবে আমি তক্ষুণি পদত্যাগ করবো। যদি কাজের অপেক্ষায় আমাকে ঘরেও বসে থাকতে হয়, তবুও আমি গুয়ান ছাওতে কাজে যাবো না।”

“তুমি এই মাত্র স্টারবাক্স থেকে বেরিয়েছো, তাই না? আমি এখনই তোমাকে খুঁজে নিচ্ছি।” বললো সাও মু, “আমি তোমার সাথে ঝংশান সাউথ রোডের চা-এর বুটিকে দেখা করবো। আমার জন্য এক কাপ অ্যাকাসিয়া সয় মিল্কের চায়ের অর্ডার দেবে।”

মিন হুয়ে সবে চায়ে একটা চুমুক দিয়েছে এমন সময়ে সাও মু পৌঁছলো। তাড়াহুড়ো করে এলো, গায়ের উইন্ডব্রেকারটা খুলতে খুলতে, ওটাকে সোফার ওপরে ছুঁড়ে দিলো, মিন হুয়ের পাশে বসে পড়লো, বলতে শুরু করলো, “ফ্যাং দং খুই খুবই আন্তরিক। উনি বলেছেন যে রিসার্চ আর ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে উনি আমাদের সিদ্ধান্ত নেবার স্বাধীনতা দেবেন। তার সাথে উনি কোম্পানিকে সাবসিডিয়ারি হিসেবেই রাখবেন ‘দং লি বা’অ্যান’ হিসেবে। কর্মীদের অবস্থা বা ব্যবস্থা দং লির অন্যান্য কোম্পানির কর্মীদের জন্য যেমন তেমনই হবে। আমি খবর নিয়েছি, কর্মীদের যে সমস্ত সুযোগ সুবিধে দেন ওঁরা সেসব দেখে অন্য অনেক কোম্পানির তুলনায় বেশ ভালো বলেই মনে হলো। “

খুশিতে তালি দিয়ে উঠলো মিন হুয়ে, “দারুণ।”

“আমারও তাই মনে হচ্ছে। জানি না হে হাই শিয়াং কী ছকছে। আমাদের সঙ্গে যাবে নাকি হেডকোয়ার্টার্সে থেকে যাবে। ও সব সময়ে বর্ষার দিনের কথা মাথায় রেখে চলে, সুতরাং এই পরিস্থিতিতে ও কিচ্ছুটি করছে না তা তো হতে পারে না। সেই জন্যই আমি ওঁকে আমার সাথে দং লির যোগাযোগের কথাটা বলি নি। ফ্যাং দং খুইয়ের নিজের খুব একটা উৎসাহ নেই হে হাই শিয়াং-এর ব্যাপারে। যদি অ্যাক্যুইজিসনটা সফল হয়, তবে উনি ম্যানেজমেন্টে সবাইকে নাও রাখতে পারেন।”

সাও মু থামলেন।

“এখন প্রশ্ন হলো, দং লি কি গুয়ান ছাও-এর থেকে বেশি ভালো? যদি গুয়ান ছাও-এর বিড দং লির থেকে বেশি টাকার হয়, তাহলে আমরা কী একটু বেশিই স্বপ্ন দেখে ফেললাম না? আরেকটা ব্যাপারও আমার অদ্ভুত লাগছে। চেং ছিরাং তোমার সঙ্গে কলেজে এক ক্লাসে পড়তো। তোমাদের চেনাশোনাও আছে একে অপরের সাথে। কোম্পানিতে তোমার পদও আমার থেকে ওপরে, তোমার প্রভাবও আমার থেকে অনেক বেশি। তাহলে বা’অ্যান কেনার ইচ্ছে হলে উনি তোমার কাছে না এসে আমার কাছে এলেন কেনো?”

“হতে পারে এই জন্য যে ওর প্রাক্তন প্রেমিকার সাথে আমার সম্পর্কটা বেশ ভালো, আর সেই জন্য ওর অস্বস্তি আছে। আমার সাথে ওর সম্পর্ক একদম ঠিকঠাক। প্রায়ই নানা মিটিং-এ আমাদের দেখা হয় আর আমি ওর সাথে কথাও বলি। কোনো ঝগড়াঝাঁটি নেই। জিএস১.০ তুমি বানিয়েছো, এটাই স্বাভাবিক যে ও তোমার কাছে আসবে।”

পরিস্থিতিটা আরো খারাপের দিকে গেলো। বিভ্রান্ত মিন হুয়ে জানতে চাইলো, “তাহলে এখন আমাদের কী করা উচিৎ?”

“যদ্দুর আমি জানি, দং লি আর গুয়ান ছাও ছাড়াও আরো অনেক কোম্পানি আছে যারা বা’অ্যান কিনতে চায়। হয়তো তাদের কেউ কেউ বেশি দামও দিতে পারবে। শেন ল্যান টেকনোলজি প্রচুর বিনিয়োগ জড়ো করেছে এই সেদিন, ওদের হাতে টাকার অভাব নেই।”

“তাহলে এখন বা’অ্যানের ভবিষ্যত অনিশ্চিত।”

“আমার একটা দুঃসাহসিক প্রস্তাব আছে। তুমি আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছো এটার কথা।” সাও মু একটু থেমে আবার বলতে লাগলেন, “আমাদের কয়েকজন একত্র হতে পারি, কয়েকটা ভেনচার ক্যাপিটাল আর প্রাইভেট ইক্যুইটি কোম্পানিকে জড়ো করতে পারি আমাদের পাশে আর ম্যানেজমেন্ট টিমের নামে নিলামে দর হাঁকতে পারি।”

“কী?” মিন হুয়ে বুঝতে পারলো না।

“এটা হলো যে আমরা নিজেরাই বাইরে গিয়ে টাকা জোগাড় করবো আর সাধারণ নিলামে দর হাঁকবো বা’অ্যান কেনার জন্য। যদি আমরা সফল হই, তাহলে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি স্বাধীনতা পাবো আমরা কোম্পানি চালানোর ক্ষেত্রে। আমরা আমাদের টিমগুলোও রাখতে পারবো, প্রজেক্ট রাখতে পারবো, আমাদের সমস্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণা আর ফলাফলের অধিকাংশটাই রাখতে পারবো।”

“এরকম করে অ্যাকুইজিসন কী সম্ভব?”

“এটাকে বলে ম্যানেজমেন্ট বাই আউট, এমবিও। এটা খুব চলে, ঠিক আছে? যাই হোক, হেডকোয়ার্টার্স আমাদের আর চায় না। আমরা দং লিতে যাই আর গুয়ান ছাওতে, কিংবা অন্য কোনো কোম্পানিতে, আমাদের ভেঙে টুকরো করবেই করবে। শেষ পর্যন্ত যা বুঝেছি, মার্জার হলে কর্মীদের ভাগ্য সবসময়েই অন্যদের দয়ার ওপর নির্ভর করে আছে, যে যাই ব্যাখ্যা দিক না কেনো। আমাদের বিশ্বাস জেতার জন্য আর আমাদের থেকে কাজ বার করার জন্য যারা কিনবে তারা নানা ধরনের মিষ্টি কথা বলবে, এদিকে ওরা নিজেরাই জানে না যে ওদের দরের সম্মান হবে কিনা। আমরা তো আর একটা গাজর দিয়ে হাতুড়ির কাজ চালাতে পারি না। তার থেকে ভালো হয় যদি আমরা নিজেরাই কিনে নি। ওঠো জাগো নিজের ভাগ্যের নিয়ন্তা নিজেই হও। কী বলো, আমি নতুন একটা কিছু শুরু করি?”

“ওকে। তুমি যদি বিনিয়োগ আনতে পারো।" মিন হুয়ে বার বার ঘাড় নেড়ে নেড়ে বললো। “আমি দু হাত তুলে তোমায় আশীর্বাদ করবো।”

“আমাদের শুরুতে পাঁচ জনের একটা ম্যানেজমেন্ট টিম তৈরি করতে হবে। তুমি যদি তাতে যোগ দিতে চাও, তবে আর দু জনের একজন হলো শু গুয়াং জিয়াঁ, আর ইয়ান চেং লিরও হ্যাঁ বলার কথা। তোমার আর কাকে মানানসই বলে মনে হয়?”

ইয়ান চেং লি হলেন চিফ ফিনান্সিয়াল অফিসার, আর শু গুয়াং জিয়াঁ সেলস-এর ডিরেক্টর। বা’অ্যান যখন তৈরি করা হয়ে ছিলো, তখন ওঁদের বাইরে থেকে এনে কাজ দেওয়া হয়। হেডকোয়ার্টার্সের সাথে ওঁদের কোনো সম্পর্ক নেই। 

ওঁদের দু জনের মধ্যে সাও মু আর শু গুয়াং জিয়াঁর সম্পর্ক ভালো, বন্ধুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইয়ান চেং লি একটি জেদী আর গোঁড়া প্রকৃতির, নীতির প্রতি মনোযোগী, নীতি আঁকড়ে থাকার লোক, আর অফিসের রাজনীতিতে নিরপেক্ষ থাকেন।

শুরুতে ইয়ান চেং লিকে বিশেষ কেউ পছন্দ করতো না। সবাই মনে করতো যে উনি উদ্ধত। কিন্তু ক্রমশ সবাই বুঝে গিয়ে ছিলো যে ওটাই ওঁর স্বভাব। আর উনি নিজের কাজে খুবই দক্ষ। তাই সবাই ওঁকে গ্রহণ করে নিয়ে ছিলো।

মিন হুয়ে একটু ভেবে জানতে চাইলো, “আমাদের টিম কোনো ভাবে হে হাই শিয়াং-কে পাশ কাটাতে পারবে?”

মিন হুয়ে আর সাও মু - দু জনের কেউই হে হাই শিয়াং-কে পছন্দ করে না। কিন্তু ওঁর সাথে হেডকোয়ার্টার্সের সম্পর্কটা খুব নিকট।

যদি ওঁকে লুকিয়ে একটা ম্যানেজমেন্ট টিম তৈরি করা হয় তবে খুব শিগগিরই উনি সেটা জানতে পেরে যাবেন। উনি নিশ্চয়ই রেগে যাবেন, লজ্জায়ও পরবেন, হয়তো জোর করে প্রভাব খাটিয়ে ওদেরকে ভুল প্রমাণ করাতে পারেন।

“ওঁকে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলে পাশ কাটিয়ে যাওয়াই যায়। তবে আমার মনে হয় যে ওঁকে জিজ্ঞেস করলে খারাপ হবে না। উনি যদি হেডকোয়ার্টার্সে থেকে যাওয়াই স্থির করেন, চলো ওঁকে জিজ্ঞেস করি, তাতে ওঁকে শ্রদ্ধা দেখানোও হবে। যদি উনি সত্যিই উৎসাহী হন আর যোগ দিতে চান, তবে ওঁর সাথে হেডকোয়ার্টার্সের যে রকম সম্পর্ক তার থেকে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ খবরও পাওয়া যেতে পারে, যাতে আমরা প্রতিযোগিতায় জিতে যেতে পারি।”

“সাও জিয়ে, তুমি যা বললে … তার সবটা আমি বুঝতে পারি নি।” সততার সাথে বললো মিন হুয়ে, “আমি শুধু তোমার কথা শুনে চলবো। যা হোক, আমি অংশ নিতে উৎসাহী।”

“সে ঠিক আছে, আমি ব্যবস্থা নেবো। প্রথমে যাও ইয়ান চেং লি, শু গুয়াং জিয়াঁ আর হে হাই শিয়াং-এর সাথে কথা বলো, দেখো তাঁদের মনোভাব কী। যদি ওঁরা যোগ দিতে চান, টিম তৈরি করা যাবে। তারপর আমি একটা কনসাল্টিং কোম্পানি খুঁজে বার করবো যারা আমাদের হয়ে নিলামে অংশ নেবে। যার মধ্যে বোঝাপড়া, চুক্তি সই করা এসবই থাকবে। যাই হোক, এই ব্যাপারটা বেশ জটিল। আইন, অ্যাকাউন্টিং, ট্যাক্স - পেশাদারদের হাতে ছেড়ে দেওয়াই ভালো।”

“বিনিয়োগের কী হবে?”

“আমি কয়েকটা বিনিয়োগ কোম্পানির আর প্রাইভেট ইক্যুইটি কোম্পানির হোমরা-চোমড়াদের চিনি। ব্যাঙ্কের লোকেদেরও চিনি। দেখবো। যদি দং লি গ্রুপ আর গুয়ান ছাও ইন্টারন্যাশন্যাল দুটোই বা’অ্যান কিনতে উৎসাহ দেখায় তবে এই কোম্পানিগুলোও খুব উৎসাহ দেখাতে পারে। আমি ইয়ান চেং লির সাথে গিয়ে ওদের সাথে কথা বলবো, তার আগে তোমাকে কয়েকটা প্রেজেন্টেসন বানাতে হবে। যদি সত্যিই আমরা এমবিও শুরু করতে পারি তাহলে বিনিয়োগ কোম্পানিগুলো প্রেজেন্টেসন চাইবেই। আমাদের হাতে যা কাগজপত্র আছে আর রিপোর্ট আছে, তাতে আমরা কয়েকটা বিনিয়োগ কোম্পানির সাথে এক দিনে কথা বলতে পারি। আমরা খুব ব্যস্ত হয়ে যাবো।”

“ঠিক আছে। আমি তৈরি করে ফেলেছি, আমার মাথার মধ্যে! প্রযুক্তির ব্যাপারটা তুমি আমার ওপর ছেড়ে দাও।”

“প্রথমত, চিফ টেকনোলজি অফিসার হয়ে ওঠার শিক্ষাটা থাকা ভালো।”

সাও মু হাসলো, কাপের দুধ দেওয়া চায়ে চুমুক দিলো, তারপর দু হাত ছড়িয়ে বললো, “চলো, করে ফেলি।”

মিন হুয়ে সাও মুয়ের হাত ধরে খুব জোরে জোরে ঝাঁকাল, ঘাড় নাড়লো, “হাতা গুটিয়ে লেগে পড়ো। চলো, করে ফেলি।”




~~~~~~~~~~~~

সম্পূর্ণ বই বিনামূল্যে : https://dl.bookfunnel.com/lcj5vznt96

Link to Previous Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/09/jpda-chapter-43.html

Link to following Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/09/jpda-chapter-43.html

Wednesday, September 18, 2024

JPDA - Chapter 43

 ৪৩. য়ে শিয়াও ঝেন



পুরো ঘরটা ম-ম করছে ধিমে আঁচে ঝলসানো শুয়োরের পাঁজরের মাংসের গন্ধে। চেন জিয়া জুন আর য়ে শিয়াও ঝেন গলা তুলে কথা বলছে, হেসে গড়িয়ে পড়ছে রান্না ঘরে।

মিন হুয়ে টেবিলের ওপরে চাবিটা রাখলো। চাবিটা রাখার জন্য ‘ঝড়াং’ করে একটা শব্দ হলো। শব্দটা তখনই জিয়া জুন শুনতে পেলো, “জিয়েজিয়ে, ফিরলে বুঝি? খাবার প্রায় তৈরি। শুধু একটা ঝোল হলেই ব্যস।”

“হাত ধোয়া?” মিন হুয়ে জানতে চাইলো, আর সু ছনকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে গেলো, সু ছন সোফায় বসে অ্যানিমে দেখছে, এমন সময় রান্নাঘর থেকে জিয়া জুনের গলা ভেসে এলো, “ওর হাতও ধোয়া আছে।”

“মিন হুয়ে জিয়ে, তুমি কী ধনে পাতা খাও?”

পর্দাটা অল্প নড়ল, য়ে শিয়াও ঝেন মাথা গলালো, “আমরা কী ঝোলে পার্স্লে দেবো?”

ওর গলার স্বরে উৎসাহ টগবগ করে ফুটছে। মনে হয়ে য়িন শু এখনো ভাঙচুর করে নি কিছুই।

“পাশে রেখে দাও, আমি সবই খাই।” উইন্ডব্রেকারটা খুলে মিন হুয়ে টাঙিয়ে রাখলো দরজার পিছনে। 

ঝোলটা খুব তাড়াতাড়িই হয়ে গেলো। ভাপে সেদ্ধ হওয়া ষাঁড়ের লেজ আর মূলোর ঝোলের একটা নিজস্ব সুগন্ধ আছে। 

বেশ দক্ষ হাতে য়ে শিয়াও ঝেন বাটি আর চপস্টিক সাজিয়ে ফেললো। পর পর সকলকে বেড়ে দেওয়া হলো ছটা পদ আর একটা ঝোল। গল্প করতে করতে খাওয়া চলতে লাগলো। আবহাওয়াটা বেশ আন্তরিক আর সখ্যতাময়।

য়ে শিয়াও ঝেন সম্পর্কে মিন হুয়ের প্রথম ধারণাটা বেশ ভালো। তার অনেকটাই য়ে শিয়াও ঝেনের শান্ত চেহারার জন্য, আর চটপট যে কোনো পরিবেশে মিশে যেতে পারে বলে। মাত্র কয়েকটা দেখা সাক্ষাতেই মেয়েটা আপন হয়ে উঠতে পারে। 

“জিয়ে, জিয়া জুনকে বুঝিয়ে বলুন না, একটু।”

সু ছনের সামনে কম আঁচে ঝলসানো শুয়োরের পাঁজরের মাংসের একটা টুকরো ধরে রেখে কথাটা বললো য়ে শিয়াও ঝেন, “শিন ছি গ্য বেজিং-এ একটা রিফ্রেশার কোর্স দেখেছেন জিয়া জুনের জন্য। সাংবাদিকতার ছাত্ররা দু বছর পড়াশোনা করবে কাজের দায়দায়িত্ব ছাড়াই, তাছাড়া একটা বড়ো খবরের কাগজে ইন্টার্নশিপ করারও সুযোগ আছে। ওর জন্য সব ব্যবস্থা করা আছে। ও থাকবেও শিন ছি গয়ের নিজের অ্যাপার্টমেন্টে। কী দারুণ সুযোগ, টিউশন নেবার থেকে অনেক ভালো, কিন্তু ও যাবে না!”

শিন ছি কথাটা আলোচনা করেছে মিন হুয়ের সাথে। ওর মতে ছিয়াঁ ঝির কাজের মানটা বড্ডো নিচু। যাকে সমাজের খবর বলা হয়, সেটাও সাজানো হয় বিনোদনের ধাঁচে, যার অনেকটাই নরম আর ছড়ানো। রেস্টুরেন্টের খাবারের মতো, নাম করা পদগুলো এতো সুস্বাদ যে খদ্দের তো রান্নার পাত্রশুদ্ধ পুরো খাবারটাই চুরি করে নিয়ে যাবে। আবার ধরা যাক, একটা লোকের অভিযোগ এই যে স্বাস্থ্য ভালো রাখার জিনিস বলে যা বিক্রি হয়, সে সব ওর বাবাকে ঠকিয়েছে। এই বক্তব্যটা বাবার এতো অপছন্দ হলো যে বাবা নিজে লোকটাকে আত্মীয়বন্ধুদের দল থেকে তাড়িয়ে দিলেন। সবটাই অতি নাটকীয়। … যদি জিয়া জুন কর্মজীবনে সাফল্য চায় তো ওকে খুব পরিশ্রম করতে হবে খুব সাধারণ কাজগুলো শেখার জন্য। 

যখন মিন হুয়ে এসব শুনে ছিলো, তখন ও একমত হয়ে ছিলো শিন ছির সাথে। বাড়ি ফিরে বলেও ছিলো চেন জিয়া জুনকে। কিন্তু জিয়া জুন খুব জেদ করে অসম্মতি জানায়। বলতে থাকে যে ছিয়াঁ ঝিতে কাজ করে ও খুবই খুশি, ওর মনে হচ্ছে ও বেশ কীর্তি অর্জন করেছে।

বসে বসে মাস্টারমশাইয়ের বক্তৃতা শুনে, পরীক্ষার পড়া মুখস্থ করার থেকে ও বেশি পছন্দ করে বাইরে দৌড়ে দৌড়ে কাজ করতে - কাজের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান তো অভ্যেস থেকেই আসে। জিয়া জুন অনিচ্ছুক, শিন ছি জোর খাটাতে পারে না, তাই জিয়া জুনকে না জানিয়ে শিন ছি পারলো না যে যখন কোনো অসুবিধে হবে, কিংবা বাধাবিপত্তি আসবে জীবনে, তখন শিন ছি সাহায্য করতে চায়।

কথাটা মনে পড়তে এখন মিন হুয়ের মনে হচ্ছে জিয়া জুন যেতে চায় নি হতে পারে এই জন্য যে ও য়ে শিয়াও ঝেনকে ছেড়ে যেতে চায় না। তাই না?

যে ভাবে দুজনে কথা বলছে আর হাসাহাসি করছে এখন দেখে মনে হচ্ছে দুজনে যেনো প্রেমিক আর প্রেমিকা। একজন টিউটর এতো খেয়াল রাখে না।

“বিনচেং-এ থাকাই ভালো। এখানে আরো পড়ার অনেক সুযোগ রয়েছে। পরে আরো সুযোগ আসবে।”

মিন হুয়ে খাওয়াতে মন দিলো আর এলোমেলো কথা বলে গেলো।

“জিয়ে, আপনি জানেন না, বেজিং-এর স্কুল অফ জার্নালিজম দূর্দান্ত! আমি আমার শেষ বছরে ওখানে যেতে চাই পোস্টগ্র্যাজুয়েট পড়ার জন্য ভর্তি হবার পরীক্ষা দিতে। যদি জিয়া জুন ওখানে থাকে, তাহলে খুব সুবিধে হয়, যেহেতু পথঘাট সব ওর চেনা হয়ে থাকবে। শিন ছি গ্যও খুব পরিশ্রম করছেন। উনি ছাড়া আর কেই বা পারবেন? জিয়া জুন না গেলে সেটা খুব খারাপ হবে। জিয়ে, ওকে আবারও বুঝিয়ে বলুন না।”

তাহলে - মিন হুয়ে ভাবলো - মেয়েটা কী শিন ছিকেও পছন্দ করে?

মিন হুয়ে তখনই কোনো উত্তর দিলো না। মেয়েটা আগের দিনের টেনিস খেলার জামাকাপড়টাই পরে আছে দেখে ইচ্ছে করেই মিন হুয়ে জিজ্ঞেস করলো, “শও ঝেন আজকে কী ইস্কুলে কোনো খেলাধূলোর ব্যাপার আছে নাকি? এতো চমৎকার জামা পরেছো?” 

“না। এই জামাটা জিয়া জুন দিয়েছে, আমি এখানে এসেছি ওকে দেখাবো বলে।”

বলেই উঠে দাঁড়ালো, ঘুরে দাঁড়ালো জিয়া জুনের সামনে, এমনকি একটা হৃদয়ানুভুতি মুদ্রাও করে দেখালো।

হৃদয়ানুভুতি মুদ্রা


জিয়া জুন হেসে মাথা নাড়লো, “শও ঝেন টেনিস শিখছে। ঘটনাক্রমে আমিও গত দু সপ্তাহ খেলাধূলোর জিনিসের ওপরে কাজ করছি। ব্র্যান্ডটা আমার চেনা। আমি কিছু ছাড় পেলাম দামে আর ওকে এই সেটটা দিলাম।”

রাগে কথা হারালো মিন হুয়ে। এই য়ে শও ঝেন দারুণ ধড়িবাজ। জিয়া জুনকে দিয়ে জামাকাপড় কেনালো, সেই জামা পরে ও যাচ্ছে য়িন শুকে পটাতে। মিন হুয়ে তখনই কিছু বললো না। খাবার পরেও অনেক ক্ষণ বেখাপ্পা এটা সেটা নিয়ে গল্প করে গেলো সবার সাথে। যখন য়ে শও ঝেন বিদায় নিতে গেলো, মিন হুয়ে বললো, “আমি তোমার সাথে নিচে যাবো, ময়লাটা ফেলে দিয়ে আসি।”

অ্যাপার্টমেন্টের দরজা পেরিয়ে মিন হুয়ে কথাটা পাড়লো এই বলে যে ওর কিছু কথা বলার আছে য়ে শও ঝেনকে।

খানিক পরে য়ে শও ঝেনকে কাছাকাছি একটা কাফেতে নিয়ে গেলো মিন হুয়ে। দুজনে বসলো, দুটো লাটের ফরমাস করলো। 

মিন হুয়ে বেশি ঢাক ঢাক গুড় গুড় না করে সোজাসুজি বললো যে ও টেনিস ক্লাবের পার্কিং লটে কী দেখেছে। 

য়ে শও ঝেনের প্রথম প্রতিক্রিয়া হলো একটা হালকা হাসি, “জিয়ে, আপনি মানুষটাকে ভুল বুঝেছেন।”

“আমার কোনো ভুল হয় নি। তুমি কাল যা পরে ছিলে, আজ এখনো তাই পরে আছো তুমি। পরে আমি য়িন শুকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছি, ও স্বীকার করেছে।”

য়ে শও ঝেন শান্ত, “একটা চল্লিশ বছর বয়সী লোক একটা একুশ বছর বয়সী কলেজ ছাত্রের ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। একটা ছোটো সুযোগ মাত্র। আমি এতে কিছুই মনে করি না। আপনিই বা এতো গুরুত্ব দিচ্ছেন কেনো ব্যাপারটাকে?”

“উদ্যোগ নাও। নাকি সস্তা কোনো দাম লাগবে তোমার?”

“এটা একটা রসিকতা।" বিরক্তিতে ঠোঁট বেঁকে গেলো য়ে শও ঝেনের, “ওর পরিবারের মেয়েমানুষটা বুড়ি হয়ে গেছে, দেখতেও বিশ্রী, বদমেজাজীও বটে। ভগবান জানে, মহিলা যে কী করে ওকে পাকড়ে রেখেছে এতো দিন? সে আবার দুটো বাচ্চার জন্মও দিয়েছে? পুরুষমানুষটা রোজ বাড়িতে রান্না করে, কাপড় কাচে, উফ্‌ ভগবান, এই উল্টো ব্যবস্থাতে কী করে কাটায় দিনের পর দিন? ঐ মহিলাকে বিয়ে করে লোকটা পস্তাচ্ছে না?”

“তোমার হাতে টেনিস ক্লাবের বার্ষিক সভ্যপদের যে কার্ডটা রয়েছে, ওটার সারা বছরের খরচ সাড়ে সাত হাজার য়ুআঁ। এটা তোমাকে দিয়েছে ঐ বিশ্রী দেখতে বুড়িটাই। তুমি পিঠ ফিরিয়েই তার বরকে ভুলিয়ে ভালিয়ে পটিয়ে নিলে। তোমার বিবেক বলে কিছু আছে? নাকি সেটা কুকুরে খেয়ে গেছে?" বেশ রাগ দেখিয়েই মিন হুয়ে বললো, “য়ে শও ঝেন, জানো কী, বোঝো কী তোমার আচরণটা অনৈতিক?”

“এটা অনৈতিক, কারণ লোকটা অনৈতিক, তাই না, জিয়ে? আমি তো বাচ্চা মেয়ে, আমি কী জানি? উনি আমার সাথে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলেন, আর আমি একটা ঘোরের মধ্যে সেটা বিশ্বাস করি।”

কথাগুলো বলার সময়ে ও নিজের নখের দিকে তাকিয়ে ছিলো, “নিশ্চয়ই আমি সে রকম মেয়ে নই যে অন্য লোকের সংসার ভাঙে। উনি যদি সত্যিই আমাকে চান, তবে ওঁকে ডিভোর্স নিতে হবে। আমিও ওঁর সাথে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করতে চাই না।”

“...”

“জিয়ে, এই ব্যাপারটা নিয়ে আপনি মাথা ঘামাবেন না।”

“য়ে শও ঝেন, আমি তোমাকে এইটা বলতে এখানে ডেকেছি যে তোমাকে আমি বরখাস্ত করলাম জিয়া জুনকে পড়ানোর কাজ থেকে।" কেটে কেটে কথাগুলো বললো মিন হুয়ে, “আজ থেকে জিয়া জুনের সাথে কোনো যোগাযোগ রাখবে না। য়িন শুয়ের কাছেও যাবে না। ওদের কারুর সাথে যোগাযোগ রাখার কথা ভেবোও না। যে ধরনের টিউটর তুমি, কাজটাই খুব আর নিরাপদ নেই তোমার জন্য।”

য়ে শও ঝেনের মুখটা সবুজ হয়ে গেলো, বললো, “আমি আপনার কথা শুনবো কেনো?”

“তুমি যদি এরকম চালিয়ে যাও, তাহলে আমার আর কোনো উপায় থাকবে না, তোমার কথা ফাঁস করে দেওয়া ছাড়া।” বিদ্রুপের ভঙ্গিতে বললো মিন হুয়ে, আর কাপে কফি গোলাতে লাগলো।

“আপনি কী আমার সাথে ঝামেলা করতে চাইছেন?" য়ে শও ঝেন ভ্রূ কোঁচকালো, “মিন হুয়ে, তুমি আমাকে নীতি কথা পড়াবার কে? একবারও মনে কোরো না যে আমি জানি না তুমি কে। তুমি তোমার বস চেং ছিরাংকে ভোলানোর চেষ্টা করো নি তখন? সব কেটে যেতে তুমি মানতে চাও নি, মামলা করেছিলে, সততার মুখোশ পরে, সতীত্বের ঢং করে ছিলে। কেনো,তোমাকে কী পয়সা কম দিচ্ছিলো?”

“...”

“আমি সাংবাদিকতার ছাত্র। আমার সাথে ঝামেলা করা সোজা নয়। তুমি যদি আমার ব্যবস্থা করো, তো আমিও তোমার ব্যবস্থা করতে পারি।”

“...”

“তুমি কী জানো আমার ডরমিটরিতে আমার ক্লাসের বাকিরা কী করছে? মুভি দেখছে। আমিই একমাত্র টিউটর, কারণ আমার পরিবারের পয়সা নেই, আমাকে নিজের ব্যবস্থা নিজেই করতে হয়, অনেক দিন থেকেই। আমি তোমাকে ভয় পাই না! আমার শূণ্য থেকে শুরু, তোমার বন্দোবস্তে আমি আমার শূণ্যতেই থেকে যাবো। আমার জন্য হারাতে না পারার কিছুই নেই।”

মিন হুয়ে ভ্রূ কুঁচকে চুপচাপ তাকালো ওর দিকে, “য়ে শও ঝেন, তোমার অসীম ক্ষমতা। তুমি বদামি করতেই পারো।”

“যাই হোক, য়িন শুয়ের রান্নার চ্যানেল, আমার পরিকল্পনা ছাড়া পঞ্চাশ লাখ ভক্ত পেতো?” বিদ্রুপ করলো য়ে শও ঝেন, “জিয়ে, নিজের থুতুতে ডুবে মরার স্বাদ আপনি যথেষ্ট পান নি বলেই মনে হচ্ছে, আমি কী আবার আপনাকে ছুঁড়ে ফেলে দেব?”

কথা বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালো ও, “ঐ মহিলা আপনাকে বলেছে আমার সাথে কথা বলতে, তাই না? আমার যেহেতু কাজটা গেছে, আমি বলবো আপনি আমাকে এই মাসের মাইনেটা দিয়ে দিন আমার অ্যাকাউন্টে। য়িন শুয়ের ব্যাপারে বলতে পারি, ঐ মহিলাকে ছেড়ে দিতে পারে যদি ও, তবে আমি ওকে বিয়ে করবো, আমি যা বলি তাই করি। বিয়ের দিন আপনাকে আসতেই হবে! বাই!”

এরপরেই ও চলে যাচ্ছিলো, মিন হুয়ে ওর পথ আটকালো। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ও নিজের মোবাইল ফোন বার করলো, “য়ে শও ঝেন, তুমি যখন অনুতাপ করতে জানো না, তখন আমিও বিনয়ের আশ্রয় নেবো না। আমি তোমার সাথে আমার যা যা কথা হলো সব রেকর্ড করেছি। তুমি তো ‘পড়ার সময়ে কাজ’ দেয় যারা তাদের মাধ্যমে আমার কাছে এসেছো, ওরাই তো তোমাকে দূর্দান্ত টিউটর বলে সুপারিশ করে ছিলো, তাই আমি তোমাদের দলনেতার কাছে এই রেকর্ডিংটা পাঠিয়ে দেবো। আর তোমাদের কলেজের সাংবাদিকতা বিভাগের প্রধানকেও পাঠাব। আর ওঁকে বলব যে তোমাকে ভালো করে শিক্ষা দিতে। তাছাড়া, ইউনিভার্সিটির অনলাইন টিউটরিং ওয়েবসাইটে রেটিং-এর ব্যবস্থা আছে না? আমি কয়েকটা মন্তব্য লিখে তোমার সুপারিশ করবো না হয়।”

য়ে শও ঝেনের মুখ লাল হয়ে উঠলো তক্ষুণি, “জঘন্য। আমি কখনোই ভাবি নি যে তুমি এমন একটা নোংরামো করবে, এমন একটা ফিকির করবে।”

“বিদায়, আমি তোমাকে আর কখনো দেখতে চাই না।”

মিন হুয়ে অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে জিয়া জুনকে বললো য়ে শও ঝেনের সমস্ত কথা। সত্যিটা এরকম দাঁড়ালো যে রেকর্ডিংটা নিজের কানে শুনে জিয়া জুন চমকে ফ্যাকাসে হয়ে গেলো, “আমাকে আগে বলো নি কেনো? আমাকে দিয়ে এতোগুলো পদ রাঁধালে কেনো?”

মিন হুয়ের ভয় ছিলো যে জিয়া জুন রেগে যাবে, আর য়ে শও ঝেনও খুব সুবিধের মেয়ে নয়, যদি একটা ঝগড়াঝাঁটি লেগে যায়, যদি নিতান্ত দুর্ঘটনাবশত কেউ আহত হয়, চেন জিয়া জুন এর মধ্যেই একবার জেল খেটে এসেছে, ওকে আরেকবার জেলে যেতে দেওয়া যায় না।

***

সেই রাতেই কৌতুহলের বশে, মিন হুয়ে একটা ব্যাগে সামান্য কয়েকটা জিনিস ভরে, সু ছনকে নিয়ে গেলো আইভি গার্ডেন-এর ব্লক এ-তে।

ও আর ঝৌ রু জি ব্লক ই-তে ছিলো তিন বছরের কিছু বেশি। এলাকাটা মিন হুয়ের ভীষণ পরিচিত। বাইরে পা রাখলেই বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট আর চারপাশের ইস্কুল কলেজও বিনচেং-এ সেরা। 

কমিউনিটিতে প্রচুর গাছ আর ফুল। প্রত্যেক বিল্ডিং-এর নিজস্ব স্যুইমিং পুল আছে, ভীষণ গরমে স্নান করার জন্য সনা আছে, জিমন্যাসিয়াম আছে, তার মধ্যে একটা বিশাল পার্ক আর বাচ্চাদের খেলার মাঠ আছে।

মিন হুয়ে চাবিটা বার করে ভালো করে দেখলো। চাবিতে লেখা আছে এ- ৩২০১। মিন হুয়ে জানে যে এটা ইয়াও ঝি ঝু যে পেন্টহাউসে থাকতোএকদম সেটার মতো হবে। কিন্তু ভেতরের সাজগোজ একদম আলাদা।

সদর দরজাটা সাদাকালো। রেখাগুলো সাদামাঠা, সোজা আর উজ্জ্বল। জ্যামিতিক বোধে পরিপূর্ণ।

মেঝে হাতে করে মাজা। আসল আসল জায়গা সাদা কার্পেটে ঢাকা। তেল রঙে আঁকা অনেকগুলো উত্তরাধুনিক ছবি টাঙানো আছে দেওয়ালে। ছবিগুলোতে অনেক রং আর সেসব রং ভারি উজ্জ্বল। ছবিগুলো নিস্তব্ধ বাড়িটাতে খানিকটা অগোছালো উত্তেজনা এনে দিয়েছে।



‘নতুন বাড়ি’ দেখে উত্তেজনায় ভরপুর সু ছন। কেবল এ ঘর ও ঘর করছে। সমস্ত ড্রয়ার খুলে দেখছে, কৌতুহলে। একগাল হেসে বললো, “মা, মা, এই বাড়িটা কী বিশাল! এখানে তো লুকোচুরি খেলা যাবে।”

“এই বাড়িটার ব্যবস্থা করেছেন বাবা, তোমার থাকার জন্য। তোমার পছন্দ হয়েছে?”

“হ্যাঁ। বাবা কী এখানে এসে আমাদের সঙ্গে থাকবে? আমাকে কিন্ডারগার্টেনে পৌঁছে দেবে?”

“বাবা এখন বেজিং-এ। বাবা প্রায়ই ফোন করবেন তোমাকে।”

“আমি এখনই বাবার সাথে ফোনে কথা বলতে চাই।”

হাতে তালি দিয়ে হাসলো সু ছন।

“বাবা আজকাল খুব ব্যস্ত থাকে। কাল ফোন করবো, কেমন?”

মিন হুয়ে ছেলের মুখটা ধরে বললো, “লক্ষী ছেলে। আটটা বেজে গেছে। এবার দাঁত মেজে, বিছানায় যেতে হবে।”

ছেলেকে পরিষ্কার করে, মিন হুয়ে ছেলেকে বিছানায় নিয়ে গেলো। দুজনে মিলে খানিক ক্ষণ গল্প করলো এটা সেটা নিয়ে। শিগগির ঘুমিয়ে পড়লো সু ছন।

একমাস ধরে ওভারটাইম কাজ করে করে মিন হুয়েরও খুব ঘুমের অভাব হয়ে ছিলো। চার ঘন্টাও রোজ ঘুমোতে পায় নি মিন হুয়ে। বাচ্চা যতক্ষণ না ঘুমিয়ে পড়ে, ততক্ষণ বাচ্চাকে ভোলাতে ভোলাতে, মিন হুয়ে প্রায় ঘুমিয়েই পড়ে ছিলো। এগিয়ে আসা ডেডলাইনের কথা মনে পড়তেই আবার বিছানা থেকে নেমে পড়লো মিন হুয়ে। 

সু ছন ভীতু। ওকে ছেড়ে বেশি দূরে যেতে সাহস করলো না মিন হুয়ে। কম্পিউটার জাপটে ধরে, একটা কম্বল গায়ে দিয়ে, খাটের পাশের একানে সোফাটাতে বসলো। খটাখট করে প্রোগ্রাম লিখে চললো।

ঘন্টা তিনেক মন দিয়ে কাজ করার পরে, আড়ামোড়া ভাঙতে লাগলো, হাই তুলতে শুরু করলো খুব। এই মূহুর্তে ঘরের কোথা থেকে বোঝা গেলো না একটা গাঢ় স্বর ভেসে এলো, “রান্নাঘরে একটা কফি মেশিন আছে, এক কাপ এস্প্রেসো বানিয়ে নে।”



মিন হুয়ে চমকে উঠলো। ঘরের এদিক ওদিক তাকালো, তারপর বুঝে নিলো যে আওয়াজটা সিলিং থেকে আসছে।

“আমি বলছি, শিন ছি।” বলার সুরটা হালকা, কিন্ত স্বরটা স্পষ্ট।

শুরুতে মিন হুয়ে মনে করলো, ওটা বোধ হয় স্মার্ট ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট। কিন্তু হঠাৎ ওর মনে পড়ে গেলো যে দেঁ চেন বলে ছিলেন যে সু ছনের শোবার ঘরে হাই ডেফিনিসন ক্যামেরা আছে, ব্যাপারটা মাথায় ছিলো না মিন হুয়ের, যখন ও এসে ছিলো, ও জানতো না কোথায় লুকোনো আছে ক্যামেরা।

“আমি তো ভয় পেয়ে গিয়ে ছিলাম, ভাবছিলাম খোদ ভগবানের দেখা পেলাম বুঝি।”

গলার স্বরটা যে দিক থেকে আসছিলো সেই দিকে তাকালোও। নিশ্চিত হলো যে মাথার ওপরের স্ফটিকের ঝাড়বাতিটায় নিশ্চয়ই একটা ক্যামেরা লাগানো আছে। নিশ্চয়ই দূর থেকে ক্যামেরাটাকে চালানো যায়, পুরো তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘুরতে পারে ক্যামেরাটা, আবার সঙ্গে গলার স্বর শোনাতে পারে। এবার মিন হুয়ে খুঁজতে লাগলো খুঁটিয়ে। খাটের উল্টো দিকের ক্যাবিনেটে একগাদা মিনিয়ন আছে। সব কটারই চোখ বেশ বড়ো বড়ো। বলা মুস্কিল যে কোন পুতুলটার চোখের ভেতরে ক্যামেরা লাগানো আছে। আবার সোফার উল্টো দিকের ইলেকট্রনিক ঘড়িটাও যেনো কেমন একটা উদ্ভট লাল আলো ছড়াচ্ছে। হতেই পারে যে ওখানেও একটা ক্যামেরা লুকোনো আছে।

মিন হুয়ে কম্পিউটারটা নামিয়ে রাখলো। গেলো রান্নাঘরে। 

খানিক পরে ফিরে এলো কফি ভর্তি একটা বড়ো কাপ নিয়ে। আঙুলে একটা ব্যান্ড-এইডও ছিলো। 

শিন ছি জিজ্ঞেস করলো, “তোর আঙুলে আবার কী হলো?”

“ছেঁকা লেগেছে।” মিন হুয়ে বললো, “আমি তো দুধ থেকে ফেনা ওঠা অবধি দুধটাতে ভাপ দি, কিন্তু এটা ঠিকঠাক কাজ করলো না। সমস্ত ভাপ ছিটকে এসে আঙুলে লাগলো।”

“তুই তো কেবল ক্যাপসুল কফি মেশিন ব্যবহার করিস, মিন হুয়ে।”

মিন হুয়ে আমল দিলো না শিন ছির শ্লেষ, অপমানে ভরা কথাগুলোর। রাগ মনের মধ্যে রেখে দিয়ে, টাইপ করতে লাগলো কি-বোর্ডে, ছেঁকা লাগা জায়গাটাতে বেশ লাগছে। নিচু স্বরে হতাশা উগরে দিলো মিন হুয়ে, “নিকুচি করেছে।”

“জিয়া জুন কেমন আছে?”

“ভালোই আছে। যাই হোক, একটা উদ্ভট কথা বলি তোকে …”

মিন হুয়ে জানে না কফির প্রভাবে কিনা, মিন হুয়ে পুরোপুরি জেগে উঠেছে, আর খানিক উত্তেজিতও হয়ে উঠেছে।

মিন হুয়ে ভাবছিলো য়ে শও ঝেনকে তো আর পাহারা দেওয়া যাবে না। সে হয়তো বেজিং-এ গিয়ে শিন ছিকে খুঁজে বার করবে কদিনের মধ্যে। ওকে বিষ ছোবলের একটা আন্দাজ দিয়ে রাখা ভালো। সে জন্য ও য়ে শও ঝেনের কথা সবটাই বললো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দীর্ঘশ্বাস না ফেলে পারলো না, “কী মনে হয় তোর, আমার কপালে কী আঠা দিয়ে কাগজ সাঁটা আছে একটা? কেনো আমার সঙ্গে কেবল দায়িত্বজ্ঞানহীন লোকেদেরই দেখা হয়?”

“তোর জন্য আমিও ভরসার অযোগ্য।” খোঁচা দিয়ে বললো শিন ছি, “এসব হাঙর রক্তের গন্ধ পেলেই ছুটে আসে।”

“টানটা নিচের দিকে।”

মিন হুয়ে ছাদের দিকে তাকালো, “তুই যদি জিয়া জুনকে বুঝিয়ে বলিস, তবে মনে হয় যে ও বেজিং যেতে রাজি হয়ে যাবে।”

“ও রাজি হয় নি। আমি এই মাত্র ওর সাথে কথা বললাম, ও জানিয়েছে যে ও এখনো বিনচেং-এই থাকতে চায়।”

“শিন ছি" মিন হুয়ে মাথা নিচু করে টাইপ করতে করতেই প্রশ্ন করলো, “সু তিয়াঁর কোনো খবর পেয়েছিস এর মধ্যে?”

“না। তোর কাছে কোনো খবর আছে?”

“না।’

দুজনে একসাথে চুপ করে গেলো। 

বেশ খানিকক্ষণ পরে মিন হুয়ে জানতে চাইলো, “তুই বলছিস যে সু তিয়াঁ এখনো বেঁচে আছে?”

“বেঁচে আছে।" শিন ছির গলার স্বর ভীষণ নিশ্চিত।

“জানলি কী করে?”

“আমি একটা ভবিষ্যতদ্রষ্টার সাথে কথা বলেছি। উনি বলেছেন যে সু তিয়াঁ এখনো বেঁচে আছে। আমি ওকে খুঁজে পাবো একদিন।”

“তুই? বিশ্বাস করিস ভবিষ্যতদ্রষ্টায়?”

“ভবিষ্যতদ্রষ্টার সাথে কথা বলা ছাড়া আর কীই বা আমি করতে পারি?”

বিদ্রুপ করলো মিন হুয়ে। 

“মিন হুয়ে”

“হুহ্‌?”

“যদি সু তিয়াঁ এখনো বেঁচে থাকে, আর আমি ওকে খুঁজে পাই, তুই কী তাহলে সু ছনকে দিয়ে দিবি আমাকে, বড়ো করার জন্য?”

“না।”

“কেন, তোর তো সু তিয়াঁর কাছে একটা জীবনের ধার বাকি?”

“তুই যদি সু তিয়াঁকে খুঁজে পাস, তবে তোদের এক ডজন বাচ্চা হতে পারে। তুই আমার থেকেই বা কেনো কেড়ে নিবি সু ছনকে?”

“কারণ ও আমারও ছেলে।”

“আমি তাও চাই না।”

“তখন তুই কী করবি?”

“আমি আমার জীবনে এগিয়ে যাবো, সু ছনের জন্য একটা নতুন বাবা খুঁজে বার করবো, যদি তোর অপছন্দ না হয় তো। আমার মনে হয় তোকে ভরসা করা যায়। মনে হয় তুই অনেক লোককেও চিনিস যাদের ওপরে ভরসা করা যায়। যখন সময় হবে তখন তাদের কারুর সাথে আমার আলাপ করিয়ে দিস। তোর কপাল ভালো হলে, আমরা একই শহরেও থাকতে পারি, তাহলে তুই সু ছনকে যখন খুশি তখন দেখতে পাবি।”

“তুই কিছুতেই এই ছেলেটাকে আমাকে দিবি না, তাই তো?”

“আরেকটা সম্ভাবনাও আছে । যদি সু তিয়াঁ বেঁচে না থাকে … তুই … আমি …”

“আমি জানি না তুই কী বলছিস।”

“তাহলে এ নিয়ে কথা বলিস না।”

শিন ছি প্রসঙ্গ বদলালো, “এই ঘরে আমি তিনটে ক্যামেরা লাগিয়েছি, তোর যদি অস্বস্তি হয় তুই পাশের পড়ার ঘরে গিয়ে কাজ করতে পারিস। আমি তোকে বিরক্ত করতে চাই না।”

“আমার কিছু যায় আসে না।”

মিন হুয়ে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসলো, “তোর কফির কাপটা বিকট দেখতে, টয়লেটের মতো, কেনো? রুচিটা কেমন বিশিষ্ট যেন!”

চমকে উঠলো শিন ছি, “তুই জানলি কী করে?”

“তুই যদি আমাকে দেখতে পাস, তাহলে আমিও তোকে দেখতে পাবো। কে বলে ছিলো আমাকে যেনো তার কম্পিউটারে কাজ করার জন্য।”

“ওয়া আহ্‌ন, মিন হুয়ে।”

“ওয়া আহ্‌ন, শিন ছি।”

মিন হুয়ে কাজ করতে লাগলো। আরো দু ঘন্টা পরে ছাদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো, “শিন ছি, তুই কী ঘুমিয়ে পড়েছিস?”

“না,” ওর গলার স্বরে ক্লান্তি, “আমিও ওভারটাইম কাজ করছি।”




~~~~~~~~~~~~

সম্পূর্ণ বই বিনামূল্যে : https://dl.bookfunnel.com/lcj5vznt96

Link to Previous Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/09/jpda-chapter-42.html

Link to following Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/08/jpda-chapter-44.html

Readers Loved