Showing posts with label Bengali story. Show all posts
Showing posts with label Bengali story. Show all posts

Tuesday, April 14, 2026

Panchpoksho - 11

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~

প্রত্নপক্ষ

~~~~~~

বাবা বলেছিলেন, “তুই যখন পছন্দ করছিস না এই টাকাটার ব্যাপারটা--” 

সুরচিতা দুম করে বলেছিল, “দিলীপকাকুর প্রেসটা চলছে না কেন? ফাল্গুনীর সামনের পুরোনো প্রেস তো এখনও ঘটাং ঘটাং করে চলছে?” 

বাবা খুব দ্বিধা করে বলেছিলেন, “সে অনেক কথা। ফাল্গুনীর প্রেস তো শুধু প্রেস নয়, ওদের মুদিখানা আছে, সিনেমা হলটা আছে, আরও আছে কাপড়ের দোকান। অনেক বড়ো পুঁজি। ওঁরা একটা ব্যবসার টাকা অন্যটায় এনে লাগাতে পারেন। সে কারণেই ওঁরা চটপট ম্যানুয়াল কম্পোজ ছেড়ে কম্পিউটারে কম্পোজ করার কাজ শুরু করে দিয়েছেন। ফাল্গুনীর বুড়ো মালিক-–কী যেন নাম--বল না?” 

সুরচিতা মনে করিয়ে দিয়েছিল বাবাকে, “মণিভূষণ গুঁই।” 

বাবা আবার ফিরে গিয়েছিলেন তাঁর আত্মগত কথোপকথনে। সুরচিতাও যেন এক বোয়া কন্সট্রিকটরের গল্প শুনছিল গোগ্রাসে।


“হ্যাঁ। ওঁর সাথে ওঁর ছেলেরা তো ছিলই এখন আবার মেজছেলের বড়োছেলেটাও কাজকম্ম করছে। ও তো কম্পিউটার শিখেছে, একটা ইন্টারনেট কাফে খুলেছে। ও-ই সব কম্পোজের কাজগুলো করে এখন।” 

সুরচিতা বোঝার চেষ্টা করছিল যে দিলীপের প্রেস বন্ধ হওয়ার পিছনে আধুনিক প্রযুক্তির সাথে পুরোনো প্রযুক্তির পাঞ্জা লড়াই নাকি সিআইএ বা গুঁই কোম্পানির কোনো ষড়যন্ত্র আছে। তাই ফস্‌ করে বলল, “তো ওরাই কী দিলীপকাকুর প্রেস বন্ধ করার জন্য কিছু করেছে?” 

বাবা মুচকি হেসে বলেছিলেন, “ওঁদের কিচ্ছু যায় আসে না দিলীপের মতো দু তিনটে লোকের ছাপাখানাতে। মণিবাবুই তো দিলীপের প্রেসটা কিনলেন, কোনো দরাদরি ছাড়াই। দিলীপ তো ওঁদের ওখানেই কাজ শিখেছে। তারপর উনিই গ্যারেন্টার হয়ে দিলীপের লোনের ব্যবস্থা করে ওর প্রেসটা খুলে দিয়েছিলেন। শুরুর দিকে কাজও দিতেন। বিয়ের কার্ড ছাপা, ক্যালেন্ডার, ডাইরি, পরে পরে পাঁজি, শারদীয়ার স্যুভেনির, বই।” 

সুরচিতার বেশ জটিল লাগছিল এবার। তাই বলে ফেলেছিল, “তাহলে, দিলীপকাকু প্রেসটা চালাতে পারল না কেন?”

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)



Monday, April 13, 2026

Panchpoksho -10

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রত্নপক্ষ

~~~~~~

সুরচিতা কোনো উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়েছিল বাবার চোখের মধ্যে সরাসরি। বাবা তখন বলেছিলেন, “পার্টি তো ফ্রি স্কুল দেখিয়ে দিয়েছে, সেখানে পড়তে তো পয়সা লাগে না। কিন্তু আঁকার মাস্টারের কাছে টিউশন না নিলে ছেলেরা সব আঁকাতেও ফেল করে। যে-ছেলের বাবা আর্ট কলেজের মাস্টার তার ছেলেও ফেল করে। মাস্টারও পার্টির লোক, মাস গেলে সে সংগঠনকে, দলকে চাঁদা দেয়; দিলীপের থেকে বেশিই দেয় হয়তো। কী করবে দিলীপ? ছেলেটার ক্লাস নাইন। তুই যদি দেখিয়ে দিলে ওর মাধ্যমিকটা উতরে যায়।” 

সুরচিতা বলেছিল, “আমি দেখালে ও পাশ করবে? জানলে কী করে?” 

বাবা বলেছিলেন, “ছেলেটা ক্লাসে র‍্যাঙ্ক করে। এতকাল ইস্কুলের মাস্টারের কাছেই পড়তো। তাঁদের কেউ কেউ ওকে এখন বিনাপয়সায় পড়াতেও রাজি; কিন্তু ছেলে পড়বে না।” 

সুরচিতা একটু অবাক হলো। তারপর ভাবলো সেও তো বাবা-মায়ের অবাধ্য, মত ও পথের বিরোধী। আরেকটা ছেলে তেমন হতেই পারে। কিন্তু বাবা-মায়ের সাথে দরাদরিটা সে ছাড়তে পারবে না। এতো অবিচার, অন্যায়ের শোধ তোলার একটা সুযোগ তার এসেছে; সে ছাড়বে না। তখন বলল, “বেশ ওকে ফ্রি-তে পড়াতে পারি। কিন্তু তোমাকে ফ্রি-তে মহান হতে দেব না।” 

বাবা বললেন, “বেশ আসছে মাস থেকে ইলেক্ট্রিকের বিল তোমাকে দিতে হবে না।”


তারপর একদিন সকালে অভি এসেছিলো। সেদিন নাইনের অঙ্কের ক্লাস। ক্লাসের সাথে অভি তাল মেলাতে পারবে কিনা দেখার জন্য সেদিন ওর পরীক্ষা নিয়েছিল সুরচিতা। ছেলেটা একশোয় পঁচানব্বই পেয়েছিল। বিনেপয়সায় বেশি খাটতে হবে না দেখে সুরচিতা খুশি হয়েছিল। কিন্তু পরের দিন অভি আসে নি। তারপরের দিনও না। এদিকে ইলেক্ট্রিকের বিল এসে গিয়েছিল। সুরচিতা কেঁচে যাওয়া যুদ্ধটার জন্য বেশ খেপে গিয়েছিল। তবু বিলটা দেখে ও একমাসের টাকাটা বাবার টেবিলে রেখে দিয়েছিল।


সন্ধে পেরিয়ে প্রায় রাত তখন। সুরচিতা খাটে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ছিল। বাবা এসেছিলেন ওর কাছে, ইলেক্ট্রিক বিল বাবদ যে টাকাটা ও বাবার টেবিলে রেখে এসেছিল সেই টাকাটা ওকে ফেরত দেবেন বলে। সুরচিতা বলেছিল, “সে ছোকরা তো আসছে না। অতএব আমাকেও ফোকটে খাটতে হচ্ছে না।” 

বাবা বলেছিলেন, “সে ছেলের আত্মসম্মান বোধ তীব্র। সে তোর বাকি ছাত্রদের থেকে জেনে গেছে তারা মাইনে দিয়েই পড়ে। তাই ও দিলীপকে বলে দিয়েছে যে ও নিজেই যা পারে তার জন্য টিউটরের দরকার নেই ওর।” 

সুরচিতা বলেছিল, “তাহলে আর টাকাটা ফেরত দিচ্ছ কেন?”


~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)


Sunday, April 12, 2026

Panchpoksho - 09

পাঁচপক্ষ
~~~~~~



প্রত্নপক্ষ
~~~~~~
সুরচিতা বলে, “থাকো মফস্বলে; যেখান থেকে হাতখরচের টাকায় রেজাল্ট দেখতে যাওয়ার পথখরচ ছিল না আমার সেদিন। তার ওপর পথখরচের ব্যবস্থা করলাম তো বিপদ-আপদের আশঙ্কায় আমাকে একা যেতে না দেওয়ার ড্রামাবাজি করে সময় মতো রেজাল্ট দেখতে যেতে দাও নি, নিজেরাও দেখে আসো নি। অন্য লোকে নিজের ছেলের রেজাল্ট দেখতে গিয়েছিল, সে তোমাদের অনুরোধ রাখতে আমার রেজাল্টও দেখে আসবে বলেছিল; সে এসে যা বলেছিল সেটাই বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছিলে; এই অন্য লোকটা কে? না যে তোমার মেয়ের স্কলারশিপের দরখাস্ত জমা দেবে বলে দেয় নি এমন সন্দেহ তোমাদেরও হয়েছিল। বলিহারি তোমাদের মানুষে বিশ্বাস!”
মা তখন সুর বদলেছিলেন, “তোর সব ব্যাপারে পুরোনো কথা টেনে আনা--”
সুরচিতা বলেছিল, “ঘটনাগুলো ভুলে গেলে দুঃখ লাঘব হয়, কিন্তু তার থেকে পাওয়া শিক্ষাটা ভুলে গেলে আবার একই ঘটনার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। তোমাদের চোখে ঠুলি, তোমরা বুদ্ধিকে অস্বীকার করে নির্বোধ আর নির্বিবাদী আদর্শবাদ দেখিয়ে যাও। বাস্তব বুদ্ধিতে যারা বাচ্চা মানুষ করল তাদের নিন্দে করো; তাদেরকে আত্মকেন্দ্রিক আর স্বার্থপর বলো। তোমরা নিজেরা নিজেদের মতো করে, নিজেদের বিচারে, ভালোমানুষটি থাকো। আমাকে ভালো মানুষ বানানোর চেষ্টা কোরো না খবর্দার। তোমার বাচ্চার দায়িত্ব তুমি না নিতে পারলে কে নেবে? সমাজ? পার্টি? আমাকে বঞ্চিত করে পার্টি আর সমাজ পোষণ করে চলেছ আমি কিচ্ছু বলি নি, এবার যে সমাজের আর পার্টির হাবিজাবি লোককে পুষতে আমাকে শোষণ করতে চাইছ! দেব সব ভেঙে, পুড়িয়ে তোমাদের মতো, তোমাদের প্রিয় বিপ্লবী কায়দায়?”
মায়ের ধৈর্যের বাধ ভেঙেছিল। হাতের কাছে ডিকশনারিটা ছিল, শব্দজব্দ করছিলেন, সেটা দিয়ে সুরচিতার পিঠে এক ঘা দিয়ে বলেছিলেন, “কী করবি তুই? কী করতে পারিস?”
সুরচিতা বলেছিল, “তোমার শাড়িটা দিয়ে তোমার ঘরের পাখা থেকে ঝুলব, হাতের মুঠোয় চিঠিতে লেখা থাকবে তোমাদের গুণপনা।” তারপর মায়ের হাত থেকে খবরের কাগজটা কেড়ে নিয়ে কুটিকুটি করে ছিঁড়ে দিয়েছিল। তাকে যে বাবা-মা লাগাম পরিয়ে রাখতে পারেন নি সেটা প্রমাণ করার জন্য তক্ষুনি কিছু একটা করা জরুরি হয়ে পড়েছিল যে।
সেদিন রাতে খেতে বসে বাবা বলেছিলেন, “দিলীপের প্রেসটা বন্ধ করে দিতে হয়েছে। ওর ছেলেটার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার দাখিল। পার্টি যদি এসব দেখত তাহলে কি আর তোকে বলতাম পড়াতে?”
~~~~~~
Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml
(চলবে)

Saturday, April 11, 2026

Panchpoksho -08

 পাঁচপক্ষ
~~~~~~



প্রত্নপক্ষ
~~~~~~
বাবা যেদিন বলেছিলেন, “মামন, দিলীপের ছেলেটাকে একটু পড়াস তো।”
সেদিন সুরচিতা মায়ের কাছে গজগজ করেছিল, “কেন পড়াবো? একটা টিউশনও কি বাবা দেখে দিয়েছে? কলেজের সিনিয়ররা দিয়েছে না হলে মাস্টারমশাইরা; কিংবা আমার রেজাল্ট ভালো, আমি পড়াই ভালো শুনে বাচ্চাদের বাবা-মায়েরা নিজেরাই এসেছেন। তাঁরা মাস গেলে পয়সা দেন। তাই তুমি আমার ট্রেনের কোয়ার্টার্লি টিকিটের ভাড়া দাও না। আর বাবা ইলেকট্রিক বিলের প্রত্যেক মাসের পয়সা নিয়ে নেয় যেহেতু বাবার বাড়ির ইলেকট্রিসিটি আর বারান্দা ব্যবহার করি টিউশন পড়ানোর জন্য। দিলীপ মানে তো কাগজওয়ালা?”
মা তেড়ে এসেছিলেন, “ফের অমন করে কথা বলছিস ঝগড়াটে মেয়ে? বাপ-মা লেখাপড়া না শেখালে এতো হিসেব দেখাতিস কী করে? দিলীপকে বলে কিনা খবরের কাগজওয়ালা! কেন? না ও রবিবারগুলোতে পার্টির কাগজটা বিলি করে। অসভ্য মেয়ে কোথাকার। এই ব্যবহার হবে বলে পেটে ধরেছিলাম তোকে!”
সুরচিতাও ফুঁসে উঠেছিল, “সে পার্টির হোক আর ভাটির, সপ্তায় সাতদিন হোক আর একদিন, খবরের কাগজ বিলি করলে তাকে কাগজওয়ালাই বলে। শেখার কথা কী বলছ? কতটা বাস্তব চিন্তা করেছ আমার শিক্ষা নিয়ে? পার্টির শিক্ষা অক্ষরে অক্ষরে মেনে তোমরা আমাকে না পড়িয়েছ ইংলিশ মিডিয়ামে না পড়তে দিয়েছ ইঞ্জিনিয়ারিং, পাছে তোমাদের পার্টির লোকে তোমাদের অপছন্দ করে, আত্মীয়রা মিথ্যুক বলে বা পাড়াপড়শিরা তোমাদের দ্বিচারণ দেখে মুখ বেঁকিয়ে হাসে, গুছিয়ে তোমাদের নিন্দে করে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে আমার স্বার্থপর আর আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখে। আরও বেশি করে ভয়ে; যদি আমি তোমাদের লাগামছাড়া হয়ে যাই আর তাতে তোমাদের এই সব আত্মীয়-বন্ধু-পার্টি-পরিজন যাদের আপনজন বলার ভান করে সাজানো আনন্দে বেঁচে আছো তারাও তোমাদের ত্যাগ করে তোমরা ভণ্ড বলে--”।
মা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন, “তুই কী চান্স পেয়েছিলি এন্ট্রাসে?”

~~~~~~
Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml
(চলবে)

Friday, April 10, 2026

Panchpoksho - 07

পাঁচপক্ষ
~~~~~~



প্রথমপক্ষ
~~~~~~
সুরচিতা বলল, “কেন? অভিকে গোরা সাহেবের গরমের রাজধানী দেখাতে পারি।”
মা বললেন, “তোর ঢং তুই রাখ। নিজে তো ধিঙ্গি শিরোমণি, ছাত্রকে যে সকাল সকাল সংসারে মন দিতে বলবে তেমন দুরাশা আমি করি না। এবার রাখো।”
মা ফোন কখনও রাখেন না। কথা বলতে না ইচ্ছে করলে, সুরচিতাকেই বলেন লাইন ছেড়ে দিতে। মিশনে আসার আগে থেকেই মা-বাবা চাইছিলেন সুরচিতা সংসারী হওয়ার কথা ভাবুক। কিন্তু সুরচিতার যথেষ্ট কারণ ছিল সেসব এড়িয়ে পালিয়ে বেড়ানোর। সেই হেতু সে ধিঙ্গি শিরোমণি ও মা-বাবার শিরঃপীড়ার কারণ। আজ কিন্তু মায়ের কথায় সুরচিতা মোটেই আহত হলো না। বরং এতদিন পরে অভির দেখা পাবে ভেবে কেমন একটা নতুন অনুভূতিতে একসাথে উদ্দীপিত আর আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল যেন।

আজ পূর্ণিমা নয়। পরশু পূর্ণিমা। তাই তারারা সব অস্পষ্ট। কোনো একটা ক্রিপ্টোমেরিয়ার ডালপাতার ঘেরাটোপ থেকে একটা ইন্ডিয়ান ব্রেনফিভার একটানা ডেকে চলেছে “চো-ও-খ গেলো-ও”, “চো-ও-খ গেলো-ও”, “চো-ও-খ গেলো-ও”- - -। সুরচিতা বাগান থেকে ঘরে এসে টান টান শুয়ে পড়ল খাটে।
আজ রাঁধবেও না; খাতাও দেখবে না; বইও পড়বে না। খিদে পেলে? দুধ বিস্কুট খাবে। কিন্তু আজ আর কিচ্ছু না। এতো দিনের অপেক্ষা তার সত্যি হতে চলেছে। যে কিশোরকে সে ছেড়ে এসেছিল তার যৌবনের ফটকে, সে আজ পূর্ণ পৌরুষে প্রেমের দাবি নিয়ে এলো বলে সুরচিতার দরজায়। অবাক সুরচিতা ফিরে দেখতে চাইছিল ফেলে আসা বছর মাস দিন ক্ষণ।

আর শেষ প্রস্তুতি নিচ্ছিল আসন্ন ঝড়-ঝঞ্ঝার জন্য। তবুও মন জুড়ে সেই প্রথম যৌবনের গোধূলির রক্তরাগ; “সে আসছে, সে আসছে--”। মগজ জুড়ে কঠিন পরীক্ষার উত্তেজনা, আর হৃদয় দ্রবীভূত প্রেমের ম্যাগমা স্রোতে। আর মন? তার জন্যই তো এতো জটিলতা--এতো পেয়েও নিঃস্ব থাকার সাধনা, সর্বস্ব সঁপে দিয়ে স্বার্থপরের তকমা নেওয়া; সব দান, সব উপহার গ্রহণ করতে না পারার অক্ষমতায় অহঙ্কারীর পরিচয়ে বাঁচা; লাভ-ক্ষতির হিসেব না করে, জীবনটা যাপন করে যাওয়া; সত্তাকে ভাগ-যোগ-বিয়োগ না করে, তার কয়েকগুণে প্রকাশ করা; যা গেল তার দুঃখ না পেয়ে যা আছে তার আনন্দে মত্ত থাকা।
~~~~~~
Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml
(চলবে)

Thursday, April 9, 2026

Panchpoksho - 06

 পাঁচপক্ষ
~~~~~~



প্রথমপক্ষ
~~~~~~
সুরচিতার মা শুধু বাইরের খোলসটার কথাই জানেন। তাঁর মনে হয় যে পড়াশুনায় অনুৎসাহী একদল ছেলেমেয়েকে লেখাপড়ায় তুখোড় করার চেষ্টা করে বাজে সময় নষ্ট করছে তাঁর মেয়ে। তাঁর ধারণা যে সুরচিতা হাজার চেষ্টা করলেও অমনোযোগী ছাত্রদের কিছুতেই কিছু শেখাতে পারবে না। তাঁর মতে এই ভস্মে ঘি-ঢালা পরিশ্রমে সুরচিতা মিশনের উদ্দেশ্যসিদ্ধির একটা যন্ত্র হয়ে উঠেছে মাত্র। বরং ঝকঝকে দু-চারজন ছাত্রকে প্রাইভেট টিউশন দিলে তার সংসার-খরচ আর বাড়িভাড়া উঠে আসত, মাইনেতে হাতই পড়ত না, সেটা জমত ভবিষ্যতের জন্য। কিছু সুনামও বাড়ত তাঁর মেয়ের। তাই তিনি সুরচিতার সপ্তাহান্তের কাজ নিয়ে তাঁর অপছন্দ আর বিরক্তি মাঝে মাঝে ব্যক্ত করে থাকেন।
আজ কিন্তু তিনি ভীষণ উত্তেজিত, আহ্লাদিত। এমনটা হয় তখনই যখন তিনি ভাবেন যে তিনি সুরচিতার নিস্তরঙ্গ জীবনে এক ঝলক খুশির তুফান তুলে দিতে চলেছেন। তাই সুরচিতার রান্নার পদাবলী শুনেও তিনি বললেন, “ভালো। কাল বাদ পরশু একটু ভালো করে বাজার করে রাখিস। ভালো করে রান্নাও করিস।”
সুরচিতা কৌতুক করে বলল, “তুমি আসবে বুঝি?” মা বললেন, “রক্ষে করো। তোমার অমন হাঁটুভাঙা পাহাড়ের মাথায় আমি আবার যাব? তাও এই চৈত মাসের বৃষ্টির পরে, শীতশীত স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ায়? তারওপর তোমার আবার আদরের ইস্কুলের কোয়ার্টারখানা পাথুরে গোমড়ামুখো বাড়ি। কতো বছরের শ্যাওলা আর হাঁপানির ব্যামো বাসা করে আছে যেন!”
মা থামলেন। হয় কথা হারিয়েছেন, না হলে খেই। না হলে দম, না হলে সাহস। এই বুঝি সমালোচনা অসহ্য হলো বলে মেয়ে তাঁর ফোন কেটে দিল। কিন্তু মেয়ের এসব কথা গায়ে লাগে না। যেদিন সময় থাকে না সেদিন ফোন কেটে দেয়; বা ইচ্ছে করে না পুরোনো রেকর্ড শুনতে সেদিন ফোন কেটে দেয়।
কিন্তু আজ মায়ের কথায় ভণিতা আছে। মানে তার পেছনে একটা চমকপ্রদ খবর আছে। বা আপাত চমকপ্রদ খবর আছে। তাই সে বলল, “কিন্ত পরশু দিনটা হঠাৎ বিশেষ রান্নার দিন হতে যাবে কেন?”
মা বললেন, “সে তুমি জানবে কী করে? কাউকে তো ফোন নম্বর দাও না। অমন ছায়ার মতো ছাত্র তোমার, তাকেও দাও নি।”
সুরচিতার সব রক্ত যেন দুগালে এসে জমা হলো, বুকের মধ্যে হাতুড়ি পিটতে লাগল। গলাটা শুকিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু গলা জুড়ে আনন্দ খেলিয়ে বলল, “অভি আসছে, মা?”
মা বললেন, “হ্যাঁ। সে ছেলে যে আবার একটা নতুন চাকরি জুটিয়েছে তা তো তোকে বলেইছিলাম। এবার একটু লম্বা ছুটিতে এসেছে। তোর কাছে যাবে কদিনের জন্য। ভালোমন্দ খাওয়াস। আর কোনো সুকর্ম তো তোকে দিয়ে হবে না।”
~~~~~~
Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml
(চলবে)

Wednesday, April 8, 2026

Panchpoksho - 05

পাঁচপক্ষ
~~~~~~



প্রথমপক্ষ
~~~~~~
একবার কৈশোর যৌবনের এই দ্বন্দ্বে প্রবৃত্তির কাছে বোধের হারটা সুরচিতার কাছে ব্যক্তিগত আঘাত হয়ে উঠেছিল। এই হার তার থেকে কেড়ে নিয়েছিল তার এক মেধাবী ছাত্রীকে। তার স্বভাবগত প্রতিশোধস্পৃহা থেকে সে প্রতিজ্ঞা করেছিল যে বোধ আর প্রবৃত্তির লড়াইতে বোধকে জিতিয়ে দেওয়ার জন্য সে আপ্রাণ চেষ্টা করবে। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে সে ছল আর কৌশলের হাত ধরবে।
হয়তো ভাবতো না এমন করে। কিন্তু ঘটনার পারম্পর্যে তার মনে পড়ে গিয়েছিল তার নিজের কৈশোরের অসহায়তার কথা, মরিয়া হয়ে প্রতিকার খোঁজার কথা। তার প্রথম যৌবনের ইচ্ছে আর আবেগ অবদমনের কথা। তার জীবনে পাওয়া যাবতীয় যৌনাঘাতের কথা, সেসব কাটিয়ে ওঠার চেষ্টার কথা। তার প্রেমের কথা।
সেসব কথার নৈর্ব্যক্তিক বিশ্লেষণে সে বুঝেছিল যে নিজের আবেগ আর বুদ্ধি দিয়ে যে জগৎ সে বানিয়েছে, সেদিন থেকে তার বর্তমান অবধি, সেটাই তার আর তার সাথে নানা সম্পর্কে জড়িয়ে থাকা নিকটতম মানুষগুলোর জীবনের বর্ম, সামাজিক আক্রমণের প্রতিরোধে, সামাজিক আগ্রাসন থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্যও। এর থেকে তার বিশ্বাসও জন্মেছে যে দুর্বুদ্ধি যদি মানুষের আবেগকে উস্কে মানুষের মধ্যে দলাদলি আর দাঙ্গা বাধাতে পারে, তাহলে বুদ্ধি দিয়েই মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে তাকে বিবেচক আর সংযতও করে তোলা যায়।
এই কৌশলের নাম চরিত্র গঠন বা চরিত্রে গিঁট পাকানো--যাই হোক না কেন। সুরচিতা জীবনকে আরও বোধ, আরও বিবেচনা, আরও স্বস্তি, আরও সন্তোষ দেওয়ার জন্য কোমর বেঁধে নেমেছে সেই থেকে। প্রকাশ্যে অঙ্ক শেখালেও, ভেতরে ভেতরে তার কারখানা যুক্তি বোনে ছাত্রদের ভাবনায়, যথাযথ প্রশ্ন করতে আর যুক্তিভিত্তিক উত্তর উপলব্ধি করতে শেখায়, সামাজিক আগ্রাসনের থেকে ব্যক্তি হয়ে টিঁকে থাকতে শেখায়। শুধু তাই নয়। টিঁকে থাকার এই লড়াইতে কী করে হাতের কাছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অস্ত্র চিনে নিতে হয়, কী করেই বা তা ব্যবহার করতে হয় সে সম্বন্ধেও কাজে লাগার মতো তথ্য ছড়ায়।
~~~~~~
Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml
(চলবে)

Tuesday, April 7, 2026

Panchpoksho - 04

 পাঁচপক্ষ
~~~~~~



প্রথমপক্ষ
~~~~~~
আবাসিক পালানোটা তাই তাদের কাছে ভয়ঙ্কর দুর্যোগের সামিল, না হলে দুর্যোগের প্রাদুর্ভাব। তাই এসব দুর্যোগের মোকাবিলা করার জন্য, বিশেষ করে, স্থানীয় মানুষের মনে মিশনের অস্তিত্ব আর কাজ নিয়ে সন্দেহ, অসন্তোষ, ক্ষোভ বা সেসব তৈরি হওয়ার মূল নিড়িয়ে ফেলার চেষ্টায় নিয়মিত আশেপাশের গ্রামগুলোতে যান মিশনের সন্ন্যাসিনীরা। তাঁরা চেষ্টা করেন স্থানীয় ভাষাটা রপ্ত করে আশেপাশের গ্রামের লোকেদের দৈনন্দিন যাপনের সুখাসুখের খবরাখবর রাখার। তাঁরা মনে করেন যে এভাবে তাঁরা মিশনের প্রতিবেশিদের অবিশ্বাস জিতে বিশ্বস্ত হয়ে উঠতে পারবেন, আশা ভরসার আধার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবেন, আর তার ফলে নিজেদের জনপ্রিয়তা ও পৃষ্ঠপোষকের সংখ্যাও বাড়াতে পারবেন।

গ্রামে নানা ধরনের কাজ করে মিশন। তার মধ্যে যেমন আছে রুগীর আর আহতের শুশ্রূষা, ধাত্রীর সেবা, ভূত তাড়ানো, ভূত ছাড়ানো তেমনই আছে আচার বানানোর, সেলাই করার, গরম কাপড় বোনার বা জৈব চাষ করার কৌশল শেখানো, আরও আছে শিশুকিশোরদের পড়াশোনা শেখানোর কাজ আর চরিত্রবিকাশের উদ্যোগ। সুরচিতা যোগ দিয়েছে পড়াশোনা শেখানোর কাজে। শুরুতে চরিত্রবিকাশ ব্যাপারটা কী-কেন এসব নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু তার ছাত্রদের মতিগতি বুঝতে গিয়ে সে ক্রমে সামিল হয়ে গেছে চরিত্র রূপায়নের উদ্যোগে।

তার বেশ হাসিই পেত প্রথম প্রথম নামগান শুনিয়ে, জপমালা ধরিয়ে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের ধার্মিক করে তোলার নামে ধর্মভীরু করে তোলার চেষ্টা দেখে। কিন্তু যত দিন কেটেছে তার কাছে স্পষ্ট হয়েছে এই চেষ্টার মূলে আছে নিতান্ত জান্তব জৈবিক জীবনকে অতিক্রম করে মনুষ্যত্ব অর্জনের এক অধ্যবসায়। কিন্তু জৈবিক প্রক্রিয়ার অমোঘতার সাথে সংঘাতে বেশিরভাগ সময়েই সে অধ্যবসায়ের হার হতে দেখেছে। বার বার অনুশীলন, অধ্যবসায়ের শৃঙ্খলা কাটিয়ে বয়ঃসন্ধির নতুন যৌনাকর্ষণ টেনে নিয়ে গেছে ছেলেমেয়েগুলোকে অকালে প্রাপ্তবয়স্ক দায়িত্বের দিকে, নেহাৎ প্রাকৃতিক খেয়ালে।
অপরিণত যৌবন আর অনুদ্‌যাপিত কৈশোরের যুদ্ধে শেষ হয়ে গেছে কিছু জীবন নেহাৎ অল্প বয়সে। কিছু জীবন নড়বড়ে দুর্বল অস্তিত্ব নিয়ে গড়িয়ে গেছে প্রথম ভ্রান্তি থেকে পরবর্তী ভুলে, তার থেকে বৃহত্তর অপরাধের কবলে। কিছু জীবন নড়বড়ে অস্তিত্বে টিঁকে থাকার লড়াইকে করে ফেলেছে ভয়ানক জটিল। কিছু জীবন বঞ্চিত হয়েছে সুস্থ পারিবারিক জীবন থেকে। কিছু জীবন আত্মঘাতী হয়েছে, কিছু হয়েছে সন্তানঘাতী। কিছু সদ্যজাত প্রাণ নিভে গেছে অবহেলায়, পরিত্যাগে।
~~~~~~
Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml
(চলবে)

Monday, April 6, 2026

Panchpoksho - 03

 পাঁচপক্ষ
~~~~~~



প্রথমপক্ষ
~~~~~~
এই দুদলের মেয়েদের কাছেই পূর্ণবয়সে মিশনের সন্ন্যাসিনী হওয়ার বা মিশনের বেতনভুক কর্মী হওয়ার বা মিশন ছেড়ে যাওয়ার রাস্তা খোলা। বলাবাহুল্য প্রথম দলের মেয়েদের জন্য মিশনের শিক্ষা একটা কেনার মতো পরিষেবা, এবং, দ্বিতীয় দলের জন্য জীবনের চরমতম সৌভাগ্য। অন্তত তাদের সেরকম বোঝাতে মিশনের অনেক রকম চেষ্টা ও ব্যবস্থা আছে।
অত্যন্ত অভিপ্রেতভাবেই প্রথম দলের মেয়েরা অবলীলায় মিশন ছেড়ে যায়, যখন খুশি তখন, অপূর্ণবয়সেও, শিক্ষান্তে বা তার আগেই এবং দ্বিতীয় দলের মেয়েরা মিশনের বাইরে বেরোতে সাহস করে না যতক্ষণ না কেউ তাদের হাত ধরে আশ্বস্ত করে যে মিশনের থেকেও বেশি নিরাপত্তা সেই হাতের মুঠোয়, পূর্ণ বা অপূর্ণ বয়সে, শিক্ষান্তে বা তার আগেই। তবে সেই হাতের মুঠো আলগা হলে মেয়েরা যে সবাই আবার মিশনে ফিরে আসে তা নয়। অধিকাংশই নিজের খাত খুঁড়ে চলতে থাকে নিজের মতো। কেউ কেউ ফিরেও আসে। তাদের বশ্যতা হয়ে যায় গভীরতর।

এই দুদল মেয়ের কেউ কেউ যে হঠাৎ করে মিশন ছেড়ে পালায় সেই পালানোর ঘটনাগুলোকে মিশন এবং স্থানীয় মানুষ কখনও ভাবেন অনভিপ্রেত অধ্যায়, কখনও মেনে নেন দূর্ঘটনা বলে। তবে মিশনের বাইরে ঘটলে যে ঘটনা নেহাৎ স্থানীয় লৌকিক জীবনের যাপনের অংশ বলে ধরা হয় বা তার অবক্ষয় বলে মনে করা হয়, কখনও কখনও সেই ঘটনাই ত্যাগের আদর্শে মহান, নিয়ম শৃঙ্খলায় আঁটসাঁট এবং অনন্য সংস্কৃতির ধারক বাহক বলে নিজেদের দাবি করে যে-মিশন সেখানে ঘটলে, পরম লজ্জার ঘটনা বলেই দেখা হয়, মিশনের মধ্যেও, মিশনের বাইরেও।
স্থানীয় মানুষের বুদ্ধিকে যেমন প্রয়োজন তেমন প্রভাবিত করার জন্য উপযুক্ত সময়ে এসব ঘটনাকে মিশনের অজুহাতে এলাকার বাইরে থেকে আসা ভিনদেশি, ভিনভাষী মেয়েমানুষগুলোর বয়ে আনা অপসংস্কৃতি বলে চালানোর চেষ্টাও বিরল নয়। এদিকে মিশনেরও লক্ষ্য স্থানীয় সমাজটাতে প্রতিপত্তি পাওয়া। সেখানকার মানুষগুলোর মনের নিয়ন্ত্রণ পাওয়া।
~~~~~~
Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml
(চলবে)

Sunday, April 5, 2026

Panchpoksho -02

পাঁচপক্ষ
~~~~~~



প্রথমপক্ষ
~~~~~~
সুরচিতার মা সারা জীবন জেনে এসেছেন যে ঘরের কাজ যদি পয়সার বিনিময়ে লোক দিয়ে করিয়ে নেওয়া যায় তাহলে তিনি যেমন স্বাছন্দ্য পান তেমনই একটা অদক্ষ শ্রমিকেরও কর্মসংস্থান হয়। তিনি আজও মনে করেন যে বাড়িতে কাজের লোক রাখাটাও সমাজসেবা হিসেবে খুব খাটো নয়। কিন্তু এসব নিয়ে তাঁর মেয়ের স্পষ্ট কোনো মনোভাবই তিনি কখনও টের পান নি।
সুরচিতা নিজেও কখনও বোঝার চেষ্টা করে নি মিশনের মত বা মায়ের মেনে চলা আদর্শের মধ্যে কোনটা ঠিক। আগে তার মনে হতো যে মায়ের নিজস্ব বলে কোনো ধারণা নেই, তাঁর সব মতামতই একটা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বৃহত্তর অভিসন্ধি প্রসূত এবং মা যা কিছু বলেন বা করেন সে সবই সেই রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বশীভূত ব্যক্তিত্বে ও সত্তায় তাদের অভিসন্ধি সিদ্ধির যন্ত্র হিসেবে করেন বা বলেন।
মিশনে কাজ নেওয়ার পর থেকে তার ধারণা সামান্য বদলেছে। সে এখন মনে করে যে দুর্বল মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ জারি করে সমাজের একেকটা অংশে দখল কায়েম রাখতে একেকটা গোষ্ঠী একেক রকম ফিকির করে। তার একটা উদাহরণ একটা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কাছে মায়ের বশ্যতা, আরেকটা উদাহরণ মিশনের বিধি ও ক্রিয়াকলাপ যার একটা মিশনের গ্রামসেবা কর্মসূচি।

মিশনে কাজ নেওয়ার আগে সুরচিতা বাবা-মায়ের সাথে থাকত। ছাত্র হিসেবে তার সুনাম ছিল। তাই তার কলেজজীবন থেকেই তার কাছে প্রচুর ছেলেমেয়ে পড়তে আসত। সে যখন বৃত্তি হিসেবে শিক্ষকতাই বেছে নিয়েছিল তখন তার বাবা-মা ভেবেছিলেন যে মেয়ের প্রাইভেট টিউশন কিছু বাড়বে। মেয়ের রোজগারও বাড়বে। কিন্তু তাঁদের সেসব ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে সুরচিতা নিজের উদ্বৃত্ত সময় লাগিয়েছিল অভাবী ছেলেমেয়েদের নিখরচায় পড়ানোর কাজে।
তবে শুরুতেই পয়সা নিয়ে বাড়িতে পড়ানোটা এক্কেবারে ছেড়ে দেয় নি সে। মিশনের ইস্কুলে চাকরি নিয়ে বাড়ি ছেড়ে তার প্রাইভেট টিউশন বন্ধ হয়ে গেছে, কারণ মিশনের অনুশাসন আর তার ভৌগোলিক স্থানান্তরণ। কিন্তু মিশনের গ্রামসেবা কর্মসূচিতে সে নাম লিখিয়েছে চাকরি নেওয়ার বেশ কয়েক বছর পরে।

মিশনের ইস্কুলে একদল মেয়ে আসে অবস্থাপন্ন পরিবার থেকে আদব, কায়দা, আচরণ, মনন, চিন্তনে সমাজে নজরকাড়া ব্যক্তিত্ব হওয়ার জন্য। আরেকদল মেয়ে মূলতঃ মিশনের কুড়িয়ে আনা বা মিশনকে দান করে দেওয়া কপর্দকহীন আশ্রিত, কেউ কেউ অজ্ঞাতকুলশীলও বটে।
~~~~
Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml
(চলবে)

Saturday, April 4, 2026

Panchpoksho -01

পাঁচপক্ষ
~~~~~~



প্রথমপক্ষ
~~~~~~
এখানে সন্ধে নামে ক্রমে। প্রথমে ঘাসে, তারপর উপাসনা কেন্দ্রের ছাদে, সব শেষে ক্রিপ্টোমেরিয়ার চূড়ায়। স্তরে স্তরে অন্ধকার জমা হয় তলা থেকে ওপরে। জলের মতো। নিজের কোয়ার্টাস্-এর বাগানে দুসারি মাছি গোলাপের মধ্যে বসে একটু একটু করে এভাবে অন্ধকারে ডুবে যেতে ভালো লাগে সুরচিতার। এসময় কিচ্ছুটি না করে গুটিসুটি প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে থাকতে ভালো লাগে তার।
তারপর তারারা আকাশে জাগে একে একে। কিংবা জাগে না। আকাশ মেঘের চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে থাকে। তারা শুদ্ধু আকাশটা জাগলে ঝাঁপ দেয় সামনের খাদে। নানা রঙের তারার আলোয় সন্ধেটা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। মনে হয় ওরা সবাই হাসছে, খেলছে। আর আকাশ ঘুমোলে খাদের কোলের উপত্যকাও কুয়াশার কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। সেখানে প্রাণ আছে কিনা বোঝার জো থাকে না। এই অনিশ্চিত মেঘ-কুয়াশার খেলায় কিন্তু নিশ্চিত ঘটনা হলো সুরচিতার মায়ের ফোন। সেটা রোজই আসে, সন্ধে নামার পরে।

আজও এলো। মা জানতে চাইলেন, “আজ রান্না করলি না আছে?”
আছে কি নেই জানে না সুরচিতা। কিন্তু বলল, “কালকের ভাত আছে। আজ ডাল করব আর মাছ ভাজব।”
এরপর প্রত্যাশিত দুখি দুখি সুরে মা বলবেন, “কেন, একটা ঢেঁড়সের ছেঁচকি কেন করলি না?”
সুরচিতা বলবে, “ক্লাস টেস্টের খাতাগুলো দেখতে হবে মা। এতো হাঙ্গাম করে রান্না করার সময় কই?”
মা দুঃখ করবেন, “তোদের ইস্কুলে তো আবার দিদিমণিরও কাজের লোক রাখার নিয়ম নেই। কী দরকার অমন চাকরিতে? অন্য আর ইস্কুল নেই দুনিয়াতে? তারপর আছে যতো বাউণ্ডুলে মেয়েমানুষের মাথায় অঙ্ক ঢোকাবার পাগলামি--”
এইখানে সুরচিতা মাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, “এখন রাখছি।”
তারপর পায়ে পায়ে ঘরে ঢুকে পড়ে। চালে-ডালে খিচুড়ি চাপিয়ে দেয় বা খাবার কী আছে কী নেই দেখে যা খুশি তাই রেঁধে নেয়। তারপর ক্লাসটেস্টের বা যে কোনো খাতা নিয়ে বসে যায় দেখতে বা কোনো বই পড়তে।

সুরচিতা একটা মিশনারি ইস্কুলে অঙ্ক শেখায়। মিশনের অনুশাসন অনুযায়ী তাকে মিশনের দেওয়া কোয়ার্টাস্-এ থাকতে হয় এবং গেরস্থালির কাজ নিজে হাতেই করতে হয়। মিশনের আশ্রিতা বা সন্ন্যাসিনী হলে অবশ্য আশ্রমের আবাসনে থাকতে হতো। বদলে মাস-মাইনের পুরোটা মিশনকে দান করে দিতে হতো। মিশনই অথর্বকালের আর পরকালের দায়িত্ব নিত। এখন শুধু ঘরভাড়াটুকু দিতে হয়, আর স্ব-সহায়তার নজির হতে হয় ছাত্রদের এবং সমাজের সামনে।
Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml
(চলবে)

Tuesday, March 31, 2026

Sibolir Prtiksha

 

সীবলির প্রতীক্ষা

কেন, আবার কী হলো? মায়ের গলাতেও বিরক্তি। এমনটাই যে হবে তা সীবলির প্রায় জানা ছিল। কিন্তু ধৈর্যের সীমা কী শুধু বাকি সবার? সীবলির নয়? 

আসলে যতক্ষণ একটা মানুষ নির্বিরোধে অন্য আরেকটা মানুষের ধারণাকে গ্রহণ করে, তার সিদ্ধান্ত মেনে নেয় ততক্ষণ কোনো অশান্তি থাকে না। কিন্তু সেই মানুষটা নিজের মতটা জাহির করলেই এতক্ষণ যারা নিজেদের ধারণা আর সিদ্ধান্ত জাহির করছিল তারা রেরে করে অনমনীয়তার সমালোচনা করে। 

কিন্তু অনমনীয়তা অসহিষ্ণুতা কার যে অদ্যাবধি নির্বিরোধে অন্যের মত গ্রহণ করেছে তার নাকি যে তিলমাত্র মতান্তরের জন্য প্রস্তুত নয় তার?

সীবলি জানে এসব তর্ক তার একান্তের। বাকি দুনিয়া এসবে কর্ণপাত করে না, তো বিবেচনা! 

মা-ও সেই দুনিয়ার বাসিন্দা। কোনোদিন তলিয়ে দেখেন নি যে যে বেঁচে থাকাটাকে মা জলের মতো বাঁচা বলেন সেটা প্রশম নাকি তারল্যটা জলের মতো হলেও স্বাদটা অ্যালকোহলের মতো তিতকুটে, স্পর্শটা ঝাঁজালো আর উষ্ণ, পরিণামটা নেশাতুর। 

আপাতত সে জবাব দেয়, কার্যকারণ বাড়ি পৌঁছে বলব। রাস্তাটা পিছল হয়ে গেছে বৃষ্টিতে। ঝোড়ো হাওয়ায় গাড়ি কাঁপছে। সাবধানে ড্রাইভ করতে হবে। এখন রাখছি। 

যদিও সে জানে বাড়ি পৌঁছে বলার মতো বিশেষ কিছুই নেই তার।

অনেকগুলো বছর হয়ে গেছে। তবু সীবলির মা, বাবা এখনও অবাস্তবের বিশ্বাসে অটুট। কিন্তু সে নিজে তো সেদিনই বুঝেছিল তার পক্ষে আর কাউকেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়, যেদিন সে তপোস্নিগ্ধকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। 

কতো বছরের সম্পর্ক তার সাথে! দশ বছর ধরে দুজনে একসাথে বড়ো হয়েছে। দুজনেই ভেবেছিল একসাথে বুড়োও হবে, যদিও তাদের বয়স তখন বেশ অল্প ছিল। কিন্তু সব ইচ্ছে যেমন সত্যি হয় না, এক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। একসাথে বুড়ো হবার ইচ্ছেটা কেমন করে যেন বিয়ের সামাজিক ব্যবস্থায় অনূদিত হয়ে গিয়েছিল। 

তাতেও সীবলি আপত্তি করে নি। এসব ব্যবস্থাদির মধ্যে তপোস্নিগ্ধ একদিন বলেছিল, আমার মায়ের সামনে তুই কার্বনেটোকে চুমু খাবি না। 

তপোস্নিগ্ধ এটা বলবি না, ওই জামাটা পরবি না, ওটা করবি না ইত্যাদি নানা খবর্দারির বাড়াবাড়ি করলেও সীবলি জানত যে দুনিয়াদারি কিংবা ভাবনার জগতে তপোস্নিগ্ধ ও সে পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল ও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। 

কিন্তু কার্বোনেটোকে চুমু খাওয়া সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞাটা সীবলিকে যেন ছ্যাঁকা দিয়ে গিয়েছিল। বাকি সব কিছুর যৌক্তিক যাচাইয়ের মতো এই বক্তব্যের কোনো বিশ্লেষণে সে যায় নি। বোধ হয় চুমু খাওয়ার মতো নিতান্ত একটা অনুভূতিতাড়িত অভিব্যক্তি নিয়ে তর্ক চলে না তাই। 

যেমন দিদিমার নির্দেশ ছিল, মেয়েমানুষ তুমি, দিনে একবারের বেশি বাহ্যে যাবে না। 

এ নির্দেশ শুনে চমকানো যায়, এর অবাস্তবতায় হাসাহাসি করা যায়, এমনকি সংস্কার না মানার অজুহাতে সংস্কার কী সাংঘাতিক অবাস্তবিক যে হতে পারে তার উদাহরণ হিসেবেও এর উল্লেখ করা যায়, কিন্তু এটা মেনে নেওয়াও যায় না, আবার এর প্রতিবাদও করা যায় না।

তপোস্নিগ্ধের কার্বোনেটো সংক্রান্ত ফতোয়ার আগে যতোবার তপোস্নিগ্ধের মা এসেছিলেন সীবলিদের বাড়ি, সীবলি কার্বোনেটোর ব্যাপারে খুব সজাগ বা সন্ত্রস্ত কোনোটাই কখনও ছিল না। কিন্তু ফতোয়ার পরে সীবলির বিবেচনা যেন নজর করতে লাগল যে তপোস্নিগ্ধের মা এবং বাড়ির অন্য কেউ সীবলির বাড়িতে ঢোকার আগেই তপোস্নিগ্ধ কার্বোনেটোকে আদর করার ছলে ওকে ওর ঘরে বেঁধে ফেলে! 

তার মানে যে দুয়েকবার তপোস্নিগ্ধকে ছাড়াই ওর মা আর অন্যরা এসেছিলেন সীবলিদের বাড়ি সেই দুয়েকবার কার্বোনেটো সীবলি আর সীবলির মায়ের পায়ে পায়ে ঘুর ঘুর করছিল। 

সেটা নিয়েই সমস্যা! 

তাই কী তপোস্নিগ্ধের মা হুকুম জারি করেছিলেন, আমাদের বাড়িতে কিন্তু এসব পুষ্যি নিয়ে যাবে না। মা-বাবার সাথে যেমন বাপের বাড়ি এলে দেখা হয়, পুষ্যির সাথেও তাই হবে। 

সীবলি তো কখনও ভাবেই নি যে কার্বোনেটোকে নিয়ে যাবে তপোস্নিগ্ধের বাড়ি, কোনোদিনই নিয়ে যায় নি তো। তাহলে এ প্রসঙ্গ কেন? বিয়ের পর তাকে ওবাড়িতে বাস করতে হতো বলে?

সীবলি তপোস্নিগ্ধকে বলেছিল যে, এমন হয় না যে, আমি আমাদের বাড়িতেই থাকলাম, আর তুই তোর বাড়িতে। তারপর ইচ্ছে হলে আমরা একসাথে দিন কিংবা রাত আমাদের বাড়িতে কিংবা তোদের বাড়িতে কাটাবো- 

কথা কেড়ে নিয়ে ফুঁসে উঠেছিল তপোস্নিগ্ধ, তুই কী বলছিস তুই জানিস না। এসব ছ্যাঁচড়ামির কোনো মানে হয়? 

তারপর সীবলি নিজেকে মাত্র সপ্তাহখানেকে বুঝিয়েছিল যে এভাবে তপোস্নিগ্ধের সঙ্গে থেকে একলা বাঁচা তারপক্ষে দুরূহ, তাই সে যখন একলাই হয়ে পড়ছে তার জীবনে, তার যাপণে, তাহলে তপোস্নিগ্ধের সাথেও সে আর থাকবে না। 

সিদ্ধান্তটা তপোস্নিগ্ধকে জানাতে প্রথমে সে উড়িয়ে দিয়েছিল সীবলির খামখেয়ালি আলটপকা একটা কথার কথা ভেবে, যেমন নাকি মাঝে মাঝেই করে থাকে সীবলির ভিতরের অমলিন কিশোরীটা। কিন্তু কাউকে কিচ্ছু না বলে সীবলি শহর বদলে ফেলায় তার মা, বাবা, তপোস্নিগ্ধ - সব্বাই চমকে গিয়েছিল। 

তপোস্নিগ্ধ ঝগড়া করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সীবলি করে নি। সে বারবার এটাই বলেছিল, তোর সাথে একলা বাঁচাটা কষ্টের। তাই নিজে নিজেই একলা বাঁচব। এতে অনেক বেশি আনন্দ পাচ্ছি। 

নতুন শহরে একটু থিতু হয়েই সীবলি প্রথম নিজের কাছে নিয়ে এসেছিল কার্বোনেটোকে। সেই প্রথম সীবলি বুঝেছিল যে মানুষ হিসেবে তপোস্নিগ্ধের সামনে অনেক সুযোগ বেশি, কিন্তু মনুষ্যেতর কার্বোনেটো বড়ো অসহায়। 

তপোস্নিগ্ধ দোসর পাক না পাক সঙ্গে থাকার লোক পেয়ে যাবে, কার্বোনেটো তো পুষ্যি, রাস্তার কুকুরদের মতো লড়াই করে বাঁচতে শেখেনি। ওকে ঘরছাড়া করলে লড়াইটা শিখতে শিখতেই ও মরে যেতে পারে। 

তাছাড়া প্রাকৃতিক লড়াই-এর শিক্ষা থেকে কার্বোনেটোকে বঞ্চিত করেছে সীবলির মতো মানুষেরাই, সুতরাং আরেকটা মানুষকে তার পছন্দের পরিবেশ দেওয়ার জন্য কার্বোনেটোকে অপরিচিত পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার দিকে ঠেলে দেওয়াটা অমানবিক। 

তাছাড়া মানুষের ক্ষমতা তো কুকুরের থেকে অনেক বেশি। তাই কার্বোনেটো না পারলেও তপোস্নিগ্ধ নিশ্চয়ই পারত নিজেকে নতুন পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে। সে পেরেওছে। কার্বোনেটো এখন তার কবরে। কিন্তু সেই মূহুর্তে সীবলি কার্বোনেটোকেই বেছে নিয়েছিল।

তারপর এতোগুলো বছর কেটে গেছে। এখন সীবলির সাথে থাকে ক্লোরেটো। মা-বাবাও থাকেন সাথে। সঙ্গে থাকে তাঁদের মেয়েকে সংসারী করার চেষ্টা। 

সীবলি তাই মাঝে মাঝে নানান লোকজনের সাথে দেখা করে। কিন্তু আপত্তি আসতে থাকে কখনও ক্লোরেটোকে নিয়ে, কখনও ক্লোরেটোর গোঁফের সবুজাভা নিয়ে, কখনও তার চোখের কাজল কালো গভীরতা নিয়ে। 

বিনা তর্কে সেসব সম্বন্ধকে ফিরিয়ে দেয় সীবলি। তার আর সম্পর্ক হয় না। আজও কাউকে সে ফিরিয়ে দিয়েছে। পুরুষটিকে সে নিজেই তার সম্বন্ধ নাকচ করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বাড়ির লোকেদের জানানোর কাজটা কূটনৈতিক বিচারে মায়েরই। আরও একবার সেই অপ্রিয় নেতিবাচক সিদ্ধান্ত জানাতে হবে অর্ধপরিচিতদের, তাই মা একটু অধৈর্য, বিরক্তও।

বাড়ি ফিরে দেখল মা চা তৈরি করে ফেলেছেন। সীবলি মনটা গুছিয়ে নিল। মা বললেন, লোকে কী বলবে? এরপর আর সম্বন্ধ পাওয়া যাবে না। 

সীবলি চুপ করে চায়ে চুমুকের পর চুমুক দিয়ে চলেছে। কোনো সাড়া না পেয়ে মা-ই আবার বললেন, আমি ভেবেছিলাম চাকরি-বাকরি করলে আমার থেকে ভালো থাকবে। তা না স্বাধীনতার নামে আমারই ঘরে বাড়াবাড়ি চলছে। যা খুশি তা-ই করবে! 

মা একটুক্ষণ চুপ করে আছেন দেখে সীবলি বুঝলো মায়ের কথা ফুরিয়েছে। সে বলল, সমস্যাটা চাকরির নয়। ব্যক্তিত্বের। পছন্দের। 

মা কিছুটা জ্বালানী পেলেন যেন, বললেন, কেন তোমাদের চাকরিতে বলে না জলের মতো হতে হবে, যে পাত্রে রাখবে তার আকার নিতে হবে, কঠিন হলে চলে না, নমনীয় হতে হয়, মেনে নিতে হয়, মানিয়ে নিতে হয়--- জীবনেও কী তাই নয়? 

শেষ চুমুকের চা-টা গিলে নিয়ে সীবলি জানাল, তফাত আছে। চাকরিটা বাড়ির বাইরের ব্যাপার। কিন্তু তুমি জীবনের যে সম্পর্ক নিয়ে নমনীয়তার প্রশ্ন তুললে সেটা ঘরের ভেতরের কথা, তার সাথে বাস করতে হয়। সেখানে অস্বস্তি নিয়ে বাঁচতে চাইছি না। জীবনের সেই জায়গাতেও নমনীয়তা আর তারল্য চাই। কিন্তু সেই তরলটা কখনও চিলড বিয়ারের মতো, কখনো প্রবল শীতে রামের উষ্ণতার মতো। অন্যের অনুভূতিকে তুষ্ট করতে অবিরত জ্বলনশীল একটা তরল হওয়ার মতো। চাকরিতে তো শীতল হওয়া তরল হওয়া স্বার্থবুদ্ধিতে। যে সম্পর্ক নিঃস্বার্থ মনোযোগ চায়, সেবা চায়, উষ্ণতা চায়, আর্দ্রতা চায়, তাতে দাহ্য তরল হলে তো শিগিগির জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে ফুরিয়ে যাব। 

মা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, সীবলি চুপ করে যায়। তারপর সীবলি চায়ের খালি কাপগুলো তুলে নিয়ে রান্নাঘরে চলে যায়, ধুয়ে ফেলে। মা ছাদে চলে যান।

সীবলিও ছাদে যায়। তার ঢাকা চৌবাচ্চার জল গরম করতে দেয়। তারপর সাঁতারের পোষাকে চৌবাচ্চায় নেমে পড়ে। প্রাথমিক চোখের জলে, নাকের জলে কাটিয়ে ওঠে। তারপর এপাড়-ওপাড়ের সাঁতারে টের পায় স্নায়ুজুড়ে কেমন ছড়িয়ে যাচ্ছে জলের আদর। জলের আদরে নিজেকে সঁপে দিয়ে সাঁতারে মগ্ন, আচ্ছন্ন রাত ঘনায়, কেটে যায়।

~~~~~
Written and published in 2013


Monday, March 30, 2026

Deri

 

দেরী



ওহ্‌ হো! প্রজিতের গলায় স্পষ্ট আপশোশ। বাথরুম থেকে বেরোতে আজও সাড়ে আটটা বেজে গেল। ধড়ফড় করে জামা কাপড় পরে, আয়নায় চোখ রেখে, চুলে চিরুনী চালাতে চালাতে টের পেলেন দময়ন্তী টেবিলে ম্যাট সাজাচ্ছেন।

বারান্দায় ভিজে গামছাটা মেলে এসে প্রজিত তাঁর নির্দিষ্ট চেয়ারটিতে বসে পড়লেন। এই সময় একটা চাপা টেনশন হয়। বলে ওঠেন উতলা গলায় দাও গো

রান্না ঘর থেকে দময়ন্তীর আশ্বাসমূলক সাড়া আসে, এই যে। জলের ঘটিটা রেখে দিয়ে যান টেবিলে। তারপর নিয়ে আসেন উচ্ছে ভাজা শুদ্ধু ধোঁয়া ওঠা ভাতের থালা। ছ্যাঁকা বাঁচিয়ে উচ্ছে ভাজা আর ভাত যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি গেলার চেষ্টা করেন প্রজিত। ততক্ষণে দময়ন্তীর তৎপরতায় পাতে ভাতের উপর ডাল আর পাশে আলু-ঢ্যাঁড়সের চচ্চড়ি পড়ে গেছে। বললেন, খাও; মাছটা ভাজা হয়ে এসেছে

ক্ষেপে ওঠেন প্রজিত। একে জানো গরম আমি খেতে পারি না; আপিসে যাওয়ার সময় মাছ ভাজা না খাওয়ালেই নয়? ভাত গরম, ডাল গরম, শুধু উচ্ছে আর ঢ্যাঁড়সটা যা ঠান্ডা

চটপটে হাতে দময়ন্তী ভাজা মাছের কাঁটা বেছে, দলা দলা মাছ পাতে দিতে থাকেন। প্রজিত বলেন ধ্যাৎ! একেই দেরী হয়ে গেছে ..; এই বয়সে ; আর দুবছর চাকরী আছে; লেটে আপিসে ঢুকলেই ইনচার্জ বলবে , আপনারা যদি এমনি করেন তবে জুনিয়রদের কি বলবো মশাই! ; মান-সম্মান ……..

ফুঁসে ওঠেন দময়ন্তী, যত দেরী কি খেতে গেলেই ? এই যে বকে বকে এত দেরী করছ ? 

প্রজিত কোনরকমে মাছের শেষ টুকরোটা মুখে ফেলে তার ওপরই ঢেলে দিলেন ঘটির জল; গিলতে গিলতে বাকি জলটা ঢাললেন পাতে; গজগজ করতে করতে উঠে পড়লেন টেবিল থেকে, আজও পঁয়তাল্লিশের লোকালটা হবে না .. কাল থেকে আর ভাত রেঁধো না আমার জন্য।

 দময়ন্তীর তৎপর জবাব , কাল কেন ? আজ রাত থেকেই রাঁধব না .. 

আবহে চটপটে পানাসাজা হাতের চুড়ির ঠিন ঠিন; আঁচানোর কুলকুচির আওয়াজের ফাঁকে ফাঁকে কানে আসে প্রজিতের; প্রজিতের নীরবতায় স্বরে ও ভাষ্যে তীব্রতর হতে থাকেন দময়ন্তী ,নিজের মান-সম্মানের পরোয়া খুব; আমি যে সকাল থেকে ধড়ফড় করে খেটে মরলাম, আমার সম্মানটা রাখছো কি? 

দময়ন্তীর হাত থেকে সাজা পানটা নিয়ে সংক্ষেপে সারেন প্রজিত , বেরনোর সময় অশান্তি কোরো না । . আসছি

প্রায় ছুটতে ছূটতে পল্লীশ্রী-র মুখে এসে একটা রিক্সা পেয়ে গেলেন প্রজিত। দমে স্টেশন। হাজরার দোকান থেকে সারা দিনের পানের  পুঁটলিটা নিতে নিতেই অ্যানাউন্সমেন্ট।

যাঃ; লোকালটা পনের মিনিট লেট!

স্টেশন চত্বরেই দেখা হয়ে গেল সুশীল, সমীর, প্রণব, অতীশ, দীপেন, মণিময়দের সাথে। লেট-ফেট, টেনশন গায়েব। জমাটি আড্ডা; কখন যে লোকাল এল। কখন তাতে উঠলেন আর কখনই বা হাওড়া স্টেশন পৌঁছলেন প্রজিত স্পষ্ট করে টেরই পেলেন না। 

হাওড়া স্টেশনে ঢুকতেই বিরক্তির একশেষ। দুই আর তিন নম্বর প্লাটফর্মে দুটো লোকাল একসঙ্গে ঢুকেছে। দুটোরই আপ লোকালের অ্যানাউন্সমেন্ট হয়ে গেছে। প্রচণ্ড রাশ; প্রজিতরা উলটো দিকে হেঁটে চলে যান প্লাটফর্মের শেষে। লাইনে নেমে পাশের ফাঁকা প্লাটফর্মে ওঠেন। হনহনিয়ে তাঁদের দল চলতে থাকে লঞ্চঘাটের দিকে। হঠাৎ সমীর হুমড়ি খেয়ে পড়েন। একটা লোক প্লাটফর্মে শুয়ে থকাতেই এই বিপত্তি। সবাই মিলে গালিগালাজ করতে শুরু করেন লোকটাকে। অথচ লোকটা জাগেও না; নড়েও না।

প্রথম প্রজিতই গন্ধটা পান। লোকটা মৃত। শবদেহ থেকে পচা গন্ধটা বের হচ্ছে। বাকি সকলকে প্রজিত অফিসের দিকে এগিয়ে যেতে বলে নিজে চললেন স্টেশন ম্যানেজারের ঘরে, এক নম্বর প্লাটফর্মে, মৃতদেহের খবর দিতে। স্টেশন ম্যানেজারের কথা মত আর. পি. এফ পোস্টে এফ. আই. আর লেখালেন। তারপর শববাহকেরা জুটতে, তাঁদের নিয়ে, পুলিশ নিয়ে এক নম্বর প্লাটফর্মে শবদেহের কাছে গেলেন। শববাহকেরা মৃতদেহ শববাহী গাড়িতে তুলে নিয়ে যেতে প্রজিত পা বাড়ালেন লঞ্চঘাটের দিকে। 

লঞ্চের অপেক্ষায় জেটিতে দাঁড়িয়ে প্রজিত। আঙুলের ফাঁকে ধরা সিগারেট। উড়ন্ত পাফের দিকে তাকিয়ে প্রজিতের মনটা আফশোষে ভরে যায়, সমীরদের কাউকে দিয়ে যদি সেকশনে একটা খবর দেওয়া যেত। পরমূহুর্তেই মনে হল তাঁর, কী-ই বা কারণ দেখাবে ওরা? অবশেষে লঞ্চ এলো; বসার একটা সীটও পেয়ে গেলেন প্রজিত। তখনই মনে হল, যাক গে, পড়ুক গে লেট মার্ক…”। ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাসও পড়ল দুরুদুরু বুক বেয়ে।

গিয়ে আর কিছুই করা যাবে না ভাবতে ভাবতে গঙ্গা পেরিয়ে, হাঁটতে হাঁটতে অফিসে পৌঁছে গেলেন। 

সেকশনে পৌঁছে ঘড়িতে দেখলেন বাজে সাড়ে এগারটা। এগিয়ে গেলেন ইনচার্জের টেবিলের দিকে দিন খোয়ানো পদক্ষেপে। মন স্থির করে ফেলেছেন প্রজিত লেটমার্ক না পড়লেও আজ আর অফিস করবেন না; ছুটির দরখাস্ত দিয়ে দেবেন। কারণ এত পরে এসে আর হাজিরা দেওয়া ঠিক না।

ইনচার্জ মনোতোষ দে; চশমার ফাঁক দিয়ে এক ঝলক প্রজিতকে দেখেই হাজিরা খাতার ওপর কলম ধরে খাতাটা বাড়িয়ে দিলেন । 

প্রজিত ভাবছি, আজ আর . বলেই থমকে গেলেন, চোখ পড়েছে খাতাটার নির্দিষ্ট জায়গায়, সেখানেই মনোতোষ কলমটা রেখেছেন। প্রজিত এ কী! কিন্তু .. বলা মাত্রই মনোতোষ মুচকি হেসে বললেন বনের মোষ তাড়ালেন …”; অপ্রস্তুত প্রজিত। মনোতোষই কথা বললেন, সইটা করুন, মশাই

~~~~
Written in 2007-08
Inspired by real events.

Readers Loved