Showing posts with label Bengali story. Show all posts
Showing posts with label Bengali story. Show all posts

Monday, August 1, 2016

পরীক্ষা

কবিতা বুল্টুকে নিয়ে খাতাবই কিনতে বেরিয়েছে। সন্তোষ পুস্তকালয় ছাড়া কোথাও বুল্টুর বুকলিস্টের সব বই পাওয়া যাবে না চন্দনগরে। দিলীপ কলেজ স্ট্রীট থেকে এনে দিলে সব বই পাওয়াও যায়, সস্তাও পড়ে। কিন্তু তাতে ছেলেকে এক সপ্তাহ বই ছাড়া স্কুলে যেতে হবে; এদিকে পড়াও এগিয়ে যাবে, ছেলে পিছিয়ে পড়বে। এ তো আর কবিতাদের কাল নয় যে ছেলেমেয়েরা অন্যের বই টুকে নিয়ে পড়বে।
অবশ্য কবিতার বা দিলীপের সময়ের সাথে বুল্টুর শৈশবের অনেক ফারাক। বুল্টুর শৈশবে অনাহার নেই, অর্ধাহার নেই, কেরোসিন তেলের জন্য লাইন দেওয়া নেই, একটা লম্পর চারপাশে গোল হয়ে বসে পাঁচ বা আট ভাইবোনের বা তুতো ভাইবোনেদের সাথে গুনগুনিয়ে পড়া নেই। বাবা স্কুলের মাইনে ভরতে না পারায় ডিফল্টার হয়ে রেজাল্টের দিন হাতে মার্কশিট না পাওয়াও নেই। বরং বুল্টুদের পেছনে খাবার নিয়ে দৌড়তে হয়, আর ভালোমন্দ পাতে জোগাতে না পারলে বায়নায় অস্থির হয়ে যেতে হয় মা-বাবাকে। পাওয়ার কাটের সময় ইনভার্টারের ব্যবস্থা না করে দিলেও, বুল্টুদের মা-বাবারা পাড়ার বেকার ছেলের থেকে জেনারেটরের কানেকশন নিশ্চয়ই নেন। আর ভাইবোন তো থাকেই না, থাকলে একটা বা তুতো।
কবিতা আর দিলীপেরও দুই ছেলেমেয়ে। মামণি আর বুল্টু। সন্তোষ পুস্তকালয়ে লোডশেডিং চলছে। যদিও সন্ধে হয়ে এসেছে, কিন্তু এখনও জেনারেটর চালানোর সময় শুরু হয় নি। মোমবাতি, ব্যাটারিতে জ্বলা টর্চ আর ব্যাটারির হ্যারিকেনের আলোয় বইপত্র খুঁজতে সময় লাগছে। কবিতার দুঃশ্চিন্তা হতে লাগল। কাল থেকে মামণির পার্ট ওয়ান পরীক্ষা শুরু।
রিক্সার মাথায় চোঙা লাগিয়ে কিছু একটা বলতে বলতে আসছে। কে জানে হয়তো নচিকেতার ফাংশন আছে। সন্তোষের বই গোছানো হয়ে গেছে। দুটো বই নিতে কাল আবার আসতে হবে। একটা রিক্সা নিয়ে এবার বাড়ি। কবিতা ভাবছে যে, মেয়েটা হয়তো এতোক্ষণে বাতি জ্বেলেই পড়তে বসে গেছে; বাতি জ্বালাতে গিয়ে যদি হাতে ছ্যাঁকা লেগে যায়? কাল যে পরীক্ষা, কী হবে! ভাবতে ভাবতে তার নাকের ওপর ঘাম জমে উঠেছে বড়ো বড়ো ফোঁটায়। একেক সময় নিজের দুশ্চিন্তার বাতিকে নিজেই বিরক্ত হয়ে ওঠে সে। মামণির বয়সে তো রুগ্ন মায়ের হেঁসেল ঠেলে নিজেরা দুবোন পড়াশোনা করেছে কবিতারা। তারওপর ছিল টিউশন করে পড়ার আর মায়ের সংসারের টুকটাক খরচ চালানো। আর পরীক্ষা? সেসব কথা মনে না করাই ভালো।
কবিতার চিন্তার সুতো ছিঁড়ে যায় চোঙাওয়ালা মাইকটা সামনে এসে পড়ায়। কানের পর্দা ফাটিয়ে কতোগুলো কথা যেন কবিতার ঘিলুতে লাভা ঢেলে দিয়ে গেল। যে উৎকন্ঠাকে নিয়ে সে বিব্রত হচ্ছিল সেই উৎকুন্ঠাই তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। নাকের ওপরের ঘাম শুকিয়ে গেল। বুকের মধ্যে শুধুই দুরমুশ চলতে লাগল। কাল বার ঘন্টা হুগলী বন্‌ধ!
তারপর দুঃখের বাষ্পও ঝেঁপে আসতে লাগল চোখে। কেন, কেন শুধু তার জন্যই এতো ঝামেলা জড়ো হয়! আপন মনে সে বিড়বিড়িয়ে ওঠে, ঠাকুর, ঠাকুর একটা কিছু করো। বুল্টু বুঝতে পারে না মা কেন এতো অস্থির হয়ে উঠেছে। তার বেশ খারাপই লাগে, দিদির পরীক্ষা বলে তারও এখন ফুচকা কিংবা সিঙারা খাওয়া বন্ধ। বাড়ি ফিরে শুধু চানাচুর দিয়ে মুড়ি খেতে হবে। সে মনে মনে ভেবে নেয় মাকে লুকিয়ে কিভাবে এক পলা সরষের তেল আর এক চামচ গুঁড়ো লঙ্কা মুড়িতে মিশিয়ে নেবে।
বাড়ি ঢোকার মুখেই কারেন্ট চলে এলো। কবিতা একটু যেন নিশ্চিন্ত হলো। দরজার হ্যাজবোল্ড ধরে নাড়তেই মামণি সাড়া দিল। তাড়াতাড়ি দরজাও খুলে দিল। কিভাবে ওকে খবরটা দেবে কবিতা বুঝতে পারছিল না। জিজ্ঞেস করল, খেয়েছিস? মামণি হাতের খাতাটা থেকে চোখ না সরিয়েই ঘাড় নাড়ল। খাবার টেবিলে বসেছিল সে এতোক্ষণ; সব খাতাপত্র হাতড়ে হাতড়ে গুটিয়ে নিচ্ছে এবার দোতলায় নিজের ঘরে উঠে যাবে বলে। বুল্টু বলল, দিদি জানিস কাল বার ঘন্টা হুগলী বন্‌ধ? মামণি চোখ পাকিয়ে বলল, ঠাট্টা করবি না। প্রচুর টেনশন এখন।  কবিতা বলেই ফেলল, বুল্টু ঠাট্টা করছে না। কাল সত্যি- শেষ করতে পারল না কথাটা সে, মামণি ডুকরে উঠল, কেন? এখনই যতো ঝামেলা? কবিতা বুল্টুকে খেতে দিতে দিতে বলল, সেই একই কারণ। যে কারণে গত চার বছরের প্রত্যেক বছরে চল্লিশ দিন করে রেল অবরোধ হয়ছে; সেই আরামবাগ-সিঙ্গুরে সিপিএম-তৃণমূলে মারপিট; যে কারণে তুই হস্টেল নিলি। নিলিই যখন তখন ছাড়লি কেন? মরিয়া গলায় মামণি এবার বলল, মা বিশ্বাস করো, হস্টেলে থাকলে দেবযানী আমাকে পরীক্ষার হলে পৌঁছতে দিত না। অ্যানুয়াল পরীক্ষার সময় সারা রাত ও ঘরে বসে গাঁজা খেয়ে হট্টগোল করেছিল। চারবার আমার গায়ে জল ঢেলে দিয়েছিল। যাতে আপদে বিপদে পরীক্ষার সময় হস্টেলে গিয়ে থাকার উপায়ই না থাকে, তাই আমি সিটটা ছেড়ে দিয়েছি। সম্ভবত দম নিতে থামে মামণি।
বুল্টু খাচ্ছে আর বড়ো বড়ো চোখ করে মামণির কথা শুনছে। নতুন বইপত্র বুল্টুর পড়ার টেবিলে গুছিয়ে দিতে দিতে কবিতা ভাবছিল, চার সিটের ঘরটা যতোটা ছিল মামণির ততোটাই ছিল দেবযানীরও। বেলদা থেকে কলকাতা এসে মেয়েটা নাকি সবার আগে মিনিস্কার্ট পরতে শেখে। এদিকে পড়ে মামণির ডিপার্টমেন্টেই। হাফইয়ার্লি পরীক্ষার পর ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার হালহকিকত দেখে মাস্টারমশাইরা চারটে স্টাডিগ্রুপ বানিয়েছিলেন। তাঁরা এই মেয়েদুটোকে এক গ্রুপে রেখেছিলেন। কিন্তু দেবযানীকে ধরে পড়তে বসানোটা মামণির মনে হয় অনধিকার চর্চা। অথচ দেবযানীর মনে হয় নি কখনও যে মামণির পড়াশোনায় বাগড়া দেওয়াটা ওর দিক থেকে অনধিকার চর্চা। দেবযানীর নাকি চাকরি-বাকরি পয়সার দরকার নেই, অতএব কী হবে পড়াশোনা করে এমনটাই তার হাবভাব। কিন্তু তার আবার সমস্যা হলো যে সে যা খুশি তাই করবে আর মামণিকেও তার সঙ্গে তারই মতো করতে হবে; না হলে মামণি ওর সাথে একই ঘরে থেকে ফার্স্ট আর সে লাস্ট হবে ক্লাসে এটা সে মানবে না।  তাই তো সেই মেয়ে অ্যানুয়াল পরীক্ষার সময় এমন লম্ফঝম্প করল যে মামণি সারারাত জেগে পরদিন পরীক্ষা দিতে গিয়েছিল, রেজাল্ট হাফইয়ায়ার্লির মতো ভালো হয় নি। মামণি ঘর বদলে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু ততোদিনে নতুন মেয়েরা আসতে শুরু করেছে। ফলে থার্ড ইয়ারের আগে ঘর বদল সম্ভব নয় জানিয়ে দিয়েছিলেন কর্তৃপক্ষ। টেস্ট পরীক্ষার আগে মামণি বাড়ি চলে এসেছিল। তখন অনার্স প্র্যাকটিক্যাল পেপারের পরীক্ষার দিন মাঝপথে ট্রেন অবরোধেও পড়েছিল। কিন্তু দিলীপ রোজ মেয়ের সঙ্গে যেতো। তাই গঙ্গা পার হয়ে, শেয়ালদা লাইনের ট্রেনে চাপিয়ে, সে মামণিকে পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেই কলেজে পৌঁছে দিয়েছিল।
মামণি জিজ্ঞেস করল, কারা বন্‌ধ ডেকেছে? বুল্টু বলল, তৃণমূল। তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে উঠে টেলিফোন ডিরেক্টরির পাতা উল্টোতে লাগল মামণি; কবিতা দৌড়ে এসে বলল, কাকে ফোন করছিস তুই? মামণি কোনো জবাব দিল না। তারপর ডায়াল করতে লাগল। সদর দরজায় দিলীপের বাড়ি ফেরার সংকেত। বুল্টু দৌড়ে গেল দরজা খুলতে।
জুতো খুলে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে দিলীপ শুনতে পেল মামণি চেঁচাচ্ছে, বাঞ্চ অফ রাস্কালস্‌, কাল হুগলি বন্‌ধ ডেকেছিস, জানিস কাল পাঁচ হাজার ছেলে মেয়ে হুগলি থেকে হাওড়া কলকাতা যাবে পরীক্ষা দিতে? হুগলিতেই তিনটে কলেজে ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির পরীক্ষা? আর কিছু যাবে ব্যারাকপুর, নৈহাটিতে। দিলীপ ধমকে উঠলেন, কার সাথে কথা বলছিস? মামণি শুনেও শুনল না। অন্য পাড়ের জবাব শুনে বলল, তোর মতো অশিক্ষিতরা দেশোদ্ধার করার ভান করলে পরীক্ষা বন্ধ ছাড়া আর কী করবে? দুবার তো পরীক্ষা, হয় তোদের জন্য নয় তোদের মতো অন্য পার্টির জন্য পিছিয়েইছে। আর তোরা নিজেদের ডিগ্রির সংখ্যা বাড়ালেই কী শিক্ষিত হবি? বন্‌ধ না তুললে আমরা কাল পরীক্ষা দেব কী করে?...... ডেকেছিস যেমন করে তেমন করে তুলেনে, রিক্সা চেপে গলা ফাটানোর কাজ তো! আমাদের পাড়ার ছেলেগুলোকেই না হয় ডেকে বলে দে...... দেখ তা হলে... ফোন রেখে মামণি বলল, আমি তৃণমূলের কলকাতা অফিসে ফোন করলাম, বাবা। ওরা কাল সকাল ছটা থেকে বার ঘন্টা বন্‌ধ ডেকেছে। দিলীপ বলল, কেন করলি? ওরা বন্‌ধ কী আর তুলবে? তুলে নেব বললেও বিশ্বাস করবি কী করে? মামণি বলল, বিশ্বাস? পলিটিকোদের? তবে ওদের মধ্যে সব দু ভাগ হয়ে গেল বন্‌ধ করা কাল ঠিক হবে কিনা তাই নিয়ে, সেটা বুঝতে পারলাম।
কবিতা চা দিল সবাইকে। বুল্টু পড়তে বসে গেল, নতুন বইতে মলাটও লাগাতে হবে। মামণি দোতলায় চলে গেল। কবিতা চা খেতে খেতে দিলীপকে বলল, কী শুরু হয়েছে? এখানে না হয় কোনো দিনই কোনো গণ্ডগোল হয় না, হয় নি। কলকাতার রাস্তায় রাস্তায়, হাওড়ার গলিতে গলিতে খুন, জখম, রক্তের হোলি খেলা হয় তো এখন আর হয় না, কিন্তু এখন এসবই হচ্ছে আরামবাগে, সিঙ্গুরে, কেশপুরে। তার আঁচ এখানে লাগবে না ভেবেছিলাম। কিন্তু এতো সেই সব দিনের কথাই মনে পড়িয়ে দিচ্ছে। দিলীপ বলল, আজ কোনো স্মৃতিচারণ নয়। কাল রাত তিনটেয় উঠব। চারটে দশের ফার্স্ট লোকালে বেরিয়ে যাব মামণিকে নিয়ে। তারপর দেখা যাবে।  কবিতা ঝটপট রাতের রান্না সেরে নিতে গেল। আজ তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়তে হবে।
স্নান সেরে দিলীপ দোতলায় গেল। মামণির কাছে গিয়ে বলল, কাল তিনটেয় উঠে চারটেয় বেরোতে হবে। আজ নটা অবধি যা হবে তাই পড়। রাতে ভালো করে ঘুমিয়ে নে। কাল পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফেরা অবধি আর তো ঘুমের চান্স নেই। আজ রাত জাগিস না। মামণি বলল, তুমি দুঃখ পেলে ওদের ফোন করলাম বলে? আমি জানি তুমি কারুর থেকে কোনো ফেভার চাইতে মানা করো... আমাদের ভালোর জন্যই। দিলীপ হেসে ফেলল, ফোন করে ঠিক করিস নি। এরা প্রতিবাদ, বিরুদ্ধতা সহ্য করে না। সেখানে এতোটা জ্ঞান দিলি, ওদের ইগোয় ধাক্কা দিলি। ওরা তোর বন্ধু ছিল না, এবার ওরা তোর শত্রু হয়ে গেল। তুই ফেভার চাইলে তো ওদের ইগো আরাম পেত, উল্টে তুই ওদের মেরেছিস, কথার চাবুক। ওরা এটাই চায় মানুষের মধ্যের হিংসেটা, ঘেন্নাটা টেনে বার করে আনতে। হিংসে আর ঘৃণাই রাজনীতির মূলধন, অস্ত্রও বটে। সামনে পেলে তুই ওদের সাথে মারপিটই করে ফেলতিস তাই না? মামণি জবাব দিল না। শুধু তাকিয়ে রইল। দিলীপ বলল, মানে তুইও ওদের যা খারাপ বলে জানিস সেটাই নিজে করে ফেলতিস। আর ওদের রাজনৈতিক শত্রুরা তোকে নিজের দলের বলে প্রমাণ করত। মানে তুইও একটা রাজনৈতিক দলের হয়ে যেতিস। আর অন্য আরেকটা দলের শত্রু হয়ে যেতিস। ......... এদের হারেরেরেতে বুদ্ধি হারাতে নেই। বিচার করতে হয়, কী করে এদের এইসব হল্লা এড়িয়ে নিজের কাজটা সেরে ফেলা যায়। তবে আজকে তো আর একার জন্য কথা বলিস নি। অনেকগুলো পরীক্ষার্থীর হয়রানির কথা ভেবে একটা প্রকৃত কারণের জন্য কথা বলেছিস। চরিত্রবল, সাহস, আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে এই প্রতিবাদ আর বিরুদ্ধতা করার ক্ষমতাটাও জরুরি। সেটা তোর আছে তুই জেনে গেলি। অতএব কাল যাই হোক, একার জীবনে তুই সারভাইভ করতে পারবি। একটু থেমে আবার বলল সে, মনোযোগ হারাস না, ধৈর্য হারাস না, পড়।
রাতে শুয়ে কিছুতেই ঘুম হতে চায় না কবিতার। বুল্টু আর দিলীপের পাল্লা দিয়ে নাক ডাকানো, নাকি মামণির ঘরের জ্বলতে থাকা আলো কিছু একটা কারণ হবে। তারপর একটু ঘুম ধরল কী তছনছ হয়ে গেল সাতাশ বছর আগেকার দুঃস্বপ্নে। তারপর আবার ঘুম একটু গভীর হতে না হতেই তিনটের অ্যালার্ম বেজে উঠল।
মামণিকে সারা দিনের জন্য কিছু খাবার আর জল দিয়ে দিল কবিতা। যন্ত্রের মতো ঝালিয়ে নিল, অ্যাডমিড কার্ড, রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট সব নিয়েছিস তো? মাথে নেড়ে সম্মতি জানায় মামণি। দিলীপের পেছন পেছন দৌড় লাগায় প্রায়। এতো ভোরে রিক্সা পাওয়া যাবে না। ওকে আর দিলীপকে অনেকটা সময় এই শেষ বৈশাখের গরমে কাটাতে হবে ঘরের বাইরে। পরীক্ষা তো শুরু সেই দুপুর বারটায়। এসব ভাবনার একরাশ উদ্বেগে অস্থির শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দেয় কবিতা। ভাবতে থাকে যে সে সব দিনই কী আবার ফিরে এলো? ফিরে আসছে নাকি সেসব দিন? ইউনিভার্সিটির পরীক্ষা তখন প্রত্যেক বছরই পিছোত অনির্দিষ্টকালের জন্য। কোন বছরের পরীক্ষা কোন বছরে হচ্ছে তার ঠিক ছিল না। পরীক্ষা একরকম হলো তো রেজাল্ট বেরোতে বছর ঘুরে যেত। দুষ্টু ছেলেগুলো বলত, দশ মাসে মানুষ একটা বাচ্চার জন্ম দিয়ে দিতে পারে, আর ইউনিভার্সিটি একটা রেজাল্ট বের করতে পারে না! তারপর পরীক্ষা সেন্টারে পৌঁছে দেখো তোমার নাম-রোল নম্বর সেন্টার কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। তখন তুমি ঘুরতে থাকো ইউনিভার্সিটির প্রশাসনিক বিভাগ থেকে সেন্টার আর সেন্টার থেকে ইউনিভার্সিটি।
আলো ফুটল। দিন শুরু হলো। খবরের কাগজ এলো। পুরো পাতা জুড়ে রাজনৈতিক দাঙ্গার খবর। সক্কাল সক্কাল এতো রক্তারক্তির কথা ভালো লাগে না কবিতার। কে জানে এখন চোখের সামনে দাঙ্গা তেমন হতে দেখে না বলেই কী দাঙ্গার ওপর এতো বিতৃষ্ণা? বাড়ির সামনে খুনোখুনি দেখলে হয়তো তার সাথে বসবাসের অভ্যেস হয়ে যেত। যেমন ছিল তিরিশ বছর আগে। তখন মনে হতো যে মাস্টারমশাই শুধু ছাত্রকে শাসন করলেন বলে তাঁকে ছাত্ররা মারল? আজ পরিণত বয়সে কবিতা বোঝে যে মাস্টারমশাই নিশ্চয়ই কোনো মন্ত্রীমশাই বা ষড়যন্ত্রীমশাইয়ের আখেরে ঘা দিয়েছিলেন বা আখের গুছোনোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। আর সুধীরদার পেটের রোগ দাঁড়িয়ে গেল পুলিশের মার খেয়ে খেয়ে, কারণ ওর নকশাল ভাইটাকে পুলিশ কখনও ধরতে পারে নি। অনেক রকম শোনা যেত এ নিয়ে। সুধীরদাকে অমন করে মারা হলো বলেই নাকি ওর ভাইটা পুলিশ খুন করেছিল প্রতিশোধ নিতে, না হলে প্ল্যাম্পফ্লেট বিলি ছাড়া আর কিছু করত না সে ছোকরা। আবার কেউ কেউ বলত, ওর ভাইটাকে পুলিশ আগেই মেরে ফেলেছিল, তার সাঙ্গপাঙ্গদের ভয় দেখাতে সুধীরদাকে বারবার তুলে নিয়ে যেত থানায়। সত্যি মিথ্যের কথা কেউ জানে না। এদেশে স্বাধীনতার পর থেকেই জমির তুলনায় লোক অনেক বেশি। একটা তানা-নানা করে তাদের শত্রু-মিত্র সাজিয়ে লড়িয়ে দেওয়া সোজা। তাতে ধনে-মানে লাভ হয় গদিয়ালদের।
সময় থেমে থাকে না। বুল্টুও স্কুলে রওয়ানা হয়ে গেল যথা সময়ে। তারওপরে ফোন বাজল। দিলীপ আপিস পৌঁছে খবর দিল, সাড়ে পাঁচটায় হাওড়া স্টেশন পৌঁছে গিয়েছিলাম। সাড়ে ছটার পর বাস ধরে কলেজ স্ট্রিট পৌঁছই। তারপর হেদোয় বসে ছিলাম। বেথুনের মর্নিং সেকশনে এতোগুলো মেয়েকে ঢুকতে দিতে চাইল না। কবিতা জানতে চাইল, আর কে কে ছিল? দিলীপ বলল, অনিন্দিতা বলে একটি মেয়ে ও তার মা, জয়ালক্ষী বলে একটি মেয়ে ও তার বাবা তো আমাদের সাথে এখান থেকেই গিয়েছিলেন। তারপর প্রায় শখানেক মেয়ে জড়ো হলো সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যে। জয়ার বাবা আর অনিন্দিতার মা থাকবেন সারাদিন। আমি ওঁদের সাথে মামণিকে রেখে এসেছি। আবার সাড়ে দশটার দিকে একবার বেরিয়ে যাব, আজ তো প্রথম দিন একঘন্টা আগে গেট খুলে দেবে। অনেক বিল উঠে গেল তাই কবিতা আর কথা বাড়ালো না। বাবা আর মেয়ে ঠিকঠাক খেলো কিনা, মেয়ের কাছে টাকা পয়সা আছে কিনা সেসব নিয়ে চাপা উদ্বেগ রয়ে গেল কবিতার মনে। দুপুরে খবরের কাগজটা নিয়ে বসতেই চোখ জুড়ে এলো তার।
কিন্তু ঘুম হলো না। চোখ বুজলেই দেখে যে, সাতাশ বছর আগের একটা দিনে, কিশোর এসে বলছে, কবিতাদি এই মাত্র হেডমাস্টারটাকে মেরে এলাম গো। সারা গায়ে ভয়ের কাঁটা কবিতার আর তার দিদির। মা রান্নাঘর থেকে চেঁচাতে চেঁচাতে ছুটে এলেন, যা অনামুখো, বলেছি না আমার বাড়ির চৌহদ্দিতে পা রাখবি না। বাপ-মার মুখে তো চুনকালি দিয়েইছিস, এখন তোর জন্য আমার ছেলেমেয়েগুলোরও বিপদ হোক। কিশোর চোখে অনেক রাগ এনে বলল, মরা বাপ-মায়ের মুখে চুনকালি দেব কী করে? জেঠুর বাড়িতে চাকরের মতো থাকি, শুধু লোকের মুখ বন্ধ করতে স্কুলে পাঠানো। কী হবে এসব বুর্জোয়া শিক্ষায়? কবিতার মা আবার ধমকে উঠলেন, কে শিখিয়েছে এসব তোকে, ডাক্তারের ব্যাটা? জ্যাঠাও কী তোর মতো অনাথের শ্রেণীশত্রু নাকি রে অকৃতজ্ঞ ছেলে? তাদের মতো মানুষ হয় না তোকে তো ডাক্তারের ব্যাটা কালসাপ বানিয়ে তুলেছে দেখছি! কিশোর মুখভঙ্গি করে বলল, ভারি তো দুধকলা খাওয়াচ্ছিল!, সপ্তায় একদিনের বেশি ভাত দিতে পারে নি... কথা না বাড়িয়ে কুড়িটা রুটি দাও তো এখন... কবিতার মা আরও রেগে গিয়ে বললেন, তোদের নেতা নিজের বড়লোক বাপের না খেয়ে পাড়ার হা-ভাতে লোকের দরজায় শৌখিন ভিক্ষে করতে পাঠিয়েছে? কেন? স্যাঙাত জুটিয়েছে বেছে বেছে যতো বাপ-মা মরা কী বাপে খেদানো অভাগাগুলোকে! গুরুজনদের শত্তুর সাজিয়ে! বলে দিস সে হারামজাদাকে আমার মেয়েদের ফুঁসলানোর চেষ্টা করলে চোখ উপড়ে নেব। আর যদি কখনও রুটি চেয়েছিস এদিকে তোর ঠ্যাং খোঁড়া করে দেব... বলতে বলতে তিনি দরজার শাল কাঠের ভারি খিলটা তুলে তেড়ে গেলেন কিশোরের দিকে। কবিতারা দুবোন মায়ের এই মূর্তি কখনও দেখে নি। কিশোর তো চলে গেল দৌড়ে। মা কবিতাকে খুব বকেছিলেন তারপর, পরদিন পরীক্ষা, পড়ায় মন না দিয়ে অলক্ষুণে ছেলেটার কথা গিলছিল বলে। ইলেকট্রিক কানেকশন ছিল না কবিতাদের বাড়িতে তখনও।  আলো হাওয়ার জন্য দরজা খুলে রেখেই পড়তে বসতে হতো, দিনের বেলা। সন্ধেবেলাও। তাতেই বিপত্তি।
পরদিন ছিল পরীক্ষার শুরু, অনার্স পেপার ওয়ান দিয়ে। অনার্সের হোম সেন্টার আর পাসে বাইরে সেন্টার হতো; সাধারণতঃ কলকাতায়; ফলে দশটার পরীক্ষা দেওয়ার জন্য সাতটা-সাড়ে সাতটায় বেরোতে হতো। কবিতারও পরীক্ষার প্রথম দিনেই বাস বন্ধ ছিল। তখন ওরকম হুটহাট বাস বন্ধ থাকত হামেশাই। নতুন রাস্তা অবধি হেঁটে যাওয়ার পর একটা রিক্সা পেয়েছিল কবিতা আর তার বন্ধু রমা। দালালপুকুরে পৌঁছে দেখেছিল কোনো গাড়িঘোড়া না পেয়ে ওদের আরেক বন্ধু আল্পনা তার বরের সাথে দাঁড়িয়ে। তারপর সেই একটা রিক্সাতেই তিনজনে নরসিংহ দত্ত কলেজে যাচ্ছিল। শ্যামাশ্রীর সামনে পৌঁছে তিনজনের হৃৎকম্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। সিনেমা হলের বারান্দায় ঝুড়ি করে সাতটা মাথা বসানো। ঝেঁপে বৃষ্টি পড়ছে তখন। রিক্সাওয়ালাও তিনজনকে নিয়ে খুব জোরে রিক্সা টানতে পারছিল না।
তারপর পরীক্ষার হলে সাম্যবাদীরা খাতার লেখা পাতাগুলো নিয়ে টানাটানি করছিল। তাদের দাবি ছিল যে নম্বর বেশি পাওয়ার পুঁজিবাদী স্বার্থপরতা করা চলবে না। আর এক্সটার্নাল ইনভিজিলেটর টহল দিয়ে যাচ্ছে। যাকে সন্দেহ করবে তাকেই রাস্টিকেট করে দেবে।  থেকে থেকেই ডেস্কে ডেস্কে ঘনিয়ে ওঠা তর্কাতর্কি, খাতা-টানাটানিতে কাকে দোষী ধরবে ইনভিজিলেটর? কবিতার বাবা মারা গিয়েছিলেন এই পরীক্ষার দু বছর আগে। দাদার একার রোজগারে পাঁচ ভাইবোন আর মায়ের খরচ চলে। কবিতা, তার দিদি আর উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্টের অপেক্ষায় থাকা তাদের ছোটভাই টিউশন করে সংসারে স্বাচ্ছন্দ্য আনার চেষ্টা করত। বোনের ক্লাস ফাইভ সবে। কবিতার একটা চাকরি চাই, তক্ষুণি। কিন্তু খাতাটা নিয়ে টুকলিবাজরা ফেরত না দিলে ঠিকঠাক? রাস্টিকেট করে দিলে ইনভিজিলেটর.....
সেসব দিন কেটে গেছে। কিশোরকে একদিন পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়েছিল। সেইদিনই জানা গিয়েছিল যে ডাক্তারবাবুর ছেলে নাকি গায়েব। অনেক বছর পরে বিদেশি ডিগ্রি নিয়ে সে দেশে ফিরেছিল। বাবা কংগ্রেসি কাউন্সিলর ছিলেন কর্পোরেশনে। সে ফেরার পর অনেকদিন কোনো রাজনীতি করে নি। এখন বড়ো নার্সিংহোম করেছে। আগেরবার সিপিএমের টিকিটে লোকসভার ভোটে দাঁড়িয়েছিল। এবার আবার বলেছে ভোট বয়কট করতে।
বুল্টুদের স্কুল হয় নি আজ। দুপুর হওয়ার আগেই বাড়ি ফিরে এসেছে। এবার মাঠে খেলতে যাবে। ফোন বাজল। মামণি বলল, মা পরীক্ষা ভালো হয়েছে। সব খেয়েছি। এইবার বাস ধরব। বাড়ি ফিরেই খবর শুনতে বসল মামণি। কাল ছুটি। পরশু আবার পরীক্ষা। কালকে জবাবি বন্‌ধ ডেকেছে সিপিএম, শুধু আরামবাগ ব্লকে, যেন ওখানকার ছেলেমেয়েরা শ্রীরামপুর, উত্তরপাড়া, রিষড়ায় পরীক্ষা দিতে যাবে না; তবে সমর্থকরা আরামবাগের বন্‌ধকে সর্বাত্মক করে তুললে নেতৃত্বের কোনো দায় নেই বলেও জানানো হয়েছে। আর পরশু এসইউসিআই রেখেছে দুঘন্টা রেল অবরোধের কর্মসূচী, উপলক্ষ আরামবাগে হিংসার অবসান।

মামণি হাতি বাগানে মাসির বাড়ি চলে গেল পেপার টু পরীক্ষার দিন থেকে। ওর জামাকাপড়, বই পত্র দিলীপ পৌঁছে দিলেন সেখানে। জয়া, অনিন্দিতা আর আরও অনেকের কলকাতায় থেকে পরীক্ষা দেওয়ার কোনো উপায়ই ছিল না। ওরা রোজ ভোর চারটের সময় ট্রেন ধরে, সারা সকাল হেদোয় বসে থেকে, দুপুরে পরীক্ষা দিয়ে সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরল, বাকি সব অনার্স আর পাস পেপার।

Friday, September 25, 2015

বাংলা মিনিসাগা


অজাতশত্রু


এক রাজপুত্র সিঙ্ঘাসনে বসেছিলেন অজাতশত্রু নামে। সার্থকনামা হতে তিনি তিনটি কাজ আজীবন করেছিলেন। প্রথমত, সবার সাথে বন্ধুত্ব পাতানোর চেষ্টা; দ্বিতীয়ত, যে বন্ধু হয় নি তার বিনাশ, তৃতীয়ত, শত্রুতার সূত্রপাত জানার জন্য চরচর্চা; তার অবশ্যম্ভাবী ফলে শত্রুকে বিনাশ করতে্ন স্থলে, জলে, ছলে বলে, কৌশলে মাতৃজঠরেও। বলাবাহুল্য, তিনি রাজত্ব করেছিলেন জনশূণ্যলোকে।


শঠে ......


লক্ষীরাম আর গঙ্গারাম বুক কাঁপিয়ে হেসে উঠেছিল আইনি বিধান শুনে। সেই বুক ঠুকেই বলেছিল লক্ষীরাম, “আমার নামে উনিশটা আর গঙ্গাদার নামে একুশটা ফৌজদারি রয়েছে।” শুধরে দিয়েছিল গঙ্গারাম, “তেইশটা, ব্যাঁচড়ার চাচা কেটে।”
সেই রাতে সরকারি বনসৃজন প্রকল্পে গরু পড়তে নিরুপায় আধিকারিক সবকটাকে তাড়িয়ে ছেড়ে দিয়েছিলেন লক্ষীরাম গঙ্গারামের ধান খেতে।




শোক ও শিক্ষা


আগে একবার আগুনে পুড়ে গিয়েছিল সনাতনের কেশ, বেশ, বাস, বসত। চুল, চামড়া নতুন গজিয়েছিল। মনের আরাম এসে ছিল সব ভুলে।পরে অন্য আগুনে পুড়তে পুড়তে সে বুঝল যে আগেরবারের দহনশোকের সাথে সে আঁচের অনুভূতি, বিস্ফোরণের কারণ, জ্বালানির চেহারা এসবের লক্ষণ চেনার শিক্ষাটাও ভুলে গিয়েছিল, তাই নিবারণ করতে পারে নি পুনর্দাহ।

শ্রান্ত পান্থের বৃক্ষনিবাস


ধাবায় ঢোকার আগে, লোকটা গাড়ির ট্রাঙ্ক থেকে মাটিতে নামিয়ে রাখল ডালপালা সমেত একটা গাছ। তার ডালে কাঠের একটা বাড়ি টাঙানো, যেন পাখিতে বাসা করবে। স্নান খাওয়া সেরে লোকটা যখন ফিরল তখন গাছটা মহীরুহ। লোকটা এবার ট্রাঙ্ক থেকে ফোল্ডিং মই বাই করে চড়ল ট্রি হাউসে। তারপর ঘুমিয়ে গেল রাতের মতো।

Sunday, August 2, 2015

সুকন্যা বৃত্তান্ত

সুকন্যা সত্যিই ভালো মেয়ে। তার মা বলেন, “ওকে কোনো দিন বলতে হয় নি ‘পড়তে বোস।’ কোনোদিন কোনো বায়না ছিল না ওর। যা খেতে দিয়েছি তাই খেয়েছে। যে জামা পরতে বলেছি তাই পরেছে। ফ্যাশন নিয়ে মোটে মাতামাতি ছিল না ওর...” তার বাবা বলেন, “মেয়েটা বড়ো ঘরকুনো, মুখচোরা ছিল। তাই লাইব্রেরিতে মেম্বার করে দিয়েছিলাম। তাও মেয়েটা অমিশুক, চুপচাপ রয়ে গেল।
সেই সুকন্যা ভালোই আছে। বিগড়েও যায় নি; খারাপও হয় নি; একটুও না। আসলে সুকন্যা খারাপ হতে পারে না। এটাই তার গলদ। সেই যে ভালোতে মন্দতে মিশিয়ে মানুষ বলে নাসুকন্যারও তাই। সে সত্যিই ভালো আর এই যে সে খারাপ হতেই পারে না এইটাই তার মন্দ। একথাটা সুকন্যা টের পেয়েছিল বেশ অল্প বয়সেই; সেই যখন সুকন্যা আর তার ভাই গুপি এক থালায় ভাত খেতো, তখন। গুপির মুখে ভাতের দলা দিলে সে খেলাচ্ছলে ফ্রু ফ্রু করে ভাত ছিটিয়ে দিত। মা অমনি চোখ বড়ো বড়ো তাকাতেন গুপির দিকে আর গলার স্বর গাঢ় করে বলতেন, “ছি গুপি, খাবার নষ্ট করতে নেই। জানো কতো লোকে খেতে পায় না? তুমি খেতে পাচ্ছো বলে মুখের ভাত দালানে ছেটাবে? তুমি না বুদ্ধিমান, কখনও এরকম করবে না আর।” গুপি কিছুক্ষণ পরে ভুলে গিয়ে আবার ফ্রু ফ্রু করে ভাত ছেটাতে শুরু করত। তখন মা মনে করানোর চেষ্টা করতেন যে গুপিকে মা কী শিখিয়েছেন। তারপরের বার গুপি কানমলা খেত। তারপরের বার কিল। তখন কাঁদত। তারপর ঘুমিয়ে পড়ত। তারপর সব ভুলে যেত আবার।
সেই সময় একদিন আঁচাতে গিয়ে সুকন্যা দেখেছিল কলঘরের নর্দমার মুখে বেশ দশ-বারো দানা ভাত পড়ে আছে। সুকন্যার আগে তার দাদু আঁচিয়ে ছিলেন সেখানে। তাঁর হাতের থেকেই সম্ভবতঃ পড়েছিল ভাতের দানাগুলো। সুকন্যা সেগুলো কুড়িয়ে নিয়েছিল। তারপর মায়ের অনুমতি চেয়েছিল, “মা, এই ভাতগুলো হাঁড়িতে রাখব?”  মা জানতে চেয়েছিলেন, “মানে, কোন ভাত?” উত্তর শুনে বলেছিলেন, “না, রাখবে না।” শুনেই সুকন্যা ভাতের দানাগুলো মুখে দিয়েছিল। তৎক্ষণাৎ একটা জোরালো কিল তার পিঠে এসে পড়েছিল। সন্ধেবেলা বাবা বাড়ি ফিরতে মা নালিশ করেছিলেন, “তোমার মেয়ের কাণ্ড জানো? সে নর্দমা থেকে ভাত কুড়িয়ে খাচ্ছে! আমি যেন তাকে পেট ভরে খেতে দিই না।” মা একটু শান্ত হতে বাবা সুকন্যাকে ডেকে জানতে চেয়েছিলেন, “অমন নোংরা থেকে ভাত খুঁটে খেলে কেনো তুমি?” সুকন্যা ঢোক গিলে বলেছিল, “অনেক লোক যে খেতে পায় না, তাই তো ভাত নষ্ট করতে নেই...... মা বলেছিল যে।” মা চেঁচিয়ে উঠে আবার এক ঘা দিয়ে বলেছিলেন, “আমি নর্দমা থেকে ভাত কুড়িয়ে খেতে বলেছি?”
সেদিন সুকন্যা বেশ বুঝেছিল যে সে কিছুই বোঝে নি। “খাবার নষ্ট করতে” নেই মানে “ফেলতে নেই”; কিন্তু ফেলে দেওয়া খাবার তুললে দোষ হয়; কী-করতে-হয় আর কী-সে-যে-কী-হয়-এর দুর্বোধ্যতায় সে শুধু শুনতে শুরু করেছিল। না প্রশ্ন করলে উত্তর দিত না। আর না করতে বললে কোনো কাজ করত না। তাকে একটা কাজ করতে বললে সেই কাজের আওতায় কী কী পড়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনে নিয়ে তবে সে কাজটা করত। আবার প্রত্যেক ধাপে কাজটা ঠিক হলো কিনা জেনে নিত। এভাবে কৈশোর নাগাদ সে বাধ্য, বিনয়ী আর কুশলী হয়ে উঠেছিল সবার বিচারে। কিন্তু সেই সবার মধ্যে কে কে ছিল না সেটাও সুকন্যা জানত। এই জানার একটা বোনাসও ছিল।  বোনাস বোধি হলো যে সাধরণ বিশ্বাস: “যারা বলে কম, তারা শোনেও কম।” সেই কারণেই কেউ কেউ তার সামনেই বলত, “সুকন্যা বিনয়ী না ছাই। কথা বলে না কারুর সাথে এতো অহঙ্কার! নেহাৎ কাজেকম্মে, লেখাপড়ায় ভালো তাই কেউ কিচ্ছু বলে না। না হলে...” আর এভাবেই তিলে তিলে গড়ে উঠছিল জগৎ সংসার সম্বন্ধে তার ধারণার পুঁজি।
কিন্তু সে পুঁজি যে নিতান্ত অকিঞ্চিৎ সেটা সুকন্যা টের পেয়েছিল কলেজে গিয়ে। সেখানে উঁচু ক্লাসের দাদারা বলে, “সে কিরে তুই বাই সাইক্ল থিভস দেখিস নি! তুই কী গাঁওয়ার? তুই কামু পড়িস নি, কাফকা পড়িস নি! তুই তো অমানুষ, জানোয়ার।” উঁচু ক্লাসের দিদিরা বলল, “এমা তুই কাজল পরিস না! কী বিশ্রি বোকা বোকা লাগে। একটা লিপগ্লস তো লাগাবি, কেমন ভিখিরির মতো ফাটা ঠোঁট তোর।” এসব কথার কোনো উত্তর সুকন্যার জানা ছিল না। আর তাছাড়া নিরুত্তরে বোনাস বোধি পাওয়ার লোভও ছিল।
কিন্তু কলেজের বোদ্ধাব্রিগেড চমকে গিয়েছিল যখন সুকন্যা আন্তর্কলেজ তাৎক্ষণিক বক্তৃতায় চ্যাম্পিয়ন আর বিতর্কে রানার্স আপ হয়েছিল। এক দিদি ব্যাগের ভেতর থেকে ব্যাগ, তার ভেতর থেকে আরেক ব্যাগ বার করে একটা লিপস্টিক দিয়ে বলেছিল, “এটা লাগিয়ে প্রাইজ নিতে উঠিস স্টেজে। ভাঙবি না, এটা টিউশনের পয়সায় কেনা।” আরেক দাদা এসে বলেছিল, “আমি তো দিল্লী চলে যাচ্ছি। আমার তিনটে ছাত্রকে পড়াবি?” সুকন্যা একটু ঘাবড়ে গিয়েছিল। বক্তৃতা না হয় সে ইস্কুলে পড়ার সময় থেকেই করে আসছে নানান দিবসে, নানান জয়ন্তীতে। তাই বলে ছাত্র পড়ানো? সে তো আগে কখনও পড়ায় নি কাউকে। এদিকে পড়ালে যে কাফকা, কামু, লিপস্টিক সব তার সে সম্ভাবনাটাও সে ফেলতে পারছিল না। সমাধান করে দিলেন এক মাস্টারমশাই। তিনি যাচ্ছিলেন কোথাও। যেতে যেতে সুকন্যার সাথে অন্য ছেলেটির কথোপকথন শুনে ফেলেছিলেন। সুকন্যাকে বলেছিলেন, “আমিও তো একদিন প্রথমদিন পড়িয়েছিলাম।”
এরপর সুকন্যার জীবনে অনেক কিছু প্রথমবার ঘটতে লাগল। বন্ধুদের সাথে সিনেমা দেখা, পিকনিকে যাওয়া, কানে ইয়ারফোন গোঁজা আর ওয়াকম্যানে গান শোনা, ইন্টারনেট সার্ফ করা। এই সময়টায় তার নিজেকে মোজার মতো মনে হতো। প্রত্যেকটা প্রথমবারের পর মনে হতো কেউ যেন মোজাটাকে উল্টে দিল একবার। এই সব ওলোটপালোটের মধ্যে সুকন্যার কিছু চ্যালা জুটেছিল। সুকন্যা তখন বেশ “সুকন্যাদি” হয়ে উঠেছিল।
তবু মাঝে মধ্যে পরীক্ষা ঘনিয়ে উঠলেই তার জীবনটা কেমন যেন “দুচ্ছাই, ভাল্লাগে না” হয়ে যেতো। আর পরীক্ষা কাটিয়ে উঠলেই তাকে পেয়ে বসত নতুন কিছু করার উশ্‌খুশুনি। এইসব উশ্‌খুশুনির সময় চ্যালাদের নিয়ে সুকন্যা কিছু একটা করার চেষ্টা করত। যেমন কলেজের সামনের ফুটপাথবাসী ছাত্রদের পড়ানো; পার্ক সাফ করা, সেখানে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে গাছ লাগানো; গ্রামে গিয়ে ছাত্রদের জন্য ক্যুইজ প্রতিযোগিতা করা।
একসময় কলেজ শেষ হয়ে গিয়েছিল। ইউনিভার্সিটিতে দুশ জনের ক্লাস। নিজের নিজের দলের বাইরে কেউ কাউকে চিনতে চাইত না। সুকন্যার চালু জীবনটা হঠাৎ যেন অচল হয়ে গিয়েছিল। মাঝে মধ্যে ফাঁক পেলেই সে তখন কলেজে চলে যেত। চ্যালাদের সাথে আড্ডা মেরে বা কাজকম্ম করে বাড়ি ফিরে যেত। ছাত্র ধর্মঘটের দিন ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস হতো না। কিন্তু কলেজে মাস্টারমশাইরা নিজেরা গেটে দাঁড়িয়ে ক্লাস করতে ইচ্ছুক ছাত্রদের কলেজে ঢুকিয়ে নিতেন। সেদিনগুলোতে সকাল সকাল সুকন্যা গিয়ে কলেজে ঢুকে পড়ত। তারপর কোনো মাস্টারমশাইয়ের ঘরে বসে, পড়ে, পড়া বুঝে বা পড়িয়ে কাটিয়ে দিত সারাদিন।
এরকম একটা ছাত্র ধর্মঘটের দিন কলেজের পাঁচিলে একসার লোক নিজেদের জলমুক্ত করছিল। দেখে সুকন্যার কিছু করার ইচ্ছেটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল। সেদিন সপারিষদ দরবারে সে ঠিক করেছিল যে মিউয়েরেটিক অ্যাসিড, ফিনাইল আর ঝাড়ু কেনা হবে। তারপর মূত্র মুক্ত করা হবে দেওয়াল। ফের যাকে দেখা যাবে পরিষ্কার দেওয়ালের ধারে নিজেকে জলমুক্ত করতে তার থেকে ফিনাইল, অ্যাসিড আর ঝাড়ুর খরচ তুলে নেওয়া হবে, আর তাকে দিয়েই দেওয়াল পরিষ্কার করানো হবে।
সেদিনই কলেজ ছুটির পরে দেওয়াল পরিষ্কার করা হয়ে গিয়েছিল। সন্ধের সময়টা বয়েজ হস্টেলের ছেলেরা পাহারায় ছিল। যে কজনকে ওরা দাঁড়াতে দেখেছিল দেওয়ালের সামনে তাদেরকে ওরা মানা করেছিল। কোনো কারণে লোকগুলো মানা শুনেছিল। পরের দিন সন্ধে থেকে গভীর রাত অবধি কলেজের দারোয়ান বলরামদা নজর রাখতে লাগল। আর ভোর থেকে কলেজ শুরু হওয়া অবধি বয়েজ হস্টেলের বাহাদুরদা। একদিন সকালে একটা লোক বাহাদুরদাকে বোঝাতে গিয়েছিল, “মানুষের আড়াল লাগে। তাই তো দেওয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়ায় লোকে।” সে লোকটাকে বাহাদুরদা একটাকা দিয়ে সুলভ শৌচাগার দেখিয়ে দিয়েছিল। এরকম দয়াতে ছাত্ররা বিরক্ত হয়েছিল। টাকা দিয়ে শৌচাগারে পাঠালে যে দেওয়ালের আড়াল নিত না সেও নেবে। টাকাটা রোজগার হবে আর অন্য কোনো দেওয়ালের আড়ালে কাজটা সেরে নেবে। তাই দফায় দফায় ওরিয়েন্টেশন ওয়ার্কশপ হতে লাগল। দেওয়াল বাঁচানোর প্রকরণ নিয়ে।
একদিন দুপুরে ফার্স্ট ইয়ারের একটা মেয়েকে একটা লোক “কেয়া করে, গরীব হৈ?” বলে ডুকরে উঠেছিল। কিন্তু মেয়েটা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার শারীরিক আবশ্যিকতার সাথে ধনী-গরীবের শ্রেণীবৈষম্যের সম্পর্ক বোঝেনি। তাই সে লোকটাকে দিয়ে দেওয়াল তো সাফ করিয়েই ছিল, আর লোকটা সাফাইয়ের খরচ দিতে পারে নি বলে একটা কাগজে নানা ভাষায় “সাবধান! আমি দেওয়ালে হিসি করি” লিখে কাগজটা লোকটার জামার পিঠে আঠা দিয়ে এঁটে দিয়েছিল। একটা লোক থার্ড ইয়ারের তিনটে ছেলেমেয়েকে, “হুজ্জুতি করছ কেন? ফুচকা খাবে? পয়সা চাই?” বলে তাদের হাতে তিরিশ টাকা গুঁজে দিয়ে দেওয়ালের গায়ে মুক্ত হতে চেয়েছিল। তারা টাকা তো নিয়েই ছিল। তার ওপর লোকটার জামাতেও কাগজ সেঁটে দিয়েছিল, “আমার টাকা সস্তা তো তাই যেচে ঘুষ দিই।”
কাজটা শুরু করার সপ্তাখানেকের মধ্যে হৈ-হৈ করে খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। মাস্টারমশাইরা তো খুশি হয়েই ছিলেন, অধ্যক্ষও মাঝে মাঝে দশ মিনিট করে দেওয়াল পাহারা দিয়ে যেতেন ছুটির পরে। সে বছর কলেজের প্রতিষ্ঠা দিবসে সুকন্যাকে বিশেষ পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। খবরের কাগজ আর টিভির লোকেরাও এসেছিল। অধ্যক্ষ তাদের সামনে বক্তৃতা করেছিলেন, “যে যুগে নেতা মানে ঘৃণিত রাজনীতিক, সে যুগে আমরা একজন অরাজনৈতিক নেত্রী পেয়েছি। মহাত্মা গান্ধির মতো। ভারতের ইতিহাসে গান্ধিই কেবল মানুষের জন্য আন্দোলন করেছেন, কোনো দল বা পদ বা চাকরির লোভে বা প্রয়োজনে রাজনীতি করেন নি। বলা ভালো গান্ধি রাজনীতিকে নয়, রাজনীতি গান্ধিকে আশ্রয় করেছিল। সুকন্যা আমাদের ছাত্রী। ভাবলে আনন্দে গর্বে উপচে উঠছে মন। আশা করব রাজনীতি সুকন্যাকে আশ্রয় বা গ্রাস করবে না......।”
এসব শুনে সুকন্যার মনে হয়েছিল যে জীবনে সেই প্রথম সে কোনো আদর্শ খুঁজে পেয়েছিল। যেন ঘুটঘুটে অন্ধকার রাস্তায় একটা টিমটিমে আলোর বিন্দুর মতো, একটা দিশা। তারপর কল্মষারি বলে একটা অলাভজনক সংস্থা শহরের সব দেওয়াল পরিষ্কার রাখার কাজে এগিয়ে এসেছিল। সুকন্যাকে তারা পার্টটাইম মেন্টর রেখেছিল। ইউনিভার্সিটির ক্লাসের পর সে সংস্থাটার শিক্ষানবিশদের ক্লাস করাতো দেওয়াল সাফাইয়ের নীতি নিয়ম নিয়ে। এইসব শিক্ষানবিশরাও অল্পবয়স্ক ছাত্র ছিল। বা পড়াশোনা ছেড়ে কাজে লাগতে শহরে এসেছিল। তাই কেউ পার্টটাইম কাজ করত, তো কেউ ফুল টাইম। প্রথম তিন-চার মাসে কল্মষারির উদ্যোগে শহরের প্রায় সমস্ত দেওয়াল পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। খুব রমরমিয়ে চলছিল দেওয়াল সাফ রাখার পাহারাদারি আর দেওয়াল নোংরা করার জন্য জরিমানা নেওয়ার কাজদুটো।
ইউনিভার্সিটির পাট চুকতে সুকন্যার একটা ব্যক্তিগত সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তাঁর মা চাইছিলেন তখন বিদূষী, বাধ্য, বিনয়ী, কুশলী কন্যাটিকে সুপাত্রস্থ করতে। কিন্তু বাবা চাইছিলেন যে সুকন্যা আরও পড়াশোনা করুক, বিদেশে যাক, গবেষণা করুক। সুকন্যা চাইছিল দেশনেতা হতে। তার ইচ্ছে ছিল সারা দেশে সে ট্রেনে চেপে ঘুরে বেড়াবে, দেশের মানুষের চাওয়া-পাওয়াটা বুঝে নিতে। কিন্তু বাবা-মায়ের মতানৈক্য দেখা দিতে সুকন্যার নাম থেকে সু খসে যেতে বসেছিল আর কী। মা দুঃখ করে বলতেন যে বাবার ইচ্ছেতেই মা মেয়ের পড়াশোনা, ব্যসন-ভূষণের তদ্বির করেছেন এতকাল। তাঁর নিজের কোনো ইচ্ছেই ছিল না মেয়েকে বিদ্যের জাহাজ করার কেন না তিনি জানতেন যে মেয়েকেও সংসারে তাঁর মতোই সার হতে হবে। এই তর্কে সুকন্যা বোনাস পেয়েছিল যে মায়ের যাবতীয় অনুশাসন হলো বাবার গেঁথে দেওয়া নীতির অনুসরণ মাত্র; তাঁর নিজস্ব কোনো মতই ছিল না।
এই সময়ে টিভির পর্দায় দেখা গিয়েছিল যে কল্মষারির কর্মীরা ঘুষ নিয়ে দেওয়াল নোংরা করতে দিচ্ছে। এক্কেবারে সন্ধেবেলার সরাসরি সম্প্রচারে। প্রচুর বিতর্ক হয়েছিলো। হাঁ হাঁ করে রাজনীতিকরা চেঁচিয়ে ছিল, দাপিয়ে ছিল, “কোন অধিকারে বা আইন বলে কল্মষারি দেওয়াল নোংরা করার জরিমানা ধরে?” “পুলিশ যদি না ধরে তো এই সংস্থা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পুলিশের কাজ করছে কেন?” “এ তো তোলাবাজি আর গুণ্ডামির সামিল?”
একটা ছাত্র সংগঠন আন্দোলনে নামল বিকৃত ছাত্র মনোবৃত্তির সংশোধনের উদ্দেশ্যে। তাদের স্লোগান ছিল, “যাহারা নিত্য দেওয়ালে ঢালিছে উষ্ণ রেচিত দ্রবণ,
   তাহারা পাতক, সুচারু বাক্য করে নি কখনও শ্রবণ।
   তাহারা শাস্তি অবশ্য পাবে আদালতে যথাবিধি।
   আমরা মুক্তি পূজারি, কেন তাদেরকে বাদ সাধি?
এই দলটার বক্তব্য ছিলো যে দেওয়ালে প্রসাব করা নিশ্চয়ই অন্যায়, কিন্তু প্রস্রাবকারীকে বাধা দিলে তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হয়।
সুকন্যা কল্মষারির কাজ ছেড়ে চলে গিয়েছিল ভারত দর্শনে। মা কেঁদে ছিলেন। বাবা গর্জে ছিলেন। গুপির তখন না ছিল পড়াশুনো না প্রেমিকা। তাই সে গিয়েছিল দিদির শাগরেদি করতে; শর্ত একটাই মুখে কুলপ আঁটতে হবে। মাসতিনেকে ওরা ভাইবোনে ছুঁয়েছিল তিরিশটা শহর, গ্রাম, কসবা। শহরের লোকের খাবার জলের অব্যবস্থা আর গ্রামের লোকের গোসলখানার অভাব দূর করার ফিকির ভাইবোনে ভেবেছিল অনেক। সেই সময় শাকিলা বিবি বলে এক গৃহবধু বলেছিল, “আমার পায়খানা ঘরটা পড়েই আছে গো। ওখানে গেলে শান্তি পাই না। মর্চি নদের বালিতে রাংচিতার আড়াল ছাড়া ও কাজটা হয় নাকি? আমার আজন্মের অভ্যেস যে!” অভ্যেসের স্বাস্থ্যাস্বাস্থ্য নিয়ে শাকিলার সাথে তর্কটা সারই হয়েছিল। তারপর এক শহরে তারা দেখে ছিল যে ঝুপড়ির লোকেরা রোজ বিকেলে সাইকেলে নানা রঙের নানা মাপের জ্যারিকেন ঝুলিয়ে কাছাকাছি কসবা থেকে জল নিয়ে আসছে। কেউ বিলোচ্ছে, কেউ বিকোচ্ছে।
এরই মধ্যে সুকন্যা আর গুপি একদিন খবর পেয়েছিল যে কল্মষারি শহরের সমস্ত দেওয়াল সাফ রাখার বরাত পেয়েছে পৌরসভার থেকে এবং জরিমানার টাকাও তারা জমা দিচ্ছে পৌরসভাকেই। ওদের যত কর্মী ঘুষখোর বলে ধরা পড়েছিল, তাদের সবার মাথায় চোর লেখা গাধাটুপি পরিয়ে, তাদেরকে শহর পরিক্রমা করানো হয়েছিল। তারপর তারা আদালতে বিচারকের সামনে প্রতিশ্রুত হয়েছিল যে ফের ঘুষ নিলে তাদের চাকরি যাবে আর শেষ দুমাসের মাইনে জরিমানা বাবদ পৌরসভাকে দিতে তারা বাধ্য হবে; অনাদায়ে দুবছর হাজতবাস। সুকন্যা কল্মষারির কর্ণাধারকে ফোন করে শুভেচ্ছা জানাতে তিনি সুকন্যাকে কাজে সামিল করে নিতে চেয়েছিলেন।
সুকন্যাও চেনা জমিতে ফসল তোলার সহজ লোভে ফিরেছিল। কিন্তু একদিন ওরই সামনে কয়েকটা লোক একসাথে দেওয়াল নোংরা করেছিল আর কল্মষারির কর্মচারী তাদের মানাও করে নি। শুধু রসিদ কেটে জরিমানা নিয়েছিল। পরদিন সেই কর্মচারীকে আপিসে ধরে সুকন্যা জানতে চেয়েছিল যে কর্মচারিটি কেনো এমন করেছিল। উত্তরে শুনেছিল যে, “দুয়েকটা লোককে দেওয়াল নোংরা না করতে দিলে কর্পোরেশনের দেওয়া জরিমানার টার্গেট মেটানো হবে কী করে? কোম্পানি কমিশন পাবে কী করে? আর কোম্পানি কর্পোরেশনের দেওয়া ফিনাইল বাজারে বেচবে কী করে? বা বাড়তি ফিনাইল না কিনে তার ভুয়োবিল জমা দেবে কী করে?”
এরপর সুকন্যা শুধু কল্মষারিই ছাড়ে নি, দেশও ছেড়েছিল বাবার নির্দেশ মেনে। এখন সে কেনিয়ায় কেমিস্ট্রি পড়াচ্ছে। তাই কী এখানে দেওয়ালগুলোতে শেওলা জমেছে? আর টেড টকে শোনা যাচ্ছে পরের নোবেল আফ্রিকার? জানি না। তবে আজও দেওয়ালের দিকে মুখ করে কেউ প্রকৃতির সাথে নিভৃত আলাপ সারলে সুকন্যাকে মনে পড়ে। বেশ বসন্ত বাতাসের মতো মন ফুরফুরে হয়ে যায় এই বিশ্বাসে যে কেউ না কেউ আসবে ঝাড়ু আর ফিনাইল নিয়ে; কে জানে কোথা থেকে, ওয়াগাডুগু না ওট্টাপালাম থেকে; আর আবার সাফ হয়ে যাবে এই নাগরিক জীবন।

**আমার গল্প সংকলন "গুচ্ছ খোরাক" থেকে 

প্রচ্ছদ শিল্পীঃ রোহণ কুদ্দুস
প্রকাশক; সৃষ্টিসুখ

বইটা পাওয়া যাবেঃ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই ঠিকানায়ঃ http://parabaas.com/bookstore/index.html#sanhita
ভারতে ("গুচ্ছ খোরাক") এই ঠিকানায়ঃ http://www.amazon.in/Guccha-Khorak-Sanhita-Mukherjee/dp/1625906366/ref=sr_1_17?m=A11UYLARTG1AFJ&s=merchant-items&ie=UTF8&qid=1393064887&sr=1-17 
> "সৃষ্টিসুখ"-এর আউটলেট, ৩০ এ সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট, (দেবী সারদা প্রেস লাগোয়া); দুপুর ২টো ৩০ থেকে সন্ধে ৬টা ৩০।
> সুচেতনা প্রকাশন, আদ্যা ভবন , ২০এ বলাই সিংহ লেন,, কলিকাতা ৯, ফোন ৬৫৪০৫৩৯০, ৯৮৩৬০৩৭৬০১,মেইলঃbasab.suchetana@gmail.com

Tuesday, July 14, 2015

ব্যাং, শুঁয়োপোকা,সাদা ঘোড়া আর আমি

একদিন রাতে হলো কী ...... না ভয়ানক কিছু না। দাদু ফোন করে বলল, “চলে আয় মুম্বাই।” আজ যাই কাল যাই করে একদিন চড়ে পড়লাম গীতাঞ্জলি এক্সপ্রেসে। 
ভরভরন্ত বর্ষায় নামলাম মুম্বাই স্টেশনে। আঁতিপাতি খুঁজে, ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকি করেও দাদুর দেখা পেলাম না। বেশ ঘাবড়ে গেলাম। ফোনেই কথা হয়। দাদুর ঠিকানা তো জানি না। অগত্যা আবার টেলিফোনে দাদুকে ধরলাম। দাদু প্রায় কাতরাতে কাতরাতে বলল, “টাকের ব্যাথায় মাথা তুলতে পারছি না।” তারপর ঠিকানা আর কিভাবে পৌঁছব ওর কাছে তার নির্দেশ জেনে নিয়ে রওনা হলাম। শহরটা বানভাসি। আর আমি যাচ্ছি ভাসি। কে জানে, এই ভাসাভাসির চক্করেই বোধ হয় দাদুর এলাকাটা ভাসি!
দাদুর বাড়ি পৌঁছে দরজায় ঘন্টি বাজালাম। ঘোমটায় টাক, মুখ ঢেকে দাদু বেরোল। আমি হেসে ফেললাম। বললাম, “কেন রে? অল্প বয়সে টুপিতে টাক ঢাকতে বললে তো খেঁকিয়ে আসতিস, আর এখন লজ্জায় ঘুমটা দেওয়া হয়েছে! আমি কি তোকে নতুন দেখছি? না তুই আমাকে?” দাদু প্রায় কেঁদে ফেলল; বলল, “ভেতরে আসবি নাকি সব কথা দুয়ার থেকেই বলে চলে যাবি?” ঢুকলাম ভিতরে। দাদু চায়ের ফ্লাস্ক দেখিয়ে দিয়ে, খাটের থেকে মাথা ঝুলিয়ে শুয়ে পড়ল। বালিশ এগিয়ে দিলাম; তাতে খ্যাঁক খ্যাঁক করে বলল, “টাকের অসুখে বালিশে মাথা রাখা দায়।” অনেক ঝোলাঝুলির পর দাদু টাকের ঘুমটা খুলল। দেখলাম যে দাদুর টাকটা সাংঘাতিক বড়ো হয়েছে, আর তাতে অসংখ্য ব্যাঙের ছাতা গজিয়েছে। অবাক হয়ে দাদুকে বললাম কথাটা। কিন্তু সে কিছুতেই বিশ্বাস করে না, বলে যে, “ঢিবি ঢিবি হয়েছিল, ভাবলাম ফোঁড়া; আমার অসুস্থতা নিয়ে ঠাট্টা করছিস!” আমি ওকে আয়না এনে দেখাতে পারলাম না। ছাতাগুলো সংখ্যায় অনেক কিন্তু ছোটো।
রাত পোহাতেই দাদুকে বলতে গেলাম ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা। কিন্তু দাদু রাজি হলো না। এদিকে ছাতাগুলো সারারাত ধরে মোটা আর বড়ো হয়েছে। তাদের ভারে দাদু মাথা তুলতে পারছে না। একবার ওকে ধরাধরি করে আয়না দেখালাম। আয়নায় ওকেও একটা আস্ত ব্যাঙের ছাতার মতো দেখাল। তাতে বুড়ো ছেলে কষ্টে কেঁদে ফেলল। অনেক চেষ্টার পর ওর কষ্টে প্রলেপ লাগালাম। তবে কষ্টটা বেশ গভীর এবং যথেষ্ট যৌক্তিক। তার শহরে চুল কাটাতে নব্বই টাকা খরচ লাগে প্রতিবার। তাও নাপিতের কাছে। নেহাৎ টাক পড়ে খরচটা কমায় ও খুশি ছিল। না জানি এখন ছাতা ওপড়াতে ডাক্তার কতো পয়সা নেবে। ব্যাথায় পাগল দাদু সে রাতে দাপাদাপি শুরু করল।
পরদিন সকালে ওকে ঘুমটায় মুড়ে চললাম হাসপাতালে। কী ঝড়বাদল সেদিন! প্রথমে ঝড়ে অটোর চালটা উড়ে গেল। তারপর দাদুর ঘোমটা। তারপর জল থইথই এক রাস্তায় অটোর প্রপেলারে প্লাস্টিক ব্যাগ আটকে অটো থেমে গেল। ব্যস্ত শহরে বানও জীবন থামাতে পারে না। সব মোটরযানেই প্রপেলার থাকে। এমনকি রিক্সাতেও হাল আর দাঁড় থাকে। সেই ভরসাতেই অমন দূর্যোগেও দাদুকে নিয়ে বেরোনো। কিন্তু অটো থামতেই কোথা থেকে একটা ব্যাঙ এসে চড়ে বসল দাদুর টাকের ছাতায়। আমি তাড়াতে যেতেই চার আঙুলে সামনের পা উঁচিয়ে বলল, “হাই!” চমকে গেলাম। ব্যাঙ বলল, “অ্যালিসের দেশে ব্যাঙের ছাতায় শুঁয়োপোকা বসত, তাই না? তুমিও শুঁয়োপোকাটার দেখা পাবে।” আমি ঠাট্টা ভেবে মুখ ঘুরিয়ে নিলাম। কিন্তু ব্যাঙ বাবাজী দাদুর টাকে অচল।
হাসপাতালে ডাক্তার পরীক্ষা-নীরিক্ষার পর বললেন যে কাজটা তাঁর নয়। তবে এক নাপিতের ঠিকানা দিলেন যে মানুষের টাক থেকে ব্যাঙের ছাতা ওপড়ায়। আবার হুডখোলা অটো চেপে চললাম বিশিষ্ট পারলারে। ব্যাঙ কিন্তু সঙ্গ ছাড়ে নি তখনও।
নাপিতের আয়নার সামনে দাদুকে বসাতেই ব্যাঙের সাথে চোখাচোখি। এদিকে খুর হাতে নাপিত এগিয়ে আসছে। ব্যাঙ বলল, “আমি আর বেশিক্ষণ নয়, কেটে পড়ব। যদি শুঁয়োপাকাটার দেখা পেতে চাও তাহলে এই আয়নাতে ঢুকে পড়ো।” একে ব্যাঙ, তায় ফিচেল। ওটাকে পাত্তাই দিলাম না। নাপিত আসতেই তাকে দেখালাম যে ব্যাঙ বসা ছাতাটাকে আগে কাটতে হবে। নাপিত বলল আয়নায় হাত রেখে দেখাতে কোন ছাতাটা। যেই আমি আঙুল বাড়িয়ে আয়না ছুঁলাম অমনি ব্যাঙ দিল এক লাফ। আর আয়নাটা একটা হ্যাঁচকা টানে আমার আঙুলের ভিতর ঢুকে পড়তে লাগল। নাকি আমি আয়নাটার মধ্যে ঠিক বুঝতে পারলাম না। শুধু ম্যাট্রিক্স সিনেমার নিওর মতো পাক খেতে খেতে হাজির হলাম একটা লালমাটির রাস্তার পাশে; সটান একটা সাদা ঘোড়ার পিঠে। রাঙামাটির পথ গ্রামটাকে ছাড়িয়ে যে দিকে গেছে ঘোড়া ছুটল সেদিকে। হঠাৎ দেখি আমার সামনে রাস্তা ধরে ছুটছে একটা পাঁশুটে শুঁয়োপোকা।
অমনি ঘোড়ার লাগাম ধরলাম। ছুটলাম শুঁয়োপোকার পিছন পিছন। যখন খেত, নালা, জঙ্গল পেরিয়ে সাদা ঘোড়া প্রায় হাঁপিয়ে গেছে, তখন শুঁয়োপোকাটাকে আমরা ধরে ফেললাম। কিন্তু ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে ওর রাস্তায় আড়াআড়ি দাঁড়িয়ে ওর গতিরোধ করার আগেই দেখি ফিনিশিং লাইন এসে গেছে। দুপাশের রাস্তায় লোকে লোকারণ্য। হৈ হট্টগোলে ঘোড়া আরও জোরে ছুটতে লাগল। জনতা তালি দিয়ে উঠল আর শুঁয়োপোকাটা প্রজাপতি হয়ে উড়ে গেল। বুঝলাম না লোকেরা তালি দিল কেন, দৌড়টা জেতার জন্য নাকি শুঁয়োপোকাটাকে প্রজাপতি হতে দেখে।
এইসব দ্বন্দে সন্দেহে হারিয়ে যাওয়া মনটা ঠাণ্ডা হতেই দেখলাম যে বাড়ির দরজা খুলে বাবা বলছেন, “কখন থেকে চা করে বসে আছি। সাইকেলটা ঢুকিয়ে দে। হাত-পা তাড়াতাড়ি ধো। চাটা গরম করছি।”

Readers Loved