Showing posts with label Bengali story. Show all posts
Showing posts with label Bengali story. Show all posts

Monday, May 4, 2026

Panchpoksho - 31

পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রতিপক্ষ

~~~~~~

সুরচিতা তিনপাহাড়ি আসার পর থেকেই মা ভীষণ ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন তার বিয়ে দেওয়ার জন্য। সুরচিতা মাকে বোঝাবার চেষ্টা করে নি যে বিয়েটা মা দেবেন না, দরকার পড়লে সে নিজেই করবে; বরং সোজাসুজি বলে দিয়েছে অনেকবার। ততোবার, যতোবার মা প্রসঙ্গটা তুলেছিলেন।

তারমধ্যে একটা শুক্রবার সন্ধের মুখে ধৃতিকান্ত এসে পৌঁছেছিল। এতোদিন পর এসে ছিল যে ধৃতিকান্তকে চিনতে সুরচিতার কয়েক মিনিট সময় লেগেছিল। তারপর খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতে সাল কটা গাঁটে গুনে সে বলেছিল, “তের বছর! আমি তো ধরেই নিয়ে ছিলাম যে তুই আমাকে ভুলে গেছিস।” 

ধৃতিকান্ত গোলাপ বাগান, পাথরের দেওয়াল, বাগানের কোণে রডোডেনড্রন দেখতে দেখতে বলেছিল, “ভুলে যে যাই নি তোকে সেটা প্রমাণ করে দিয়েছি বল?” 

সুরচিতা খুশিতে মাথা নাড়তে নাড়তে বলেছিল, “পয়েন্ট। তর্কের সুযোগ নেই।” 

তারপর বলেছিল, “ভিতরে চল, এখন আর এখানে বসে কিছু দেখা যাবে না।” 

ধৃতিকান্ত বলেছিল, “কেন? না হয় অন্ধকারটাই দেখব!” 

সুরচিতা বলেছিল, “তাহলে একলা বসে দেখ। আমি চা নিয়ে আসি। আরেকটা চেয়ার নিয়ে আসি।” 

ধৃতিকান্ত বসে পড়েছিল খালি চেয়ারটাতে।


একটু পরে একটা বাটিতে করে কুচো পেঁয়াজ আর চানাচুর দিয়ে মাখা চিঁড়েভাজা আর ধোঁয়াওঠা চায়ের দুটো কাপ একটা তেপায়া টুলে বয়ে নিয়ে এসেছিল সুরচিতা। তারপর আবার ভেতর থেকে আরেকটা চেয়ার নিয়ে এসে বসেছিল ধৃতিকান্তর পাশে। চুপ করে দুজনে চা আর চিঁড়েভাজা খাচ্ছিল। ধৃতিকান্তই বেশিটা খেয়েছিল। মাঝে মাঝে একটু একটু নিচ্ছিল সুরচিতা।


ধৃতিকান্তই বলেছিল, “আমরা যেন প্রৌঢ় দম্পতি। বাগানে পাশাপাশি বসে চা খাচ্ছি।” 

সুরচিতা বলেছিল, “আর অন্ধকার দেখছি, দুচোখে।” 

বলে ধৃতিকান্তর দিকে তাকিয়ে বাঁ চোখটা টিপতে গিয়ে কী যেন একটা দেখে ফেলেছিল ধৃতিকান্তর চোখে, সেই আধো অন্ধকারে।


ধৃতিকান্ত লুকোনোর চেষ্টা করেনি। চেয়ারের হাতলে আলতো রাখা সুরচিতার বাঁ হাতের তালুটা নিজের ডান হাতের মুঠোয় নিয়ে বলেছিল, “যেন এটা সত্যি হয়।” 

সুরচিতা শিউরে উঠেছিল যদিও, তবুও অকম্পিত গলায় বলেছিল, “বলিহারি তোর শখ, দু চোখে অন্ধকার দেখব বুড়ো বয়সে? কেন? চাওয়ার মতো আর কিছু ছিল না?” 

ধৃতিকান্ত কিন্তু মুঠো আলগা করে নি। জবাবে বলেছিল, “তুই ভালো করেই বুঝেছিস আমি প্রৌঢ় দম্পতি হতে চেয়েছি তোর সাথে। কিন্তু...ভুলটা আমারই। এতোদিন পরে সব আবার নতুন করে শুরু করতে হতো।” 

থেমে ছিল ধৃতিকান্ত। সুরচিতা চুপ করে শুনছিল, বলতে দিচ্ছিল ধৃতিকান্তকে।

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)


Sunday, May 3, 2026

Panchpoksho - 30

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রাক্‌পক্ষ

~~~~~~

অভির প্রথম ক্লাসের দিন সুরচিতা ওর সাথে দেখা করেছিল, ইস্কুলে ছুটি নিয়ে। দুজনে সন্ধে অবধি এখানে সেখানে আড্ডা দিয়েছিল। বাড়ি ফেরার সময় তুমুল বৃষ্টিতে ভিজে গিয়েছিল সুরচিতা। মনসাতলার মুখে এতো জল হয়েছিল যে ওর পা থেকে চটি খুলে ভেসে গিয়েছিল। তবু সেদিন কোনো দুঃখ তো দূর বিরক্তিও হয় নি। 

অসম্ভব আনন্দ হয়েছিল জীবন কানায় কানায় ভরে যাওয়ায়, অনেক দুঃস্বপ্নের পরে একটা স্বপ্নকে সত্যি হয়ে উঠতে দেখে। এতো আনন্দ যে চোখ ভরে উঠছিল উচ্ছাসে। গালে গড়িয়ে আসা অশ্রু ধুয়ে যাচ্ছিল বৃষ্টির জলে। পুরো রাস্তা খালি পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরেছিল মেয়েটা। 

কপালে, চিবুকে, দুহাতের দশ আঙুলে, কনুই জুড়ে একশ কুড়ি ডিগ্রি জ্বর ছিল তার, বৃষ্টি আরও বাড়িয়ে তুলেছিল সেই জ্বর আর তার ঘোর। অভি তাকে ছুঁয়েছিল কপালে, চিবুকে, আঙুলে, কনুইতে, স্তনসন্ধিতে, চেনা রেস্তোরাঁর অচেনা কেবিনের পর্দাঘেরা আবছায়াতে।


শীতকালে সুরচিতা শ্যামশরণের সাথে তিনপাহাড়ি এসেছিল প্রথম বার। সরকারি সাহায্যে চলা একটা মিশনারি স্কুলে চাকরিও জুটিয়ে নিয়েছিল। শ্যামশরণ ফিরে গিয়েছিল সুরচিতার শহরে; আর সুরচিতা ফিরে এসেছিল শ্যামশরণের শহরে। তারপর ক্রমশঃ মত্ত হয়েছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন নির্মাণে। 

অভির সাথে যোগাযোগ মানে মাসান্তে কটা টাকা পাঠানো আর একটা পোস্টবক্স নম্বর। কখনও যে মনপ্রাণ দুজনের কারুরই ক্ষেপে ওঠে নি দেখা করার জন্য তা নয়। কিন্তু জগতের নজর আর কৌতূহল এড়াতে দুজনেই স্বীকার করে নিয়েছিল স্বেচ্ছা বিরহ। দোল-দূর্গোৎসবে অভির শহরে ফেরাটা অনিবার্য ছিল। তাই সুরচিতা সেসব সময়ে মিশনে উৎসব উদযাপনে সামিল হওয়ার অছিলায় বাড়ি ফিরত না। কিংবা বেড়াতে চলে যেত কোনো সমুদ্রের তীরে বা জঙ্গলের গভীরে। মা-বাবা কখনও সঙ্গী হতেন, কখনও হতেন না। চার ছ বছর থেকে কিছু বেশি বছর কিংবা অনির্দিষ্টকাল, বিরহের দীর্ঘ অভ্যেসে তারা দুজনেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল।


~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)


Saturday, May 2, 2026

Panchpoksho - 29

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রাক্‌পক্ষ

~~~~~~

শীতের ছুটিতে সুরচিতা একদিন লাইব্রেরি গিয়েছিল। দেখেছিল ওখানে স্টাডিরুম খোলা হয়েছে। ব্যবহার করতে পারে যে কেউ সোম থেকে শুক্র, দুপুর থেকে রাতে লাইব্রেরি বন্ধ হওয়া অবধি। লাইব্রেরির বইয়ের দেখাশোনা করতেন রুনুদি, সেবাদি আর পুবের পাহাড় থেকে আসা শ্যামশরণদা। তাদের সাথে সুরচিতার খুব ভাব ছিল। ওঁরা সুরচিতাকে পুরো লাইব্রেরির যত্রতত্র যেতে দিতেন, বই সাজাতে গোছাতে দিতেন, ধুলো ঝাড়তে দিতেন, আর যে বইটাই তার চাই সেটা খুঁজে রাখতেন; অনেক সময়ে বইয়ের বদলে দিতেন শুধু খবর যে কবে নাগাদ কাঙ্ক্ষিত বইটা বা বইগুলো সুরচিতা হাতে পাবে। 

অতএব দিদিদের বুঝিয়ে অভির ট্রেন যাত্রার উপায়ান্তর পাওয়া গেলো। সে এসে দিদিদের সাহায্যে দুপুরের অনেক আগে থেকে স্টাডিরুমে ঢুকে পড়ত। আর বিকেলে হল্লা শুরু হলে বা তার আগেই নিজের গন্তব্যে রওনা হতো। কর্তৃদের কেউ যদি জানতে চাইতেন যে অসময়ে স্টাডিরুমের পাঠক কে, শ্যামশরণদা কিংবা দিদিরা জানাতেন যে অভি রুনুদির বোনপো; বাড়িতে পড়াশোনার অসুবিধে থাকায় ও লাইব্রেরিতে বসে পড়ে।


অভি লাইব্রেরিতে বসে পড়তে শুরু করার আগে রুনুদি বা অভি কেউ কাউকে চিনতও না। সরকারি মহকুমা লাইব্রেরিতে গ্রুপ ডি গ্রন্থাগার সেবিকার চাকরিটা পেতে রুনুদির ক্লাস এইট পাশের সার্টিফিকেট লেগেছিল একটা; আসতেনও মহকুমা শহরের বাইরে, দূরের একটা গ্রাম থেকে, বাসে করে। শাড়ি-জামাতে অনটনের ছাপটা স্পষ্ট ছিল। কিন্তু মনে কোনো কার্পণ্য ছিল না। সে-কথা বলতে গেলে বলতেন, “ওরে মেয়ে আমার কী এতে কোনো খরচা আছে? ছেলেটা তো আলোপাখাও জ্বালায় না যে ইলেকট্রিক পুড়বে সরকারের; উল্টে আমাদের সুবিধে হয়, ও যেখানে বসে সে জায়গাটার ধুলো ঝাড়তে হয় না।” 

তারপর খুব যেন রসিকতা হয়েছে এমন করে তিনমূর্তি হেসে উঠত। সুরচিতা চাকরি পেয়ে রুনুদি আর শ্যামশরণদাকে পান খাইয়েছিল; সেবাদি চা-পান খান না; তাই তাঁর জন্য ছিল টফি।


তারপর কখন যে দুটো বছর কেটে গিয়েছিল টের পাওয়া যায় নি। অভির ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের আর হোস্টেলের ফি মকুব হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু খাতা পেন পেন্সিল, অল্প হলেও ইন্সট্রুমেন্টস, দিন গেলে অসুখ-বিসুখ, জামাকাপড় বাবদ খরচ এসবের ব্যবস্থা করার জন্য মাসে মাসে ওর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা ভরার দায়িত্ব সুরচিতা নিয়েছিল। যদিও ওর বাবা-মা জানতেন ওঁদেরই খরচটা চালাতে হবে। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টও খোলা হয়েছিল ওর কলেজের ব্রাঞ্চে। তারপর ক্রমে অভি টিউশন জুটিয়ে নেবে কয়েকটা এমনটাই ঠিক হয়েছিল।

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Friday, May 1, 2026

Panchpoksho - 28

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রাক্‌পক্ষ

~~~~~~

তারপর পুলিশ অফিসার গলা তুলে হুঙ্কার দিতেই, বড়দি তার ওপরে গলা তুলে বলেছিলেন, “আমার নির্দেশ মেনেই মেয়েরা থানায় এসে এসব বজ্জাতকে জমা দেয় তাই আপনি কেরামতি দেখানোর সুযোগ পান। তা না করে যদি এগুলোকে রাস্তায় ফেলে দিত পারতেন আমার মেয়েদের ওপর দারোগাগিরি ফলাতে? আমার মেয়েদের না ছাড়লে পুরো ইস্কুল আমি এখানে বসাব। আপনাকে, আপনার নেতাকে, তার বাবাকে, তার বিরোধী নেতাকে সক্কলকে বসিয়ে ক্লাস করাবো আর বেয়াদবি দেখলেই--” 

কথাটা আর শেষ হয় নি, তার আগেই মিনমিন করে অফিসারটি বলেছিলেন, “যান, যান আপনার মেয়েদের নিয়ে যান।”


আজ এসব কথা ভাবলে সুরচিতার মনে হয় যে বড়দি না থাকলে, তাঁর একটা বিশিষ্ট পরিচিতি না থাকলে, সেদিন কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের খপ্পরে গিয়ে পড়ত থানায় আটকে পড়া মেয়েগুলো। তারপর তাদের নিত্য নিরাপত্তার অভাববোধ থেকে, বা পুলিশের অসহযোগ ও বিরোধিতায় তাদের অবুঝ অভিমানী কিশোর মনে সমাজ আর শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ নিশ্চয়ই জমা হতো। আর সেই অভিযোগ থেকে ক্ষোভ তৈরি করে, সেটা ব্যবহার করে হয়তো নিতান্ত আঞ্চলিক বা আরো বড়ো কিছু একটা রাজনৈতিক গণ্ডগোল বাধিয়ে তোলা হতো। মেয়েগুলোকেও হয়তো ব্যবস্থা অমান্য করতে আর অপরাধে অভ্যস্ত করে তোলা হতো। নিরবচ্ছিন্ন সামাজিক জীবনপ্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হতো।


সামনে থেকে আসা আঘাত ঠেকানোর জন্য হাত ওঠে নিতান্ত স্নায়বিক কারণে। তবু মানুষ সহ্য করে, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবধি, বিশেষত সামাজিক যাপনের সবটুকুই যখন দূষিত হয়ে যায় রাজনীতির জবরদখলে। এরকম একটা অবস্থায় অব্যবস্থার যাঁতাকলে কোন কাজের যে কী কী পরিণতি হতে পারে তা আঁচ করা গেলেও নিয়ন্ত্রণ করা তো যায় না। তাই হয়তো অব্যবস্থা রেখে দেওয়া হয়, তার থেকে ঘোলাজলে মাছও ধরা হয়। 

ব্যবস্থাপকদের নিশ্চয়ই মুনাফা হয় এতে। আর বার বার কৈশোর সে যাঁতাকলে বলি হয়ে যায়, কিছুটা অসংযমে, কিছুটা অনভিজ্ঞতায়, কিছুটা আবেগে, কিছুটা স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদে, কিছুটা প্রতিবর্তগত আত্মরক্ষার চেষ্টায়।

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Thursday, April 30, 2026

Panchpoksho - 27

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রাক্‌পক্ষ

~~~~~~

কিন্তু এক বিপদের মোকাবিলা করতে গিয়ে মেয়েদের অন্য বিপদ ঘনিয়ে ঊঠেছিল। প্রথম যেবার ফন্টের মতো কাউকে থানায় নিয়ে গিয়েছিল সুরচিতারা সেবার তো ওদের বলা হয়েছিল, “ছিছি, ছিছি, ছিছি! তোমরা ইস্কুলে যাও, লেখা পড়া শেখো আর এটুকু জানো না যে মারপিট করে আইন হাতে তুলে নিতে নেই?” 

কিন্তু তাতে লজ্জা পাওয়ার উপায় ছিল না সুরচিতাদের। উপদ্রব এতো বেড়েছিল, বিশেষতঃ বাড়ি থেকে ইস্কুল যাওয়ার সময় আর ইস্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময়। সময়দুটো নির্দিষ্ট হওয়ায় সেই সময়দুটোতে উপদ্রব হতো নিয়মিত। 

কখনও একমুখ কাঁচাপাকা দাড়ি নিয়ে একটা লোক রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে পড়ত প্যান্টের চেন খুলে। কখনও তার সাথে চীৎকার করে মেয়েদের শরীর নিয়ে ছড়া কাটত। কখনও শরীরের নানা অংশে খিমচে দিয়ে, খাবলে দিয়ে চলে যেত সাইকেল চেপে সাঁ করে। 

মেয়েরা একেক দিন দলে দলে ওঁত পেতে থেকে মোকাবিলা করত এসব আক্রমণের। কখনও নিয়মিত আক্রমণকারীকে দেখা মাত্র উলু দিয়ে রাস্তার সকলকে সচকিত করে দেওয়া হতো। আক্রমণ হলে “বাঁচাও” “বাঁচাও” চীৎকারে জানান দিত আক্রান্ত। আর তার আগে পিছের মেয়েরা গুলতিতে ঢিল নিয়ে তৈরি হয়ে যেত। আক্রমণকারীকে দেখা মাত্র ঢিল মেরে তার মাথা ফাটিয়ে দিত। ধরাশায়ী করা গেলে হাত-পা কিছু একটা ভেঙে দেওয়া হতো। তারপর তাকে নিয়ে যাওয়া হতো থানায়।


এরকম আরেকবার হতে যে মেয়েরা থানায় গিয়েছিল তাদেরকে দায়িত্বে থাকা পুলিশরা বলেছিল, “বাঁদর মেয়ের দল, ফের যদি এমন করবি তো তোদের জেলে ভরে দেব।” 

বলাবাহুল্য আলাদা করে ভয় পাওয়ার কিছু ছিল না সুরচিতার বা তার সতীর্থদের। তারপর একবার তো থানায় আটকেও রাখা হয় কিছু মেয়েকে। কিছু মেয়ে পালিয়ে গিয়ে ইস্কুলে খবর দিয়েছিল। কারণ সেসময়টা ইস্কুল বসার সময় ছিল। 

বড়দি নিজে থানায় এসে ডিস্ট্রিক্‌ট ম্যাজিস্ট্রেটের চিঠি দেখিয়ে বলেছিলেন, “এই অর্ডার পাওয়ার পরেও আপনারা মেয়েদের ইস্কুল যাতায়াতের পথে টহলের ব্যবস্থা নেন নি।” 

জবাবে থানার বড়োবাবু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু হতাশ, ক্লান্ত বড়দি হাত তুলে বলেছিলেন, “থাক আর বলতে হবে না; আমি জানি, আপনাদের নাকি সব মেয়েকে বাড়ির থেকে ইস্কুলে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া ছাড়াও আরও বেশি জরুরি কাজ আছে। তা আমার মেয়েরা নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য যদি একটা লোফারকে দুঘা দিয়ে ফেলে সেটা আইনভঙ্গ হলো, আর সাক্ষী সমেত দশ-বারোটা মেয়ে আপনাকে আসামী এনে দিলে আপনি মেয়েগুলোকেই জেলে ভরেন? আপনি নিশ্চয়ই মেয়ের বাবা নন। বোধ হয় মায়ের পেটেও জন্মান নি।” 

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Wednesday, April 29, 2026

Panchpoksho - 26

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রাক্‌পক্ষ

~~~~~~

ফন্টে যখন মাস্তানও হয় নি তখন ইস্কুল ফেরতা মেয়েদের টোন টিটকিরি করত, সুযোগ পেলে গায়েও হাত দিত। ওর বিশ্বাস হয় নি যে ওর বিরুদ্ধ গোষ্ঠীর লোকেরা ইস্কুলের মেয়েদের হাতেই মার খেয়ে হাড় ভেঙেছে।

একদিন ওর এলাকায় সুরচিতা অ্যাণ্ড কোম্পানি হাজির হয়েছিল। ও স্বভাব মতো টোন, টিটকিরি করে যখন বুঝে নিয়েছিল যে দুটো মেয়েই ভীতু তখন মেয়ে দুটোর কাছে গিয়েছিল রাস্তার ধারের মেয়েটার থুতনি নেড়ে বুকে ধাক্কা দিয়ে চলে যাবার মতলবে। 

কিন্তু থুতনিতে হাত দিতেই মেয়েটা ওর হাত ধরে এমন প্যাঁচ দিয়েছিল যে ও সাইকেল সুদ্ধ পড়েছিল মাটিতে। তারপর রে রে করে আরও কিছু মেয়ে ছুটে এসে মেরে ওর হাত ভেঙে দিয়েছিল, সাইকেলের দুটো চাকার রিম ভেঙে দিয়েছিল, সিট খুলে নিয়ে গিয়েছিল; সব শেষে নালার জলে মুখ গুঁজে দিয়ে নাকানি চোবানি খাইয়ে বলিয়েছিল আর কোনোদিন যদি ও কোনো মেয়েকে জ্বালিয়েছে তো মেয়েগুলো নাকি ওর এমন হাল করবে যে ও নিজের বউকে ছুঁতেও ভয় পাবে। 

তারপর ফন্টেকে ওরা নাকে খত দিতে দিতে থানায় জমা করে দিয়েছিল। সে বাবদে ফন্টের মাথায় যে ঘা-টা হয়েছিল সেটা শুকোতে বছর ঘুরে গিয়েছিল। এখন ওর ভাগনেটা সেই ঘায়ের গর্তে হাতের আঙুল ঢুকিয়ে আঙুলটা পাকাতে পাকাতে জিজ্ঞেস করে, “তোমার পিস্তলের গুলি কি এখানেই লাগাবো?” 

শুনলেই ফন্টের পায়খানা পেয়ে যায়। যাই হোক ফন্টে আর আসে নি অভির কাছে কখনও।


কিন্তু সেই জখম তৈরি হওয়ার পরেই ফন্টে ক্রমশঃ এলাকার ত্রাস হয়ে ওঠে। কারণ সেদিন ফন্টের নামে থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ নেওয়া হয় নি। শুধু ফন্টের বেলাই এমন হয়েছিল তাতো নয় তার আগে বা পরেও যাদেরকে সুরচিতারা থানায় নিয়ে গিয়েছিল তাদের কারুর বিরুদ্ধে কখনও অভিযোগ নেওয়া হয় নি। 

ফন্টেরা ক্রমে জেনে গিয়েছিল যে তারা অবধ্য। তাদেরকে থানায় দাখিল করা হলেও তাদের কোনো ক্ষতি নেই। বরং যতো বেশিবার যেতে পারবে ততো লাভ, কোনো না কোনো ভাবে তাদের পুরস্কৃত করা হবে, ক্ষতিপূরণে। ফলে ফন্টেরা ক্রমশঃ খুচরো অন্যায় থেকে বড়ো অপরাধে হাত পাকাতে থাকে নির্ভয়ে। হয়তো সেই মেয়ের দলকে নিয়ে ব্যক্তিগত অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল কারুর কারুর মনে। কিন্তু তাদের অধিকাংশেরই স্বভাব বদলায় নি, তারা শুধু মেয়েদের আক্রমণের এলাকা বদলে ছিল।

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)


Tuesday, April 28, 2026

Panchpoksho - 25

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রাক্‌পক্ষ

~~~~~~

তখন সুরচিতা ইউনিভার্সিটি পেরিয়ে একটা আদ্যপ্রান্ত বাণিজ্যিক ইস্কুলে চাকরি নিয়েছে। তাতে না ছিল অযথা পোষণের ভরসা, না ছিল পেনশনের অঙ্গীকার। বাবা-মা দুজনেই বিরক্ত ছিলেন। তারওপর আবার ইস্কুলের কয়েকজন মাস্টারের সাথে মিলে সুরচিতা একটা সংস্থায় কাজ করত যেখানে ইস্কুল ছেড়ে দেওয়া বাচ্চাদের পড়ানো হতো। তাতে কোনো উপরি রোজগার ছিল না; উল্টে নিজের পকেট থেকে খরচ দিতে হতো। সকালের টিউশনি বন্ধ করে সন্ধের কয়েকটা টিউশন রেখেছিল সপ্তায় দুদিন আর শনিবার দুবেলা। আর সোম-বুধ-শুক্র সন্ধেবেলা ছিল অভির সাথে ঘন্টা দুয়েক কাটানো। রুটিন অভি ঠিক করত। দরকার পড়লে সুরচিতা অভির পড়াশোনায় অংশ নিত। না হলে নিজের বই পড়ত বা রিসার্চের কাজ এগোত।


উপায়ান্তর পাওয়া অবধি অভির সমস্যার একটা চলনসই সমাধান হয়েছিল। রোজ সকালে ও চলে আসত সুরচিতার কাছে। তারপর হয় ইস্কুল যেত নয়তো যেদিন ইস্কুল থাকত না সেদিন ট্রেনে চেপে চলে যেত সুরচিতাদের সংস্থায়। দুপুরে কয়েকজন বাচ্চার পড়াশোনা দেখত; নিজের পড়া পড়ত। বিকেলে বাড়ি ফিরত। 

তারপর হয় সুরচিতা আসত না হলে ও যেত সুরচিতার কাছে। বসত বাকি ছাত্রদের সাথে। তাতে দু চারজন সমবয়সীর সাথে ওর চেনাশোনা হতো; ওপর ওপর মেলামেশা, হাসি ঠাট্টার একটা অভ্যেস হতো; বাকি ছেলেমেয়েরা কি পড়ে; কতক্ষণ পড়ে; কখন পড়ে, এসবও জানতে পারত। 

যতো সম্বর্ধনা আর বক্তৃতার নেমন্তন্ন পেত তার সবেতে অভি যেতো না। পরে কেউ জবাবদিহি চাইলে ও খুব নম্রভাবে জানাত যে বাবা বা মা কেউই সময় বার করতে পারেন নি ওকে সভায় নিয়ে যাওয়ার। 

কথাটার সত্যতা প্রশ্নাতীত। কিন্তু এটাও সত্যি যে বাবা-মা জানতেনও না ছেলের কোথায় কোন আসরে নেমন্তন্ন। ছেলেটা একটা পরীক্ষা পাশ করেছে মাত্র। হতে পারে প্রতিযোগিতায় সে সামনের সারিতে থেকে সবার নজর কেড়েছে। কিন্তু সেই পরীক্ষা পাশের স্বাভাবিক আর সাধারণ ঘটনাটাকে উদ্‌যাপনের হিড়িকে কৃত্রিম অভিকর্ষে ফাঁপিয়ে তোলা হচ্ছিল। 

ছেলেটার সামনে আরও অনেক পরীক্ষা বাকি তখনও; তার জন্য প্রস্তুতি প্রয়োজন ছিল। তাই উচ্ছ্বাসের উড়ান নয়, দরকার ছিল বাস্তবের মাটিতে দাঁড়ানোর। সেই তাগিদে অভি কিছু ছল আর কৌশল শিখে গিয়েছিল।


এর মধ্যে একদিন সন্ধেবেলা ফন্টে এসেছিল চিলেকোঠায়। তখন ফন্টে পাড়ার মাস্তান থেকে শহরের নেতা হওয়ার পথে; সে অভির কাছে পড়তে চেয়েছিল রবীন্দ্র মুক্ত বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাশ করতে চায় বলে। সুরচিতা বলেছিল, “ফন্টে, মাথার ঘা-টা শুকিয়ে গেছে বুঝি?”

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Monday, April 27, 2026

Panchpoksho - 24

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রাক্‌পক্ষ

~~~~~~

মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরোতে অনেকেই অভির চিলেকোঠার ঘরে দেখা করতে আসতে চাইত। কেউ বলত তার বাচ্চাকে পড়াতে। অভিকে এক পাহাড় নম্বর পেতে দেখে সারা জগৎ সংসার বোধহয় ভুলে গিয়েছিল যে কিছুদিন আগেই তারা অভিকে দেখত শুধুমাত্র বখে যাওয়া দুটো ছেলেমেয়ের সন্তান বলে। 

কারও ছিল বিস্ময়, কারও হিংসে। কেউ বলত, তার ছেলের সাথে অভি যদি মেশে তাহলে তার ছেলের কিছু উন্নতি হতে পারে। কেউ কেউ এসে বসে থাকত সারাদিন, অভি কী করে এত অভাবেও এত ভালো করল সেই রহস্য জেনে নিতে নিজের নম্বর বাড়াবে বলে। 

খবরের কাগজ বা টিভি চ্যানেল অবশ্য প্রথম সপ্তাহ ছাড়া আসে নি। এদিকে সে যে দিনের বেলাটা ইস্কুলে থাকবে তার জো ছিল না। কারণ ইস্কুলে ক্লাস হতো না, পড়াও হতো না। সারাদিন ফুটবল মাঠে থাকলে সন্ধের পড়াশোনাও ঘুমিয়ে পড়ে। 

দিনে আর রাতের অধিকাংশ সময়টাই বাড়িতে ছেলেটার মা থাকতেন না, যে যত আপদ দোরগোড়াতে ঠেকিয়ে দেবেন। পড়শিরা ওদের বন্ধু ছিল না। নিম্নবিত্তের কারণে বাসাটা শুধু স্বল্পবিত্ত মানুষদের এলাকায় নিতে হয়েছিল দিলীপকে তা তো নয়। শিক্ষা, রুচি, সামাজিক পরিবেশ এবং আরও অনেক কিছুর সঙ্গে সমঝোতা করতে হয়েছিল। কিছু মাস্তান আর তোলাবাজও দুপুরে টোকা দিতে আরম্ভ করল অভির চিলেকোঠার ঘরে।


এই সময়ে একটা রবিবার দুপুরে অভি গিয়েছিল সুরচিতার বাড়ি। উদ্‌ভ্রান্ত গলায় বলেছিল, “সু তোমার কাছে কিছু চাইতে আমার ভীষণ লজ্জা করে। কিন্তু আমি পাগল হয়ে যাব এত লোক সামলাতে। আমি খুব অমিশুক। লোকজনের সাথে কথা বলতে জানি না; এসব ব্যাপারে ঠিক কী ভুল কী জানি না--” 

অভিকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে সুরচিতা বলেছিল, “আমাকে কী তোর পাবলিক রিলেশন্স ম্যানেজার করবি নাকি?” 

তারপর হিহি করে হেসেছিল। অভি একটু বিব্রত হয়েছিল। কিন্তু বলেছিল, “সু, বাবা-মা আমার শক্তি নয় দুর্বলতা। ওঁদের কারণে আমার কোনো কীর্তিরই গৌরব নেই। কিন্তু তুমিই শুধু আমাকে একটা আলাদা মানুষ হিসেবে দেখেছ।” 

তারপর কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। সুরচিতা অভির চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বলেছিল, “তোকে আমার অদেয় কিছুই নেই। বল, ঠিক কীভাবে এই পরিস্থিতির থেকে নিস্তার পেতে চাস। ভেবে উপায় তোকেই বার করতে হবে। সেটা কাজে পরিণত করতে আমাকে যা করতে বলবি সেটা আমি করব।” 

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Sunday, April 26, 2026

Panchpoksho - 23

পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রাক্‌পক্ষ

~~~~~~

দুয়েরই কারণ ওর বাবা-মায়ের বেছে নেওয়া জীবনযাপন। দুজনের সিদ্ধান্তের, কর্মের ফল মর্মে মর্মে অভি ভোগ করত। সেই জন্যই ওর ফ্রি টিউশনে আপত্তি ছিল। ওর আপত্তি ছিল বাবা-মায়ের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার আর অক্ষমতার দায় দয়াশীল পৃথিবীর কাঁধে তুলে দিতে। বিকল্প হিসেবে সে নিজের কাঁধটা অনেক শক্তিশালী করে তুলছিল। কোনটা দাক্ষিণ্য আর কোনটা শুধুই ভালো ব্যবহার সেটা বোঝার বয়স হয় নি বলে ও এড়িয়ে চলত সমবয়স্কদেরও। তাই শ্রদ্ধাটুকু সুরচিতা গোপন করে নি, প্রেমটাকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে চলেছিল অনেকদিন।


লম্বা ছুটির সময়ে সুরচিতা অভিকে নিয়ে যেত মিউজিয়ামে, তারামণ্ডলে, সায়েন্স সিটিতে, চিড়িয়াখানায়, বটানিকাল গার্ডেনে। কখনও বা ঐতিহাসিক মনুমেন্টগুলোতে। তাতে যেমন ডালহৌসি স্কোয়ার থেকে বিবাদী বাগের গল্প থাকত, তেমনই থাকত ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল বা ফোর্ট উইলিয়াম। বাদ পড়ত না অক্টারলোনি মনুমেন্ট বা ন্যাশনাল লাইব্রেরি। ছিল নন্দন, রবীন্দ্রসদন, এশিয়াটিক সোসাইটি, টাউন হল, মহাজতি সদন। তারপর বইমেলাও। 

একবার দুজনে চক্ররেলে চড়ে বেরিয়েছিল গঙ্গার ধার ধরে শহরের সীমানা দেখতে। দুজনে ছাড়া কেউ জানতও না এসব টইটইয়ের কথা। অভির তো বলার কেউ ছিল না। সুরচিতা নিজেকে কয়েক ভাগে আলাদা করে নিয়েছিল। এক ভাগে ছিল তার বাবা-মায়ের মেয়ে, আরেক ভাগে তার ইউনিভার্সিটির জীবন। আরেক ভাগে তার টোল। অন্য আরেকভাগে অভি।


ধীরে ধীরে অভি অনেক সহজ হয়ে উঠেছিল। কখন অভির মনে সুরচিতার জন্য একটু একটু করে ভালো লাগা জমতে জমতে তা প্রেমের পাহাড় হয়ে উঠেছে তা ওরা নিজেরাই টের পায় নি। একদিন কোনো একটা মুশকিল প্রশ্নের উত্তর পেয়ে সুরচিতার চোখমুখ উপচে উঠেছিল মুগ্ধ প্রশংসায়; হয়তো প্রেমেও। 

তার উত্তরে একটা জটিলতর প্রশ্ন রেখেছিল অভি, আর উত্তর পেয়ে ওর চেহারায় ঝকঝকিয়ে উঠেছিল সেই মুগ্ধতা যা শিরার রক্ত হৃদয়ে পদ্ম না ফোটালে দেখাই যায় না। ভেঙে পড়েছিল সুরচিতার সমস্ত আড়াল। অভিও লুকোনোর চেষ্টা করে নি তার একমাত্র বন্ধুর কাছে তার প্রেমের কথা। 

তারপর ওদের চোখে কৃষ্ণচূড়ার রক্তিমার মানে বদলে গিয়েছিল। বসন্তের হাওয়া আর গ্রীষ্মের দুপুর ভীষণ সহনীয় হয়ে উঠেছিল। বর্ষার জলে ভাসা রাস্তায় ঘেন্নার আবর্জনারা অবজ্ঞা পেয়েছিল, আর সফেন ঢেউগুলোতে ভীষণ ভালোলাগা আছড়ে পড়েছিল। শরতের নীলিমা গাঢ়তর হয়েছিল। হেমন্তের মানে দাঁড়িয়েছিল দুঃসময়ের প্রস্তুতিতে গোণা কয়েক প্রহর; আর শীত মানে বসন্তের অপেক্ষা, পায়ের শব্দ গোণা।

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)



Saturday, April 25, 2026

Panchpoksho - 22

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রাক্‌পক্ষ

~~~~~~

কোনো কোনো দিন হয়তো যাবতীয় ল্যাম্পপোস্টরা ভেঙে পড়ত দুজনের ঘাড়ে সাইন-কোসাইনের অনুপাতে। কখনও নিওলিথিক কুমোরেরা মৃৎপাত্রে কী করে নকশা ফোটাত সে কথাটা স্পষ্ট হয়ে উঠত। কখনও তুমুল তর্ক হতো স্টিলির মধ্যে সংসক্তি আসঞ্জন নিয়ে; কখনও সালকাস জাইরাসে উন্মাদনা ছড়াতো ভারী জল। এবং এসবের মধ্যে দিয়ে সব শৈত্য পেরিয়ে কখন যেন উষ্ণ গালফ স্ট্রিম হয়ে যাতায়াত শুরু হয়েছিল গোলাপি খামে রাখা ছেঁড়া ছেঁড়া কবিতার, বুনো ফুলের আর চকোলেটের।


কিন্তু তার আগে বয়ে গিয়েছিল অনেক হিমশীতল মুহূর্ত। অভির জীবনে না ছিল দোল, না দিওয়ালি; না দূর্গাপুজো, না সরস্বতী পুজো। সে-জীবনে যতোটা পাথরের রুক্ষ কাঠিন্য ছিল, ততোটা ছিল না কৈশোরের উচ্ছ্বাস বা কৌতূহলের বিস্ফোরণ। ততোটাই দুরূহ ছিল সে পাথরের বুকে কোনো আঁচড় কাটা বা তার নিজের ফাটল বরাবর সম্ভাব্য ভাঙনগুলো আটকে কোনো নকশা কুঁদে তোলা। বইয়ের কোণে আঙুলে আঙুল ছুঁয়ে গেলে সুরচিতার হৃদপিণ্ডের দেওয়ালে রক্তের ঢেউ আছড়ে পড়ত অনেকক্ষণ। কিন্তু সেই ঢেউয়ের ঝাপটা অভির চোখেও ছলকে উঠতে দেখেছিল সুরচিতা, বছর ঘুরে যেতে।


এরকম কিছু যে হতে পারে সেটা সুরচিতার আজন্মের সামাজিক বোধের সীমায় ছিল না। নিজের কাছে সত্যিটা স্বীকার করতে তার প্রবল যন্ত্রণা হয়েছিল। অভির সাথে একটা সহজ সম্পর্কের আবর্তে আসা অনেক ধৈর্যের সিঁড়ি ভাঙা। সেই সম্পর্কটা সুরচিতা কিছুতেই তার একতরফা প্রেমের দাবিতে ভেঙে দিতে চাইত না। 

সে অনেক নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে ভেবে ভেবে যে অভির যদি সন্দেহ হয় সুরচিতার উদ্দেশ্য কী তাই নিয়ে বা কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য আছে বলে। তার সারাক্ষণ আশঙ্কা হতো যে তার মনোভাবের ব্যাখ্যায় অভি যদি ব্যর্থের কামনা চরিতার্থতার চেষ্টা দেখে তাহলে জগৎ, জীবন সব কিছু নিয়ে ছেলেটার মনে তিক্ততার বিস্ফোরণ হতে পারে। বিশেষত অভির বাবা-মায়ের সমস্ত কথা শুনে সুরচিতা টের পেয়েছিল তার অভিমানের গভীরতা। সেই অভিমানই মাত্র চোদ্দ বছরের ছেলেটার সহ্য, দার্ঢ্য, বিবেচনার মূলে। অথচ সারা পৃথিবী হয় ওকে দয়া দেখাতো, নয়তো তাচ্ছিল্য।

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)



Friday, April 24, 2026

Panchpoksho - 21

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রাক্‌পক্ষ

~~~~~~

হয়তো বোঝে নি কারণ অভির সাথে মেশার মূলে সুরচিতার একটা সচেতন উদ্দেশ্য ছিল। সুরচিতা ভেবেছিল যে অভি যদি সত্যিই তার মা-বাবার মতো দুর্বল না হয় বা যদি তার নিজের মতে আর নিজের মতো বাঁচার ইচ্ছে আর উৎসাহ থাকে তাহলে সুরচিতা অভিকে সসম্মানে বন্ধু করে নেবে, যতটুকু ভরসা ছেলেটার লাগবে বা সে নিতে চাইবে সবটুকু নিঃশর্তে দেবে, আর আগলে রাখবে টুকুন রায়দের থাবা থেকে, ছলে আর কৌশলে। 

তাই সে অভিকে জানতে চেয়েছিল, বুঝতে চেয়েছিল। আবার সেই জানা বোঝার হাত ধরে টুকুন রায়দের সাথে অঘোষিত নিশঃব্দ অলক্ষ্য যুদ্ধটার কারণ, উদ্দেশ্য সবই ক্রমে বদলে গিয়েছিল, সুরচিতার সচেতনতা আর আর তার নিয়ন্ত্রণরেখাকে ফাঁকি দিয়ে।


সুরচিতার মুগ্ধতার কথা হয়তো অভি বুঝেছিল বা তার অস্পষ্ট ধারণা হয়েছিল সুরচিতার অনুভূতি সম্পর্কে। সুরচিতা তার কোনো ক্ষতি করবে মানে সুরচিতা তাকে কোনো ভাবে অপমান করবে সে সম্ভাবনাটা সে আমল দেয় নি। তার প্রতিনিয়তের দুর্গতির পাশে অমন অপমানের একটা মনোবেদনা তার কাছে হালকা ঝুঁকি বই কিছু মনে হয় নি বোধ হয়। সে কিছু না করেও অপরাধীর জীবন কাটাচ্ছিল যে। 

তার বয়সী ছেলেদের মা-বাবারা নিজেদের ছেলেকে সাবধান করতেন অভির সাথে মিশে দুর্মতি হতে পারে বলে। আর মেয়েদের, মানে যে সব মেয়েদের বাবাদের দোতলা বাড়ি ছিল তারা কেবলই অভির স্বভাব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতেন তার মা-বাবার কথা টেনে এনে। ফলে সুরচিতা তার মন নিয়ে, অনু্ভূতি নিয়ে কিছুদিন খেলে আনন্দ নেবে আর তারপর তাকে ফেলে দিয়ে চলে যাবে এরকম ভয় অভি মোটেও পায় নি। 

শারীরিক কোনো উৎপীড়নের আশঙ্কাও তার অযৌক্তিক মনে হয়েছিল হয়তো। কারণ হয়তো তার প্রত্যেকটা দিন একটা একটা নতুন লড়াই ছিল মা-বাবার অল্প বয়সের খেয়ালের মাশুল দিতে দিতে নতুন করে নিজের জন্য বাঁচার কারণ খুঁজে পাওয়ার মধ্যে, নতুন করে বাঁচার লড়াই জেতার কৌশল শেখার মধ্যে। 

সুরচিতার আসা যাওয়া নিয়ে সে সতর্ক থাকলেও আক্রমণাত্মক ছিল না। তাই বোধ হয় একসময় সেও টের পেয়েছিল সুরচিতা তার বন্ধুর অভাব পূরণ করতে পারে। তারপর একসময় নিয়মিত সোম-বুধ-শুক্র সন্ধেবেলা সুরচিতা কিছুক্ষণ কাটাতো অভির সাথে। কোনো কোনো সন্ধেবেলা চা, মুড়ি, চানাচুর খেতে খেতে গল্পে মুখর হতো দীপ্তির সাময়িক যোগদানে।

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)



Thursday, April 23, 2026

Panchpoksho - 20

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রাক্‌পক্ষ

~~~~~~

সুরচিতা বলেছিল, “চা পরে খাবো একদিন, যেদিন তোর বইটা ফেরত দিতে আসব সেদিন। তোর দরকার পড়লে বইটা তুই আনতে পারিস আমার থেকে। রবিবার দুপুরে গেলে আমাকে পাবিই বাড়িতে; বাকি কোনো সময়ের ভরসা নেই।”


অভি আসে নি সুরচিতাকেই আবার যেতে হয়েছিল। সুরচিতা ওর জন্য একটা বই নিয়ে গিয়েছিল। বইটা নেড়ে চেড়ে অভি ফিরিয়ে দিতে পারে নি। বলেছিল, “এর বদলে তুমি কী চাও?” 

সুরচিতা বলেছিল, “তোর বইগুলো পড়তে দিস একে একে।” 

অভি বলেছিল, “এই বইগুলো তুমি পড়ো নি?” 

সুরচিতার হেসে বলেছিল, “কতো বই, কতো লেখা! সব কী পড়া যায়? তার ওপর ক্লাসিকগুলো একেক বয়সে একেক রকম লাগে। তাছাড়া তোর বয়সী কোনো মেয়ে এইসব বই পড়ে না। কার হাতে কোন বই দেওয়া হবে তা নিয়ে বয়ঃজ্যেষ্ঠদের বেশ ছেলেদের-বই, মেয়েদের-বই দুই-দুই ভাবনা আছে বলেই মনে হয়েছে আমার। তাই তোর পড়া বা তাকে রাখা সব বই আমার পড়া নয়।” 

তারপর কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। সুরচিতাকেই আবার মুখ খুলতে হয়েছিল, “বদলে তুইও আমার বই পড়তে পারিস। নাহলে একতরফা বই নিতে নিতে আমার ধার বেড়ে যাবে। তার জন্য তোকে আমার বাড়িতে যেতে হবে, নিজেকে বই বেছে নিতে হবে। তোকে হাতে করে বই এনে দিলে তোর পছন্দের সাথে অবিচার করা হবে। তাই সেটা আমি করতে পারব না। এখন তুই সুযোগ নেওয়ার মতো সাহসী হবি না মুখ্যু থাকবি সেটা তোর ব্যাপার”। 

আবার সব চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। বাইরে একটা ঘুঘু বার দুয়েক ডেকে উঠেছিল। কয়েকটা ছাতারে খ্যাচর খ্যাচর করে উঠেছিল। অভি বলল, “উপকারে আমার দম বেরিয়ে আসে। তোমার মতলবটা কী?” 

সুরচিতা বলেছিল, “যদি তুই আমার আত্মতুষ্টির উপলক্ষই হোস, তাতে তোর কী কোনো ক্ষতি দেখছিস? যদি না দেখিস, তাহলে আমার সাথে ফুচকা খেতে যাস, গঙ্গার ধারে।”


অভির সাথে ফুচকা খেতে যাওয়ার আগে চার-পাঁচবার বই দেওয়া-নেওয়া করতে হয়েছিল সুরচিতাকে। সে যে ছেলেটার সাথে মিশছে শুধুই একটা আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধায় তা ছেলেটা তখন স্পষ্ট করে বুঝেছে কী বোঝেনি তা সুরচিতাও বোঝেনি। 

সে এটাও বোঝে নি যে শান্ত কিশোরের মধ্যে মূর্ত ব্যক্তিত্ব তাকে শুধু অবাক নয় মুগ্ধও করেছে। বিশেষতঃ নিজের বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব, অপ্রতুল আত্মসম্মানবোধ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের সমঝোতা দেখতে দেখতে সুরচিতার মন যখন ভীষণ ক্লান্ত আর বিষাক্ত তখন ওর থেকে অনেক কম বয়সী একটা ছেলের মধ্যে সে সবের তীব্রতা টের পেয়ে ও অভির সাথে মিশছিল স্বতোৎসারিত শ্রদ্ধায়, অদম্য আকর্ষণে, নির্দ্বিধায়। 

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Wednesday, April 22, 2026

Panchpoksho - 19

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রাক্‌পক্ষ

~~~~~~

মহিলা ঠোঁট উল্টিয়ে বলেছিলেন, “এমনি খাওয়া-শোওয়ার সময় সব দোতলার ঐ কোণের ঘরটাতে থাকে। তা বাদে কত্তা-গিন্নী তো থাকেন না। ছেলেকে তিনতলার চিলেকোঠায় পেতে পারো।” 

সুরচিতার আর কিছু জানার ছিল না। সদর দিয়ে বেঁকে চুরে ভিতরে আসা পুরুষটিকে কাটিয়ে রাস্তায় নেমে সে তালা খুলে সাইকেলটা তুলেছিল উঠোনে। সেটাকে সদরের একপাশে দেওয়ালে ঠেকিয়ে চাবি দিয়ে রেখে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গিয়েছিল অন্ধকারে।


চারপাক খেয়ে যখন ছাদে পৌঁছেছিল তখন হৃদপিণ্ড দবদবিয়ে প্রায় গলায় উঠে এসেছিল। তাও দৌড়ে গিয়ে চিলেকোঠার ঘরের দরজায় ধাক্কা দিয়েছিল দুমদুম করে। ভেতর থেকে কোনো সাড়া আসে নি। কয়েক মুহূর্ত নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছিল সুরচিতা। তারপর যেই ভাবছিল যে ফিরে যাওয়াই ভালো, তখনই দরজা খুলে অবাক গলায় অভি জানতে চেয়েছিল, “কাকে চাই?” 

সুরচিতা খুব স্বাভাবিক গলায় বলেছিল, “তুই আমাকে চিনতে পারছিস না? আচ্ছা পরীক্ষাটা দিয়ে এলি তার কী হলো জানতেও গেলি না?” 

অভি কোনো উত্তর দেয় নি। দুই হাতে দরজার দুই পাল্লা ধরে সোজাসুজি তাকিয়ে ছিল সুরচিতার চোখের ভিতরে। সুরচিতার বলেছিল, “আমি সুরচিতা। তুই আমার কাছে অঙ্ক পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলি। মনে আছে?” 

অভি অস্ফুটে বলেছিল, “হুঁ।” 

সুরচিতাই আবার বলেছিল, “চল ঘরের ভেতরে যাই।” তখন অভি ইতস্তত করে বলেছিল, “ভেতরে খুব গরম।” তবে দরজা ছেড়ে একপাশে সরে দাঁড়িয়েছিল। সুরচিতা ঘরের ভেতরে পা রাখতে রাখতে বলেছিল, “গরম তো তুই ছিলিস কী করে ভেতরে?” 

অভি খুব জোরের সঙ্গে বলেছিল, “আমার অভ্যেস আছে।” 

সুরচিতা হেসে বলেছিল, “আমার যে অভ্যেস নেই সে কথা তোকে কে বলল?” 

অভি উত্তর দেয় নি কোনো।


ঘরের মধ্যে প্লাই দিয়ে বানানো একটা বইয়ের তাক ছাড়া কোনো আসবাব ছিল না। একটা পুরোনো রঙচটা কিন্তু পরিষ্কার মাদুরে একটা নীল ওয়াড় লাগানো বালিশ আর অনেক খাতাবই ছড়ানো ছিল। সুরচিতা মেঝেতেই বসে পড়েছিল। অভিও বসতে বাধ্য হয়েছিল। তারপর দুজনে অনেক কথা হয়েছিল। 

কেন পঁচানব্বই হলো, কেনই বা একশো হলো না; অভির অঙ্ক ছাড়া আর কী পড়তে ভালো লাগে। প্রিয় লেখক কে; প্রিয় খেলা কী; কোন সাবজেক্টে অভি দুর্বল এবং আরো অনেক কিছু। কথায় কথায় সন্ধের অন্ধকার যখন ঘরের আনাচে-কানাচে জমতে শুরু করেছে, তখন অভি একটা কেরোসিনের ল্যাম্প জ্বালিয়েছিল। বলেছিল, “মা ফিরলে এক কাপ চা আপনাকে খাওয়াতে পারতাম, কিন্তু--” 

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Readers Loved