Showing posts with label Sexuality in Bengali Literature. Show all posts
Showing posts with label Sexuality in Bengali Literature. Show all posts

Sunday, March 29, 2026

Nijer Arale

নিজের আড়ালে

রাতটুকুই কেবল মানসীর নিজের। তাও কেড়ে নেয় ঘুম। না ঘুমোলে দিন কাটানো কঠিন। তাছাড়া অধিকাংশ রাতে জেগে থাকার ইচ্ছে হেরে যায় দিন যাপণের ক্লান্তির কাছে। ক্রমে মানসীর রাতগুলো ভাগ হয়ে গেছে ঘুম আর রাতটুকুকে একান্তে কাটানোর তীব্র আকাঙ্খার মধ্যে। 

নিজের শর্তে রাত কাটাবে বলে মানসী কখনো বই পড়েছে। কিন্তু তাতে অধিকাংশ সময়েই বইয়ের চরিত্ররা তার অস্তিত্বে ছেয়ে থাকত। এইভাবে বইয়ের বিষয়ের মধ্যে সে ধুলো ধুলো হয়ে মিশে যেত।

রাতটুকুকে নিজের ইচ্ছে মতো পেতে কখনো মানসী গিটার সেধেছে। তাতে মাথার ভেতর সুরের অনুরণনে ঘুম ফালাফালা হয়ে গেছে। 

কখনও বা ছাদে বেড়াবার চেষ্টা করেছে। ঘেমে-নেয়ে বিরক্ত হয়ে গেছে। 

মোদ্দা কথাটা হলো নিজের সাথে নিজে কিছুটা সময় কাটাবার এতোরকম চেষ্টায় সে নিজেই ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে, ক্ষত-বিক্ষত হয়ে হারিয়ে গেছে নিজের থেকে দূরে। ক্রমশঃ তার ভাবনা, তার বুদ্ধিমত্তা, তার নিজের চেতনা সম্পর্কে সে উদাসীন হয়ে পড়ছে। অথচ আত্মবিশ্বাস আর গুছুনেপণার লোকদেখানো আড়ম্বরে সজাগ, সদা সচেতন চেহারাটা তার অমলিন থেকে গেছে। তাই অনবরত আয়না দেখলেও সে নিজে টেরটি পায় নি ভিতরের ভাঙন।

কত দেরি করে সে খবর তার গোচরে এলো জানে না মানসী। একদিন স্টেকহোল্ডার মিটিঙের পরে, টয়লেটে ঢুকে মানসী শুনল, শময়িতা, তাদের প্রজেক্টের কমিউনিটি মেন্টর, প্রজেক্ট বিশ্লেষণ করছে, ফোনে। 

ওপারে যেই থাক, আলোচনাটায় প্রকাশযোগ্য নয় এমনসব তথ্য থই থই করছিল। শুনে মানসী দ্বন্দে জেরবার হয়ে গিয়েছিল যে শময়িতা বোকা না শয়তান। কারণ শময়িতাকে সেদিন অবধি সে বুদ্ধিমতী, সৎ স্বতঃস্ফূর্ত, বলেই জানত। ফলে সে যে টয়লেটের মতো হট্টমেলায় বেফাঁস কথা বলবে তা মানসীর কল্পনাতীত। 

তারপর সত্যিকারের সজাগ হয়ে মানসী জানতে চেষ্টা করে আপিসের আর কে কে শময়িতার মতো। তাতে ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হওয়ার দাখিল হয়েছিল। 

এই সব অসময়ের বাছ-বিচারে আসল কাজও প্রায় বরবাদ হওয়ার যোগাড় হয়ে পড়েছিল। কিন্তু নতুন করে চোখ-কান খোলা রাখার অভ্যেস তৈরি হলো বলেই, সে হঠাৎ শুনতে পেল, সেই শময়িতার মুখেই, কেউ খারাপ বললে যখন মানি না আমার কাজটা খারাপ, তখন কেউ ভালো বললেই বা গলে যাই কী করে?

মেয়েটাকে খোদ একাউন্ট ম্যানেজার ডেকে পারফরমেন্স নিয়ে কিছু বলেছিলেন সেদিন। মেয়েটার কথাগুলো শুনে মানসীর মনে পড়ে গিয়েছিল যে অনেকগুলো বছর আগে সে নিজেও এমনটাই বেপরোয়া ছিল। জীবনের অসংখ্য আপসে সেদিনের বেপরোয়া বিবেচনা কি ঘুমিয়ে পড়েছে? এতোদিন ধরে নিজেকে গড়ার চেষ্টায় একটু একটু করে সে কি নিজেকে আসলে নষ্টই করেছে? 

একসময় প্রশ্নগুলো অফিসের চৌহদ্দী থেকে বেরিয়ে চব্বিশ ঘন্টার সঙ্গী হয়ে মানসীকে কুরে কুরে খেতে থাকে। চানঘরে সাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে হতাশার নোনা ঢেউয়ে, গলায় জমা বাষ্পে যখন দুচোখে অন্ধকার তখনই জলের কলকল শব্দের ভেতর বেজে ওঠে, 

অনমিতা, শুচিস্মিতা, মন্দীভূতা পথ

জলেই যদি যাবে তবে টানছ কেন রথ

মানসীর চেতনা ফিরে আসে এক ধাক্কায়। যতদূর মনে পড়ে তার দশ বছর বয়স থেকে সে আপন চৌহদ্দিতে সেরা হওয়ার লড়াই করে যাচ্ছে। এমনকি যে রূপ তার সৃষ্টি নয়, সেই রূপকেও সে মেজে ঘষে ঝকঝকে আর ধারালো করে তুলেছে, ক্রমশঃ। সফলও হয়েছে সে, কিন্তু রাতারাতি নয়। অনেক নির্ঘুম রাত কাটিয়ে, অনেক সাধনায় শরীর পাত করে, লক্ষ্য ছুঁয়েছে। 

সবই তার নিজের বানানো লক্ষ্য; কেউ তার সামনে শিকারের জন্য পাখি সাজিয়ে দেয় নি। তার শিকার তাকে নিজেকেই খুঁজে নিতে হয়েছে বারবার। 

তবু কেন কে জানে সাফল্যের প্রদর্শনী দেখে দর্শকরা আহা না বললে মানসীর মন খারাপ হতো খুব এককালে। সে কথা এখন ভাবলেই হাসি পায় তার। তারপর একসময় সে আর আহা-র তোয়াক্কাও করত না। 

এতোগুলো মানুষের মধ্যে সামাজিক বসবাসের ফলে একদিন সে টের পেয়ে গিয়েছিল যে প্রদর্শনীতে বাহ্‌! বলা দর্শকমাত্রই সত্যিকারের অভিভূত গুণমুগ্ধ মানুষ নাও হতে পারে, হতে পারে নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক কিংবা শত্রুপক্ষের নজরদার। অবশ্যই এই শেষ পর্যায়ের মানুষজন মানসীর ক্রিয়াকলাপে খুশি হয় না মোটেই; খুশি তারাই হয় যারা মানসীর সাফল্যে লাভবান হয়। আসল কথাটা হলো পৃথিবীসুদ্ধু সক্কলকে একটা যে কোনো কাজে খুশি করে দেওয়া যায় না। 

আপন আপন স্বার্থবুদ্ধি দিয়ে মানুষ খুশি কিংবা অখুশি হয়। আপন আপন বিবেচনায় ঘটনা কিংবা অঘটন নির্ণয় করে। আপন আপন দৃষ্টিকোণে তকমা লাগায় ভালো আর খারাপের। সেই জন্যই পৃথিবীর কে কী বলবে তার অপেক্ষা না রেখে, শুধুই নিজের খুশির জন্য মানসী খপখপ করে পাখি ধরে, মটমট করে সেগুলোর ঘাড় মটকায়, নানা পদ্ধতির পটুতায়।

এইভাবেই অনেকদিন মাপা কথা, চাপা তথ্য, যথাযথ সাজ-গোজে যথাযথ অভিনয় - যখন যেমন দরকার, এই নিয়েই চলছিল তার অগুণতি মুখোশের আড়ালে বাস। মুখোশের স্বাচ্ছন্দ্যে সারাদিনে এক এক সময়ে এক এক ভূমিকা সে পালন করে যেত অবলীলায়। মুখোশের ওপর ভরসা তার এতই বেশি হয়ে উঠেছিল ক্রমে যে সে মুখোশের আড়াল নিয়েছে তখনও যখন মুখটুকু মেলে রাখা ভীষণ জরুরী ছিল। 

এভাবে তার আত্মবিশ্বাস যে ঢাকা পড়ে গেছে অহমিকায় সে কথা মানসী টেরটি পায়নি মোটে। এখন তার মনে হচ্ছে যে সে চুর হয়েছিল লুকোচুরি খেলার নেশায় কিংবা তাকে গিলে ফেলেছিল যথেচ্ছ মুখোশ ব্যবহারের অভ্যেস। সেই জন্যই হয়তো কখনো কখনো মুখ ভেবে সে আঁকড়ে ধরেছিল আরেকটা মুখোশ। কিন্তু এভাবে মুখোশের আড়ালে নিজস্ব মুখ তার হারিয়ে গিয়েছিল ক্রমে, নিজের অজান্তে, নিজের তৈরি খেলার ঘোরে। সে প্রায় ভুলতে বসেছিল কী তার আসল চেহারা।

অথচ মানসী ক্ষয় নয়, জয় চেয়েছে জীবনে। সেই জয়ের নেশায় তার সত্ত্বাটুকু একটু একটু করে ক্ষয়ে গেছে, ধূলো হয়ে মিলিয়ে গেছে যুদ্ধক্ষেত্রে। এখন তাই জয়ের থেকে আত্মবিশ্বাসের আকর চিনতে পারে না, ক্ষয়ে যাওয়া অস্তিত্ব জুড়ে কেবল টের পায় পরাজয়ের ভয় আর ঠকে যাওয়ার গ্লানি। এতো যুদ্ধ জিতে গিয়েও তাই জয় অর্থহীন। তাই নিজের সাথে একলা হতে চাওয়া; নিজের মধ্যে নিজের খোঁজ। অবশেষে খোঁজ মিলল চানঘরে।

*

দিনান্তের স্নানটুকু মানসীকে যেন ফিরিয়ে দেয় তার অকৃত্রিম অবয়ব। স্নান শেষে খুঁটিয়ে দেখে সে নিজেকে আয়নাতে। প্রতিবিম্বে সন্তুষ্ট হলে তবে দিনের গ্লানি কাটে। ঘনিয়ে আসে স্বপ্নময় ঘুম। নতুন প্রত্যয়ে জাগে প্রতিদিন, উদ্যমে বাঁচে। 

দিনশেষের চান তাই তার জীবনে নিতান্ত আবশ্যিক হয়ে ওঠে। এদিকে সারা দিনের ক্লান্তি নিয়ে ঘন্টাটাক সময় ঠায় দাঁড়িয়ে চানঘরে কাটানো কষ্টকর হয়ে উঠতে থাকে মানসীর। তাই অতি প্রয়োজনীয় স্নানটুকুকে আরামের করে নিতে বাথরুমে পেতে ফেলে বাথটব, তার পাশে দেওয়াল জুড়ে টাঙায় আয়না। 

রাতের খাওয়া মিটলে, বাকি সাংসারিক চাহিদাগুলো একে একে ঘুমোতে যায়। বাড়ির সব আলো নিভিয়ে, সব সম্পর্কের থেকে ছুটি নিয়ে শোবার ঘরের লাগোয়া চানঘরে বাথটবের জলে নিজেকে নিরাবরণ মেলে ধরে মানসী। শাওয়ার থেকে ছড়িয়ে পড়া জলের আদর শরীর জুড়ে আরাম দেয়। আনাচে-কানাচে, অজানা খাঁজে। ধুয়ে যায় সারাদিনের নানা পোষাক থেকে জমা ধূলো, ময়লা, নোংরা, সংক্রামিত জীবাণু।

স্নানের সুবাদেই মানসী টের পায় সামাজিক যাপণ কী বিরাট নাটক। সারাক্ষণই সেখানে অঙ্কের পর অঙ্কে, অগ্রন্থিত সংলাপে, স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় চলে। 

অভিনেতা অনেক, চরিত্র অনেক। নাটকের নিজস্ব নিয়মে একাধিক অভিনেতা একই সময়ে এবং আলাদা আলাদা সময়েও, আলাদা আলাদা মঞ্চে নাটকের খাতিরে একই চরিত্রে অভিনয় করে। নাটকের খাতিরে চরিত্রচয়ন, চরিত্রায়ন সবই বাধ্যতামূলক এবং বাধ্যতামূলকভাবেই স্বতঃস্ফূর্ত। ফলে একই পোষাক ঘুরে ফিরে পরে অনেকেই। আর ছড়িয়ে যায় ত্বক থেকে ত্বকে নানা অসুখের বীজানু।

রোজ রাতে স্নান সেরে জল জল গায়ে একটা নরম জামা পরে ঘুমিয়ে পরে সে। বাথটব থেকে বিছানায় চারিয়ে যায় জীবনদায়ী স্বপ্নগুলো।

কোনো কোনো দিন জলে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজলেই মানসী একটা বনে পৌঁছে যায়। সেখানে সব গাছে উজ্জ্বল সবুজ পাতা। পাতার ফাঁক দিয়ে বলয়ের ধারা বানিয়ে নেমে আসছে সূর্যের আলো। গাছের ভিড় চিড়ে কুলকুলিয়ে বয়ে চলেছে এক সরু অগভীর নদী । তার বুকের মধ্য, দুধারেও জমে উঠেছে মসৃণ নুড়ির রং বাহার। থেকে থেকে আলো পড়ে ঝলসে ওঠে নুড়িতে হোঁচট খেয়ে ঠিকরে ওঠা জল। পাখির ডাকে ডাকে মুখর সেই বনটাকে নিয়ে মানসী বাথটব থেকে পৌঁছয় বিছানায়। অস্তিত্বময় ছেয়ে থাকে কৈশোর। সে নদীর থেকে ভেসে আসে ঘুম পাড়ানি,

জল জল জল, ছলছলিয়ে চল

রঙিন নুড়ি ধুয়ে, শ্যাওলার বীজ রুয়ে

জল সোহাগে চুর, মাতাল উছল সুর

ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা হিম, ডাইনোসরের ডিম

ডাইনোকথা যাক, জলের আদর থাক

জল জল জল, তোর সাথে যাই চল।

*

কৈশোর মানে যৌবনের স্বপ্ন দেখা। যৌবন মানে স্বপ্ন ভাঙার শুরু। কিন্তু নিজের জীবনে কৈশোর যৌবনের সহবাসে মানসী সব মঞ্চে সেরা অভিনেত্রী হয়ে গেল আবার। তার বার বছরের ছেলে খ তো বলেই ফেলল, মা যেন আমার ক্লাসমেট। 

বর সুতীর্থ একদিন জিজ্ঞেস করল, তুমি কী নতুন কোনো রিলেশনশিপ... 

আগে হলে মানসী বিশ্রীভাবে খেঁকিয়ে উঠত, আমাতে পোষাচ্ছে না, ডিভোর্স চাই, সোজা বলতে পার না? মেনিমুখো মিন্‌সে! 

কিন্তু এখন সে নতুন মানুষ। তাই রহস্য করে বলল, হয়তো। 

তারপর সুতীর্থর গাল টিপে আলতো চুমু দিল চিবুকে। দুজনের মধ্যে জমা পুরোন বরফ গলে গেল, অন্তত কিছু দিনের জন্য। শাশুড়ি ভাবলেন তাঁর সব দুর্ব্যবহার মানসী মাফ করে দিয়েছে বুঝি। মা ভাবলেন, মানসীর সব অভি্যোগ মুছে গেছে আপিসে তার লাগাতার উন্নতিতে। 

আপিসে সে উদাহরণ হয়ে গেল বয়সের সাথে সাথে উদ্যমকে ধরে রাখার জন্য। এমনকি তাকে তো এইচ-আর বলেই ফেলল মাসে একদিন করে মোটিভেশনাল ট্রেনিং করাতে। 

মানসী ভাবছে তার অবিরাম সাফল্যের কৌশল নিয়ে একটা বই লিখবে। অবশ্যই মুখোশের আড়াল থেকে, বিভিন্ন পোষাকে, কিন্তু একেবারেই কেউ টের পাবে না মুখোশ আছে বা লেখার সময় সে কোন পোষাকে ছিল।

খয়ের গরমের ছুটি মে মাসে। তখন দিন দশেকের ছুটি নিয়ে কোথাও বেড়াতে যেতে চায় সুতীর্থ। মানসীর আর খ দুজনেই সমুদ্রের ধারে যেতে চাইল। সুতীর্থর ইচ্ছে ঠাণ্ডা কোথাও যাওয়ার। তখন দক্ষিণ গোলার্ধে শীতকাল, তাই মরিশাস গেল ওরা। 

সেখানে সমুদ্র উত্তাল নয়। লেগুন বন্দী শান্ত, স্বচ্ছ জল, নীল থেকে সবুজ, ঘন কিংবা হালকা। লেগুনের গভীরের প্রবাল রাজ্যে হেঁটে, প্যারাগ্লাইডিং করে আকাশ থেকে পাখির চোখে লেগুন আর দ্বীপ দেখে, মরা আগ্নেয়য়গিরি আর তার জ্বালামুখ জোড়া হ্রদ কিংবা পাইন বন দেখে, সাত রঙা জমি, লেগুনের সীমা আর আনারস ক্ষেত দেখে বেশ কেটে গেল ছুটি। তার মধ্যে একরাতে স্বপ্ন এলো। 

মানসী লেগুনের জলে ভাসতে ভাসতে ক্রমশ দিগন্তের দিকে যাচ্ছিল সমুদ্রের কাছে। তীরে বসেছিল খ আর সুতীর্থ। মানসী যখন প্রায় মিলিয়ে যাচ্ছিল দৃষ্টিসীমার বাইরে, তখন খ চীৎকার করে উঠল, ফিরে এসো মা। মা-আ, মা-আ। যদি তুমিও ফেলে রেখে যাবে তো কুড়িয়ে আনলে কেন আমাকে?

ঘুম ভেঙে গেলো মানসীর। সিধে চলে গেল স্নানে। বেড়াবার ঝোঁকে সে ভুলেই গিয়েছিল স্বামী-পুত্রের সাথে একান্ত অবকাশ কাটানোর সময়েও সামাজিক নাটক চলতে থাকে, মুখোশ পরতে হয়। তার ওপর তার আর খয়ের মধ্যে ছেয়ে আছে সীমাহীন মিথ্যে। সে মিথ্যের বোঝা তাকে বইতে হবে আরও ছবছর, খয়ের আঠার বছর বয়স পূর্ণ হওয়া অবধি। খয়ের মা খকে ফেলে রেখে গিয়েছিল হাসপাতালে। 

নিঃসন্তান মানসী ঠিক করেছিল সদ্যজাত কোনো বাচ্চাকে আপন করে নেবে। সুতীর্থর সম্মতি ছিল না। সচরাচর মানসীর কোনো সিদ্ধান্তেই তার সমর্থন থাকত না সে সময়ে। যদিও পরস্পরের ব্যক্তিত্বের টানেই তারা দুজনে বিয়ে করেছিল এবং অবশ্যই মানসী সন্তানও চেয়েছিল সুতীর্থর থেকে, তবুও বিয়ের পর থেকেই সুতীর্থ মানসীকে শুধুই অবিমৃশ্যকারী বলতে শুরু করে, মানসীর পরিবারের প্রতি সাংঘাতিক অশ্রদ্ধা দেখাতে শুরু করে, আর মানসীর সাথে সম্পর্কটা ক্রমশঃ সংক্ষিপ্ত করে ফেলে। 

আসলে সুতীর্থর জীবনে যেকোনো নতুন ঘটনা, সম্পর্ক বা জিনিস খুব জলদি পুরোন হয়ে যায়। আর সব কিছু নতুন করে নেওয়ার ব্যবস্থা জানলেও, সম্পর্ককে নতুন করে নিতে হয় কী করে তা সুতীর্থ জানে না। 

এদিকে বিয়ে করা সত্ত্বেও নতুন সম্পর্কের হাতছানি সে এড়াতে পারছিল না। আবার মুখে চুনকালি পড়ার ভয়ে মানসীকে ছেড়ে যেতেও পারছিল না, কিংবা মানসী তাকে ছেড়ে যেতে পারে এমন কিছুও করে উঠতে পারছিল না। বিয়ের পাঁচ বছর পর দুজনে একবাড়িতেই থাকত এক অভূতপূর্ব অযৌন দাম্পত্যের উদাহরণ হয়ে। 

খকে বাড়ি নিয়ে এসে মানসী সুতীর্থকে তালাকনামা ধরিয়েছিল। কিন্তু সুতীর্থ বিয়েটা ভাঙে নি। আসলে সে নিজে কিছু গড়ে না, কিছু ভাঙার জোরও তার নেই। সে শুধু ঝুরঝুরে ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের মরা শরীরে নতুন রঙ লাগিয়ে ঝকঝকে করে রাখতে জানে, তাতে পৃথিবীর কৌতুহল এবং গায়ে পড়া সহানুভূতি, সাহায্য থেকে বাঁচা যায়। 

আপসের দুর্দান্ত দক্ষতায় বারবছরে সে খয়ের বাবা হয়ে উঠেছে। হয়তো ছবছর পরেও খয়ের থেকে সত্যি কথাটা চেপে গেলেই সে আরাম পাবে বেশি। হয়তো সুতীর্থর ভয় আছে যে সমাজে তার দুর্নাম হয়ে যাবে, তার পিতৃত্বের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ জাগবে, তার পালিত পুত্র তাকে ত্যাগ করলে। 

ঠিকই, অযোগ্য লোকেরই যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ হয় অন্যের যোগ্যতা নিয়ে, নিজের যোগ্যতার মূল্যায়ণ নিয়ে। তাছাড়া সে কোনো দিনই কোনো সম্পর্কের দায় নেয় নি, সুখটুকু, সুবিধেটুকু নিয়েছে শুধু। তাই মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের প্রতি তার বিশ্বাস নেই। মানসীর আছে। সে জানে খ তার আপন সন্তান, যা কেউ দেয় নি, একান্তই তার। গর্ভে ধারণ না করেও সে যখন খয়ের মাতৃত্বের সুখ এবং দায়িত্ব নিয়েছে, তখন সত্যের অজুহাতে তাদের মা-ছেলের সম্পর্কে কোনো দিনই চিড় ধরবে না। 

কিন্তু এসব বিতণ্ডা আসতই না যদি মানসী তার নিজের বাথটব, আয়না এসবের সাথে রাতের খানিকটা কাটাতে পারত। মন জুড়ে তখন অন্য এক খোঁজ,

জল, জল, জল, কোথায় গেলি তুই?

তো্র গহীনে দু দণ্ড পা ডুবিয়ে রই।

*

বাড়ি ফিরে এসেও স্বপ্নটা বিভীষিকা হয়ে হানা দিতে লাগল মানসীর একলা অবসরে। বেড়ানোর ছুটিটা একটু বাড়িয়ে নিয়েছিল সে বইটা লিখতে শুরু করবে বলে। 

মরিশাস থেকে ফিরে রোজই সে বই লেখার জন্য ট্যাবলেট নিয়ে বসে সকাল সকাল। কিন্তু একটা শব্দও লিখে উঠতে পারেনা। কেবল হাত নিশপিশ করে উঁকি মারে বাপ-ব্যাটার সোশাল নেটওয়ার্কিং পেজে। 

বাপেরটায় মাস ছয়েকের পুরোনো খবর। ছেলেরটায় ভূতপ্রেত গেমসের রিকোয়েস্ট। নিজেরটায় গায়ে পড়া লোকজনের কথোপকথন, তোর দিশি বাথরুমটা নাকি বিলিতি করে ফেলেছিস? 

মনে মনে বলে, শালা, কুড়ি বছরে আমার বদলের খবর রাখে না, আমার বাথরুমের খবর রাখে! 

জবাবে একটা সাদামাঠা হাসিমুখ ইমোট আইকন পাঠায়।

কিন্তু এতো গোয়েন্দাগিরিতেও এমন কাউকে পাওয়া গেল না যে সুতীর্থকে নতুন করে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়। এমন কোনো আশঙ্কাই কোথাও ঘনায় নি যে খ টের পেয়ে যাবে মানসী কে, সে কে, মানসী বলার আগেই। 

তারপর দু-পাঁচটা শব্দ নেড়ে চেড়ে কয়েকটা লাইন খাড়া হলেও সেগুলো বই হয়ে উঠতে অনেক দেরি বোঝা যায়। অমনি হাই উঠতে শুরু করে, দুপুর হওয়ার অনেক আগেই। টিভি, মুভি কালেকশন এসব নিয়ে বসলেও মন গিয়ে পড়ে বইয়ের ওপর। কিন্তু লিখতে গেলে শব্দগুলো ঠিকঠাক গোছানো যায় না। 

মানসী বাড়িতে থাকায় খয়ের আব্দার কিছু বেড়েছে। অবশ্য ছেলেটা বাড়ের মুখে। ভালো-মন্দ খাবারে লোভ তো কিছু থাকবেই এখন। ছেলের ফিরিস্তি মতো জলখাবার বানাতে লেগে পড়ে মানসী দুপুর একটু ঘন হলেই। সুতীর্থ ফোন করে এরকম সময়ে। মানসী রান্না করছে শুনে সেও তার নিজের ফরমাশ জানায়। মন গুনগুনিয়ে ওঠে,

বহু দূরে দূরে

অচেনা শহরে শহরে

ঘুরে ফিরে এসে তবু

বোর লাগে চেনা রান্নাঘরে

ঘোর কেটে যায় একা স্নানঘরে।

ব্যস অমনি হাতের কাজটুকু কোনো রকমে সেরে দৌড় চানঘরে। বাথটবে ডুব। স্বপ্নের খোঁজে তন্ন তন্ন করে স্মৃতি ঘাঁটতে থাকা। তারপর বইয়ের শব্দগুলো জমাট বাধে। আর মানসী শান্তভাবে জল থেকে উঠে পড়ে। ঝটপট জামা কাপড় পরে নিয়ে বসে পড়ে লিখতে। 

তারপর কে এলো, কে যে গেলো সে বিষয়ে খুব হুঁশ থাকে না। বইয়ের ঘোরেই ইস্কুল ফেরত খকে খেতে দেয়। তার জিনিসপত্র জায়গায় ঘুছিয়ে রাখতে বলে, খিটখিট করে না। সুতীর্থকে চা বানিয়ে দেয়; শাশুড়ি মাকে রাতের ওষুধ দেয়; নিঃশব্দে। তারপর মাঝরাত পার করে বই লেখা চলতে থাকে। কিন্তু ঘুমোতে যাওয়ার আগে স্নানঘর বাধা।

ফলে স্বপ্নে প্রজাপতি, গুবড়ে পোকা, গুপি-বাঘা, ঘ্যাঁঘাসুর, দ্রিঘাংচু, বারান্দার উল্টোদিকের রুদ্র পলাশ গাছে লক্ষী পেঁচার আনাগোনা লেগে থাকে। কিংবা মায়ের সাথে ঝগড়া হলে, স্বপ্নে মা রেল লাইনে বসিয়ে ভাত খেতে দেন এমনটাও দেখে সে। কখনও কখনো ভাইয়ের সাথে ঘুড়ি ওড়ায় ছাদে। আর আকাশটা ভরে মোজেক তৈরি হয় নানা রঙের নানা চেহারার ঘুড়ির।

*

বইয়ের খসড়াটা ছুটির মধ্যে হয়ে গেলো। তারপর আপিস চালু হয়ে গেলো। রাজনীতি, মুখোশ জাগলিং, পোষাক নিয়ে টানাটানি-ও শুরু হয়ে গেলো। ফলে বাড়ি ফিরে বইটার গায়ে নতুন নতুন রঙের প্রলেপ পড়তে লাগল। প্রাথমিক খসড়া প্রায় পুরোটাই বদলে একটা নতুন বই তৈরি হয়ে চলল রোজ।

যথারীতি আপিস-সংসার-বই তিনের টানে ঘোরের মধ্যে চলতে লাগল যাবতীয় আবশ্যিক নিত্যকর্ম। রুটিন থেকে হারিয়ে গেলো গেমস, সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং। খ কিংবা সুতীর্থকে নিয়ে আশঙ্কারা নানা খাঁজেখোঁজে, ফাঁকে-ফোকরে লুকিয়ে পড়ল। অবস্থাটা চলল একটা পাবলিশার জুটিয়ে লেখাটা তাদের আপিসে জমা পড়া অবধি।

তারপর আবার একরাতে খাটের ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙে স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল মানসীর। সুতীর্থ মাস্টারবেশানে ব্যস্ত। সতের-আঠার বছর আগে এরকম কোনো কোনো রাতে মানসী সুতীর্থর সাথে মিলিত হতে চাইত। সুতীর্থ মানসীর অস্তিত্বকেই অস্বীকার করত; মাস্টারবেশানে বাধা পেয়ে বিরক্ত হতো, ঠেলে সরিয়ে দিত দূরে। আবার কোনো কোনো রাতে মানসীকে প্রত্যাখ্যান করার আধঘন্টাটাক পরেই শুরু হতো সুতীর্থর লীলা। অন্য অনেক সময়ে আবেগ ঘন ঘনিষ্ঠতায় মানসী প্রশ্ন করেছে, স্বমেহনে তুমি কার কথা ভাব সখা? 

মিষ্টি হেসে সুতীর্থ এড়িয়ে গেছে প্রশ্নটা। এই জীবনে মানসী কাটিয়ে দিল আঠার বছর!

পরের দিন সারাক্ষণ মেজাজ খারাপ থাকবে তার, যদিও সে বিছানা ছেড়ে বারান্দায় চলে গেলো। আবার চানেও সমাধান নেই। সমাধান নেই এই ধাঁধার। তাকে যদি চাইই না যৌনতায় তবে তার সঙ্গের কিছুকালের যৌন সম্পর্কটা কেন সামাজিক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল সুতীর্থ? কেন সেই সম্পর্ক সে টিকিয়ে রাখল এতোকাল? তাকেও বিয়েটা ভাঙতে দিল না কেন?

পায়ে পায়ে খয়ের ঘরে এসে মানসী দেখল ছেলেটা ডাইরির ওপর উপুড় হয়ে ঘুমোচ্ছে। কারো ডাইরি না দেখার নীতি মেনে কোনোদিনই মানসী সুতীর্থর ডাইরিও দেখেনি, খয়েরটাও দেখেনি। খুব ইতস্তত করে খয়ের ডাইরিটা তাকে রাখার জন্য তুলে নিল মানসী। খোলা পাতাটায় লেখা আছে, ডাইরি লিখি ঠাঠাম মানে মিসেস রত্না রায় পড়বেন বলে। 

হাসি খেলে গেল মানসীর ঠোঁটে। নাতি আর ঠানদির টিপিক্যাল খুনসুটি দেখে। তারপর লেখা, হাহা। 

আরও মজা লাগল মানসীর। মনটা হালকা হয়ে গেল বলে সে ডাইরিটা নিয়ে সোফায় শুয়ে পড়ল। প্রথম পাতায় লেখা, আঠার বছর বয়স হলে এই খাতাটা মাকে দিয়ে দেব। 

মনে মনে মানসী ভাবল, কেন রে? 

পরের পাতায় লেখা, আমি জানি আঠার বছর বয়সে মা আমাকে কিছু দেবে। আমি তো সাবালক হয়ে যাব, আমারও মাকে কিছু দেওয়া উচিৎ। তাই আমি এই খাতাটাই দেব মাকে। মা জানতে পারবে আমি মায়ের পাশে আছি। হয়তো তখনই মাকে বলতে পারব না যে তুমি আর অফিসে যেও না, কিন্তু ইচ্ছে হলে মা আমার সাথে সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিতে পারে। আসলে মায়ের কথা কেউ শোনে না, অথচ মা সবার কথা শোনে। 

এইবারে খুব হাসি পেল মানসীর, সে যে নিজেও তার মা সম্পর্কে এমনটাই ভাবত!

একটা পাতায় লেখা, আজ খুব দুঃখ হলো। স্কুল থেকে স্কেচ করতে নিয়ে গিয়েছিল বিদ্যাসাগর সেতুর নীচে। দেখলাম অনু আন্টি বাবাকে খুব মারছে, আর লায়ার, কাওয়ার্ড এসব বলে চেঁচাচ্ছে। বাবা খানিক্ষণ হাসল, তারপর খুব ভেঙচি কাটল অনু আন্টিকে। দুজনেই আমাকে দেখল কিন্তু চিনতে পারল না। বাড়িতে ফিরে বাবা আমাকে রোজকার মতই মাথায় বিলি কেটে দিল যখন পড়ছিলাম। বাবা কী বাড়ির বাইরে আমায় চিনতে পারে না? জিজ্ঞেস করে দেখব? 

মানসীর মনে অস্বস্তিগুলো ফিরে এলো। কয়েকপাতা পরে অনু আন্টি লেখায় চোখ আটকে গেল। পাতাটা খুঁটিয়ে পড়তে লাগল মানসী, অনু আন্টির বিয়েতে দারুন সানডি করেছিল। বাবা চারটে খেয়েছে, আমি দুটো। অনু আন্টি যখন জানতে চাইল ভালো করে খেয়েছি কিনা, আমি বললাম সানডির কথাটা, আন্টি কেমন রেগে গেল, আমি আর জিজ্ঞেসই করতে পারলাম না বাবা তাকে কি মিথ্যে বলেছে, বাবা কেন ভীতু। বিয়ে বাড়িতে বাবার অন্য বন্ধু শ্রীরাধা আন্টিও এসেছিল। আমি ওকে একদম দেখতে পারি না। ও একদিন আমাদের বাড়িতে এসে আমাকে ঘরে বন্ধ করে দিয়েছিল। মা ছিল না, ঠাঠামকে নিয়ে ঠাঠামের বোনপোর বিয়েতে গিয়েছিল। ফলে সারা দিন আমি ঘরে বসে একলা কেঁদেছি। 

কেঁদে ফেলল মানসী। ছেলেটা অভাগা বলেই কী এতো সহ্য করতে হলো ওকে? তারপরই মনে হলো অভাগা কেন হবে। দিব্যি তো মা পেয়েছে, বাপও পেয়েছে, ঠাকুমা পেয়েছে। 

এরপর কয়েক পাতা জোড়া লেখা, আজ আমি বুঝেছি ঠাঠাম, না মিসেস রত্না রায় কেন আমাকে দেখলেই কুহু, কুহু করে ডাকেন। আমার মা নাকি কাকের মতো কর্কশ, ষাঁড়ের মতো তেজী, তাই এজন্মে বাবা মাকে সন্তান দেয় নি। আমি আজও বুঝি না কেন কীভাবে পুরুষ নারীকে সন্তান দেয়। শুধু বুঝি এটা একটা প্রাকৃতিক ঘটনা, যেমন লেখা আছে নেচার স্টাডি বইতে। তাতেই খেয়াল করলাম ছোটবেলায় পড়া কাক কোকিলের সম্পর্কটা। আশ্চর্‍্য! মা তেজী বলেই কী রত্না রায় মায়ের সামনে আমাকে কোকিলছানা বলে ডাকেন না কখনও? ডাকতে সাহস করেন না। মায়ের সামনে কখনো বলেন না যে মা নাকি জলের মতো হলেই রত্না রায়কে কোকিলছানার সাথে একছাদের তলায় থাকতে হতো না, তাঁর আপন নাতি আসত চাঁদপানা ফুটফুটে।”

উঠে বসে পড়ে মানসী, “মা তেজী বলেই আমি আজ মায়ের ছেলে। মা তেজী বলেই আমার পড়াশোনা হচ্ছে, না হলে হয়তো কোনো বস্তিতে বোমা বাঁধতাম! কিন্তু রত্না রায় যা জানেন না তা হলো আমি কোকিলছানা নই, কোকিলছানা উড়তে শিখলেই কাকের বাসা ছেড়ে পালায়, কিন্তু আমি কখনও মাকে ছেড়ে যাব না। সাধ্য হলেই সুতীর্থ রায়, রত্না রায়কে এই বাড়িতে ফেলে রেখে মাকে নিয়ে চলে যাব। আমাদের দরজা কোনোদিন ওদের জন্য খোলা থাকবে না। সে অবধি রত্না রায়কে ঠাঠাম বলেই ডাকব সামনে, সুতীর্থ রায়কে বাবা। রত্না রায় কারো ডাইরি ছাড়েন না। আমারটাও পড়বেন। অথচ সব জেনে আমাকে সহ্য করতে বাধ্য হবেন। সুতীর্থ রায়কে যদি জানান, তাহলে তাঁরও একই হাল হবে। আমার মুখোশ খুলতে গেলে যে ওঁদের নিজেরটাও খুলতে হবে .........। 

একসাথে দুঃখ, আনন্দ, কান্না চেপে ধরছে মানসীকে। ডাইরিটা যেমন ছিল তেমনই রেখে দিল খয়ের মাথার কাছে। তারপর আবার বাথরুমে ঢুকে পড়ল, বাথটবে জল ভরে এলিয়ে দিল শরীর। স্বপ্নে দেখল, হাত, পা, মুখ ঘষে ঘষে মুখোশের আঠা, ময়লা, ছাঁচের দাগ সব তুলতে তুলতে তার হাত দুটো যেন জলের হয়ে গেছে। 

মুখ থেকে চোঁয়ানো জলের ফোঁটা হাতের চামড়ার স্বচ্ছ সমুদ্রে মিশে যাচ্ছে। আয়নার দিকে ফিরে দেখে মুখখানাও এপাড় ওপাড় দেখা যাচ্ছে, আয়না-দেয়াল-মুখের ছায়ার ওপর ছায়ায় তৈরি হওয়া অসংখ্য প্রতিবিম্বের ঝাপসা কোলাজ ভেদ করেও! মন্ত্রের মত বাজছে,

জল, জল, জল, একলা আমার সই

ইচ্ছে করে আমি যেন তোরই মতো হই।



~~~~~

Written in 2011,

Published in October 2012 at

https://www.parabaas.com/article.php?id=4474

Wednesday, March 23, 2016

অতিরিক্ত যৌনতার দাবিতে

সংকটোন্মচন
     এমসিপি! মনের ভেতর এই শব্দটাই বাজল লেখিকার। মুখে বললেন, আজ তাহলে আসি। উল্টোদিকের বেঞ্চে মুখোমুখি বসা সম্পাদক বললেন, বেশ, তাহলে মনে রাখবেন যে লেখাটাতে আরও যৌনতা আনতে হবে। লেখিকা উঠে পড়েছিলেন বেঞ্চ থেকে। এবার লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে গেলেন রাস্তা ধরে। ভাবছিলেন, লোকটা জানে না যে এইভাবে গল্পে আরও যৌনতা আনুন বললে যৌন হেনস্থা করা হয়? আপিসে কাজ করে, আর জানে না? ব্যাটা, ঠিক জানে। কোনটা বলবে, কখন বলবে, কখন কোন দলের হয়ে বলবে, পীড়িতের হয়ে বলবে নাকি পীড়ককে পীড়িত বানাবে সব ছকা আছে শয়তানটার। সেই জন্যই তো আপিসের ভেতর ধানাই-পানাই করে বাইরে বেরিয়ে এসে চায়ের দোকানে বলল যাতে কোনো কেস না ঠোকা যায়। যাতে হজম করে নিতে হয় পথচলতি আর পাঁচটা যৌন আক্রমণের মতো। ...... আবার এ লোকটার এসব কেচ্ছা লোককে জানাতে গেলেও এ ব্যাটাকেই চাই। কী জ্বালাতন! যাবতীয় বিরক্তি, গা রি-রি আর গা গুলোনো চেপে যেতে হবে .... মেল সভিনিস্টিক পিগ
     মন ঠান্ডা হতে তিনি ঠাহর করলেন যে আপিসপাড়ার ফেরিঘাট ছাড়িয়ে উত্তরে চলে এসেছেন বেশ খানিকটা। তাই আর দ্বিধা না করে আরো উত্তর-পুবে চললেন। বইপাড়ায় এগলি ওগলি তস্য গলি খুঁজে বার করলেন বাংলা হরফে ছাপা বাৎসায়ানের কামসূত্র। বইটাতে কোনো ব্যাখ্যা নেই। কিন্তু সংস্কৃত শ্লোকের অন্বয় বিশ্লেষণ করে দেওয়া আছে। লেখিকা যারপরনাই খুশি হলেন। অন্যের চেবানো তত্ত্ব বা তথ্য গিলতে হবে না দেখে। ফলে প্রায় হাওয়ায় উড়তে উড়তে পৌঁছে গেলেন কাছাকাছি ফেরিঘাটে।
     কিন্তু হাওড়া যাওয়ার লঞ্চটা লেখিকার সামনের দিয়ে চলে গেল। পরের লঞ্চের অপেক্ষায় তিনি জেটিতে বসে পড়লেন। হ্যালোজেন আলোয় বইটা পড়তে শুরু করলেন। মাঝে মাঝে একটা-আধটা সন্দেহ কাঁটা দিচ্ছিল যে সব শ্লোকের মানে ঠিকঠাক বুঝছেন কিনা। ভরসা করা যায় এমন নৈর্ব্যক্তিক পণ্ডিত ব্যাক্তিত্বের উপস্থিতির অভাব টের পাচ্ছিলেন তীব্রভাবেতবুও কয়েক ভাঁড় চা, কয়েক ঠোঙা ঘটি-গরম, খেয়ে ফেললেন। তাঁর চারপাশে প্রচুর ভিড় জমল, আবার খালিও হয়ে গেল। ঝোলার মধ্যেকার ফোনটা কাঁপতে তাঁর হুঁশ হলো। ফোনটা বার করে দেখলেন কাকিমার ফোন। সময় দেখে টের পেলেন যে বাড়ি ফেরার সময় পেরিয়ে গেছে ঘন্টা দুয়েক আগেই।
লেখিকার মা-বাবা ও কাকা গত হওয়ার পর থেকে কাকিমা তাঁর সঙ্গেই থাকেনলেখিকার সহোদর ও তাঁর পরিবার চেয়েছিলেন যে লেখিকা ও কাকিমা তাঁদের সাথেই থাকুন। কিন্তু লেখিকার মনে হয়েছিল যে ওঁদের সাথে থাকলে তাঁর নিভৃতি ভাঙবে, ফলে তিনি অস্থির হয়ে পড়বেন ওঁদের থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্য এবং সুসম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে। তিনি একলাই ছিলেন পিতামহের ভিটেতে তাঁর পৈতৃক অংশে। কাকা গত হতে নিঃসন্তান কাকিমা তাঁর সাথে থাকতে চেয়েছিলেন যখন, তখন তিনি বাধা দেননি। শর্ত দিয়েছিলেন যে কাকিমাকেও রাঁধুনির হাতে খেতে হবে
     কাকিমার সাথে কথা বলে লেখিকা ফোন আর বই দুইই ঝোলাস্থ করলেন। তারপর আরেক ভাঁড় চা খেতে খেতে উতলা হয়ে পড়লেন হাওড়াগামী পরের লঞ্চের জন্য। জেটিটা প্রায় ফাঁকা। যে কটা লোক রয়েছে তাদের আবার লেখিকাকে দেখে ধর্ষণ পেলেই হয়েছে। গঙ্গায় ঝাঁপ দেওয়া যায়। কিন্তু গঙ্গার ঢেউ ভাঙা জলে চোখ রেখে বুঝলেন যে ওই জলে ঝাঁপাতে হলে ঘেন্না কাটিয়ে উঠতে হবে। এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই কাঙ্খিত লঞ্চ এসে গেল। ঘন্টাটাক পরে নিজের বাড়িতে পৌঁছে স্নান খাওয়া সেরে লেখিকা পরম উৎসাহে বাৎসায়নের কামসূত্র পড়তে লাগলেন।
     বইটা রাতারাতি শেষ করে তিনি বুঝতে পারলেন না যে কেন অন্তত চারদিন অন্তর পুরুষ মানুষের দাড়ি কামানো উচিৎ, কেনই বা দাড়ি কামাবার কথা থাকলেও দাঁত মাজার কথা কিছুই বলা হয় নি যেখানে কাম চরিতার্থ করার জন্য মুখগহ্বরের বিষদ ব্যবহারের আলোচনা আছে। এইসব দ্বন্দ ফিরে ফিরে এলো সারাদিন কলম ঠেলা, ফাইল ঘাঁটার ফাঁকে নানান বিরোধ, ঝগড়া নিষ্পত্তির ফাঁকে ভেবে চললেন কী করে একটা ফিল্ডট্যুর করা যায় যাতে হাতেগরম অভিজ্ঞতা লেখার ছত্রে ছত্রে থইথই করতে থাকে। মাঝে মাঝে টেলিফোনে নম্বর দেখতে লাগলেন যদি তাঁর এই প্রেমিক, সেই প্রেমিক, ঐ প্রেমিকদের কারুর সাথে পরামর্শ করা যায়। ফোন করতে পারলেন না কিছুতেই। এঁদের প্রবল ভয় যে লেখিকা বেফাঁস লিখতে পারেন তাঁদের প্রত্যেকের এক্সট্রাম্যারিটাল কেচ্ছা কারণ লেখিকার নাকি কোনো ইনহিবিসন নেই। তিনি বিয়ের গোলামী করেন না। আর তাই নাকি তিনি অকাতরে নিজের এবং বিবাহিত প্রেমিকদের প্রেমচর্চার তোড়ে ভেঙে দিতে পারেন প্রেমিকদের নিজের নিজের সুখনীড়ফলে লেখিকা ভয় পাচ্ছেন যে যৌনতা নিয়ে এঁদের সাথে আলোচনা করে কিছু লিখলে, তা প্রকাশ পেলে এসব প্রেম তাঁর কেটেও যেতে পারে; তেমন হলে প্রান্তযৌবনে তিনি নতুন করে প্রেমিকই বা পাবেন কোথায়, বিশেষত যাদের কাঁধে মাথা দু দমক দীর্ঘশ্বাস ফেলা যায়, কিন্তু তাদের জন্য ঘুম থেকে উঠেই ভাত রাঁধতে হয় না তবে সমস্ত আবেগের অত্যাচার টপকে, দিনশেষে মাথায় তেইশ ওয়াট সিফিএল জ্বালিয়ে একখানা দারুণ ফিল্ডওয়ার্কের প্ল্যানও বানিয়ে ফেললেন।

ফিল্ডট্যুরস্‌
     শনিবার অন্ধকার থাকতে বেরিয়ে পড়লেন। যদিও কাকিমা জানলেন যে তিনি আপিসের কাজে মফস্বলে যাচ্ছেন আসলে তিনি পৌঁছলেন মন্দারমণি। বিচের ওপর একটা হোটেলের উঠলেন যেখানে সব কটা ঘর আর তার লাগোয়া বারান্দা মিলিয়ে আলাদা আলাদা কটেজ। স্নান-খাওয়া মিটিয়ে টেনে ঘুম লাগালেন সন্ধে অব্দি। সন্ধে নাগাদ জমিয়ে চা-পকৌড়া খেলেন হোটেলের লাগোয়া খড় ছাওয়া বিনা দেওয়ালের রেস্তোরাঁতে। মিস মার্পলের মতো উল বুনতে বুনতে ঘন্টা তিনেকের পর্যবেক্ষণে জেনে গেলেন যে কোন কোন ঘরে জোড়া জোড়া লোকজন আছে; আর সেই সব ঘরের কোনগুলোর বারান্দায় একেবারেই আলো পৌঁছয় না
     রাত নিশুতি হতে কান পাতলেন একশ বিরাশি নম্বরে। সেখানে শুধুই নিশ্বাসের শব্দ। একশ পঁচাশিতে টিভি চলছে। দুজনেই হেসে খুন। লেখিকা ভাবলেন যে ফিরে আসা যাবে পরে। একশ নব্বইতে একজন আরেকজনের চুল বেঁধে দিচ্ছিল। এই ঘরের লাগোয়া বারান্দায় লেখিকা জাঁকিয়ে বসলেন। ঘরের আলো নিভে যেতে লেখিকা চোখ বন্ধ করলেন যাতে কান বেশি সজাগ হয়। দুজনের কথার আওয়াজ মিলিয়ে গিয়ে নিশ্বাসের ওঠাপড়ার এলোমেলো ছন্দ যখন কিছুক্ষণ স্থায়ী তখন চোখ মেলে লেখিকা দেখলেন যে খাটের ওপর পদ্মাসনে বা বাবু হয়ে দুজনেই বসে জোড় হাতে প্রার্থনার ভঙ্গীতে। খানিকক্ষণ সেই জোড়া প্রার্থীর দিকে তাকিয়ে লেখিকা টের পেলেন যে তাঁর পিঠ বেয়ে কিছু একটা উঠছে মাথার দিকে। অতএব পর্যবেক্ষণে ইতি টেনে নিঃশব্দে ঝটকা  দিয়ে গায়ের কালো চাদর খুলে ফেললেন। তারপর হালকা পায়ে ছুটে নিজের ঘরের সামনে পৌঁছে বারান্দার নিচে দাঁড়িয়ে চাদরটাকে উথাল পাথাল ঝাড়তে গিয়ে বুঝলেন যে জন্তুটা কামড়ে ধরে আছে চাদরটা। তাই সেটা ভারি লাগছে। অতএব চাদরটাকে জন্তুটার চারপাশে পুঁটলি পাকিয়ে দেওয়ালে ছুঁড়ে মারলেন। মাটির চায়ের ভাঁড় রেল লাইনে ছুঁড়ে মারলে যেমন আওয়াজ হয়, তেমন একটা আওয়াজ হলো। ফের চাদরটা কুড়িয়ে ঝাড়তে গিয়ে দেখলেন যে জন্তুটা তখনও তাতে আটকে আছে। ঘরের মধ্যে থেকে টর্চ এনে দেখলেন যে চাদরে একটা হারমিট ক্র্যাব সেঁটে বসে আছে। অতএব অভিযানে ইতি টেনে তিনি নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন। কোনো রকমে অশান্ত মনে রাতটুকু কাটিয়ে বিফল ফিল্ডট্যুরের হতাশা নিয়ে বাড়ি ফিরলেন পরদিনই।
     একটা অধৈর্য সপ্তাহ কাটিয়ে পৌঁছলেন এক বেশ্যাবাড়িতে। ততদিনে তাঁর মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে যৌনতা বেচাকেনার বাজারে অন্তত যৌনতার ঘাটতি থাকবে না, হয়ত উচিৎ মূল্য দিলে এসথেটিক থেকে প্রস্থেটিক সব কিছুই মিলতে পারে। সেখানে মালকিন বললেন, তা এই দিনের বেলাতেই লাগবে? কেমন মেয়ে লাগবে তোমার? লেখিকার যে মেয়ে লাগবে না সে কথা মালকিনকে বোঝাতে গিয়ে শুনলেন যে দেশি-বিদেশি মেয়েছেলে খদ্দেরও আছে নাকি এ পাড়ার ছেলেমেয়েদের! ফলে লেখিকার খুশি বেড়ে উঠল শতগুণ। তাঁর অবশ্য রাত্রিবাসের খরচ বেশিই পড়বে দেখা গেল। কারণ অন্য ক্লায়েন্টের সঙ্গে বেইমানী করে তাঁকে এমন ঘর দেওয়া হবে যাতে দুপাশের ঘরের সারা রাতের ঘটনা তাঁর চক্ষুষ্কর্ণগোচর হয়।
     প্রথম রাতে একটা ঘরে প্রথমে এলো একটা পাঁড় মাতাল। সে লোকটা মেয়েটার গলাটা জড়িয়ে ধরে খাটে ঝাঁপাল বটে দমাস শব্দ করে, তারপর জামাকাপড় খোলা শেষ হওয়ার আগেই মেয়েটার কাঁধে এমন লালা মাখালো যে মেয়েটা লোকটাকে ঠেলে সরিয়ে দিল। তাতে বোঝা গেল লোকটা ঘুমিয়ে কাদা হয়ে গেছে। তখন মেয়েটা লোকটার পকেট হাতড়ে টাকা-পয়সা বার করে ফটাফট গুণে দেখে, কিছু পয়সা লোকটার পকেটে ফিরিয়ে দিল। তারপর ঘরের দরজা খুলে দুটো মিচকে মতো ছোকরাকে নিয়ে এসে লোকটাকে হ্যাঙারে টাঙানোর মতো করে ছেলেদুটোর কাঁধে ঝুলিয়ে বার করে দিল। ফের ঘরটা ফিটফাট করে, চুল আঁচড়ে, আরেক প্রস্থ লিপস্টিক বুলিয়ে ঘরের আলো-পাখা বন্ধ করে দিয়ে ঘরটা থেকে চলে গেল
     অন্যঘরে তখন তিনটে মেয়ে দারুণ ঘুরে ঘিরে নাচছে। সঙ্গতে মোবাইলের ফিনফিনে ডার্লিং তেরে লিয়েতুমুল সিটি আর হাততালির মধ্যে মালকিন ধেয়ে এলো, খান্‌কির ছেলে, টিভি দেখ বাড়ি গিয়ে। ছেলেগুলোর একটা বলল, তিনজনের প্রত্যেকের একঘন্টার পয়সা দিয়েছি। সবে চল্লিশ মিনিট হয়েছে। আরেক জন বলল, তোমার মেয়েরা তো জামা কাপড় খুলল না! আরেক জন আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, সকলের পিঠে হাত দিয়ে ঠেলা মেরে ঘর থেকে সকলকে বার করে দিতে দিতে মালকিন বলতে লাগল, এই ছুঁড়ি ফাঁকা ঘরে গিয়ে ওদের কুড়ি মিনিট সেরে দি দিকি, আর সব খুলে নাচবি... একটু পরে মালকিন লেখিকার ঘরে এসে বলল, আজ বাজার গরমও আছে, আর তোমাকে অনেক রকম দেখাতেও হবে, তাই ওদের মাঝপথে বার করে দিলুম আরকি। এসব আবার তুমি কিছু লিখ নি বাপু, তাহলে আমার বিসনেসে রিসেশন লেগে যাবে। লেখিকা তখন অন্য সিনে মগ্ন। একটা বেশ প্যাংলা মতো লোক মেয়েটাকে বিছানায় আছড়ে ফেলে বেশ দ্রুতবেগে সংগম সারছেআর মেয়েটা আকুলি-বিকুলি করে বলে চলেছে, দুশো টাকা আরও লাগবে কিন্তু, আপনে মোজাটা পরেন নি, পরে ঝামেলা করবেন না
     লেখিকা কিন্তু দুশো টাকার রফা দেখার অবকাশ পেলেন না। তার আগেই প্রথম ঘরে নাটক জমে উঠেছে। মালকিন একটা কাঠের খিল দিয়ে প্রায় মাথা ফাটিয়ে দিচ্ছিল বিছানায় আধশোয়া মাস্তান গোছের লোকটার, হারামি, তোর বাপের হেরেম পেয়েচিস? আগের দিনের টাকা দিস নি, আবার এসেছিস? তোর পার্টিকে চাঁদা দুব, তুইও ফিরিতে মজা নিবি দুটো তো হবে নি। হয় দুদিনের মাল ছাড় নাহলে বিদেয় হ মাস্তানও গোঁফ মুচড়ে হুঙ্কার দিল, বজ্জাত মেয়েছেলে তোমার ব্যবসা উঠিয়ে দেব জানো? কর্পোরেশনের রোলার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেব- আহ্‌ মাস্তানের হুঙ্কার থমকে গেল। মালকিন এক ঘা কষিয়েছে তার হাতে। বেরো শিগ্‌গির, নাহলে মেরে তোর খুলি ফাঁক করে খালের জলে ভাসিয়ে দেব। তোর কপ্পোরেসনের মুখে মুতি, মিউনিস্যাল্টির ইয়ে করি... মাস্তান হাত বাড়িয়ে খিলটা কাড়তে গেল যেই অমনি ওর মাথায় মেয়েটা একটা সাঁড়াশি দিয়ে এক ঘা কষিয়ে দিল। অবাক চোখে মাস্তান মেয়েটার দিকে তাকাতে গিয়ে দেখল মালকিনের মাস্তানরা সব্বাই ঘরের দরজায়। সে তখন মাথার আলুতে হাত বুলোতে বুলোতে বেরিয়ে গেল।
     অন্যঘরটা তখন অন্ধকার। আলো জ্বলতে দেখা গেল একটা মেয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করছে। আর তার খদ্দের বলছে, তুমি ভাই ওই চেয়ারটাতে বোসো। আমি খানিক তোমাকে দেখি। মেয়েটা বলল, জামা পরে না খুলে? লোকটা বলল, খানিক খুলেই নাহয় বোসো। দরজায় টোকা পড়লে আমাকে জাগিয়ে দিয়ে, একটু সামলে দরজা খুলো, আমরা যেন ...ইয়ে.. মানে করছিলুম মেয়েটা জামাকাপড় খুলতে খুলতে লোকটার নাক ডাকতে লাগল।
     অন্যঘরে তখন তখন প্রচলিত নয়-ছয়কে অর্ধেক করে, অনুভূমিক তলের সমান্তরাল মোচড় দিয়ে একটা অভিনব মুদ্রার জন্ম হয়েছে এবং ঝট করে সেই মুদ্রা ভেঙে নারীপুরুষ যথাকার ধারণ করতেই মেয়েটা বলল, ওয়াক্‌। একশ টাকা বেশি দিন। এরকম উল্টোপাল্টা কাজ আমি করি না। লোকটা বলল, এটাতে অসুখ-বিসুখ করে না। তাই সারা পৃথিবীতে এটার দাম কম রে পাগলি। তারপর হাসিটা মুখে মেখে রেখেই লোকটা মেয়েটাকে দুটো দশ টাকার নোট ধরিয়ে সট করে কেটে পড়ল। আর হুড়মুড়িয়ে আরেকটা লোক তিনটে মেয়েকে নিয়ে ঢুকে পড়ল। আগের মেয়েটা ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। তিনজনে মিলে পুরুষটার কাপড় জামা খুলতে লাগল, নিজেদেরগুলোও খুলতে লাগল। আর ঝুপ করে লোডশেডিং হয়ে গেল। মফস্বলের এই এক দূর্গতি। কিন্তু দূর্গতি দেখা গেল শুধু লেখিকার। বারান্দায় কোথাও থেকে জেনারেটরের আলো এসে পড়েছে। পাশের ঘরের সম্মিলিত হাসি আর শীৎকার সপ্তম স্বর্গে। দড়াম করে দরজা খুলে মালকিন এসে বলল, ঘরগুলোতে আলোর ব্যবস্থা নেই। তুমি কী করবে? লেখিকার ঘুম ধরে গিয়েছিল। আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বললেন, একটা রিক্সা ডেকে দাও। লোকাল আছেআমি বাড়ি চলে যাই। মালকিন হাত ধরে লেখিকাকে সিঁড়ি দিয়ে দোতলা থেকে একতলায় নামতে সাহায্য করলতারপর হরেন? গোপাল? বলে ডাকাডাকি করলতাতে যে রিক্সাটা এলো তার চালককে বলল, দিদির থিকে বেশি ভাড়া নিবি না, দিদি এনজিও তায় খগুরে কাগজ। তারপর লেখিকাকে বলল, আবার এসো। দুগ্‌গা, দুগ্‌গা।
     কথা মতো লেখিকাও পরের সপ্তাহে পৌঁছে গেলেন। কিন্তু তখন মালকিনের ঘরে বেজায় চেঁচামেচি। একটা দালাল গোছের লোক নালিস করার মতো করে বলছে, এদিকে হাঁড়ির হাল, তায় উনি ধম্ম দেকাচ্চেন! আমাকে বলে কিনা ইয়ের খ্যামতা নেই এক ঘর বিছানা!’...” দালালটি দম নিতে থামল যেই অমনি মালকিন বলল, এখন আয়, ভেবে দেখছি কী করা যায়। তারপর মালকিন বিস্তর নাকে কান্না জুড়লতার সাথে নাকি মাস্তানের ঝামেলার জেরে ব্যবসা বন্ধ। একটা নাকি পুরোনো মেয়ে আছে, যার বয়স হলেও দর আছে এখনও, কিন্তু তার নিজের উঠোন, ইঁটের দেয়াল আর টিনের চাল উঠতেই সেই ধর্মে মন দিয়েছে। সকাল বিকেল ছবি আঁকিয়েদের সামনে কাপড় খুলে বসে থাকে, তাতে খোরাকির পয়সাটুকু পেলেই সে সন্তুষ্ট। তো সেই মেয়ের কাছে দুর্দিনে সাহায্য চেয়ে পাঠিয়েছিলেন দালাল মারফত, তাতে সে দালালের সাথে অমন করেছে। এতগুলো মানুষের পেট চলবে কী করে ভেবেই মালকিন এখন অস্থির। লেখিকার উটকো গবেষণাকে ঔদার্য দেখানোর মতো ঐশ্বর্য নাকি তার আর নেই, ইত্যাদি। তারপর আরেকটা ঠিকানা দিল সে ঘোর শহরের একটু উচ্চমার্গীয় বারনারীর সাথে কথা বলার জন্য, শর্ত, আমাকে কিন্তু টু পাস্‌সেন্ট দিতে হবে। লেখিকা জিজ্ঞেস করলেন, কতো? মালকিন ঘ্যাঁচ করে আলমারি খুলে একটা ক্যালকুলেটর বার করে বোতাম টিপে বললেন, দু হাজার। লেখিকা ব্যাগ খুলে দুটো কুড়ি টাকার নোট বার করে বাড়িয়ে দিলেন। মালকিন বলল, নেকাপড়ার এই ফল! বলি তেনার পারিশ্‌শমিকের ওই টু পাস্‌সেন্টই দুহাজার। ঠিকানাটা লেখিকার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। ভাবার ভঙ্গীতে মোবাইলের বোতাম টিপে টিপে একটা মেসেজে লিখেও নিলেন সেটা। তারপর বললেন, আমি পারবো না গো অত খরচ করতে।

ওলোট-পালোট
শনিবার সারাদিন, রবিবার সারারাতেও যথেষ্ট সন্তোষজনক যৌনতা এলো না লেখায়। যৌনাচার থেকে যৌনভঙ্গিমা যাই লেখেন সবই দেখতে পান কামসূত্র থেকে টোকা, বাৎসায়ন সেই কয়েকহাজার বছর আগে লিখে রেখে গেছেন। এদিকে মোচড় ওদিকে মোচড় দিয়ে নতুন কিছু করতে গেলেই মনে পড়ছে কলজে যে ছবিকে পানু বলে ডাকতেন সেসবের কথা। কুরুচির চূড়ান্ত সেসব যে স্মৃতির এমন গভীরে রয়ে গেছে, লিখতে না বসলে তা কখনও টেরটি পেতেন না!
যৌনতা নিয়ে আবহমান কাল ধরে যে ব্যবসা চলেছে তার গতিপ্রকৃতির মতো তাত্ত্বিক কথা বলতে বসে মনে হলো যে নারীদেহের এবং উত্তরকালে পুরুষ-নারী-অন্যলিঙ্গের সব মানুষদেহের বস্তুকরণ ঘটছে এবং তাই নিয়ে আলোচনাটা এই মূহুর্তে ক্লিশে। তাহলে বেশ নাড়িয়ে দেওয়া একটা ফিকশনও লেখা গেলনা, একটা সাড়া জাগানো তত্ত্বও তৈরি করা গেল না। আঙুলের ডগায় রয়ে গেল কি-বোর্ড। একটা হেরে যাওয়ার কষ্ট গলার থেকে পাকস্থলীতে কয়েকবার ঠেলে একলাখী বারনারীর নম্বরটা লাগানোর চেষ্টা করলেন লেখিকাএকটা যান্ত্রিক উত্তরব্যবস্থা বলল, নমস্কার, অবিরাম আনন্দ-এ দূরভাষকেন্দ্রে যোগাযোগ করার জন্য ধন্যবাদ। আমাদের নিয়মিত ব্যবসার সময় সোমবার থেকে শুক্রবার প্রতিদিন সকাল নটা থেকে বিকেল পাঁচটা। শনিবার, রবিবার ও সংস্থার অন্যান্য বন্ধের দিনে আমাদের স্বয়ংক্রিয় উত্তরদাতাকে আপনার প্রয়োজনের কথা জানাতে পারেন। আপনার যা বলার তা জানান বিপের পর।
রকম সকম দেখে লেখিকা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। ভোর হতে তখনও ঘন্টাচারেক বাকি। বিছানায় শুয়ে কাতরাতে কাতরাতে ঘন্টা খানেক কেটে যেতে ভাবলেন যে যদি ভুল নম্বরে ফোন করে থাকেন! খুব অভাববোধ করতে লাগলেন মোবাইলের যুগের আগেকার, কেবলমাত্র ল্যান্ডলাইনের সময়টাকে। তখন কেমন টেলিফোন ডিরেক্টরি খুলে ফোন নম্বর থেকেই যাবতীয় ঠিকানা এবং ঠিকানার মালিকটির নাম জানা যেত। আর এই হতচ্ছাড়া মোবাইলের যুগে কিছুতেই বোঝার উপায় নেই যে হাতে টুকে আনা নম্বরের উল্টোপাড়ে কে আছে! হতে পারে মালকিনের কাগজেই ভুল-ভাল লেখা ছিল। লেখিকা অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারলেন না যে মালকিনের কাগজে ঠিকানাটা ইংরেজিতে লেখা ছিল না বাংলায়। যে সব অসভ্য অশিক্ষিতের আড়ত, বাংলাতেই লেখা ছিল মনে হয়। নাহ্‌, অনেকগুলো মেয়ের বাচ্চারা তো ইস্কুলে যায়, ঠিকানাটা বেশ স্পষ্ট হাতের লেখায় লেখা ছিল, বোধ হয়...। দুচ্ছাই, নিকুচি করেছে... বলে নিজের টুকে আনা নম্বর আর শেষ ডায়াল করা নম্বর একবার তুলনা করে দেখলেন। দুটো অবিকল এক দেখে আবার ডায়াল করলেন। আবারও অবিরাম আনন্দ-এর যান্ত্রিক উত্তর রেকর্ড করার ব্যবস্থার নির্দেশ শোনা যেতে লাগল।
সকাল হতে, আপিসের জন্য তৈরি হতে হতে একটা ফিকির মাথায় এলো। অবিরাম আনন্দ-এর যান্ত্রিক মেসেজ-এ জানালেন যে একটা চালু পত্রিকার পক্ষ থেকে একটা ফিচার করার জন্য তিনি অবিরাম আনন্দ-এর কর্ণাধারের সাক্ষাৎকার প্রার্থী। তারপর মা ফলেষু কদাচন জপে নিজেকে সঁপে দিলেন সোমবারের গড্ডালিকায়।
দুপুর নাগাদ একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলো। তিনি যেমন সদ্যজাত পত্রিকার সম্পাদকের ফোন ধরে তাদের কৃতার্থ করেন, তেমন করেই ধরলেন ফোনটা। আর চমকে উঠলেন শুনে, নমস্কার, অবিরাম আনন্দ-এর থেকে চূর্ণা বলছি। পনার নাম আর যে পত্রিকায় কাজ করেন তার নামটা বলুন আরেকবার প্লিজ। তোতলাতে তোতলাতে বলে দিলেন লেখিকা। চূর্ণা বলল ওঁরা ক্যালেন্ডার দেখে কয়েকদিন পরে জানাবে। লেখিকা বিনবিনিয়ে ঘেমে উঠলেন এই ভেবে যে চূর্ণা কই জানতেও চাইল না যে অবিরাম আনন্দ-এর কাজের ব্যাপারে লেখিকা কতটা জানেন। তিনি অবশ্য ঝালিয়েই রেখেছিলেন উত্তর, প্রান্তিক নারীদের নিয়ে আপনাদের কাজের কথা সামান্য শুনেছি। সেসব বিষদে জানার জন্যই যাব।  কিন্তু সেসব কিছুই না ঘটায় তিনি বেশ ঘাবড়ে গেলেন।
তিন সপ্তাহ পরে একটা বুধবার কি বেস্পতিবার সকালে লেখিকা যখন বাসে বসে উথালপাথাল মানুষের কথা, জীবনের কথা, সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ কথা ভাবতে ভাবতে ঢুলছেন, তখন তাঁর সেলফোনটা চ্যাঁ চ্যাঁ করে উঠল। ফোন ধরার ব্যাপারে যেহেতু চেনাচেনা বাছ-বিচার নেই, তাই ঝপাং করে তিনি ফোনটা ধরেই নিলেন।  চূর্ণা বলল, সামনের রবিবার দুপুর একটায় আমাদের আপিসে চলে আসুন। আমাদের সিইও আপনার সাথে কথা বলবেন। ঠিকানাটা আপনার জানা আছে বলেই জানি। ফোনটা চূর্ণা কেটে দিল। লেখিকার উত্তর দেওয়ার কোনো অবকাশ রইল না। এর মানে হয় যে মফস্বলের মালকিনের সাথে এদের যোগাযোগ হয়েছে, তা হলে দেনা পাওনা? লেখিকা আবার চূর্ণাকে ফোন করার চেষ্টা করলেন, ফোনটা কেবল ফ্যাক্সারে চলে যেতে লাগল। বাধ্য হয়ে অবিরাম আনন্দ-এর নম্বর লাগালেন। উত্তর এলো, আমাদের সমস্ত উত্তরদাতা এখন ব্যস্ত। বিপের পর আপনি আপনার নাম, ফোন নম্বর ও প্রশ্ন বা বক্তব্য রাখুন। যে ক্রমে আপনার কথা আমরা শুনব, সেই ক্রমে আপনাকে উত্তর দেওয়া হবে। লেখিকা আমতা, আমতা করে বললেন, চূর্ণার সাথে আসছে রবিবারের মিটিং-এর কথা পাকা হয়েছে বলে জানতে চাই, মিটিং-এর মাশুল কত? মানে মিটিং বাবদ আপনারা আমার থেকে কত টাকা নেবেন? ফোনে না জানিয়ে মেসেজ করে দিলেও চলবে। ধন্যবাদ। উৎকন্ঠার দুয়েক-রাত পেরিয়ে চূর্ণার কাছ থেকেই টেলিফোনে জবাব এলো, মিটিং বাবদ আপনার কোনো খরচ নেই
লেখিকা বিশ্বাস করতে পারছেন না। এমন হয় নাকি! যাদের রোজগার শরীর বেচে, তারা কথা বলার জন্য পয়সা নেবে না? এদিকে এমন জব্বর যোগাযোগের কথা কারুর কাছে ফাঁস করতেও ইচ্ছে করছে না তাঁর। কারুর সাথে আলোচনা করে সন্দেহগুলো ঝালিয়ে নিতে গেলেই যৌনতার খোঁজে যে তিনি অন্যলোকের বিছানা দেখেছেন লুকিয়ে, ফ্রিতে এবং মূল্য দিয়ে সেসব কথা ফাঁস হয়ে যাবে। আর তাঁর মান-সম্মান, সম্ভ্রম সব যাবে। নাম, ক্যারিসমা সব যাবে।
এদিকে তিনি নানা প্রশ্নে জেরবার। একলাখী বেশ্যাকে কী সাব-অল্টার্ন বলা যায়? না বলা গেলে কেন যায় না, কিংবা তার সাথে নিপীড়িত, শোষিত, নির্যাতিত, অসংখ্য দারিদ্র্য ক্লিষ্ট নিঃপাই প্রান্তিক যৌনকর্মীদের তফাতটাই বা কী? এঁদের সাথে ওঁর মূল্যের তফাৎটা কেন? কৌতুহলে সাঁতার দিতে দিতে রবিবার দুপুরে তিনি হাজির হলেন অ্যালপাইন হাইটসের দরজায়। ডোরবেল বাজল যেন গীর্জার ঘন্টা! এ কী পরিহাস? উত্তর পাওয়ার আগেই কুড়ি ফুট উঁচু দুপাল্লার দূর্গফটকের মতো দরজার পাশে ছোট্টো একটা ফুট সাতেক উঁচু দরজা খুলে গেল। দরজাটা না খুললে, ওটাকে দেওয়ালেরই অংশ বলে ধরে নেওয়া গিয়েছিল। লেখিকা ঢুকলেন একটা আট ফুট বাই আট ফুট কুঠুরিতেএকটি বিশ-পঁচিশ বছরের মেয়ে এসে তাঁর ঝোলাটাকে একটা মোটা কাপড়ের থলিতে ভরে দিল। থলির ভেতরের দেওয়ালে কালো কাপড়ের আস্তরণ। তারপর লেখিকাকে একটা আলখাল্লা পরতে বলল, যার ভেতরে কালো কাপড়ের আস্তরণ। তারপর মেয়েটা লেখকের কানের দুলে, চশমার ফ্রেমে, ব্ল্যাকটেপ লাগিয়ে দিল, ঝটপট। তারপর বলল, সেলফোনটা অফ করে ভরে দিন এই বাক্সে। বিরক্তিকর এই ব্যবস্থা চলাকালীন লেখক নজর করলেন মাটিটা একটু কেঁপে উঠল। তারপর শুনলেন গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট হওয়ার শব্দ। দেওয়ালের গায়ের কাচ ঢাকা চৌকো জানলা দিয়ে দেখলেন একটা গাড়ি বেরিয়ে যেতে মেঝেটা পাতালে চলে গেল, আর একটু পরে আবার অল্প মাটি কাঁপিয়ে উঠে এলো আরেকটা গাড়ি নিয়ে। মানে এই বাড়ির নিচে মলের পার্কিং-এর মতো পার্কিং আছে!
মেয়েটার কথায় চমকের ঘোর ভেঙে গেল তাঁর। শুনলেন, বলছি যে বাক্সটা ঝোলায় পুরে নিজের কাছে রাখুন। তিনি নির্দেশ মেনে নিলেন। তারপর আবারও মেয়েটার নির্দেশেই তাকে অনুসরণ করলেন। দেউটি পেরতে পাইন ছাওয়া ঠান্ডা ছায়া দিয়ে মোড়া গলিপথতারপর গাছ দিয়ে সাজানো বারান্দা টপকে ঢোকা গেল বসার ঘরে। ঘরটা দাবার ছকের মতো সাজানো। সব আসবাবে, মেঝেতে, ছাদে দাবার কেরামতি। সেখানেই পাটভাঙা ডুরে শার্ট আর কালো প্যান্ট, কালো পাম্প শু পরা আরেকটা বছর বিশ-পঁচিশেকের মেয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা করল, আসুন, বসুন। চা বলি? লেখিকার অবিশ্বাসের পাহাড় ঠেলে কোনো মতে ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিলেন। মেয়েটি বসতে, তিনিও বসে পড়লেন। এতো কেতাদুরস্ত আবহাওয়া তিনি কল্পনাই করতে পারেন নি। মেয়েটিই প্রথম মুখ খুলল, বেবাক হয়ে গেলে ফিচারের জন্য প্রশ্ন করবেন কী করে? লেখিকা যিনি স্বভাব বাকপটুতায় প্রচুর পুরস্কৃত তিনি হাঁ করলেন কিন্তু কোনো শব্দ বেরোল না। তখন মেয়েটিই আবার বলল, নাকি আপনার জিজ্ঞেস করার কিছু নেই যেহেতু আপনার প্রস্তাবটা হলো আমার ব্যবসার মূল পরিষেবাটা উঁকি দিয়ে দেখে একটা হইচই জাগানো গল্প লেখা, যেটা পুরস্কারও পাবে, ফিল্মও হবে, নাম হবে, মান হবে, পয়সাও হবে......
আক্রান্ত হতেই লেখিকার জান্তব প্রতিরক্ষা প্রবণতা জেগে উঠল, তার মানে আপনিও আমার পিছনে লোক...... হা হা হেসে উঠল মেয়েটি। হাসি শেষ হতে বলল, আপনার লেখায় চোখ বুলিয়ে আপনাকে চালাক চতুর মনে হয়েছে। কিন্তু বুদ্ধিমতী বলতে যা বোঝায় সেটা যে আপনি নন তার প্রমাণ পেলাম আহত লেখিকা আবার ফণা তুললেন, আমার লেখা পড়ে তুমি বুঝবে কী? মেয়েটি মুখের হাসিটা ঝকঝকে রেখেই বলল, ইন্টেলেকচুয়াল সুপিরিয়রিটির প্রশ্ন করছেন? আপনি তো মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক বিএ এম এ-র বাইরে গ্লোবাল কোনো মাপকাঠিতেই পরীক্ষা দেন নি। তাও আবার যে শিক্ষাব্যবস্থায় ডিগ্রি কেনা যায়- লেখিকা মরিয়া হয়ে গজগজ করলেন, আমাদের যুগে সেসব- মেয়েটি বলল, একালের মতো ফেলো কড়ি মাখো তেল খোলামেলা বেচাকেনা ছিল না, কিন্তু চোরাগোপ্তা ট্যাবিউলেটরকে পয়সা দিয়ে স্কোর কিনে, যদি মার্কশিট বেরোলে ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থী মামলা করে তো তার খাতা লোপাট করে হাজির করার মতো প্রমাণ গায়েব করার চল তো ছিল। তো আপনাদের ডিগ্রিগুলো মূল্যহীন, সেগুলো ইন্টেলেক্টের মাপকাঠি নয় আর লিখে-টিখে যে ঢাকটা পেটান সেটা কতটা সময় ধরে কাদের সাথে, কোন কোন দলে ভিড়ে ঢাক পিটছেন তার ওপর দাঁড়িয়ে, ইনলেক্টের সাথে তার কোনও সম্পর্ক নেই এসবের এক্কেবারে উল্টোদিকে আমার ব্যবসাটাএর ইউএসপি হচ্ছে চুপচাপ থাকা, আপনাদের মতো সোশ্যাল, আনসোশ্যাল, অ্যান্টিসোশ্যাল, কর্পোরেট বা কো-অপরেটিভ মিডিয়ায় ঢাক পেটানো নয়। তাই আমার এসএটি স্কোর ষোলশো না চব্বিশশো, জিআরই নাইনটি ফাইভ পারসেন্টাইল কিনা সেসব আপনাদের জানার কথাও নয়। জানেন না বলে মানেনও না। আসলে  যে টুপিটা মাথায় পরে আছেন, সেটাকেই খুলি ভাবেন ড় ভেতরের হাওয়াটাকে ঘিলু-
লেখিকা মুখ বাঁকিয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, নিজের ডেরায় ডেকে অপমান করাটা দূর্বলতা মেয়েটি এবার অট্টহাস্য করে উঠল, তাহলে আপনি কী বলেন, আমার ডেরায় এসে আপনি আমাকেই অপমান করে জোর দেখাবেন, আর সেটাই বুদ্ধিমত্তা? আমার লোকজন সদরে না পৌঁছে দিলে, আপনি বেরোবেন কি করে এখান থেকে? এরপরের নৈঃশব্দটা লেখিকা ভরতে পারলেন না। কপালে ঘামের বিনবিনিয়ে ওঠাটাও লুকোতে পারলেন না। মেয়েটির হাসিমাখা সপ্রশ্ন চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, তাহলে বিনা পয়সায় আমাকেই বা সময় দিচ্ছেন কেন? মেয়েটি হাসি ধরে রেখেই বলল, গুড কোয়েশ্চেন। সময় আপনি দিচ্ছেন, ফোকটে। আপনি নিজের নাম আর পত্রিকার নাম বলে যোগাযোগ করায় আমাদের জন্য আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করা সহজ হয়ে যায়আপনার আর্টিক্ল আছে, ফিচার নেই - আপনি পত্রিকায় স্টাফ নন, ফ্রিলান্সার, জীবিকা চাকরি, শখ আঁতলামি - কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না আঁতলামির ফ্যাশনেবল ডেস্টিনেসন্স্‌ যেমন  খালাসিটোলা, হাড়কাটাগলি সেসব ছেড়ে কেন আপনি অবিরাম আনন্দ-এ। সংসারের দায়িত্ব নেবেন না স্ত্রী-স্বাধীনতার অছিলায়, সেই অছিলাতেই একাধিক বিবাহিতাবিবাহিত পুরুষের সাথে, মহিলার সাথে প্রেম করার সুখটুকু নেবেন, কিন্তু সংসারের দায়িত্ব কিছু নেবেন না - এবং আপনি এই বয়সেও চান লোকে আপনাকে ভালো, ‘সংবেদনশীল সমাজসচেতন বলুক। ফলে যাপনজনিত মর‍্যাল ডিলেমায় জর্জরিত হয়ে একশো বছরের পুরোনো তত্ত্ব ঝেড়ে নিজের ইন্টেলেকচুয়াল সুপিরিয়রিটি দাবি করে চলেছেন, যদিও বুঝতেও পারেন না তত্ত্বটার বৈজ্ঞানিক ভুল। আবার আর্টিক্ল আর ফিকশনে যৌনতার অভাব বলে অন্য লোকে খুঁত ধরায়, সেই লোকের বিচারে একশোয় একশো পাওয়ার চেষ্টায় যৌনবাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন - এরকম স্নায়ুগিঁট আমাদের একঘেয়ে জীবনে দারুন এন্টারটেইনমেন্ট, ম্যা-ম। আপনাকে ছাড়ি কী করে! আক্রান্ত, আহত লেখিকা এবার আক্রমণই সেরা রক্ষণ বলে মনে করলেন, বেশ তো, আমি অন্য নারীপুরুষের, এমনকি যারা একগামিতার শপথ নিয়েছে, তাদেরও যৌনজীবনে ভাগ বসাই, সেই নারীপুরুষেরা যৌনতার বদলে যৌনতা পায়, আমিও তাই পাই তাতে আমারটা অপরাধ হলো, আর তোমার পয়সার বিনিময়ে যৌনতা বেচাটা নৈতিক?
মেয়েটি পুলকিত, উল্লসিত হয়ে উঠল, আপনি যাদের যৌনজীবনে ভাগ বসান, তারা যৌনতার বিনিময়ে যৌনতা দেয়, উপরি দেয় গার্হস্থ্য, সন্তানসুখ, নিশ্চিত করে একটা প্রজাতির জৈবিক এবং নৈতিক টিকে থাকা। আপনি তো উপরি কিছু দেন না, উল্টে তাদের স্টেডি পার্টনারদের প্রাপ্য যৌনতায় ভাগ বসিয়ে তাদের পার্টনারদেরকে বঞ্চিত করেন প্রাপ্য যৌনতা থেকে, মানে আপনার প্রেমিকদের স্টেডি পার্টনাররা যৌনতার বিনিময়ে প্রাপ্য যৌনতাটুকুও পায় না! আবার আপনি আপনার যৌনসঙ্গী এবং সঙ্গিনীদের সারাক্ষণ ভয়ও দেখাতে থাকেন যে আপনার সাথে যৌনতা বিনিময় না করলে আপনি নাকি সব ফাঁস করে দিয়ে তাদের সুখের স্বর্গে আগুন দিয়ে দেবেন! ইন্‌সিকিউরিটির হদ্দমুদ্দ। একটু থেমে মেয়েটা আবার বলল, আমি পয়সার বিনিময়ে যৌনতা দিই না। যৌনতার সাথে যৌনতা বিনিময় করি। পয়সাটা সেই বিনিময় গোপ রাখার মাশুল। আপনাদের সমাজ বাড়ির রান্না ফেলে রেস্টুরেন্টে খেলে নিন্দে করে না, কিন্তু বাড়ির যৌনতা থেকে একটু স্বাদ বদলের জন্য বাইরে যৌনতা করলে দোষ ধরে। আইন বানিয়ে ক্রিমিনাল অফেন্স ধরে। তাই আপনি লোকের অপরাধবোধের সুবিধা তোলেন, আর আমি লোকের অপরাধবোধটাকে পয়সার বিনিময়ে অবলিভিয়ন বা বিস্মৃতি নামের কুঠুরিতে রাখি। তফাতটা বুঝলেন?
লেখিকা তফাত বুঝতে আসেন নি অবিরাম আনন্দ-এ কিংবা অ্যালপাইন হাইট্‌সে। তিনি এসেছিলেন রগরগে যৌনতার খোঁজে, যাতে মুড়ে খানিকটা খসখসে দুঃখ আর ঢকঢকে বঞ্চনা দিয়ে প্রবল আবেগঝঞ্ঝা ঘনিয়ে তোলা যায়, জনপ্রিয়তা আর প্রশংসা দুই-ই হাসিল করা যায়। ম্যাগো, ফিচার লিখবেন তিনি কোন দুঃখে! তাঁর কী কল্পনার দৈন্য নাকি সত্য আর তথ্যের অভাব? ফলে ধৈর্য ধরে রাখার কোনো দরকারই তাঁর ছিল না। মেয়েটার প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলে বসলেন, জানো, আমি উত্তমনারীতে নিজের অভিজ্ঞতার নামে তোমার এবং তোমার মতো মেয়েদের ব্যবসার কথা নিয়ে আর্টিক্ল লিখে তোমাদের লাটে তুলতে পারি?
 মেয়েটির উত্তরুৎসুক মুখে আবার কৌতুক জমে উঠল। বলল, শুনেছেন বা পড়েছেন কখনও মার্গারেট থ্যাচার বলেছিলেন, বিয়িং পাওয়ারফুল ইস লাইক বিয়িং আ ওম্যান। ইফ ইউ হ্যাভ টু সে ইউ আর, উ আরন্ট। ক্ষমতা দেখাচ্ছেন? বেশ তো লিখুন আর্টিক্ল, নিজের ব্লগ ছাড়া আর কোথাও পাবলিশ করা যায় কিনা দেখুন, দেখুন ব্লগের ভিজিবিলিটি ব্লকড হয়ে যায় কিনা। আপনার চুলের ডগা না ছুঁয়েও, আপনার শরীরে, পোশাকে রেকর্ডিং ডিভাইস লুকিয়ে রাখার সম্ভাবনাটাই  অকেজো করে দিয়েছি, আপনাকে জোব্বা পরিয়ে, আপনার মাথায় উরনি বেধে, আপনার ঝোলা আমাদের ঝোলার মধ্যে পুরে। এমনকি আপনার মোবাইলটা অবধি এখন পরিষেবা সীমার বাইরেএই কথাবার্তার কোনো জার্নালিস্টিক প্রুফ রাখতে পারবেন না, ম্যাম। এর থেকে হয়তো আন্দাজ করতে পারছেন যে আপনার ব্লগটা যাতে কেউ না পড়ে তার ব্যবস্থা করতে আমার কোনো অসুবিধে হবে না।
লেখিকার অভিপ্রায় সিদ্ধির সম্ভাবনা গেছে দেখে তিনি আর একটা মরিয়া চেষ্টা করলেনতোমার ব্যবসাটা তো বেআইনি। মেয়েটা এবার ফিক করে হাসল, যারা আইনের রক্ষক, যারা আইনের ব্যবসাদার, যারা আইন বানায়, যারা আইন ভাঙে তারাও আপনারই মতো এখানে এসে ক্ষমতা দেখিয়ে যায়। কিন্তু ক্ষমতায় কুলোলে বিবেচনা করে দেখবেন কে বেশি ক্ষমতাবান যে কোটি কোটি লোককে বুদ্ধু বানিয়ে প্রধানমন্ত্রী হলো বা মুখ্যমন্ত্রী হলো সে, নাকি যে লোকটা সেই মন্ত্রীর ক্ষমতার তম্বি উপভোগ করতে করতে তাকে অরগ্যাজম ফেক করে সে।
এবার লেখিকার ঠোঁটে একচিলতে জয়ের হাসি দেখা গেল। যা হোক মেয়েটার এতো যত্নে সামলে রাখা খদ্দেরদের গোপনীয়তায় চিড় ধরানো গেছে। তাই মেয়েটিও একটু সতর্ক হলো। বলল, চা-তো ঠান্ডা হয়ে গেল, আরেক কাপ বলি? লেখিকা বললেন, না, আমার আর চা-এর দরকার নেই। আপনি অনুমতি দিলে আমি যেতে পারি।  মেয়েটি এবার নির্লিপ্তি নিয়ে বলল, যা খুশি লিখুন। তবে যদি বলেন যে আমাদের ব্যবসায় যারা পরিষেবা দেয় তারা নিতান্ত অবস্থার স্বীকার, সেটা ডাহা মিথ্যে বলা হবে। বেশ্যাবৃত্তির ইচ্ছে না থাকলে আত্মহত্যা করা তো কারুর আটকায় না। যেমন আপনি না চাইলে কেউ আপনাকে দিয়ে রগরগে কিংবা গ্যাদগ্যাদে গা-গুলানো যৌনতা লেখাতে পারে না। ভালো থাকুন। নমস্কার। যে মেয়েটি সদর থেকে ভিতরে নিয়ে এসছিল লেখিকাকে, সে ততক্ষণে উপস্থিত হয়েছে দাবার ছকের ভিতরে। তাই লেখিকাও উঠে পড়ে জোব্বা-ঝোলা-বাক্স-ব্ল্যাকটেপ থেকে মুক্তি নিয়ে, হিমশীতল অ্যালপাইন হাইট্‌স থেকে বেরিয়ে পা রাখলেন শহরের রোদ চিড়বিড়ে ঘেমো ভিড়ে।
সঙ্কটমোচন
     একটা ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে হাঁটছিলেন ফুটপাথ ধরে। ব্যাগের মধ্যে ফোনটা কাঁপছে। তাঁর এখন ধরতে ইচ্ছে করছে না। এতটুকুও যৌনতা তিনি কোত্থাও পেলেন না, যেটা লিখে তিনি হুলুস্থুল করে ফেলতে পারেন। বেশ হতাশ হয়ে বহুমাথা মোড়ে লঞ্চঘাটগামী একটা অটোরিক্সায় চড়ে পড়লেন। তাঁর পাশে একটা মেয়ে বসেমেয়েটার গা ঘেঁসে একটা পুরুষ। পুরুষটা বলল, পাঁচশো? পাঁচশো বড্ড বেশি। মেয়েটা কিছুই বলল না লোকটা বলল, আড়াইশো? মেয়েটা তাও কোনো জবাব দিল না। লোকটা আবার বলল, তিনশো? মেয়েটা এক্কেবারে নিঃশব্দ। ফের লোকটা ঘড়ঘড়ে গলায় সাড়ে তিনশ। বলে মেয়েটার উরুটা খামচে ধরল। মেয়েটা শাঁখা-পলা-কাচের চুড়ি-ইমিটেশন চুড়ি সমেত হাত দিয়ে লোকটার কবজিতে একটা মোচড় লাগাল। লোকটা আহ্‌হ্‌ বলে মেয়েটার উরু ছেড়ে দিল। মেয়েটাও লোকটাকে ডিঙিয়ে অটোর জঙ্গলের মধ্যে নেমে গেল, বেশ গম্ভীর চালে। লোকটা উস্কো-খুস্কো চেহারায় অটোওলাকে আট টাকা খুচরো দিয়ে নেমে গেল। লেখিকা ফাঁকা অটোয় একান্তে সেলফোন খুলে দেখলেন। সম্পাদকের ফোন, পাঁচবার। একটা মেসেজ, কোনো নারী উদ্যোগ নিয়ে কিছু দেবেন না প্লিজ। একথা বলছি কারণ আপনি যে অবিরল সাধনা নারী উন্নতি মন্দির-এর নানান আপিসে যাতায়ায় করছেন সেটা আমি জানি। ওদের নিয়ে রোজ বিদেশি পুঁজিতে চালু ইংরেজি কাগজগুলো দশ বছর ধরে লিখে চলেছে, আমরা কখনও লিখিনি বলে। আমরা আমাদের পাঠকের কাছে দায়বদ্ধ। আমরা যা চিরকাল ছেপেছি তাই ছাপব, কাউকে কিছু করতে দেখে আমরাও সেটাই করার জন্য ঝাঁপাই না। আমরা অরিজিনাল ভাবি, তাই সব্বার থেকে সবসময় এগিয়ে থাকি।

     লেখিকার কানটা গরম হয়ে গেল! অবিরাম আনন্দ হোক বা অ্যালপাইন হাইট্‌স, নাকি অবিরল সাধনা নারী উন্নতি মন্দির তার খবর দশ বছর ধরে ইংরেজি কাগজের পাঠকরা জানে! কেবল তিনিই জানেন না! কথাটা যত ভাবছেন, তত জ্বলছেন তিনি রাগে। শেষে ফাঁকা, চুপচাপ লঞ্চঘাটে বসে সম্পাদকের নম্বরটা ডায়াল করলেন। সম্পাদক কিচ্ছু শোনেন না, শুধু বলেন। তাই ফোন তুলেই বললেন, এটুকু বলুন শুধু আগামী ইস্যুতে চারটে পাতা মানে হাজার দুয়েক শব্দের জায়গা রাখব কি আপনার জন্য? অন্য কালে হলে লেখিকার অহংটি লাফিয়ে আকাশ ছুঁতো এই ভেবে যে হু হু কাটতি পত্রিকার সম্পাদক তাঁর লেখা শুরু হওয়ার আগেই তাঁর জন্য জায়গা রাখতে চাইছেন পরবর্তী সংখ্যায়, এ যেন স্বর্গের নন্দনকাননে স্বয়ং ইন্দ্র বাংলো অফার করছে! কিন্তু মফস্বলের খারাপ পাড়া থেকে শহুরে আলিশান অ্যালপাইন হাইট্‌স ঘুরেফিরে তাঁর গিঁটগুলো খুলে গেছে। তিনি আর তেমন ভালো লিখতে পারবেন কিনা কিংবা আদপেই কখনও লিখতে পারবেন কিনা তাই নিয়ে তাঁর ঘোর সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এই সমস্ত বেঁচে থাকার মধ্যে সত্যিমিথ্যে মিশিয়ে মনকে চোখ ঠারা কথায় সাজানো যে পৃথিবীটা গড়েছেন তার সবটাই ফালতু, মূল্যহীন, মেকি বলে মনে হচ্ছে। এই গড়নে নিজেকে ওস্তাদ কারিগর ভেবে বহু বছর ধরে আহ্লাদ করাটা মুর্খামি বলে মনে হচ্ছে। নিজের নির্বুদ্ধিতা আর অপদার্থতা টের পাওয়ার লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছে। আর এসবের মূলে এই হারামী, শালা সম্পাদক! তাই উত্তরে লেখিকা বললেন, মর মিনসে, ওলাওঠা হয়ে মর!

Readers Loved