Showing posts with label Bengali Prose. Show all posts
Showing posts with label Bengali Prose. Show all posts

Sunday, May 17, 2026

Panchpoksho - 44

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



আত্মপক্ষ

~~~~~~

সুরচিতা বলল, “তোর বাবা-মাকে এলাকা থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া জরুরি। বয়সের কারণে ওঁরা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছেন। এদিকে তুই স্বাধীন হয়েছিস, সুরোজগেরে হয়েছিস। আর তোর ওপর টুকুন রায় এণ্ড কোম্পানির কোনো খবরদারি চলে না। এতে তোদের ওপর টুকুন রায়ের হিংসে আরও বেড়েছে। এরপর তোর বাবা-মাকে উৎপীড়ন করে তোকে শোষার একটা রাস্তা খুঁজবে। তুই ওখানে ফ্ল্যাট কিনলে সেটাই ওরা একটা ছুতো করবে হয়তো। তাই ভাবছিলাম একটু শান্তিতে থাকার জন্য না-হয় দুপয়সা বেশিই খরচ করলি বাড়ি ভাড়াতে; না হয় কদিন দেরিই হলো অ্যাসেট বানাতে, নিজেদের বাড়ি হতে, গাড়ি হতে। তোর মামার বাড়ির প্রসঙ্গ সেই জন্যই তুললাম যে যদি এখানকার বাস উঠিয়ে দিলীপকাকুরা ওখানে যেতে পারেন। কিন্তু সে-পথ যখন বন্ধ তখন না হয় তোর ওখানেই নিয়ে যা। ভাষায় অসুবিধে হবে কদিন। তবে সিয়াপুরা এখন বেশ কসমোপলিটান শুনেছি। অসুবিধে নাও হতে পারে। তাছাড়া তোর বাবা-মা ইন্টেলিজেন্ট। ভাষা শিখে নেবেন জলদি। একটু উৎসাহ দিবি, হেল্প করবি না-হয়।” 

অভি বলল, “থ্যাঙ্কস, তুমি আমার বাবা-মার নির্বুদ্ধিতাটার, অল্পবয়সের খেয়ালটারই শুধু সমালোচনা করেছ বরাবর। কিন্তু তাঁদের চটপট টিঁকে থাকার উপায় শিখে ফেলার ক্ষমতা, চরম দুর্গতিতেও আত্মীয়পরিজনের কাছে গিয়ে না দাঁড়ানোর জেদ এবং নিজেদের পরিস্থিতি নিঃশব্দে সহ্য করে যাওয়ার ক্ষমতা, নিজেদের মধ্যে কোনো ফাটল না জাগিয়ে তোলা এসব নজর করেছ বলে মনে হয় নি আমার। কিন্তু আজ যখন মানলে যে তাঁরাও বুদ্ধিধর তখন ভালো লাগল।” 

সুরচিতা বলল, “তুই তো আকাশ থেকে পড়িস নি। তোর বাবা-মার মেধাটাই তোর মধ্যে বর্তেছে। হয়তো আত্মসম্মানবোধটাও। কিন্তু মেধার সঙ্গে লাগে ঠিকঠাক করে ভাবতে পারার, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা; আবগকে বশ করার ক্ষমতা, আবেগের সংতুলন। সেসব তৈরি হয় পারিপার্শ্বিকের সাথে মেলামেশা থেকে, কোনো একটা উদাহরণ থেকে। ইস্কুলে টিচাররা আর বাড়িতে আপনজনেরা পড়ুয়াদের মধ্যে এইসব ক্ষমতা তৈরি করার চেষ্টা করলে তবে হয়। তোর বাবা-মায়ের বুদ্ধি থাকলেও ওঁদের বিবেচনাটা গড়ে তোলার জন্য কেউ হয়তো ছিলেন না। সেটা তো ওঁদের দোষ নয়। ওঁরা কোথায় জন্মাবেন বা কোন পরিবেশে বেড়ে উঠবেন সেটা ওঁরা ঠিক করেন নি। তবু তোর ব্যাপারে ওঁরা খুবই যত্নবান ছিলেন। এতটা আমি বুঝতাম না যদি না এখানে আসতাম।” 

অভি বলল, “মানে? এখানে তোমার সেই বুদ্ধিমতী ছাত্রীর ইলোপ করার পরে বুঝেছ?”

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)


Saturday, May 16, 2026

Panchpoksho - 43

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



আত্মপক্ষ

~~~~~~

তারপর আবার শুরু করল, “হ্যাঁ, যা বলছিলাম; তোর মামাবাড়িতে দাদু আর মামা। দাদু এখনও বেঁচে থাকলে তোকে আর তোর মাকে আটকে রাখতে পারেন। মামা লোক দেখানে দেখভাল করতে পারেন আর তোর বাবার বাড়ির লোকেদের ভিলেন বানাতে পারেন--তোর বাবাকে ওঁদের হাতে তুলে দিয়ে বা নিজেরাই তোর বাবাকে মেরে ফেলে দোষটা তোর জ্যাঠাদের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে। আর দাদু না থাকলে তোদের মেরে ফেলতে তোর মামার কোনো বাধা নেই। তারপর বাবার বাড়ির লোকেরা মামার বাড়ির লোকেদের আর মামার বাড়ির লোকেরা বাবার বাড়ির লোকের দোষারোপ করে সমাজের সুপুত্তুর হবেন না হয়।” 

তারপর একটু থেমে বলল, “যদিও বিয়ের যুগ্যি সুচাকুরে একটা ছেলেকে নিয়ে মা-বাবা তাঁদের সাফল্যটা দেখাতে গেলে মারপিট, গুম করে রাখা বা গুমখুনের সম্ভাবনা কম। তবে তোকে দেখলে তোর কথা জানলে ওঁদের খুব হিংসে হবে। রাগও আরও বেড়ে যাবে। দেশে ঘরের ব্যাপার। কী হতে কী হয়ে যায় আর ওখানকার টুকুন রায়রা কেমন পাকিয়ে তোলে কে জানে। তাহলে ওদিকে গিয়ে কাজ নেই। আমি ভাবছিলাম এসব লোকেদের মুখে ঝামা ঘষা উচিৎ নাকি এড়িয়ে যাওয়া--” 

অভি বলে উঠল, “তাহলে রেজাল্ট পেলে কস্ট-বেনেফিট অ্যানালিসিসের?” 

মুচকি হাসল সুরচিতা। তারপর বলল, “আসলে তোর টাস্ক লিস্টে এরপর একটা বাড়ির ব্যবস্থা করা জরুরি। আমি সাইট সিলেকশনের চেষ্টা করছিলাম।” 

অভি প্রশ্ন করল, “আগে বাড়ি?” 

তারপর বলল, “বেশ তোমার যখন ওটাই প্রায়োরিটি তবে তাই হবে।” 

সুরচিতা বলল, “আমার প্রায়োরিটির কথা নয়। এটা তোর প্রয়োজন। বাবা-মাকে রাখবি কোথায়? ঐ বাসাবাড়িতেই?” 

অভি বলল, “এখনও ভাবি নি। তবে ভাবাচ্ছ যখন, তখন বলতে পারি, না বাসাবাড়িতে রাখব না। কিন্তু এই বাজারে বাড়ি কোথায় পাব? যেখানে জমি কিনে বাড়ি বানানো যাবে, বাবা-মা কী সেখানে গিয়ে থাকবে? মানে ঐ দেশে ঘরে বা সেরকম কোথাও। নাকি সেখানে ভাগের জমি এতদিন পরে চাইতে গেলে উজিয়ে থাকা হাতগুলো না মারধর করে হ্যান্ডশেক করবে? আর যেখানে এতকাল কাটাল সেখানে আমি একটা ফ্ল্যাট কিনতে পারি বড়ো জোর।” 

সুরচিতা বলল, “ভালো হয় যদি তোর কাছে নিয়ে গিয়ে ওঁদের রাখতে পারিস।” 

অভি বলল, “তাহলে তো মেসে থাকতে পারব না, অনেক বেশি বাড়িভাড়া দিতে হবে। নিজের বাড়ি বানাতে বা নিদেনপক্ষে একটা ফ্ল্যাট কিনতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। তারওপর আমার কবে কোথায় ট্রান্সফার হবে তার ঠিক নেই।”

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)


Friday, May 15, 2026

Panchpoksho - 42

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



আত্মপক্ষ

~~~~~~

তারপর সুরচিতা প্রেমিকটির আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে পরল। মাফিন আর কফি খেতে খেতে দুজনের অনেক হাসি ঠাট্টা হলো। এখন অনিশ্চয়তাগুলো অনেকটাই ওদের দুজনের নিয়ন্ত্রণে; আত্মবিশ্বাসও অনেক বেশি, দুজনেরই। 

শেষ যখন ওরা মুখোমুখি হয়েছিল তখনও এমন হাসিঠাট্টার অবকাশ ছিল না। এমন একান্ত যাপনের সুযোগও ছিল না তখন। 

সন্ধের মুখে সুরচিতার মায়ের ফোন এলো। মা জানতে চাইলেন, “কী করে কী খাওয়ালি অভিকে?” 

সুরচিতা বলল, “সেটা তুমি অভির মুখ থেকেই শোনো।” 

অভি উচ্ছসিত হয়ে বলতে লাগল এসে থেকে ও কী কী খেয়েছে। তারপর খুশি খুশি গলায় “গুড নাইট” বলে মা ফোনটা রেখে দিলেন।


সুরচিতা অভিকে জিজ্ঞেস করল, “বাড়িতে খবর দিয়েছিস?” 

অভি বলল, “না। দিচ্ছি।” 

দীপ্তি অনেক ধন্যবাদ দিলেন সুরচিতাকে এই জন্য যে অভিকে মানুষ করায় সে ওঁদের সাহায্য করেছে বলে। ফোনটা স্পিকার মোডে ছিল। অভি হাসছিল। দীপ্তির সাথে কথাবার্তা সারা হতে সুরচিতা বলল, “তোর মামার বাড়ির দিকে গিয়েছিলি?” 

অভি বলল, “জন্মে থেকে মা কোনোদিন নিয়ে যায় নি মায়ের নিজের বাড়িতে, সেখানে আমি হঠাৎ যেতে যাব কেন?” 

সুরচিতা বলল, “মা কেন নিয়ে যাননি জানিস?” 

অভি বলল, “ওখানে গেলেই নাকি বাবাকে সবাই মেরে ফেলবে আর মাকে আর আমাকে আটকে রাখবে।” 

সুরচিতা বলল, “কিংবা তোদেরও মেরে ফেলবে। এখন ভাবতে হবে লাভটা কিসে--মেরে ফেলায় না আটকে রাখায়?” 

অভি কিচ্ছু বুঝতে পারছিল না, বলল, “মানে?” 

সুরচিতা বলল, “তোর বাবার চার ভাই, সকলেই বাবার বড়ো তাই তো?” 

অভি বলল, “তাই-ই তো শুনেছি।” 

সুরচিতা বলল, “সবাই-ই সরকারি-আধাসরকারি চাকুরে আর বাড়ির জমিজমার অংশীদার। তোর বাবা ইস্কুলে পড়ার সময়ই ঠাকুর্দা মারা গিয়েছিলেন। বাবা বড়ো হয়েছিলেন মূলতঃ দাদাদের আশ্রয়ে। ফলে তিনি সবার ছোটো হলেও খুব আদরের ছিলেন না। এখন তিনি অবিবাহিত বা নিঃসন্তান মারা গেলে তাঁর অংশীদারিটুকু এঁরা পেয়ে যেতেন। আর তাঁকে সপরিবারে নিকেশ করতে পারলেও তাই।” 

বিরক্ত মুখে ভ্রূ কুঁচকে অভি বলল, “ধুর কী সব শুরু করলে? তোমার সাথে অনেক জরুরি কথা আছে--” 

ওকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে সুরচিতা বলল, “সে তো আছিস কদিন, বলবি না হয়।”

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Wednesday, May 13, 2026

Panchpoksho - 40

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~


প্রতিপক্ষ

~~~~~~

সুরচিতা দুদিকে মাথা নেড়ে বলেছিল, “বলতে পারব না। গত কয়েক বছরে জীবনের যে দিশা দেখেছি, যা করে চলেছি, যা করতে চাই আজ সবই এখানে আসার পরে ঠিক করা। যা ভেবে এখানে এসেছিলাম তার সাথে সে সবের কোনো মিলই নেই। আগামী কয়েক বছর কী করব জানি আজ। কিন্তু সেই ‘কয়েক’ বছরের মধ্যে ঠিক কটা বছর, বা মাস, বলতে পারব না। তারপর জীবন যেরকম ভাবাবে সেরকম চলব।” 

ধৃতিকান্ত অধৈর্য হয়ে বলেছিল, “কোনো মানে হয়? দশ বছর পর তোর যদি মনে হয় ‘আমাজনের জঙ্গল দেখি’, পারবি না। তখন শরীরের জোরও থাকবে না। হতাশ হয়ে যাবি--।” 

সুরচিতা সামলে নিয়েছিল তর্কের সেই উত্তপ্ত উন্মত্ততা, “যখন ইচ্ছে হবে তখন চেষ্টা করব এই মিশনের আমাজন শাখায় বদলি নেওয়ার। না হলে যে দেশের কারেন্সি তখন স্ট্রঙ্গেস্ট থাকবে সে দেশে পোস্ট ডক করতে চলে যাব। কয়েক বছরে আমাজন দেখার পয়সা উঠে আসবে।” 

তখন ধৃতিকান্ত শান্ত হয়ে বলেছিল, “তাহলে পিএইচডি করে ফেলেছিস?” 

সুরচিতার চেহারায় ফুটে ওঠা সম্মতি দেখে আবার বলেছিল, “সে অবশ্য পোস্ট ডক করতে তো যখন তখন যাওয়াই যায়--কিন্তু কতদিন করেছিস পিএইচডি? তারপর কী আর অ্যাকটিভলি রিসার্চ করছিস? না হলে--” 

কথা কেড়ে নিয়েছিল সুরচিতা, “পিএইচডি পেলাম তাও বছর পাঁচেক হলো। তারপর থেকে যা কাজ করছি তা নিয়ে গোটা তিনেক পেপারও বেরিয়েছে রে, তবে সেগুলো সবই সোশ্যাল সায়েন্স জার্নালে।” 

ট্রেন তখন তিনপাহাড়ি ঢুকছিল। সুরচিতা সিট থেকে উঠে দরজার দিকে যাচ্ছিল। ধৃতিকান্ত সমাহিত গলায় বলেছিল, “তোর সাথে আবার কবে দেখা হবে?” 

সুরচিতা হেসে বলেছিল, “হবে হয়তো। এত ভাবিস না।” 

তারপর টুক করে নেমে পড়েছিল। ওকে বেশ খানিকটা উজিয়ে গিয়ে চড়াই ভাঙতে হতো। ধৃতিকান্ত এগিয়ে গিয়েছিল জাংশনের দিকে, সেখান থেকে এয়ারপোর্টে গিয়ে ওর রাত্রিযাপন ও উড়ানের পরিকল্পনা ছিল।

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)


Tuesday, May 12, 2026

Panchpoksho - 39

পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রতিপক্ষ

~~~~~~

মধ্যে মধ্যে চলছিল টুকটাক কথাবার্তা আর তর্কাতর্কি। সুরচিতা খুব খোলামনেই তার মনের অবাক চেহারাটা মেলে ধরেছিল যে তেরটা বসন্ত ধৃতিকান্ত একলা কাটিয়েছে। ধৃতিকান্ত হেসে বলেছিল, “তুইও তো প্রেমিককে ছেড়ে অনির্দিষ্টকাল নির্বাসন নিয়েছিস। কী করে আছিস?” 

সুরচিতা বলেছিল, “কাজ নিয়ে।” 

ধৃতিকান্ত জবাবে বলেছিল, “আমি কী শুয়ে বসে খেলে কাটিয়েছি এতোগুলো বছর?” 

তারপর প্রায় বুজে যাওয়া স্বরে গলার কাঁপন লুকিয়ে বলেছিল, “একটা জলজ্যান্ত স্বপ্ন থাকলে, সেটা সত্যি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকলে, বছরগুলো চোখের নিমেষে পার হয়ে যায়। যেখানে যা কিছু সুন্দর দেখেছি সব জায়গায় তোকে আমার পাশে টের পেয়েছি। কিন্তু এখন দেখছি সেসব নেহাতই কাঁচা মনের কল্পনা।” 

তারপর মুহূর্তেই গলার উদাসভাবে ঝেড়ে বলেছিল, “পড়ানোর কাজে আর কত সময় যায় তোর? বাকি সময় কিসে যায় তোর?” 

সুরচিতা গলায় দুষ্টুমি জড়িয়ে বলেছিল, “ছক কষে। কীসের ব্যবসায় মূলধন কতো লাগে, লোক কতো লাগে, টেকনোলজি কী লাগে, কতগুলো লোকের কত সময়ের এমপ্লয়মেন্ট হয় এইসব। বাচ্চাদের মনস্তত্ত্বের বই পড়ে। ধেড়েদের মুখে খুড়োর কল ঝোলাবার ফিকির খুঁজে। খুড়োর কল কাস্টমাইজ করার প্ল্যানে। ধেড়েদের মনস্তত্ত্ব আর মন প্রভাবিত করার উপায় খুঁজে।”


ধৃতিকান্তর ফেরার ফ্লাইট ছিল পরদিন ভোরে। তাই খাওয়ার পরেই ওরা ন্যারোগেজ ট্রেনে চেপে বসেছিল। এটা সেটা বকবক করতে করতেই ধৃতিকান্ত বলে ফেলেছিল, “এখানে কী রাজনীতি নেই? ঝগড়া নেই? আমাকে বোঝাতে আসিস না যে প্রতিষ্ঠান আছে আর তাতে ক্ষমতা দখলের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটা এই সব মহিলারা ছেড়ে দিয়েছেন।” 

সুরচিতা অস্বীকার করেনি, “আছে সবই। কালই বললাম তো। কিন্তু আমার সাথে তার কোনো যোগাযোগ নেই। সরকারি গ্রান্ট পায় মিশন, ইস্কুল চালাবার জন্য। তার শর্ত পালনের জন্য আমার মতো দুচারজন অধার্মিককে মাইনে দিয়ে, পেনশনের ভরসা দেখিয়ে ওদের পুষতে হয়। তার সাথে লোভ আছে আমাদের ধর্ম দীক্ষা দিয়ে ইন্সেন্টিভ কামানোর। সিম্বায়োসিস, বন্ধু। আমরা একসাথে আছি।” 

ধৃতিকান্ত জানতে চেয়েছিল, “সারা জীবন এমনই কাটাবি তাহলে?”

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Monday, May 11, 2026

Panchpoksho - 38

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রতিপক্ষ

~~~~~~


ধৃতিকান্তর চোখে ‘ফির কেয়া হুয়া’ জাতীয় প্রশ্নের ছায়া দেখে, বলে চোলে, “এতক্ষণে তাঁরা কাজ শেষ করে ফেলে নিজের নিজের জপমালা বা ধর্মগ্রন্থ নিয়ে বসে গেছেন বাগানে বা বারান্দায় বা বসার ঘরে। বারোটার ঘন্টা বাজলে আবার হেঁসেলে যাবেন, ডাল-ভাত-তরকারি খাবেন, বাসন-কোসন মাজবেন ফের দিবানিদ্রা দেবেন, বা আচার শুকোবেন কী লেস বুনবেন, কিংবা সোয়েটার। কেউ কেউ পাড়াও বেড়াতে বেরোন। বিকেলে উপাসনাকেন্দ্রে গিয়ে পিয়ানো বাজিয়ে গান-টান গাইবেন। তারপর রাতের খাওয়া সেরে নেবেন।”

বিস্তারিত বিবরণের পর এলো উপসংহার, “তাহলে বুঝেছ? এখানে তুমি চাও বা না–চাও ভোররাতে ঘুম ভাঙবেই। তবে দিনের কাজে কেউ কেউ আবার আপোশও করবেন। সরেজমিনে দেখতে আসবেন আপ হামারে হ্যাঁয় কৌন?” 

ব্যাজার মুখে ধৃতিকান্ত বলেছিল, “আমি তোর ভেতরের ঘরে ঘুমোতে যাচ্ছি।” 

ঝটিতি জবাব দিয়েছিল সুরচিতা, “বাব্বা শুধু পুরুষবন্ধু নয়, এক্কেবারে বেডরুমে! কী মশলা গো সন্ন্যাসিনীদের পানসে জীবনে! ওঁরা বচ্ছরভরের খোরাক পাবেন রে, আমাদের দুহাত তুলে আশির্বাদ করবেন।” 

ধৃতিকান্ত ঘরের ভেতর থেকে গজগজ করে কী বলেছিল শুনতে পায় নি সুরচিতা।


স্নান সেরে ব্রেকফাস্ট বানিয়ে তৈরি হয়ে নিয়েছিল সুরচিতা। তারপর আবার চা নিয়ে বসে ও খবরের কাগজ উল্টেপাল্টে দেখতে দেখতেই ধৃতিকান্ত স্নান সেরে তৈরি হয়ে গিয়েছিল। খাওয়া সেরে বেরোনোর মুখে দেখা হয়ে গিয়েছিল একদল সন্ন্যাসিনীর সাথে। ওঁরা গুহামন্দিরের বাগানের পরিচর্যা সেরে ফিরছিলেন বাসায়। ওঁদের অনেকেই আবার সুরচিতার সহকর্মী। ওঁদের সাথে ধৃতিকান্তের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল সে। 

সন্ন্যাসিনীরা পরামর্শ দিয়েছিলেন জেলাশহর টৌলিং দেখতে যাওয়ার। কারণ সেটা পুরোনো দিনের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী হওয়ায় ঐতিহাসিক শহর। তারওপর স্থানীয় মানুষের উৎসাহে ইতিহাস সেখানে এখনও জেগে আছে গলিঘুঁজি থেকে রাজপথে। ফলে বেশ আকর্ষণীয় গম্ভীর জায়গা। আবার পুরোনো রঙে রাঙা হলেও বেশ ঊজ্বল। 

তারপর ওঁরা ঘুরে ঘুরে ধৃতিকান্তকে দেখিয়ে ছিলেন গুহামন্দির, উপাসনাকেন্দ্র, আর আবাসিক অংশ বাদে মঠের আনাচকানাচ। সিঁড়ি দিয়ে হাইওয়েতে নেমে সুরচিতারা ট্রেকার পেয়ে গিয়েছিল টৌলিং-এ যাওয়ার। চকে গিয়ে ঘুরতে ঘুরতে বকবক করতে করতে বাছাই করা রেস্তোরাঁতে পৌঁছে ওরা খাওয়া-দাওয়াও সেরেছিল।

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Sunday, May 10, 2026

Panchpoksho - 37

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রতিপক্ষ

~~~~~~

ধৃতিকান্তর উত্তর সুরচিতার অজানা ছিল না। সে বলেছিল, “না, তোর বাবা ফোন ধরেছিলেন। তোর মোবাইল নাম্বার দিলেন, ঠিকানা দিলেন। আজ এলে তোকে পাব কিনা সেটা আমিই জিজ্ঞেস করেছিলাম। আমি যদিও তিনটে হাওয়াই আড্ডা পার হয়ে তবে তোর এখানে এলাম, কিন্তু তোর বাবাকে ফোন করেছিলাম ইউসিএলএ থেকেই।” 

সুরচিতা পুরোনো দিনের মতো উচ্ছসিত হয়ে বলেছিল, “বস! তুমি তো হলিউডের কোলের ছেলে এখন।” 

ধৃতিকান্ত হেসেছিল মুচকি। সুরচিতা আবার বলেছিল, “বাবা কী জানেন যে তুই আইএসডি করছিলি?” 

ধৃতিকান্ত নেতিবাচক মাথা নেড়েছিল। তারপর বলেছিল, “চিতা, তুই সত্যিই ডিজিট্যাল পৃথিবীর বাইরে। এখন আইএসডি করার দরকার পড়ে না। ভিওআইপি দিয়েই সস্তায় কথা বলা যায়।” 

শ্রোতার গোল গোল চোখ দেখে আবার বলতে শুরু করেছিল, “ভিওআইপি মানে--” 

তাকে মাঝপথে থামিয়ে সুরচিতা বলেছিল, “নে এবার ঘুমো। আমার পড়শিরা আবার চারটে থেকে উঠে ঘন্টা বাজাতে শুরু করবে।”


সকাল বেলা দুকাপ চা হাতে বসার ঘরে এসেছিলো সুরচিতা। ধৃতিকান্ত তখনও ঘুমোচ্ছিল। সুরচিতা ওকে ডেকে তুলতে ও উঠে বসল ধড়মড়িয়ে। তারপর হাই তুলতে তুলতে বলল, “ওরে বাবা চারটের সময় অতো ঘন্টা বাজল কেন? তারপর গুনগুন করতে করতে লোকজন যায় আর আসে, যায় আর আসে। ঘুমের দফারফা।” 

সুরচিতা ‘আগেই-তো-বলেছিলাম’ জাতীয় একটা ভঙ্গিমায় জবাব দিয়েছিল, “সন্ন্যাসিনীরা ছটায় ডিনার খেয়ে শুয়ে পড়েন। অন্ধকার থাকতে উঠে ধম্মকম্মে লাগেন। ঊষালগ্নে গুহার মধ্যে রাখা জাগ্রত দেবতার মূর্তিতে অর্ঘ্য অর্পণ করে জপতপ সারেন। তারপর উপাসনাকেন্দ্রে গিয়ে ভগবানের অবতারদের গানটান শোনান। ফের পুরুত শান্তির জল ছেটান আর সবাই মাথা পেতে নেন; তারপর “নবজন্মের আরক” বা “এলিক্সির অফ রিজুভেনেশন” নামে ভগবানের প্রথম অবতারের আঙুলের ডগা ছোঁয়া চিনির জল খেয়ে নিজেদের হেঁসেলে ঢোকেন।”

শ্রোতার মনোযোগে ইন্ধন দিয়ে বলে চলে, “বরাদ্দ মতো দুধ বা চা, পাঁউরুটি, কলা, ডিম, আপেল যে যা খান তাই খেয়ে যার যা কাজ তাতে লেগে পড়েন। মানে কেউ রান্না করেন, তো কেউ করেন মশলা, কেউ বাসন মেজে ধুয়ে মুছে তাকে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখেন, কেউ কেউ কাপড় জামা চাদর লেপ বালিশের ওয়াড় পিছনের বাগানের উনুনে সাবান দিয়ে সেদ্ধ করে কেচে ধুয়ে শুকোতে দেন, কেউ বা আবার ঘর বারান্দা উঠোন সব ঝাড়ু দিয়ে মুছে সাফ করেন। মানে সন্ন্যাসিনীরা সব কাজ সারেন, একা একা বা দলে দলে।”

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Saturday, May 9, 2026

Panchpoksho - 36

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রতিপক্ষ

~~~~~~

ধৃতিকান্ত অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছিল, “তবে কী? তুই সন্ন্যাসিনীদের নিয়ে খোরাক করবি, যাকে ভালোবাসিস তাকে বিয়ে করবি না...কী ন্যাকামি এসব?” 

সুরচিতা ধাঁধার সমাধান করে দিয়েছিল, “দেখ ধৃতি, যখন কলেজে পড়তাম তখন একটা ছেলের সাথে একটা মেয়ের একটু মেশামিশি হলে যদি একজনের অন্যজনকে ভালো লাগত তাহলে সে কথা জানাজানিও হয়ে যেত। জানার পর কিছুদিন কী করি কি না করি করে অন্যজন একটা সম্পর্কে রাজিও হয়ে যেত বেশিরভাগ সময়েই। তারপরে সেসব সম্পর্ক টিঁকে গেছে বা ভেঙে গেছে, বা ভেঙে জোড়াও লেগেছে। সেরকম সময়ে যদি বলতিস, তাহলে হয়তো আমিও ধানাইপানাই করে রাজি হয়ে যেতাম। কিন্তু--” 

ধৃতিকান্ত গর্জে উঠেছিল, “আমি সেদিন বলি নি বলে--” 

সুরচিতাও বাধা দিয়েছিল, “আমি মোটেও বলছি না যে সেদিন না বলে এতোদিনে বলছিস বলে আমি রাজি নই।” 

ধৃতিকান্ত হতাশ গলায় বলেছিল, “আমি জানি, তৈরি হয়ে কোমর বেঁধে আসতে গিয়ে আমি দেরি করে ফেলেছি। আমার আগে কেউ তোকে--। ছাড়। কলেজে তুই সারাক্ষণ খিঁচিয়ে থাকতিস। কিচ্ছু পছন্দ নয় তোর। শুধু নম্বর পেতে হবে। ফার্স্টক্লাস পেতে হবে। ফার্স্টক্লাস পেয়ে কী করবি? কোথায় মাস্টার্স করবি? কোথায় পিএইচডি করবি? কিচ্ছু দিশা নেই। শুধু ছুটছে দম দেওয়া পুতুলের মতো। কাউকে বিশ্বাস করতিস না। আমি তোকে তাই বলতে পারিনি, যদি আমার বন্ধুত্বও বাতিল করিস! তারপর আমরা সবাই শহর ছেড়ে চলে গেলাম। তোকে দিয়ে কোনো ইন্‌স্টিটিউশনের ফর্ম পর্যন্ত তোলানো যায় নি। তোকে নাকি তোর বাবা-মা যেতে দেবেন না। এতোদিন পরে যখন দ্বিধার বয়স পেরিয়ে আমরা ধৈর্য ধরতে শিখেছি মনে করলাম তখন দেখি--। তোর বিয়েতেও কি বাবা-মায়ের আপত্তি?”


প্রশ্নটা না পেলে সুরচিতার জবাব দেওয়ার কিছু ছিল না। সবটাই সে বুঝেছিল। খুব শান্ত গলায় উত্তর দিয়েছিল, “তোর পুরো ভাবনার ওপর আমি শ্রদ্ধাশীল। যা করেছিস তার থেকে ভালো কিছু হয় না আমার বিবেচনায়। তোর প্রশ্নের উত্তর হলো যাকে ভালোবাসি তাকে বিয়ে করব শুনলে বাবা-মার সেরিব্রাল থ্রম্বোসিস হবে। তবে বিয়ে না করার সেটা কারণ নয়। সেটা কাল বলব। তোকে বিয়ে করলে বাবা-মার আপত্তি হয়তো হতো না। অন্তত তোকে ঠিকানা দিয়েছেন; আজ তুই আসতে পারিস মনে করে মা আজ ফোনও করল না। এসব দেখে তো তাই মনে হচ্ছে। কিন্তু তুই কী আমার বাড়িতে জানিয়েছিস যে তুই কোথায় থাকিস এখন, কী কাজ করিস আর আমার কাছে কেন আসছিস?” 

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Friday, May 8, 2026

Panchpoksho - 35

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রতিপক্ষ

~~~~~~

সুরচিতা বলেছিল, “এতো দিন পরে তোর সাথে আড্ডা, তাতে হাড্ডিগুলো জড়ো হলে আমি সহ্য করব না।” 

ধৃতিকান্ত সওয়াল করার সুযোগ পেয়েছিল, “আমাকে মিস করেছিস এতোদিন তো যোগাযোগ করিস নি কেন?” 

সুরচিতার জবাব যেন শানানো ছিল, “তুইই তো চিঠি লেখা বন্ধ করে দিয়েছিলি, চেন্নাই ছাড়ার পর।” 

ধৃতিকান্ত নাছোড়, “ই-মেল ছিল, গ্রুপ মেল ছিল...” 

সুরচিতার কারণ জোরালো, “ডিজিটাল ডিভাইড। তোর হস্টেলের ঘরে ইন্টারনেটের প্লাগ ইন ছিল; আমি মাসে একবার সাইবার কাফে গিয়ে যখন লগ ইন করতাম তখন গাদা গাদা বিজনেস মেল মুছে আঙুলে ব্যথা হয়ে যেত, সময় আর পয়সা দুই-ই নষ্ট হতো, তার থেকেও বেশি খারাপ হতো মেজাজ। তার ওপর গুঁইবাবুর নাতি সারাক্ষণ নজরদারির অছিলায় আমার স্ক্রিন পড়তো, গায়েও পড়তো। মফস্বলের গায়েপড়ামি তো আর জীবনে বুঝতে হলো না, হলে বুঝতিস প্রাইভেসির অ্যাইসি কী ত্যাইসি কাকে বলে।”


ধৃতিকান্তর ‘এমনি’ অমলেটও খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। সুরচিতা বলেছিল, “কী খাবি-–আইসক্রিম না চিলড রসগোল্লা?” 

ধৃতিকান্তর পছন্দ ছিল অন্য, বলেছিল, “গরম পান্তুয়া পেলে ভালো হতো।” 

ফ্রিজ থেকে পান্তুয়া বার করে সুরচিতা মাইক্রোওয়েভে দিয়ে তাতিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ধৃতিকান্ত পান্তুয়া রেখে বাসন মেজেছিল। আর গুম হয়ে গিয়েছিল।


ছেলেটা জামাকাপড় বদলে যখন বসার ঘরে ফিরে এসেছিল, ততক্ষণে ডিভান দখল করে বিছানা পাতা হয়ে গিয়েছিল। সুরচিতা একটা মোড়ায় বসে বই পড়ছিল। ওর সামনে হাঁটু মুড়ে বসে ধৃতিকান্ত বলেছিল, “কেটে যাওয়া দিন আর ফিরবে না। আস্ত আমি তো এসেছি, তোর অভিমান কী করে জিতি বল?” 

সুরচিতার গলা বুজে এসেছিল। বলেছিল, “তুই আমার আকৈশোরের একটা স্বপ্নকে সত্যি করে দিলি!” 

উৎসাহ পেয়ে ধৃতিকান্ত বলেছিল, “তাহলে তুই আমাকে বিয়ে করবি?” 

সুরচিতা এবার খুব স্নেহে ধৃতিকান্তর হাতের তালুতে নিজের হাত বুলিয়ে বলেছিল, “না, করব না। জানি তুই কষ্ট পাবি। কিন্তু তবু--করব না। করতে পারব না। করলে আমি কষ্ট পাব।” 

ধৃতিকান্ত বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে বলেছিল, “কষ্ট পাবি কেন? তুই কি অন্য কাউকে--” থেমে গিয়েছিল তার প্রশ্নে সুরচিতার ইতিবাচক ঘাড় নাড়া দেখে।


ধৃতিকান্ত ডিভানে ধপ করে বসে পড়তে সুরচিতা নীরবতা ভেঙেছিল, “অন্য কাউকে ভালোবাসি বলে তোকে বিয়ে করব না এমন নয়। জানি একদিন তোর মতোই সে উদয় হবে তার ভালোবাসার দাবি নিয়ে...”

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Thursday, May 7, 2026

Panchpoksho - 34

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রতিপক্ষ

~~~~~~

সুরচিতা বলেছিল, “এতো দিন পরে তোর সাথে আড্ডা, তাতে হাড্ডিগুলো জড়ো হলে আমি সহ্য করব না।” 

ধৃতিকান্ত সওয়াল করার সুযোগ পেয়েছিল, “আমাকে মিস করেছিস এতোদিন তো যোগাযোগ করিস নি কেন?” 

সুরচিতার জবাব যেন শানানো ছিল, “তুইই তো চিঠি লেখা বন্ধ করে দিয়েছিলি, চেন্নাই ছাড়ার পর।” 

ধৃতিকান্ত নাছোড়, “ই-মেল ছিল, গ্রুপ মেল ছিল...” 

সুরচিতার কারণ জোরালো, “ডিজিটাল ডিভাইড। তোর হস্টেলের ঘরে ইন্টারনেটের প্লাগ ইন ছিল; আমি মাসে একবার সাইবার কাফে গিয়ে যখন লগ ইন করতাম তখন গাদা গাদা বিজনেস মেল মুছে আঙুলে ব্যথা হয়ে যেত, সময় আর পয়সা দুই-ই নষ্ট হতো, তার থেকেও বেশি খারাপ হতো মেজাজ। তার ওপর গুঁইবাবুর নাতি সারাক্ষণ নজরদারির অছিলায় আমার স্ক্রিন পড়তো, গায়েও পড়তো। মফস্বলের গায়েপড়ামি তো আর জীবনে বুঝতে হলো না, হলে বুঝতিস প্রাইভেসির অ্যাইসি কী ত্যাইসি কাকে বলে।”


ধৃতিকান্তর ‘এমনি’ অমলেটও খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। সুরচিতা বলেছিল, “কী খাবি-–আইসক্রিম না চিলড রসগোল্লা?” 

ধৃতিকান্তর পছন্দ ছিল অন্য, বলেছিল, “গরম পান্তুয়া পেলে ভালো হতো।” 

ফ্রিজ থেকে পান্তুয়া বার করে সুরচিতা মাইক্রোওয়েভে দিয়ে তাতিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ধৃতিকান্ত পান্তুয়া রেখে বাসন মেজেছিল। আর গুম হয়ে গিয়েছিল।


ছেলেটা জামাকাপড় বদলে যখন বসার ঘরে ফিরে এসেছিল, ততক্ষণে ডিভান দখল করে বিছানা পাতা হয়ে গিয়েছিল। সুরচিতা একটা মোড়ায় বসে বই পড়ছিল। ওর সামনে হাঁটু মুড়ে বসে ধৃতিকান্ত বলেছিল, “কেটে যাওয়া দিন আর ফিরবে না। আস্ত আমি তো এসেছি, তোর অভিমান কী করে জিতি বল?” 

সুরচিতার গলা বুজে এসেছিল। বলেছিল, “তুই আমার আকৈশোরের একটা স্বপ্নকে সত্যি করে দিলি!” 

উৎসাহ পেয়ে ধৃতিকান্ত বলেছিল, “তাহলে তুই আমাকে বিয়ে করবি?” 

সুরচিতা এবার খুব স্নেহে ধৃতিকান্তর হাতের তালুতে নিজের হাত বুলিয়ে বলেছিল, “না, করব না। জানি তুই কষ্ট পাবি। কিন্তু তবু--করব না। করতে পারব না। করলে আমি কষ্ট পাব।” 

ধৃতিকান্ত বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে বলেছিল, “কষ্ট পাবি কেন? তুই কি অন্য কাউকে--” থেমে গিয়েছিল তার প্রশ্নে সুরচিতার ইতিবাচক ঘাড় নাড়া দেখে।


ধৃতিকান্ত ডিভানে ধপ করে বসে পড়তে সুরচিতা নীরবতা ভেঙেছিল, “অন্য কাউকে ভালোবাসি বলে তোকে বিয়ে করব না এমন নয়। জানি একদিন তোর মতোই সে উদয় হবে তার ভালোবাসার দাবি নিয়ে...”

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Wednesday, May 6, 2026

Panchpoksho - 33

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রতিপক্ষ

~~~~~~

সুরচিতা আবার যেন ফিরে গেল অন্য এক দৃশ্যে, “ক্রিপ্টোমেরিয়ার কালচে ভেজা গায়ে রমণীর খোঁপায় লাগান জুঁইয়ের মালার মতো ঝুলে থাকা সাদা সাদা অর্কিডের গোছা, গোধূলির পীতাভায় দিন শেষের দীর্ঘশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে থাকে অতল খাদে, যেন কার অপেক্ষায় ছিল, সে বুঝি আসে নি; আর ভোরের রক্তিমায় লজ্জারুণ হয়ে জেগে ওঠে নতুন অপেক্ষায়, অক্লান্ত চেয়ে থাকে সারাদিন পথের দিকে, যদি সে আসে, যদি সে আসে।” 

ধৃতিক্লান্ত অবাক গলায় বলল, “বাব্বা পাহাড়ে যাদু আছে দেখছি! তোর মতো ঝগড়ুটে, মুখরা মেয়েকেও কবি বানিয়ে ফেলল।” 

বাস্তব আর বর্তমানে ফিরতে ফিরতে সুরচিতা বলল, “না, কাব্য আর হলো কই--। তবে তখন এমন তারাভরা আকাশ দেখতে পেতিস না। গাছভরা রডোডেনড্রন আর গোলাপ দেখতে পেতিস না।” 

গ্লাসের গায়ে চামচ বাজিয়ে প্রিয় বন্ধুর খোঁজে অনেকগুলো বছর উজিয়ে আসা ছেলেটা গাইতে শুরু করেছিল, “মাশরুমের বদলে তারা পেলুম তাই রে নাই রে না...”


সুরচিতা আঁতকে উঠেছিল, “করছিস কী? থাম থাম। এখানে চারপাশে চিরকুমারীরা থাকেন। তোর পৌরুষের গন্ধে তাদের এমনিই ঘুমের ব্যাঘাত হয়েছে আজ রাতে; তার ওপর তুই এমন মেটিং কল দিলে ওঁদের যে নরকেও জায়গা হবে না?” 

গল্পের গন্ধে থেমে গিয়েছিল ধৃতিকান্ত। তারপর একটা অমলেট একটা প্লেটে সাজিয়ে আরেকটা বোল দিয়ে ঢেকে রেখেছিল টেবিলের একধারে। তারপর একমুখ গরম খিচুড়ি জিভে লোফালুফি করতে করতে জিজ্ঞেস করেছিল, “তুই কী সন্ন্যাস নিবি নাকি? দুবেলা মালা নিয়ে জপা প্র্যাকটিস করছিস? নাকি এরা অন্য কিছু নিয়ে জপে? কিন্তু খেতে বসে প্রেয়ার করলি কই?” 

সুরচিতা চামচ দিয়ে নেড়ে নেড়ে পাতের খিচুড়িটা ঠাণ্ডা করতে করতে জবাব দিয়েছিল, “আমি এদের মাইনে করা অঙ্কের মাস্টার। ধম্মকম্ম করলেই এরা শত্রুতা শুরু করবে। ভাববে আমিও বুঝি হেডমাস্টারনি হতে চাই, ক্ষমতার দখল নিতে চাই।” 

এই খানে ফস করে ধৃতিকান্ত বলে বসে ছিল, “এই ধ্যাধ্‌ধ্যাড়া পাহাড় চুড়োয় আবার ক্ষমতা কী রে? অগুণতি মেঘলা দিন, আর পাগলা করা মনখারাপ, এখানে ক্ষমতার লোভ তাও আবার...কেউ থাকে!” 

বাকি কথাগুলো অট্টহাসিতে ঢেকে গিয়েছিল। আবার সুরচিতা, “শ্‌শ্‌শ্‌শ্‌শ্‌...” করে উঠেছিল। তারপর বলেছিল, “যেখানে পাইয়ের সাইজ যেমন, খেয়ে হজম করার লোকের পাকস্থলীর মাপ আর স্বাস্থ্য তো তেমনই হবে। কাল খুব ভোরে উঠে শহরে যাবো আর রাত করে ফিরব। না হলে তোর মতো ডবকা ছোকরার আওয়াজ পেয়ে কুমারীরা সারা দিন ভ্যান ভ্যান করবে এখানে।” 

ধৃতিকান্ত খেই ফিরে পেয়েছিল, “তাতে তোর হিংসে হবে?” 

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Tuesday, May 5, 2026

Panchpoksho - 32

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রতিপক্ষ

~~~~~~

একটু পরে আবার বলেছিল ধৃতিকান্ত, “তের বছর আগে তুই ছিলি আমার প্রিয় বন্ধু। সেদিন আমি তোকে যেমনটা ছেড়ে রেখে গিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম তুই এখনও তাই আছিস। আমার প্রিয় বন্ধু। কিন্তু এই মুহূর্তে আমরা পরস্পরের কাছে প্রায় ভিনগ্রহী।” 

তারপরের নৈঃশব্দ দীর্ঘতর হয়েছিলো। একসময় বাস্তব বিবেচনা করে সুরচিতাকে বলতে হয়েছিলো, “বস, তুমি শহর থেকে পাঁচ মাইল দূরে, পাঁচশো ফুট উঁচুতে পাহাড়ের মাথায় বসে রোমান্টিক হতে পারো, কিন্তু তোমার পেট তো তাতে সায় দেবে না; এই গণ্ডগ্রামে তালি বাজালে ভূতের রাজার প্যান্ট্রিওয়ালাও আসবে না। আমি গেলাম খিচুড়ি, ডিম ভাজা রাঁধতে। এখন তুমি বসে অন্ধকার দেখবে, না আকাশের তারা গুণবে, নাকি খিচুড়ি ডিম ভাজার গন্ধে খিদে চাগাবে সেটা তোমার ব্যাপার।”


খিচুড়িটা হয়ে যেতে, সুরচিতা ডিম ভাজতে শুরু করেছিল। ঠিক তখনই ছুট্টে ঘরে ঢুকে পড়েছিল ধৃতিকান্ত। রান্না ঘরের দরজায় একটা টুল পেতে বসে বলেছিল, “আমাকে একটা অমলেট এমনি দিবি তো?” 

সুরচিতা হেসে ফেলেছিল, “বর্ষা কালে এলে এতে বেশ মাশরুম ঠেসে খাওয়াতে পারতাম। কিন্তু এখন পেঁয়াজ, লঙ্কা দিয়েই খেতে হবে। কাল থাকবি তো?” 

পাল্টা প্রশ্ন করেছিল ধৃতিকান্ত, “কেন, না হলে কী তোদের মুর্গিরা কাল স্ট্রাইক করবে?” 

সুরচিতা বলল, “না, কাল আমরা টৌলিং শহরে যাব এমুলুকের নুডুলের সেরা স্বাদ নিতে।” 

ধৃতিকান্ত তখন প্রায় অন্য যুগে; কলেজবেলার বাচালতায় মত্ত। বলেছিল, “না তুই বর্ষাকালের কথা কী বলছিলি? তখন এলে কী ভালো হতো? মাশরুম?” 

সুরচিতা বলল, “বটে। তার সাথে আরও অনেক কিছু।” 

ধৃতিকান্ত বলেছিল, “যেমন?” 

সুরচিতার দুচোখ যেন অনেক দূরের কিছু দেখছিল, “কোনো কোনো বাগানে জিঙ্গোবাইলোবার ডালে ঝোলা আনারসের মতো হলুদ অর্কিডের গোছা, হাসন্তমুখ ঘাস ফুল, আর ক্যালেন্ডুলার মতো অজস্র সাদা হলুদ ম্যাজেন্টা তারাফুলের গোছা।” 

ধৃতিকান্ত চোখ নাচিয়ে বলল, “এই ভ্যাপসা ভেজা এলাকাটাও সুন্দর হয়ে ওঠে বর্ষাতে? বসন্তকালে না হয় সব জায়গাতেই ফুল ফোটে। কিন্তু এখানে বর্ষাকাল সুন্দর বলছিস কী করে? সারাক্ষণ সবটা মেঘে ঢাকা থাকে না? ঘরের মেঝে থেকে জল ওঠে না বিন্দু বিন্দু!”

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Monday, May 4, 2026

Panchpoksho - 31

পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রতিপক্ষ

~~~~~~

সুরচিতা তিনপাহাড়ি আসার পর থেকেই মা ভীষণ ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন তার বিয়ে দেওয়ার জন্য। সুরচিতা মাকে বোঝাবার চেষ্টা করে নি যে বিয়েটা মা দেবেন না, দরকার পড়লে সে নিজেই করবে; বরং সোজাসুজি বলে দিয়েছে অনেকবার। ততোবার, যতোবার মা প্রসঙ্গটা তুলেছিলেন।

তারমধ্যে একটা শুক্রবার সন্ধের মুখে ধৃতিকান্ত এসে পৌঁছেছিল। এতোদিন পর এসে ছিল যে ধৃতিকান্তকে চিনতে সুরচিতার কয়েক মিনিট সময় লেগেছিল। তারপর খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতে সাল কটা গাঁটে গুনে সে বলেছিল, “তের বছর! আমি তো ধরেই নিয়ে ছিলাম যে তুই আমাকে ভুলে গেছিস।” 

ধৃতিকান্ত গোলাপ বাগান, পাথরের দেওয়াল, বাগানের কোণে রডোডেনড্রন দেখতে দেখতে বলেছিল, “ভুলে যে যাই নি তোকে সেটা প্রমাণ করে দিয়েছি বল?” 

সুরচিতা খুশিতে মাথা নাড়তে নাড়তে বলেছিল, “পয়েন্ট। তর্কের সুযোগ নেই।” 

তারপর বলেছিল, “ভিতরে চল, এখন আর এখানে বসে কিছু দেখা যাবে না।” 

ধৃতিকান্ত বলেছিল, “কেন? না হয় অন্ধকারটাই দেখব!” 

সুরচিতা বলেছিল, “তাহলে একলা বসে দেখ। আমি চা নিয়ে আসি। আরেকটা চেয়ার নিয়ে আসি।” 

ধৃতিকান্ত বসে পড়েছিল খালি চেয়ারটাতে।


একটু পরে একটা বাটিতে করে কুচো পেঁয়াজ আর চানাচুর দিয়ে মাখা চিঁড়েভাজা আর ধোঁয়াওঠা চায়ের দুটো কাপ একটা তেপায়া টুলে বয়ে নিয়ে এসেছিল সুরচিতা। তারপর আবার ভেতর থেকে আরেকটা চেয়ার নিয়ে এসে বসেছিল ধৃতিকান্তর পাশে। চুপ করে দুজনে চা আর চিঁড়েভাজা খাচ্ছিল। ধৃতিকান্তই বেশিটা খেয়েছিল। মাঝে মাঝে একটু একটু নিচ্ছিল সুরচিতা।


ধৃতিকান্তই বলেছিল, “আমরা যেন প্রৌঢ় দম্পতি। বাগানে পাশাপাশি বসে চা খাচ্ছি।” 

সুরচিতা বলেছিল, “আর অন্ধকার দেখছি, দুচোখে।” 

বলে ধৃতিকান্তর দিকে তাকিয়ে বাঁ চোখটা টিপতে গিয়ে কী যেন একটা দেখে ফেলেছিল ধৃতিকান্তর চোখে, সেই আধো অন্ধকারে।


ধৃতিকান্ত লুকোনোর চেষ্টা করেনি। চেয়ারের হাতলে আলতো রাখা সুরচিতার বাঁ হাতের তালুটা নিজের ডান হাতের মুঠোয় নিয়ে বলেছিল, “যেন এটা সত্যি হয়।” 

সুরচিতা শিউরে উঠেছিল যদিও, তবুও অকম্পিত গলায় বলেছিল, “বলিহারি তোর শখ, দু চোখে অন্ধকার দেখব বুড়ো বয়সে? কেন? চাওয়ার মতো আর কিছু ছিল না?” 

ধৃতিকান্ত কিন্তু মুঠো আলগা করে নি। জবাবে বলেছিল, “তুই ভালো করেই বুঝেছিস আমি প্রৌঢ় দম্পতি হতে চেয়েছি তোর সাথে। কিন্তু...ভুলটা আমারই। এতোদিন পরে সব আবার নতুন করে শুরু করতে হতো।” 

থেমে ছিল ধৃতিকান্ত। সুরচিতা চুপ করে শুনছিল, বলতে দিচ্ছিল ধৃতিকান্তকে।

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)


Readers Loved