Showing posts with label Bengali Prose. Show all posts
Showing posts with label Bengali Prose. Show all posts

Saturday, April 4, 2026

Panchpoksho -01

পাঁচপক্ষ
~~~~~~



প্রথমপক্ষ
~~~~~~
এখানে সন্ধে নামে ক্রমে। প্রথমে ঘাসে, তারপর উপাসনা কেন্দ্রের ছাদে, সব শেষে ক্রিপ্টোমেরিয়ার চূড়ায়। স্তরে স্তরে অন্ধকার জমা হয় তলা থেকে ওপরে। জলের মতো। নিজের কোয়ার্টাস্-এর বাগানে দুসারি মাছি গোলাপের মধ্যে বসে একটু একটু করে এভাবে অন্ধকারে ডুবে যেতে ভালো লাগে সুরচিতার। এসময় কিচ্ছুটি না করে গুটিসুটি প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে থাকতে ভালো লাগে তার।
তারপর তারারা আকাশে জাগে একে একে। কিংবা জাগে না। আকাশ মেঘের চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে থাকে। তারা শুদ্ধু আকাশটা জাগলে ঝাঁপ দেয় সামনের খাদে। নানা রঙের তারার আলোয় সন্ধেটা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। মনে হয় ওরা সবাই হাসছে, খেলছে। আর আকাশ ঘুমোলে খাদের কোলের উপত্যকাও কুয়াশার কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। সেখানে প্রাণ আছে কিনা বোঝার জো থাকে না। এই অনিশ্চিত মেঘ-কুয়াশার খেলায় কিন্তু নিশ্চিত ঘটনা হলো সুরচিতার মায়ের ফোন। সেটা রোজই আসে, সন্ধে নামার পরে।

আজও এলো। মা জানতে চাইলেন, “আজ রান্না করলি না আছে?”
আছে কি নেই জানে না সুরচিতা। কিন্তু বলল, “কালকের ভাত আছে। আজ ডাল করব আর মাছ ভাজব।”
এরপর প্রত্যাশিত দুখি দুখি সুরে মা বলবেন, “কেন, একটা ঢেঁড়সের ছেঁচকি কেন করলি না?”
সুরচিতা বলবে, “ক্লাস টেস্টের খাতাগুলো দেখতে হবে মা। এতো হাঙ্গাম করে রান্না করার সময় কই?”
মা দুঃখ করবেন, “তোদের ইস্কুলে তো আবার দিদিমণিরও কাজের লোক রাখার নিয়ম নেই। কী দরকার অমন চাকরিতে? অন্য আর ইস্কুল নেই দুনিয়াতে? তারপর আছে যতো বাউণ্ডুলে মেয়েমানুষের মাথায় অঙ্ক ঢোকাবার পাগলামি--”
এইখানে সুরচিতা মাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, “এখন রাখছি।”
তারপর পায়ে পায়ে ঘরে ঢুকে পড়ে। চালে-ডালে খিচুড়ি চাপিয়ে দেয় বা খাবার কী আছে কী নেই দেখে যা খুশি তাই রেঁধে নেয়। তারপর ক্লাসটেস্টের বা যে কোনো খাতা নিয়ে বসে যায় দেখতে বা কোনো বই পড়তে।

সুরচিতা একটা মিশনারি ইস্কুলে অঙ্ক শেখায়। মিশনের অনুশাসন অনুযায়ী তাকে মিশনের দেওয়া কোয়ার্টাস্-এ থাকতে হয় এবং গেরস্থালির কাজ নিজে হাতেই করতে হয়। মিশনের আশ্রিতা বা সন্ন্যাসিনী হলে অবশ্য আশ্রমের আবাসনে থাকতে হতো। বদলে মাস-মাইনের পুরোটা মিশনকে দান করে দিতে হতো। মিশনই অথর্বকালের আর পরকালের দায়িত্ব নিত। এখন শুধু ঘরভাড়াটুকু দিতে হয়, আর স্ব-সহায়তার নজির হতে হয় ছাত্রদের এবং সমাজের সামনে।
Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml
(চলবে)

Tuesday, March 31, 2026

Sibolir Prtiksha

 

সীবলির প্রতীক্ষা

কেন, আবার কী হলো? মায়ের গলাতেও বিরক্তি। এমনটাই যে হবে তা সীবলির প্রায় জানা ছিল। কিন্তু ধৈর্যের সীমা কী শুধু বাকি সবার? সীবলির নয়? 

আসলে যতক্ষণ একটা মানুষ নির্বিরোধে অন্য আরেকটা মানুষের ধারণাকে গ্রহণ করে, তার সিদ্ধান্ত মেনে নেয় ততক্ষণ কোনো অশান্তি থাকে না। কিন্তু সেই মানুষটা নিজের মতটা জাহির করলেই এতক্ষণ যারা নিজেদের ধারণা আর সিদ্ধান্ত জাহির করছিল তারা রেরে করে অনমনীয়তার সমালোচনা করে। 

কিন্তু অনমনীয়তা অসহিষ্ণুতা কার যে অদ্যাবধি নির্বিরোধে অন্যের মত গ্রহণ করেছে তার নাকি যে তিলমাত্র মতান্তরের জন্য প্রস্তুত নয় তার?

সীবলি জানে এসব তর্ক তার একান্তের। বাকি দুনিয়া এসবে কর্ণপাত করে না, তো বিবেচনা! 

মা-ও সেই দুনিয়ার বাসিন্দা। কোনোদিন তলিয়ে দেখেন নি যে যে বেঁচে থাকাটাকে মা জলের মতো বাঁচা বলেন সেটা প্রশম নাকি তারল্যটা জলের মতো হলেও স্বাদটা অ্যালকোহলের মতো তিতকুটে, স্পর্শটা ঝাঁজালো আর উষ্ণ, পরিণামটা নেশাতুর। 

আপাতত সে জবাব দেয়, কার্যকারণ বাড়ি পৌঁছে বলব। রাস্তাটা পিছল হয়ে গেছে বৃষ্টিতে। ঝোড়ো হাওয়ায় গাড়ি কাঁপছে। সাবধানে ড্রাইভ করতে হবে। এখন রাখছি। 

যদিও সে জানে বাড়ি পৌঁছে বলার মতো বিশেষ কিছুই নেই তার।

অনেকগুলো বছর হয়ে গেছে। তবু সীবলির মা, বাবা এখনও অবাস্তবের বিশ্বাসে অটুট। কিন্তু সে নিজে তো সেদিনই বুঝেছিল তার পক্ষে আর কাউকেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়, যেদিন সে তপোস্নিগ্ধকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। 

কতো বছরের সম্পর্ক তার সাথে! দশ বছর ধরে দুজনে একসাথে বড়ো হয়েছে। দুজনেই ভেবেছিল একসাথে বুড়োও হবে, যদিও তাদের বয়স তখন বেশ অল্প ছিল। কিন্তু সব ইচ্ছে যেমন সত্যি হয় না, এক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। একসাথে বুড়ো হবার ইচ্ছেটা কেমন করে যেন বিয়ের সামাজিক ব্যবস্থায় অনূদিত হয়ে গিয়েছিল। 

তাতেও সীবলি আপত্তি করে নি। এসব ব্যবস্থাদির মধ্যে তপোস্নিগ্ধ একদিন বলেছিল, আমার মায়ের সামনে তুই কার্বনেটোকে চুমু খাবি না। 

তপোস্নিগ্ধ এটা বলবি না, ওই জামাটা পরবি না, ওটা করবি না ইত্যাদি নানা খবর্দারির বাড়াবাড়ি করলেও সীবলি জানত যে দুনিয়াদারি কিংবা ভাবনার জগতে তপোস্নিগ্ধ ও সে পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল ও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। 

কিন্তু কার্বোনেটোকে চুমু খাওয়া সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞাটা সীবলিকে যেন ছ্যাঁকা দিয়ে গিয়েছিল। বাকি সব কিছুর যৌক্তিক যাচাইয়ের মতো এই বক্তব্যের কোনো বিশ্লেষণে সে যায় নি। বোধ হয় চুমু খাওয়ার মতো নিতান্ত একটা অনুভূতিতাড়িত অভিব্যক্তি নিয়ে তর্ক চলে না তাই। 

যেমন দিদিমার নির্দেশ ছিল, মেয়েমানুষ তুমি, দিনে একবারের বেশি বাহ্যে যাবে না। 

এ নির্দেশ শুনে চমকানো যায়, এর অবাস্তবতায় হাসাহাসি করা যায়, এমনকি সংস্কার না মানার অজুহাতে সংস্কার কী সাংঘাতিক অবাস্তবিক যে হতে পারে তার উদাহরণ হিসেবেও এর উল্লেখ করা যায়, কিন্তু এটা মেনে নেওয়াও যায় না, আবার এর প্রতিবাদও করা যায় না।

তপোস্নিগ্ধের কার্বোনেটো সংক্রান্ত ফতোয়ার আগে যতোবার তপোস্নিগ্ধের মা এসেছিলেন সীবলিদের বাড়ি, সীবলি কার্বোনেটোর ব্যাপারে খুব সজাগ বা সন্ত্রস্ত কোনোটাই কখনও ছিল না। কিন্তু ফতোয়ার পরে সীবলির বিবেচনা যেন নজর করতে লাগল যে তপোস্নিগ্ধের মা এবং বাড়ির অন্য কেউ সীবলির বাড়িতে ঢোকার আগেই তপোস্নিগ্ধ কার্বোনেটোকে আদর করার ছলে ওকে ওর ঘরে বেঁধে ফেলে! 

তার মানে যে দুয়েকবার তপোস্নিগ্ধকে ছাড়াই ওর মা আর অন্যরা এসেছিলেন সীবলিদের বাড়ি সেই দুয়েকবার কার্বোনেটো সীবলি আর সীবলির মায়ের পায়ে পায়ে ঘুর ঘুর করছিল। 

সেটা নিয়েই সমস্যা! 

তাই কী তপোস্নিগ্ধের মা হুকুম জারি করেছিলেন, আমাদের বাড়িতে কিন্তু এসব পুষ্যি নিয়ে যাবে না। মা-বাবার সাথে যেমন বাপের বাড়ি এলে দেখা হয়, পুষ্যির সাথেও তাই হবে। 

সীবলি তো কখনও ভাবেই নি যে কার্বোনেটোকে নিয়ে যাবে তপোস্নিগ্ধের বাড়ি, কোনোদিনই নিয়ে যায় নি তো। তাহলে এ প্রসঙ্গ কেন? বিয়ের পর তাকে ওবাড়িতে বাস করতে হতো বলে?

সীবলি তপোস্নিগ্ধকে বলেছিল যে, এমন হয় না যে, আমি আমাদের বাড়িতেই থাকলাম, আর তুই তোর বাড়িতে। তারপর ইচ্ছে হলে আমরা একসাথে দিন কিংবা রাত আমাদের বাড়িতে কিংবা তোদের বাড়িতে কাটাবো- 

কথা কেড়ে নিয়ে ফুঁসে উঠেছিল তপোস্নিগ্ধ, তুই কী বলছিস তুই জানিস না। এসব ছ্যাঁচড়ামির কোনো মানে হয়? 

তারপর সীবলি নিজেকে মাত্র সপ্তাহখানেকে বুঝিয়েছিল যে এভাবে তপোস্নিগ্ধের সঙ্গে থেকে একলা বাঁচা তারপক্ষে দুরূহ, তাই সে যখন একলাই হয়ে পড়ছে তার জীবনে, তার যাপণে, তাহলে তপোস্নিগ্ধের সাথেও সে আর থাকবে না। 

সিদ্ধান্তটা তপোস্নিগ্ধকে জানাতে প্রথমে সে উড়িয়ে দিয়েছিল সীবলির খামখেয়ালি আলটপকা একটা কথার কথা ভেবে, যেমন নাকি মাঝে মাঝেই করে থাকে সীবলির ভিতরের অমলিন কিশোরীটা। কিন্তু কাউকে কিচ্ছু না বলে সীবলি শহর বদলে ফেলায় তার মা, বাবা, তপোস্নিগ্ধ - সব্বাই চমকে গিয়েছিল। 

তপোস্নিগ্ধ ঝগড়া করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সীবলি করে নি। সে বারবার এটাই বলেছিল, তোর সাথে একলা বাঁচাটা কষ্টের। তাই নিজে নিজেই একলা বাঁচব। এতে অনেক বেশি আনন্দ পাচ্ছি। 

নতুন শহরে একটু থিতু হয়েই সীবলি প্রথম নিজের কাছে নিয়ে এসেছিল কার্বোনেটোকে। সেই প্রথম সীবলি বুঝেছিল যে মানুষ হিসেবে তপোস্নিগ্ধের সামনে অনেক সুযোগ বেশি, কিন্তু মনুষ্যেতর কার্বোনেটো বড়ো অসহায়। 

তপোস্নিগ্ধ দোসর পাক না পাক সঙ্গে থাকার লোক পেয়ে যাবে, কার্বোনেটো তো পুষ্যি, রাস্তার কুকুরদের মতো লড়াই করে বাঁচতে শেখেনি। ওকে ঘরছাড়া করলে লড়াইটা শিখতে শিখতেই ও মরে যেতে পারে। 

তাছাড়া প্রাকৃতিক লড়াই-এর শিক্ষা থেকে কার্বোনেটোকে বঞ্চিত করেছে সীবলির মতো মানুষেরাই, সুতরাং আরেকটা মানুষকে তার পছন্দের পরিবেশ দেওয়ার জন্য কার্বোনেটোকে অপরিচিত পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার দিকে ঠেলে দেওয়াটা অমানবিক। 

তাছাড়া মানুষের ক্ষমতা তো কুকুরের থেকে অনেক বেশি। তাই কার্বোনেটো না পারলেও তপোস্নিগ্ধ নিশ্চয়ই পারত নিজেকে নতুন পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে। সে পেরেওছে। কার্বোনেটো এখন তার কবরে। কিন্তু সেই মূহুর্তে সীবলি কার্বোনেটোকেই বেছে নিয়েছিল।

তারপর এতোগুলো বছর কেটে গেছে। এখন সীবলির সাথে থাকে ক্লোরেটো। মা-বাবাও থাকেন সাথে। সঙ্গে থাকে তাঁদের মেয়েকে সংসারী করার চেষ্টা। 

সীবলি তাই মাঝে মাঝে নানান লোকজনের সাথে দেখা করে। কিন্তু আপত্তি আসতে থাকে কখনও ক্লোরেটোকে নিয়ে, কখনও ক্লোরেটোর গোঁফের সবুজাভা নিয়ে, কখনও তার চোখের কাজল কালো গভীরতা নিয়ে। 

বিনা তর্কে সেসব সম্বন্ধকে ফিরিয়ে দেয় সীবলি। তার আর সম্পর্ক হয় না। আজও কাউকে সে ফিরিয়ে দিয়েছে। পুরুষটিকে সে নিজেই তার সম্বন্ধ নাকচ করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বাড়ির লোকেদের জানানোর কাজটা কূটনৈতিক বিচারে মায়েরই। আরও একবার সেই অপ্রিয় নেতিবাচক সিদ্ধান্ত জানাতে হবে অর্ধপরিচিতদের, তাই মা একটু অধৈর্য, বিরক্তও।

বাড়ি ফিরে দেখল মা চা তৈরি করে ফেলেছেন। সীবলি মনটা গুছিয়ে নিল। মা বললেন, লোকে কী বলবে? এরপর আর সম্বন্ধ পাওয়া যাবে না। 

সীবলি চুপ করে চায়ে চুমুকের পর চুমুক দিয়ে চলেছে। কোনো সাড়া না পেয়ে মা-ই আবার বললেন, আমি ভেবেছিলাম চাকরি-বাকরি করলে আমার থেকে ভালো থাকবে। তা না স্বাধীনতার নামে আমারই ঘরে বাড়াবাড়ি চলছে। যা খুশি তা-ই করবে! 

মা একটুক্ষণ চুপ করে আছেন দেখে সীবলি বুঝলো মায়ের কথা ফুরিয়েছে। সে বলল, সমস্যাটা চাকরির নয়। ব্যক্তিত্বের। পছন্দের। 

মা কিছুটা জ্বালানী পেলেন যেন, বললেন, কেন তোমাদের চাকরিতে বলে না জলের মতো হতে হবে, যে পাত্রে রাখবে তার আকার নিতে হবে, কঠিন হলে চলে না, নমনীয় হতে হয়, মেনে নিতে হয়, মানিয়ে নিতে হয়--- জীবনেও কী তাই নয়? 

শেষ চুমুকের চা-টা গিলে নিয়ে সীবলি জানাল, তফাত আছে। চাকরিটা বাড়ির বাইরের ব্যাপার। কিন্তু তুমি জীবনের যে সম্পর্ক নিয়ে নমনীয়তার প্রশ্ন তুললে সেটা ঘরের ভেতরের কথা, তার সাথে বাস করতে হয়। সেখানে অস্বস্তি নিয়ে বাঁচতে চাইছি না। জীবনের সেই জায়গাতেও নমনীয়তা আর তারল্য চাই। কিন্তু সেই তরলটা কখনও চিলড বিয়ারের মতো, কখনো প্রবল শীতে রামের উষ্ণতার মতো। অন্যের অনুভূতিকে তুষ্ট করতে অবিরত জ্বলনশীল একটা তরল হওয়ার মতো। চাকরিতে তো শীতল হওয়া তরল হওয়া স্বার্থবুদ্ধিতে। যে সম্পর্ক নিঃস্বার্থ মনোযোগ চায়, সেবা চায়, উষ্ণতা চায়, আর্দ্রতা চায়, তাতে দাহ্য তরল হলে তো শিগিগির জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে ফুরিয়ে যাব। 

মা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, সীবলি চুপ করে যায়। তারপর সীবলি চায়ের খালি কাপগুলো তুলে নিয়ে রান্নাঘরে চলে যায়, ধুয়ে ফেলে। মা ছাদে চলে যান।

সীবলিও ছাদে যায়। তার ঢাকা চৌবাচ্চার জল গরম করতে দেয়। তারপর সাঁতারের পোষাকে চৌবাচ্চায় নেমে পড়ে। প্রাথমিক চোখের জলে, নাকের জলে কাটিয়ে ওঠে। তারপর এপাড়-ওপাড়ের সাঁতারে টের পায় স্নায়ুজুড়ে কেমন ছড়িয়ে যাচ্ছে জলের আদর। জলের আদরে নিজেকে সঁপে দিয়ে সাঁতারে মগ্ন, আচ্ছন্ন রাত ঘনায়, কেটে যায়।

~~~~~
Written and published in 2013


Monday, March 30, 2026

Deri

 

দেরী



ওহ্‌ হো! প্রজিতের গলায় স্পষ্ট আপশোশ। বাথরুম থেকে বেরোতে আজও সাড়ে আটটা বেজে গেল। ধড়ফড় করে জামা কাপড় পরে, আয়নায় চোখ রেখে, চুলে চিরুনী চালাতে চালাতে টের পেলেন দময়ন্তী টেবিলে ম্যাট সাজাচ্ছেন।

বারান্দায় ভিজে গামছাটা মেলে এসে প্রজিত তাঁর নির্দিষ্ট চেয়ারটিতে বসে পড়লেন। এই সময় একটা চাপা টেনশন হয়। বলে ওঠেন উতলা গলায় দাও গো

রান্না ঘর থেকে দময়ন্তীর আশ্বাসমূলক সাড়া আসে, এই যে। জলের ঘটিটা রেখে দিয়ে যান টেবিলে। তারপর নিয়ে আসেন উচ্ছে ভাজা শুদ্ধু ধোঁয়া ওঠা ভাতের থালা। ছ্যাঁকা বাঁচিয়ে উচ্ছে ভাজা আর ভাত যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি গেলার চেষ্টা করেন প্রজিত। ততক্ষণে দময়ন্তীর তৎপরতায় পাতে ভাতের উপর ডাল আর পাশে আলু-ঢ্যাঁড়সের চচ্চড়ি পড়ে গেছে। বললেন, খাও; মাছটা ভাজা হয়ে এসেছে

ক্ষেপে ওঠেন প্রজিত। একে জানো গরম আমি খেতে পারি না; আপিসে যাওয়ার সময় মাছ ভাজা না খাওয়ালেই নয়? ভাত গরম, ডাল গরম, শুধু উচ্ছে আর ঢ্যাঁড়সটা যা ঠান্ডা

চটপটে হাতে দময়ন্তী ভাজা মাছের কাঁটা বেছে, দলা দলা মাছ পাতে দিতে থাকেন। প্রজিত বলেন ধ্যাৎ! একেই দেরী হয়ে গেছে ..; এই বয়সে ; আর দুবছর চাকরী আছে; লেটে আপিসে ঢুকলেই ইনচার্জ বলবে , আপনারা যদি এমনি করেন তবে জুনিয়রদের কি বলবো মশাই! ; মান-সম্মান ……..

ফুঁসে ওঠেন দময়ন্তী, যত দেরী কি খেতে গেলেই ? এই যে বকে বকে এত দেরী করছ ? 

প্রজিত কোনরকমে মাছের শেষ টুকরোটা মুখে ফেলে তার ওপরই ঢেলে দিলেন ঘটির জল; গিলতে গিলতে বাকি জলটা ঢাললেন পাতে; গজগজ করতে করতে উঠে পড়লেন টেবিল থেকে, আজও পঁয়তাল্লিশের লোকালটা হবে না .. কাল থেকে আর ভাত রেঁধো না আমার জন্য।

 দময়ন্তীর তৎপর জবাব , কাল কেন ? আজ রাত থেকেই রাঁধব না .. 

আবহে চটপটে পানাসাজা হাতের চুড়ির ঠিন ঠিন; আঁচানোর কুলকুচির আওয়াজের ফাঁকে ফাঁকে কানে আসে প্রজিতের; প্রজিতের নীরবতায় স্বরে ও ভাষ্যে তীব্রতর হতে থাকেন দময়ন্তী ,নিজের মান-সম্মানের পরোয়া খুব; আমি যে সকাল থেকে ধড়ফড় করে খেটে মরলাম, আমার সম্মানটা রাখছো কি? 

দময়ন্তীর হাত থেকে সাজা পানটা নিয়ে সংক্ষেপে সারেন প্রজিত , বেরনোর সময় অশান্তি কোরো না । . আসছি

প্রায় ছুটতে ছূটতে পল্লীশ্রী-র মুখে এসে একটা রিক্সা পেয়ে গেলেন প্রজিত। দমে স্টেশন। হাজরার দোকান থেকে সারা দিনের পানের  পুঁটলিটা নিতে নিতেই অ্যানাউন্সমেন্ট।

যাঃ; লোকালটা পনের মিনিট লেট!

স্টেশন চত্বরেই দেখা হয়ে গেল সুশীল, সমীর, প্রণব, অতীশ, দীপেন, মণিময়দের সাথে। লেট-ফেট, টেনশন গায়েব। জমাটি আড্ডা; কখন যে লোকাল এল। কখন তাতে উঠলেন আর কখনই বা হাওড়া স্টেশন পৌঁছলেন প্রজিত স্পষ্ট করে টেরই পেলেন না। 

হাওড়া স্টেশনে ঢুকতেই বিরক্তির একশেষ। দুই আর তিন নম্বর প্লাটফর্মে দুটো লোকাল একসঙ্গে ঢুকেছে। দুটোরই আপ লোকালের অ্যানাউন্সমেন্ট হয়ে গেছে। প্রচণ্ড রাশ; প্রজিতরা উলটো দিকে হেঁটে চলে যান প্লাটফর্মের শেষে। লাইনে নেমে পাশের ফাঁকা প্লাটফর্মে ওঠেন। হনহনিয়ে তাঁদের দল চলতে থাকে লঞ্চঘাটের দিকে। হঠাৎ সমীর হুমড়ি খেয়ে পড়েন। একটা লোক প্লাটফর্মে শুয়ে থকাতেই এই বিপত্তি। সবাই মিলে গালিগালাজ করতে শুরু করেন লোকটাকে। অথচ লোকটা জাগেও না; নড়েও না।

প্রথম প্রজিতই গন্ধটা পান। লোকটা মৃত। শবদেহ থেকে পচা গন্ধটা বের হচ্ছে। বাকি সকলকে প্রজিত অফিসের দিকে এগিয়ে যেতে বলে নিজে চললেন স্টেশন ম্যানেজারের ঘরে, এক নম্বর প্লাটফর্মে, মৃতদেহের খবর দিতে। স্টেশন ম্যানেজারের কথা মত আর. পি. এফ পোস্টে এফ. আই. আর লেখালেন। তারপর শববাহকেরা জুটতে, তাঁদের নিয়ে, পুলিশ নিয়ে এক নম্বর প্লাটফর্মে শবদেহের কাছে গেলেন। শববাহকেরা মৃতদেহ শববাহী গাড়িতে তুলে নিয়ে যেতে প্রজিত পা বাড়ালেন লঞ্চঘাটের দিকে। 

লঞ্চের অপেক্ষায় জেটিতে দাঁড়িয়ে প্রজিত। আঙুলের ফাঁকে ধরা সিগারেট। উড়ন্ত পাফের দিকে তাকিয়ে প্রজিতের মনটা আফশোষে ভরে যায়, সমীরদের কাউকে দিয়ে যদি সেকশনে একটা খবর দেওয়া যেত। পরমূহুর্তেই মনে হল তাঁর, কী-ই বা কারণ দেখাবে ওরা? অবশেষে লঞ্চ এলো; বসার একটা সীটও পেয়ে গেলেন প্রজিত। তখনই মনে হল, যাক গে, পড়ুক গে লেট মার্ক…”। ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাসও পড়ল দুরুদুরু বুক বেয়ে।

গিয়ে আর কিছুই করা যাবে না ভাবতে ভাবতে গঙ্গা পেরিয়ে, হাঁটতে হাঁটতে অফিসে পৌঁছে গেলেন। 

সেকশনে পৌঁছে ঘড়িতে দেখলেন বাজে সাড়ে এগারটা। এগিয়ে গেলেন ইনচার্জের টেবিলের দিকে দিন খোয়ানো পদক্ষেপে। মন স্থির করে ফেলেছেন প্রজিত লেটমার্ক না পড়লেও আজ আর অফিস করবেন না; ছুটির দরখাস্ত দিয়ে দেবেন। কারণ এত পরে এসে আর হাজিরা দেওয়া ঠিক না।

ইনচার্জ মনোতোষ দে; চশমার ফাঁক দিয়ে এক ঝলক প্রজিতকে দেখেই হাজিরা খাতার ওপর কলম ধরে খাতাটা বাড়িয়ে দিলেন । 

প্রজিত ভাবছি, আজ আর . বলেই থমকে গেলেন, চোখ পড়েছে খাতাটার নির্দিষ্ট জায়গায়, সেখানেই মনোতোষ কলমটা রেখেছেন। প্রজিত এ কী! কিন্তু .. বলা মাত্রই মনোতোষ মুচকি হেসে বললেন বনের মোষ তাড়ালেন …”; অপ্রস্তুত প্রজিত। মনোতোষই কথা বললেন, সইটা করুন, মশাই

~~~~
Written in 2007-08
Inspired by real events.

Friday, March 27, 2026

Kathberali

 

কাঠাবেড়ালি



মুখের ওপর দিনের প্রথম রোদ এসে পড়ল। অনির্দেশকে খিঁচিয়ে উঠল কাঠবেড়ালি। এসময়টায় বড়ো বিরক্ত লাগে। চোখ খুলতে ইচ্ছে করে না। তবু রাজ্যের আলো মাখামাখি হয়ে যায় চোখে। আরও একটুক্ষণ গড়াতে ইচ্ছে করে ঠাণ্ডায়। এ সময়েই সব শান্তি খানখান করে ডেকে ওঠে বাজখাঁই কাক। ঘাপটি মেরে ঘুমিয়ে থাকার আর উপায় থাকে না।

উঠে পড়ে লি নামের কাঠবেড়ালি। আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলতে তুলতেই টের পায় পেটটা বড্ড খালি। গা-ঝাড়া দিয়ে বেরিয়ে পড়ে বাদামের খোঁজে। বাদাম যোগাড়ের সময়েই ঘুম ভাঙার দুঃখটা চলে যায়। বরং মনে হতে থাকে, ভোর ভোর ঘুম ভেঙেছিল ভাগ্যিস! না হলে বাদামগুলো সব ভাই, ভাদ্রবউরা মিলে সাবড়ে দিত এতোক্ষণে। তারপর বহুদুর গেলে তবে পাওয়া যেত বাদাম। তাই মনে মনে ক্ষমা চেয়ে নেয় কাকের কাছে বিরক্ত হয়েছিল বলে।

এমনিতে দূরে যেতে খারাপ লাগে না লির। দূরে গেলে তার নিজের হয়ত পেট ভরে খাওয়া জুটে যায় সারাদিন, কিন্তু দাদু বেচারাকে সারাদিনে অনেকটা উপোস দিতে হয়। যত উপোসের জ্বালা বাড়ে বেলা বাড়ার সাথে সাথে, দাদুর মুখে তত গালাগালির ছররা ফোটে। 

মানুষগুলোকে দুচোখে দেখতে পারে না দাদু। দাদু যখন জোয়ান ছিল তখন লির থেকেও অনেক বেশি শক্তি ধরত, পেতও বেশি, খেতও বেশি। তার ওপর দাদুকে তার অথর্ব দাদুর জন্য খাবার বয়ে বয়ে আনতে হতো না সারাদিনে চব্বিশবার। সারাদিন দাদু খেলত, খেলত আর খেলত। মাঝে মাঝে প্রেমও করত। 

লির কিন্তু সারাদিন কেটে যায় নিজের আর দাদুর খাবারের খোঁজে। দুর-দূরান্ত থেকেও লি দাদুর জন্য খাবার নিয়ে আসে। দাদু যে এক্কেবারে চলতে ফিরতে পারে না। এদিকে এমন কেউ নেই যে লির সাথে কাজটা ভাগ করে নিতে পারে। লির বাবা-মা লির ছোটবেলাতেই মোটর গাড়িতে চাপা পড়ে আর ইলেক্ট্রিক তারে পুড়ে মারা গেছে। এই জন্যই দাদু মানুষগুলোকে সহ্য করতে পারে না। ওদের কেবল নিজেদের ভালো থাকা নিয়েই কথা। জগতে আর বাকি কে  কেমন আছে তা নিয়ে কোনো মাথা ব্যাথা নেই। দাদুর মতে লির ভোগান্তির জন্য বজ্জাত মানুষগুলোই দায়ী। না শুধু ওর বাবা-মায়ের মৃত্যুর জন্যই নয়; দাদুর খাবার বয়ে আনার ঝক্কিটাই নাকি লির থাকত না যদি দাদুর ছোটবেলার মতো গাছ আর খেত থাকত এখন।

দাদুর ছোটবেলায় অনেক গাছ আর খেত ছিল। গাছে ছিল বাদুর, চিল, শকুন। বুড়ো কাঠবেড়ালিরা বসে বসে ঝিমোত যখন তখনই তাদের সদগতি করে দিত পাখিগুলো। এরকম করেই লির দাদুর দাদু, বাবা, মা, ঠানদি সবাই একে একে ইহকাল থেকে পরকালে পাড়ি দিয়েছিল। 

অথচ দাদুর বেলায় দেখ! গাছ, খেত, পাখি সব গায়েব। শুধু দাম্বা দাম্বা বাড়ি আর বাড়ি; সেসব বাড়ির দেয়ালে, তাকে, কোনায়, খাঁজে ফরসা, ফ্যাকাসে, দামড়া কালো, গুটকে, ভয়াল হাজার রকম মাকড়সা আর মাকড়সা। বাড়ি বানিয়ে মানুষগুলোর আর সাধ মেটে না। একপাল বাড়িতে ঢোকে আর পিলপিলিয়ে আরেকপাল আসে; লাউ মাচা বাঁধে খালপাড়ে। 

দাদুকে পাখিতে নিল না। এদিকে হাঁটুর বাতে চলচ্ছক্তিরহিত দাদু। কোথাও যেতে পারে না। তাই দাদুর মানুষের মোটরে কিংবা ইলেক্ট্রিক শকে মারা পড়ারও কোনো উপায় নেই। দাদু সারাদিন ঘ্যান ঘ্যান করে, কেন হাঁটুর মতো বুকের ধুক ধুকিটাও থেমে যাচ্ছে না যে।

এসব শুনতে শুনতেই লির পেটে হয় চাপ লাগে, ঝটপট মাটি খুঁড়ে হালকা হয়ে নিতে হয় তাকে; নয়তো খিদেতে পেটটা পাক দিয়ে ওঠে। তখনি ছুটতে হয় বাদামের খোঁজে। 

এতসব ব্যস্ততার মধ্যে তিন-চার দিনে অন্তত একবার চোখাচোখি হয়ে যায় লিনির সাথে। লিনি থাকে দু তিন পাড়া পরে। দাদু অনেকবার তাড়া দিয়েছে লিকে লিনির সাথে প্রেম পর্ব শুরু করার জন্য। কিন্তু খাবার খাবার করে দৌড়ে লিনিকে একলা পাওয়াই যায় না কখনও। কখনও কখনও লি ভাবে যে কি হবে লিনির সাথে প্রেম করে; লিলি আসবে। ব্যস; তারপর সেই দৌড় খাবার খাবার খাবার। 

একদিন দুপুরে লি দাদুর পাকা লোমের থেকে পোকা বাছছিল। সে সময় লিনিদের পাড়ার অনেকে এলো দৌড়ে দৌড়ে লিদের পাড়ায়। ওদের ওখানে নাকি সব গাছ উপড়ে ফেলা হচ্ছে। গাছের ওপর দিয়ে মানুষদের গাড়ি না রেলগাড়ি কিসব যেন যাবে । পুরো পাড়া থেকেই কাঠবেড়ালিদের বাস উঠে গেল। উঠে গেল যে কটা পাখ-পাখালি পরিবার ছিল সে সব্বাই। 

লিনিকে নতুন আস্তানায় থিতু হতে সাহায্য করতে এল লি। তখনই লি জানতে পারল যে লিনি একদম একা। ওর আর কেউ নেই। তারপর দাদুর সাথে লিনি যখন ভাব করতে এল, তখন দাদুই লিনিকে বললেন আলাদা আস্তানায় একা না থেকে ওঁদের সাথেই থেকে যেতে। লিনি খানিকক্ষণ লেজ খাড়া করে চোখ পিটপিটিয়ে রাজি হয়ে গেল।

কিছুদিন পরে খুব বৃষ্টি নামল। দাদু আপন মনে গুন গুন করতে করতে নাক ডাকাতে শুরু করল। লি লিনিকে খুব খুব আদর দিল। 

তারপর কিছু মাস, কিছু বছর কেটে গেল। সারাদিন অনেক দৌড়োদৌড়ি করে তবে লি আর লিনি দুজনের খোরাক জোটে। লিনি আসার পরে লিদের সাবেক আস্তানা ছাড়তে হয়েছিল। সে পাড়াতেও মানুষের কেঁচোকল মাটি খুঁড়ে সব গাছ উপড়ে ফেলছিল। 

বেচারা দাদুও এই সময়ে মুক্তি পায়। হুড়োহুড়ির মধ্যে গাছের ডালে না কোনো যন্তরের ঘায়ে, নাকি মানুষের পায়ে পিষে সত্যি সত্যিই থেমে যায় দাদুর বুকের ধুকধুকি। শুধু চুপি চুপি লিনিকে বলে যায় দাদু নাকি লিলি হয়ে ফিরে আসতে চায়। আজও খুব বৃষ্টি পড়লে লিনি ঘন হয়ে এসে লিকে মনে করিয়ে দেয় সে কথা।

লি জানে না ঠিক কি কারণ। লিলিকে আনার ফুরসত নেই তার নাকি সাহসে কুলোচ্ছে না। দাদু মারা গিয়ে ইস্তক পাঁচবার আস্তানা বদলাতে হয়েছে লি আর লিনিকে। বাদাম তো দূর; কোনো খাবারই আর পেট ভরার মতো পাওয়া যায় না। 

তার ওপর লিনির বুকে বাতাস ধরে না। বেচারি দৌড়ঝাঁপ করতেই পারে না মোটে। একটু চললেই বাতাসের অভাবে বেচারির চোখ ঠেলে গোঁফ খুলে বেরিয়ে আসে যেন। 

লি একলা দুজনের খোরাকি এনে ঝিম মেরে যায়। লিনিকে আদর সোহাগ করতেই পারে নি সেই বৃষ্টির রাতের পর থেকে আর একবারও। তবুও লিনি লিলির কথা পাড়লে মন ভালো হয়ে যায় লির। তারপর বুকে যেন একটা পাথর চেপে বসে। খাবে কি লিলি? থাকবে কোথায়? বুকে বাতাস পাবে তো?

সমস্ত উদ্বেগ নিয়েই ঘুমে ঢলে পড়ে লি। আবার ভোর হয়। আবার আস্তানার গোটানোর দিন আসে। এভাবে চলতে চলতে অবশেষে এক আস্তানায় পাঁচটা বর্ষা কাটিয়ে দিল তারা। লিনির বুকের বাতাসের কষ্টটাও একটু একটু করে কমে গেল। লিনি আবার বেরোতে লাগল খাবারের খোঁজ়ে। এবারের আস্তানার কাছে পিঠেই অনেক বাদাম পাওয়া যায়। 

পরের বর্ষায় লিলি এল। লি আর লিনি খুব যত্ন করে লিলিকে বাদাম চেনায়। কিন্তু এ জায়গাটা ছেড়ে যদি যেতে হয় ভেবে আজকাল ভোরের অনেক আগেই ঘুম ভেঙে যায় লির। 

পরদিন সকালেই তিনজনে তিনদিকে চলে যায়, দূরে দূরে। এবারের আস্তানাটা গোটাতে হলে কোথায় থাকবে সে জায়গাটা আগে থেকে দেখে রাখবে বলে। এ জায়গাটায় মানুষের বাড়ি কিংবা বাজার কিংবা রাস্তা কিংবা রেলগাড়ি হলে, সরাসরি চলে যাবে আগে থেকে দেখা রাখা এরকমই আরেকটা জ়ায়গায়, যেখানে খাবার নেই, বাতাস নেই নেই-নেইতে রাত জ়েগে কাটাতে হবে না। লি ঠিক করে ফেলেছে; উত্তরাধিকারে লিলিকে দিয়ে যাবে ঘুম ভেঙে আলসেমি মাখার ভোরটাই।

~~~~~
Written and published in 2010

Readers Loved