Showing posts with label Bengali Prose. Show all posts
Showing posts with label Bengali Prose. Show all posts

Sunday, April 26, 2026

Panchpoksho - 23

পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রাক্‌পক্ষ

~~~~~~

দুয়েরই কারণ ওর বাবা-মায়ের বেছে নেওয়া জীবনযাপন। দুজনের সিদ্ধান্তের, কর্মের ফল মর্মে মর্মে অভি ভোগ করত। সেই জন্যই ওর ফ্রি টিউশনে আপত্তি ছিল। ওর আপত্তি ছিল বাবা-মায়ের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার আর অক্ষমতার দায় দয়াশীল পৃথিবীর কাঁধে তুলে দিতে। বিকল্প হিসেবে সে নিজের কাঁধটা অনেক শক্তিশালী করে তুলছিল। কোনটা দাক্ষিণ্য আর কোনটা শুধুই ভালো ব্যবহার সেটা বোঝার বয়স হয় নি বলে ও এড়িয়ে চলত সমবয়স্কদেরও। তাই শ্রদ্ধাটুকু সুরচিতা গোপন করে নি, প্রেমটাকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে চলেছিল অনেকদিন।


লম্বা ছুটির সময়ে সুরচিতা অভিকে নিয়ে যেত মিউজিয়ামে, তারামণ্ডলে, সায়েন্স সিটিতে, চিড়িয়াখানায়, বটানিকাল গার্ডেনে। কখনও বা ঐতিহাসিক মনুমেন্টগুলোতে। তাতে যেমন ডালহৌসি স্কোয়ার থেকে বিবাদী বাগের গল্প থাকত, তেমনই থাকত ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল বা ফোর্ট উইলিয়াম। বাদ পড়ত না অক্টারলোনি মনুমেন্ট বা ন্যাশনাল লাইব্রেরি। ছিল নন্দন, রবীন্দ্রসদন, এশিয়াটিক সোসাইটি, টাউন হল, মহাজতি সদন। তারপর বইমেলাও। 

একবার দুজনে চক্ররেলে চড়ে বেরিয়েছিল গঙ্গার ধার ধরে শহরের সীমানা দেখতে। দুজনে ছাড়া কেউ জানতও না এসব টইটইয়ের কথা। অভির তো বলার কেউ ছিল না। সুরচিতা নিজেকে কয়েক ভাগে আলাদা করে নিয়েছিল। এক ভাগে ছিল তার বাবা-মায়ের মেয়ে, আরেক ভাগে তার ইউনিভার্সিটির জীবন। আরেক ভাগে তার টোল। অন্য আরেকভাগে অভি।


ধীরে ধীরে অভি অনেক সহজ হয়ে উঠেছিল। কখন অভির মনে সুরচিতার জন্য একটু একটু করে ভালো লাগা জমতে জমতে তা প্রেমের পাহাড় হয়ে উঠেছে তা ওরা নিজেরাই টের পায় নি। একদিন কোনো একটা মুশকিল প্রশ্নের উত্তর পেয়ে সুরচিতার চোখমুখ উপচে উঠেছিল মুগ্ধ প্রশংসায়; হয়তো প্রেমেও। 

তার উত্তরে একটা জটিলতর প্রশ্ন রেখেছিল অভি, আর উত্তর পেয়ে ওর চেহারায় ঝকঝকিয়ে উঠেছিল সেই মুগ্ধতা যা শিরার রক্ত হৃদয়ে পদ্ম না ফোটালে দেখাই যায় না। ভেঙে পড়েছিল সুরচিতার সমস্ত আড়াল। অভিও লুকোনোর চেষ্টা করে নি তার একমাত্র বন্ধুর কাছে তার প্রেমের কথা। 

তারপর ওদের চোখে কৃষ্ণচূড়ার রক্তিমার মানে বদলে গিয়েছিল। বসন্তের হাওয়া আর গ্রীষ্মের দুপুর ভীষণ সহনীয় হয়ে উঠেছিল। বর্ষার জলে ভাসা রাস্তায় ঘেন্নার আবর্জনারা অবজ্ঞা পেয়েছিল, আর সফেন ঢেউগুলোতে ভীষণ ভালোলাগা আছড়ে পড়েছিল। শরতের নীলিমা গাঢ়তর হয়েছিল। হেমন্তের মানে দাঁড়িয়েছিল দুঃসময়ের প্রস্তুতিতে গোণা কয়েক প্রহর; আর শীত মানে বসন্তের অপেক্ষা, পায়ের শব্দ গোণা।

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)



Saturday, April 25, 2026

Panchpoksho - 22

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রাক্‌পক্ষ

~~~~~~

কোনো কোনো দিন হয়তো যাবতীয় ল্যাম্পপোস্টরা ভেঙে পড়ত দুজনের ঘাড়ে সাইন-কোসাইনের অনুপাতে। কখনও নিওলিথিক কুমোরেরা মৃৎপাত্রে কী করে নকশা ফোটাত সে কথাটা স্পষ্ট হয়ে উঠত। কখনও তুমুল তর্ক হতো স্টিলির মধ্যে সংসক্তি আসঞ্জন নিয়ে; কখনও সালকাস জাইরাসে উন্মাদনা ছড়াতো ভারী জল। এবং এসবের মধ্যে দিয়ে সব শৈত্য পেরিয়ে কখন যেন উষ্ণ গালফ স্ট্রিম হয়ে যাতায়াত শুরু হয়েছিল গোলাপি খামে রাখা ছেঁড়া ছেঁড়া কবিতার, বুনো ফুলের আর চকোলেটের।


কিন্তু তার আগে বয়ে গিয়েছিল অনেক হিমশীতল মুহূর্ত। অভির জীবনে না ছিল দোল, না দিওয়ালি; না দূর্গাপুজো, না সরস্বতী পুজো। সে-জীবনে যতোটা পাথরের রুক্ষ কাঠিন্য ছিল, ততোটা ছিল না কৈশোরের উচ্ছ্বাস বা কৌতূহলের বিস্ফোরণ। ততোটাই দুরূহ ছিল সে পাথরের বুকে কোনো আঁচড় কাটা বা তার নিজের ফাটল বরাবর সম্ভাব্য ভাঙনগুলো আটকে কোনো নকশা কুঁদে তোলা। বইয়ের কোণে আঙুলে আঙুল ছুঁয়ে গেলে সুরচিতার হৃদপিণ্ডের দেওয়ালে রক্তের ঢেউ আছড়ে পড়ত অনেকক্ষণ। কিন্তু সেই ঢেউয়ের ঝাপটা অভির চোখেও ছলকে উঠতে দেখেছিল সুরচিতা, বছর ঘুরে যেতে।


এরকম কিছু যে হতে পারে সেটা সুরচিতার আজন্মের সামাজিক বোধের সীমায় ছিল না। নিজের কাছে সত্যিটা স্বীকার করতে তার প্রবল যন্ত্রণা হয়েছিল। অভির সাথে একটা সহজ সম্পর্কের আবর্তে আসা অনেক ধৈর্যের সিঁড়ি ভাঙা। সেই সম্পর্কটা সুরচিতা কিছুতেই তার একতরফা প্রেমের দাবিতে ভেঙে দিতে চাইত না। 

সে অনেক নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে ভেবে ভেবে যে অভির যদি সন্দেহ হয় সুরচিতার উদ্দেশ্য কী তাই নিয়ে বা কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য আছে বলে। তার সারাক্ষণ আশঙ্কা হতো যে তার মনোভাবের ব্যাখ্যায় অভি যদি ব্যর্থের কামনা চরিতার্থতার চেষ্টা দেখে তাহলে জগৎ, জীবন সব কিছু নিয়ে ছেলেটার মনে তিক্ততার বিস্ফোরণ হতে পারে। বিশেষত অভির বাবা-মায়ের সমস্ত কথা শুনে সুরচিতা টের পেয়েছিল তার অভিমানের গভীরতা। সেই অভিমানই মাত্র চোদ্দ বছরের ছেলেটার সহ্য, দার্ঢ্য, বিবেচনার মূলে। অথচ সারা পৃথিবী হয় ওকে দয়া দেখাতো, নয়তো তাচ্ছিল্য।

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)



Friday, April 24, 2026

Panchpoksho - 21

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রাক্‌পক্ষ

~~~~~~

হয়তো বোঝে নি কারণ অভির সাথে মেশার মূলে সুরচিতার একটা সচেতন উদ্দেশ্য ছিল। সুরচিতা ভেবেছিল যে অভি যদি সত্যিই তার মা-বাবার মতো দুর্বল না হয় বা যদি তার নিজের মতে আর নিজের মতো বাঁচার ইচ্ছে আর উৎসাহ থাকে তাহলে সুরচিতা অভিকে সসম্মানে বন্ধু করে নেবে, যতটুকু ভরসা ছেলেটার লাগবে বা সে নিতে চাইবে সবটুকু নিঃশর্তে দেবে, আর আগলে রাখবে টুকুন রায়দের থাবা থেকে, ছলে আর কৌশলে। 

তাই সে অভিকে জানতে চেয়েছিল, বুঝতে চেয়েছিল। আবার সেই জানা বোঝার হাত ধরে টুকুন রায়দের সাথে অঘোষিত নিশঃব্দ অলক্ষ্য যুদ্ধটার কারণ, উদ্দেশ্য সবই ক্রমে বদলে গিয়েছিল, সুরচিতার সচেতনতা আর আর তার নিয়ন্ত্রণরেখাকে ফাঁকি দিয়ে।


সুরচিতার মুগ্ধতার কথা হয়তো অভি বুঝেছিল বা তার অস্পষ্ট ধারণা হয়েছিল সুরচিতার অনুভূতি সম্পর্কে। সুরচিতা তার কোনো ক্ষতি করবে মানে সুরচিতা তাকে কোনো ভাবে অপমান করবে সে সম্ভাবনাটা সে আমল দেয় নি। তার প্রতিনিয়তের দুর্গতির পাশে অমন অপমানের একটা মনোবেদনা তার কাছে হালকা ঝুঁকি বই কিছু মনে হয় নি বোধ হয়। সে কিছু না করেও অপরাধীর জীবন কাটাচ্ছিল যে। 

তার বয়সী ছেলেদের মা-বাবারা নিজেদের ছেলেকে সাবধান করতেন অভির সাথে মিশে দুর্মতি হতে পারে বলে। আর মেয়েদের, মানে যে সব মেয়েদের বাবাদের দোতলা বাড়ি ছিল তারা কেবলই অভির স্বভাব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতেন তার মা-বাবার কথা টেনে এনে। ফলে সুরচিতা তার মন নিয়ে, অনু্ভূতি নিয়ে কিছুদিন খেলে আনন্দ নেবে আর তারপর তাকে ফেলে দিয়ে চলে যাবে এরকম ভয় অভি মোটেও পায় নি। 

শারীরিক কোনো উৎপীড়নের আশঙ্কাও তার অযৌক্তিক মনে হয়েছিল হয়তো। কারণ হয়তো তার প্রত্যেকটা দিন একটা একটা নতুন লড়াই ছিল মা-বাবার অল্প বয়সের খেয়ালের মাশুল দিতে দিতে নতুন করে নিজের জন্য বাঁচার কারণ খুঁজে পাওয়ার মধ্যে, নতুন করে বাঁচার লড়াই জেতার কৌশল শেখার মধ্যে। 

সুরচিতার আসা যাওয়া নিয়ে সে সতর্ক থাকলেও আক্রমণাত্মক ছিল না। তাই বোধ হয় একসময় সেও টের পেয়েছিল সুরচিতা তার বন্ধুর অভাব পূরণ করতে পারে। তারপর একসময় নিয়মিত সোম-বুধ-শুক্র সন্ধেবেলা সুরচিতা কিছুক্ষণ কাটাতো অভির সাথে। কোনো কোনো সন্ধেবেলা চা, মুড়ি, চানাচুর খেতে খেতে গল্পে মুখর হতো দীপ্তির সাময়িক যোগদানে।

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)



Thursday, April 23, 2026

Panchpoksho - 20

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রাক্‌পক্ষ

~~~~~~

সুরচিতা বলেছিল, “চা পরে খাবো একদিন, যেদিন তোর বইটা ফেরত দিতে আসব সেদিন। তোর দরকার পড়লে বইটা তুই আনতে পারিস আমার থেকে। রবিবার দুপুরে গেলে আমাকে পাবিই বাড়িতে; বাকি কোনো সময়ের ভরসা নেই।”


অভি আসে নি সুরচিতাকেই আবার যেতে হয়েছিল। সুরচিতা ওর জন্য একটা বই নিয়ে গিয়েছিল। বইটা নেড়ে চেড়ে অভি ফিরিয়ে দিতে পারে নি। বলেছিল, “এর বদলে তুমি কী চাও?” 

সুরচিতা বলেছিল, “তোর বইগুলো পড়তে দিস একে একে।” 

অভি বলেছিল, “এই বইগুলো তুমি পড়ো নি?” 

সুরচিতার হেসে বলেছিল, “কতো বই, কতো লেখা! সব কী পড়া যায়? তার ওপর ক্লাসিকগুলো একেক বয়সে একেক রকম লাগে। তাছাড়া তোর বয়সী কোনো মেয়ে এইসব বই পড়ে না। কার হাতে কোন বই দেওয়া হবে তা নিয়ে বয়ঃজ্যেষ্ঠদের বেশ ছেলেদের-বই, মেয়েদের-বই দুই-দুই ভাবনা আছে বলেই মনে হয়েছে আমার। তাই তোর পড়া বা তাকে রাখা সব বই আমার পড়া নয়।” 

তারপর কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। সুরচিতাকেই আবার মুখ খুলতে হয়েছিল, “বদলে তুইও আমার বই পড়তে পারিস। নাহলে একতরফা বই নিতে নিতে আমার ধার বেড়ে যাবে। তার জন্য তোকে আমার বাড়িতে যেতে হবে, নিজেকে বই বেছে নিতে হবে। তোকে হাতে করে বই এনে দিলে তোর পছন্দের সাথে অবিচার করা হবে। তাই সেটা আমি করতে পারব না। এখন তুই সুযোগ নেওয়ার মতো সাহসী হবি না মুখ্যু থাকবি সেটা তোর ব্যাপার”। 

আবার সব চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। বাইরে একটা ঘুঘু বার দুয়েক ডেকে উঠেছিল। কয়েকটা ছাতারে খ্যাচর খ্যাচর করে উঠেছিল। অভি বলল, “উপকারে আমার দম বেরিয়ে আসে। তোমার মতলবটা কী?” 

সুরচিতা বলেছিল, “যদি তুই আমার আত্মতুষ্টির উপলক্ষই হোস, তাতে তোর কী কোনো ক্ষতি দেখছিস? যদি না দেখিস, তাহলে আমার সাথে ফুচকা খেতে যাস, গঙ্গার ধারে।”


অভির সাথে ফুচকা খেতে যাওয়ার আগে চার-পাঁচবার বই দেওয়া-নেওয়া করতে হয়েছিল সুরচিতাকে। সে যে ছেলেটার সাথে মিশছে শুধুই একটা আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধায় তা ছেলেটা তখন স্পষ্ট করে বুঝেছে কী বোঝেনি তা সুরচিতাও বোঝেনি। 

সে এটাও বোঝে নি যে শান্ত কিশোরের মধ্যে মূর্ত ব্যক্তিত্ব তাকে শুধু অবাক নয় মুগ্ধও করেছে। বিশেষতঃ নিজের বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব, অপ্রতুল আত্মসম্মানবোধ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের সমঝোতা দেখতে দেখতে সুরচিতার মন যখন ভীষণ ক্লান্ত আর বিষাক্ত তখন ওর থেকে অনেক কম বয়সী একটা ছেলের মধ্যে সে সবের তীব্রতা টের পেয়ে ও অভির সাথে মিশছিল স্বতোৎসারিত শ্রদ্ধায়, অদম্য আকর্ষণে, নির্দ্বিধায়। 

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Wednesday, April 22, 2026

Panchpoksho - 19

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রাক্‌পক্ষ

~~~~~~

মহিলা ঠোঁট উল্টিয়ে বলেছিলেন, “এমনি খাওয়া-শোওয়ার সময় সব দোতলার ঐ কোণের ঘরটাতে থাকে। তা বাদে কত্তা-গিন্নী তো থাকেন না। ছেলেকে তিনতলার চিলেকোঠায় পেতে পারো।” 

সুরচিতার আর কিছু জানার ছিল না। সদর দিয়ে বেঁকে চুরে ভিতরে আসা পুরুষটিকে কাটিয়ে রাস্তায় নেমে সে তালা খুলে সাইকেলটা তুলেছিল উঠোনে। সেটাকে সদরের একপাশে দেওয়ালে ঠেকিয়ে চাবি দিয়ে রেখে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গিয়েছিল অন্ধকারে।


চারপাক খেয়ে যখন ছাদে পৌঁছেছিল তখন হৃদপিণ্ড দবদবিয়ে প্রায় গলায় উঠে এসেছিল। তাও দৌড়ে গিয়ে চিলেকোঠার ঘরের দরজায় ধাক্কা দিয়েছিল দুমদুম করে। ভেতর থেকে কোনো সাড়া আসে নি। কয়েক মুহূর্ত নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছিল সুরচিতা। তারপর যেই ভাবছিল যে ফিরে যাওয়াই ভালো, তখনই দরজা খুলে অবাক গলায় অভি জানতে চেয়েছিল, “কাকে চাই?” 

সুরচিতা খুব স্বাভাবিক গলায় বলেছিল, “তুই আমাকে চিনতে পারছিস না? আচ্ছা পরীক্ষাটা দিয়ে এলি তার কী হলো জানতেও গেলি না?” 

অভি কোনো উত্তর দেয় নি। দুই হাতে দরজার দুই পাল্লা ধরে সোজাসুজি তাকিয়ে ছিল সুরচিতার চোখের ভিতরে। সুরচিতার বলেছিল, “আমি সুরচিতা। তুই আমার কাছে অঙ্ক পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলি। মনে আছে?” 

অভি অস্ফুটে বলেছিল, “হুঁ।” 

সুরচিতাই আবার বলেছিল, “চল ঘরের ভেতরে যাই।” তখন অভি ইতস্তত করে বলেছিল, “ভেতরে খুব গরম।” তবে দরজা ছেড়ে একপাশে সরে দাঁড়িয়েছিল। সুরচিতা ঘরের ভেতরে পা রাখতে রাখতে বলেছিল, “গরম তো তুই ছিলিস কী করে ভেতরে?” 

অভি খুব জোরের সঙ্গে বলেছিল, “আমার অভ্যেস আছে।” 

সুরচিতা হেসে বলেছিল, “আমার যে অভ্যেস নেই সে কথা তোকে কে বলল?” 

অভি উত্তর দেয় নি কোনো।


ঘরের মধ্যে প্লাই দিয়ে বানানো একটা বইয়ের তাক ছাড়া কোনো আসবাব ছিল না। একটা পুরোনো রঙচটা কিন্তু পরিষ্কার মাদুরে একটা নীল ওয়াড় লাগানো বালিশ আর অনেক খাতাবই ছড়ানো ছিল। সুরচিতা মেঝেতেই বসে পড়েছিল। অভিও বসতে বাধ্য হয়েছিল। তারপর দুজনে অনেক কথা হয়েছিল। 

কেন পঁচানব্বই হলো, কেনই বা একশো হলো না; অভির অঙ্ক ছাড়া আর কী পড়তে ভালো লাগে। প্রিয় লেখক কে; প্রিয় খেলা কী; কোন সাবজেক্টে অভি দুর্বল এবং আরো অনেক কিছু। কথায় কথায় সন্ধের অন্ধকার যখন ঘরের আনাচে-কানাচে জমতে শুরু করেছে, তখন অভি একটা কেরোসিনের ল্যাম্প জ্বালিয়েছিল। বলেছিল, “মা ফিরলে এক কাপ চা আপনাকে খাওয়াতে পারতাম, কিন্তু--” 

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Tuesday, April 21, 2026

Panchpoksho -18

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রাক্‌পক্ষ

~~~~~~

এখন আর সুরচিতার মনে পড়ে না বাবার সাথে কথা বলার কতোদিন পরে কাণ্ডটা সে করেছিল। কিন্তু তারিখটা তার ডাইরির পাতায় নকশা করা আছে। সেদিন কিছু একটা কারণে হঠাৎ ক্লাস বাতিল হয়ে গিয়েছিল ইউনিভার্সিটিতে। ওরকম প্রায়ই হতো, দুদল ইউনিয়নবাজ ছেলেমেয়ের মারপিটে, বা মারকুটেদের শাস্তির প্রতিবাদে বা ওদের কোনো দূ-সম্পর্কীয় বুড়ো নেতা মারা গেলেও। তাই কারণটা খুব বিশেষ ছিল না সুরচিতার কাছে। সেদিন বাড়ি ফিরে সে বোঝা-বোঁচকা সব নামিয়ে প্রায় উড়ে গিয়েছিল সাইকেল নিয়ে। সঙ্গে শুধু ছিল অভির পরীক্ষার খাতাটা।

ঠিকানা জানা ছিল। কিন্তু বাড়িটা দেখে ভুলভুলাইয়া মনে হয়েছিলো। বাইরে থেকে কড়া ঘুরিয়ে খোলা যায় এরকম একটা জীর্ণ কিন্তু সেগুনের পাল্লা ছিল সদর দরজায়। দরজাটা পনের ইঞ্চি পাঁচিলের গাঁথনিতে ফোটানো, রাস্তা থেকে একধাপ উঁচু সিঁড়ির মাথায়। সেটা পেরিয়ে তিনদিক পনের ইঞ্চি পাঁচিলে ঘেরা উঠোন। উঠোনের মাঝামাঝি তুলসী মঞ্চ; তাতে একটা শুকনো মরো মরো তুলসী গাছ পুরো বাড়িটার জীর্ণ আবহাওয়াটার মুখড়া গাইছে। 

উঠোনের তিনদিকে উঁচু রক। রক বরাবর অনেকগুলো দরজা জানলা। এখানে ওখানে ছেঁড়া ফাটা পর্দারা ঝুলছে। কোনোটা তার পিছন থেকে আসা পাখার হাওয়ায় দুলছে। আবার কোনোটা টানটান স্থির ঢেকে রাখছে আপ্রাণ তালার ভার। 

সবচেয়ে সরু দরজাটায় কোনো পর্দা ছিল না, তাই দেখা গেল সেখানে অন্ধকারে উঠে গেছে একটা সিঁড়ি। তার সামনেও রক থেকে দু ধাপ সিঁড়ি নেমেছে উঠোনে। দরজাগুলোতে না ছিল কোনো নম্বর, না কোনো নেমপ্লেট। কী করলে অভিকে খুঁজে পাবে বুঝতে পারছিল না সুরচিতা। হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে ছিল, আর মাঝে মাঝে পিছন ফিরে দেখছিল রাস্তায় রাখা সাইকেলটাকে।


সেই সময় একটা পর্দা দুলিয়ে মাঝবয়সী এক মহিলা বেরিয়ে এসেছিলেন। আর তখনই পিছনে একটা পুরুষকন্ঠ গজগজিয়ে উঠেছিল, “কী সব বিবেচনা! দরজার মুখটা জাম করে সাইকেল রাখে......” 

সুরচিতা পিছন ফিরে দেখেছিল যে সত্যিই পুরুষটি নিজের সাইকেলটা বাড়িটার দরজা পার করে ভেতরে ঢোকাতে গিয়ে বেশ ঝামেলায় পড়েছেন। কিন্তু তার থেকেও বেশি জরুরি ছিল মহিলাটির থেকে অভির ঠিকানা জানা। তাই বলেছিল, “শুনছেন?” 

মহিলা ফিরে তাকিয়ে বলেছিলেন, “আমাকে বলছ?” 

সুরচিতা বলেছিল, “হ্যাঁ, আপনাকেই। অভিরা মানে দিলীপকাকু কোন ঘরে থাকেন?” 

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Monday, April 20, 2026

Panchpoksho -17

পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রত্নপক্ষ

~~~~~~

প্রত্যেকটা নতুনরকম ব্যবসা যেই শুরু করতে যাবে মণিবাবুর নাতি-নাতনিরা অমনি তাদের জালে ফেলা হবে দিলীপের মতো করে। এইসব ছেলেমেয়েরা নিজেদের পছন্দের দোসর খুঁজে নিলে যদি পারিবারিক অসন্তোষের কারণ দেখা দেয়, তখন টুকুন রায়রা তার মধ্যে নিজেদের জড়াবে। যতগুলো পক্ষ থাকবে এই বিবাদে সব পক্ষকেই মাজা ভেঙে বসাবার জন্য মিথ্যের পর মিথ্যে বলবে। মিষ্টি কথায় কাজ না হলে ভয় দেখাবে। যে মিষ্টি কথায় ভুলে যাবে বা ভয় পাবে তাকেই নিজেদের তাঁবেতে নিয়ে বাকিদের শাসানি আর হুমকি দিতে থাকবে তাদের অপকর্ম খুঁজে বার করে বা নিছক অপকর্মের গুজব ছড়িয়ে।


সে রাতে সুরচিতার মতো রুক্ষ, উদ্ধত মেয়ে নিজের কাছে নিজেই দূর্বোধ্য হয়ে উঠেছিল। ভীষণ লজ্জা করছিল সেদিন ওর, নিজের অক্ষমতা দেখে। যত লজ্জা করছিল তাকে ছাপিয়ে উঠেছিল নিয়তির পরিহাসে পাওয়া দুঃখ। 

নিয়তি মানে মৃত্যু নয়, জন্ম। না হলে অমন তীক্ষ্ণ মেধার ছেলে কেন এমন করে এক অর্বাচীনের ঔরসে আরেক নির্বোধের গর্ভে জন্মাবে আর তার তুচ্ছ জীবনের একান্ত যাপনটা কিছু লোকের জীবনধারণের প্রকোপে অনন্ত নরকযন্ত্রণা হয়ে দাঁড়াবে? নিজের শৈশব, কৈশোর উপভোগ করতে পারবে না? কেন? কেন? কেন? ইচ্ছে করছিল টুকুন রায়কে ছিঁড়ে কুটি কুটি করে ফেলতে; নিদেনপক্ষে ওদের কাগজগুলো।


সেই থেকে নিয়তির সাথে যুদ্ধ শুরু সুরচিতার। জীবন যেমন করে আসে তাকে সেইভাবে না মেনে নিয়ে, তার সাথে পাঞ্জা কষে লড়াই করার শুরু জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য। আক্ষেপ আর হাহাকার করা ছেড়ে দিয়ে প্রতিকারের খোঁজ শুরু। প্রথমবার, নিজের ইচ্ছেয়।

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Sunday, April 19, 2026

Panchpoksho - 16

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~


প্রত্নপক্ষ

~~~~~~

তখন সুরচিতা যেন হাঁফ ছেঁড়ে বেঁচেছিল নটে গাছ মুড়োতে। আজ জানে যে এরকম নটে গাছের মুড়ো হয় না, সবটাই ধড়; তো মুড়োবে কী! সেদিন অবশ্য বেশ নাটুকে কায়দায় বলেছিল, “তা হলে তো এবার টুকুন রায়দের খপ্পর থেকে মুক্তি আসন্ন, যাক বাঁচা গেল।” 

বাবা ঠোঁটের কোণে মলিন হাসি মেখে বলেছিলেন, “দারিদ্র্য বড়ো কঠিন অভিশাপ। তার সাথে যদি অবিমৃষ্যকারিতা যোগ হয় তাহলে বেঁচে থাকা কঠিনতর হয়ে যায়। দিলীপ যদি ওর ছাত্রী দীপ্তিকে নিয়ে এখানে পালিয়ে না আসত, অন্তত লেখাপড়া শেষ করে একটা চাকরি করা অবধি অপেক্ষা করত--তা না, দীপ্তির বাবা নাকি ওকে অন্য লোকের সাথে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছিলেন। এখন দীপ্তির হেল্‌থ সেন্টারের কাজটাও তো ধামা ধরে। নিজেরা জোরালো হওয়ার আগেই জমকালো হয়ে গেল--যাক বাদ দে। আমি আমার মতো করে ভাবছিলাম যদি ওদের ছেলেটাকে ওদের ভুলের মাশুল দেওয়ার জোয়াল থেকে বাঁচানো যায়।”


সুরচিতার মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছিল। এরকম হতো মাঝে মাঝে, যখন বাবাকে ওর বেশ ভিনগ্রহের লাগত। কিন্তু ও তখনও জানত যে অভিকে বাবা ভালোবাসেন কিনা বা অভির জন্য খামকা বাবা কেন ভাবছেন এসব কথা ও বাবাকে জিজ্ঞেস করলে বাবা উত্তর দিতে পারতেন না। এটাও সত্যি সেই প্রশ্নের উত্তর সেদিন তার নিজেরও জানা ছিল না। সেই উত্তর সে আজ জানে যে শুধু নিজের ভালো লাগবে বলে, কখনও নিজেকে নিজের খুব খারাপ লাগবে না বলে, বা নিজেই নিজের চোখে হীন হয়ে পড়লে নিজেকে অন্তত একটু ভালো লাগার মতো একটা কীর্তি খুঁজে পাবেন বলেই বাবা অভিকে সহজতর একটা জীবন দিতে চেয়েছিলেন।


সেদিন অবশ্য সুরচিতা বাবার থেকে টাকাটা ফেরত নেয় নি। বলেছিল, “টাকাটা আমাকে দিতে হবে না। আমার রোজগার বাড়লে পুরো বিলটাই আমি দেব। তোমার এই ব্যবস্থাটা আমাকে দায়িত্বশীল করেছে। অন্তত আমি বুঝে গেছি যে খেয়ে পরে বাঁচার, এমনকি রোজগার করারও কিছু খরচ আছে।” 

সব যন্ত্রণা ছাপিয়ে বাবার মুখে ফুটে উঠেছিল শান্তির হাসি।


আর সারা রাত সুরচিতা কেঁদে ভাসিয়েছিল। কেন? অভির জন্য। তার নিজের জন্য। কিছুটা দিলীপের জন্য, কিছুটা মণিবাবুর জন্য। দিলীপের শুধু উদ্যমটুকুই ছিল। কিন্তু মণিবাবুর পয়সা আর বনেদীয়ানাও আছে। তবু যে ছকে সক্কলে বাধা পড়েছে তাতে মণিবাবুর ব্যবসাটা চেটে চুষে চিবিয়ে খেতে টুকুনদের বেশি দিন লাগার কথা নয়। 

#sanhitamukherjeeoriginals
পাঁচপক্ষ
~~~~~~
প্রত্নপক্ষ
~~~~~~
তখন সুরচিতা যেন হাঁফ ছেঁড়ে বেঁচেছিল নটে গাছ মুড়োতে। আজ জানে যে এরকম নটে গাছের মুড়ো হয় না, সবটাই ধড়; তো মুড়োবে কী! সেদিন অবশ্য বেশ নাটুকে কায়দায় বলেছিল, “তা হলে তো এবার টুকুন রায়দের খপ্পর থেকে মুক্তি আসন্ন, যাক বাঁচা গেল।”
বাবা ঠোঁটের কোণে মলিন হাসি মেখে বলেছিলেন, “দারিদ্র্য বড়ো কঠিন অভিশাপ। তার সাথে যদি অবিমৃষ্যকারিতা যোগ হয় তাহলে বেঁচে থাকা কঠিনতর হয়ে যায়। দিলীপ যদি ওর ছাত্রী দীপ্তিকে নিয়ে এখানে পালিয়ে না আসত, অন্তত লেখাপড়া শেষ করে একটা চাকরি করা অবধি অপেক্ষা করত--তা না, দীপ্তির বাবা নাকি ওকে অন্য লোকের সাথে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছিলেন। এখন দীপ্তির হেল্‌থ সেন্টারের কাজটাও তো ধামা ধরে। নিজেরা জোরালো হওয়ার আগেই জমকালো হয়ে গেল--যাক বাদ দে। আমি আমার মতো করে ভাবছিলাম যদি ওদের ছেলেটাকে ওদের ভুলের মাশুল দেওয়ার জোয়াল থেকে বাঁচানো যায়।”

সুরচিতার মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছিল। এরকম হতো মাঝে মাঝে, যখন বাবাকে ওর বেশ ভিনগ্রহের লাগত। কিন্তু ও তখনও জানত যে অভিকে বাবা ভালোবাসেন কিনা বা অভির জন্য খামকা বাবা কেন ভাবছেন এসব কথা ও বাবাকে জিজ্ঞেস করলে বাবা উত্তর দিতে পারতেন না। এটাও সত্যি সেই প্রশ্নের উত্তর সেদিন তার নিজেরও জানা ছিল না। সেই উত্তর সে আজ জানে যে শুধু নিজের ভালো লাগবে বলে, কখনও নিজেকে নিজের খুব খারাপ লাগবে না বলে, বা নিজেই নিজের চোখে হীন হয়ে পড়লে নিজেকে অন্তত একটু ভালো লাগার মতো একটা কীর্তি খুঁজে পাবেন বলেই বাবা অভিকে সহজতর একটা জীবন দিতে চেয়েছিলেন।

সেদিন অবশ্য সুরচিতা বাবার থেকে টাকাটা ফেরত নেয় নি। বলেছিল, “টাকাটা আমাকে দিতে হবে না। আমার রোজগার বাড়লে পুরো বিলটাই আমি দেব। তোমার এই ব্যবস্থাটা আমাকে দায়িত্বশীল করেছে। অন্তত আমি বুঝে গেছি যে খেয়ে পরে বাঁচার, এমনকি রোজগার করারও কিছু খরচ আছে।”
সব যন্ত্রণা ছাপিয়ে বাবার মুখে ফুটে উঠেছিল শান্তির হাসি।

আর সারা রাত সুরচিতা কেঁদে ভাসিয়েছিল। কেন? অভির জন্য। তার নিজের জন্য। কিছুটা দিলীপের জন্য, কিছুটা মণিবাবুর জন্য। দিলীপের শুধু উদ্যমটুকুই ছিল। কিন্তু মণিবাবুর পয়সা আর বনেদীয়ানাও আছে। তবু যে ছকে সক্কলে বাধা পড়েছে তাতে মণিবাবুর ব্যবসাটা চেটে চুষে চিবিয়ে খেতে টুকুনদের বেশি দিন লাগার কথা নয়।
~~~~~~
Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml
(চলবে)

Saturday, April 18, 2026

Panchpoksho - 15

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রত্নপক্ষ

~~~~~~

হিসেব বোঝাতে লাগলেন বাবা, “পাঁচ বছরের কাগজের দাম ধার করে চোকালে ওর প্রেসটার খোলনলচে বদলের কাজটা হতোও না; প্রেসটা ধুঁকত, মার খেত ব্যবসা। এখনই প্রযুক্তি বদলেছে; এখনই তার সাথে তাল মিলিয়ে না চলতে পারলে পিছিয়ে পড়তেই হবে। খদ্দেরের ডিমান্ড আপ-টু-ডেট টেকনোলজি দিয়ে মেটাতে না পারলে খদ্দের অন্য ব্যবসাদারের কাছে চলে যাবে। প্রেসে প্রযুক্তিগত অদলবদলগুলো এখনই না করতে পারলে পরে পারার সম্ভাবনা কম, সংস্থান জোটানোই যে দুঃসাধ্য হয়ে যাবে। তারপরেও যদি বা সুযোগ আসে তখনও যে একইভাবে ও বাধা পাবে না তার নিশ্চয়তা কী? ক্রমশঃ শেষের দিকে এগিয়ে, যুদ্ধটাকে আরও বিধ্বংসী করে তুলে তারপর আত্মসমর্পণ করে নাকাল হওয়ার থেকে ও ভেবেছে আত্মহত্যাই শ্রেয়। তাই প্রেসটা বেচেই দিল ও।”


বুদ্ধি দিয়ে সুরচিতা বোঝার চেষ্টা করছিল সত্যি নিস্তার কিছু আছে নাকি। ও বেশ দুশ্চিন্তায় হাবুডুবু খেতে খেতে জানতে চাইল, “বাবা, এই বয়সে দিলীপকাকু তো চাকরিও পাবে না, তাহলে এখন ওদের চলবে কী করে?” 

বাবা ভাঙা গলায় বললেন, “দীপ্তির কাজ আছে। তবে সেটা তেমন জোরালো কিছু নয়। দিলীপের কিছু বাঁধা খদ্দের তো ছিল। সেই কাজগুলো ও ধরবে; মণিবাবুর ওখানে বা অন্য কোথাও, মানে যেখানে সবচেয়ে সস্তায় হবে, সেখানে কাজগুলো করিয়ে তুলে দেবে--” 

দারুণ ষড়যন্ত্র টের পেয়ে গেছে যেন এমন করে সুরচিতা বলল, “মানে দালালি করবে। চেনা ছকে আরেকটা স্বাধীন ছোট ব্যবসাদারকে দালাল বানানো হলো। রোজগারের পরিমাণের কথা ভাবলে স্পষ্ট দেখা যায় যে ব্যবসাদার থেকে দালাল হয়ে যাওয়া লোকগুলো বেশ গরীব আর দুর্বল হয়ে পড়ে। ব্যবসায় লোকগুলোর আয়ের পরিমাণ অনিশ্চিত ছিল, কিন্তু আয়টা নিয়মিত ছিল। এখন আয়টা যেহেতু অন্য দুটো লোক বা সংস্থা পরস্পরের সঙ্গে ব্যবসা করবে কিনা তার উপর নির্ভরশীল, তাই সেটা অনিয়মিত হয়ে গেল। লোকগুলো বেশ মাজা ভেঙে হাঁটু মুড়ে বসল। এতো তামাম জনসাধারণকে চেটে-চুষে-চিবিয়ে খাওয়ার দুর্ধর্ষ বন্দোবস্ত গো বাবা!” 

মেয়েকে ছদ্ম মুগ্ধতায় অকপট নিন্দে করতে দেখে হেসে ফেললেন সুরচিতার বাবা, “তবে এই মাজাভাঙা অশক্ত লোকগুলোর ঘাড়ে সমাজ বল আর রাজ্যপাটই বল, সে তো আর শতক ধরে নেত্য করতে পারবে না। দুর্বল লোকগুলো সে বোঝা বইতে পারবে না। খুব শিগগির মুখ থুবড়ে পড়বে। এটাই নিশ্চিন্তির কথা।”

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)


Friday, April 17, 2026

Panchpoksho - 14

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রত্নপক্ষ

~~~~~~

সুরচিতা ঝলসে উঠেছিল, “তারপরেও এদের তুমি চাঁদা দাও? তোমার লজ্জা করে না? নিজের রোজগারে ক্রিমিনাল পোষো আর আর নিজের মেয়েকে--” থেমে গিয়েছিল বাবার দুই ভ্রূর মাঝে জমে ওঠা যন্ত্রণা দেখে। 

তখন বাবা বলেছিলেন, “করে। তাই তো তোর টাকাটা ফেরত দিতে এসেছি। ওদের আমি ছেড়ে দিয়েছি তা বেশ কয়েক বছর হলো। তবু দিলীপের মতো কটা ছেলেকে ছাড়তে পারছি না। হয়তো এই দুর্বল ছেলেগুলোকে দিয়েই ওরা আমাকেও একদিন দুর্বল করতে চাইবে, যদিও আমি ওদের সহমর্মিতা, মধ্যস্থতা, সহৃদয়তার ফাঁদে কখনও পড়ি নি। কিন্তু অনেকেরই দুর্বলতার হদিশ রাখি তো।”


সুচরিতার সন্দেহ ছিল আরও অনেক, “মণিবাবু আর টুকুন রায়ের কোনো--” 

বাবা ওকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, “মণিবাবু এ শহরে বনেদী আর টুকুন বেনো জল, ভুঁইফোঁড়। মণিবাবু ছাড়া দিলীপের প্রেস কেনার হিম্মত এ শহরে কোনো লোকের নেই এখনও।” 

ধাঁধায় পড়ে গেল সুরচিতা, বলল, “তাহলে?” 

বাবা বললেন, “দিলীপ কাগজ বেচতে পারুক না পারুক, তোলা কাগজের দাম ওকে চুকিয়ে দিতে হবেই। সে জন্য ধার করলেও ওকে শুধতে হোতো। আবার প্রেসটা থাকলে নামে হলেও ওর রোজগার থাকবে, ফলে ওকে চাঁদাও দিতে হবে, দালালিও দিতে হবে, কৃতজ্ঞতার কর্জের মহাজনি সুদ বাবদ কাগজ তুলতেও হবে; বেচা না গেলে বিলোতেও হবে। তার ওপর নেতৃত্বের কুনজরে পড়েছে বলে, ব্যাপার এমন দেখানো হচ্ছে যেন লোকে যে কাগজ নিতে চাইছে না সেটাও দিলীপেরই দোষে বা ওরই উস্কানিতে, যেন ও যথেষ্ট উদ্যম নিয়ে কাগজটার জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারছে না। তার কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে যেন ও নিজের ব্যবসাটাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই মাশুল হিসেবে ধরা হচ্ছে ওর ব্যবসা থেকে করা রোজগারটা।” 

বাবা বলে চললেন, “যতোদিন প্রেস থাকবে, ততোদিন পরিবার প্রতিপালনের জন্য আর প্রেসটাকে রাখার জন্য ওকে সময় বা শ্রম দিতেই হবে। তাছাড়া ও ভাবছিল যে এবারে প্রেসের খোলনলচে বদলে সমসাময়িক করে তুলবে ছাপাখানাটা। তাহলে হয়তো ও আর ছোটোখাটো ব্যবসাদার থাকতো না অদূর ভবিষ্যতে। ওর বাড়বৃদ্ধি বা স্বাবলম্বী হওয়ার মূলে যে প্রেসটা! তাই দিলীপের প্রেসের রোজগারটাই নিংড়ানোর পরিকল্পনা হচ্ছে, হবেও পরে, ওকে দুর্বল করে নিজেদের তাঁবেতে রাখার জন্য।”

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)

Thursday, April 16, 2026

Panchpoksho -13

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~



প্রত্নপক্ষ

~~~~~~


বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, “একরকম তাই-ই। ওকে কোনোদিনই টুকুন বা পার্টি—কেউই--ছাপার কাজগুলোর পয়সা দেয় নি, টুকুনের জনসেবায় বা পার্টির জনপ্রিয়তা-বর্ধনের কাজে উদ্যোগী স্বনিযুক্ত সফল যুবকের চাঁদা বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল সেসব। তারওপর গত পাঁচবছরে কাগজের বিক্রি বাবদ যা দাম হয়, সবই ওকে একসাথে চোকাতে হলো, নিজের পকেট থেকে।”


আবার প্রশ্ন করেছিল সুরচিতা, “যেসব লোকে কাগজের দাম দেয় না তাদের কাগজ দেওয়া বন্ধ করে দিলেই তো হতো, তাই না?” 

বাবা একটু যেন অন্যমনস্ক হয়ে গিয়ে বলেছিলেন, “দিয়েছিল। কিন্তু ওর কোটার কাগজ ওকে তুলতে হতো। পার্টির শিক্ষা হচ্ছে যে লোকে দাম না দিলেও কাগজটা লোককে দিতে হবে, তাদেরকে না হলে আদর্শ বোঝানো যাবে কী করে? কী করে তাদের ঠিক-ভুল বাছতে শেখানো যাবে? পার্টির আদর্শ কর্মীকে তাই লোকের বাড়ি বাড়ি কাগজ পৌঁছে দিয়ে জনসেবা করতে হয়, পার্টিকে জনপ্রিয় করার কাজ করতে হয়, পার্টির আদর্শ প্রচার করতে হয়। কিন্তু পার্টির কাগজ আর কেউ পড়তে চাইছে না। যাদের জোর করে কাগজ দিচ্ছে দিলীপ, তারা দাম দিতে চাইছে না। তবুও কিছু কাগজ বিলোচ্ছে ছেলেটা; কিন্তু বেশিরভাগ কাগজই ও আর বিলোচ্ছে না। সেই জন্যই ও বিষ-নজরে পড়েছে। ওকে জানিয়েও দেওয়া হয়েছে যে ও নিয়ম মানছে না বলে ওর ওপরে নেতৃত্ব বিরক্ত। তার মাশুল হিসেবেই পার্টির প্রতি দিলীপের নিষ্ঠার প্রমাণ চাওয়া হলো। ওকে একসাথে পাঁচ বছরের কাগজের দাম চুকিয়ে দিতে বলা হলো। তাই প্রেসটা বেচতে হলো।”


সুরচিতা বেশ অবাক হলো। রোজগারের একমাত্র উপায় বলতে যে প্রেসটা সেটা বেচে দিলে এতো বড়ো খরচের ধাক্কা দিলীপ চোকাবে কী করে? প্রেসটা থাকলে যা হোক রোজগার হতো। কাগজের দাম বাবদ যদি ধারও করতে হতো সেটাও শোধ করতে পারত সেই রোজগার থেকে। কিন্তু এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছিল না সুরচিতা। সেই কথা সে বাবাকে বলেও ফেলেছিল। বাবা বললেন, “দলের প্রতি নিষ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে মানে এবার ওকে ভাতে মারার আরও অনেক চেষ্টা হবে, যাতে ও আরও বেশি করে দলের ওপর নির্ভরশীল আর তার ফলে দলের আরও বাধ্য হয়ে পড়ে। সুরোজগারের আত্মবিশ্বাস আর তার ফলে জেগে ওঠা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য যাতে ভেঙে পড়ে তার ব্যবস্থা করা হবে--” 

সুরচিতা অধৈর্য হয়ে জানতে চাইল, “মানে?”

 বাবা একটা বড়ো শ্বাস ফেলে বললেন, “মানে এরপর কাগজ না তুললে প্রেসে হয়তো ডাকাতি করাবে বা আগুন ধরিয়ে দেবে।” বাবার গলা বুজে এসেছিল ক্ষোভে, দুঃখে।

#sanhitamukherjeeoriginals
পাঁচপক্ষ
~~~~~~
প্রত্নপক্ষ
~~~~~~
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, “একরকম তাই-ই। ওকে কোনোদিনই টুকুন বা পার্টি—কেউই--ছাপার কাজগুলোর পয়সা দেয় নি, টুকুনের জনসেবায় বা পার্টির জনপ্রিয়তা-বর্ধনের কাজে উদ্যোগী স্বনিযুক্ত সফল যুবকের চাঁদা বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল সেসব। তারওপর গত পাঁচবছরে কাগজের বিক্রি বাবদ যা দাম হয়, সবই ওকে একসাথে চোকাতে হলো, নিজের পকেট থেকে।”

আবার প্রশ্ন করেছিল সুরচিতা, “যেসব লোকে কাগজের দাম দেয় না তাদের কাগজ দেওয়া বন্ধ করে দিলেই তো হতো, তাই না?”
বাবা একটু যেন অন্যমনস্ক হয়ে গিয়ে বলেছিলেন, “দিয়েছিল। কিন্তু ওর কোটার কাগজ ওকে তুলতে হতো। পার্টির শিক্ষা হচ্ছে যে লোকে দাম না দিলেও কাগজটা লোককে দিতে হবে, তাদেরকে না হলে আদর্শ বোঝানো যাবে কী করে? কী করে তাদের ঠিক-ভুল বাছতে শেখানো যাবে? পার্টির আদর্শ কর্মীকে তাই লোকের বাড়ি বাড়ি কাগজ পৌঁছে দিয়ে জনসেবা করতে হয়, পার্টিকে জনপ্রিয় করার কাজ করতে হয়, পার্টির আদর্শ প্রচার করতে হয়। কিন্তু পার্টির কাগজ আর কেউ পড়তে চাইছে না। যাদের জোর করে কাগজ দিচ্ছে দিলীপ, তারা দাম দিতে চাইছে না। তবুও কিছু কাগজ বিলোচ্ছে ছেলেটা; কিন্তু বেশিরভাগ কাগজই ও আর বিলোচ্ছে না। সেই জন্যই ও বিষ-নজরে পড়েছে। ওকে জানিয়েও দেওয়া হয়েছে যে ও নিয়ম মানছে না বলে ওর ওপরে নেতৃত্ব বিরক্ত। তার মাশুল হিসেবেই পার্টির প্রতি দিলীপের নিষ্ঠার প্রমাণ চাওয়া হলো। ওকে একসাথে পাঁচ বছরের কাগজের দাম চুকিয়ে দিতে বলা হলো। তাই প্রেসটা বেচতে হলো।”

সুরচিতা বেশ অবাক হলো। রোজগারের একমাত্র উপায় বলতে যে প্রেসটা সেটা বেচে দিলে এতো বড়ো খরচের ধাক্কা দিলীপ চোকাবে কী করে? প্রেসটা থাকলে যা হোক রোজগার হতো। কাগজের দাম বাবদ যদি ধারও করতে হতো সেটাও শোধ করতে পারত সেই রোজগার থেকে। কিন্তু এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছিল না সুরচিতা। সেই কথা সে বাবাকে বলেও ফেলেছিল। বাবা বললেন, “দলের প্রতি নিষ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে মানে এবার ওকে ভাতে মারার আরও অনেক চেষ্টা হবে, যাতে ও আরও বেশি করে দলের ওপর নির্ভরশীল আর তার ফলে দলের আরও বাধ্য হয়ে পড়ে। সুরোজগারের আত্মবিশ্বাস আর তার ফলে জেগে ওঠা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য যাতে ভেঙে পড়ে তার ব্যবস্থা করা হবে--”
সুরচিতা অধৈর্য হয়ে জানতে চাইল, “মানে?”
বাবা একটা বড়ো শ্বাস ফেলে বললেন, “মানে এরপর কাগজ না তুললে প্রেসে হয়তো ডাকাতি করাবে বা আগুন ধরিয়ে দেবে।” বাবার গলা বুজে এসেছিল ক্ষোভে, দুঃখে।
~~~~~~
Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml
(চলবে)

Wednesday, April 15, 2026

Panchpoksho -12

 পাঁচপক্ষ

~~~~~~


প্রত্নপক্ষ

~~~~~~

বাবা গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলেন। তারপর চৌকি থেকে ঝুলে থাকা পা দুটোকে খানিকক্ষণ মন দিয়ে দেখেছিলেন। তারপর পায়ের একটা পাতা অন্য পাতাটায় ঘষতে ঘষতে বলি-কী-না-বলি করে বলে ফেলেছিলেন, “দিলীপের প্রেসের ঘরটার ব্যবস্থা করার জন্য ওকে কাউন্সিলর টুকুন রায়ের কাছে যাতায়াত করতে হয়েছিল। দিলীপের তখন বছর পঁচিশেক বয়স, টগবগে ছেলে। টুকুনের মনে ধরেছিল ওকে। তারপর ওর চ্যালারাও দিলীপের ওখানে আড্ডা দিতে শুরু করে। সবার মতো দিলীপও নিজের প্রেসে টুকুনদের পার্টির কাগজ রাখতে শুরু করে। তারপর ঘরটা পাইয়ে দিয়েছে বলে টুকুন দিলীপকে বলে ওদের লিফলেট ছাপিয়ে দিতে, ব্যানার বানিয়ে দিতে। তারপর বলে ওদের হয়ে কাগজ বিক্রি করতে।” 

সুরচিতার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য প্রশ্ন তুলেছিল, “করল কেন? না করলে কী হতো?” 

বাবা নিরুপায় স্বরে বলেছিলেন, “তুই বুঝবি না সে কথা।”


বুঝবি না বললে তখন বেশ গায়ে লাগত সুরচিতার। ফলে তৎক্ষণাৎ বলেছিল, “বুঝিয়ে বললে নিশ্চয়ই বুঝব।” 

বাবা বলেছিলেন, “কারুর কথা--এমন সব কথা--আলোচনা করা ঠিক নয়।” 

সুরচিতা তর্ক করেছিল, “বেঠিক তখন যখন তুমি পরচর্চায় সুখ পাবে--ধরো কিনা পাড়ার লোকের কাছে এসব কথা বলে নিজের বুদ্ধির বড়াই করবে আর অহঙ্কারে ঝলমলাবে। আমাকে বললে ব্যাপারটা শিক্ষামূলক জীবনীপাঠ হবে।” 

বাবা একটু চুপ করে থেকে বলতে শুরু করেছিলেন, “দিলীপের অল্প বয়স তখন। সংসার করে ফেলেছে ... সংস্থান তো করতে হবে। ঘরটার জন্য টুকুন রায় মধ্যস্ততা করেছিল, না-হলে যে-দরে ও পেয়েছিল ঘরটা সেই দরে পাওয়া সম্ভব ছিল না। তাছাড়া ঘরটার মালিকানা নিয়েও অস্পষ্টতা ছিল। সব শরিক বা দাবিদারকে চেনাই দায় ছিল, তায় তুষ্ট করা তো দুরূহ কল্পনা। একজনের সাথে রফা হলে আরেকজন এসে বলে ‘আমিও শরিক। সুতরাং আমাকেও সমান টাকা দিতে হবে ঘরটা পেতে হলে।’ স্টেশন রোডের ওপর, বাজারের মধ্যে ব্যবসার জন্য একটা ঘর--বুঝতেই পারছিস অনেক লোকেরই নজর ছিল।” 

খিক খিক করে হেসে সুরচিতা বলেছিল, “বোঝো, একে বলে দালালির দাম চোকাতে দাসত্ব! এঁরা আবার সমাজের বঞ্চনা বেচে রাজনীতি করেন!” 

প্রত্যাশিত বিরক্তি প্রকাশ করে বাবা বলেছিলেন, “লেখাপড়া শিখে ভাষার এ কী অবস্থা! কাদের সঙ্গে মেশো আজকাল?”

সুরচিতা তখন উদ্ধত ছিল, তাই বলেছিল, “যাদের সঙ্গে মিশলে টুকুন রায়কে এড়িয়ে চলা যায় তাদের সাথে। এখনও তো ঝুড়ি থেকে বেড়াল বেরোল না। সেই ঘর ভাড়ার দালালি চোকাতে দিলীপকাকুর ব্যবসা বিকিয়ে গেল নাকি?”

~~~~~~

Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml 

(চলবে)



Readers Loved