Wednesday, August 14, 2024

JPDA - Chapter 08

৮. দাবা খেলা



 মিন হুয়ে আঁতকে উঠলো, “কী?”

বিব্রত হয়ে পড়লো। আগে হলে এতক্ষণে সে শিন ছির মুখে একটা চড় কষিয়ে দিয়েছে কোনো কথা না বলে। কিন্তু এখন মিন হুয়েকে প্রথমেই ভাবতে হচ্ছে তার জায়গায় সু তিয়াঁ থাকলে কী রেগে যেতো?

নিশ্চয়ই না। শিন ছির সঙ্গে, এই মূহুর্তে, আনন্দ আত্মহারা অবস্থায়, সু তিয়াঁ নিশ্চয়ই মেনে নিতো শিন ছির আব্দার, তাই না? অন্তত মিন হুয়ের মনে, সু তিয়াঁর ডায়েরি পরে, সু তিয়াঁর যে ছবিটা তৈরি হয়েছে, সেটা শিন ছির অনুগত অনুচরের ছবি। সু তিয়াঁ শিন ছিকে খুব মান্যি করে, তার মেজাজ সহ্য করে, তার অধৈর্য আচরণ ক্ষমা করে দেয়, শিন ছি রেগে গেলে তাকে শান্ত করে, আপ্রাণ চেষ্টা করে শিন ছির গোঁয়ার্তুমিতে খারাপ হয়ে যাওয়া সম্পর্কগুলোকে মেরামত করতে।

মিন হুয়ে মনস্থির করে ফেলে যে খেলাটা ও পুরোটাই খেলবে।

সামনে ঝুঁকে শিন ছির চোখে চোখ রেখে, নিষ্পলক দৃষ্টিতে বলে, “জামার চেনটা পিঠের দিকে।”

শিন ছি এক মূহুর্তের জন্য একটু চমকে ওঠে। সে আশা করে নি ‘সু তিয়াঁ’-রূপী মিন হুয়ে তাকে যথাযথ উত্তর দেবে। বিনয়ে জানতে চায়, “আমি কী-?”

মিন হুয়ে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায়।

শিন ছি হাত বাড়িয়ে চেনটা গোড়া অবধি টেনে দেয়। একটা ‘চাক’ করে শব্দ হয় আর সিল্কের জামাটা খসে পড়ে মিন হুয়ের কাঁধ থেকে। মিন হুয়ে ব্রা-এর হুক খুলে দিয়ে, বুক চিতিয়ে শান্ত চোখে তাকায় শিন ছির দিকে।

সু তিয়াঁর শরীরে এমন কোনো বিশেষ চিহ্ন ছিলো না যা দিয়ে ওকে চেনা যায়। সেটা চেন শিয়েংশঁ যখন ল্যান জিন গতে ফোন করে কথা বলে ছিলেন, তখনই জানা গিয়ে ছিলো। তখন উদ্দেশ্য ছিলো ভবিষ্যতে যদি কোনো অবশেষ পাওয়া যায় সু তিয়াঁর তখন তার থেকে যাতে চিনে নেওয়া যায় সু তিয়াঁকে তার একটা নথি বানানো। কাজটা খানিকটা নিয়মরক্ষাও বটে। ল্যান জিন গের ল্বব্যানিয়াঁ বেশ সহযোগিতা করে ছিলেন তখন। যে মেয়েরা লি চুন মিয়াও-এর সাথে থাকতো, তিনি জিজ্ঞাসাবাদ করে ছিলেন তাদেরকে লি চুন মিয়াও-এর শরীরের পরিচিতি চিহ্নের ব্যাপারে। তিনি বিশেষ জিজ্ঞাসাবাদ করে ছিলেন ঝাও য়িং মেইকে। মেয়েদের বাসায় যেহেতু সবাই একটা স্নানঘর ব্যবহার করতো, মেয়েরা অনেকেই লিন চুন মিয়াও অর্থাৎ সু তিয়াঁকে স্নানের সময়ে দেখেছে। সেই মেয়েরা জানিয়ে ছিলো যে লি চুন মিয়াও-এর শরীরে কোনো জন্মদাগ, কোনো ক্ষত, কোনো তিল বা স্পষ্ট কোনো দাগ কারুর নজরে কখনো পড়ে নি। 

শিন ছি চোখ কুঁচকে, খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো মিন হুয়ের শরীরের ঊর্ধাংশ, যেমন ছবি আঁকিয়েরা দেখে মডেলকে, তেমন করে। কিন্তু কিচ্ছু ছোঁয় না। পাঁচ সেকেন্ড পরে নিঃশব্দে মিন হুয়ের সাথে হাত লাগিয়ে ব্রা-এর হুক লাগিয়ে ফেলে, জামাটা গায়ে গলিয়ে চেন টেনে দেয় ঘাড় অবধি। তারপর মিন হুয়ের বাঁ কাঁধে আলতো টোকা দেয়, যেনো ধুলো লেগে ছিলো, সেটা ঝেড়ে দিলো।

মিন হুয়ে জানতে চাইলো, “কোনো পরিবর্তন ঘটেছে?”

শিন ছি বললো, “বড্ডো বড়ো। আমি চিনতে পারছি না একদম।”

মিন হুয়ে টিপ্পনি দিলো, “তুই তো কাউকে মুখ দেখেও চিনতে পারতিস না।”

শিন ছি মেনে নিলো, “আমি কোনোদিন তোর মুখটাও স্পষ্ট দেখি নি। তোর উচ্চারণ বেশ জোরালো হয়েছে। আর এটা-”

দেখালো বুকের দিকে, “একেবারেই আগের মতো নেই।”

মিন হুয়ে জানতে চাইলো, “খেয়াল করেছিস?”

শিন ছি জানালো, “আমি আগে দেখেছি।”

তারপর মনে করানোর চেষ্টা করলো, “মনে নেই তোর? সেবার গ্রীষ্মে? বঁ ফায়ার পার্টিতে? আমরা একে অপরের -”

পরের কথাগুলো শিন ছি বললো না। সু তিয়াঁও এই কথাটা ডায়েরিতে লেখে নি। মিন হুয়ের খানিক ধারণা ছিলো যে সু তিয়াঁ আর শিন ছির সম্পর্কটা শুধুমাত্র বন্ধুত্ব ছিলো না, তার থেকে গভীরতর কিছু ছিলো। মিন হুয়ের আর কোনো উপায় রইলো না সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, “তেরো বছর।”

শিন ছি দোহার দিলো, “হ্যাঁ, তেরো বছর।”

তারপর দাবা খেলা ফের শুরু করে বললো, “তুই কোনোদিন দাবাও জিতিস নি আগে।”

মিন হুয়ে জুসে একটা চুমুক দিয়ে বললো, “সে তো আগের কথা।”

শিন ছি কৌতুহলী, “যখন আমি ছিলাম না এখানে, তখন কী তুই কোনো ক্লাবে যেতিস, আর প্রায়ই খেলতিস?”

মিন হুয়ে জানালো, “ নাহ্‌, প্রায়ই খেলতাম না।”

শিন ছি তর্ক জুড়ে দিলো, “তাহলে দাবা খেলার এতো বাড়াবাড়ি রকমের ওস্তাদি রপ্ত করলি কী করে?”

মিন হুয়ে তর্কের মোড় ঘোরালো, “তুই কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিস না যে কেউ তোর থেকে বেশি বুদ্ধিমান, বিশেষ করে একটা মেয়ে, তাই না?”

শিন ছি অস্বীকার করলো, “আমি বিশ্বাস করি।”

জুসটা খেতে খেতে গলা পরিষ্কার করে নিয়ে মিন হুয়ে বললো, “পরিবর্তনটা যেভাবে হয়েছে সেটা শোন। একদিন আমি পাহাড়ে গিয়ে ছিলাম মাশরুম তুলতে। আমি জানতাম না যে কোনটা তুলব, কোনটা তুলবো না। আমি পাহাড়ের চূড়াটা বেশ টের পাচ্ছিলাম। হঠাৎ করে -”

মিন হুয়ে ইচ্ছে করে থেমে গেলো, শিন ছির কৌতুহলে শান দেবার জন্য। শিন ছি অধৈর্য, “হলোটা কী? তুই খাড়া পাহাড় থেকে পড়ে গেলি?”

মিন হুয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে দুহাত ছড়িয়ে বললো, “না। আমার মাথায় বাজ পড়ে ছিলো। তারপরে বাড়িতে ফিরে থেকেই আমি টের পেতে লাগলাম যে আমার আইকিউ বেড়ে চলেছে।”

শিন ছি হাসলো, “এটা কী যা-তা বাজে কথা?”

মিন হুয়ে ঝগড়া করতে লাগলো, "কেনো তোর মনে হলো যে ছোটোবেলায় আমি তোর তুলনায় মাথা মোটা ছিলাম? সেটাও কী যা-তা বাজে কথা নয়?”

শিন ছি বোঝাতে লাগলো, “ছোটোবেলায় মনে হতো যে তোর শুধু খেলাধুলো করতেই ভালো লাগে। তুই হোমওয়ার্কও আমার থেকে টুকতিস।”

মিন হুয়ের ঝট করে মনে পড়ে গেলো সু তিয়াঁর ডায়েরির একটা কথা, “সেই অঙ্ক পরীক্ষাটার কথা মনে পড়ে তোর যেটায় তোর থেকে টুকেও আমি বেশি নম্বর পেয়ে ছিলাম তোর থেকে?”

শিন ছি নিজের মাথা চাপড়াতে চাপড়াতে বললো, “মনে আছে। মনে আছে। আর তখন তুই বলেছিলি-”

মিন হুয়ে কথা কেড়ে নিলো, “- যে পরিবারের দায়দায়িত্ব বওয়ার কাজটা তোর। আমাকে তো অলিম্পিকের ট্রেনিং-এ মন দিতে হবে।”

শিন ছি সমর্থন করলো, “ঠিকই। সেই সময়ে এটাই ঠিক ছিলো। আমরা একমত হয়ে ছিলাম পরিবারের শ্রমবিভাজনটা কেমন হবে সেই ব্যাপারে।”

মিন হুয়ে হাসলো।

শিন ছি তাকালো মিন হুয়ের চোখের ভেতরে, যেনো মগজের সব খাঁজভাঁজে থাকা চিন্তাগুলো পড়ে নেবে, “আমারই ভুল। আমার উচিৎ হয় নি তোকে একই পুরোনো চোখে দেখা। য়ে লাওশি বলে ছিলেন যে তুই বাড়ি ফিরে গেছিস। তোর দেশে, দূর্গম পাহাড়ে। জীবনযাপণ বেশ কঠিন। তাই আমি ভেবে ছিলাম যে তুই দেশে ফিরে যাবার পরে তোর হয়তো আর পড়াশোনার সুযোগই হয় নি। অথবা আরো খারাপ কিছু, তোকে হয়তো পেটের তাগিদে অল্পবয়সেই রোজগার শুরু করতে হয়েছে, এমনকি হয়তো তোকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়েছে …. এই যে কদিন তুই আসিস নি, আমি মরিয়া হয়ে তোর অপেক্ষা করেছি। অনেক সময় তো এও মনে হয়েছে যে তোর হয়তো বাচ্চাকাচ্চা হয়ে গেছে, তুই আর এখানে আসবি না ……”


অনেক বছর বিদেশে থাকার কারণে শিন ছির ম্যান্ডারিন খুব চলতি ম্যান্ডারিন নয়। আর সব সময়ে ওর উচ্চারণে বিদেশবাসের একটা আভাস রয়ে যাচ্ছে। কয়েকটা শব্দ উচ্চারণের সময়ে ও বেশ ইতস্তত করছে, যেনো ও নিশ্চিত নয় যে জিভটা ভাঁজ করার দরকার আছে কিনা, যেনো ওর মুখের মধ্যে কুঁচো পাথর আছে। কিন্তু ওর গলার স্বরটা ভীষণ আরামদায়ক, নিচু, নরম, অক্লেশে উঁচু আর নিচুতে খেলা করে। ও খুব বাকপটুও বটে। ভঙ্গিটা খানিক ছেলেভুলোনো, বিশেষত, জেদী গোঁয়ার, কাঁদুনে বাচ্চাকে ভোলানোর মতো। 

মিন হুয়ে ধামা চাপা দেবার চেষ্টা করে, “ঠিক আছে। পাহাড়ের অবস্থা তুই যতোটা খারাপ ভাবছিস, ততোটা খারাপও নয় ……”

শিন ছি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, “আমি ভেবে ছিলাম যে আমি একাই ভীষণ বদলে গেছি। যা হোক আমি বিদেশে গিয়ে ছিলাম। আমি আশা করি নি যে তুই আমার থেকেও বেশি বদলে যাবি। তিয়াঁ তিয়াঁ, আমরা আর আগের মতো সেই তুই, সেই আমি নেই। আমাদের পরস্পরকে আরো বেশি ভালো করে জানা প্রয়োজন, যাতে আমরা বেশি ভালো করে একসাথে থাকতে পারি। আমি তো খুব আচমকা আচরণ করেছি আজ। তুই কী ভয় পেয়েছিস?”

তারপর কথা আরো এগোয় “কী করে ……”

যতো শিন ছি আত্মবীক্ষণে ডুব দেয়, নিজের মানসিকতার, আচরণের চুলচেরা বিচার করে চলে, ততো দুঃখ পেতে থাকে মিন হুয়ে। মিন হুয়ে সত্যি সু তিয়াঁ হবার ভান করতে চেয়ে ছিলো। কিন্তু ভান করার চেষ্টাটাই পুরো চেষ্টাটাকে মাটি করে দিচ্ছে। মিন হুয়ে থেকে থেকেই স্বমূর্তি ধরে ফেলছে। ওকে যা করতে হবে সেটা হলো যে সু তিয়াঁ সম্পর্কে শিন ছির বয়ে চলা ধারণাগুলোকে পুরো বদলে ফেলতে হবে। তাকে অন্য অনেক পরিবর্তনের সম্ভাবনা গ্রহণ করাতে হবে। আর তারপর “সু তিয়াঁ”-র মিন হুয়ে সংস্করণটা শিন ছির সামনে মেলে ধরতে হবে।

ডায়েরিটাকে ভিত করে, একটু গল্প মিশিয়ে, খুব মুসকিল হবে না শিন ছিকে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিরাপদে ইউনাইটেড স্টেটসে ফেরত পাঠানো। অপরেসনের পর পুরো সুস্থ হয়ে উঠে শিন ছি যতো খুশি রাগতে পারে, গালাগালি করতে পারে। যা হোক একটা জীবন অন্তত বাঁচানো যাবে।

এসব ভাবতে ভাবতেই মিন হুয়ে দাবার বোর্ডের দিকে নজর ফেরাল, “এই বারে তুই শুরু কর চাল দিয়ে।”

শিন ছি একটা ঘুটি মুঠিতে নিলো আর সেটা মাঝবরাবর সেঁটে খেলা শুরু করে দিলো, “আমার প্রথম চাল।”

মিন হুয়ে চাললো, “ঘোড়া।”

শিন ছি চাল দিলো, “বড়ে।”

মিন হুয়ের পরের চাল, “রথ।”

মিন হুয়ে সৈন্যদল নিয়ে পালাতে লাগলো। শিন ছি সেই গতির সুযোগে একটা দান জিতে নিলো।

মিন হুয়ে প্রশংসা করলো, “সাত চালে রক্তারক্তি হবে দেখছি। দূর্দান্ত।”

শিন ছি হালকা হেসে বললো, “তুইও তো সাতটা চালে পুরো সেনার পাশ কাটিয়ে গেলি। তুইও ভালো খেলছিস। খুব চট করে দেখা যায় না যে কেউ নিজের জীবন বিপন্ন করে সেনাকে রক্ষা করছে।”

মিন হুয়ে উত্তর দিলো, “এটাই আমার ছক।”

শিন ছি প্রশংসা করলো, “সাহসী, চতুর।”

বেশ খানিক ভয়ানক খেলা হবার পরে, কান ঘেঁষে শিন ছি জিতলো। হাতের মুঠিতে একটা ঘুটি নিয়ে খানিক লোফালুফি করে, খানিক ভাবলো, তারপর হঠাৎ করে ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করলো, “তিয়াঁ তিয়াঁ, তুই আমাকে ইচ্ছে করে জিতিয়ে দিস নি তো, কি রে?”

মিন হুয়ে জোর দিয়ে বললো, “মোটেই না।”

শিন ছি তর্ক করলো, “আগের ঘোড়াটা, তোর মতো যারা খেলে তাদের ক্ষেত্রে, মারা পড়ার কথা নয়।”

মিন হুয়ে আশ্বস্ত করলো, “...... একটা কৌশলের ভুল।”

শিন ছি অবিশ্বাসের চোখে তাকালো, কিন্তু কিছু বললো না এ ব্যাপারে। শুধু জিজ্ঞেস করলো, “আর এক বোর্ড?”

মিন হুয়ে ঝটপট মাথা নেড়ে আপত্তি করলো, “না। আমার খিদে পেয়েছে। আমি তাড়াতাড়ি ঘুমোতে যেতে চাই।”

শিন ছি চমকে উঠলো এক মুহুর্তের জন্য। হাতঘড়ি দেখলো, টেবিল থেকে মিন হুয়েকে মেনুকার্ডটা দিয়ে বললো, “তুই ঠিক কর কি খাবি। আমি রুম সার্ভিসে ফোন করছি।”

মিন হুয়ে একবাটি সি-ফুড পরিজ চাইলো শুধু। শিন ছি অর্ডার দিলো স্টিক, স্যালাড, আর রেড ওয়াইন। ওয়েটার যখন দিয়ে গেলো তখন বললো যে স্টিকটা প্লেটে পাঁচ মিনিট ঢাকা দেওয়া আছে আর এক্ষুণি খাওয়া যাবে। কথা বলা শেষ করে শিন ছির থেকে টিপ নিয়ে, ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেলো।

দুজনে তখনই খেতে বসে পড়লো।

মিন হুয়ে পরিজে চুমুক দিতে দিতে দেখলো যে শিন ছি ধীরে ধীরে বিফ কাটছে। মিন হুয়ের সামনে বসে আছে ছেলেটা খাড়া, সুচারু ভঙ্গিমাতে খাচ্ছে, তার মুখের পাশের দিকটা দেখাচ্ছে রাজহাঁসের মতো মাধুর্য মাখা। আবার ছেলেটাকে দেখে মনে হচ্ছে যে সে একইসাথে ভীষণ আরামে আছে আবার খুব প্রভাবও ছড়াচ্ছে ঘরের আবহে যেনো। মিন হুয়ের একটা ধাঁধার মতো লাগছিলো যে একইসাথে দুটো আবহ কী করে শিন ছি ধরে রাখছে।

না বেশি না কম আঁচে ঝলসানো স্টিকটা থেকে ছিটকে ছিটকে গোলাপী রক্ত ঠিকরে বেরোচ্ছে। শিন ছির বেশ ভালো খিদে পেয়ে ছিলো। খুব উৎসাহ নিয়ে খাচ্ছিলও। তাকিয়ে দেখতে দেখতে মিন হুয়ের মাথা ঝিম ঝিম করে উঠলো। তাড়াহুড়ো করে মাথা নামিয়ে নিলো। 

শিন ছি তখনই নজর করলো, ঝটপট রক্তটা দুটো পাতা দিয়ে ঢেকে দিলো। প্রশ্ন করলো, “তোর কি মাথা ঝিম ঝিম করছে?”

মিন হুয়ে বললো, “না রে। তেমন কিছু না।”

শিন ছি প্রসঙ্গ বদলালো, “স্টিকটা বেশ নরম, চেখে দেখবি নাকি?”

ঠোঁট কামড়ে মাথা নাড়লো মিন হুয়ে। 

হাতের ছুরিটা নামিয়ে রেখে শিন ছি উদ্বেগে প্রশ্ন করলো, “ব্যাপারটা কী? তুই কি ঘামছিস? হাত পা কাঁপছে?”

নিস্পৃহ হেসে মিন হুয়ে আশ্বস্ত করলো, “ঠিক আছে।”

তারপর কাঁপতে থাকা বাঁ হাতের তালুটা গুঁজে দিলো হাঁটুর নিচে। 

মিন হুয়ে কিছু বলতে চায় না দেখে শিন ছি আর কথা বাড়ালো না। দু কামড়ে স্টিকটা শেষ করে, স্যালাডটাও সাফ করে দিলো। তারপর ওর চোখ পড়লো মিন হুয়ের সামনে পড়ে থাকা আধ বাটি পরিজে, “তুই কি আর খাবি? দেখে বেশ ভালোই মনে হচ্ছে।”

মিন হুয়ে মাথা নেড়ে না বললো। শিন ছি বাকি পরিজটা চুমুক দিয়ে শেষ করে দিলো।

ওর যে খুব খিদে পেয়ে ছিলো বোঝা যাচ্ছে। সারাদিন অপেক্ষা করেছে হয়তো সু তিয়াঁর জন্য, কিচ্ছুটি খায় নি।

মুখ মুছে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে মিন হুয়ে জানালো, “আমি ঘুমোতে গেলাম।”

শিন ছি সাড়া দিলো, “ঠিক আছে।”

আঙুল তুলে করিডরের প্রান্তটা দেখিয়ে বললো, “ঐ ঘরটা থেকে উপত্যকার পুরোটা দেখা যায়। বেশ ভালো দেখায় সব কিছু।”

মিন হুয়ে কয়েক পা এগোলো, শিন ছি পিছু ডাকল, “তিয়াঁ তিয়াঁ।”

মিন হুয়ে সাড়া না দিয়ে পারলো না, “হুঁ।”

মিন হুয়ে কাছে এগিয়ে এসে শিন ছি আশ্বস্ত করলো, “আমার সাথে তুই নিরাপদ। আমার জন্য তুই অনেক বদলে গেছিস। কিন্তু তোকে জানিয়ে রাখি, তুই খুশি থাকলেই হলো, সে তুই যতই বদলে যাস না কেনো আমি তার পরোয়া করি না। আমি ঠিক মানিয়ে নেবো। তাতে আমাকে যদি পুরো উল্টে যেতে হয় আমার তাতেও কোনো দ্বিধা নেই। কিন্ত একটা জিনিস কখনো যেনো না বদলায় -”

মিন হুয়ে চুপ করে তাকিয়ে রইলো শিন ছির দিকে।

শিন ছি কথাটা শেষ করলো, “তা হলো - আমাদের একসাথে থাকতে হবে।”

তারপর প্রশ্ন করলো, “তুই একমত?”

মিন হুয়ে এক কথায় সারলো, “একমত।”

শিন ছি হেসে বললো, “ওয়া আ’ন।”

মিন হুয়ে সাড়া দিলো, “শুভ রাত্রি।”

সন্ধে আটটা বাজে। আকাশ রোদে ঝলমল করছে। আরো কিছুক্ষণ লিভিং রুমে বসার সাহস করতে পারলো না মিন হুয়ে।

ঘুমোনোও কঠিন। শিন ছি, তার সমস্ত আন্তরিক আচরণ সত্ত্বেও, খুব সজহ মানুষ নয়। অন্তত য্তোটা সহজ বলে তাকে মনে হয়, ততোটা সহজ নয়। সু তিয়াঁর মতো অসাবধানী নয়। সু তিয়াঁর মতো ঘোরপ্যাঁচহীন সাদামাঠা নয়। শিন ছির আন্তরিকতা বুদ্ধিদীপ্ত। তাকে চট করে বোকা বানানো যায় না। যতোটা সম্ভব শিন ছির সাথে একলা কাটানোর ব্যাপারটা এড়িয়ে যাওয়াই ভালো।

অনেকক্ষণ শুয়ে থাকার পরে, অনেক কসরত করে, মিন হুয়ের একটা তীব্র তাগিদ জেগে উঠলো শিন ছির কাছে সত্যিটা উগরে দেবার। যতো আগে বলা যায়, ততো সম্ভাবনা বাড়ে ক্ষমা পাবার। এখন তো শিন ছি বুঝতে পারছে যে তার সামনে যে মেয়েটা আছে সে তার স্মৃতিতে জেগে থাকা সু তিয়াঁ নয়। হয়তো তাই সু তিয়াঁর জন্য তার অনুভূতিগুলো ততো তীব্র আর হবে না। এই পরিস্থিতিতে সু তিয়াঁর মৃত্যুর খবরটা শিন ছিকে জানানো হয়তো খুব মারাত্মক হবে না।

মিন হুয়ে ওর সোনি কম্পিউটারটা চালু করলো। আজকাল সে একটা ছোটো স্ক্যানার দিয়ে সু তিয়াঁর ডায়েরির পুরোটা স্ক্যান করে রাখছে। একটা টেক্সট রেকগনিশন সফটওয়্যার ব্যবহার করে ডায়েরির সমস্ত লেখাজোখা একটা সম্পাদনা করা যায় এমন ডকুমেন্টে পরিণত করে ক্লাউডে জমা রাখছে। স্ক্যানিং আর প্রুফ রিডিং করে, বার তিনেক পুরো ডায়েরিটা পরে মিন হুয়ে ডায়েরির বিষয়বস্তুতে বেশ সড়গড় হয়ে উঠেছে।

খানিক টেক্সট অ্যানালিসিস -এর পরে মিন হুয়ে দেখলো যে সু তিয়াঁর প্রচুর উদ্বেগ ছিলো শিন ছির আবেগপ্রবণতা নিয়ে। ডায়েরি ভর্তি শিন ছির বদ মেজাজের বিশদ বিবরণ - “রেগে যাওয়া" “রাগত" “গালি দেওয়া" “খেপে যাওয়া" “ঝগড়া” ……

সু তিয়াঁ সব থেকে বেশি উদ্বিগ্ন সেদিন এই ভেবে যে সে দিনটাতে শিন ছি খুশি কিনা -

– “আজকে মাদার্স ডে। আর শিন ছি মোটেই খুশি নয়। ও বলেছে যে ও ঘেন্না করে ওর মাকে। ওর কিচ্ছু আসে যায় না যে ওর মা ওকে চায় না। যদি কিচ্ছু না হয়, তাহলে ও কল্পনা করতে পারে যে ওকে ছেলেধরায় চুরি করে নিয়ে গিয়ে ছিলো। তাতে যদি ও সারা জীবনে কখনো ওর মা-বাবাকে দেখতে না পেতো, তাহলে জানতো যে অন্তত এই পৃথিবীতে দুজন ওকে ভালোবাসে। আমি জিজ্ঞেস করে ছিলাম যে আমার ভালোবাসা কী ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে। উত্তরে ও বলেছে যে আমার ভালোবাসা মায়ের ভালোবাসা নয়।

– “আজ লাওশি আমাদের সকলকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ছিলেন, শিন ছির সাথে দেখা করাতে। শিন ছির মুখটা কাগজের মতো সাদা হয়ে ছিলো। আমি ওকে জিজ্ঞেস করে ছিলাম যে ব্যথা করছে কিনা। তাতে ও উত্তর দিয়ে ছিলো যে ব্যাথা এড়ানো যাবে না। হ্যাঁ, ব্যাথা আছে। তবে ও ব্যাথায় কষ্ট পাবে কিনা সেটা ও ঠিক করে নেবে। শিন ছি সব সময়ে এরকম করেই কথা বলে। আমি ভয় পাচ্ছিলাম যে ও অনেক কিছু চিন্তা করবে, ভাববে, তাই ঘাড় না নেড়ে আমার কোনো উপায় ছিলো না। আসলে কিন্তু ও যে কী বলেছে তার কিচ্ছু আমি বুঝতে পারি নি। বাকি সব ছাত্ররা কানাকানি করছিলো যে শিন ছি মরে যাচ্ছে। আমি খেয়াল করেছি যে আমার সঙ্গে কথা বলার সময় যন্ত্রণায় ওর ভ্রু কুঁচকে যাচ্ছে। আমার এতো কষ্ট হচ্ছিলো যে আমার কান্না আসছিলো।

আমি শিন ছির কাছে জানতে চেয়ে ছিলাম যে ও মরতে ভয় পায় কিনা। ও বলে ছিলো না। ও নাকি অনেকবার নরকের সদর দরজায় যাতায়াত করেছে। আমি জিজ্ঞেস করে ছিলাম ওকে যে ঠিক কেমন লাগে ‘মরতে’। ও বলে ছিলো বেশ নিশ্চিন্ত আর আরামদায়ক লাগে। যদি তাই হয়, তবে মরতে আমার ভয় নেই। আমি বলে ছিলাম ওকে, ‘শিন ছি তোর যদি একলা লাগে, আমাকে ডাকিস, আমি তোর সাথে মরবো।’ শিন ছি আমাকে খুব ধমক লাগিয়ে ছিলো আর বলে ছিলো আমি নির্বোধ।

– “কাল শিন ছি দাবা খেলায় জিতেছে। এমনকি ডিনও ওর বুদ্ধির প্রশংসা করেছেন। ও প্রাইজের টাকায় আমাকে দশটা ভালুক পুতুল কিনে দিয়েছে। বলেছে যে আমার দশ বছর বয়স আর একটা আমার মা-বাবার দেওয়া উপহার। ক্লাস থ্রির লিয়াঁলিয়াঁ শুনে ওকে বলে ছিলো যে ওরও একটা পুতুল চাই। কিন্তু শিন ছি ওকে কিনে দেবে না বলেছে। লিয়াঁলিয়াঁ আমার কাছে এসে বায়না করছিলো, তাই আমি ওকে একটা পুতুল দিয়ে ছিলাম। শিন ছি যখন জানতে পারলো ব্যাপারটা তখন ও দৌড়ে গিয়ে লিয়াঁলিয়াঁর থেকে পুতুলটা কেড়ে নিয়ে এলো। 

এই নিয়ে সে রাতে আমাদের খুব ঝগড়া হয়ে ছিলো। আমি বলে ছিলাম, ‘শিন ছি, লিয়াঁলিয়াঁ খুব গরীব। ওকে একটা দিই না।’ শিন ছি বলে ছিলো, ‘না। এর আগে তুই যখন ওর থেকে একটা ইরেজার চেয়ে ছিলি, তখন ও তো তোকে দেয় নি। তাহলে ও এখন কেনো পুতুলটা তোর থেকে চাইছে?’ আমি বলে ছিলাম, ‘তবুও তোকে এতো হিংসুটে হতে হবে না। তুই কী ভালো করে কথা বলেছিস?’ শিন ছি বলে ছিলো, ‘আমি ওকে বলেছি যে কেবল তুই আমার প্রিয়জন।’ একথা শুনে আমি প্রায় কেঁদে ফেলে ছিলাম। লিয়াঁলিয়াঁ গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর করতে ওস্তাদ। ভগবান জানে এখন আমার পিঠপিছে ও আমার নামে কি যে বলে বেড়াবে।

নিশ্চিত জানি আজ লিয়াঁলিয়াঁ আমাকে ভালো চোখে দেখে নি। আমার কাছে এসে বললো, ‘জানিস শিন ছি মরে যাবে। তাই পুতুল দশটা তুই হারাস না। এই দশটা পুতুলই শুধু ও তোকে দিয়ে যাবে।’ এসব কথা শিন ছিকে বললে শিন ছি আবার কি না কি ভাববে। ভুলে যাওয়াই ভালো। কী হবে ওকে অখুশি করে। কাল অমন ভালো দিনেও ও সারাদিন হাসে নি। সত্যি বলতে কী আমিও ওর মাকে ঘেন্না করি। ওর মায়ের কী অনুতাপই না হবে যদি জানতে পারে যে এমন একটা বুদ্ধিমান ছেলেকে ওর মা ফেলে দিয়ে গিয়েছে।

মিন হুয়ে একত্র করে রাখা লেখাগুলো আবার পড়তে লাগলো। কল্পনা করার চেষ্টা করতে লাগলো যে এই মূহুর্তে শিন ছি এখনো জীবিত আছে দেখে সু তিয়াঁর মনের অবস্থা ঠিক কেমন হতে পারতো। সে নিশ্চয়ই খুব খুশি হতো, তাই না? সু তিয়াঁ এতো খেয়াল রাখতো শিন ছির, তাহলে মিন হুয়ে সত্যিটা বলে শিন ছিকে দুঃখ দেবে কেনো?

যদি ও অপেরেসনের পর আর নাই বাঁচে, তাহলে অন্তত শেষের কটা দিন ও খুশিতে সন্তুষ্টিতে কাটাতে পারবে। মরার আগেই শোকে দুঃখে অবশ হয়ে পড়বে না। যদি অপরেসনটা ঠিকও হয়, তাহলেও একটা ভালো মেজাজ শরীরকে সুস্থ করার জন্য ভালোই হবে, তাই না?

মিন হুয়ের মনে পড়ে গেলো যে ওর ঠাকুমার অগ্ন্যাশয়ে ক্যান্সার হয়ে ছিলো। কিন্তু বাড়ির কেউ ভয়ে ঠাকুমাকে কথাটা জানায় নি। প্রথমে ঠাকুমাও কিছু নজর করে নি। যদিও কিছু কিছু লক্ষণ দেখা দিচ্ছিলো, তাও ঠাকুমা বেশ হাসিখুশিই ছিলো। একদিন কী ভাবে কোথা থেকে যেনো ঠাকুমা জেনে গিয়ে ছিলো। পরের সপ্তাহেই ঠাকুমাকে এমার্জেন্সি ওয়ার্ডে দিতে হয়ে ছিলো। ভয়ে ঠাকুমার ওজন অর্ধেক হয়ে গিয়ে ছিলো। তিন মাসের মধ্যে মারা গিয়ে ছিলো। মিন হুয়ের বাবা তখনও বেঁচে ছিলেন। তিনি খুব অনুতাপও করতেন ব্যাপারটা নিয়ে। পরে যখন মিন হুয়ের ঠাকুর্দা কঠিন অসুখে পড়লেন, তখন কেউ তাকে সত্যিটা বলার সাহস করে নি। যদিও ঠাকুর্দাও তিন মাসের মধ্যেই মারা গিয়ে ছিলেন, তবুও সবাই তাঁকে শেষ পর্যন্ত ভুলিয়ে ভালিয়ে হাসিখুশিই রেখে ছিলো। শেষ নিঃশ্বাস ফেলা পর্যন্ত তিনি জানতেন না তাঁর কি অসুখ করে ছিলো। তিনি একটা ঘোরের মধ্যে চলে গিয়ে ছিলেন যেনো।

এসব কথা ভেবে মিন হুয়ে খুশিই হলো যে শিন ছিকে সত্যি কথা বলার যে তাড়নাটা ওকে পেয়ে বসে ছিলো সেটা ও সময় মতো আটকাতে পেরেছে। মনে মনে মিন হুয়ে ঠিক করে নিলো যে অপেরসনের আগে অবধি শিন ছি যতোটা সম্ভব আনন্দেই কাটাক।

আর সু তিয়াঁর মৃত্যুর কথাটা যতো দিন সম্ভব গোপণ রাখা যায়, তাই থাক।

পরের দিন সকালে মিন হুয়ে ভোর ভোর, ছটার সময়ে জেগে গেলো। ওর ভোর ভোর ওঠার অভ্যেস। পরিষ্কার হয়ে লিভিংরুমে গেলো সকালের খাবার খাবে বলে। 

পিছনের বারান্দায় যাবার দরজাটা সামান্য খোলা ছিলো। জলের শব্দ আসছে। সদ্য বানানো কফি হাতে মিন হুয়ে বাইরে গেলো। 

স্যুইমিং পুলে শিন ছি সাঁতার কাটছে। 

সকালের আলো তখনও বেশ মৃদু। পুরো উপত্যকা ঢেকে আছে সাদা কুয়াশায়। গাছে মহানন্দে পাখিরা গান গাইছে।

মিন হুয়ে খালি পায়ে পুলের ধার পর্যন্ত গেলো। ইচ্ছে ছিলো ‘সুপ্রভাত’ জানানো। কিন্তু কিছুতেই ও জলের মধ্যে সাঁতরাতে থাকা শিন ছির থেকে চোখ ফেরাতে পারছিলো না। শিন ছির শরীরটা মোটেই অসুস্থ মানুষের মতো নয়। চেহারাটা বেশ লাগসই, চওড়া কাঁধ, সরু কোমর, সুঠাম বুকের পেশী, কঠিন উরু, সরু গোড়ালি। কুড়ি মিটারেরো কম লম্বা একটা পুলে এপাড় ওপাড় সাঁতরাচ্ছে শিন ছি - ব্রেস্টস্ট্রোক, ব্যাকস্ট্রোক, বাটারফ্লাই - মুক্ত আর খুশি।

যখন দুজনের চোখ একে অপরের চোখে পড়লো, মিন হুয়ে শুধু একটা ‘হাই’ বললো।

শিন ছি তখনই সাঁতার দিয়ে পুলের ধারে চলে এলো। জল থেকে উঠে পড়লো। একটা তোয়ালে নিলো মিন হুয়ের সামনে দাঁড়িয়ে গা মুছতে লাগলো খুব স্বাভাবিকভাবে। ওর পেশিগুলো সুঠাম, নিশ্চিত রেখায় আর সাবলীল বাঁকে, তলপেট আঁটোসাঁটো, অক্লেশে ওঠানামা করছে। কোথাও কোনো ঠেলে ওঠা নীল শিরা দেখা যাচ্ছে না বডিবিল্ডারদের মতো।

আর শিন ছির পুরো শরীর থেকে একটা বর্ণনাতীত, ব্যাখ্যাতীত শান্তি, সংযম আর আত্মাভিমান বিকিরিত হচ্ছে, যেনো ও জানে যে ওর চারপাশের মানুষদের তুলনায় ও বেশি ভালো, যাতে কেউ ওর সাথে টক্করে না যায় ………

হালকা চালে শিন ছি প্রশ্ন করলো, “তোর পছন্দ?”

কোনটা পছন্দ? পাহাড়? জল? স্যুইমিং পুল? নাকি ওর আকর্ষণীয় শরীর?

হঠাৎ করে মিন হুয়ের মুখ লাল হয়ে উঠলো। তাড়াহুড়ো করে চোখ নামিয়ে নিলো মাটিতে। মুখের ভেতরটা শুকনো। গলার থেকে যেনো ধোঁয়া বেরোচ্ছে। ও একটা তোয়ালে নিয়ে শিন ছির পিঠের দিকে দেখালো, “এখানে এখনো ফোঁটা ফোঁটা জল আছে …… তুই মুছিস নি।”

শিন ছি ঘুরে দাঁড়ালো। মিন হুয়ে দেখলো শিন ছির ভিজে মাথার চুল থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে শিরদাঁড়ার সিধে খাঁজ বেয়ে কোমরে। আস্তে আস্তে মিন হুয়ে শুষে নিলো সব জল তোয়ালেতে। 

শিন ছি বললো, “ঠিক আছে।”

তারপর ঘুরে দাঁড়ালো আর দুম করে চেঁচিয়ে উঠলো, “নড়িস না।”

মিন হুয়ের নাকে এক হাত দিয়ে চিমটি কাটল, আরেক হাতে ওর থুতনিটাকে ধরে রেখে, বললো, “তিয়াঁ তিয়াঁ, তোর যে নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে।”


~~~~~~~~~~~~

সম্পূর্ণ বই বিনামূল্যে : https://dl.bookfunnel.com/lcj5vznt96

Link to Previous Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/08/jpda-chapter-07.html

Link to following Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/08/jpda-chapter-09.html


Tuesday, August 13, 2024

JPDA - Chapter 07

 ৭. ভিলা হোটেল



সেই মূহুর্তে মিন হুয়ের মনে হচ্ছিলো যে ও কিছুতেই শিন ছিকে বিয়ে করতে পারে না। ও মাত্র কয়েকদিনের জন্য সু তিয়াঁর ভান করে আছে। ও কিছুতেই শিন ছিকে বিয়ে করতে পারবে না। নিশ্চয়ই সু তিয়াঁর ঋণ মেটাতে যদি শিন ছিকে বিয়ে করতে হয় তাতে ভুল বা দোষ কিছু নেই। সু তিয়াঁ তার জীবন দিয়ে মিন হুয়ের প্রাণ বাঁচিয়েছে বলে কথা, সু তিয়াঁর শেষ ইচ্ছেটা পূরণ করলে, হয়তো তার করুণার প্রতি খানিক সম্মান করা যাবে।

কিন্তু সমস্যা হলো এই যে বিয়ের ভিত্তিতে থাকে সত্যিকারের প্রেম। আর মিন হুয়ের হাতের সবকটা তাসের পাতা নকল। তার ভয় একটাই, নকল দেখনদারিটা একদিন সত্যি হয়ে যাবে। তার থেকেও বেশি ভয়ের ব্যাপার হলো যে সত্যিটা প্রকাশ হলে শিন ছি কিছুতেই মিন হুয়ের সমবেদনা মেনে নিতে পারবে না, কোনো দিন ক্ষমা করতে পারবে না মিন হুয়ের মরিয়া চেষ্টাটা যে মিন হুয়ে সু তিয়াঁর কাছে জীবনের ঋণ মেটাবার ইচ্ছেতেই সব কিছু করেছে।

আরেকটা সম্ভাবনাও আছে। যদিও এই মূহুর্তে নিতান্ত ক্ষীণ, কিন্তু তবু আছে : কি হবে যদি সু তিয়াঁ এখনো বেঁচে থাকে? শিন ছির কাছে ফিরে আসে? এসে যদি দেখে যে যার জন্য সে নিজের জীবনের পরোয়া করে নি, সেই মানুষটাই তার ছেলেবেলার প্রেমিকের সঙ্গ ভোগ করছে, তাহলে মিন হুয়ে কী আজন্মের মতো পাপী হয়ে যাবে না?

“বিয়েটা এক্ষুণি করে কাজ নেই।”

তার মতটাকে জোরালো করার জন্য শেষে একটা “ঠিক আছে?” বলে প্রশ্ন মিন হুয়ে রাখলো না।

জানতে চাইলো না, “চলবে?” কিংবা, “তোর কি মত?”

শিন ছির মুখ অন্ধকার করে হতাশা এলো দেখে, ঢোঁক গিলে মিন হুয়ে যোগ করলো, “আগে সার্জারিটা হয়ে যাক। যতো শিগগির সম্ভব তুই নিউইয়র্কে ফিরে যা। আমি আমার ভাইকে খুঁজে বার করি ততো দিনে।”

মিন হুয়ে চাই ছিলো যে শিন ছি কালই ফিরে যাক। তাহলে তাকে আর এই অভিনয় করে যেতে হবে না। ধরা পড়ার ভয় ওকে গিলে খাচ্ছে।

এই ব্যাপারে ভাবলেই মিন হুয়ে বুঝতে পারছে যে সে নানান অজুহাত খুঁজে বার করছে যাতে তাকে শিন ছির সঙ্গে থাকতে না হয়। যতো নির্বোধই হোক না কেনো ও নিজে, মিন হুয়ে নিজের ভাবনাটা খুব টের পাচ্ছিলো। 

শিন ছি খালি চাউনিতে মিন হুয়ের দিকে চেয়ে রইলো অনেকক্ষণ, একটাও কথা না বলে। অনেকটা সময় যাবত ওর মুখটা লাল হয়ে ছিলো। তারপর মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। মুখের রং লাল থেকে ফ্যাকাসে হবার সময়টুকুর মধ্যে শিন ছি ঘাড় নেড়ে বললো, “তুই বিয়েটা পরে করতে চাইলে ঠিক আছে। কিন্তু আমি তোর ভাইয়ের খোঁজে তোর সঙ্গে যাবো।”

মিন হুয়ে তর্ক জুড়ল, "কেনো?”

শিন ছি নিজের আশঙ্কা প্রকাশ করলো, “পথে তুই পাচার হয়ে যাবি।”

মিন হুয়ে তর্কটা চালিয়ে যেতে লাগলো, “সেটা কী করে সম্ভব?”

শিন ছির যুক্তি, “তুই আগেও চুরি হয়ে গিয়ে ছিলি।”

মিন হুয়ে তৈরি ছিলো জবাব নিয়ে, “সে তো শিশু বয়সে।”

শিন ছি তর্কে ইতি টেনে দিলো, “সে যা হোক, না, তোকে আর ভাবতে হবে না। আমি তোর সঙ্গে একসঙ্গে থাকতে চাই। ভাইকে খুঁজবো একসাথে, নিউইয়র্কে ফিরবো একসাথে, সব মিটে গেলে। আমি তোর অপেক্ষা করেছি এতো বছর, এখন কিছুতে আমি তোর থেকে আলাদা হবো না আবার।”

মিন হুয়ের সব কথা, এতোক্ষণের সব চেষ্টা মাটি হয়ে গেলো।

শিন ছির কথা আর থামে না, “তিয়াঁ, তিয়াঁ, বললে হবে, আমরা তেরো বছর একে অপরকে দেখি নি। প্রত্যেকে বদলে গেছি অনেক। আমি খুব শিগগির তোর সাথে মানিয়ে নিতে পারব। কিন্তু মনে হচ্ছে যে আমার সাথে মানিয়ে নিতে তোর অনেক সময় লাগবে। সে তুই নে না সময়, চিন্তার কিচ্ছু নেই।”

শিন ছি হাসলো। তারপর একটু নড়ে চড়ে বসলো। নিজের হাতের মধ্যে মিন হুয়ের দু হাত নিয়ে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললো, “দ্যুবুছি। আমি বড্ডো অধৈর্য হয়ে পড়েছি আর কেবল নিজের অনুভূতির কথাই ভেবেছি।”

মিন হুয়ে শূণ্য দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো শিন ছির দিকে। কি যে করবে সেটা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারলো না।

শিন ছি তারপর জানতে চাইলো, “এখানে উঠেছিস কোথায়? কাছাকাছি না দূরে?”

মিন হুয়ে স্বাভাবিক সত্যি বললো, “কাছাকাছি। একটা হোমস্টে। পাঁচ মিনিটের হাঁটা রাস্তা।”

য়েহুয়া লেক শুধু একটা দেখার জায়গা তো নয়, গ্রীষ্মকালে বেড়ানোর জায়গাগুলোর অন্যতম। কয়েকটা হোটেল আর ভিলা আছে এখানে। কাছাকাছি গ্রামের মানুষজন হোমস্টে চালিয়েও বেশ রোজগার করেন। কম খরচে, দিনে তিনটে খাবার সমেত, পরিষ্কার পরিচ্ছন থাকার দিব্যি বন্দোবস্ত।

শিন ছির পরামর্শ, “তুই যদি ঠিক মনে করিস তো তুই আমার হোটেলে চলে আয় আগে। হোটেল রেলস্টেশন অবধি একটা গাড়ি দেয়। কাল হোটেল থেকে একসাথে সুইহুয়া রওয়ানা দিতে পারি আমরা, তোর ভাইয়ের খোঁজে।”

মিন হুয়ে তেড়ে ফুঁড়ে বললো, “এতো ঝামেলায় যেতে হবে না। আমি তো হোমস্টেকে পুরো ভাড়া দিয়ে রেখেছি। আমি খুব সহজে ট্যাক্সিতে রেল স্টেশনে পৌঁছে যাবো। চল, রেল স্টেশনে দেখা করি।”

শিন ছি থমকে গেলো প্রথমে। চুপ করে মিন হুয়েকে দেখতে লাগলো। দুচোখ ভর্তি দুঃখ। খানিক পরে মৌনি ভেঙে জানতে চাইলো, “তিয়াঁ, তিয়াঁ, আমি কি কিছু ভুল করেছি?”

এই মূহুর্তে মিন হুয়ে ডুবে গেলো অনুতাপে। নিজের ওপর ওর ভীষণ ঘেন্না হতে লাগলো ওর নিজের কৌতুহলের বাড়াবাড়িতে। শিন ছিকে দেখতে ওর এতো দূর আসাটা উচিৎ হয় নি মোটেই। সু তিয়াঁর অপেক্ষা করতে করতে, একসময় শিন ছিকে হাল ছেড়ে ফিরে যেতে হতো নিউইয়র্কে, হার্টের সার্জারি করানোর জন্য। একাই ফিরে যেতে হতো ওকে, নিজের জীবনে। তাতে অন্তত ওর মনের মধ্যে সু তিয়াঁ বরাবর বেঁচে থাকতো। মনের মধ্যে একটা দারুণ সুন্দর স্মৃতি থেকে যেতো। তাই নিয়ে শিন ছি মিশে যেতে পারতো মানুষের সমুদ্রের মধ্যে।

শিন ছির অভিব্যক্তিতে বুক ভেঙে যায়। মিন হুয়ে আর সহ্য করতে না পেরে বললো, “ঠিক আছে, চল তোর হোটেলেই যাবো না হয়।”

শিশুর মতো আনন্দে উচ্ছাস জানালো শিন ছি, “ইয়েহ……”

মিন হুয়ের সঙ্গে শিন ছি হোমস্টেতে গেলো মিন হুয়ের জিনিসপত্র নিতে। বিশেষ কিছুই ছিলো না। একটা মাত্র ট্রলি ব্যাগ। তারপরে দুজনে আবার হাঁটা দিলো ইয়ং’আন সাঁকো পেরিয়ে য়েহুয়া লেক গার্ডেন ভিলা হোটেলের দিকে, যেখানে শিন ছি আছে।

সারা পথটুকু শিন ছি খুব সজাগ, সাবধান হয়ে কথা বলতে লাগলো মিন হুয়ের সাথে। খুব বেশি কথা বলতে যেনো সাহসও করছিলো না, পাছে মিন হুয়ে অসন্তুষ্ট হয়। মিন হুয়ের মনের মধ্যে একটা দুঃখ গুমরে উঠছিলো। কিন্তু মিন হুয়েরও মনে হচ্ছিলো যে শিন ছির সাথে তার একটা দূরত্ব থাকাই ভালো, যাতে, কিছু হলে দুজনের পক্ষে এগোনো বা পেছোনো সহজ হয়।

যাবতীয় খিটিমিটি সত্ত্বেও শিন ছির মেজাজ বেশ আনন্দে ডগমগ। এমনকি সে হাঁটছে অবধি হালকা চালে। মনে হচ্ছিলো যে ও এতো খুশি যে তখনই যেনো নাচতে পারে, যেখানে আছে সেখানেই। মিন হুয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে ছিলো, সত্যিটা থেকে শিন ছিকে অন্ধকারে রেখেছে বলে।

অন্ধকারে থাকা মানুষটা একটা হানিমুন স্যুইট ভাড়া নিয়েছে। সেটা আসলে পাহাড়ের মাথায় একটা ভিলা। কার্ড সোয়াইপ করে লিভিং রুমে ঢুকে পড়ে মিন হুয়ে অবাক হয়ে গেলো সুগন্ধী ফুলের কুয়াশা দেখে। একটা বিশাল কাচের বাতি ঝুলছে বিশাল লিভিং রুমের ছাদ থেকে। কাচের এক পাশে সোনালি রং করা আছে। প্রত্যেকটা পাতার মধ্যে দিয়ে আলো ঠিকরে ঠিকরে বেরোচ্ছে। পুরো ঘরটাতে বাস্তব আর অবাস্তব একাকার হয়ে আছে, অনেক বৈষম্যে, অনেক পরতে।

একটা লম্বা টেবিলে গোলাপ রাখা আছে - লাল, হলুদ, সাদা, বেগুনী ………

আর না পেরে মিন হুয়ে থমকে থেমে গেলো। সুগন্ধটা একটা দেওয়ালের মতো তার পথ আগলে ছিলো। তার শ্বাস নিতে ভয় লাগছিলো। কারণ এই সুগন্ধ তো সু তিয়াঁর। 

ব্যাপারখানা দাঁড়াচ্ছে যে শিন ছি সব গুছিয়ে রেখেছে - দেখা, বিয়ে, মধুচন্দ্রিমা আর ফেরা ……


কিন্তু সু তিয়াঁ সবই হারালো মিন হুয়েকে বাঁচাতে গিয়ে। 

মিন হুয়ে ভাবতে লাগলো। আর তার চোখ লাল হয়ে উঠতে লাগলো।

এমন সময় গলার স্বরে রহস্য মাখিয়ে শিন ছি বললো, “এদিকে আয়। এখানে তোর পছন্দের জিনিসটা আছে।”

মিন হুয়ের হাত নিজের এক হাতে ধরে, শিন ছি অন্য হাতে দরজাটাতে টান লাগালো। দরজায় ঠিক বাইরেই খোলা হাওয়ায় ব্যবহারের একটা স্পা টাব রাখা আছে। 

মিন হুয়ে কাঁদতে চাই ছিলো। তার গলায় না ছিলো হাহাকার, না ছিলো চোখে জল। কেবল ভাবছে, “সব শেষ, সব শেষ। এই কি একসাথে একটা বাব্ল বাথ নেবার ছন্দ?”

হাতে টেনে ধরে শিন ছি বাব্ল বাথ পেরিয়ে নিয়ে গেলো মিন হুয়েকে। মিন হুয়ের সামনে একটা ছোট্টো ব্যক্তিগত ব্যবহারের স্যুইমিং পুল জেগে উঠলো।

বাড়াবাড়ি রকমের মুখভঙ্গি করে, হাত নেড়ে, যেনো এক ধনভাণ্ডার উজাড় করে দিচ্ছে - এরকম একটা ভাব করে, শিন ছি বললো, “টা-ডাহ। তোর ভীষণ প্রিয় স্যুইমিং পুল।”

মিন হুয়ে কিছু বলার আগেই মিন হুয়ের হাত ধরে শিন ছি ঝাঁপিয়ে দিলো স্যুইমিং পুলে। দুজনে একসাথে পড়লো পুলের মধ্যে। 

মিন হুয়ে সাঁতার কাটতে পারে না। ফলে সে ভয়ে চেঁচিয়ে উঠলো। সাঁতার কাটতে না পারা মানুষের জলের মধ্যে বেঁচে থাকার জান্তব প্রবৃত্তিতে গলা জড়িয়ে ধরলো শিন ছির, লেপ্টে রইলো শিন ছির শরীরে সাথে।

যা হবার কথা তাই হলো। শিন ছি বহু বছর বিদেশবাসের পর দেশে এসেছে। তার রকমসকম সাধারণ বোধবুদ্ধির বাইরে। শিন ছি বললো, “জেগে উঠেছে।”

মিন হুয়ে ভীষণ সন্দেহজনকভাবে লাফ ফেরে সরে গেলো শিন ছির থেকে দূরে। তারপর পাগুলোকে সোজা করে, পুলের মেঝেতে পা রাখলো। মনে মনে চেঁচাতে লাগলো, “কী লজ্জা! কী লজ্জা!” মুখে বললো, “জলটা ঠান্ডা। আমি একটু আগে আইসক্রিম খেয়েছি। আমার পেটটা কেমন ভিজে গেছে। পেটে ব্যথা করছে।”

শিন ছি ব্যস্ত হয়ে উঠলো, “বু হাইসা। আমার দোষ। ঠাট্টা করতে পেলে আমি আর কিছুই খেয়াল রাখতে পারি না।।”

তাড়াতাড়ি পাড়ে উঠে পড়লো শিন ছি। মিন হুয়েকে টেনে তুললো জল থেকে। জিজ্ঞেস করলো, “পেটে খুব ব্যাথা করছে? ডাক্তারের কাছে যাবি?”

মিন হুয়ে আশ্বাস দিলো, “ঠিক আছে। গরল জলে চান করলেই ঠিক হয়ে যাবে।”

অপ্রস্তুত চাউনিতে একে অপরের দিকে দেখলো। দুজনেরই শরীরের ওপরের ভাগে পাতলা সাদা টিশার্ট। জলে ভিজে দুজনেরই টিশার্ট স্বচ্ছ হয়ে গেছে। চোখ ফিরিয়ে আবার এক পলক দেখলো একে অপরকে। যেই শিন ছির চোখ নেমে এলো মিন হুয়ের বুকের ওপর, মিন হুয়ে ঘুরে দাঁড়ালো, জানতে চাইলো, “বাথরুম কোথায়?”

শিন ছি বললো, “ডান হাতে তিন নম্বর দরজা।”

তারপর বললো, “আমিও স্নানে যাবো।”

চোখে ভয় নিয়ে মিন হুয়ে তাকালো শিন ছির দিকে, ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো, “অ্যাঁ!”

শিন ছি তৎক্ষণাৎ বুঝিয়ে বললো, “দুটো বাথরুম আছে।”

ঝটপট চান সেরে নিলো মিন হুয়ে। চুল শুকিয়ে, একটা হালকা বেগুনি ল্যাভেন্ডার রঙা জামা পরে গেলো লিভিংরুমে। শিন ছি সোফায় বসে আছে। সাদা শার্ট আর গ্রে স্ল্যাক্স পরে। পায়ে কালো চপ্পল। মিন হুয়েকে দেখে চটপট উঠে দাঁড়ালো, “তোকে কিছু ড্রিংক্স দি। কী নিবি? এখানে রেড ওয়াইন আছে, বিয়ার আছে, জুস আছে, কোলা আছে, আর মিনারেল ওয়াটার আছে।”

মিন হুয়ে পছন্দ জানালো, “জুস। শিয়া শিয়া।”

শিন ছি আপ্যায়ন করলো, “যেখানে খুশি সেখানে বসে পড়।”

মিন হুয়ে সোফার এক কোণে বেশ বিশ্রীভাবে বসলো। কফি টেবিলের ওপরে দুটো বাতি জ্বলছে। তার পাশে ছিলো শিন ছির জিনিসপত্র - সেল ফোন, কয়েকটা ব্যাটারি, ল্যাপটপ, একটা চামড়ায় মোড়া নোটবুক, একটা দাবার বোর্ড যার ওপরে গুটিগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা আছে।

দাবার বোর্ড

মিন হুয়ে একটা গুটি তুলে নিলো দাবার বোর্ড থেকে। হাতের মধ্যে রেখে গুটিটা হালকা হাতে ঝাঁকাতে লাগলো। বসে রইলো নির্বোধের মতো। জানে না কি করা উচিৎ। তাই গুটিগুলো বেছে ফেললো প্রথমে। তারপর দাবার ছকে সাজিয়ে ফেললো, লাল আর কালো দিক বরাবর।

রান্নাঘরে অনেকক্ষণ ধরে কাজ করার পরে শিন ছি দু কাপ গরম পানীয় নিয়ে এলো, “খেয়ে দেখ, গরম অ্যাপলসিডার। গরম আপেলের রস। এতে পেটটা গরম রাখে।”

মিন হুয়ে হাতে নিয়ে দেখলো একটা হালকা হলুদ কাপ। কাপের মধ্যে ধোঁয়া ওঠা একটা তরল। মধ্যে চেরির মতো দেখতে লরেল বেরি আর এক টুকরো আপেল। চুমুক দিয়ে প্রশংসা না করে পারলো না, “দুর্দান্ত।”

লরেল বেরি

শিন ছি নিজের কাপটা নিয়ে মিন হুয়ের পাশে বসে জানালো, “আমার মা আমাকে শীতের সময় মাঝে মধ্যেই বানিয়ে দিতেন।”

মিন হুয়ে চমকে উঠলো, “তোর মা?”

শিন ছি অনুতাপের স্বরে বললো, “ওহ্‌! আমি ভুলে গেছিলাম আমাদের চুক্তির কথা যে আমরা অতীতের কথা বলব না।”

হাসলো শিন ছি, “মানে আমার পালক মা।”

মিন হুয়ে জানতে চাইলো, “কেমন কাটল তোর ওখানে?”

শিন ছি সন্তুষ্টি জানালো, “চমৎকার।”

মিন হুয়ের আরো প্রশ্ন ছিলো, “উনি ম্যান্ডারিন বোঝেন?”

শিন ছি অকাতরে উত্তর দেয়, “মোটেই না।”

মিন হুয়ের প্রশ্ন শেষ হয় না, “তাহলে তুই কী করলি যখন প্রথম ইউনাইটেড স্টেটসে পৌঁছোলি?”

শিন ছি উত্তর দিয়ে যায়, “প্রথম তিনমাস খুব কষ্টকর ছিলো। আমি কিছুই বুঝতে পারতাম না। তিন মাস পরে আমি মোটামুটি কথাবার্তা চালিয়ে নিতে পারতাম।”

মিন হুয়ের কৌতুহল বাধভাঙা। কিন্তু ও আর প্রশ্ন করতে সাহস করলো না। ভয়ে। যদি শিন ছিকে একই ভাবে ওর মতো প্রশ্ন করা থেকে আটকানো না যায়, তাহলে মিন হুয়ের আসল কথাটা বেরিয়ে পড়বে। 

কিন্তু শিন ছি জিজ্ঞেস করলো অন্য কথা, “তা হলে শেষ অবধি তোর ভাইকে খুঁজে পাওয়া গেছে যা হোক। চল, সুইহুয়া গিয়ে নিশ্চিত হয়ে আসি। তাই না?”

এই ব্যাপারে কথা বলার জন্য মিন হুয়ে ভীষণ তৈরি। এটা নিয়ে সে বিশদে কথা বলতে পারবে। তার কারণ শিন ছির সাথে দেখা হবার আগেই মিন হুয়ে পরিজন খুঁজে বার করার ওয়েবসাইটের একজন ভলান্টিয়ারের সাথে ফোনে কথা বলে ছিলো। ভলান্টিয়ার মিন হুয়েকে যাবতীয় প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে দিয়ে ছিলো। বহু বছর ধরে সু তিয়াঁ রেজিস্ট্রেশন করে রেখে ছিলো ফ্যামিলি ফাইন্ডিং ওয়েবসাইটে। এই প্রথমবার কোনো সম্ভাবনাময় পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। সু তিয়াঁর ছোটো ভাই যখন হারিয়ে যায়, তখন তার বয়স ছিলো মাত্র দেড় বয়স। তার কোনো পোষাকি নাম তখনো ছিলো না। তাকে ডাকা হতো “আজিএ” বলে।

মিন হুয়ের যুক্তি হল, “ছেলেটার নামটা প্রায় একরকম। অন্য পরিবারটা একই সময়ে একটা ছেলে দত্তক নিয়ে ছিলো। দত্তক নেবার দিনক্ষণ আমার ভাই কিডন্যাপ হবার দেড় মাসের মধ্যে। দিন তারিখগুলো বেশ কাছাকাছি। তারওপর সুইহুয়া ইয়াংছেনজেনের কাছাকাছি। দুটো একই পথে পড়ে।”

ভ্রূ কুঁচকে শিন ছি সন্দেহ উগরে দিলো, “এই দুটো কারণ কি যথেষ্ট যে সুইহুয়ার ছেলেটাই তোর ভাই? এর ওপর কি ভরসা করা যায়?”

মিন হুয়ে জানালো, “ওরা রক্তের নমুনা নিয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষা করার জন্য। কয়েক দিনের মধ্যেই ফলাফল জানা যাবে।”

মিন হুয়ে কাপে একটা চুমুক দিয়ে বললো, “এখন আমি যাচ্ছি একটু খোঁজখবর করে সাধারণ অবস্থাটা বুঝে নিতে।”

শিন ছি আরো প্রশ্ন করলো, “তোর ভাইয়ের কী কোনো দাগ আছে শরীরে? বিশেষ চিহ্ণ? জন্মদাগ?”

মিন হুয়ে বললো, “না। বাচ্চাটাকে এক বছর বয়সে কেমন দেখতে ছিলো তার কোনো ছবিও নেই।”

শিন ছি বললো, “তা হলে ডিএনএ ছাড়া আর কিছুর ওপরেই ভরসা করা যাবে না।”

মিন হুয়ে মেনে নিলো, “হ্যাঁ। তাতো বটেই।”

হঠাৎ শিন ছি বলে উঠলো, “তিয়াঁ তিয়াঁ, তুই যদি তোর ভাইকে খুঁজে পাস, তাহলে তুই ভাইকে ফেলে বিদেশে যেতে চাইবি না। আমি কিন্তু চিনে ফিরে এসে তোর সাথে থাকতে পারি। এতো দিনের পরে ভাইকে খুঁজে পেলে, আমি চাইবো না যে তোর সাথে তোর ভাইয়ের ছাড়াছাড়ি হোক।”

মিন হুয়ে জানে না যে এই কথার কী জবাব হয়। সে শুধু ঘাড় নাড়ে।

শিন ছি অন্য কথায় চলে গেলো, “তোর কি খিদে পেয়েছে? আমরা বাইরে রেস্টুরেন্তে যাবো ডিনারের জন্য? নাকি ঘরেই বলব, রুম সার্ভিস?”

মিন হুয়ে হাতঘড়ি দেখলো। শেষ বিকেলে পাঁচটা বাজে মাত্র। বললো, “ এখনো অনেক সময় আছে। আমার খিদেও নেই এখন।”

শিন ছি আবার অন্য কথায়, “এই, আমি দেখছি যে তুই দাবার বোর্ডে সব ঘুটি সাজিয়েছিস। একবোর্ড খেললে হয়। খেলবি, আগের মতো?”

মিন হুয়ে শিন ছির দিকে তাকালো, চোখ পিটপিট করে বললো, “ঠিক আছে। খেলবো।”

এবারে খেলতে আধঘন্টা লাগলো। শুরুতে শিন ছি যেনো অপ্রতিরোধ্য, তখন মিন হুয়ে প্রত্যেক চালে ধীর স্থির। এক নজরে, শেষ পর্যন্ত খেলাটা অবিচ্ছিন্নভাবে চলছে।

  শিন ছির চাল, “দুটো গাড়ি নিয়ে, নদী পেরিয়ে, আমি আশঙ্কা করছি যে এই খেলাটা শেষ হয়ে যাবে। আমি কামানের মধ্যে যাচ্ছি।”

মিন হুয়ে দুদিকের সৈন্য সাজানোর দিকে দেখলো, দুদিকের অনেক ফাঁদ।

“গাড়িটা খেলাম।”

“এতো দেরিতে গাড়ি খাবি? আমি তো দপ্তরী হয়ে গেছি।”

“অবাক কান্ড। অপরূপ সুন্দর হতে যাস না। তুই অপরূপ সুন্দর হলে, আমি তোর দিকে ছুটে যাবো আর তোকে মেরে ফেলবো।”

“আমিও বড়েগুলো খাব আর ঘোড়াটাকে মেরে ফেলবো।”

“তাহলে অপরূপ সুন্দরে পদোন্নতি নেবো।”

“কামান পাঠালাম।”

“সৈন বল দিলাম।”

“তোর দপ্তরীকে কাটলাম।”

“জিন সেনাধ্যক্ষ।”

“সেনাদল ধ্বংস। খেলা মাত।”

চোখ বড়ো বড়ো করে শিন ছি চেয়ে রইলো মিন হুয়ের দিকে। তার মুখে একটা অবিশ্বাস্য অভিব্যক্তি, “ও মা! আমি এর মধ্যেই হেরে গেছি!”

মিন হুয়ে প্রশ্ন করলো, “জানিস কি গন্ডোগোলটা কোথায়?”

শিন ছি আগ্রহী, “বল।”

মিন হুয়ে ব্যাখ্যা করলো, “এক্ষুণি যখন দুটো গাড়ি যুদ্ধে, সামনের সারিতে, তখন তোর সামনের গাড়ি দিয়ে সেনাপ্রধানকে ডাকা উচিৎ হয় নি। বাজে চাল। তোর পিছনের সারির গাড়ি দিয়ে সেনাধ্যক্ষকে ডাকা উচিৎ ছিলো। তাতে তোর জেতার সম্ভাবনা থাকতো।”

শিন ছির উৎসাহ বেড়ে গেছে, “চল আরেকবার খেলি।”

মিন হুয়ে রাজি হয়ে গেলো, “ঠিক আছে।”

দুজনে আবার খেলতে লাগলো দাবা। হঠাৎ করে শিন ছি হাত দিয়ে গুটিগুলো আড়াল করে দিলো, মিন হুয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, “তিয়াঁ তিয়াঁ, তুই কী সত্যিই সু তিয়াঁ?”

মিন হুয়ের নজরও একটু ট্যারা হলো। তার মনে একটা সন্দেহ ঘনিয়ে উঠল : এই ছেলেটা কি আসলে শিন ছি? এমন কী হতে পারে যে আসল শিন ছি মরে গেছে আর সামনে বসে থাকা মানুষটা নকল শিন ছি?

মিন হুয়ে প্রশ্ন রাখলো, “তোর ব্যাপারটা কী, তুই কী আসলে শিন ছি?”

শিন ছি গায়ের জামাটা খুলে ফেললো। ওর বুকের মধ্যিখানে গাঢ়, লম্বা ক্ষতটা জেগে উঠলো। “তুই এইটা সব সময়ে চিনতে পারবি, বল?”

মিন হুয়ে হাঁ হয়ে যাওয়া মুখটা বন্ধ করলো, হাসলো, বললো, “আরে, ঠাট্টা করছিলাম, তোকে এতো গুরুত্ব দিতে হবে না।”

জামার বোতাম এঁটে, শান্ত স্বরে শিন ছি বললো, “আমি গুরুত্ব দিই নি।”

খেলতে খেলতে বললো, “আমি তো খুলে ফেলেছি। এবার তোর পালা।”


~~~~~~~~~~~~

সম্পূর্ণ বই বিনামূল্যে : https://dl.bookfunnel.com/lcj5vznt96

Link to Previous Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/08/jpda-chapter-06.html

Link to following Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/08/jpda-chapter-08.html


Readers Loved