সীবলির প্রতীক্ষা
“কেন, আবার কী হলো?” মায়ের গলাতেও বিরক্তি। এমনটাই যে হবে তা সীবলির প্রায় জানা ছিল। কিন্তু ধৈর্যের সীমা কী শুধু বাকি সবার? সীবলির নয়?
আসলে যতক্ষণ একটা মানুষ নির্বিরোধে অন্য আরেকটা মানুষের ধারণাকে গ্রহণ করে, তার সিদ্ধান্ত মেনে নেয় ততক্ষণ কোনো অশান্তি থাকে না। কিন্তু সেই মানুষটা নিজের মতটা জাহির করলেই এতক্ষণ যারা নিজেদের ধারণা আর সিদ্ধান্ত জাহির করছিল তারা রেরে করে অনমনীয়তার সমালোচনা করে।
কিন্তু অনমনীয়তা অসহিষ্ণুতা কার – যে অদ্যাবধি নির্বিরোধে অন্যের মত গ্রহণ করেছে তার নাকি যে তিলমাত্র মতান্তরের জন্য প্রস্তুত নয় তার?
সীবলি জানে এসব তর্ক তার একান্তের। বাকি দুনিয়া এসবে কর্ণপাত করে না, তো বিবেচনা!
মা-ও সেই দুনিয়ার বাসিন্দা। কোনোদিন তলিয়ে দেখেন নি যে যে বেঁচে থাকাটাকে মা জলের মতো বাঁচা বলেন সেটা প্রশম নাকি তারল্যটা জলের মতো হলেও স্বাদটা অ্যালকোহলের মতো তিতকুটে, স্পর্শটা ঝাঁজালো আর উষ্ণ, পরিণামটা নেশাতুর।
আপাতত সে জবাব দেয়, “কার্যকারণ বাড়ি পৌঁছে বলব। রাস্তাটা পিছল হয়ে গেছে বৃষ্টিতে। ঝোড়ো হাওয়ায় গাড়ি কাঁপছে। সাবধানে ড্রাইভ করতে হবে। এখন রাখছি।”
যদিও সে জানে বাড়ি পৌঁছে বলার মতো বিশেষ কিছুই নেই তার।
অনেকগুলো বছর হয়ে গেছে। তবু সীবলির মা, বাবা এখনও অবাস্তবের বিশ্বাসে অটুট। কিন্তু সে নিজে তো সেদিনই বুঝেছিল তার পক্ষে আর কাউকেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়, যেদিন সে তপোস্নিগ্ধকে ফিরিয়ে দিয়েছিল।
কতো বছরের সম্পর্ক তার সাথে! দশ বছর ধরে দুজনে একসাথে বড়ো হয়েছে। দুজনেই ভেবেছিল একসাথে বুড়োও হবে, যদিও তাদের বয়স তখন বেশ অল্প ছিল। কিন্তু সব ইচ্ছে যেমন সত্যি হয় না, এক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। একসাথে বুড়ো হবার ইচ্ছেটা কেমন করে যেন বিয়ের সামাজিক ব্যবস্থায় অনূদিত হয়ে গিয়েছিল।
তাতেও সীবলি আপত্তি করে নি। এসব ব্যবস্থাদির মধ্যে তপোস্নিগ্ধ একদিন বলেছিল, “আমার মায়ের সামনে তুই কার্বনেটোকে চুমু খাবি না।”
তপোস্নিগ্ধ “এটা বলবি না”, “ওই জামাটা পরবি না”, “ওটা করবি না” ইত্যাদি নানা খবর্দারির বাড়াবাড়ি করলেও সীবলি জানত যে দুনিয়াদারি কিংবা ভাবনার জগতে তপোস্নিগ্ধ ও সে পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল ও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
কিন্তু কার্বোনেটোকে চুমু খাওয়া সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞাটা সীবলিকে যেন ছ্যাঁকা দিয়ে গিয়েছিল। বাকি সব কিছুর যৌক্তিক যাচাইয়ের মতো এই বক্তব্যের কোনো বিশ্লেষণে সে যায় নি। বোধ হয় চুমু খাওয়ার মতো নিতান্ত একটা অনুভূতিতাড়িত অভিব্যক্তি নিয়ে তর্ক চলে না তাই।
যেমন দিদিমার নির্দেশ ছিল, “মেয়েমানুষ তুমি, দিনে একবারের বেশি বাহ্যে যাবে না।”
এ নির্দেশ শুনে চমকানো যায়, এর অবাস্তবতায় হাসাহাসি করা যায়, এমনকি সংস্কার না মানার অজুহাতে সংস্কার কী সাংঘাতিক অবাস্তবিক যে হতে পারে তার উদাহরণ হিসেবেও এর উল্লেখ করা যায়, কিন্তু এটা মেনে নেওয়াও যায় না, আবার এর প্রতিবাদও করা যায় না।
তপোস্নিগ্ধের কার্বোনেটো সংক্রান্ত ফতোয়ার আগে যতোবার তপোস্নিগ্ধের মা এসেছিলেন সীবলিদের বাড়ি, সীবলি কার্বোনেটোর ব্যাপারে খুব সজাগ বা সন্ত্রস্ত কোনোটাই কখনও ছিল না। কিন্তু ফতোয়ার পরে সীবলির বিবেচনা যেন নজর করতে লাগল যে তপোস্নিগ্ধের মা এবং বাড়ির অন্য কেউ সীবলির বাড়িতে ঢোকার আগেই তপোস্নিগ্ধ কার্বোনেটোকে আদর করার ছলে ওকে ওর ঘরে বেঁধে ফেলে!
তার মানে যে দুয়েকবার তপোস্নিগ্ধকে ছাড়াই ওর মা আর অন্যরা এসেছিলেন সীবলিদের বাড়ি সেই দুয়েকবার কার্বোনেটো সীবলি আর সীবলির মায়ের পায়ে পায়ে ঘুর ঘুর করছিল।
সেটা নিয়েই সমস্যা!
তাই কী তপোস্নিগ্ধের মা হুকুম জারি করেছিলেন, “আমাদের বাড়িতে কিন্তু এসব পুষ্যি নিয়ে যাবে না। মা-বাবার সাথে যেমন বাপের বাড়ি এলে দেখা হয়, পুষ্যির সাথেও তাই হবে।”
সীবলি তো কখনও ভাবেই নি যে কার্বোনেটোকে নিয়ে যাবে তপোস্নিগ্ধের বাড়ি, কোনোদিনই নিয়ে যায় নি তো। তাহলে এ প্রসঙ্গ কেন? বিয়ের পর তাকে ওবাড়িতে বাস করতে হতো বলে?
সীবলি তপোস্নিগ্ধকে বলেছিল যে, “এমন হয় না যে, আমি আমাদের বাড়িতেই থাকলাম, আর তুই তোর বাড়িতে। তারপর ইচ্ছে হলে আমরা একসাথে দিন কিংবা রাত আমাদের বাড়িতে কিংবা তোদের বাড়িতে কাটাবো-”
কথা কেড়ে নিয়ে ফুঁসে উঠেছিল তপোস্নিগ্ধ, “তুই কী বলছিস তুই জানিস না। এসব ছ্যাঁচড়ামির কোনো মানে হয়?”
তারপর সীবলি নিজেকে মাত্র সপ্তাহখানেকে বুঝিয়েছিল যে এভাবে তপোস্নিগ্ধের সঙ্গে থেকে একলা বাঁচা তারপক্ষে দুরূহ, তাই সে যখন একলাই হয়ে পড়ছে তার জীবনে, তার যাপণে, তাহলে তপোস্নিগ্ধের সাথেও সে আর থাকবে না।
সিদ্ধান্তটা তপোস্নিগ্ধকে জানাতে প্রথমে সে উড়িয়ে দিয়েছিল সীবলির খামখেয়ালি আলটপকা একটা কথার কথা ভেবে, যেমন নাকি মাঝে মাঝেই করে থাকে সীবলির ভিতরের অমলিন কিশোরীটা। কিন্তু কাউকে কিচ্ছু না বলে সীবলি শহর বদলে ফেলায় তার মা, বাবা, তপোস্নিগ্ধ - সব্বাই চমকে গিয়েছিল।
তপোস্নিগ্ধ ঝগড়া করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সীবলি করে নি। সে বারবার এটাই বলেছিল, “তোর সাথে একলা বাঁচাটা কষ্টের। তাই নিজে নিজেই একলা বাঁচব। এতে অনেক বেশি আনন্দ পাচ্ছি।”
নতুন শহরে একটু থিতু হয়েই সীবলি প্রথম নিজের কাছে নিয়ে এসেছিল কার্বোনেটোকে। সেই প্রথম সীবলি বুঝেছিল যে মানুষ হিসেবে তপোস্নিগ্ধের সামনে অনেক সুযোগ বেশি, কিন্তু মনুষ্যেতর কার্বোনেটো বড়ো অসহায়।
তপোস্নিগ্ধ দোসর পাক না পাক সঙ্গে থাকার লোক পেয়ে যাবে, কার্বোনেটো তো পুষ্যি, রাস্তার কুকুরদের মতো লড়াই করে বাঁচতে শেখেনি। ওকে ঘরছাড়া করলে লড়াইটা শিখতে শিখতেই ও মরে যেতে পারে।
তাছাড়া প্রাকৃতিক লড়াই-এর শিক্ষা থেকে কার্বোনেটোকে বঞ্চিত করেছে সীবলির মতো মানুষেরাই, সুতরাং আরেকটা মানুষকে তার পছন্দের পরিবেশ দেওয়ার জন্য কার্বোনেটোকে অপরিচিত পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার দিকে ঠেলে দেওয়াটা অমানবিক।
তাছাড়া মানুষের ক্ষমতা তো কুকুরের থেকে অনেক বেশি। তাই কার্বোনেটো না পারলেও তপোস্নিগ্ধ নিশ্চয়ই পারত নিজেকে নতুন পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে। সে পেরেওছে। কার্বোনেটো এখন তার কবরে। কিন্তু সেই মূহুর্তে সীবলি কার্বোনেটোকেই বেছে নিয়েছিল।
তারপর এতোগুলো বছর কেটে গেছে। এখন সীবলির সাথে থাকে ক্লোরেটো। মা-বাবাও থাকেন সাথে। সঙ্গে থাকে তাঁদের মেয়েকে সংসারী করার চেষ্টা।
সীবলি তাই মাঝে মাঝে নানান লোকজনের সাথে দেখা করে। কিন্তু আপত্তি আসতে থাকে কখনও ক্লোরেটোকে নিয়ে, কখনও ক্লোরেটোর গোঁফের সবুজাভা নিয়ে, কখনও তার চোখের কাজল কালো গভীরতা নিয়ে।
বিনা তর্কে সেসব সম্বন্ধকে ফিরিয়ে দেয় সীবলি। তার আর সম্পর্ক হয় না। আজও কাউকে সে ফিরিয়ে দিয়েছে। পুরুষটিকে সে নিজেই তার সম্বন্ধ নাকচ করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বাড়ির লোকেদের জানানোর কাজটা কূটনৈতিক বিচারে মায়েরই। আরও একবার সেই অপ্রিয় নেতিবাচক সিদ্ধান্ত জানাতে হবে অর্ধপরিচিতদের, তাই মা একটু অধৈর্য, বিরক্তও।
বাড়ি ফিরে দেখল মা চা তৈরি করে ফেলেছেন। সীবলি মনটা গুছিয়ে নিল। মা বললেন, “লোকে কী বলবে? এরপর আর সম্বন্ধ পাওয়া যাবে না।”
সীবলি চুপ করে চায়ে চুমুকের পর চুমুক দিয়ে চলেছে। কোনো সাড়া না পেয়ে মা-ই আবার বললেন, “আমি ভেবেছিলাম চাকরি-বাকরি করলে আমার থেকে ভালো থাকবে। তা না স্বাধীনতার নামে আমারই ঘরে বাড়াবাড়ি চলছে। যা খুশি তা-ই করবে!”
মা একটুক্ষণ চুপ করে আছেন দেখে সীবলি বুঝলো মায়ের কথা ফুরিয়েছে। সে বলল, “সমস্যাটা চাকরির নয়। ব্যক্তিত্বের। পছন্দের।”
মা কিছুটা জ্বালানী পেলেন যেন, বললেন, “কেন তোমাদের চাকরিতে বলে না ‘জলের মতো হতে হবে, যে পাত্রে রাখবে তার আকার নিতে হবে, কঠিন হলে চলে না, নমনীয় হতে হয়, মেনে নিতে হয়, মানিয়ে নিতে হয়’--- জীবনেও কী তাই নয়?”
শেষ চুমুকের চা-টা গিলে নিয়ে সীবলি জানাল, “তফাত আছে। চাকরিটা বাড়ির বাইরের ব্যাপার। কিন্তু তুমি জীবনের যে সম্পর্ক নিয়ে নমনীয়তার প্রশ্ন তুললে সেটা ঘরের ভেতরের কথা, তার সাথে বাস করতে হয়। সেখানে অস্বস্তি নিয়ে বাঁচতে চাইছি না। জীবনের সেই জায়গাতেও নমনীয়তা আর তারল্য চাই। কিন্তু সেই তরলটা কখনও চিলড বিয়ারের মতো, কখনো প্রবল শীতে রামের উষ্ণতার মতো। অন্যের অনুভূতিকে তুষ্ট করতে অবিরত জ্বলনশীল একটা তরল হওয়ার মতো। চাকরিতে তো শীতল হওয়া তরল হওয়া স্বার্থবুদ্ধিতে। যে সম্পর্ক নিঃস্বার্থ মনোযোগ চায়, সেবা চায়, উষ্ণতা চায়, আর্দ্রতা চায়, তাতে দাহ্য তরল হলে তো শিগিগির জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে ফুরিয়ে যাব।”
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, সীবলি চুপ করে যায়। তারপর সীবলি চায়ের খালি কাপগুলো তুলে নিয়ে রান্নাঘরে চলে যায়, ধুয়ে ফেলে। মা ছাদে চলে যান।
সীবলিও ছাদে যায়। তার ঢাকা চৌবাচ্চার জল গরম করতে দেয়। তারপর সাঁতারের পোষাকে চৌবাচ্চায় নেমে পড়ে। প্রাথমিক চোখের জলে, নাকের জলে কাটিয়ে ওঠে। তারপর এপাড়-ওপাড়ের সাঁতারে টের পায় স্নায়ুজুড়ে কেমন ছড়িয়ে যাচ্ছে জলের আদর। জলের আদরে নিজেকে সঁপে দিয়ে সাঁতারে মগ্ন, আচ্ছন্ন রাত ঘনায়, কেটে যায়।
