Saturday, August 31, 2024

JPDA - Chapter 25

২৫. সু ছনের চোখের জল

 


“তার মানে ঝি ঝু এখনো হাসপাতালে? কে দেখাশোনা করছে?” জানতে চাইলো মিন হুয়ে।

“ওর অপরেসন হয়ে গেছে। এরপর রেডিওথেরাপি হবে। কেমোথেরাপি হবে।”

পালং-এর ঝোলে একটা চুমুক দিয়ে বললো ঝৌ রু জি, “ওর মা-বাবা থাকেন শিনজিয়াং-এ। আমার সাহস হয় নি ওঁদেরকে জানানোর। হাসপাতালেই সব ব্যবস্থা আছে, আলাদা কোনো যত্ন তো লাগবে না। তাছাড়া, ও আছেও আমাদের হাসপাতালে। ওয়ার্ডের সম্পূর্ণ দায়িত্ব আমার। ওর যদি কিছু খেতে ইচ্ছে করে বা কোনো জিনিসের দরকার পরে সে তো আমি তক্ষুণি আনিয়ে দিতে পারবো ওর জন্য।”

বিনচেং - শিনজিয়াং


ইয়াও ঝি ঝু উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে, তারওপর মা-বাবার একমাত্র সন্তান। যখন দুজনে একসঙ্গে ছিলো, তখন ঝৌ রু জিই ওর দেখাশোনা করতো বেশি। 

“অ্যাই, এখন তো প্লাস্টিক সার্জারি খুব উন্নত হয়েছে। তাহলে স্তন বানিয়ে দেওয়া যাবে না? সিলিকোন বা ওরকম কিছু দিয়ে।”

যাই হোক, মিন হুয়ে অনেক বছর ধরে ব্রেস্ট ক্যানসার শনাক্ত করার নানান পদ্ধতি সম্পর্কে পড়াশোনা করেছে। ব্রেস্ট ক্যানসার ধরা পড়ার পরে কী কী করা যায় সেটা ওর অল্পস্বল্প জানা আছে।

“হ্যাঁ, আমি তো করবও ভাবছিলাম।” মাথা নেড়ে বললো ঝৌ রু জি, “কিন্তু ওর তো রক্ত জমাট বাধার অসুখ আছে। তাই ওর এসব চলবে না।”

“এতে কী নাচের ওপর প্রভাব পড়বে?”

“না” বললো ঝৌ রু জি, “স্তন বড়ো হলে নাচতে অসুবিধে হয়। তাছাড়া, সৌন্দর্যের ওপর স্তন না থাকার কোনো প্রভাব নেই। ইন্টারন্যাশন্যাল সুপারমডেলদের কথাই ধরো না, তারা তো অধিকাংশই স্তনহীন প্রায়। স্তন পেশা বিশেষে বিলাসিতা হয়ে দাঁড়ায়।”

“তাও বটে।”

যদিও মিন হুয়ে বললো কথাটা, কিন্তু ও তো জানে যে ফিরে ব্রেস্ট ক্যানসার হবার সম্ভাবনা কী প্রচন্ড বেশি, এমনকি দুটো স্তন বাদ দিয়ে দেবার পরেও। তার পরেও জীবন বাঁচানো যায় না। মিন হুয়ে চেষ্টা করেও মন খারাপ হয়ে যাওয়া আটকাতে পারলো না।

পরদিন মিন হুয়ে এক ক্যান ভর্তি করে হালকা বার্লি বানাল, কুঁচো চিংড়ি দিয়ে। সঙ্গে নিলো ছাঁচি কুমড়োর ঝোল। ঝৌ রু জিকে বললো ইয়াও ঝি ঝুয়ের জন্য খাবারগুলো নিয়ে যেতে।

সন্ধেবেলা ঝৌ রু জি ক্যান ফেরত নিয়ে এলো যেমনকে তেমন। বললো যে ঝি ঝুয়ের মেজাজ খুব খারাপ ছিলো, খায় নি কিছুই, কারুর সাথে কথাও বলে নি, শুধু কান্নাকাটি করেছে সারাদিন।

“ওকে বোঝানোর চেষ্টা করেছো?”

মিন হুয়ের আর কোনো উপায় ছিলো না, ছাঁচি কুমড়োর ঝোলটাকে আরেকবার গরম করে সবাইকে একবাটি করে দিলো। 

“তুমি ওকে ভোলানোর চেষ্টা করো নি কেনো? তুমি শুধু শুকনো কথা বলো।”

ঝৌ রু জি একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বললো, “এটা তো আসলে শিয়া য়ি হ্যাং-এর কাজ। আর এ ছোকরা জানেও না নিজে যে ও কোথায় গায়েব হয়ে গেছে। প্রথম কয়েক দিনে ঝি ঝু রোজ জানতে চাইতো যে একবারও য়ি হ্যাং এসেছে কিনা। খুব রেগে ছিলো। কয়েকবার জিজ্ঞেস করে ছিলো কিন্তু কেউই দেখে নি য়ি হ্যাং-কে, তারপর জিজ্ঞেস করা বন্ধ করে দিয়ে ছিলো। ওর নাচের দলের লোকেরাও খারাপ নয়। ওঁরা সব সময় কাউকে না কাউকে পাঠিয়ে দেন ঝি ঝুকে সঙ্গ দেবার জন্য।”

“তোমারও উচিৎ ওর খেয়াল রাখা। যাই হোক, তোমরা স্বামী-স্ত্রী।” মিন হুয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।

“হ্যাঁ” ঝৌ রু জি বাটির ঝোলটা খেয়ে নিলো, “ছাঁচি কুমড়োর ঝোলটা খেতে বেশ। ছন ছন, ভালো লেগেছে?”

খেতে খেতে হাসলো সু ছন, “বেশ খেতে। আমি আরেকটু চাই এটা, বাবা।”

“ইয়ো, ও কথাটা বলো না। বাবা এক ঢোকে সবটা খেয়ে ফেলেছে। এটা ভালোই। মা বরং তোমাকে আরেক বাটি বানিয়ে দিক।”

মিন হুয়ে ঝোলটার রেসিপি ইন্টারনেট থেকে দেখে নিয়ে বানিয়ে ছিলো, একবারের জন্য। মিন হুয়ে নিজের ফোনটা খুলে রেসিপিটা আরেকবার দেখে নিলো, “আমি তো মনেও রাখি নি।”

“আমাকে বানাতে দাও।” ঝৌ রু জি উঠে পড়ে রান্নাঘরে চলে গেলো।

মিন হুয়ে রাঁধতে জানে না। কলেজে পড়ার সময়ে রোজ রোজ ক্যাফেটেরিয়ায় খেতো। কাজ করার সময় নিচের তলায় গিয়ে খাবার অর্ডার করতো বা খাবার কিনে নিয়ে বাড়িতে গিয়ে খেতো। ও মাসে একবারও রাঁধে নি কখনো। ওর মা-বাবা দুজনেই ভালো রাঁধতে জানতেন, বিশেষত মা।

যখন আত্মীয়-বন্ধুরা বিয়েবাড়িতে একত্র হতেন, আর বিয়েবাড়িতে খানাপিনার আয়োজন হতো, সেখানেই মিন হুয়ের মায়ের নেমতন্ন হতো রান্নার দলকে নেতৃত্ব দেবার জন্য। গ্রামের লোকেরা রেস্টুরেন্টে ব্যাঙ্কোয়ে দেওয়া পছন্দ করতো না মোটে। তাঁরা সাধারণত নিজেদের উঠোনে একটা তাঁবু খাটিয়ে একটা উনুন পেতে নিতো। মিন হুয়ের মা কয়েকজনকে ডেকে নিতেন হাতে হাতে জিনিসপত্র আনার কাজ আর রান্নার জোগাড় করে দেবার জন্য। একটা পুরো দিনে খুব খাটলে তিনি একডজনের বেশি টেবিল ভরা মানুষকে খাইয়ে খুশি করে দিতে পারতেন।

বিয়ের পরে ঝৌ রু জি বা মিন হুয়ে কচ্চিৎ কদাচিৎ রান্না করেছে। যদিও রেঁধেও থাকে তো ঝৌ রু জিই রান্নটা করেছে বেশির ভাগ সময়ে। কারণ তারই খাবার নিয়ে খুঁতখুঁতুনি বেশি। মিন হুয়ে বা সু ছনকে খাইয়ে তৃপ্ত করা খুব সহজ। ওরা দুজনেই যা পায় তাই খায়, এমন কি ওরা দুজনে ইন্সট্যান্ট নুডল্‌স পেলেও খুব আনন্দ করে খায়। মিন হুয়ে কেবল মাত্র তিনটে পদ ভালো করে বানাতে পারে - হালকা আঁচে ঝলসানো মুর্গির ডানা, কাঁচা লঙ্কা দিয়ে শুয়োরের মাংসের কুঁচি, আর ঠান্ডা পালং শাক, যেনো চেং ইয়াও জিঁর তিনটে কৌশল, সব সময়ে ওগুলোই রান্না করে। ঝৌ রু জি অনেকটা খাবার পরেও নালিশ না করে পারে না, কিন্তু সু ছনের কিছুতেই তৃপ্তি হয় না যতোই খাক না কেনো।

কাকতালীয়ই হবে, সেদিনই মিন হুয়ে গিয়ে ছিলো বিনচেং ইউনিভার্সিটির হাসপাতালে যেহেতু বা’অ্যানের সঙ্গে ঐ হাসপাতালের অনেকগুলো প্রজেক্ট আছে, সেহেতু প্রজেক্টের ডেটা হাসপাতাল থেকে বা’অ্যানে পাঠানোর কোনো একটা কাজের জন্য। ঘটনাচক্রে ও অনকোলজি ডিপার্টমেন্টের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলো। ভেবে ছিলো যে ঝৌ রু জির সাথে একবার দেখা করবে।

মায়ের মৃত্যুর পরে অনেক দিন অবধি মিন হুয়ে ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে যেতো ‘অনকোলজি ডিপার্টমেন্ট’ শব্দজোড়া শুনলেই। 

বিয়ে হয়ে ইস্তক, সু ছনের অসুস্থতার কারণে, বার বার হাসপাতালে গেলেও, মিন হুয়ে অনকোলজি ডিপার্টমেন্ট এড়িয়েই যেতো। সেদিনই ওর মনে হয়ে ছিলো ঝৌ রু জির সাথে দেখা করবে। যখন নার্সকে ও ঝৌ রু জিকে কোথায় পাবে জিজ্ঞেস করলো, তখন জুনিয়র নার্স জানালো, “ঝৌ ঝংজিয়ে আগে চলে যাবেন বলেছেন আজকে। ওঁর বাড়িতে নাকি কী অসুবিধে আছে। শু ইশঁ সব সার্জারি করবেন।”

অথচ যখন ঝৌ রু জি বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছিলো তখন বলে যে ওর একটা অপেরেসন আছে সেদিন, ও রাত দশটা অবধি বাড়ি ফিরতে পারবে না।

মিন হুয়ে উত্তর দিলো, “আমি ওঁর স্ত্রী।”

“ওহ্‌” বলে মুখে হাত চাপা দিলো জুনিয়র নার্স।

“আমি এখানে এসেছি ইয়াও ঝি ঝু-কে দেখতে।” মিন হুয়ে বললো।

কৌতুহলের সঙ্গে জুনিয়র নার্স জানালো, “আমিই তো ডিসচার্জের কাজ করেছি।”

“উনি কী সেরে উঠছেন?”

“হ্যাঁ, ওঁর শরীরের অবস্থা খুব খারাপ নয় -” বলতে বলতে নার্স মাথার দিকে দেখালো আঙুল দিয়ে, “মনের ওপর চাপ খুব গুরুতর। উনি কিছুই খান না, এমনকি জলও না। চিকিৎসা করাতে চান না। চুপি চুপি হাতের কব্জি কেটে ফেলেন। ভাগ্য ভালো যে ঝৌ ঝংজিয়ে দেখে ফেলে ছিলেন। ঝৌ ঝংজিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় থাকতেন, প্রায়ই আসতেন ইয়াও ঝি ঝুকে একটু আরাম দেবার জন্য। ইয়াও ঝি ঝুয়ের মনের অবসাদ অনেকটাই কেটে গিয়ে ছিলো গত কয়েক মাসে। না হলে আমার তো সাহসই হতো না ওঁকে হাসপাতাল থেকে ছুটি দেবার।”

ইয়াও ঝি ঝু হলো ঝৌ রু জির প্রাক্তন স্ত্রী আর বিনচেং-এর এক বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী। ডিপার্টমেন্টের সবাই জানে। 

মিন হুয়ে আর কোনো প্রশ্ন করলো না। সোজা ফিরে গেলো কোম্পানিতে আরেকটা মিটিং-এর জন্য আর প্রোগ্রাম লেখার কাজে।

দুপুরের খাবার পরে মিন হুয়ে আর থাকতে পারলো না ঝৌ রু জিকে ফোন না করে, “কোথায় তুমি?”

ঝৌ রু জি হাঁপাচ্ছিলো কিন্তু গলার স্বরে মনে হলো না যে ও অবাক হয়েছে, “আমি ঝি ঝুয়ের এখানে।”

মিন হুয়ে বললো, “ওহ্‌" তারপর জানতে চাইলো, “কোনো সমস্যা আছে? গোলমাল হয়েছে কিছু?” 

“না, তেমন কিছু না, একটু …”

একটু দ্বিধা করে বললো ঝৌ রু জি, “একটু আগে আমার সাথে শিয়া য়ি হ্যাং-এর ভয়ঙ্কর মারপিট হয়েছে।”

“ঝগড়া?” মিন হুয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছিলো, “হাতে লাগে নি তো তোমার? ঝৌ রু জি যুক্তি দিয়ে ভাবো, তোমাকে সার্জারি করতে হয়।”

“শিয়া য়ি হ্যাং-ও সার্জারি করে। আমি কী কাউকে ভয় পাই নাকি!”

মিন হুয়ের অস্বস্তি হলো খুব। ছুটি নিয়ে বেরিয়ে গেলো ইয়াও ঝি ঝুয়ের অ্যাপার্টমেন্টের দিকে। দরজা খুলতেই দেখলো যে রক্ত লেগে আছে ঝৌ রু জির কপালে আর ঠোঁটের কোণে। 

“রু জি!” মিন হুয়ে এতো ভয় পেয়ে ছিলো যে ও হাত দিয়ে ঝৌ রু জির মুখটা ছুঁয়ে দেখলো কতোটা লেগেছে, “এখানটা একটা হাঁ হয়ে আছে। তোমার কী সেলাই করতে লাগবে?”

“না না, এটা একটু মাংস কেটে গেছে মাত্র। ব্যান্ড-এইড লাগালেই হবে।”

“দ্যুইবুচি, মিন হুয়ে, সব আমার দোষ।”

ইয়াও ঝি ঝুয়ের চেহারা জুড়ে ক্ষমার প্রার্থনা জেগে উঠে ছিলো। সতর্ক হয়েই বলছিলো মিন হুয়েকে, “আমি ওদের বারণ করে ছিলাম, ওরা যেনো মারপিট না করে, চেষ্টাও করে ছিলাম ওদের ছাড়ানোর, কিন্তু দুজনের কেউই আমাকে পাত্তাই দিলো না, রু জির খুব লেগেছে। হাসপাতালেই যাচ্ছিলো ও, আমিই ওকে ছুটি নিতে বলেছি, ওর আঘাতের পরিচর্যা করার পরেই আমরা হাসপাতাল ছেড়ে বেরিয়েছি … এই মাত্রই বাড়ি এসে পৌঁছেছি।”

মাসের পর মাস ইয়াও ঝি ঝুকে দেখে নি মিন হুয়ে। তার ওপর ওর রোগ - সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিলো যে ওর শরীর যেনো এক সাইজ ছোটো হয়ে গেছে। ওর মলিন মুখে কোনো ঔজ্জ্বল্য নেই, আগে যে ত্বক থেকে গোলাপী আভা ঠিকরে বেরোতো সেটাও চলে গেছে। চোখগুলো বসে গেছে কোটরে, চিবুকের সমস্ত মাংস যেনো গলে গেছে, চামড়াটা যেনো টান করে হাড়ের ওপরে সাঁটা আছে আর খুলির রেখাগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মাথায় একটা নরম লাল টুপি পরে আছে ও, সম্ভবত কেমোথেরাপির কারণে মাথার থেকে খসে পড়া চুলের অবস্থাটা ঢাকার জন্যই।

“ঠিক আছে।” দীর্ঘশ্বাস ফেললো মিন হুয়ে, “শিয়া য়ি হ্যাং গায়েব হয়ে গিয়ে ছিলো না কয়েক মাস আগে? আবার কী করতে তার উদয় হলো?”

“মিন হুয়ে, দরজায় দাঁড়িতে থেকো না। ভেতরে এসো, বসো।” মিন হুয়েকে ধরে সোফায় বসিয়ে দিলো ঝি ঝু, “যখন আমি রোগে পড়লাম, ও তখন বলে ছিলো যে ও বিদেশে যাচ্ছে ওর বাবাকে গবেষণায় সাহায্য করার জন্য। ও ইউরোপে চলে গিয়ে ছিলো, ওখানেই ছিলো অনেকগুলো মাস, আমার সাথে কোনো যোগাযোগ করে নি। পরে আমাকে একটা মেসেজ পাঠিয়ে ছিলো, আমিও রাজি হয়ে ছিলাম টেক্সট মেসেজেই সম্পর্ক ভেঙে ফেলতে।”

ইয়াও ঝি ঝু গম্ভীর চোখে মিন হুয়ের দিকে তাকিয়ে বললো, “অপরেসনের সময় আমি খুব ভেঙে পড়ে ছিলাম মনে মনে। রু জিকে ধন্যবাদ … আর নাচের দলের সহকর্মীদেরও যাঁরা আমার যত্ন নিয়েছেন। আমি কৃতজ্ঞ। তার ফলে আমি কাল ফিরেছি। আমি যখন অ্যাপার্টমেন্টে ফিরলাম তখন একটা কাগজ পেলাম যার থেকে জানতে পারলাম যে অ্যাপার্টমেন্টটা বিক্রি হয়ে গেছে। আর আমাকে বলা হয়েছে এক মাসের মধ্যে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে … আর আমি হতবাক হয়ে যাই।”

“তোমরা অ্যাপার্টমেন্টটা কেনো নি আগেই?” মিন হুয়ে ঘাবড়ে গেলো।

“শিয়া য়ি হ্যাং কেনার পয়সাটা দেয়। আমরা বিবাহিত নই। সেই জন্য সম্পত্তির কাগজে শুধু ওর নাম লেখা আছে।”

বাঁকা হাসি দেখা গেলো ঝি ঝুয়ের মুখে, “আসলে আমি তো ওর সাথে সম্পর্ক ভেঙেও ফেলেছি। আমি ওর অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেও চাই না। ব্যাপারটা হলো আমার অসুখের জন্য আমি হাসপাতালে ছিলাম আর অন্য একটা অ্যাপার্টমেন্ট খুঁজে নিতে পারি নি। আমি ভেবে ছিলাম ও বোধ হয় আমাদের এতোদিনের সম্পর্কের কথা ভেবে আমাকে খানিক সময় দেবে। আমি আশা করি নি যে আমাকে এতো তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যেতে হবে। আমি বাড়িটা পরিষ্কার করে দিয়েছি গতকালই আমার জিনিসপত্র সব সরিয়ে নিয়ে। আর য়ি হ্যাং-কে আসতে বলে ছিলাম। যেহেতু আমরা অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছি, তাই আমি জানতে চাই ছিলাম যে ও কিভাবে জিনিসপত্র ভাগ করতে চায়। এখানে এখনো ওর নিজের অনেক জিনিস রয়ে গেছে, কিছু গয়নাগাটি, বাও, এরকম কিছু আরকি। তাই ওকে আমি বলে ছিলাম যে আমি ওর সাথে দেখা করতে চাই। রু জি ভয় পাচ্ছিলো যে আমি হয়তো অসুস্থ হয়ে পড়ব, হয়তো য়ি হ্যাং কিছু বললে আমার মাথা গরম হয়ে যাবে, তাই রু জি আমার সাথে এসে ছিলো। একেবারে কোথাও কিচ্ছু নেই, আমি কথা বলতেও শুরি করি নি য়ি হ্যাং-এর সাথে, রু জি মারপিট করতে লেগে গেলো য়ি হ্যাং-এর সাথে, আর আমি ওকে আটকাতে পারলাম না … মিন হুয়ে, এই পুরো ব্যাপারটায় আমি খুব ভালো কাজ করি নি, আমার রু জিকে এখানে নিয়ে আসাই উচিৎ হয় নি। তবে তুমি দুশ্চিন্তা কোরো না মোটেই, রু জির অন্য কোনো ইচ্ছে নেই, ও খুবই ভালো মানুষ, ও শুধু আমার হয়ে লড়াই করতে চায়।”

“না, আমি খুব বেশি কিছু ভাবছি না।” মিন হুয়ে নরম হয়ে বললো, “তুমি কী ক্লান্ত? তুমি কী খানিক ক্ষণ শুয়ে নেবে?”

“না। আমি অনেক ভালো আছি। আমি একটা বাসাও খুঁজছি। এখন আমার হাতে দুটো অ্যাপার্টমেন্ট আছে - দুটোই শহরের দক্ষিণে, এখান থেকে অনেক দূরে। আমি … শিগগির চলে যাবো।”

ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে ঝি ঝু হাঁপাতে হাঁপাতেই অনেক কথা বলে গেলো মিন হুয়ের হাত ধরে রেখে, উত্তেজনায় লাল হয়ে।

মিন হুয়ের নজরে পড়লো ঝি ঝুয়ের কব্জির ওপরে একটা গোল লাল দাগ। আস্তে আস্তে বোঝাতে লাগলো ঝি ঝুকে মিন হুয়ে, “ঠিক আছে। সব ঠিক আছে। তোমাকে অতো দূরে যেতে হবে না। তুমি যদি কাছাকাছি থাকো, তাহলে আমরাও আসতে পারবো, তোমার কিছু লাগলে সেটা দেখতে পারবো। যা হোক, এ জায়গাটা হাসপাতালের কাছেও বটে।”

ঝি ঝুয়ের চোখ লাল হয়ে উঠলো, “শিয়া শিয়া নিয়া, মিন হুয়ে।”

“ভুল -ভাল কিছু করবে না। এখনো তোমার মা-বাবা বেঁচে আছেন।”

“হ্যাঁ,” ঝি ঝুয়ের গলা বুজে এলো, “করবো না।”

সেই রাতে মিন হুয়ের ঘুম হয় নি, সারা রাত ঝৌ রু জিও বিছানায় ছটফট করেছে।

সকালের শুরুতেই জানলার বাইরে ভোরের আলো দেখে মিন হুয়ে নরম স্বরে জানতে চাইলো, “রু জি, তুমি এখনো ঝি ঝুকে ভালোবাসো, তাই না?”

ঝৌ রু জি উত্তর দিলো না।

“চলো ডিভোর্স করি।” বললো মিন হুয়ে।

"কেনো?” উঠে বসে পড়লো ঝৌ রু জি, “আমি তো শুধু ঝি ঝুয়ের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছি।”

“ও যে ভাবে তোমার দিকে তাকায় … তাতে আমার মনে হয়” অন্ধকারে মিন হুয়ে তাকালো ঝৌ রু জির দিকে, “আমি তোমাকে যথেষ্ট ভালোবাসি না।”

  • - যেমন, ঝি জু বেশ লেগে থাকতে পারে, ও যখন ঝৌ রু জিকে বেশিক্ষণ কাজ করতে দেখে তখনই ওর রাগ হয়, মিন হুয়ের কখনোই রাগ হয় না। মিন হুয়ের কখনো ঝৌ রু জিকে ভীষণ “দরকার” পরে নি। আর ঝৌ রু জির অস্তিত্ব তেমন স্পষ্ট নয়।

  • - যেমন মিন হুয়ে দাবা খেলতে পছন্দ করে, কিন্তু রু জির মনে হয় কেবল অবসরপ্রাপ্ত বুড়ো লোকেরা দাবা খেলতে পারে। রু জি অপেরা শুনতে পছন্দ করে, মিন হুয়ে যতোবার থিয়েটারে গেছে ঝৌ রু জির সাথে, প্রত্যেকবার ঘুমিয়ে পড়েছে।

  • - যেমন ঝৌ রু জি একটা টেক্সট মেসেজ পাঠালে তাতে অন্তত তিনটে লাইন লেখা থাকে, কিন্তু মিন হুয়ের জবাবের দৈর্ঘ্য প্রায় সময়েই তিনটে শব্দের বেশি হয় না।

  • - যেমন প্রত্যেক তারা নিজের নিজের মাসমাইনে নিজেরা বুঝে নেয়, আর প্রত্যেক মাসের শুরুতে মাইনের একটা অংশ একটা ড্রয়ারে রাখে দুজনেরই লাগে এমন সব জিনিসের বা কাজের প্রয়োজনে খরচা করার জন্য। বড়ো খরচ দুজনে আলোচনা করে নেয়।

  • - যেমন দম্পতির দিনের মূল আলোচনার বিষয় হলো যে কিভাবে দিনটা কাটাবে যাতে কোনো ডেডলাইন পেরিয়ে না যায়। কিভাবে সময়ের অভাব আর পার্থক্যকে অতিক্রম করবে যখন দুজনেই ওভারটাইম কাজ করবে। পরের দিন কাজ থেকে ফেরার পথে বাচ্চাকে কে নিয়ে আসবে। কে রাতের খাবার বানাবে। বাচ্চা অসুস্থ হলে তার রোগশয্যার পাশে কে থাকবে/

সত্যি বলতে কোনো ভুল নেই। সারা পৃথিবীর সব দম্পতি এই বয়সে এরকম ব্যাপার নিয়েই মেতে থাকে। কিছু লোক কিছু না পেলেও সারা বছর ব্যস্ত থাকে, অন্তত তারা এই পর্যন্ত তাদের “কাজের ক্ষেত্রে সফল”।

***

মিন হুয়ের জোরাজুরিতে ঝৌ রু জি বিচ্ছেদে রাজি হয়ে গেলো। খুব তাড়াতাড়ি দুজনে মিটিয়ে নিলো কাগজের কাজ। আর মিন হুয়ে কিছুই চায় নি শুধু সু ছনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব ছাড়া। সে সু ছনকে একলা বড়ো করবে এটাই তার একমাত্র শর্ত। ঝৌ রু জি জোর করে ছিলো বাচ্চার জন্য খরচা দেবে বলে। এমনকি ও চেয়ে ছিলো হাসপাতালের কল্যাণ প্রকল্পে পাওয়া বাড়ির অর্ধেক মিন হুয়েকে দিতে তাদের স্বামী-স্ত্রীর যৌথ সম্পত্তি হিসেবে। মিন হুয়ে স্থির করে নিয়ে ছিলো যে এই সম্পত্তি ও নেবে না। এই নিয়ে আলোচনা করে দুজনে অনেকটা সময় কাটিয়েছে, শেষে মিন হুয়ে বলে, “রু জি, ব্যাপারটা এতো স্পষ্ট করার কী আছে? তুমি আর আমি -আমরা কেউই কম মাইনে পাই না। আমাদের জীবনযাপণে কোনো অনটন নেই। সু ছন অসুস্থ, আর তুমি ডাক্তার। আমি অনেক সময়েই তোমার সাহায্য চেয়ে থাকি। যদি আমরা সব হিসেব নিক্তি মেপে মিটিয়ে ফেলি, তাহলে আমি ভবিষ্যতে তোমার থেকে সাহায্য নিতে আমার যে খুব লজ্জা করবে।’

আবার করে বিয়ে করার পরে ঝি ঝু আর রু জি তিয়াঁরাঁ কমিউনিটিতে এসে থাকতে শুরু করে। মিন হুয়ে আর সু ছন থাকে আইভি গার্ডেনের অ্যাপার্টমেন্টেই। মিন হুয়ে আর রু জির প্রায়ই দেখা হয় কাজের সুবাদে, বাচ্চার অসুস্থতার কারণে আর বাচ্চার নানা ধরনের স্বাস্থ্যপরীক্ষার জন্য।

কখনো মিন হুয়ে ওভার টাইম কাজ করে, বাচ্চাকে সময় মতো নিয়ে আসতে পারে না বাড়িতে। এই সময় রু জি সাহায্য করে মিন হুয়েকে, বাচ্চাকে সময় মতো বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে। মিন হুয়ে কোনো কাজে শহরের বাইরে গেলে সু ছনকে সে পাঠিয়ে দেয় হয় সাও মুয়ের বাড়ি না হলে ঝি ঝুয়ের বাড়িতে। দুজনেই খুব আনন্দের সঙ্গে মিন হুয়েকে সাহায্য করে ওর বাচ্চার দেখাশোনা করে।

মাঝে মাঝে একলা লাগে মিন হুয়ের। তা বাদে খুব তাড়াতাড়ি মিন হুয়ে মানিয়ে নেয় একক মায়ের জীবনের সাথে। 



ঝৌ রু জি বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার পরে, খুব অখুশি হয়ে ছিলো সু ছন। 

এটা মিন হুয়ে আশা করে নি, ওর কোনো মানসিক প্রস্তুতিও ছিলো না এই অবস্থাটার জন্য।

যখন সু ছন টের পেলো যে ঝৌ রু জি চলে গেছে বাড়ি ছেড়ে, ও খুব চীৎকার করে কাঁদতো, উদ্ভট স্বরে চেঁচামেচি করতো আর রোজ বাবাকে দেখার জন্য বায়না করতো। মিন হুয়ে আশা করে নি যে সু ছনের এতো টান থাকবে ঝৌ রু জির প্রতি। যখনই ঝৌ রু জি দেখা করতে আসতো সু ছনের সাথে, তখনও ও এতো খুশি হতো যেনো কোনো উৎসব লেগেছে, জাপ্টে ধরতো রু জির উরু, কিছুতেই ছাড়তে চাইতো না, কিছুতেই যেতে দিতে চাইতো না রু জিকে। এমনকি রু জির সঙ্গে বাথরুমে অবধি যেতো যাতে এক মূহুর্তের জন্য রু জির কাছছাড়া না হয়। 

রু জিকে নতুন নতুন কায়দা ঠাউরাতে হতো পালাবার জন্য।

দুজনের কারুরই মা কিংবা বাবা হবার অভিজ্ঞতা ছিলো না। দুজনেই হাক্লান্ত হয়ে থাকতো কাজ থেকে ফিরে আর বাচ্চার অসুখ নিয়ে। 

সাধারণত সু ছন চুপচাপ বসে লেগো নিয়ে খেলতো। ও বলতেও পারতো না ওর কাছে কে আছে।

অপ্রত্যাশিতভাবে, ডিভোর্সে সব চেয়ে আহত হয়ে ছিলো বাচ্চা। মিন হুয়ের অনুতাপের শেষ ছিলো না। তার কেবলই মনে হয়েছে যে ঝৌ রু জি সু ছনের জনক নয়, আর কাজের দিনে ঝৌ রু জি অনেকটা সময় বাড়ির বাইরেই থাকে, সেই জন্য বাচ্চা আর বাবার মধ্যে নিশ্চয়ই খুব জোরালো সম্পর্ক হবে না। কিন্তু একটা কথা তার নজর এড়িয়ে গিয়ে ছিলো। জন্মের প্রথম দিন থেকে সু ছন ঝৌ রু জিকে পাশে পেয়েছে, আন্তরিক উৎসাহের সঙ্গে বাবার ভূমিকা পালন করেছে ঝৌ রু জি। পাউডার দুধ খাইয়ে, ডাইপার বদলে, কথা বলতে শিখিয়ে, খেলার সময় সঙ্গ দিয়ে, খেলতে নিয়ে গিয়ে … রু জি, মিন হুয়ের মতোই সি ছনের সব চেয়ে কাছের লোক। 

“মা, তুমি আমার বাবাকে তাড়িয়ে দিলে কেনো?”

যদি ও ঝৌ রু জিকে একটানা এক সপ্তাহ দেখতে না পায় তো, সু ছন কেঁদে ভাসাবে, ঘুমোতে যাবে না কিছুতেই, “আমার বাবাকে চাই! আমি বাবার সঙ্গে ঘুমোব।”

মিন হুয়ের দিনে এক ঘন্টা যায় ওকে ভোলাতে। গল্প বলে, গান শুনিয়ে, মনোযোগ সরিয়ে নিয়ে গিয়ে, তবে সু ছন ঘুমিয়ে পড়ে জল ভরা চোখে।




~~~~~~~~~~~~

সম্পূর্ণ বই বিনামূল্যে : https://dl.bookfunnel.com/lcj5vznt96

Link to Previous Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/08/jpda-chapter-24.html

Link to following Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/09/jpda-chapter-26.html

Friday, August 30, 2024

JPDA - Chapter 24

২৪. বেগুনি পুঁতি

 


ঠেলা দিয়ে দরজাটা খুলতেই নজরে এলো ইয়াও ঝি ঝু খালি পায়ে একটা সোফার ওপরে দাঁড়িয়ে আছে, হাত বাড়িয়ে দেওয়াল থেকে একটা অয়েল পেন্টিং পাড়ছে। হয়তো শরীরের ভারসাম্য রাখার তাগিদে পুরো মানুষটা দেওয়ালের গায়ে লেপ্টে আছে। ঘরের মধ্যে ঢুকেই মিন হুয়ের নজরে পড়লো মানুষটার চেহারাটার এক পাশ। সোজা নাকের হাড়, ছোট্টো নাকের ডগা, নিচু করে বেধে রাখা খোঁপা, কয়েকগোছা উস্কো খুস্কো চুল আলসের মতো ঝুলে আছে ঘাড়ে, রাজহাঁসের মতো সরু, মার্জিত ঘাড়টাকে আরো স্পষ্ট করে তুলেছে। 

যে সব পেরেক থেকে পেইন্টিংগুলো ঝুলছিলো, সেগুলো অনেক উঁচুতে। সে অনেকবার চেষ্টা করেও পুরো ছবিটা দেওয়াল থেকে টেনে নামাতে পারলো না। তার কপাল থেকে টপটপ করে ঘাম ঝরে পড়ছিলো আর সে সামান্য বেদম হয়ে পড়ে ছিলো।

মিন হুয়ে পাশ থেকে দেখছিলো, একটু যেনো ঘোর লেগে গেলো।

ঝি ঝু এতো সুন্দরী যে মেয়েরাও তার সঙ্গে ভাব করতে চাইবে। প্রত্যেকটা চলন যেনো নাচের মুদ্রা, এমনকি আলসে চেহারাটা জুড়ে ছড়িয়ে আছে যৌন মাদকতা। হঠাৎ মিন হুয়ের মনে পড়ে গেলো ঝৌ রু জির পড়ার ঘরের কাচের আলমারিতে রাখা একটা এসএলআর ক্যামেরা আর কয়েকটা ভীষণ দামী লেন্সের কথা। এরকম বৌ থাকলে বরের ছবি তোলার শখ হওয়াটাই স্বাভাবিক, না হলে বউয়ের সৌন্দর্যের যথেষ্ট কদর করা হবে না।

অনেক সময় লাগলো মিন হুয়ের নজরে আসতে যে একটা লোকের সোফার কোণে উবু হয়ে বসে আছে, দেওয়াল থেকে নামিয়ে আনা অনেকগুলো ফোটোফ্রেমকে গুছিয়ে রাখছে। যখন লোকটা শুনতে পেলো যে ঘরে কেউ ঢুকেছে, তখন মাথা তুলে বললো, “নি হাও!”

লোকটার চেহারা দেখে তাকে মোটেই সুদর্শন বলা চলে না, তবে মোটের ওপর দেখতে ভালো। বিশেষ লম্বা-চওড়া নয়, ফর্সা মুখ, কোঁকড়া চুল, চোখ কোঁচকানো যেনো জেগে উঠতে পারছে না, ঠোঁটের কোণগুলো সামান্য ওঠানো। প্রাণবন্ত। বয়স তিরিশের শুরুতে বলেই মনে হয়। তার হাবভাব শিল্পীসুলভ, ইয়াও ঝি ঝুয়ের মেজাজের সাথে বেশ মানানসই।

চারজনে একে একে নিজেদের পরিচয় দিলো।

“এ হলো শিয়া য়ি হ্যাং, আমার নান ফঙিয়ো।”

ইয়াও ঝি ঝু সোফা থেকে লাফিয়ে নেমে এসে মিন হুয়ের হাত ধরে উদার আন্তরিকতায় ঝাঁকুনি দিলো, “আমি শুনেছি তোমরা বিয়ে করছো। অভিনন্দন।”

মিন হুয়ে এরকম পরিস্থিতিতে অভ্যস্ত নয়, তার মুখখানা হালকা লাল হয়ে উঠলো। একটা হালকা হাসি দিয়েই উত্তর সেরে ফেললো।

“আজ রেজিস্ট্রেশন।” আনন্দের স্বর ঝৌ রু জির গলায়, “দেখা গেলো যে আমি ভুল রঙের শার্ট পরেছি। মিন হুয়ে আমাকে বললো জামাটা বদলে নিতে।”

“তোমার সাদা পরা উচিৎ। ভুলে গেছো?” ইয়াও ঝি ঝু তাকালো ঝৌ রু জির দিকে, তারপরে মিন হুয়ের দিকে, নরম চোখে, হঠাৎ কী যেনো মনে পড়ে গেলো, ঝুঁকে ব্যাগের থেকে একটা লাল রঙের খাম বার করলো, “বিয়ে সুখের হোক! আমি চাই তোমাদের জীবন প্রেম, প্রীতি আর সৌন্দর্যে ভরে উঠুক।”

হংবাও অথবা লাল রঙের খাম

“আমরা একটা উপহারও কিনেছি তোমাদেরে দেবো বলে। আশা করি, তোমাদের পছন্দ হবে। আমি কাল দিয়ে যাবো।” বললো শিয়া য়ি হ্যাং।

মিন হুয়ে ফুলে ওঠা লাল খামটার দিকে তাকিয়ে ফিরিয়ে দিলো, “আরে, হংবাও-এর আবার কী দরকার? এতো লৌকিকতার কী আছে!”

“রু জি, আমি কী খুশি হয়েছি। আগের দিন যখন দেখা হলো, তখন তুমি বললে তোমার কোনো সম্পর্কই নেই। আর এক সপ্তাহের মধ্যে তুমি বিয়ে করতে যাচ্ছো?”

শিয়া য়ি হ্যাং একটা ঠাট্টার ঘুষি মারলেন ঝৌ রু জিকে, বললেন, “মিন শওজিয়ে কী আকাশ থেকে পড়লেন?”

“হ্যাঁ … সঙ্গে বাচ্চাও আছে।” ঝৌ রু জি খুব অহঙ্কার দেখিয়ে জড়িয়ে ধরলো মিন হুয়েকে, “তাড়াতাড়ি করো।”

ঝৌ রু জি যখন এটা বললো, তখন ইয়াও ঝি ঝু একটা লাল খাম গুঁজে দিচ্ছিলো মিন হুয়ের হাতে, মিন হুয়ের শরীর থরথরিয়ে কেঁপে উঠলো, মিন হুয়ে কিছুতেই আটকাতে পারলো না, “মানুষে মানুষে কতো তফাত, মিন হুয়ে। আমার সঙ্গে যখন ছিলো ঝৌ রু জি, তখন ও কিছুতেই বাচ্চা নিতে রাজি ছিলো না। বলতো চল্লিশের পর ভেবে দেখবে, আর তোমার সঙ্গে এখনই -”

“- - প্ল্যানে ছিলো না এটা।” কাঁধ ঝাড়া দিলো ঝৌ রু জি।

মিন হুয়ে ভেবে পেলো না কী উত্তর দেবে ইয়াও ঝি ঝুয়ের অভিব্যক্তির। কেবল খিলখিল করে হাসলো একটু। 

চিনে সমাজজীবনে বেগুনী রঙের তাৎপর্য -১


চিনে সমাজজীবনে বেগুনী রঙের তাৎপর্য -২


চিনে সমাজজীবনে বেগুনী রঙের তাৎপর্য -৩


দুজনকে অস্বস্তিতে দেখে ইয়াও ঝি ঝু আর কথা বাড়ালো না। চটপট প্রসঙ্গ বদলে ফেললো, “বিয়ের উৎসবটা কবে?”

“কয়েকজন বন্ধুকে হুইডং হোটেলে খেতে ডাকবো। আজ বিকেলে সময়টা আর কোথায় সে সব জানাবো। তোমাদের দুজনকেই আসতে হবে কিন্তু।”

“অবশ্যই।” শিয়া য়ি হ্যাং খুব গুরুত্ব দিকে করমর্দন করলো ঝৌ রু জির সাথে, “আমি নিশ্চয়ই আসবো। অভিনন্দন।”

“আচ্ছা, পেইন্টিংগুলো সব বাধা হয়ে গেছে। এই যে চাবিটা। তোমাকে দিয়ে দিলাম।”

ইয়াও ঝি ঝু চাবির রিং থেকে চাবিটা বার করে নিয়ে দিয়ে দিলো মিন হুয়েকে। 

“আচ্ছা, আচ্ছা,” মিন হুয়ের বেশ ভালো লেগে গেলো ইয়াও ঝি ঝুকে। ওর মনে হলো যে ঝি ঝু বেশ নরম মনের মানুষ, “আমি শুনেছি যে আপনি সবে একটা বড়ো বাড়ি নিয়েছেন।”

“হ্যাঁ, আপনার প্রতিবেশীই বলতে পারেন।”

“হুহ্‌!”

“জি আপনাকে বলে নি বোধ হয়, আমরা আমরা তো বত্রিশ তলায় থাকি, আর তিনটে তলা ওপরে।”

ঝৌ রু জি জামা বদলাতে গিয়ে ছিলো। কথাটা কানে যেতে ভারি বিব্রত হয়ে পড়লো।

আইভি গার্ডেনের পেন্টহাউস অ্যাপার্টমেন্ট এলাকাতে সব থেকে দামী অ্যাপার্টমেন্টগুলোর মধ্যে পড়ে। চারটে শোবার ঘর, দুটো বসার ঘর, তিনটে স্নানের ঘর, দুশো স্কোয়ার মিটারের বেশি, দাম প্রায় এক কোটি পঞ্চাশ লাখ য়ুআঁ। মিন হুয়ে জানে কারণ যখন ও প্রথম বিনচেং-এ এসে ছিলো, তখন কোম্পানির একজন মহিলা এক্সেকিউটিভ এই কমিউনিটির সব থেকে ওপরের তলায় থাকতেন। তিনি আসবাব কেনার পরে সবাইকে ছবি পাঠিয়ে ছিলেন, ছবিগুলো মিন হুয়ের ওপরে গভীর প্রভাব ফেলে ছিলো।

“মিন হুয়ে, আমাকে ভুল বুঝো না -”

ইয়াও ঝি ঝু চটপট ব্যাখ্যা দিলো, “আমি বাড়িটা নিতে চেয়ে ছিলাম অনেক দিন আগেই। তখন মালিকের বেচার তাড়া ছিলো, দামটা কুড়ি লাখের মতো কমিয়ে দিয়ে ছিলো। রু জি ডাউন পেমেন্টও করে দিয়ে ছিলো। আমি ভাবি নি যে সারাই-এর কাজ এতো তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। তারপর আমরা আলাদা হয়ে গেলাম। কিন্তু বাড়িটা আমার খুব পছন্দ। আমার মোটেই বাড়িটা বিক্রি করার ইচ্ছে ছিলো না। রু জিও খুব ভালো মানুষ। ও বলে ছিলো যে ও অপেক্ষা করবে পাকাপাকিভাবে হাতবদলের জন্য যতোদিন না আমি ডাউনপেমেন্টটা দিতে পারছি। আমি ওখানে কখনো বাস করি নি। এ বছরে য়ি হ্যাং-এর সাথে সম্পর্ক হবার পরে, য়ি হ্যাং আমাকে সাহায্য করলো ডাউনপেমেন্ট-এর ধারটা শোধ করে দিতে। সম্পত্তিটার আইনি অধিকার গত মাসে হাতবদল হয়েছে। আমরা সবে সারাই আর গোছগাছ শুরু করেছি। কিছু মনে কোরো না, রু জি আর আমি - আমরা এখনো ভালো বন্ধু। য়ি হ্যাং আগে থেকেই সহকর্মী ছিলো, আমরা অনেক সময় একসাথে আড্ডা মারি।”

“ঠিক আছে, আমি কিচ্ছু মনে করি নি।” বললো মিন হুয়ে।

“আমাদের রেজিস্টার করতে হবে।” ঘড়ির দিকে তাকালো ঝৌ রু জি, “শনিবারে দেখা হবে।”

“বাড়িটা গুছিয়ে দিয়ে আমরা চলে যাবো। এলোমেলো করে ফেলেছি সব, বড্ডো খারাপ লাগছে।” 

একটা ন্যাতা কুড়িয়ে নিয়ে ইয়াও ঝি ঝু সোফাটা মুছতে লাগলো। মুছে দিতে লাগলো ওর পায়ের ছাপ সোফাটার ওপর থেকে।

“তোমাকে গোছাতে হবে না। শুধু ছবিগুলো নিয়ে গেলেই হবে। ভুলে যেও না, শোবার ঘরে আরেকটা ছবি আছে।”

“ঠিক আছে।”

চারজনে পরস্পরকে বিদায় জানালো। ঝৌ রু জি মিন হুয়ের হাত ধরে তড়তড়িয়ে চলে গেলো এলিভেটরে চড়ে।

গাড়িতে মিন হুয়ে ঠাট্টা করলো, “রু জি, তোমরা দুজন বেশ মজার। তোমরা একটা অতো বড়ো বাড়ি কিনলে, তাহলে ছাড়াছাড়ি করলে কেনো?”

“ওর ইচ্ছে, দমকা আবেগে কেনা।”

“আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে … তবুও কেনো ওর সাথে একই বাড়ির নিচের তলায় থাকো? একবার ওপরে উঠে আর আরেকবার নিচে নেমে দেখা করতে অসুবিধে হয় না?”

“ও ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছে। আমি না, আমি নয় … তুমি কী এখনো ফিরে যেতে চাও?”

“...”

“আমি জানতাম না যে বছর ঘুরতে না ঘুরতে ও প্রেমে পড়বে শিয়া য়ি হ্যাং-এর।”

“ও-ও সার্জেন?”

“প্ল্যাস্টিক সার্জেন। ওদের পুরো পরিবারের সবাই একই কাজ করে। ওর বাবা বিনচেং-এ অনেকগুলো ক্লিনিক খুলেছেন। বেইজিং-এও। সাংঘাইতে শাখা আছে। শুনেছো নিশ্চয়ই ‘ফেঙ্গ্যি জিয়ামেই প্লাস্টিক সার্জারি’-র নাম?”

“আমি শুনেছি অনেক মুভিস্টার প্ল্যাস্টিক সার্জারির জন্য ওখানে যায়।”

“হ্যাঁ। সত্যি বলতে কী শিয়া য়ি হ্যাং ভালো ডাক্তার আর খুব মজার মানুষ। ওর বাড়িতে যা টাকা আছে, তাতে ও যদি সারাদিন ঘুমিয়েও কাটায়, তাতেও ওর টাকাই টাকা রোজগার করে আনবে। আমাদের মতো মাসমাইনের লোকেদের মতো নয়, যাদের রোজগার তুলনামূলকভাবে বেশি, কিন্তু আমাদের উত্তরপশ্চিমের হাওয়া খেয়ে কাটাতে হবে যদি আমরা শুয়ে বসে থাকি।”

“তুমি কী শিয়া য়ি হ্যাং-কে খুব ভালো করে চেনো?”

“আগে ও একটা হাসপাতালে কাজ করতো। ওর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ার পর থেকে ও কাজ ছেড়ে দেয় বাবার ক্লিনিকে বাবাকে সাহায্য করবে বলে। আমিই ঝি ঝুকে ওর সাথে আলাপ করিয়ে দিয়ে ছিলাম। ওর নাচের দলের এক বন্ধু মুখের কিছু সূক্ষ্ম বদল করতে চাই ছিলো, সেই জন্যই আর কি। তারপর যাতায়াত বাড়তে, চেনাশোনাও বাড়লো। সব মিলিয়ে ঘটে গেছে আর কী।”

“ওরা তো সবাইকে জানিয়েও প্রেম করছে। তাহলে একসাথে থাকছে না কেনো, অন্য কোথাও?”

“আমি অন্য জায়গায় চলে যাবো ভেবে ছিলাম। কিন্তু আমি একটাও ঠিকঠাক বাসা খুঁজে পাই নি। প্রথমত, এখানকার পরিবেশটা ভালো। ব্যবস্থাপত্রও ভালো, এটা হাসপাতেলের কাছেও। দ্বিতীয়ত, ও এখানে থাকে না। আরেকটা ব্যাপার হলো যে আমি রোজ ওদের সাথে দেখা করতে চাই যাতে আমাকে দেখলে অন্তত ওরা একটা কথা ভাবে ‘ডাউন পেমেন্টের টাকাটা দেওয়া হয় নি।’ টাকাটা আমার নিজের নয়। আমার মা-বাবার টাকা।”

মিন হুয়ে ‘ফিচ’ করে একটা শব্দ করে হাসলো, “ও তুমি এখানে আছো শুধু টাকার জন্য?”

“হ্যাঁ।” ঝৌ রু জি বললো, “আমরা হাসপাতালে বড়ো বাড়িটা পেলেই এখান থেকে চলে যাবো। তোমার যদি অসুবিধে লাগে, তাহলে তুমি এখনই একটা বাসা দেখো, আস্তে আস্তে সেখানে চলে যাওয়া যাবে।”

“তাহলে এখনই এখান থেকে চলে গিয়ে কাজ নেই। আমি এসব ঝামেলার ব্যাপারে খুব অলস।”

মিন হুয়ে আশা করে নি যে পরের চার বছরেও ওর আলস্য কাটবে না। তার ছেলে সু ছন জন্মানোর পরেও আলস্য কাটে নি, ঝৌ রু জির সঙ্গে বিয়ে ভেঙে ফেলার পরেও আলস্য কাটে নি, মিন হুয়ে হাসপাতালের বড়ো বাড়িতে কোনো দিনই থাকে নি। এমন নয় যে ওর থাকার সুযোগ ঘটে নি, কিন্তু বিনচেং ইউনিভার্সিটি থেকে অনেকটা দূরে তিয়াঁরাঁ কমিউনিটি। ইউনিভার্সিটির হাসপাতাল যেখানে সেখান থেকে সাতটা বাসস্টপ পরে। গাড়িতে গেলে মোটেই দূর নয়। কিন্তু রাস্তার এই অংশটার দুর্নাম শহরের সবথেকে ভিড় এলাকা বলে। সেই জন্য কাজে যাতায়াতের জন্য সুবিধের নয়। তার ওপর সু ছন জন্মেছে জন্মগত মিট্রাল ভালভ ইন্‌সাফিসিয়েন্সি সেন্ট্রাল কোয়ান্টিটেটিভ রিফ্লাক্স নিয়ে। ওর বয়স খুব কম আর ওর শরীরে কোনো লক্ষণও দেখা যাই নি বলে, ডাক্তার তাড়াতাড়ি করে সার্জারি করতে বারণ করেছেন। বলেছেন, ওর একটু বেড়ে ওঠার জন্য অপেক্ষা করতে।

বাচ্চা অসুস্থ বলে মিন হুয়ে খুব দুশ্চিন্তায় থাকে আর কোনো বয়স্ক মানুষও নেই যে ওকে সাহায্য করতে পারে। সেই জন্য কাজের বেশিরভাগটাই ও বাড়ি থেকে করে। ভাগ্য ভালো যে ঝৌ রু জি ডাক্তার। তাই সু ছনের অবস্থা কোনো সময়ে বিপজ্জনক নাকি সেটা যে কোনো অসুস্থতার শুরুতেই ধরা পড়ে যায়। চট করে স্থির করা যায় যে ওকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে নাকি তার দরকার নেই। তার সঙ্গে, বিনচেং ইউনিভার্সিটির আওতায় যে কিন্ডারগার্টেনটা, সেটা শহরের সেরা কিন্ডারগার্টেনগুলোর একটা। কিন্ডারগার্টেনটা ইউনিভার্সিটির পুবদিকের গেটের গায়ে। সেই জন্য কিন্ডারগার্টেনটা বা’অ্যান টেকনোলজির আপিসের খুব কাছাকাছি। কেবলমাত্র ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও কর্মীদের বাচ্চারাই ঐ কিন্ডারগার্টেনে পড়তে পারে। কাজে যাতায়াতের অসুবিধে আর বাচ্চাকে ইস্কুলে দেবার-নেবার সমস্যার জন্য ঝৌ রু জি যে আবাসন পেয়ে ছিলো সেটা ভাড়া দিয়ে দিয়ে ছিলো। তাতে আইভি গার্ডেনের বাসার যে ভাড়া সেটার খানিকটা পূরণ হয়ে যায়।

প্রথম তিন বছর তিন জনের পরিবারটা ব্যস্ত কিন্তু শান্তিপূর্ণ জীবন যাপণ করলো। ঝৌ রু জি আর মিন হুয়ে দুজনেই তাদের নিজের নিজের কাজের জায়গায় প্রায় মেরুদন্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দুজনেই সারাদিন নিজের নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। রাতে ঘুমোতে যাবার সময় ছাড়া প্রায় কেউ কারুর সাথে কথাই বলে না। বাচ্চাও এতো ছোটো যে বাইরে গিয়ে মুভি দেখার বা কারাওকে গাইতে যাবার বা বেড়াতে যাবার ব্যাপার নেই। ফাঁকা সময়ের অধিকাংশটাই তারা পার্কে যায় বা রেস্টুরেন্টে বা সু ছনের প্রিয় খেলার মাঠে যাতে সে খেলতে পারে।

সু ছন সুন্দর দেখতে আর লাজুক। শান্ত, মনোযোগী, লেগো নিয়ে খেলতে ভালোবাসে, ভালোবাসে “লিটল্‌ আইনস্টাইন” দেখতে। ও কথা বলতে শুরু করেছে অনেক দেরিতে। ঝৌ রু জি সন্দেহ করছিলো বুঝি ওর অটিসম আছে। অনেক পরীক্ষা করিয়ে দেখা গেছে যে সু ছনের বোধবুদ্ধি একদম স্বাভাবিক। খানিক সময় কেটে যেতে, সু ছন হঠাতই কথা বলতে শুরু করে। শুরু করে একটা আস্ত বাক্য বলে। তারপরে বেশ কিছুদিন খুব বকবক করতো ……

মিন হুয়ে কোনো দিন ঝৌ রু জিকে বলে নি যে পৃথিবীতে তার কাছের লোক দুজনঃ একজন মৃত সু তিয়াঁ আর অন্য জন সু ছনের জনক শিন ছি। মিন হুয়ে প্রায়ই ওদের কথা ভাবে। স্বপ্নে দেখে ওদের, এমনকি কখনো কখনো ঘোরের মধ্যে শুনতে পায় যে ওরা দুজনে কথা বলছে। 

এসবের থেকে ওর কেবলই মনে পড়ে যায় যে একদম না চাইতেই ওর প্রাপ্তির মূল্য কতোটা আর ও কী ধ্বংস করেছে।

ওর কেবল মনে হয় যে ওর কোনো ঋণ নেই। ও কেবল আরো একটু ভালো করে বেঁচে থাকতে পারে। 

সু ছনের কথা ভাবলেই, মনের গভীরে, র নিজের দুটো সত্তা যেনো একটা সাদা কুয়াশা দিয়ে আলাদা হয়ে যায়, যাতে দুই সত্তা যেনো পরস্পরকে স্পষ্ট দেখতে না পায়। এই ঠান্ডা স্বভাবের ছেলেটা যেনো সু তিয়াঁর পাঠানো চর, চুপচাপ দেখতে থাকে মিন হুয়েকে। ও মিন হুয়েকে ‘মা’ বলে ডাকে, কিন্তু সেই ডাকে যেনো কেমন একটা ব্যাখ্যাতীত বৈরাগ্য আছে।



সু ছন তো সু তিয়াঁ আর শিন ছির সন্তান, মিন হুয়ে কেবল ধারক, বাহক, বাইরের শরীরি আধার মাত্র। মিন হুয়ের মাঝে মধ্যে অপরাধী লাগে যে ঝৌ রু জিকে এতো জটিলতার মধ্যে জড়ানো উচিৎ হয় নি। মিন হুয়ে এখনো বুঝে উঠতে পারেনি যে ঝৌ রু জিকে একটা অজানা অভিযোগের আবর্তে এনে ফেলেছে নাকি একটা অভিসম্পাতের ফাঁদে ফেলেছে।

সু ছনকে আপন সন্তানের মতোই দেখে ঝৌ রু জি। প্রথম ডাইপার থেকে সে বাবার ভূমিকা পালন করে চলেছে মনের খুশিতে। মিন হুয়ে আর ঝৌ রু জি - এই দুজনের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তানের সম্ভাবনা অনেক দিন হলো লোপ পেয়েছে।

সু তিয়াঁর ডায়েরিটাকে একটা ই-বুক বানিয়ে নিয়েছে মিন হুয়ে, রেখে দিয়েছে নিজের মোবাইল ফোনে, সময় পেলেই খুলে পড়তে থাকে। ডাইরিটার সাথে মিন হুয়ে এতোই সড়গড় হয়ে উঠেছে যে প্রায় প্রত্যেক অনুচ্ছেদ তার মনে খোদাই হয়ে আছে।

“শিন ছি বললো, আমি ওরই। ও যেনো তেনো উপায়ে আমাকে ভোলানোর চেষ্টা করবে না কখনোই, ও যে আমাকে ভালোবাসে সে কথাটা সারা পৃথিবীকে জানানোর কথা তো বাদই থাক। আমরা একে অপরের, আমাদের ঝগড়া করারও দরকার নেই, আমাদের বদলানোরও দরকার নেই, আমাদের কিচ্ছু প্রমাণ করার নেই, আমার যদি ওকে কখনো দরকার পড়ে, তবে একবার একটামাত্র বাক্যে বললেই হবে, ও হাজার হাজার পাহাড় আর নদী পেরিয়ে আমার কাছে চলে আসবে।” - - সু তিয়াঁর ডায়েরি।

 ***

হেমন্তে যখন সু ছন কিন্ডারগার্টেনে যেতে শুরু করলো, তবে মিন হুয়ে সারা দিনের জন্য কাজে যাওয়া শুরু করতে পারলো। ততো দিনে মিন হুয়ে বা’অ্যান টেকনোলজিতে আর অ্যান্ড ডি -এর ডিরেক্টর হয়ে গেছে। কোম্পানিও তিরিশ জনের একটু বেশি থেকে বেড়ে একশো জনের বেশি কর্মী রেখেছে। সব থেকে সামনের সারিতে থাকা প্রোডাক্ট MIST বাজারে নিজের জায়গা পাকা করে ফেলেছে। স্ব-উদ্ভাবিত স্তনের ক্যান্সারের প্যাথোলজিক্যাল ইমেজ অ্যানালিসিস সিস্টেম আর বুকের এবং ফুসফুসের ইন্টেলিজেন্ট ইমেজ ডায়াগনোসিস সিস্টেম - দুটোই ক্লিনিক্যাল টেস্টিং-এর পর্যায়ে, আর এ দুটোই চিনের কয়েক ডজন শীর্ষস্থানীয় শাখাবহুল হাসপাতালের সাথে সহায়তার সম্পর্ক তৈরি করে ফেলেছে। এ সবের সাথে কোম্পানি একটা ক্লাউড নির্ভর CAD প্রোডাক্টও বানাচ্ছে যার লক্ষ্য হলো যে হাসপাতালগুলোর মধ্যে তথ্যের, কর্মীর এবং যন্ত্রপাতির আদানপ্রদানের একটা সংস্কৃতি তৈরি করা যাতে তৃণমূল স্তরের চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো যেগুলো দূর্গম দূরত্বে কাজ করে, সেগুলো তাদের অবস্থান থেকে চিকিৎসা সংক্রান্ত সব সাহায্যই পেতে পারে যে কোনো শহরের যে কোনো বড়ো হাসপাতালের শাখা হাসপাতালের মতোই, ক্লাউডভিত্তিক প্রোডাক্টের মাধ্যমে, যখন কঠিন এবং নানা রকমের রোগের চিকিৎসা করতে হবে, তখন।

মিন হুয়ে আগাপাশতলা ইঞ্জিনিয়ার। যখনই সে কাজে মন দেয় তখনই সে একটা আত্মবিস্মৃত অবস্থায় চলে যায়, চারপাশের মানুষজনের পরিস্থিতি এবং সম্পর্কের কোনো পরিবর্তনের আওয়াজই আর ওর কানে ঢোকে না। একটার পর একটা ডেডলাইনে বেদম হয়ে রাতের পর রাত জেগে কাটানো ওর স্বাভাবিক অভ্যেসের মতো। ঝৌ রু জির কোনো অভিযোগ নেই, কারণ তারও পদোন্নতি ঘটেছে, সেও অনকোলজি বিভাগের ডাইরেক্টর হয়েছে এবং প্রায়ই লাগাতার অপরেসন করে যায়, এতো ব্যস্ত যে কখনো থামার সুযোগ পায় না।

এক দিন অবশেষে, মিন হুয়ে আর ঝৌ রু জি স্বাভাবিক সময়ে কাজের থেকে ছুটি পেলো। দুজনে একসাথে রাতের খাবার খেতে গেলো বেশ দামী রেস্টুরেন্টে। সু ছনের জন্য ছিলো তার প্রিয় ধিমে আঁচে ঝলসানো মুর্গির ডানা। 

খেতে খেতে মিন হুয়ে জানতে চাইলো, “অনেক দিন হলো ঝি ঝু বা য়ি হ্যাং-কে দেখে নি। ওরা কী চলে গেছে?”

“ওদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে।”

মিন হুয়ে চমকে উঠলো, “কবে হলো?”

“তিন চার মাস আগে।”

মিন হুয়ে আর ঝৌ রু জির বিয়ের পরে, সব সময়েই ওপরের তলার অ্যাপার্টমেন্টে ঝি ঝু আর য়ি হ্যাং থাকতো। তিন বছর কেউই বাড়ি ছেড়ে চলে যায় নি। দুটো পরিবার বেশ আনন্দের সঙ্গেই পড়শীর মতো লেনদেন করতো।

তবে খুব ঘন ঘন যাতায়াত ছিলো না। মিন হুয়ের পরিবারে প্রাপ্ত বয়স্করা ভীষণ ব্যস্ত, আর একটা বাচ্চা ছিলো, ওদের সময়ই ছিলো না অন্য কারুর জন্য। শিয়া য়ি হ্যাং আরো অনেকগুলো ক্লিনিক খুলছিলো। ও সব সময়েই ব্যবসার কাজে বাইরে থাকতো। ঝি ঝুও প্রায়ই বাড়ির বাইরে থাকতো কারণ তার নাচের দল সারা দেশের নানান জায়গায়, এমনকি পৃথিবীর নানান কোণে অনুষ্ঠান করতে যেতো। কিন্তু ছুটির সময়ে দুই পরিবার পস্পরের বাড়িতে যেতো, এলিভেটরে দেখা হলে গল্প জুড়তো, কদাচিৎ মাহ্‌ঝং-ও খেলতো, মদ খেতো, ফুটবল খেলা দেখতো, এই আরকি। মাসে বার কয়েক দেখা হয়েই যেতো।

ঝি ঝু আর য়ি হ্যাং প্রথা মতো বিয়ে করে নি। মিন হুয়ে শুনে ছিলো যে কারণটা হলো ঝি ঝু তিন বছরের বড়ো য়ি হ্যাং-এর থেকে আর ডিভোর্সি। শিয়া পরিবার অর্থাৎ য়ি হ্যাং-এর বাড়ির লোকেরা ঝি ঝুকে পুত্রবধু হিসেবে মেনে নেয় নি। ঝি ঝুও কিচ্ছুটি মনে করে নি, সারাক্ষণ য়ি হ্যাং-এর সাথে বাস করেছে।

"কেনো? সবই তো ঠিক ছিলো।”

“ঝি ঝু … ওর ব্রেস্ট ক্যানসার ধরা পড়েছে। বেশ গুরুতর অবস্থা।” বললো ঝৌ রু জি।

“সে কী! কতই বা বয়স ওর?”

অবাক হবার পালা সেরে মিন হুয়ে জানতে চাইলো, “এখন কী অবস্থা? ও কি হাসপাতালে আছে? ওকে দেখতে যেতে হবে একদিন।”

“আমিই সার্জারি করেছি।”

“ওহ্‌”

“দুটো স্তনই বাদ দিতে হয়েছে।”

“...”

“ও … ও তো খুবই সুন্দরী।”

“হ্যাঁ” ঝৌ রু জি দীর্ঘশ্বাস ফেললো।

“তাহলে শিয়া য়ি হ্যাং -”

“ও যেই শুনেছে যে ঝি ঝুয়ের স্তন বাদ দিতে হবে, ও হাওয়া হয়ে গেছে … ফিরে কখনো দেখতেও আসে নি।”

দাঁত কিড়মিড় করে উঠলো ঝৌ রু জি, “বেজন্মা!”




~~~~~~~~~~~~

সম্পূর্ণ বই বিনামূল্যে : https://dl.bookfunnel.com/lcj5vznt96

Link to Previous Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/08/jpda-chapter-23.html

Link to following Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/08/jpda-chapter-25.html

Readers Loved