Tuesday, August 27, 2024

JPDA - Chapter 21

 ২১. নাগর আমার



সাও মুয়ের বাড়ি টাউনহাউস কমিউনিটির একদম বাঁদিকে, দুটো তলার প্রত্যেকটাই একশো আশি বর্গমিটার জুড়ে ছড়ানো, চারটে শোবার ঘর, দুটো বসার ঘর, দুটো স্নানের ঘর। ঘরের সাজসজ্জায় খুবই রুচিশীলতার ছাপ।

য়িন শু একতলা, দোতলা সবই ঘুরে ঘুরে দেখালো মিন হুয়ে আর ঝৌ রু জিকে। এই প্রথমবার মিন হুয়ে কোম্পানির কোনো নেতৃস্থানীয় পদাধিকারির বাড়িতে এসেছে। মিন হুয়ে একটু জড়োসড়ো হয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু ঝৌ রু জি বেশ সড়গড় মনে হলো এরকম পরিস্থিতির সঙ্গে। সে বেশ আসবাবপত্র দেখতে লাগলো উৎসাহের সঙ্গে। মাঝে মধ্যে য়িন শুকে জিজ্ঞেস করতে লাগলো যে কোন জিনিসটা কোথা থেকে কেনা। তারপর ঝৌ রু জির উৎসাহ গিয়ে পড়লো রেফ্রিজেরাটর আর ওয়াশিং মেশিনে। জানতে চাইলো যে ওগুলো কাজ করে কেমন। য়িন শুও খুব ধৈর্য ধরে ঝৌ দু জির সব প্রশ্নের উত্তর দিলেন একে একে, যেনো কোনো দুর্মূল্য সম্পদের বিবরণ দিচ্ছেন।

“য়িন শিয়েংশঁ -”

“আমাকে য়িন শু বলে ডাকলেই হবে।”

“য়িন শু, আপনি কী টেনিস খেলতে ভালো বাসেন?”

ঝৌ রুজি খুব কৌতুহলের সঙ্গে দেওয়ালে টাঙানো একটা ছবির দিকে দেখালো। ছবিতে য়িন শুকে দেখা যাচ্ছে টেনিস র‍্যাকেট ধরে।

“হ্যাঁ আমি টেনিস খেলি। আমি তো প্রদেশের দলের হয়েও খেলেছি। তবে আমি আহত হবার পরে অবসর নিয়েছি।”

“এখন তাহলে আপনি কোথায় কাজ করেন?” জানতে চাইলো মিন হুয়ে।

“আমি একটা ক্লাবে টেনিস কোচের কাজ করেছি অনেক বছর। তারপর ছেড়ে দিয়েছি। আমাদের দুটি সন্তান। ওদের জন্য সাও মুয়ের সময় নেই একদম। সেইজন্য বাচ্চাদের দেখাশোনার কাজ আর গেরস্থালির সবটুকুর দায়িত্ব আমি নিয়েছি, যাতে সাও মু ওর ক্যারিয়ারে পুরো মনোযোগ দিতে পারে।”

য়িন শু হাসলেন, একটা ছবি হাতে নিলেন। পরনের অ্যাপ্রন থেকে আটা ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন, “মূল কারণটা হলো সাও মু আমার থেকে অনেক বেশি রোজগার করেন। যদি আমি কাজে যাই, আর ও ঘরে থাকে কাজ ছেড়ে দিয়ে, তবে আমাদের পুরো পরিবার পথে বসবে।”

মিন হুয়ে অল্প হলেও অবাক হলো। যতো পুরুষ সে এ যাবৎ দেখেছে তাদের মধ্যে কেউই স্বীকার করার সাহস দেখাবে না এ সে পুরো সময়ের জন্য বাড়িতে থাকে আর বাচ্চাদের দেখাশোনা করে। য়িন শুয়ের মতো শান্ত ভঙ্গীতে সহজে সত্যিটা স্বীকার করার ব্যাপারটা না হয় বাদই দেওয়া গেলো।

“হ্যাঁ, আপনি যদি এমন করে বলেন তো আমি একটু ভয়ই পাচ্ছি যে আমার বোধ হয় একটা বাচ্চার জন্ম দেবার সাহসই হবে না।” ঝৌ রুজি মিন হুয়ের দিকে এক ঝলক না তাকিয়ে পারলো না, “সত্যি? পরিবারে দুটো বাচ্চা থাকলে এতো ভারিক্কি ব্যাপার?”

“না, তা নয়। আমি বলছি না যে বাচ্চার জন্মের ঠিক পরেই চব্বিশ ঘন্টা বাচ্চার সঙ্গে যে ভাবে থাকতে হয় সেভাবেই বরাবর কাটে। কিন্তু যদি আমাদের এখনকার পরিস্থিতির কথা ধরি, তো আমাদের ছেলের সাঁতারের ক্লাস আছে, আঁকা শেখার ক্লাস আছে, বাস্কেট বল ক্লাস আছে, বেহালা বাজানো শেখার ক্লাস আছে, তাইকোনদো ক্লাস আছে প্রত্যেক সপ্তাহে। আবার আমার মেয়ের পিয়ানো শেখার ক্লাস, আবৃত্তি শেখার ক্লাস, জিমন্যাসটিক্স, ব্যালে, আর ব্যাডমিন্টন শেখার ক্লাস আছে। আলাদা আলাদা সময়ে, আলাদা আলাদা জায়গায়। রাতের খাওয়া হয়ে গেলে তাদেরকে পড়তে পাঠাই বাড়ির বাইরে, আবার নিয়ে আসি। রাত নটার পরে। সাও মু আসলে চেয়ে ছিলো যে ওরা দুজনে একই ক্লাসে যাক, যাতে আমার জন্য একটু সহজ হয়। কিন্তু বাচ্চাদের পছন্দ হলো না ব্যাবস্থাটা। ওদের দুজনের রুচি পছন্দ বেশ আলাদা। আর বাবা-মা হিসেবে আমরা পক্ষপাত করতে পারি না। আমাদের সন্তুষ্টি আসে না ওদের ওপর কিছু চাপিয়ে দিলে বা ওদেরকে ওদের ইচ্ছে মতো চলতে না দিলে।”

য়িন শু কথা বলা থামিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো, “কপাল ভালো আমি আজন্ম খেলাধূলো করেছি আর দৌড়ে বেড়াতে পারি। চট করে হাঁপিয়ে যাই না।”

মিন হুয়ে হেসে জিজ্ঞেস করলো, “তার মানে আপনার আর সাও জঁয়ের আলাপ হয়ে ছিলো টেনিস ক্লাবে, তাই তো?”

“তুমিও শিখতে পারো। বাড়িতে ওঁকে সাও ল্বব্যানিয়াঁ নাই বা বললে। শাও জিয়ে বোলো বরং।”

য়িন শু হাসলেন আর ওঁদের নিয়ে এলেন বসার ঘরে যাতে ওঁরা সোফাতে বসতে পারেন। দুজনকে এক গ্লাস করে তরমুজের রস খেতে দিলেন, “এই মাত্র বানিয়েছি আমি, নিজে হাতে। আরো নাও। সাও মু এখনই এসে যাবে। আমি এখনো শেষ পদ দুটো বানাচ্ছি। এখনো দশ মিনিট লাগবে ওগুলো নামাতে।”

ঝৌ রু জি তৎক্ষণাৎ বললো, “আমি কোনো কাজে লাগতে পারি?”

“হয়ে গেছে।” য়িন শু কথাটা বলেই ঘুরে রান্নাঘরে চলে গেলেন। খানিক পরে কুকিং রেঞ্জের হুড বেজে উঠলো গমগম করে। 

মিন হুয়ে চারপাশে তাকিয়ে দেখতে লাগলো। চোখ আটকে গেলো ছাদ থেকে ঝুলন্ত ঝাড়বাতিটায়। ওটা ক্রিস্টালের। দীর্ঘশ্বাস ফেললো, “বলার দরকার নেই, সাও মু জিয়ের রুচিখানা জবরদস্ত। এরকম একটা বিশাল ঝাড়বাতির দাম কতো হবে? কয়েক হাজার ডলার নিশ্চয়ই?”

“এটার দাম কয়েক হাজার ডলারের থেকে কিছু বেশি।” ঝৌ রু জি ফিসফিসিয়ে বললো, “যদিও এই এলাকাটা শহরের মাঝখান থেকে অনেক দূরে, কিন্তু ইস্কুলটা ভালো বলে, বাড়ির দাম এখানে খুব কম নয়। এরকম একটা বাড়ির দাম পড়বে নব্বই লাখ য়ুআঁর বেশি। পরিবারে একজন রোজগেরে হলে বাড়িটার জন্য ধার শুধতে বেশ চাপ হবে।”

“হতে পারে এঁদের মা-বাবা অবস্থাপন্ন। তাঁরা হয়তো ডাউন পেমেন্ট করে দিয়েছেন বা কিছু।”

“সাও মুয়ের দেশ গাঁয়ের দিকে। ওঁদের অবস্থা খুব ভালো নয়।”

“অ্যাই, ঝৌ রু জি,” মিন হুয়ে হালকা চাপড় দিলো ঝৌ রু জিকে, “আপনি এতো সব জানেন কী করে?”

“ইয়াং বেই বেই বলেছে আমাকে।”

“হতে পারে য়িন শুয়ের মা-বাবা অবস্থাপন্ন।”

“হতে পারে,” ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিলো ঝৌ রু জি, “আসবাবের দিকে দেখুন। প্রত্যেকটা এক পিস করেই তৈরি হয়েছে। এমন কী স্নানের ঘরে টয়লেট পেপার রাখার তাকটাও হাতে করে খোদাই করা।”

“আপনি আবার অন্যের বাড়িতে এসে বাথরুম দেখতে গিয়ে ছিলেন?”

“এই দেখছিলাম আর কী।” ঝৌ রু জি তরমুজের রসে একটা চুমুক লাগালো, “য়িন শু ছোটোবেলায় নিশ্চয়ই অগাধ বৈভবে বাস করেছে।”

“সেটা বুঝলেন কী করে?”

“আমি যদি ওঁর মতো সারাদিন বাড়িতে বসে থাকি কোনো কাজ না করে, তাহলে আমি কাউকে মুখ দেখাতে পারবো না। ওঁকে দেখুন, নিজেকে এতো গর্বের সঙ্গে সারাদিন বাড়িতে থাকা বাবা বলে পরিচয় দিলো, যেনো নিজেকে উইম্বলডন টেনিস চ্যাম্পিয়ন বলে পরিচয় দিচ্ছে! তিলমাত্র অস্বস্তি নেই। আচরণ নিখুঁত, পরিপাটি, মোটেই মনে হচ্ছে না যে ভান করছে। মোদ্দা কথা হলো যে ওর মাথায় পয়সা রোজগারের কোনো চিন্তা নেই।”

এই অবধি বলে স্বাভাবিক ভাবে ঝৌ রু জির হাত নেমে এলো মিন হুয়ের কাঁধে। তাকালো মিন হুয়ের দিকে। এক ঝলক দেখেই নিজের দু হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলো মিন হুয়েকে। টের পেলো মিন হুয়ের শরীর খুবই আড়ষ্ট হয়ে আছে তখনও। নিজের অজান্তেই ছেড়ে দিলো মিন হুয়েকে।

“ঝৌ রু জি, আপনি বেশ পরচর্চা করতে পারেন।”

“কেউ যদি পুরো সময়ের জন্য বাবা না হতে পারে, তবে মেয়েদের সাথে বন্ধুত্ব তো করতে পারে, তাই না?”

হাসলো খিলখিল করে, মিন হুয়ের দিকে দুষ্টুমি ভরা চোখে তাকিয়ে বললো, “আমি ভীষণ চেষ্টা করছি ব্রেস্ট ক্যান্সারের লিম্ফ নোড মেটস্ট্যাসিস নিয়ে আলোচনাটা এড়িয়ে যেতে। কিন্তু মনে হচ্ছে যে স্তন থেকে ক্যান্সারের লসিকা গ্রন্থিতে ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারটা নিয়ে কথা না বললেই নয় এবার।”

মিন হুয়ে টুক করে ব্যাগ থেকে একটা নোটবুক আর বলপয়েন্ট পেন বার করে বললো, “বেশ তাই বলুন দেখি।”

“আপনি সত্যিই জানতে চান লিম্ফ নোডে কী করে ব্রেস্ট ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ে ? এই পরিবেশে? মেজাজ নষ্ট হয়ে যাবে না তো?”

“আমি সত্যিই শুনতে চাই। এমনিতেই কয়েকদিনের মধ্যেই আমি এটা নিয়ে কাজ শুরু করতে যাচ্ছি। চিকিৎসকরা ব্যাপারটা কিভাবে দেখেন সেটা আগে থেকে জানা থাকে তাহলে ভালোই হবে। নিজে নিজে শেখার থেকে আপনার থেকে শুনে নেওয়া ভালো।”

ঝৌ রু জিকে হতাশ দেখালো।

“প্রথমে বলুন, মেটাস্ট্যাটিক ব্রেস্ট ক্যান্সার কী?”

ঝৌ রু জি নিজের নখ খোঁচাতে খোঁচাতে বললেন, “শুরুতে একটা মেটাস্ট্যাটিক টিউমর থাকে। ক্যান্সারের কোষগুলো শুরুতে যে কোষসমস্টিতে থাকে সে সব ছেড়ে শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে যেতে থাকে শরীরের সংবহনতন্ত্র দিয়ে। যার মধ্যে রক্ত ছাড়া আছে লসিকা। নতুন টিউমর তৈরি হয়। চিকিৎসকদের পক্ষে এই নতুন টিউমরগুলোকে সনাক্ত করা মুস্কিল। শুধুমাত্র প্যাথোলজিস্টের পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে - ষাট শতাংশ সম্ভাবনা রয়ে যায় ছোটো টিউমরগুলো স্লাইডে দেখাই গেলো না।”

“এই জন্যই এআই ব্যবহার করাটা জরুরি।”

“হ্যাঁ, এআই প্রযুক্তি যদি এই সুক্ষ্ম টিউমরগুলোকে ধরে দিতে পারে তাহলে ব্রেস্ট ক্যানসার শুরুতেই ধরা পড়ার হার বাড়তে পারে।”

কাজের কথা শুরু হতে ঝৌ রু জিকে কিছুতেই থামানো যায় না যেনো, “একটা কথা আপনাকে মাথায় রাখতে হবে যে চোঙ্গুয়াতে ব্রেস্ট ক্যান্সার যে সংখ্যায় হয় তা পশ্চিমের দেশগুলোর তুলনায় সংখ্যায় কম। কিন্তু যে হারে চোঙ্গুয়াতে ব্রেস্ট ক্যান্সারের সংখ্যা বাড়ছে, তা পৃথিবিতে সব চেয়ে বেশি। গত বছর, নতুন করে ব্রেস্ট ক্যান্সার হয়েছে এমন মহিলাদের সংখ্যাটা ছিলো দু লাখ সত্তর হাজার। মৃত্যুর সংখ্যা ষাট হাজারের ওপর। কুড়ি বছর বয়সের ওপরে বয়স এমন সব মহিলাদের মধ্যে ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পড়ার সংখ্যাটা ক্রমশ বেড়ে চলেছে। সব থেকে বেশি ব্রেস্ট ক্যান্সার দেখা যাচ্ছে যাদের বয়স পঞ্চান্ন বছরের আশেপাশে তাঁদের -”

মিন হুয়ে কিছুতেই আটকাতে পারলো না নিজের চোখ দুটোকে। নিজের উঁচিয়ে ওঠা স্তনের দিকে র দৃষ্টি গিয়ে পড়লো, এক মূহুর্তের জন্য হলেও।



“আপনি চাইলে আমি দেখে দিতে পারি।” ঝৌ রুজি বললো মিন হুয়ের চোখে চোখ রেখে, ঠোঁটে হালকা হাসি খেলে গেলো।

“যান দেখি।” চোখ পাকিয়ে তেড়ে ফুড়ে উঠলো মিন হুয়ে, পরের প্রশ্নের দিকে এগোতে এগোতে। এই সময়েই দরজাটা খুলে গেলো। সাও মু বাড়ির সদর পেরোলো দুটো বাচ্চার সাথে। কাউকে তাঁর চোখে পড়লো না।

প্রথম যে মানুষটার সাথে তাঁর দেখা হলো, তার গলার স্বর শোনার জন্য সাও মু যেনো ব্যাকুল, “ও গো, ‘ছিন আই দে’, অতিথিরা সবাই এসে গেছেন?”

“বসার ঘরে আছেন সব। খাবার তৈরি।” য়িন শু বললেন রান্নাঘর থেকে, “পরিবেশনের সময় এখন।”

ঝৌ রু জি আর মিন হুয়ে একে অপরের দিকে তাকালো হাসতে হাসতে। কেউই আশা করে নি যে সাও মু তার বরকে অমন অশ্লীল ভাবে ডাকবেন বাড়িতে। তবে সাও মুয়ের বাচ্চাদুটোর ওপরে চোখ পড়তে অতিথিরা সাও মুয়ের জন্য খুশি না হয়ে পারলেন না। ছেলেটা আর মেয়েটা দুজনেই খুব সুন্দর - বড়ো বড়ো চোখ, ফর্সা গায়ের রং, দুজনেরই চেহারায় আর শরীরের ধাঁচে য়িন শুয়ের ধাত পেয়েছে, সাও মুয়ের কোনো ছায়াই নেই বাচ্চাদের চেহারায়।



“আমি দুঃখিত। দশ মিনিট দেরি হয়ে গেলো আমার।” কোট ছেড়ে রেখে সাও মু এগিয়ে এলেন কথাবার্তা শুরু করার জন্য, “এই যে আমার ছেলে মেয়েরা। বড়ো, য়িন দি, সাত বছর বয়স। দ্বিতীয় জন, য়িন নিং, পাঁচ বছরে।”

দুটো বাচ্চাই খুব ছটফটে, বেশ হাসিখুশি। আইয়ে আর শুশুকে নিজেদের পরিচয় দিয়েই দৌড়ে গেলো স্নানঘরে হাত-পা ধুয়ে পরিস্কার হতে। 

সবাই খাবার ঘরে গিয়ে বসলো, চারজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ আর দুটো বাচ্চা, পাঁচটা পদ আর একটা ঝোল, মাংস আর সব্জি দিয়ে ভরপুর। এর মধ্যে একটা ছিলো ম্যান্ডারিন মাছ দিয়ে বানানো কাঠবেড়ালির মতো দেখতে মাছ ভাজা। যে ছুরির দু ধারই দাঁতালো আর দাঁতের সারি একে অপরের উল্টোদিকে হেলানো তেমন একটা ছুরি দিয়ে কাঁটা ছাড়ানো ম্যান্ডারিন মাছগুলোকে খোদাই করে কাঠবেড়ালির মতো দেখতে করা হয়েছে, টেবিলের ওপরে মাছগুলো টোম্যাটো সসে জবজবে লাল। বাকি সব কিছু বাড়িতে রাঁধা পদঃ কাঁচা লঙ্কা দিয়ে কুঁচোনো শুয়োরের মাংস, গরুর মাংসের কিমার মধ্যে বড়ো বড়ো টোফুর ঘনক দিয়ে বানানো মাপো টোফু, কুঁচোনো বাধাকপি, শুকনো বাঁশের ডগা আর বেকন, সঙ্গে একটা বিশাল পাত্রে শুকনো চিংড়ি দিয়ে টলটলে হালকা ছাঁচি কুমড়োর ঝোল।

কাঁচা লঙ্কা দিয়ে কুঁচোনো শুয়োরের মাংস

মাপো টোফু

ম্যান্ডারিন মাছ দিয়ে বানানো কাঠবেড়ালির মতো দেখতে মাছ ভাজা

Cross-cut Knife যে ছুরির দু ধারই দাঁতালো আর দাঁতের সারি একে অপরের উল্টোদিকে হেলানো


বিনচেং-এ মিন হুয়ের দিনের তিনটে খাবারই বাইরে থেকে আনানো। প্রায় কখনোই সব্জি বাজারে যায় না মিন হুয়ে। বহুকাল হয়ে গেছে বাড়িতে যত্নে বানানো খাবার খায় নি মিন হুয়ে। মিন হুয়ে খিদে আর সামলাতে পারলো না। পর পর দুবাটি ভর্তি খাবার খেয়ে ফেললো। 

যদিও সাও মুয়ের পরিবারের কর্তাটি গৃহী আর গৃহিণীটি বাড়ির বাইরে রোজগেরে, তবুও এই দম্পতির মধ্য কোনো বিশেষ বোঝাপড়া বা অস্বাচ্ছন্দ্যের আভাস মাত্র পাওয়া যায় না তাদের প্রথাগত ভূমিকা দুটো উল্টে যাওয়ায়। বরং তারা পরস্পরকে দিব্যি বোঝে। একে অপরকে চুপচাপ সাহায্য করে যায়। এতে মিন হুয়ের খানিক হিংসে হয়।

খাওয়া মিটে যেতে য়িন শু বাচ্চাদের নিয়ে দোতলায় চলে গেলেন। সাও মু সেই সময়ে অতিথিদের নিয়ে বসলেন বসার ঘরে। একথা সেকথার পর বললেন, “গত দু বছর ধরে, চিকিৎসাক্ষেত্রে এআই ব্যবহার করে এমন প্রযুক্তির বাজার বেশ গরম। তবে অনেক বুদ্বুদও আছে। হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্টারনেট, স্টার্ট-আপ কোম্পানিগুলো আর যে কোম্পানিগুলো চিকিৎসায় ব্যবহারের যন্ত্র বানায় সেগুলো - এরা সব্বাই এআই-এর প্রজেক্ট শুরু করছে। যদিও সবার নিজের নিজের লক্ষ্য আছে, তবে অনেক এমন ক্ষেত্র আছে যেগুলো এদের আলাদা কাজগুলোর অনেকগুলোতেই দেখা যায়। যদিও বা'অ্যান একটা ছোট্টো কোম্পানি, যেটা খুব পুরোনও নয়, তবুও বা'অ্যান গুরুত্ব দেয় নিপুণ কারিগরিকে। আজকে আমি হেড কোয়ার্টার্সে গিয়ে ছিলাম, বসেদের সঙ্গে কথা বলতে। ওঁরা প্রত্যেকেই মনে করেন যে বা'অ্যান এখনো এআই ইমেজ অ্যানালিসিস প্ল্যাটফর্মের কাজের ওপরই নির্ভরশীল। কোম্পানিটা একগোছা প্রোডাক্ট বানিয়েছে কেবলমাত্র একটা রোগের জন্য আর লড়ে যাচ্ছে শিল্পক্ষেত্রে সেরার তকমা পাবার জন্য। যেমন ধরো - ব্রেস্ট ক্যান্সার স্ক্রিনিং। এর থেকে অন্যান্য রোগ যেমন ন্যাসোফ্যারিনজিয়াল ক্যান্সার, লিভার ক্যান্সার, ব্রেন ক্যানসার … এমন কী রেটিনার ক্যান্সার, কার্ডিওভাসকুলার রোগ, অ্যালজাইমার্স ডিসিস - এসবের জন্যও প্রোডাক্ট বানানো যেতে পারে।”

মিন হুয়ে আপন মনে ভাবতে লাগলো, সাও মুয়ের কথাগুলো তো সাও মু কোম্পানিতে মিটিং-এর সময়েও বলতে পারতো, বাড়িতে ডেকে এনে বলছে কেনো,কে জানে।

মিন হুয়ে শুনতে লাগলো সাও মুয়ের কথা, “যদ্দুর আমি জানি, পাঁচটা কিংবা ছটা মুখ্য প্রতিযোগী আছে এআই ইমেজিং দিয়ে ব্রেস্ট ক্যান্সারের স্ক্রিনিং করার প্রতিযোগিতায়। এই কোম্পানিগুলোর অনেকগুলো যেমন, ইউন য়িং টেকনোলজি আর ডিপ ভিউ মেডিক্যাল, ফাইন্যান্সিং-এর B রাউন্ডে পৌঁছে গেছে। স্টার্ট-আপ কোম্পানিগুলো যা করছে তা করছে, ত বাদে আবার গুয়ান ছাও ইন্টারন্যাশন্যাল আর ডং লি গ্রুপ -এর মতো ইন্ডাস্ট্রির মহীরুহরাও এআই নিয়ে কাজ করছে উৎসাহের সাথে। বা'অ্যানের সুবিধে ছিলো বিপুল পরিমাণ তথ্য, যা এখন ক্রমশ সীমিত হয়ে আসছে। কোম্পানিটা তো শুরু হয়ে ছিলো একটা হার্ডওয়্যার কোম্পানি হিসেবে, সফট্‌ওয়্যারের দিকে একেবারেই মন দেয় নি কিনা। ব্যাপারটা খুবই সরল। এআই ইমেজ অ্যানালিসিস সবে সবে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, আপস্ট্রিম আর ডাউনস্ট্রিম কী করে মেলানো হবে, এবং কী করে মূল ক্লিনিক্যাল সমস্যাগুলো সমাধান হবে - কোনো ব্যাপারটাই এখনো খুব নিশ্চিত রূপ নেয় নি। এটা যেনো একটা ছ-সাত বছরের বাচ্চা। সবাই জানে ভবিষ্যত আছে একটা, কিন্তু বাচ্চাটা এখনো বড়ো হয় নি। কেউ জানে না এরপরে কী হবে।”

“শুরুর উন্মাদনা, উত্তাপ কমে গেলে, এক আধটা কোম্পানি নিশ্চিত ফুরিয়ে যাবে।” হেসে বললো ঝৌ রু জি। 

“ঠিক কথা। কয়েকটা স্টার্ট কোম্পানি নিশ্চিতভাবে C রাউন্ডেও টিকে যাবে।”

সাও মু ঘাড় নেড়ে বললো, “আমি আজকে তোমাদের ডেকেছি বিশেষ করে এই ভবিষ্যতের এই দিকটার কথাই আলোচনা করার জন্য আর দেখার জন্য যে আর কতো দিন লাগবে বা কতোটা কঠিন এ ব্যাপারটা। এটা আমার প্ল্যান করার সময়। কারণ মিন হুয়ের মতোই আমারও চিকিৎসা বিষয়ে জ্ঞান সীমিত। এক্ষুণি পরিপূরক পড়াশোনা লাগবে। রু জি, শুনেছি যে এ বছরে তোমাদের ইউনিভার্সিটিতে একটা এআই মেডিক্যাল রিসার্চ গ্রুপ শুরু করবে। তুমি কী আমাদের বলতে পারবে গবেষণা কোন দিকে যাচ্ছে আর কী কী কাজ করা গেলো?”

“ওহ! সাও জঁ -” ঝৌ রু জি নালিশ করতে লাগলো, “মিন হুয়ে আর আমি এখানে কাজের কথা বলতেই এসেছি তো।”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে আপনি কাজের পরে আমাদের একটা ছোটো মিটিং-এ ডাকলেন না কেনো? কেনই বা আমাদের শওজিউজিকে দিয়ে এই জমজমাট খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করালেন?”

“বাড়িতে বসে, খেতে খেতে, পান করতে করতে, কথা বলার পরিবেশটা বেশি ভালো নয় কী?”

মিন হুয়ে চুপ করে গেলো।

ঝৌ রু জিও তাই।

এর ফলে পরের দু ঘন্টায় তিন জনে মিলে সাও মুয়ের বাড়ির বসার ঘরে বসে ব্রেস্ট ক্যান্সার নিয়েও কথা বলে গেলো, যতক্ষণ না মিন হুয়ে আর ঝৌ রু জি নিজেদের বাড়ি ফেরার জন্য উঠলো।

****

তাকোয়াকি

গাড়িতে বসাত পরে ঝৌ রু জি জানতে চাইলো, “সামনের মলে একটা তাকোয়াকির দোকান আছে। ভালোই বানায় গোল গোল জাপানি ডাম্পলিংগুলো। যাবেন?”

অবাক মিন হুয়ে জানতে চাইলো, “আপনার পেট ভরে নি এখনো?”

“আমরা মঙ্গলবার বিয়ে করবো। রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করি একটু, একটু কেনাকাটা করি একসাথে। না হলে বিয়েটা জলো, ঢপবাজির মতো লাগবে না?”

মিন হুয়েও তাই ভাবছে। তার ওপরে য়িন শুয়ের রান্নাটা বেশ ভারি ছিলো। মিন হুয়ের একটু যেনো পেট ভার লাগছে। আবার এটা ওটা খাবার জন্য ইচ্ছেও করছে। সব মিলিয়ে মিন হুয়ে ঘাড় নেড়ে সায়ই দিয়ে ফেললো, “ওকে।”

যদিও মিন হুয়ে অনেক দিন আছে বিনচেং-এ, তবু তার ঘোরাফেরা কোম্পানির পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে বাধা। শহরের পশ্চিমে যেখানে সাও মু থাকে সেইদিকটা সম্বন্ধে মিন হুয়ে প্রায় কিছুই জানে না। কেবল জানে যে ঐ এলাকাতে প্রচুর শপিং মল আছে যেগুলোতে দামী জিনিসপত্র বিক্রি হয়। কিন্তু ঝৌ রু জি এলাকাটা বেশ ভালোই জানে। সে দিব্যি ভিড়ের মধ্যে হাঁটতে লাগলো মিন হুয়ের হাত ধরে।

“দোতলায় অনেকগুলো ব্র্যান্ড স্টোর আছে। কোনটা পছন্দ তোমার - শানেল না গুচি?”

“তুমি শুনলে কোথা থেকে?”

“চলো দেখা যাক।”

মিন হুয়ে চেপে ধরলো ঝৌ রু জিকে, “বাদ দাও। শুধু খাবার জিনিস দেখি, চলো। আর যা চোখে পড়বে তাই দেখি।”

“না। খুব শিগগির আমরা বিয়ে রেজিস্টার করতে যাচ্ছি। আর আমি তোমাকে এখনো কোনো ভদ্রস্থ উপহার দিই নি। আমি দুঃখিত।”

বলেই ঝৌ রু জি প্রায় টানতে টানতে মিন হুয়েকে নিয়ে গেলো দোতলায়, শানেলের দোকানে। “এই কালো আর সোনালি মাঝারি মাপের লিবয়টা অনেক কাজে লাগবে।”

শানেল লিবয়


কর্মী মহিলাটি মিন হুয়ের হাতে একটা নমুনা তুলে দিলো, “এটা আপনি পছন্দ না করে পারবেন না।”

মিন হুয়ে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে এদিক ওদিক ঘুরে অনেকগুলো ভঙ্গী করে ঝৌ রু জিকে দেখালো। “তাহলে এটাই নেওয়া যাক।” বলে ঝৌ রু জি ক্রেডিট কার্ড বার করে দাম চোকাবার জন্য চেক আউট কাউন্টারের রাস্তা ধরলো। খানিক পরেই টের পেলো যে মিন হুয়ে চলা ফেরা বন্ধ করে দিয়েছে, যেনো পাথর হয়ে গেছে, যেনো ওর পিছনে একটা নেকড়ে দাঁড়িয়েছে এখনই ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে বলে, কিংবা যেনো ও ভুত দেখেছে হঠাৎ।

কাউন্টারের কর্মীর হাতে ক্রেডিট কার্ডটা দিয়ে পিছনে পায়ের শব্দ শুনতে পেলো। একটা লম্বা লোক কাউন্টারের দিকে হেঁটে এলো, অন্য আরেকজন কর্মীকে বললো, “আমি এই স্যুটটা চাই। এটা আমাকে ভাঁজ করে দিন। আর এই জুতো জোড়া। শিয়া শিয়া।”

গলার স্বর খাদের দিকে আর মিঠে। দাম মেটানো হয়ে গেলো যেই অমনি তিনি চলে গেলেন।

ঝৌ রু জি লোকটার মুখটা স্পষ্ট দেখতে পায় নি। শুধু দেখেছে যে লোকটা একটা হালকা ধূসর রঙের উইন্ডব্রেকার পরে আছে, লম্বা খাড়া চেহারা, আচরণে শান্ত। ঝৌ রু জি উইন্ডব্রেকার পরা লোকটাকে এলিভেটরে উঠতে দেখলো। তারপর শপিং ব্যাগ হাতে এলো মিন হুয়ের কাছে। তখনও মিন হুয়ে চমক কাটিয়ে উঠতে পারে নি দেখে ঝৌ রু জি মিন হিয়ের কাঁধ চাপড়ে জিজ্ঞেস করলো, “লোকটাকে চেনো নাকি?”

মিন হুয়ে হাসলো। হাসিটা অস্বাভাবিক দেখালো। মাথা ঝাঁকাতে লাগলো।

“আমি যদি ঠিক আন্দাজ করে থাকি, তবে লোকটা চেং ছিরাং, তাই না?”




~~~~~~~~~~~~

সম্পূর্ণ বই বিনামূল্যে : https://dl.bookfunnel.com/lcj5vznt96

Link to Previous Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/08/jpda-chapter-20.html

Link to following Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/08/jpda-chapter-22.html

Monday, August 26, 2024

JPDA - Chapter 20

 ২০. সামিল


মিন হুয়ে অফিসে ঢুকলো, দরজাটা বন্ধ করে দিলো, কানে দিলো ইয়ারফোন, ডুবে গেলো প্রোগ্রাম লেখার মধ্যে। যতক্ষণ না গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো ততক্ষণ ধরে লিখল। সেই মূহুর্তে ওর মনে পড়ে গেলো যে ও আর কফি খেতে পারবে না, কারণ ও গর্ভবতী। বহুদিন ওর মাথা ঘুরেছে কফি খেতে না পেয়ে। সেই সমস্ত লোকেদের দলে পড়ে মিন হুয়ে যারা সকালবেলা এক কাপ কালো কফি না হলে কিছুতেই জেগে উঠতে পারে না।

চায়ের ঘরে পৌঁছে দেখলো ইয়াং বেই বেই কফি মেশিনে কফি বিন ঢালছে। মিন হুয়ে দেখে সে তাড়াতাড়ি বললো, “মিন হুয়ে জিয়ে, আপনার ডিক্যাফ কফি তৈরি। আপনি চাইলে আমি এক পাত্তর টাটকা কফি বানিয়ে দিতে পারি।”

কথা শেষ করেই সে একটা লাল রঙের কফি মেশিন ছুঁলো যার ওপরে রুপোলি রং দিয়ে লেখা আছে ‘ডিক্যাফ’। 

“না, না, আমি নিজে বানিয়ে নেবো।” বলতেই বলতেই মিন হুয়ে ওপরে নিচে সমস্ত বোতামগুলো দেখে নিচ্ছিলো, “জল ভরে কোথা দিয়ে?”

“জল ভরা আছে। সবই অটোমেটিক। এই ভাবে চিপে ধরুন।”

মিন হুয়ের কফি তৈরি। সোফায় বসে একটা চুমুক দিয়ে বললো, “ওয়াও, গন্ধটা তো বেশ!”

“এতে কোনো ক্যাফেন নেই। আপনি বারবার খেতেই পারেন। শুধু মুখের সুখ পাবার জন্য, মিন হুয়ে জিয়ে।”

“এই নিয়ে আর কথা বলে কাজ নেই। আমি তো পুরোপুরি জেগে উঠলাম যেই কফির গন্ধ পেলাম।”

“তাহলে আপনি একটা কাজ করতে পারেন।-”

বলতে বলতেই বেই বেই একটা বড়ো মুঠিতে খানিক কফি বিন নিয়ে একটা কাপে চালান করে দিলো, “এটা আপনার মনিটরের পাশে রাখবেন কোড লেখার সময়ে। আপনি প্রোগ্রাম লেখার সময়েই সুগন্ধ নিতে পারবেন।”

“হা হা, দারুণ বুদ্ধি দিয়েছেন তো!”

মিন হুয়ে মোটেই আড্ডা দিতে পারে না। কিন্তু বা'অ্যানে মহিলা সহকর্মীও সংখ্যায় হাতে গোণা। বেই বেই ফ্রন্টডেস্কের কাজ ছাড়াও কিছু প্রশাসনিক কাজ করেন, আচরণ আর পরিষেবা সংক্রান্ত কাজও করেন। এঁরা সবাই উঁচুদরের আর কোম্পানির সব্বাই এঁদের পছন্দ করে। বেই বেই মিন হুয়ের সাথে ভালো ব্যবহার করে হয়তো এই জন্য যে সাও মু আলাদা করে বলে দিয়েছেন বেই বেই-কে মিন হুয়েকে যত্ন করার জন্য। 

“মিন হুয়ে জিয়ে, আমি আপনাকে কিছু বলতে চাই। আপনার সময় হবে তো?”

ইয়াং বেই বেই পাশে বসলো, পাকড়ে ধরলো চায়র কাপটা, একটু মধুও চিপে দিলো তাতে, অনেকক্ষণ ধরে একটা চামচ দিয়ে গুলে নিতে লাগলো, আর বললো, “আমি বলতে চাই না। এটা আমার ব্যাপার নয়। অফিসের মা দওইয়্যাঁ আমাকে জানতে বলেছেন আপনার ব্যাপারে, উনি - একজন পুরুষ সহকর্মী, তাই ওঁর মনে হয়েছে যে আমি আপনাকে প্রশ্নগুলো সরাসরি করতে পারি।”

মিন হুয়ে নিজের ঠোঁট চেটে সোজা হয়ে বসলো, “আপনার সময় থাকলে, জিজ্ঞেস করুন।”

“জিয়ে, আপনি কী সত্যিই বিয়ে করেন নি?”

“সত্যিই করি নি।”

“তাহলে … আপনার পেটে যে বাচ্চা আছে … আপনি তাকে জন্ম দেবেন বলে ঠিক করেছেন … তাই তো?”

“হ্যাঁ।”

“আমাদের কোম্পানিটা ছোটো। তাই অফিসেই পরিবার পরিকল্পনা … অবিবাহিতের জন্ম দেওয়া …”

একটু থেমে বললেন, “বেআইনি। যেমন সুপারবার্থ। বুঝলেন?”

“বেআইনি!” মিন হুয়ে এমন চমকে উঠলো যে আরেকটু হলে হাতের কফিটা প্রায় ফেলেই দিচ্ছিলো। “কোন আইনের বিরুদ্ধে যায় এটা?”

“জনসংখ্যা আর পরিবার পরিকল্পনা আইন।”

চায়ের ঘরে কেউ ছিলো না তখন। তবুও বেই বেই কথা বলতে লাগলেন খুব নিচু স্বরে, “বাচ্চাকে জন্ম দিলে তোমার একটা বার্থ সার্টিফিকেট লাগবে। তোমার যদি ম্যারেজ সার্টিফিকেট না থাকে, তাহলে তুমি বার্থ সার্টিফিকেট পাবে না। এমনভাবে বাচ্চা জন্মালে তোমাকে ফাইন দিতে হবে। তাকে বলে সোশ্যাল মেইন্টেন্যান্স ফি। তবে পরিবারের পাকা ঠিকানার নথীকরণ করতে পারবে। অনেক ঝামেলা হবে।”

যবে থেকে শিন ছির ধমক খেয়েছে, তবে থেকে মিন হুয়ের বিভ্রান্তি লেগেই আছে কয়েক মাস যাবৎ। শুধু সজাগ থাকে যখন প্রোগ্রাম লেখে। ও কখনোই ভাবে নি যে ও অন্তঃস্বত্তা হবে। ভাবেই নি তারপরে কী হতে পারে।

“তাহলে পরিবারের পাকা ঠিকানার নথীকরণের দরকার নেই।” ভ্রূর ঠান্ডা ঘাম মুছে নিলো মিন হুয়ে।

“ও জিয়ে, আপনি সমাজের থেকে কতো যোজন দূরে বাস করেন বলুন তো? একটা বাচ্ছা কী করে বড়ো হবে একটা নথীকৃত আবাসের ঠিকানা ছাড়া? একটা রেজিস্টার্ড পার্মানেন্ট রেসিডেন্স না থাকলে বাচ্চা কিন্ডারগার্টেন-এ যেতে পারবে না, এলিমেন্টারি স্কুলেও যেতে পারবে না। কিছুই করা যাবে না রেজিস্টার্ড পার্মানেন্ট অ্যাড্রেস না থাকলে।”

মিন হুয়ে শুধু বললো, “ওহ্‌!” তারপর বোবা হয়ে গেলো যেনো।

“আপনার সাথে বাচ্চার বাবার যোগাযোগ আছে এখনো?” বেই বেই আবার জানতে চাইলেন।

“মেইয়ো।” মিন হুয়ে মাথা নাড়লো, “আমি বাচ্চার বাবার পরিচয় প্রকাশ করতেও চাই না।”

“টাকার পরিমাণটা সমান নয়। দ্বিতীয়ত, আপনাকে মা এবং বাবা দুজনেরই পরিচয়ের প্রমাণ জমা দিতে হবে এবং সোশ্যাল মেইন্টেন্যান্স ফি জমা করার রসিদও জমা দিতে হবে অ্যাকাউন্ট নথীকরণের সময়ে যাথে বাচ্চার বাবার অ্যাকাউন্টও জমা দিতে হবে। সঙ্গে আপনাকে একটা প্যাটার্নিটি টেস্ট সার্টিফিকেট দিতে হবে। তার জন্য আবার পুলিশ স্টেশনের দওইয়্যাঁর থেকে অনুমোদন নিতে হবে।”

মিন হুয়ের মাথাটা ক্রমশ ফুলে উঠছিলো যেনো, “টাকাটা সমস্যা নয়। আমি নিজেই দিতে পারবো। অন্য জিনিসগুলো … কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।”

“আমার জিয়ে, অনেক টাকা। আমি পরিবার পরিকল্পনা কমিশনে ফোন করে জেনেছি … আপনার মতো পরিস্থিতিতে, আপনাকে পঞ্চাশ হাজার য়ুআঁ দিতে হবে।”

“পঞ্চাশ হাজার য়ুআঁ?” মিন হুয়ে চোখ বড়ো বড়ো করে তাকালো, ওর অবিশ্বাস্য লাগছে। “এতো?”

“আমি আপনাকে মিথ্যে বলবো না। তাই-”

বেই বেই মিন হুয়ের পেটের দিকে তাকালেন, “আপনি কী এখনো বাচ্চাকে জন্ম দিতে চান?”

মিন হুয়ে জোরে জোরে ঘাড় নেড়ে বললো, “দাঙ্গরাঁ।”

বেই বেই ঘুরে বসলেন, “আরেকটা উপায় আছে অবশ্য।”

“হুহ্‌”

“জিয়ে, আপনাকে একটা অ্যাপের কথা বলতে পারি, বাইহে ডট কম, একটা ব্লাইন্ড ডেটে যান আর আপনার বাচ্চার একটা বাবা খুঁজে নিন। অবশ্যই বাচ্চার জন্মের আগে ম্যারেজ সার্টিফিকেটটা করিয়ে নেবেন।”

বেই বেই-এর সাথে কথা বলার পরে মিন হুয়ের মনে হলো যে কিছুতেই বাচ্চাটা ওর একার, ওর একলার হবে না। মানুষের সাথে আচারে ব্যবহারে ও নিজে মোটেই পটু নয়। আর কোনো আত্মীয়স্বজনও নেই, বয়ঃজ্যেষ্ঠ কেউও নেই বিনচেং-এ যার সাথে এ ব্যাপারে আলোচনা করতে পারে। এর জেরে মিন হুয়ে একটু চিন্তায় পড়লো। অফিসে ফিরে গিয়ে পুরো ব্যাপারটা আবার ভাবলো। মিলবে না এমন কোনো রাস্তাই নেই। বাচ্চার জন্মের আগে সাত-সাতটা মাস মানে দুশো দিনেরও বেশি আছে। এখনো সময় আছে।

কাজ থেকে বেরোনোর সময় মিন হুয়ে আবার মুখোমুখি হলো ঝৌ রু জির, এলিভেটরে। ঝৌ রু জি জানতে চাইলো যে সাও মুর বাড়িতে নেমন্তন্ন রাখতে মিন হুয়ে একসাথে যাবে কিনা ঝৌ রু জির গাড়িতে। 

মিন হুয়ে ভাবলো ব্যাপারটা। বললো, “সুপারমার্কেটে থামা যাবে সাও মু-এর বাড়ি যাবার পথে? আমি ওয়াইনের একটা বোতল নেবো।”

“ও কে। আমিও কয়েকটা জিনিস কিনবো। ডিনারের নেমতন্নে যাচ্ছি। আমিও তো খালি হাতে যেতে পারি না।”

ঝৌ রু জি একটা অডি চালায়, গাড়িটা চিনে তৈরি। গাড়িটা রেখেছেও খুব পরিষ্কার। দুজনে যখন সুপারমার্কেটে পৌঁছোলো মিন হুয়ে অ্যালকোহল সম্পর্কে কিছুই জানে না। ঝৌ রু জির পরামর্শ মতো একবোতল হুইস্কি কিনল। দাম চুকিয়ে বেরোনোর সময় দুজনে ‘মা ও বাচ্চা’ বিভাগের পাশ দিয়ে গেলো। ঝৌ রু জি জিজ্ঞেস করলো, “আপনি কী গর্ভবতী মহিলাদের ভিটামিনগুলো খেতে শুরু করেছেন?”

“না।”

“ফোলিক অ্যাসিড?”

“ডাক্তার বলেছে খেতে। কিন্তু আমার এখনো কেনার সময় হয় নি। কদিন খুব ব্যস্ত আছি আমি।”

“তাহলে এখন কিনে নিন।” ঝৌ রু জি টেনে নিয়ে গেলো মিন হুয়েকে একসারি তাকের সামনে। বেশ দক্ষ হাতে ঘাঁটাঘাঁটির পরে, “এই ব্র্যান্ডের ভিটামিন ভালো। এতে ফোলিক অ্যাসিডও আছে। এতে আপনাকে দুটো আলাদা করে কিনতে হবে না। আর এই যে নরওয়ের চুনোমাছের ডিএইচএ, এরও দু বাক্স।” 

“ডিএইচএটা আবার কী … কী কাজে লাগে?”

“অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড, সাধারণত ব্রেন গোল্ড বলে।” হাতের ছোটো নীল রঙের ওষুধটার দিকে দেখালেন ঝৌ রু জি, “এই জিনিসটা স্নায়ুকোষে তৈরিতে কাজে লাগে। মগজ আর রেটিনার জন্যও খুব জরুরি। বাচ্চার ব্রেনের কোষ তৈরিতে সাহায্য করে আবার মায়ের পোস্টপার্টাম ডিপ্রেসনের মোকাবিলাতেও সাহায্য করে। এটা সত্যিকারের ভালো জিনিস, বিশ্বাস করুন। তিন মাস থেকে ছমাস বাচ্চার মগজ তৈরির সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সময়। বাচ্চার বুদ্ধির বিকাশের জন্য আপনি এটা নিশ্চয়ই খাবেন।”

এতো প্রাণবন্ত স্বরে ঝৌ রু জি বলছিলো যে মনে হচ্ছিলো বিজ্ঞাপণ। মিন হুয়ে দু বাক্স নিয়ে নিলো, শপিং কার্টে রেখে দিলো, দোকান ছেড়ে বেরোনোর উপক্রম করছিলো যখন ঝৌ রু জি হঠাতই বাক্সদুটো তুলে নিয়ে খুঁটিয়ে দেখে ওগুলোকে তাকের ওপর তুলে দিলো, বদলে অন্য বাক্স নিলো, “ওটাতে মাছের তেল ছিলো। এটাতে সিউইডের তেল। এটাই চাই, ওটা নয়।”

মিন হুয়ে দাম দেখলো। পরেরটার দাম আগেরটার দামের দ্বিগুণ, “এগুলো সবই ডিএইচএ, কোনো ফারাক আছে কী?”

“আছে বই কী। যে ডিএইচএটা সমুদ্রের শ্যাওলা থেকে নেওয়া হয়, সেটা ফুডচেনের মধ্যে দিয়ে বাহিত হয় নি। তাতে দূষণ কম। এতে গর্ভবতী মহিলারা আর শিশুরা তুলনামূলকভাবে বেশি নিরাপদ। তাছাড়া এটা হজম করাও সহজ।”

“আপনি এতো সব জানলেন কী করে?”

“আমি তো ডাক্তার। ভুলে গেছেন সে কথা?”

দোকানের কাজ শেষ হলে দুজনে গাড়িতে চেপে চলতে লাগলো। ভিড়ের সময়, রাস্তায় অনেক যানবাহন। সাও মু শহরের বাইরে থাকেন, তিনি বলেনও যে তিনি একটা বড়ো বাড়িতে থাকতে চান। তিনি অল্প পথ যাতায়াতের সুখটুকু ছেড়ে দিয়েছেন। নেভিগেশনে দেখাচ্ছিলো যে আরো দেড় ঘন্টা লাগবে পৌঁছোতে। মিন হুয়ের মনে পড়ে গেলো অ্যাপটারকথা যেটা বেই বেই বলে ছিলো তাকে। তাড়াতাড়ি ডাউনলোড করে নিলো, ব্যক্তিগত তথ্যও ভরতে লাগলো।

ঝৌ রু জি একঝলক দেখে নিয়ে বললেন, “আপনিও বাইহে ডট কম ব্যবহার করেন?”

মিন হুয়ে ফোনটা ঢেকে রাখলো, “আপনি কী করে জানলেন?”

ঝৌ রু জি হেসে বললেন, “আমারও একটা অ্যাকাউন্ট আছে। এই রেজিস্ট্রেশন পেজটার প্যাটার্ন সহজেই চেনা যায়।”

মিন হুয়ে টাইপ করতে থাকল, “কদ্দিন ব্যবহার করছেন এটা? কেমন, ভালো?”

“আমার সময় নেই ব্যবহার করার। রোজই সার্জারি থাকে একটা না একটা। ব্লাইন্ড ডেটের সময় কোথায়?”

“একবারও একজনের সাথে দেখা করেন নি?”

“হ্যাঁ। দেখা করেছি। কয়েকবার। কয়েকবার খেতে গিয়েছি। কথা বলে ভালো লাগে নি। তাই আর কথা বলি নি ফের।”

“কারণ এইটা যে যাদের সাথে ডেটে গিয়ে ছিলেন তাদের কাউকেই আপনার মনে ধরে নি?” 

“হ্যাঁ। তুলনামূলক ভাবে আমার যোগ্যতা বেশি ভালো - আমার তেত্রিশ বছর বয়স, মেডিক্যাল পিএইচডি আছে, বড়ো একটা পদে কাজ করি, মা-বাবা সরকারী কর্মচারী ছিলেন, আমাকে দেখতে খারাপ নয়, তাই না? আমি দ্বিতীয়বার বিয়ে করতে চাইছি, আমাকে আর জোর করবে কে?”

“এতো অনেক এলোপাথাড়ি তোলপাড়ের মতো শোনাচ্ছে।”

“যার একবার ডিভোর্স হয়ে গেছে সে ভালো করেই জানে যে সম্পর্কটা ভেঙে গেছে। মূল্য কী? ব্যাপারটা একটা ভালো বন্ধুত্বের অবসানের মতোই। যদি কেউ একবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তবে দ্বিতীয়বারে আর ভয় কী?”

ঝৌ রু জি নিপুণহাতে স্টিয়ারিং হুইল ঘোরালেন, “দেখেছি আমিও।”

“কিন্তু আপনি কখনো শিখেবন না।”

“আমি ভীষণ চেষ্টা করেছি, সত্যিই চেষ্টা করেছি। আমার মা বলেন বরবউ-এর সম্পর্কটা একটা বাড়ির মতো। একটা আলোর বাল্ব খারাপ হয়ে গেলে আলোর বাল্বটা বদলে নিতে হয়, কিন্তু একটা আলো জ্বলছে না বলে বাড়িটা বদলানো যায় না। কিন্তু আমার আর আমার বউয়ের ঝামেলাটা একটা আলোর বাল্বের মতো নয়। একজন ফার্স্ট-ক্লাস সার্জন হয়ে ওঠাটাই আমার জীবনের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নটা আমি বিয়ের জন্য ছেড়ে দিতে রাজি নই। আমি পারবো না। বুঝলেন কী?”

“বুঝলাম।” মিন হুয়ে বললো, আর বলতে বলতে ফোনটা নাড়াতে লাগলো। “দেখুন, আমি রেজিস্টার করে দু ঘন্টাও হয় নি, কয়েক মিনিট আগে আমাকে কেউ একটা টেক্সট মেসেজ পাঠিয়েছে। ওয়াও! দুটো মেসেজ।”

“বলুন দেখি কী চলছে?”

“একজনের বয়স পঁয়ত্রিশ, এক দশমিক সাত ছয় মিটার লম্বা, ওজন নব্বই কেজি। অন্যজনের বয়স ঊনত্রিশ বছর, এক দশমিক সাত তিন মিটার লম্বা, ওজন পঁচাত্তর কিলোগ্রাম। আমার হিসেবে এই পঁচাত্তর কিলোগ্রাম খুব খারাপ নয় দেখতেও ভালো, বেশ বুদ্ধিদীপ্ত।”

জুম ইন করে, ডানদিকে, বাঁদিকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মিন হুয়ে ছেলেটার ছবিটা দেখতে লাগলো। 

“আমার কেনো মনে হচ্ছে যে আপনি যেনো তরমুজ বাছছেন?”

“হাহা হাহা” মিন হুয়ে ফোনে টাইপ করতে লাগলো, “আমি এবার এঁদের বলতে চাই যে আমার পেটে বাচ্চা আছে আর জিজ্ঞেস করবো যে ওঁরা কিছু মনে করছেন না তো। যদি এঁরা কিছু মনে না করেন তো আমি এঁদের বলবো কোথায় কখন দেখা করবো।”

টেক্সট মেসেজ পাঠানোর পরে, সেটা যেনো মিলিয়ে গেলো কোথায়। আর সেই যে দুজন যারা একটু আগে পর্যন্ত আবেগে গদ্গদ হয়ে চ্যাট করে যাচ্ছিলো মিন হুয়ের সাথে, তারা যেনো কোথায় উবে গেলো এক মূহুর্তে। কোনো সাড়া শব্দই নেই আর।



মিন হুয়েকে থেকে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে দেখে, ঝৌ রু জি বললো, “দুপুরে বলেছি আপনাকে, আমার কিচ্ছু যায় আসে না। দেখুন, আপনার পেটের বাচ্চা জন্মানোর পরে তার একটা বাবা তো থাকতে হবে, তাই না? যখন কিন্ডারগার্টেন-এ যাবে, তখন অন্য সব বাচ্চারই বাবা থাকবে, কিন্তু এই বাচ্চার থাকবে না, মর্মান্তিক। বাচ্চাকে একটা স্বাভাবিক বাড়ি দেওয়াটা জরুরি আর তার মা-বাবা দুজন থাকাটাও জরুরি।”

“আপনার সত্যিই কিচ্ছু যায় আসে না?”

“সত্যি কথাটা বলতে দিনঃ আমি হাসপাতালের শেষ পর্যায়ের যে ফ্ল্যাট বিলির জনকল্যাণকর ব্যবস্থা তার সুযোগটা নিতে চাই। আপনি ‘তিয়াঁরাঁ কমিউনিটি’র কথা শুনেছেন? চারটে হাই-রাইজ অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং আছে এই রাস্তার পুব দিকে, যেগুলো আমাদের ইউনিভার্সিটির বানানো। চারপাশটা দেখতে ভালো, এলাকাটা ভালো। দামটা চারপাশের ভাড়ার তিন ভাগের একভাগ যেটা অর্ধেক কেনা আর অর্ধেক বিনাপয়সায় পাবার সামিল। কিন্তু প্রজেক্টের মাথা বলেছেন যে এই ফ্ল্যাটগুলো তাঁদেরকেই দেওয়া হবে যাঁরা বিবাহিত বটে, কিন্তু তাঁদের বাড়ির মালিকানা নেই। আমার যা পদাধিকার তাতে আমি তিনটে শোয়ার ঘর দুটো বসার ঘর সমেত ফ্ল্যাট পাবো।”

“ওয়াও! ওহ্‌।”

“বিনচেং-এ বাড়ির যা দাম, তাতে আপনি যদি আমার জায়গায় থাকতেন, তবে আপনিও লোভে পড়ে যেতেন নাকি?”

“আমার সঞ্চয় খুবই কম।” মিন হুয়ের সৎ স্বীকারোক্তি, “আমার সামর্থ্যে কুলোবে না।”

“আপনাকে পয়সা দিতে হবে না। দেখুন, আমরা পরস্পরের কাজে লাগতে পারি যদি আমরা বিয়ে করি। আপনার একটা ম্যারেজ সার্টিফিকেট লাগবে বাচ্চার জন্ম দিতে, আমার একটা ম্যারেজ সার্টিফিকেট লাগবে একটা বাড়ির মালিক হতে। যদিও ব্যাপারটা ভীষণই পরস্পরের কাজে লাগার, ব্যবহারে লাগার মতো শোনাচ্ছে, তবুও দেখুন আমাদের অন্য ব্যাপারপগুলোও মানানসই। বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, আয়, কাজের পরিবেশ - সব মানানসই। যদি এমনও মনে হয় যে আমাদের বনিবনা হচ্ছে না, আমরা সেই বিষয়ে আলোচনা করে বিয়ে ভেঙেও দিতে পারি। আমি কথা দিচ্ছি যে আমার জন্য আপনার পরিস্থিতি কঠিন হবে না কখনো।”

ঝৌ রু জি শান্ত স্বরে বললো, “আমার প্রাক্তন স্ত্রীর সাথেও ব্যাপারটা এরকমই। আর কিছু না, আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করে ছিলাম যে আমি সার্জারি ছেড়ে একটা ডাক্তারি পড়ানোর কলেজে পড়াবো কিনা। আমি চাই নি সার্জারি ছেড়ে ডাক্তারি কলেজে মাস্টারি করতে। তাই আমি ডিভোর্সে রাজি হয়ে ছিলাম। কখনো কোনো ঝগড়া হয় নি। বন্ধুমহলে সবাই জানে যে আমরা এখনো পরস্পরকে পছন্দ করি।”

“তাহলে আপনি কবে বিয়ে করতে চান?”

“কাকে?”

“ধরুন আমাকে।”

“আমি এই সপ্তাহে ছুটিতে আছি। সামনের মঙ্গলবারে আবার কাজে যোগ দেবো। সোমবারে সিভিল সার্টিফিকেশন ব্যুরোতে গেলে কেমন হয়?”

মিন হুয়ে নিজের ক্যালেন্ডার দেখে বললো, “সোমবার ঠিক আছে।”

“সকাল দশটার সময়ে।”

“এর সাথে আমার দুটো অনুরোধ আছে।”

“বলুন।”

“প্রথমত, আমাকে জিজ্ঞেস করবেন না যে আমার বাচ্চার বাবা কে।”

“আমি কখনো জানতে চাইবো না।”

“দ্বিতীয়ত, বাচ্চার পদবী হবে ‘সু’।”

“আমার কোনো কৌতুহল নেই।”

“আপনার কোনো শর্ত আছে? আপনি কিছু জানতে চান?” মিন হুয়ে জিজ্ঞেস করলো।

“আপনার সাথে চেন ছিরাং-এর গন্ডগোলটা কী নিয়ে?”

“আমি এ ব্যাপারে কোনো কথা বলতে চাই না।”

“ওকে, তাহলে বলতে হবে না আপনাকে।”

মিন হুয়ে খানিক ক্ষণ ভাবলো। তারপরে জানতে চাইলো, “আপনার শখ কী কী?”

“বেহালা, ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক, ব্যালে, মুভি।”

মিন হুয়ে ফের জিজ্ঞসে করলো, “আপনি নাচতে পারেন?”

“আমি ব্যালে নাচ দেখতে ভালো বাসি।” বললো ঝৌ রু জি, “আপনার শখ কী কী?”

“দাবা খেলা, তাস খেলা, গেমস, মুভিস।”

“তার মানে মুভিস আমাদের দুজনেরই শখের জিনিস। আমরা একসাথে মুভি দেখতে যেতে পারি পরে।”

“হ্যাঁ।”

“এটাই সাও জঁয়ের বাড়ির এলাকা। এইখানে।”

ঝৌ রু জি গাড়িটাকে রাস্তার পাশে দাঁড় করালেন। দুজনে কমিউনিটির প্রবেশপথ অবধি ওয়াইন আর উপহার হাতে নিয়ে হেঁটে গেলো। 

“জানো মিন হুয়ে, আমি আমার প্রাক্তন বৌয়ের সাথে ছায়ার মতো লেগে ছিলাম তিন বছর ও আমাকে বিয়ে করতে রাজি হবার আগে। আর তুমি - তুমি তো রাজি হয়ে গেলে তোমার জন্য কিছুমাত্র করার আগেই।”

মিন হুয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। হঠাৎ করে। ঝৌ রু জির দিকে চেয়ে প্রত্যেক শব্দে ওজন দিয়ে বললো, “ঝৌ রু জি, আমি চটপট রাজি হয়েছি, কিন্তু আমি কিছু না ভেবেই রাজি হয়ে গেছি এমন নয়। অন্য লোকে কী ভাবলো তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আমি রাজি হয়েছি কারণ আমি বিষয়টা স্পষ্ট করে বুঝেছি। তুমি কী গুরুত্ব দিয়ে ভেবেছ? বুঝেছ স্পষ্ট করে?”

“হ্যাঁ ভেবেছি।”

“ভালো।”

***



সাও মু যে ঠিকানা লিখে দিয়ে ছিলেন সেখানে পৌঁছে দুজনে একটা দোতলা টাউনহাউসের দেখা পেলো। দরজায় ঘন্টি বাজালো, ভেতর থেকে পুরুষ কন্ঠে উত্তর এলো, আর দরজাও খুলে গেলো। তিনি হাসিমুখে অভ্যর্থনা করলেন, “আসুন, আসুন, খুয়েংয়িং।”

মিন হুয়ে আর ঝৌ রু জি মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলো। তারা জানে না এই মানুষটা কে।

সাও মুয়ের বিয়াল্লিশ বছর বয়স। যে মানুষটা দরজা খুললেন, তাঁকে দেখে ঝৌ রু জির থেকেও কম বয়সী বলে মনে হচ্ছে, খুবই সুদর্শন, লম্বা, ছোট্টো মুখ, পুরুষ মডেলের মতো শারিরীক গঠন, একজোড়া শান্ত, তীক্ষ্ণ চোখ প্রায় পশুর মতো।

এক ঝলকে মিন হুয়ের মনে হলো যে স্যুট পড়লে মানুষটাকে খুব কেতাদুরস্ত দেখাতো, যেনো ওয়াল স্ট্রীটের ব্যাঙ্কার।

মিন হুয়ে ভাবলো যে মানুষটা নিশ্চয়ই সাও মুয়ের বোনপো বা ভাইপো হবে। ঝৌ রু জিও সামান্য বিভ্রান্ত, ‘নি হাও’ অবধি বলতে পারলো না, শুধু পায়ে পায়ে অনুসরণ করলো।

“সাও মু বাচ্চাদের আনতে গেছে। আমি রান্না করছি। গন্ধ পাচ্ছেন কী আপনারা?”

হেসে বললেন মানুষটা। একসারি সাদা দাঁত দেখা গেলো, “যা হোক, আমি নিজেই আমার পরিচয়টা দিয়ে দি, আমার নাম য়িন শু, আমি সাও মুয়ের বর।”




~~~~~~~~~~~~

সম্পূর্ণ বই বিনামূল্যে : https://dl.bookfunnel.com/lcj5vznt96

Link to Previous Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/08/jpda-chapter-19.html

Link to following Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/08/jpda-chapter-21.html

Readers Loved