Thursday, September 5, 2024

JPDA - Chapter 30

 ৩০. অনুভূতি আর সংবেদনশীলতা



মিন হুয়ের মনে হচ্ছিলো যে এই পৃথিবীতে ওর সব থেকে গভীর মন খারাপের কারণ ওর শত্রুর ক্ষমতা কেবল বেড়েই চলেছে। দুঃখ গভীরতর হচ্ছে কারণ এই শত্রুকে এখন অনুরোধ করতে হবে।

এর মধ্যে কোথাও না কোথাও কখনো না কখনো নতজানু হতেই হবে।

এই মূহুর্তে তার মনের মধ্যে কেবল কলহ। 

মিন হুয়ে : বাচ্চার জীবন বাঁচানোর জন্য, ও নিশ্চয়ই অনুরোধ করবে চেং ছিরাং-কে, তাতে যতো বিব্রতই হতে হোক না কেনো ওকে।

ক্ষ্যাপাটে বোধ : যদি কোনো উপায় থাকে যাতে চেং ছিরাং-কে অনুরোধ না করলেও চলে, আমি সেই উপায়টাই নেবো। যদি তাতে হাজতবাস জোটে আর, আর আমাকে অপরাধ করতে হয় তাও।

যুক্তি বোধ : এটা একটা জীবন আর মৃত্যুর প্রশ্ন। ঠিক বা ভুল, আবেগ আর আত্মমর্যাদা তার নিরিখে কিছুই নয়।

ক্ষ্যাপাটে বোধ : এখনো চেং ছিরাং-কে বাদ দেওয়া যায়। আমি নিজেই সিঙ্গাপুরে যাবো আর চেং গুয়াং য়ি-কে খুঁজে বার করবো। চিকিৎসার নীতিশাস্ত্র জানেন যিনি, তিনি নিশ্চয়ই বসে থাকবেন না। আমি ওঁর প্রতি সহানুভূতি দেখাব, ওঁকে যুক্তি দিয়ে বোঝাব, না হলে একশো চড় কষাবো …

যুক্তি বোধ : কল্পনার গাছ থেকে নাম। তুই কেবল একাই নস যার ছেলের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। সমস্ত অসুস্থ বাচ্চার মায়েরই সেরা ডাক্তারটাকে চাই। যদি চেং গুয়াং য়িয়ের সাথে কথা বলা এতই সোজা হতো তো তাঁর সমস্ত সময়টাই দেওয়া থাকতো রুগীদের, তাঁর সময় থাকতো না সিঙ্গাপুরে গিয়ে মাসাধিক কাটানোর। 

ক্ষ্যাপাটে বোধ : তুই কী আগ্রাসী পদ্ধতি নিতে পারবি কিছু?

যুক্তি বোধ : মাপ কর, তোর হাতে কিছু আছে কী যা আমাকে উত্তেজিত করবে?

ক্ষ্যাপাটে বোধ : আহ্‌হ্‌হ্‌হ্‌হ্‌

শেষে আবেগ হার মানল যুক্তির কাছে। যুক্তি বোধ হারিয়ে দিলো ক্ষ্যাপাটে বোধকে। মিন হুয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললো যে ও চেং ছিরাং-কে অনুরোধ করবে মধ্যস্থতা করার জন্য।

স্টারবাক্সে হঠাৎ দেখা হয়ে যাবার সময়টুকু ছাড়া গত চার বছরে মিন হুয়ে একটাও কথা বলে নি চেং ছিরাং-এর সাথে। মুছে ফেলে ছিলো চেং ছিরাং-এর ফোন নাম্বার, উইচ্যাটে ব্লক করে ছিলো, আনফলো করে ছিলো আর পুড়িয়ে দিয়ে ছিলো চেং ছিরাং-এর বিজনেস কার্ড। ওর জীবন থেকে সম্পূর্ণ হারিয়ে গিয়ে ছিলো চেং ছিরাং।

কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে লোকটাকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাবার উপায় ছিলো না। যেহেতু সবাই তারা বিজ্ঞান প্রযুক্তি ক্ষেত্রে কাজ করে, সবাই সফ্‌টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার আর সবাই এআই নিয়ে কাজ করছে।

এই কয়েক বছরে গুয়ান ছাও-ও তাদের কাজের লক্ষ্য বদলে নিয়েছে এআই মেডিক্যাল কেয়ারের দিকে। বাজার ধরার জন্য, ওরা প্রচুর খরচা করেছে প্ল্যাটফর্ম বানাতে আর ইকোসিস্টেম তৈরি করতে। তাই এখনো গুয়ান ছাও কারিগরি ক্ষেত্রে যথার্থ নেতৃত্বের দাবি রাখে। এমনকি মিন হুয়ের ঊর্ধতন হে হাই শিয়াং, খুব মন দিয়ে লক্ষ্য করে চলেছেন গুয়ান ছাও-এর কাজকারবার। তিনি চেং ছিরাং-কে চেনেন আর থেকে থেকেই নানান মিটিং-এ দুজনকার দেখা হয়। সম্ভবত সাও মু মনে করিয়ে দিয়েছে বলে, আর মিন হুয়ের বিরক্তি উদ্রেক করবেন না বলে, তিনি চেং ছিরাং-এর নাম করেন না সরাসরি।

‘চেং ছিরাং’ নামের জায়গাটা নিয়ে নিয়েছে “গুয়ান ছাও ইন্টারন্যাশন্যল’।

“সবার আস্থা থাকা উচিত প্রযুক্তির স্টকে। দেখো তোমরা ‘গুয়ান ছাও ইন্টারন্যাশনাল’ কতোটা বেড়েছে।”

“গুয়ান ছাও এই সেদিন বাজারে একটা নতুন প্রোডাক্ট এনেছে। সব্বার উচিৎ এটাকে মন দিয়ে নজর করা। এটা অনেক বেশি ইন্টারন্যাশন্যাল স্ট্যান্ডার্ডের কাছাকাছি। হয়তো এটাই এখনকার চলতি প্রবণতা।”

“গুয়ান ছাও আমাদের থেকেও বেশি খবর রাখতে পারে কারণ ওদের একটা প্ল্যাটফর্ম আছে আর সেটা একটা বড়ো প্ল্যাটফর্ম। ঝেং ল্যান ইন্টারনেটে তাঁর ক্যারিয়র শুরু করে ছিলেন প্রচুর বিনিয়োগ নিয়ে। এখন তিনি হাসপাতালগুলোর সঙ্গে তথ্য সংগ্রহের জন্য কাজ করতে উৎসাহ দেখাচ্ছেন, খরচ করতে চাইছেন - টাকা থাকলে সব কাজই করা সহজ। - আহ্‌!”

যখন হে হাই শিয়াং গুয়ান ছাও-এর কথা বলেন, মিন হুয়ের অভিব্যক্তিটা নিরুৎসাহে ভরে যায়, উত্তর দেয় না কোনো, কোনো মন্তব্য করে না, এবং মাথা নিচু করে চা খাওয়াতে মন দেয় …

চেং ছিরাং-এর সাথে যোগাযোগের সমস্ত রাস্তা এতো যত্ন নিয়ে মিন হুয়ে বন্ধ করে ছিলো যে অনেকক্ষণ খুঁজেও ও কিছুতেই চেন ছি রাং-এর ফোন নম্বর খুঁজে পেলো না। হাসপাতালে সু ছনের রোগশয্যার পাশে বসে, মিন হুয়ে সব দিক তলিয়ে ভাবলো, আর ঠিক করলো যে ও ফোন করবে ওয়েই ইয়ঁ চেং-কে। ওয়েই ইয়ঁ চেং হলো চেং ছিরাং-এর সহায়ক। ওয়েই ইয়ঁ চেং মিন হুয়ের জুনিয়র, ওর থেকে তিন বছর পরে পড়াশোনা করতো, গুয়ান ছাও-তে কাজ শুরু করে ছিলো মিন হুয়ের সঙ্গেই প্রায়, আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ক্লাস পাশ করেই। যেহেতু দুজনে একে অপরকে কলেজের দিন থেকে চেনে, দু জনের মধ্যে একটা সুসম্পর্ক ছিলো।

যখন ওয়েই ইয়ঁ চেং ওর গ্র্যাজুয়েসন প্রজেক্ট করছিলো, তখন ও একটা সমস্যায় পড়ে ছিলো, যেটা ও সমাধান করতে পারছিলো না। মিন হুয়ে ওকে টিউশন দিয়ে ছিলো সেই সময়ে। তার ফলে ও শুধু পরীক্ষাতে পাশই করে নি, ও গ্র্যাজুয়েশনের সময়ে একটা ডিসাইন এক্সেলেন্স অ্যাওয়ার্ডও পেয়ে ছিলো।

গুয়ান ছাও ছাড়ার পর থেকে মিন হুয়ে আর ওয়েই ইয়ঁ চেং আর কখনো যোগাযোগ করে নি। কিন্তু ওয়েই ইয়ঁ চেং-এর নম্বরটা তখনও মিন হুয়ের ফোনে রাখা ছিলো। পরে ও শুনেছিলো যে মামলার পরে ঝেং য়ি তিং কোনো মহিলা সহায়ক রাখতে দেয় নি চেং ছিরাং-কে, যদি বা মহিলা অ্যাসিস্ট্যান্ট রাখতে দিয়ে ছিলো তো সুন্দরী অ্যাসিস্ট্যান্টদের কাজ করতে দিতো না। যে পুরুষটি দীর্ঘদিনের জন্য অ্যাসিস্ট্যান্ট রয়ে গেছে পদোন্নতির পর থেকে সে হলো ওয়েই ইয়ঁ চেং। ওর মুখ ভর্তি ব্রণর দাগ আছে, ওর দাঁত উঁচু, সবই ঝেং য়ি তিং-এর সন্দেহ এড়াতে।



“হাই, দাজিয়ে, হজিউ বুজিয়া!” ফোনের অন্য পাশে ওয়েই ইয়ঁ চেং-এর গলার স্বর আগের থেকে অনেক বেশি পরিণত আর অভিজ্ঞ শোনাল। 

“ইয়ঁ চেং, আমি চেং ছিরাং-কে কিছু বলতে চাই।” মিন হুয়ের সময় নেই সম্ভাষণের, “তুই কী আমাকে ওঁর ফোন নাম্বার দিতে পারবি?”

“মোবাইল ফোন নাম্বার? সে তো বদলায় নি। তুমি তো ওঁর প্রিয় সতীর্থ ছিলে, তোমার কাছে আছে নিশ্চয়ই?” আনন্দের সঙ্গেই বললো ওয়েই ইয়ঁ চেং।

“আমি মুছে দিয়েছি, আর আমার মনেও পড়ছে না।” মিন হুয়ে এক মূহুর্তের জন্য থামলো, তারপর গম্ভীর স্বরে বললো, “আমার প্রয়োজনটা জরুরী।”

চেং ছিরাং-এর মোবাইল ফোন নম্বর নিয়ে কোম্পানিতে কোনো গোপণীয়তা নেই, গুয়ান ছাও-এর অনেকেই জানে। একটু ক্ষণ দ্বিধা করলো ওয়েই ইয়ঁ চেং, ভাবছিলো যে গ্র্যাজুয়েশনে থিসিসের সময় থেকে মিন হুয়ের কাছে ওর ঋণ রয়ে গেছে, তাই ও মিন হুয়েকে চেং ছিরাং-এর ফোন নম্বরটা নিশ্চয়ই বলে দিলো, কিন্তু শেষে মনে করাতে ভুলল না, “বোলো না আমি দিয়েছি ফোন নম্বরটা।”

“বুঝলাম। এরপর যখন আমরা দেখা করবো, আমি নিশ্চয়ই তোকে ডিনার খাওয়াবো।”

“সাহস হবে না অতো। ল্বব্যাঁ জানতে পারলে … উনি জানান দেন শত্রুর সঙ্গে সহযোগিতা করাটা অপরাধ।”

“রাখ তো।’

“সত্যিই। এখন ল্বব্যানিয়াঁ খুব কড়া হাতে ল্বব্যাঁকে রাখেন।”

“ঠিক আছে। তোর অবস্থা খারাপ হোক তা আমি চাই না। ভালো থাকিস।”

“হ্যাঁ।”

মিন হুয়ে নম্বরটা নিজের মোবাইল থেকেই ডায়াল করলো। পর পর তিনবার। কিন্তু কেউ সাড়া দিলো না। খারাপ লাগলেও, মিন হুয়েকে আবার ফিরে ওয়েই ইয়ঁ চেং-কেই ফোন করতে হলো।

“উনি সম্ভবত এখানে নেই। আর কোনো ভাবে ওঁর সাথে যোগাযোগ করা যায় কী?”

“পিং’আঁ স্ট্রিটে কেএফসির পাশে একটা জিম আছে। উনি প্রায়ই সেখানে সাঁতার কাটতে যান কাজের পরে।”

“আজ যাবেন?

“খুব বেশি আগে নয়, তবে উনি বেরিয়ে গেছেন আজ, একটু আগে।”

মিন হুয়ে খুব দুশ্চিন্তায় পড়েছে। দুশ্চিন্তায় ওর গলার স্বর আটকে আটকে আসছিলো, ওয়েই ইয়ঁ চেং শুনতে পেলো, এক মূহুর্ত চুপ থেকে ও বললো, “উনি নিশ্চয়ই এখন সাঁতার কাটছেন।”

মিন হুয়ে চেনে জায়গাটা। হাতের ঘড়ি দেখলো, সময়টা কাজ শেষ হয়ে যাবার পরে তো বটেই। সু ছনের দায়িত্ব ভালো করে জিয়া জুনকে বুঝিয়ে দিলো, একটা ট্যাক্সি নিয়ে চললো জিমে।

ভিড়ের সময় চলছে।

অনেকক্ষণের জন্য ট্যাক্সিটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইলো। অগত্যা মিন হুয়ে নেমে পড়লো ট্যাক্সি থেকে বদলে একটা তিন চাকা মোটর সাইকেল ভাড়া করলো। মোটর সাইকেলের চালক মিন হুয়েকে নানান গলি দিয়ে নিয়ে চললো, শেষে হাজির করলো জিমের ফটকে।

তিন চাকা মোটর সাইকেল


মেম্বারশিপ কার্ড ছাড়া জিমে ঢোকা যাবে না। সেই জন্য তক্ষুণি মিন হুয়েকে একটা ট্রায়াল কার্ড কিনতে হলো। লকার রুমে জুতো ছেড়ে খালি পায়ে স্যুইমিং পুলে গেলো।

সাত-আট জন সাঁতার কাটছিলো স্যুইমিং পুলে। কিছু পুরুষ, কিছু মহিলা। মিন হুয়ে পুলের ধারে দাঁড়িয়ে খুঁজতে শুরু করলো। বেশি সময় লাগলো না, ওর চোখে পড়ে গেলো কোথায় চেং ছিরাং সাঁতার কাটছে।

পুরো বিনচেং-এ চেং ছিরাং-এর মতো সুদর্শন পুরুষ খুব কমই আছে। চেং ছিরাং-এর পিঠের দিকটাও সুদর্শন। 



চেং ছিরাং সব সময়ে সব কাজে প্রস্তুত থাকে হালের নতুন গ্যাজেট ব্যবহার করার জন্য। ব্যবহার করেও। রুপোর আস্তরণ লাগানো সাঁতারের চশমা, সিলিকোন স্যুইমিং ক্যাপ, ইয়ারপ্লাগস্‌, স্পিডো রিস্টব্যান্ড, কালো রঙের হাঙরের চামড়ার টাইট স্যুইমিং ট্রাঙ্ক পরে আছে, পেশাদার সাঁতারুদের মতো। সেই আবরণ ফুঁড়ে জেগে উঠছে পিঠের পেশি আর সরু পা।

সাঁতারের একটা গলিতে বারবার সাঁতার দিয়ে যাতায়ার করছে, দেখে মনে হচ্ছে, একাই, কোনো সঙ্গী ছাড়াই।

প্রায় কুড়ি মিনিট পরে, চেং ছিরাং গুটি গুটি এলো পুলের ধারে, বিশ্রাম নিতে। যখন চোখ তুলে তাকালো, তখন মিন হুয়ে ওর চোখের সামনে।

গা থেকে টপ টপ করে জল পড়ছে, তবু হেঁটে এলো মিন হুয়ের সামনে, একটা তোয়ালে তুলে নিয়ে, গায়ের জল মুছলো, শান্ত স্বরে জানতে চাইলো, “তোমার জন্য কিছু করতে পারি কী, মিন হুয়ে?”

ঘাতক। লোকটার অ্যাড্রেনালিন বয়ে চলে উল্টোদিকে। ওর সামনের লোকজন যতো ভয় পেতে থাকে, ওর আচরণ ততো শান্ত হতে থাকে। যখন ও কোনো জঘন্য কাজ করে, মিছে কথা বলে, তখনো ওর মুখ লাল হয় না।

মিন হুয়ে এতো পছন্দ করতো লোকটার মুখ থেকে আসা শব্দ দুটো : মিন হুয়ে। লোকটা ইচ্ছে করে দুটো শব্দের মধ্যে থামত, যেনো পিয়ানো বাজাতে বাজাতে একটু বিশ্রাম করে নেওয়া।

মিন হুয়ে কখনো অস্বীকার করে না যে যখন লোকটার সঙ্গে ওর প্রথম আলাপ হয়ে ছিলো তখন লোকটার জন্য ওর মনে তীব্র শ্রদ্ধা আবার খানিকটা মমতাও ছিলো। মিন হুয়ে জানতো যে লোকটা বিবাহিত, তাই মিন হুয়ের আবেগ মমতাতেই সীমাবদ্ধ ছিলো।

সেই দিন পর্যন্ত, যেদিন অফিসে, লোকটা জোর করে মিন হুয়েকে চুমু খেয়ে ছিলো, জোর করে মিন হুয়ের মুখের ভেতরে ঠুসে দিয়ে ছিলো নিজের জিভ …

“হ্যাঁ।” মিন হুয়ে জোরে জোরে মাথা ঝাঁকালো, মাথার মধ্যে ভিড় করে আসা সমস্ত জঘন্য বিরক্তিকর ব্যাপারগুলোকে ঝেড়ে ফেলার জন্য। ভুলে যেতে হবে এখন।

“তুমি কী আমাকে এখনই বলবে? নাকি আমি জামাকাপড় বদলে আসব, তারপর কোথাও বসে আস্তে ধীরে কথা বলতে বলতে বলবে?”

লোকটা খুব বিনয়ী। কথার মধ্যে কোনো তাড়াহুড়ো নেই।

“এখন বলব।” মিন হুয়ের কানে বাজল নিজের কাঁপতে থাকা কন্ঠস্বর।

“বেশ, বলো তাহলে।” লোকটা তখনই খেয়াল করেছে, যেনো উৎসাহের কিছু পেয়েছে। হালকা হাসি খেলে যাচ্ছে লোকটার মুখে।

“আমি আপনার অনুগ্রহ চাইতে এসেছি।” মিন হুয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করছে যাতে ওর শব্দগুলো মৃদু অকম্পিত স্বরে বের হয় গলা থেকে। কিন্তু কোনো কারণে ওর কথাগুলো শোনালো দায়ে পড়ে বাধ্য যেনো, যেনো ও ভেতরে ভেতরে ও ফুঁসছে।

“সত্যি?” লোকটা বিদ্রুপ করলো নাকের ভেতর থেকে শব্দ করে। সেই বিদ্রুপ বজায় রেখেই বললো, "কেনো মনে হলো তোমার যে আমি তোমাকে সাহায্য করবো, এই অনুগ্রহ কিংবা কোনো ব্যাপারে? মিন হুয়ে? তুমি আমাকে যা ভুগিয়েছো, আমার মানসম্মানে কালি ছিটিয়েছো, যদি তোমার মনে না থাকে, শেষ যখন স্টারবাক্সে দেখা হয়ে ছিলো আমাদের, তুমি তখনো বলেছিলে যে তুমি আমাকে পরাস্ত করবে, বাধ্য করবে আমাকে মাটিতে হাঁটু মুড়ে বসতে, আমি তোমাকে বাপ বাপ বলে ছেড়ে দিতে বলবো …”

“আমার ছেলের একটা জন্মগত হৃদরোগ আছে। ভাল্‌ভ সারাইয়ের জন্য সার্জারির প্রয়োজন …”

লোকটা তখনই বুঝে গেলো, “তুমি আমার বাবার খোঁজে এসেছো?”

“সম্ভব?”

“উনি তো এখন দেশে নেই।”

“কোনো ভাবে ওঁকে দেশে ফিরিয়ে আনতে পারেন এই অপরেসনটা করানোর জন্য? আমি যাতায়াতের প্লেন ভাড়া দেবো। এবং যদি অন্য কোনো শর্ত থাকে, তাও আমি মেনে নিতে রাজি।”

লোকটার মুখ থেকে হঠাৎ হাসি মিলিয়ে গেলো। সে ভয়ানক গম্ভীর হয়ে গেলো, “কখন ফেরত আনতে চাও ওঁকে?”

“যতো তাড়াতাড়ি হয়, ততোই ভালো।”

পুলের পাশে টেবিলে একটা ওয়াটারপ্রুফ পাউচ ছিলো। তার মধ্যে থেকে সেলফোন বার করে যখন চেং ছিরাং দেখলো যে তিনটে মিস্‌ড কল তখন বলে ফেললো, “ওহ্‌” তারপর মিন হুয়ের দিকে ফিরে তাকিয়ে বললো, “এ অতি বিরল ঘটনা! তুমি আমাকে কৃপা করেছো দেখছি, বার বার ফোন কল করার।”

“একটা মানুষের জীবন মরণের প্রশ্ন। আমি ভীষণ উদ্বিগ্ন।”

“তাহলে আমি আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করবো যে ওঁর সময় হবে কিনা।”

মোবাইল ফোনে দ্রুত টাইপ করলেন। মিনিট পাঁচেক পরে বললেন, “উনি কাল আসবেন। দুপুর পার করে। অপেরসনের আগে রুগীকে দেখাটা জরুরী। উনি রুগীকে দেখতে চান আগে। খুব তাড়াতাড়ি হলে পরশু। এখন তোমার ছেলে কোন হাসপাতালে আছে?”

“বিনচেং ইউনিভার্সিটির হাসপাতালে।”

“অপেরসন হবে কিন্তু আঁ জিতে। বাবা ব্যবস্থা করবেন ট্রান্সফারের। তুমি তোমার ছেলেকে কাল রাতে আঁ জি হাসপাতালের কার্ডিওথোরাসিক ডিপার্টমেন্টে পাঠিয়ে দিতে পারো।”

“ঠিক আছে।”

“চিন্তা কোরো না। আমার বাবা বছরে তিনশোরও বেশি অপরেসন করেন। আর এ ধরনের অপেরশন ওঁর কাছে খুব সহজ।”

“শিয়া শিয়া।” মিন হুয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেললো, অবশেষে ওর কথা বলার ভঙ্গিও খানিক নরম হলো, “আমি ওঁর প্লেনের টিকিট কিনে দিচ্ছি।”

“না, আমি এই মাত্র প্লেনের টিকিট কিনে দিয়েছি।”

সব কিছু ভালো ভাবে মিটে গেলো, তাই না?

মিন হুয়ে তাকালো চেং ছিরাং-এর দিকে। মনের মধ্যে ঝড় তুলেছে হাজারো জটিল ভাবনা। ও নিশ্চিত যে ওর স্বর আর বাচনভঙ্গি শুরুর থেকে শেষ পর্যন্ত হিমশীতল ছিলো, ও কখনো “ভিক্ষা” করে নি। 

চেং ছিরাং কোনো সমস্যা তৈরি না করে কয়েক মিনিটে সমস্যাটার সমাধান করে দিলো।

মিন হুয়ে না ভেবে থাকতে পারলো না হয়তো লোকটা নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। মিন হুয়ে কী ওকে ক্ষমা করে দিতে পারবে?

“তাহলে … আমি আর আপনার ব্যায়ামে ব্যাঘাত করবো না।”

মিন হুয়ে ভাবছিলো হাসপাতালের বিছানায় পড়ে থাকা সু ছনের কথা। ওর আর কিছু বলার ছিলো না। ও চাই ছিলো যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব বেরোতে, “ঝেইজিয়া।”

“দাঁড়াও।”

মিন হুয়ে ঘুরতে যাচ্ছিলো, কিন্তু দাঁড়িয়ে পড়লো।

“তুমি আমাকে যা করতে বলেছো আমি করে দিয়েছি।” চেং ছিরাং ফোনটাকে ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগে ভরে দিলো, তাকালো মিন হুয়ের দিকে আধো হাসি নিয়ে, “এবার আমার পালা তোমার থেকে কিছু চাওয়ার।”

মিন হুয়ের শিরদাঁড়া শক্ত হয়ে উঠলো, “বেশ, বলুন কী চান, কী করতে হবে আমাকে।”

“সামনের শনিবারে একটা এআই ইন্ডাস্ট্রি রিসেপসন আছে। বেশ বড়ো আয়োজন। য়ি তিং আর আমি যাবো ওখানে। তাহলে তুমিও এসো।”

শিল্পক্ষেত্রের সম্বর্ধনাতে যেতে হবে? মিন হুয়ের মনে হলো তাতে তো কোনো সমস্যা নেই, যদিও ও কেবল গবেষণার কথা যে সম্মেলনে হয় সেখানেই যায়। যারা ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়াতে চায় তারা এই জাতীয় রিসেপসনে যেতে পছন্দ করে, যেমন হে হাই শিয়াং।

“ব্যস, শুধু রিসেপসনে যেতে হবে?”

“মোটেই না। এখনো অবধি য়ি তিং আমাকে সন্দেহ করে।”

“ওঁর সন্দেহ তো অমূলক নয়।” মিন হুয়ে বললো সোজাসুজি।

“আমি আশা করছি যে তুমি কিছু একটা করবে আমাকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য।”

মিন হুয়ে তাকালো চেং ছিরাং-এর দিকে। এতো অবাক হলো যে অনেক ক্ষণ পর্যন্ত ও কিছুই বলতে পারলো না। শেষে জানতে চাইলো, “যেমন?”

“যেমন, তোমাকে দেখতে ঠান্ডা বরফের মতো। আসলে তুমি ছিনাল। যখন তুমি একটা সুদর্শন পুরুষ দেখলে আর থাকতে পারো না, বিশেষ করে আমার মতো সুপুরুষ, সুদর্শন কাউকে …”

মিন হুয়ে, “...”

“আমার চরিত্রে কলঙ্ক দিয়েছো তুমি। তোমাকেই সেটা সাফ করতে হবে সেদিন। কল্পনায় কোনো লাগাম দিও না, যতোটা সম্ভব সৃজনশীলতা দিয়ে কাজটা করে ফেলো।”

“মাপ করবেন,” মিন হুয়ে উপহাস করলো, “কাজটা সারা হবে?”

“আমি বলছি কাজটা সারা হবে তাই সারা হবে, আমি যতক্ষণ না বলছি এটা সারা হয় নি, ততক্ষণ হবে না।”

“Fuক ইউ।”

“তুমি কী চাও যে আমি টিকিটটা ক্যান্সেল করে দি?” ভ্রূ তুলে জানতে চাইলো চেং ছিরাং, “মিন হুয়ে, তুমি যাবে কি যাবে না রিসেপসনে?”

মিন হুয়ে দাঁর কিড়মিড় করে বললো, “যাবো।”

“লক্ষী মেয়ে।” গালে হালকা চাপড় দিলো চেং ছিরাং, “আমি জানি কে কার বাপ।”

মিন হুয়ে মনে হলো যেনো ওর সারা গায়ে কেউ গরম ম্যাগমা ঢেলে দিয়েছে। আর ও পাথর হয়ে গেছে। দাঁড়িয়ে রইলো স্থির।

দেখলো চেং ছিরাং কেমন সিটি দিতে দিতে চলে গেলো।




~~~~~~~~~~~~

সম্পূর্ণ বই বিনামূল্যে : https://dl.bookfunnel.com/lcj5vznt96

Link to Previous Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/09/jpda-chapter-29.html

Link to following Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/09/jpda-chapter-31.html

Wednesday, September 4, 2024

JPDA - Chapter 29

২৯. ভালভ

 


সেদিন মিংসেন কমিউনিটিতে জিয়া জুনের দ্বিতীয় দিন। ছিয়াঁ ঝি ফোনে জানালেন জিয়া জুনকে যে সে কাজে ফিরিতে পারে। তার পুরোনো কাজে নয়, তবে একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিকের সহায়কের কাজে, সমাজ নিয়ে খবর করে যে বিভাগ, সেই বিভাগে। জিয়া জুন মনের খুশিতে কাজে গেলো।

কাজ থেকে ফিরে জিয়া জুন জানালো যে ছিয়াঁ ঝি তাকে খুব যত্ন করেছে আর বলেছে যে অভিজ্ঞ সাংবাদিকের সঙ্গে কাজ করে সমাজের নানান খবর বার করতে। আসলে অভিজ্ঞ সাংবাদিকটি এর মধ্যেই অবসর নিয়েছেন কাজের থেকে, তাঁর বাচ্চারা সবাই বিদেশে। তাঁর স্বাস্থ্য ভালো আর আলস্যে তিনি অভ্যস্ত নন। তাঁকে অনেক বেশি মাইনে দিয়ে ছিয়াঁ ঝি বহাল করেছে কাজে। তিনি শুরুতেই জিয়া জুনকে শিখিয়েছেন নিজে নিজে শিখতে, নিজে নিজে উপদেশ দিতে, উদাহরণ দিতে, প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তর নিজেই খুঁজে বার করতে।

সাংবাদিকদের শিফটে নিয়ম করে অফিসে বসতেই হবে এমন কোনো বাধা ধরা নিয়ম নেই। জিয়া জুনের অভ্যেস ভোর ভোর ঘুম থেকে ওঠা আর তাড়াতাড়ি শুতে যাওয়া। এদিকে মিন হুয়ে নিশাচর। তাই জিয়া জুনের কাঁধে দায়িত্ব চাপলো সকালে সু ছনকে কিন্ডারগার্টেনে পৌঁছে দেবার। 

রাতে খাবার সময়ে, মিন হুয়ে যদি কোনোদিন সময় মতো কাজ থেকে ফেরে সন্ধেবেলা, তবে তিনজনে একসাথে খেতে বসে। যা হোক, জিয়া জুন গরীব ঘরের সন্তান। মাত্র চার হাজার য়ুআঁ মাস মাইনেতে সে খুব সাধারণ জীবন যাপণ করে। মাইনের থেকে তিন হাজার য়ুআঁ আবার দিয়ে দেয় মিন হুয়েকে ঘর ভাড়া বলে, বাকি টাকায় সে সস্তাতম খাবার আর জামাকাপড়ের বন্দোবস্ত দেখে রোজ। মিন হুয়ের খারাপ লাগে, সাংবাদিক বলে কথা, সারাদিন জিয়া জুন অনেক গুরুত্বপূর্ণ লোকের সাথে কথা বলে কাজের প্রয়োজনে, তার জামাকাপড় খুব সস্তা হলে চলে না। তাই মিন হুয়ে কয়েক গোছা ভালো জামা কিনে দিয়েছে জিয়া জুনকে। তবে সেগুলো পরতে জিয়া জুন খুব উৎসাহী নয়। বরং সেই জামাগুলো ও ক্লোসেটে টাঙিয়ে রাখতেই পছন্দ করে। 

মিন হুয়ের মনে পড়ে গেলো ঝৌ রু জি ছবি তুলতে উৎসাহী। আর অনেকগুলো ফোটোগ্রাফি ক্লাবেও তার যাতায়াত ছিলো। মিন হুয়ে তাই জিয়া জুনের সাথে ঝৌ রু জির আলাপ করিয়ে দিলো। উদার হাতে ঝৌ রু জি দুটো খুব দামী লেন্স দিয়ে দিলো জিয়া জুনকে, তাকে ক্লাবগুলোতে নিয়ে যেতে লাগলো, আর জিয়া জুনের সামাজিক বৃত্তটা ছড়াতে লাগলো, চার জনে বেশ মিলে মিশে যায়।

তবুও মিন হুয়ে বলে নি জিয়া জুনকে যে সু ছন আসলে শিন ছির ছেলে। যেহেতু সু ছন পছন্দ করে ঝৌ রু জিকে, মনে করে ঝৌ রু জিই ওর আপন বাবা, মিন হুয়ে ভয় পায় যে জিয়া জুন হয়তো উল্টোপাল্টা কিছু বলে বসবে যদি ও জানতে পারে।

বাবা বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, মামা এসেছে বাড়িতে, সু ছন পাশে পেলো আরেকটা বাবার মতো মানুষ, শিশুর স্মৃতি নেই, ধীরে ধীরে সু ছন আর জিয়া জুন ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলো।

জিয়া জুন রোজ সকালে একটা ক্যামেরা কাঁধে বেরিয়ে যায় দেখে, বিকেলে ফিরে খুব আনন্দ করে দিনের সাক্ষাতকারগুলোর গল্প করে দেখে, কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে - এমন ব্যস্ত যে বাধা সময়ের গন্ডি পার করে, মাঝরাত পেরিয়ে কাজ করে - সেটা দেখে মিন হুয়ে বুঝতে পারে যে কাজটা জিয়া জুনের খুব পছন্দের আর কাজের এই সুযোগটাকে সে খুব যত্নে লালন করে। যদিও শুরুটা খুবই নিচু মানের, কিন্তু প্রত্যেক দিনের উন্নতিতে মিন হুয়ে আনন্দ পায়।

জিয়া জুন দ্বিতীয় মাসের মাইনে পাবার ঠিক পরে পরেই, অপ্রত্যাশিতভাবে ছিয়াঁ ঝি ফোন করলেন মিন হুয়েকে দিনের বেলায় কাজের সময়ে, “আমি ভাবছি চেন জিয়া জুনকে বিনোদন বিভাগেই ফিরিয়ে আনবো বদলি করে, আপনার কোনো আপত্তি আছে?”

“ব্যাপারটা কী?”

ছিয়াঁ ঝি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, “সামাজিক খবরের সাংবাদিকদের খুব তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণমূলক দৃষ্টিভঙ্গী আর সমাজকে প্রভাবিত করার মতো লেখার ক্ষমতা থাকাটা জরুরী। চেন জিয়া জুনের ভিতটা বড্ডো কাঁচা। ও জানেই না কিভাবে লিখতে হয়, এমনকি ও টাইপোগুলোও ঠিক করতে পারে না। আর কয়েকটা বাক্য পড়ে মনে হয় যে ও ব্যকরণও বোঝে না। ও যাঁর সাথে কাজ করছে তিনি মনে করছেন যে জিয়া জুনের পান্ডুলিপি পড়ে তাঁর রক্তচাপ বেড়ে যাবে। উনি আর জিয়া জুনের সাথে কাজ করতে চাইছেন না। আমার মনে হয় যে জিয়া জুনের এখনো -”

“তাহলে অন্য কোনো সাংবাদিকের সঙ্গে কাজ করতে দিন জিয়া জুনকে।” বললো মিন হুয়ে।

“মিন শওজিয়ে, আমি বুঝতে পারছি আপনি কতোটা যত্ন করে চেষ্টা করছেন জিয়া জুনের জীবনকে নতুন খাতে নিয়ে যাবার। অন্যকে সাহায্য করার কাজটা খুবই সঠিক কাজ, কিন্তু কখনো কখনো আপনাকে বাস্তব পরিস্থিতিটাও মেনে নিতে হবে। বাস্তবটা হলো এই যে চেন জিয়া জুন সত্যিই সাংবাদিক নয়। আমার মনে হয় বডিগার্ড হওয়াই ভালো। সাংবাদিক হওয়া কঠিন। ওর জন্য ব্যাপারটা খুব বিব্রতকর …”

 “আমি জানি। সেই জন্যই আমি পঞ্চাশ হাজার য়ুআঁ দিয়েছি ওর প্রশিক্ষণের জন্য। আপনি তো টাকাটা নিয়েও নিয়েছেন। আমি তিন বছরের ইন্টার্নশিপের মাইনেও দিয়েছি। এমনকি আপনি নিজেও বলেছেন, সব ঠিক চললে হয়তো -”

“মিন শওজিয়ে, শুনুন আমার কথা -”

“আমরা চুক্তিবদ্ধ।” মিন হুয়ে বললো কড়া সুরে, “দয়া করে অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখান। আমার একটা মিটিং আছে, সব ঠিক থাকলে, আমি এখন রাখব।”

“দাঁড়ান” ছিয়াঁ ঝি কোনো উপায় নেই দেখে মেনে নিতে বাধ্য হলেন, “অন্তত ওঁর জন্য একটা টিউটর রাখুন, ওর চোঙ্গুয়েনটার কিছু উন্নতি হোক?”

মিন হুয়ে জানে না কী ভীষণ নিন্দেমন্দ সহ্য করতে হয় চেন জিয়া জুনকে প্রতিদিন। ও তার কিছুই প্রকাশ করে নি। প্রত্যেকদিন হাসি মুখে খেতে এসেছে। বরাবর ছবিটা যেনো অনায়াস কাজের দিনের।

বিনচেং-এ অনেক ইউনিভার্সিটি। এক ঘন্টার কম সময়ে মিন হুয়ে বেশ কয়েকজন টিউটরের খোঁজ পেয়ে গেলো ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসগুলোর যোগসূত্রে। মিন হুয়ে ছ জনকে বেছে নিলো - তিন জন চোঙ্গুয়েন বিভাগ থেকে আর তিন জন সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে। য়ে শও ঝেন নামের একটা মেয়ে, সাংবাদিকতা বিভাগে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র, জিয়া জুনকে সপ্তাহে তিন দিন বিনচেং ইউনিভার্সিটির পড়ার ঘরে খবর লেখার তালিম দিতে লাগলো। সাবধান হতে গিয়ে মিন হুয়ে নিজে গিয়ে আগে য়ে শও ঝেনের সাথে আলাপ করে জেনে এসেছে যে মেয়েটা গ্রামের মেয়ে, সাদামাঠা সাজগোজ, গুছিয়ে কথা বলতে পারে। মেয়েটা সিভিতে লিখে রেখেছে প্রচুর পুরস্কার পেয়েছে বলে। দেখে শুনে কাজের বলেই মনে হলো মিন হুয়ের।

সে রাতে যখন সে বাড়ি পৌঁছোলো মেয়েটির সাথে জিয়া জুনের আলাপ করিয়ে দেবার জন্য, দেখা গেলো যে জিয়া জুন খুব খুশিই হয়েছে। ও টিউশনের খরচটার দায়িত্ব নিতে চাইলো।

“আমি টাকা দিয়ে দিয়েছি। অনেক টাকাও নয়।” বললো মিন হুয়ে নুডল রাঁধতে রাঁধতে, “তুই যখন পান্ডুলিপির জন্য টাকা পাবি, তখন আমাকে ভালো করে খাইয়ে দিস।”

“শিয়া শিয়া নি, জিয়েজিয়ে।” বললো জিয়া জুন।

মিন হুয়ের সব কিছু টক লাগতে লাগলো, প্রায় কেঁদেই ফেললো, “তুই …, কী বলে ডাকলি আমাকে এক্ষুণি?”

“জিয়েজিয়ে,” চেন জিয়া জুনের মুখময় রক্তিমা ছড়িয়ে গেলো, “তুমি আমার থেকে দু বছরের বড়ো। আমি কী তোমাকে ঠিক ডাকে ডাকছি?”

“আমাকে মাশরুম দিয়ে ডিম ভাজা করতে দাও।” চেন জিয়া জুন রেফ্রিজেরেটর খুললো আর হঠাৎ করে সু ছন মাথা গলিয়ে দিলো, “শুশু, হংদৌ বিং।”

হংদৌ বিং (পপসিক্ল Red Bean Ice)


“এই যে।” জিয়া জুন একটা পপসিক্ল দিলো, কিন্তু মিন হুয়ে কেড়ে নিলো, “রাতের খাবারের আগে মিষ্টি খেও না, যত্ন না নিলে দাঁত খারাপ হয়ে যাবে, বড়ো হলে সু ছন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দেখতে পুরুষ হবে যার দাঁতগুলো ধবধবে সাদা, তাই না ছন ছন?” 

“মা, আমার খুবই তেষ্টা পেয়েছে, আমি কী এক কামড় খেতে পারি?”

মিন হুয়ে গ্লাসে জল ঢেলে হাঁটু মুড়ে বসলো সু ছনের সামনে, “তেষ্টা পেয়েছে যখন তখন জল খাও।”

“জিয়েজিয়ে, তুমি না ভীষণ কড়া।” চেন জিয়া জুন হাসতে হাসতে বললো। যবে থেকে ছেলেটা মিন হুয়ের ফ্ল্যাটের উল্টোদিকের ফ্ল্যাটটায় থাকতে শুরু করেছে, তবে থেকে ও মিন হুয়েকে ‘মিন হুয়ে’ বলেই ডাকতো। এই প্রথমবার ও মিন হুয়েকে ‘জিয়েজিয়ে’ বলে ডাকল।

মিন হুয়ের বুকের মধ্যে যেনো খানিকটা ওম টলটল করতে লাগলো। কিছুতেই না ভেবে পারলো না যে যদি সু তিয়াঁ বেঁচে থাকতো, তবে এমন বিচক্ষণ ভাইকে দেখে সে নিশ্চয়ই খুব খুশি হতো।

“ওহ, যা হোক” চেন জিয়া জুন পকেট থেকে একটা ব্যাঙ্ক কার্ড বার করে খাবার টেবিলে রাখলো, ডিম ফ্যাটাতে ফ্যাটাতে, “আমি দু লাখ য়ুআঁ ফেরত পেয়েছি, যেটা তুমি সেদিন দিয়েছিলে।”

মিন হুয়ে ছেলেকে জল খাওয়াচ্ছিলো। এক মূহুর্তের জন্য ওর মুখে হাসি থমকে গেলো, “কোন দু লাখ য়ুআঁ?”

“সে যে শও গ্য আমাদের ভয় দেখিয়ে যে দু লাখ য়ুআঁ আদায় করে ছিলো।” বললো, চেন জিয়া জুন।

“হেই, তুই আবার অদের সাথে মারপিট করতে যাচ্ছিস না। তাই তো?”

মিন হুয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলো আর তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়ালো, “ঐ দু লাখ য়ুআঁ ওরা নিশ্চয়ই সৎ কোনো উপায়ে তোকে ফেরত দেয় নি।”

চেন জিয়া জুন ঘুরে দাঁড়ালো আর কলের জলে মাশরুমগুলো ধুতে গেলো, “দেখো আমি তোমাকে আগে বলতে চাই নি। কিন্তু তুমি কী জানো যে গত সপ্তাহে শও গ্য আবার এসে ছিলো আমার কাছে এই জন্য যে দু লাখ যথেষ্ট নয়, ওর আরো দু লাখ চাই।”

“...”

সেদিন টাকাটা দেবার সময়ে মিন হুয়ের সামান্য অনুতাপ হয়ে ছিলো বই কী। সামান্য যদিও। কিন্তু হয়ে ছিলো। এই জন্য অনুতাপ হয় নি যে টাকার পরিমাণটা বড্ডো বেশি। বরং অনুতাপ এই জন্য হয়ে ছিলো যে ও যেনো বড্ডো সোজাসুজি ওদেরকে জানিয়ে দিয়ে ছিলো যে “টাকার অবস্থা খারাপ নয়, ভালোই”। শুরুতেই আগে সম্মত হবার দরকার ছিলো, আর তারপরে টাকাটাও দেওয়া উচিৎ ছিলো খেপে খেপে, একাধিক কিস্তিতে, প্রত্যেকবার দেবার সময়ে প্রচুর নাকে কান্না কাঁদা উচিৎ ছিলো। তাতে হয়তো ঐ সব লোকে ঘুরে ঝামেলা করতে আর আসতো না।

“এই লোকটা পাগল। আন্ডারওয়ার্ল্ড এরকম করে কাজ করে না। ওকে একটা শিক্ষা দেবার দরকার ছিলো।”

চেন জিয়া জুনের মত আলাদা, “ও আমাকে রফা করতে বলে ছিলো ছুরির আগায়। আমি ওকে ভীষণ পিটিয়েছি। বাধ্য করেছি ওকে ওখানেই দাঁড়িয়ে টাকাটা ফেরত দেওয়াতে।”

“তোর কী মনে হয়, এতে সমস্যা মিটে যাবে?”

“নিশ্চয়ই।”

“জিয়া জুন – -”

পরের কুড়ি মিনিট ধরে মিন হুয়ে সমানে বোঝাতে লাগলো চেন জিয়া জুনকে, যার মর্মার্থ হলো, “হিংসার পথ নিও না।”

“কিন্তু ওকেও তো আর সুযোগ দেওয়া যায় না যাতে ও আমাদের সারাজীবন ব্ল্যাকমেল করে।”

“ও কোনো ভাবেই ছাড়বে না।”

মিন হুয়ে যতো ভাবতে লাগলো ব্যাপারটা ততো অস্থির হয়ে উঠলো, “কেমন হয় যদি আমি তোর বাড়িতে থাকি, আর তুই আমার বাড়িতে থাক, কিছু দিনের জন্য?”

“চিন্তা কোরো না। দরজায় একটা সারভেইল্যান্স ক্যামেরা আছে, যদি ও আমাকে খুঁজেও বার করে, ও এই কমিউনিটিতে আসবে না।”

***

মিন হুয়ে ঠিকই ভেবে ছিলো। এটা ওরই সমস্যা।

এক সপ্তাহ পরে মিন হুয়ে সু ছনকে আনতে গেলো কিন্ডারগার্টেন থেকে, কাজ থেকে ফেরার পথে, ই-ডঙ্কিটা ভেঙে গেছে, দুজনে হাত ধরে হাঁটছে, রাস্তার একটা নির্জন কোণ পেরোচ্ছিলো যখন তখন তিনটে গুন্ডা হঠাৎ ওদের রাস্তা আটকালো। গুন্ডাদের নেতা শও গ্য।

ই-ডঙ্কি


মিন হুয়ে কিছু বলতে পারার আগেই শও গ্য সু ছনকে ছিনিয়ে নিয়ে নিজের হাতের মধ্যে খামচে ধরে রাখলো সু ছনের হাত। সু ছন এতো ভয় পেয়ে ছিলো যে ও কাঁদতে শুরু করলো, ছটফট করতে লাগলো, হাওয়ায় লাথি কষাতে লাগলো জোরে জোরে, শও গ্যর সারা শরীর আঁচরে দিলো তার ছোট্টো দুটো হাত দিয়ে।

“মা! কিছু করো” চেঁচিয়ে উঠলো সু ছন, ওর মুখটা তখনই বেগুনি হয়ে গেছে, “মা, আমার ভয় করছে। মা, মা –”

বাচ্চাটা চেঁচাচ্ছে দেখে শও গ্য একটা থাপ্পড় কষালো সু ছনের গালে। আর কষিয়েই ভয় পেলো যে ছেলেটা বুঝি মরেই গেলো।

মিন হুয়ে সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে বা ফোন করতে সাহস করলো না। বেশ খানিক ক্ষণ বিভ্রান্ত হয়ে রইলো সেই জন্যই হাঁটু মুড়ে বসে দয়া ভিক্ষা করতে লাগলো, “শও গ্য! শও গ্য! যদি আপনার কিছু বলার থাকে, আপনি কী দু লাখ য়ুআঁ চান আবার? আমার কাছে আছে, আছে আমার কাছে! আমি এখনই দিতে পারবো! মোবাইল ট্রান্সফার করতে পারবো! দয়া করে আমার ছেলেটাকে মারবেন না!”

“নিকুচি করেছে! শেষবারে চেন জিয়া জুন আমাকে গলা টিপে মেরেই ফেলছিলো আরকি, আর তুই চাস সেটা দু লাখে রফা হয়ে যাবে? কিছুতেই না! পকেটে হাত দিস না, ফোন খুলিস না, তুই ঝামেলা করতে চাস তো, বিশ্বাস কর, আমি ওকে মেরেই ফেলবো!”

শও গ্য মুঠোয় ধরে ভয়ানক ঝাঁকাতে লাগলো সু ছনকে, “আমি খবর নিয়েছি, তুই কোম্পানির ডিরেক্টর। আর তোর ছেলের হার্টের ব্যামো আছে।”

ঝাঁকানির চোটে সম্ভবত সু ছনের জ্ঞান ফিরে এসে ছিলো, তখনই কেঁদে উঠলো ছেলেটা। উদ্বেগে কাঁপতে লাগলো মিন হুয়ে। কাঁপা স্বরেই বললো, “আমি নড়বো না, আমি মোটেই নড়বো না! যা বলবে তাই করতে রাজি আছি।”

“ফোনটা ছুঁড়ে দাও এদিকে।”

মিন হুয়ে ফোনটা বার করে ছুঁড়ে দিলো।

“পাওয়ার-অন পাসোয়ার্ড?”

“এক ছয় সাত নয়।”

“আমার দশ লাখ য়ুআঁ চাই। তুই বল, আমি কাজ করছি।”

শও দাদা ছুঁড়ে দিলো সু ছনকে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সঙ্গীর দিকে। মিন হুয়ের ফোনটা নিয়ে বেশ দক্ষতার সঙ্গেই ফোনটা চালু করলো।

“শও গ্য, দু লাখ য়ুআঁ অবধিই দেওয়া যায় মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। আমি বাকি টাকাটা কালকে দেবো। কথার খেলাপ হবে না। নিশ্চিত থাকুন টাকা আপনার হাতে যাবেই -”

ভয়ে, উদ্বেগে মিন হুয়ের চোখ ছাপিয়ে চোখের জলের ধারা গড়িয়ে পড়লো গালে।

যদিও মিন হুয়ের রোজগার কম নয়, যদিও ওর রোজকার খরচ খুবই কম, তবুও ওর কাছে দশ লাখ য়ুআঁ নেই, কারণ ও মাত্র কয়েকবছর কাজ করছে। একবার ওর মনে হলো যে ও ধার করতে পারবে সাও মু বা ঝৌ রু জির থেকে, -

“তাহলে এখন দু লাখই দে। আমাকে পেমেন্ট পাসওয়ার্ডটা বল।”

মিন হুয়ে মুখ খুলতেই যাচ্ছিলো, এমন সময়ে শুনতে পেলো একটা মোটর সাইকেলের গর্জন আসছে ওর পিছন থেকে, ও ঘুরে তাকালো, দেখতে পেলো চেন জিয়া জুন একটা ই-ডঙ্কিতে চড়ে পূর্ণগতিতে ধেয়ে আসছে শও দাদার দিকে।

জিয়া জুনের চোখগুলো লাল, আর মুখে একটা মরিয়া অভিব্যক্তি।


সব্বাই পিছিয়ে গেলো, এড়িয়ে গেলো ওর পথ। সামনে গিয়ে হুড়মুড়িয়ে পড়বে দেখে, চেন জিয়া জুন কষে ব্রেক লাগালো, নেমে পড়লো লাফ দিয়ে, একটা ইঁট তুলে নিলো রাস্তা থেকে আর সেটা ছুঁড়ল শও দাদার দিকে।

গুন্ডা শও দেখে ছিলো যে জিয়া জুন তেড়ে আসছে ওরই দিকে। অন্যদিকে দুজন পথচারী যাঁরা এদিককার আওয়াজ পেয়েছেন, তাঁরাও এসে হাজির হলেন। শও দা ভয়ে পেয়ে গেলো যে এই বুঝি কেউ তার ছবি তুলে নেবে, তাই সে একটা সিটি দিলো। তার সহকারী সু ছনকে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিলো, ঘুরে দাঁড়িয়ে দৌড় লাগালো পালিয়ে যাবে বলে। একটু পরে, দলটার আর কোনো চিহ্ন রইলো না। 

“ছন ছন!”

মিন হুয়ে দৌড়ে গেলো সু ছনকে নিজের দুহাতে জড়িতে ধরার জন্য। ছেলেটার ঠোঁট আর আঙুলের ডগা কালো হয়ে গেছে। সারা শরীরের ত্বক যেনো পাঁশুটে রঙা, মুখের চামড়া স্বচ্ছ হয়ে উঠেছে, ত্বকের নিচে নীল রক্তবাহগুলো জেগে উঠেছে। ছেলেটা গুনগুন করে কিছু একটা বললো, শোনা গেলো না, হাত চাপা দিলো বুকে, বড়ো হাঁ করে দ্রুত শ্বাস নিলো কয়েকবার, তারপর হঠাৎ চোখ বন্ধ করে দিলো, চেতনা হারালো।

এমন দৃশ্য জিয়া জুন আগে কখনো দেখেনি। হতবাক হয়ে পড়লো।

“অ্যাম্বুলেন্স ডাক।” ছেলেকে কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো মিন হুয়ে আর দৌড়োতে শুরু করলো।

“দেরি হয়ে গেছে।” জিয়া জুন মাটির থেকে তুলে নিলো ই-ডঙ্কিটাকে, “হাসপাতাল সামনেই, বসে পড়ো গাড়িতে, আমি তোমাকে নিয়ে যাবো।”

মিন হুয়ে সু ছনকে জড়িয়ে ধরলো, বসলো ই-ডঙ্কির পেছনের সিটে। মা আর ছেলেকে নিয়ে পূর্ণ গতিতে গাড়ি চালিয়ে জিয়া জুন চললো হাসপাতালে।

*** 

কপাল ভালো, ঝৌ রু জি তখনো কাজ করছিলো হাসপাতালে। দৌড়ে ওয়ার্ডে পৌঁছে জরুরি চিকিৎসার সমস্ত ব্যবস্থায় লেগে গেলো মিন হুয়ের টেক্সট মেসেজ পাওয়া মাত্র।

সু ছনের অসুখে পড়া এই প্রথম নয়। কিন্তু এই প্রথমবার অসুখ এতো ভয়াবহ যে সু ছন কোমায় চলে গেছে।

আগে, যখন ঝৌ রু জি সঙ্গে ছিলো, তখন বাচ্চার শরীরের যে কোনো লক্ষণ - যেমন হাঁপধরা, রাতে ঘামা, সায়ানোসিস, হৃৎস্পন্দনের বেড়ে যাওয়া - ঝৌ রু জিকে সতর্ক করে দিতো আর তখনই বাচ্চাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া যেতো পরীক্ষা করানোর জন্য। 

সু ছনের জন্মের পরে, প্রথম তিন বছর মিন হুয়ে সাহসই করে নি বাড়ির বাইরে গিয়ে কাজ করতে, যাতে সু ছনের প্রতি কোনো অবহেলা না হয়। ও বাড়িতে থেকেই কাজ করেছে। সু ছন শান্ত বাচ্চা। খেলতে বা মারপিট করতে পছন্দ করে না। কিন্ডারগার্টেনের টিচাররাও সু ছনের খুব যত্ন নেন। ওকে কোনো ভারি পরিশ্রমের অনুশীলনে নেন না। সেই জন্যই এতোগুলো বছর সু ছন যত্নে সুরক্ষিত ছিলো, যদিও ওর হার্টের অসুখ আছে, কিন্তু তাতে ওর স্বাভাবিক জীবনে কোনো বিঘ্ন ঘটে নি।

কিন্তু, মিট্রাল ভাল্ভ ম্যালফর্মেশন এর কারণে সামান্য গঠনগত পরিবর্তন ঘটলেই সু ছনের অবস্থা গুরুতর হয়ে দাঁড়াবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে। হৃৎপিন্ডের সুস্থতার জন্য আর দুর্ঘটনা এড়াতে অস্ত্রোপচার করে সারাইয়ের চেষ্টা করতেই হবে একবার না একবার।



মিন হুয়ে জানতো এ দিনটা একদিন আসবেই, আর ভাবতো যে সেই দিনটা অনেক দূরে নিশ্চয়ই। 

যেহেতু ভালভের সার্জারি মানে থোরাকোটমি হবে মানে বুক অন্তত পঁচিশ সেন্টিমিটার মতো মানে প্রায় দশ ইঞ্চি লম্বা ক্ষত হবে বুকে। ডাক্তার বুকের মধ্যেকার পাঁজর জোড়ার ফলকের মতো হাড়টাকে চিড়ে ফেলবেন, কেটে ফেলবেন হৃদপিন্ডকে ঘিরে থাকা আবরণটা, থামিয়ে দেবেন হৃদপিন্ড, তা সত্ত্বেও যাতে শরীরের বাকি সব অঙ্গে রক্ত চলাচল না থামে তার জন্য শরীরের বাইরের যন্ত্র দিয়ে হৃদপিন্ড আর ফুসফুসের কারবারে যেভাবে রক্ত শুদ্ধ হয়ে যারা শরীরে ছড়িয়ে যায় আর সারা শরীর থেকে রক্ত ফিরে আসে শোধনের জন্য সেই ব্যবস্থাটা তৈরি করবেন, তবে সারাই হবে হৃদপিন্ড।

বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এ যাতীয় অস্ত্রোপচারে জীবনের ঝুঁকি অনেক বেশি। 

সেই জন্যই এই কটা বছর মিন হুয়ে সর্বান্তকরণে এই ভাবনাটাকে এড়িয়ে গেছে, অস্বীকার করেছে এই পরিস্থিতিটার কথা ভাবতে। মিন হুয়ে জানে না এই পরিস্থিতিটার মুখোমুখি হবে কিভাবে। ওর আরো দুশ্চিন্তা হলো এই যে সু ছন এই যাতীয় ভয়ঙ্কর অস্ত্রোপচারের ধকল সইতে পারবে কিনা।

সু ছনের অবস্থাটার থেকে নিস্তার পাবার কয়েকটা ব্যবস্থা দেবার পরে, কয়েকটা পরীক্ষা-নিরিক্ষা করার পরে, সু ছনকে আবার ওয়ার্ডে ফিরিয়ে দেওয়া হলো। যে ডাক্তার সু ছনকে দেখছিলেন তাঁর সঙ্গে কয়েকটা কথা বলার বলে ঝৌ রু জি মিন হুয়ের কাছে এসে জানালো, “এখনকার মতো সু ছন খানিক সামলে উঠেছে। কিন্তু ওর হৃদপিন্ড দুর্বল হয়ে আছে এখনো। হৃদপিন্ড বড়োও হতে শুরু করেছে। যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করতে হবে।”

মিন হুয়ের হৃদপিন্ড থমকে গেলো এক মূহুর্তের জন্য : দিনটা তাহলে এসেই গেলো। ঝৌ রু জির হাত শক্ত করে ধরলো মিন হুয়ে, অসহায় তাকালো ঝৌ রু জির দিকে, “ও তো এখনো খুব বাচ্চা। আর একটু অপেক্ষা করা যাবে না? আমার একটাই ভয় যদি আমার ছেলেটা এই অপরেসনের ধকল না নিতে পারে?”

“আমরা আর অপেক্ষা করতে পারবো না। ওর ভাল্ভটা সারাতেই হবে যতো শিগগির সম্ভব যাতে রক্তের ব্যাকফ্লো মানে রিগারজিটেশন মানে ভাল্‌ভ দিয়ে রক্ত লিক করা আটকানো যায়। আজকের ব্যাপারটাই একটা খুব কঠিন সংকটজনক লক্ষণ।” 

ম্লান মুখে জিজ্ঞেস করলো মিন হুয়ে, “কী করবে এখন?”

“প্রথমে আমরা চেষ্টা করবো যাতে ভাল্ভটা সারাই করা যায়। যদি দেখা যায় যে ভাল্‌ভটার অবস্থা এতোই খারাপ যে ওটা সারানো যাবে না, তাহলে ওটা বদল করতে হবে। দু ধরণের কৃত্রিম ভাল্‌ভ হয়, মেকানিক্যাল আর বায়োলজিক্যাল।”

ঝৌ রু জি ব্যাখ্যা করতে লাগলো, “মেকানিক্যাল ভাল্‌ভ বেশি দিন টেকে। যদি জিনিসিটা মানানসই হয় তবে ওটা বদলানোর দরকার নাও হতে পারে পরের কয়েক দশক ধরে, কিন্তু এটা ব্যবহার করতে হবে সারা জীবন। আর অ্যান্টিকোয়াগুলান্টস। বাচ্চাদের বয়স সাধারণত সাত বা আট হওয়া অবধি অপেক্ষা করতে হয় এই ভাল্‌ভ তাদের শরীরে লাগানো অবধি। বায়োজিক্যাল ভাল্‌ভ সাধারণত শুয়োরের হৃদপিন্ড বা গবাদি পশুর হৃদপিন্ডের থেকে বানানো হয়। অ্যান্টিকোয়াগুলান্টস লাগে না। তবে এগুলো খুব শক্তপোক্ত হয় না। ওগুলোকে আবার বদলানোর দরকার হয় অনেক সময়ে।”

“বুকটা কাটা কী খুবই জরুরী?” মরিয়া হয়ে জানতে চাইলো মিন হুয়ে, “আমি শুনেছি অনেক সার্জারি আছে যাতে বড়ো করে বুক কাটার দরকার হয় না, এমন কী রোবোট দিয়েও সার্জারি হয়ে যায়।”

“ওগুলোর কোনোটাই এখনো খুব পরিণত নয়। রঙীন আল্ট্রাসাউন্ড থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ছনছনের অবস্থাটা বেশ জটিল। ওর অবস্থাটাতে চলতি ওপেন হার্ট সাজারিই বেশি নিরাপদ।”

নিচু স্বরে বললো ঝৌ রু জি, “তুমি একদম চিন্তা কোরো না। আজকাল এ জাতীয় অপরেসন অনেক বেশি হারে সফল হয়।”

“কিন্তু ওর তো এখন মাত্র তিন বছর বয়স!” মিন হুয়ে থাকতে পারলো না আর, ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো।

“হ্যাঁ, বাচ্চাদের এ জাতীয় অপেরশনের জন্য উচ্চমানের প্রযুক্তি লাগে।” ঝৌ রু জি ধীরে ধীরে মিন হুয়ের হাত ধরে ঝাঁকাতে লাগলো মিন হুয়েকে স্বান্তনা দেবার জন্য, “বাচ্চাদের হার্টগুলো ছোটো আর ওদের রক্তবাহগুলোও অনেক বেশি ঠুনকো।”

“বিনচেং-এ সেরা কে?”

“কার্ডিওলজিস্ট?”

“ওয়াং ইশ, যিনি এই মাত্র ছনছনের প্রাণ বাঁচালেন তিনিই সেরা আমাদের হাসপাতালে।”

“এঁর থেকেও ভালো কেউ আছেন?”

ঝৌ রু জি ঘাড় নেড়ে বললেন, “আঁ জি হাসপাতালের চেং গুয়াং য়ি বাচ্চাদের হৃদপিন্ডের অসুখের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সেরা। কিন্তু সহজে তাঁকে রাজি করানো যায় না। বিন চেং-এ তিনি সেরা, এমন কি বলা যায় সারা দেশে তিনিই সেরা। চিকিৎসা জগতে তাঁর ডাক নাম ‘চেরি’।”

“চেরি?”

“কখনো জন্মদিনের কেক খেয়েছো? সব থেকে ওপরে ক্রিমের স্তর থাকে একটা। তার ওপরে থাকে একটা চেরি। যদি সারা দেশের হার্ট সার্জারির এক্সপার্টদের কেকের সাথে তুলনা করা হয় তো চেং গুয়াং য়ি ক্রিমের ওপরের চেরি।”

“সে তো ভালো কথা।” হড়বড় করে বললো মিন হুয়ে, “আমরা তাহলে এখনই আঁ জিতে ট্রান্সফার করে দি ছনছনকে। আর চেং গুয়াং য়িকে অনুরোধ করি অপরেসন করার জন্য।”

“উনি এখন চোঙ্গুয়োতে নেই।”

“কী?”

“উনি এখন সিঙ্গাপুরে একটা অ্যাকাডেমিক এক্সচেঞ্জে গেছেন। আগামী তিন মাস আসবেন না।”

“তাহলে আমি কাল সিঙ্গাপুরে যাবো, ওঁর কাছে প্রার্থনা জানাবো ফিরে আসার জন্য।” বলে ফেললো মিন হুয়ে।

“আমার আশঙ্কা তুমি নিশ্চয়ই এসব করবে না।” ঝৌ রু জি দেখলো মিন হুয়ের দিকে, একটা লম্বা শ্বাস ফেললো, চুপ করে গেলো।

"কেনো? আমি জানি ওঁকে নিমন্ত্রণ করে আনা কঠিন। কিন্তু আমি সব কিছু করতে রাজি আছি, ওঁকে নিমন্ত্রণ করে আনার জন্য।”

“উনি চেং ছিরাং-এর বাবা। আর অসংখ্য লোক তাঁর কাছে প্রার্থনা করে চলেছে রাতদিন।” বললো ঝৌ রু জি, “শুধু তোমার ছেলের জন্য দেশে ফেরা চেং গুয়াং য়ির জন্য অসম্ভব।”

সেই মূহুর্তে মিন হুয়ের মনে হলো র মস্তিষ্ক যেনো রক্তশূণ্য হয়ে গেলো ঝৌ রু জি যা বললো তাতে।




~~~~~~~~~~~~

সম্পূর্ণ বই বিনামূল্যে : https://dl.bookfunnel.com/lcj5vznt96

Link to Previous Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/09/jpda-chapter-28.html

Link to following Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/09/jpda-chapter-30.html

Readers Loved