Saturday, October 12, 2024

JPDA - Chapter 67

 ৬৭. সামনে উঁচু পাহাড়



সু তিয়াঁর সমাধি ছিয়াঁ শ্যন চ্যাঙ্গল সমাধিক্ষেত্রে, বিনচেং-এর পুব দিকে।

শিন ছি বেছে নিয়েছে সমাধির জন্য জোড়া কেন্দ্রস্তম্ভ। আর ওর নিজের সমাধির জায়গাটাও ধরে রেখেছে। মার্বেল পাথরের ফলকে সু তিয়াঁ আর শিন ছির নাম খোদাই করা আছে। শুধু শিন ছির মৃত্যুর সালের জায়গাটা খালি রাখা আছে।

মিন হুয়ে যখন জানতে পারলো কথাটা, তখন ও জিয়া জুনের সঙ্গে একবার গিয়ে ছিলো শ্রদ্ধা জানাতে। 

যে দিন সু তিয়াঁর অবশেষ খুঁজে পাওয়া গিয়ে ছিলো, সে দিন শিন ছির লাগামহীন দোষারোপ আর মিন হুয়ে সইতে পারে নি। ট্রেনে চেপে একাই বিনচেং-এ ফিরে এসে ছিলো।

পরের দিন জিয়া জুনও ফিরে এসে ছিলো। ও জানিয়ে ছিলো মিন হুয়েকে যে শিন ছি আর দেঁ চেন রয়ে গেছে খোঁড়ার কাজটা চালিয়ে যাবার জন্য যাতে সু তিয়াঁর বাকি অবশেষ তুলে আনা যায়।

খবর শুনে মুশুইহে শহরের পুলিশ বিভাগ দুজন পুলিশকর্মীকে পাঠিয়ে ছিলেন যার মধ্যে একজন চেন শিয়েংশঁ যিনি ঘটনার তদন্ত করে ছিলেন সেই সময়ে। তাই উনি শিন ছি আর দেঁ চেনকে সু তিয়াঁর অবশেষ তোলার ব্যাপারটাতে প্রশাসনের কাজের অংশটাতে সাহায্যও করে ছিলেন।

দু দিন পরে, ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল বের হয়ে ছিলো। তাতে প্রমাণ হয়ে যায় অবশেষটা সু তিয়াঁ কিংবা লি চুন মিয়াও-এরই।

যখন সব কিছু দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে উঠলো, তখন মিন হুয়ের মনটা আগের থেকেও বেশি ভারী হয়ে উঠলো যেনো।

তার ওপর, শিন ছি ওর সাথে সমস্ত যোগাযোগ ছিন্ন করে ফেলেছে। পুরো পরিস্থিতিটা মিন হুয়েকে যেনো একটা ঘোরের মধ্যে ঠেলে দিলো অনেক দিনের জন্য, খেতে পারে না, এমনকি প্রোগ্রাম লেখার কাজে আর বাগ ঠিক করার কাজেও আর উৎসাহ পায় না যেনো। ওর দুশ্চিন্তা হতে থাকে যে ওর ছেলেটা বুঝি রোজ ন্যানির সঙ্গে কাটাবে। তাই ছেলেকে ফেরত এনে নিজের কাছে রেখে দিয়েছে, মিংসেন কমিউনিটির অ্যাপার্টমেন্টে।

রাতে সু ছন ওর সঙ্গে থাকে। ছেলেকে ঘুম পাড়ানোর পরে সারা রাত মিন হুয়ে চোখ মেলে থাকে, ছাদ দেখতে থাকে ভোর পর্যন্ত।

যখন দিনের বেলা কাজে যায়, ওকে সাও মু বলে দুম করে অফিস ছেড়ে যেনো বেরিয়ে না যায় ও।

চেং ছিরাং আর দিঁ য়িফঁ দু জনেই মিন হুয়ের সঙ্গে ঝামেলা করার জন্য মুখিয়ে আছে। যেহেতু ঝেং ল্যান সদ্য গত হয়েছেন, গুয়ান ছাও-এর ওপরতলায় ক্ষমতার নানান রদবদল চলছে। বেশ কিছু দিন ধরে চেং ছিরাং আর মিন হুয়ের দিকে মন দিতে পারছে না, ওকে উদয়াস্ত ব্যস্ত রাখতে পারছে না। তাই নিরুপায় মিন হুয়ে ঘোরের মধ্যেই অফিসে কাটায়, হাবিজাবি খায়, এক সপ্তাহের মধ্যে ওজন বাড়িয়ে ফেললো সাত ক্যাটি মানে চার কেজিরও বেশি।

কয়েক দিন পরে, মোবাইল ফোনের ক্যালেন্ডার মনে করিয়ে দিলো যে পরের দিনটাই ঝৌ রু জির জন্মদিন। মিন হুয়ের হঠাৎ মনে পড়ে গেলো ওকে ঝি ঝু যে কাজটা দিয়ে ছিলো সেটার কথা। ক্লোজেট খুঁড়ে ও দুটো ব্যাগ বার করে আনলো, দু জোড়া জুতোর, যেগুলো ও শিন ছিকে দিয়ে আনিয়ে ছিলো ইউনাইটেড স্টেটস্‌ থেকে। দোকান থেকে যত্ন করে উপহারের মতো বেধে দিয়েছে দু জোড়া ড্যান্সকো জুতো। কাজে যাওয়ার পথে মিন হুয়ে হাসপাতালে গেলো ঝি ঝুয়ের সঙ্গে দেখা করবে বলে। যেহেতু ঝি ঝু বলে ছিলো ঝৌ রু জির জন্মদিনে ওকে একটা চমক দেবে, তাই মিন হুয়ে ভাবলো যে চুপচাপ উপহারটা এনে আগেভাগে ঝি ঝুকে দিয়ে রাখাই ভালো।

চেনা পথ ধরে ও পাঁচ তলায় পৌঁছোলো। ওয়ার্ডে গিয়ে দেখলো যে সব খাঁ খাঁ খালি। নতুন চাদর পাতা আছে টান টান করে, কোথাও কোনো ভাঁজ নেই।

মিন হুয়ে চমকে উঠলো এক মূহুর্তের জন্য। ভাবলো ও বুঝি ভুল ঘরে ঢুকে পড়েছে। বাইরে গিয়ে ঘরের নম্বর দেখে নিশ্চিত হতে গেলো, পাশ দিয়ে যাওয়া একজন নার্সকে ধরে জানতে চাইলো, “এখানে যে রুগি ছিলো তিনি কোথায়? ঘর বদলানো হয়েছে কী?”

“কী নাম রুগির?”

“ইয়াও ঝি ঝু।”

“উনি মারা গেছেন।”

মিন হুয়ে এতো ভয় পেলো যে ওর হাত কাঁপতে শুরু করলো, ওর হাত থেকে উপহারের বাক্সদুটো পড়ে গেলো মেঝেতে, “কখন?”

সেই দিন। মিন হুয়ে ব্যবসার কাজে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলো সারা দেশে কিছু আগের যে সময়টাতে, ও মাত্র দু বার দেখা করতে পেরে ছিলো ঝি ঝুয়ের সাথে, যখন বিনচেং-এ ফিরে ছিলো।

ঝৌ রু জি জানতো যে মিন হুয়ে কাজ নিয়ে ব্যস্ত। তাই ইচ্ছে করেই ও কিছু জানায় নি মিন হুয়েকে। ওর সাথে কোনো যোগাযোগও করে নি দু সপ্তাহের ওপরে। ও কিছু বলে নি, না হলে মিন হুয়ে ট্রেনে চড়ে ফিরে আসতো পুরো পথ শুধু ঝি ঝুয়ের অন্ত্যেষ্টিতে উপস্থিত হবার জন্য …

মিন হুয়ের সাথে ঝি ঝুয়ের সম্পর্কটা কাছের ছিলো, আবার দূরেরও। ওরা দুজনে বন্ধু বা পরিচিতও নয় একে অপরের, কেবল ওরা দু জনে একটাই পুরুষকে বিয়ে করে ছিলো। এই আর কী। আর একে অপরের সঙ্গে ওদের আলাপের অধিকাংশটাই ছিলো সামাজিক শিষ্টতায় বাধা, আন্তরিক কিছু নয়।

“ঝৌ ইশঁ কোথায়?" জানতে চাইলো মিন হুয়ে।

“অফিসে।”

মিন হুয়ে দু জোড়া জুতো নিয়ে চললো পাঁচ তলার অন্য প্রান্তে। সেই মূহুর্তেই ঝৌ রু জি ওয়ার্ডে ঘুরে ঘুরে রুগি দেখা শেষ করে এসে পৌঁছোলো।

ওর খুব কোনো পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হলো না। শান্ত অভিব্যক্তি, ঝকঝকে চোখ, চেহারা মোটেই বিধ্বস্ত নয়। মিন হুয়ে জানে যে ও সারা দিন সংকটজনক শারিরীক অবস্থায় থাকা রুগিদেরই দেখে, ও জীবন মৃত্যু দুটো দেখতেই অভ্যস্ত, ওর আবেগে সচরাচর কোনো অভিঘাত তৈরি হয় না। জীবন যাপণের ক্ষেত্রেও তাই। যেমন দুটো মানুষের বিয়ে আর বিচ্ছেদের পুরো ব্যাপারটা ভীষণ শান্ত, কোনো ঝগড়াঝাঁটি নেই, আবেগের কোনো ব্যাপক ওঠা কিংবা পড়া নেই। কিন্তু এর বিপরীতে গিয়ে ও মারপিট করেছে, মেজাজ হারিয়েছে ঝি ঝুয়ের জন্য - আবেগের বিরল একটা অভিব্যক্তি।

সেই জন্য মিন হুয়ে ঠাট্টাও করতো যখন ওরা এক সঙ্গে ছিলো যে ওদের দুজনের এক হয়ে যাওয়া উচিৎ। ঝৌ রু জি তর্ক করতো যে ও সব সময়েই এই রকমই।

পরে, মিন হুয়ে যখন ঝি ঝুয়ের সঙ্গে অনেক গল্প করেছে, তখন ঝি ঝুও বলেছে যে ঝৌ রু জির মেজাজ খুব ভালো, ধীর, স্থির, হতে পারে এই জন্য যে ও প্রায়ই উদ্বিগ্ন রুগিদের মুখোমুখি হয় আর স্বাভাবিক ভাবেই একটা ভীষণ ভদ্র কেজো ব্যক্তিত্ব তৈরি করে ফেলেছে।

কেউ জানে না ওর বুকের ভেতরে কী তোলপাড় যে চলছে।

দুজনে কথা বললো ঝি ঝুয়ের শেষ মুহুর্ত নিয়ে। ঝৌ রু জি বললো, “ও বড্ডো তাড়াতাড়ি চলে গেলো, হঠাৎ করে নয়। শেষ দু দিনে ওর কথা বন্ধ হয়ে গিয়ে ছিলো, শুধু আমার দিকে তাকিয়ে থাকতো, যেনো কিছু রয়ে গেছে যা ও বলতে পারলো না।”

কথা বলে হয়ে যেতে ও মেঝেতে রাখা জুতোর জোড়া দুটো পায়ে গলিয়ে নিলো। তারপর একটু চলাফেরা হাঁটাহাঁটি করে দেখলো। জুতো জোড়া দুটো একদম মাপসই হয়েছে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঝৌ রু জি বললো, “হয়তো ও বলতে চাই ছিলো যে ও আমার জন্য দু জোড়া জুতো কিনেছে।”

কথা শেষ করে, খানিক ক্ষণ মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে রইলো।

মিন হুয়ে মন খারাপ না করে পারলো না। অনুশোচনা হতে লাগলো যে ও জুতোর জোড়া দুটো কেনো আগে নিয়ে আসে নি, আগে নিয়ে এলে ঝি ঝু নিজে হাতে ঝৌ রু জিকে উপহারটা দিয়ে যেতে পারতো মারা যাবার আগে, ওর দেওয়া জন্মদিনের শেষ উপহার।

অনেক ক্ষণ ধরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, মিন হুয়ে ঝৌ রু জির কাঁধে চাপড় মেরে জানতে চাইলো, “এমন একটা বড়ো ব্যাপার, তুমি আমাকে আগে কেনো জানাও নি?”

“আমি ভেবেছি যে তুমি ব্যবসার কাজে বাইরে গেছো। আমি অপেক্ষা করতে চেয়ে ছিলাম তুমি ফেরা পর্যন্ত। ঝি ঝুয়ের মা-বাবা খুবই ভেঙে পড়েছেন। জোর করে অস্থিভস্ম সঙ্গে করে ওঁদের ওখানে নিয়ে গেলেন। আমি ওঁদের সঙ্গে শিংজিয়াং গিয়ে ছিলাম, ঝি ঝু-এর জন্য একটা সমাধির জায়গা খুঁজতে সাহায্য করেছি ওঁদের, অন্ত্যেষ্টিও ওখানেই হয়েছে। আমি তো সবে মাত্র গতকাল ফিরেছি।”

“তুমি কী কাজের পর ফাঁকা আছো? কোথাও যাবে, একসাথে মদ খাবো?" প্রস্তাব দিলো মিন হুয়ে।

“অন্য কোনো দিন। দুপুরে আর বিকেলে, সন্ধেবেলা সার্জারি আছে। পুরো সময়টা ভর্তি।”

বাঁকা হেসে ঝৌ রু জি বললো, “আমি ঠিক আছি।”

“এমন একটা সময়ে তুমি কাজ করছো কী করে? তোমার বাড়ি গিয়ে বিশ্রাম নেওয়া উচিৎ। অথবা কোথাও গিয়ে আরাম করা …”

কোনো একটা কারণে, ঝৌ রু জিকে যতো শান্ত দেখাচ্ছে, মিন হুয়ের মন ওর জন্য ততোটাই বিচলিত হচ্ছে। যদি ঝৌ রু জি চীৎকার করে দোষারোপ করতো মিন হুয়ের ওপরে, যে রকম শিন ছি করে, আর এতো দুঃখ পেতো যে কান্নার তোড়ে রগের শিরা ফেটে যাবে বলে মনে হোতো তাহলে হয়তো মিন হুয়ে এতো ভয় পেতো না।

“কাজ আমাকে সব কিছু ভুলিয়ে দিতে পারে।" বললো ঝৌ রু জি, “যদিও সাময়িক।”

“তাহলে চলো পান করি, মদ নয়, কফি।”

ও জোর করে ঝৌ রু জিকে ধরে নিয়ে এলো একটা এসপ্রেসোর দোকানে। দুজনে এক এক কাপ করে এসপ্রেসো অর্ডার করলো। এতো তেতো সেগুলো যে খাওয়া গেলো না। বরফ দেওয়া জল নিতে হলো তারপরে। 

“একটা গুরুতর অসুখে কারুর মারা যাওয়াটা যতোটা নাটকীয় ভাবছো তুমি, ততোটা নাটকীয় মোটেই নয়।" মিন হুয়ের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে ঝৌ রু জি বললো, “মৃত্যু একটা প্রাকৃতিক আর শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়া। আর জীবনের ব্যবস্থাটা ভেঙে পড়তে থাকে লাগাতার, নিজের শেষের জন্য প্রস্তুতি চলে, যেমন কম্পিউটারে একটার পরে একটা প্রোগ্রাম বন্ধ হয়ে যায় শাট ডাউন করলে। চিকিৎসক হিসেবে, পুরো প্রক্রিয়াটার সম্পর্কে আমার ধারণাটা খুব স্পষ্ট, এমনকি কিছু না হলেও ব্যাপারটা একই। আগে থেকে দিব্যি বলা যায় এটা কোন দিকে যাবে।”

“শুনে মনে হয় যে এটা ভয়ানক।”

কফিটা খুবই তেতো। মিন হুয়ে খুব জোর দিয়ে কাপের নিচের কনডেন্সড দুধ গুলিয়ে নিতে লাগলো, “ঝি ঝু আমাকে একবার বলে ছিলো যে ও তৈরি, আর ওর ভয় এই যে তুমি প্রস্তুত নও, তাই ও আমাকে বলে ছিলো মনে করে তোমার খেয়াল রাখতে।”

“ — — ফল হলো এই যে, আমি তখন ছিলামই না, যখন ঘটনাটা ঘটলো।”

“ও যাবার কদিন আগে, আমি টের পাচ্ছিলাম যে ওর সময় ঘনিয়ে এসেছে, তাই আমি ওর হাত ধরে বসে থাকতাম আর নরম সুরে কথা বলতাম। সব সময়ে ও যে সাড়া দিতো তা নয়। একটা রাতে ও হঠাৎ জেগে উঠলো আর বললো যে ও শিয়া য়ি হ্যাং-কে দেখতে চায়। শেষ মূহুর্তে, আমরা চার জনে, – ওর মা-বাবাকে নিয়ে – ওকে বিদায় জানিয়েছি একসাথে।”

“শিয়া য়ি হ্যাং?" একটা ঘোরের মধ্যে জিজ্ঞেস করলো মিন হুয়ে, “ও কেনো এসে ছিলো এখানে?”

“ঝি ঝু শুধু শুধু কাউকে বিয়ে করার মেয়ে নয়। ও শিয়া য়ি হ্যাং-এর সঙ্গে ছিলো কারণ ও শিয়া য়ি হ্যাং-কে পছন্দ করতো। ঝি ঝু আসতে বলে ছিলো শিয়া য়ি হ্যাং-কে এই জানাতে যে ও শিয়া য়ি হ্যাং-কে ক্ষমা করে দিয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে ও এই বিষয়টা নিয়ে মন খারাপ না করে, আর যত্নবান হয়।”

“এই ছোকরার সময়ে বিবেক জেগে উঠে ছিলো, ওর সামনে খুব কেঁদেছে, বলেছে যে ও খুব দুঃখ পাচ্ছে ঝি ঝুয়ের জন্য। আগে তখন ও এতো অনুভূতিহীন হতে চায় নি, কিন্তু ওর বাবা ওকে ধমকে ছিলেন, ও ভয় পেয়ে ছিলো যে ও হয়তো ঝামেলায় পড়বে যদি ওর বাবার সঙ্গে ও ঝঞ্ঝাট করে তো।”

অপ্রত্যাশিতভাবে ছকটা এরকমই। মিন হুয়ে তাকালো ঝৌ রু জির দিকে। অনেক ক্ষণ কিছু বলতে পারলো না, তার পরে বিদ্রুপের সুরে বললো, “সবাই তো প্রাপ্তবয়স্ক। সবাই মাতাল, কিন্তু কারোরই মেরুদন্ড নেই।”

অমন একটা লোককে, মিন হুয়ে কখনোই এতোটা ক্ষমা করে দেবে না।

“শিয়া য়ি হ্যাং নিজে হাতে ওর অস্থিভস্ম পাহাড়ের মাথা থেকে ফেলতে চেয়েছে। তাই ও আমাদের সঙ্গে শিংজিয়াং গিয়ে ছিলো। ঝি ঝুয়ের মা-বাবা শুধু জানতেন যে আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। কিন্তু ওরা জানতেন না যে তারপরে ঝি ঝু ছিলো শিয়া য়ি হ্যাং-এর সঙ্গে। তাই অনেকটা স্বান্তনা পেয়েছেন ওঁরা।”

“তুমিও তাহলে বদ লোকটাজে ক্ষমা করে দিলে এতো তাড়াতাড়ি?”

মিন হুয়ে চোখ বড়ো বড়ো করে প্রশ্ন করলো, “শিয়া য়ি হ্যাং-এর নরকে যাওয়া উচিৎ ও যা করেছে তার জন্য। তাই না?”

“যদি ঝি ঝু ওকে ক্ষমা করে দেয়, তবে আমার তো ওকে ক্ষমা না করার কোনো কারণ নেই। ওর তো কিছু যায় আসে না …”

ঝৌ রু জি বললো, “এই পৃথিবী ছেড়ে যাবার আগে, ঝি ঝু চেয়েছে সমস্ত বিবাদ বিসংবাদ মিটিয়ে ফেলতে, তাই আমি ওকে শুধু একটু সাহায্য করেছি কাজটা সম্পূর্ণ করতে। এই আর কী।”

“ঝৌ রু জি –”

“আমি জানি, ব্যাপারটা তোমার পছন্দ নয়, তাই আমি তোমাকে ডাকিও নি।”

ঝৌ রু জি কাঁধ ঝাঁকালো, “জীবন এরকমই। সব শুরু হয়ে যায় তুমি যখন কিছুই বোঝো না, ঠাহর করে ওঠো না তখন - কিচ্ছু না জেনে, তুমি এর গভীরে - সবার যন্ত্রণা আলাদা আলাদা। কেউ কারুর থেকে একটুও বেশি ভালো নয়। ঝি ঝু একজন শিল্পী। আমার পক্ষে ওর আধ্যাত্মিক অবস্থানে পৌঁছোনো সম্ভব নয়। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে প্রেমের মতো অনুভব ওর বাধা হতে পারে না। তোমার মতো নয় …”

“আমার মতো নয়?”

মিন হুয়ে চমকে উঠলো, “কী? মানে? আমি প্রেমে বাধা পড়ে আছি?”

“অবশ্যই।”

হাসলো ঝৌ রু জি, “যখন আমরা এক সঙ্গে ছিলাম, যে কবার আমরা যৌন প্রেম করেছি, প্রত্যেকবার তুমি অন্যমনস্ক থাকতে। শিন ছি করেছেটা কী যে তুমি এমন হয়ে গেছো?”

“...”

হঠাৎ মিন হুয়ের প্রচন্ড ইচ্ছে হলো ঝৌ রু জিকে বলে ফেলার, আর দশ মিনিটও লাগলো না ওর সব কথা বলে ফেলতে। 

খুব ছোটো করে সু তিয়াঁ আর শিন ছির গল্প বলে ফেলার পরে মিন হুয়ে এক ঢোকে শেষ করে ফেললো ভয়ানক তেতো কফিটা।

অনেক ক্ষণ কথা বললো না, ওর মনে হতে লাগলো যে সবটা একটা অলীক কল্পকথা।

“এখন সু তিয়াঁ নেই আর। আমাদের পক্ষে একে অপরকে সঙ্গী হিসেবে মেনে নেওয়া অসম্ভব। কিন্তু আমাদের একটা বাচ্চা আছে। আমরা কেউই বাচ্চাটাকে কাছছাড়া করতে চাই না। আমরা জানি না কী করা উচিৎ আমাদের।”

“তাহলে একসঙ্গে থাকো। বাচ্চার জন্য।”

“এটা কিচ্ছু না, আর খুব পুরোনো ধারণা। এখনো তোমরা ভাবো যে একটা বাচ্চা দুটো মানুষকে বেধে রাখতে পারে? এটা সু ছনের জন্য খুব খারাপ হবে।”

“এতে এতো অবাক হওয়ার কী আছে? সারা পৃথিবীতে কতো জোড়া মা-বাবা একসাথে বাধা পড়ে থাকে শুধু তাদের বাচ্চাদের জন্য? তুমি কী জানো না প্রত্যেক বছরে কলেজে ভর্তির পরীক্ষা হয়ে গেলেই ডিভোর্সের সংখ্যা সব থেকে বেশি হয়ে দাঁড়ায়?”

“অন্যেরা হয়তো পারে। কিন্তু শিন ছি আর আমি পারবো না।”

মিন হুয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, “সু তিয়াঁর পাহাড়প্রমাণ বাধা, শিন ছি হয়তো ওর সারা জীবনে কাটিয়ে উঠতে পারবে না।”

“তাহলে তুমি কী করবে?”

“আমি জানি না …”

ওর চোখগুলো অল্প ফুলে আছে। ও খালি চোখে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলো।

ও জানে যদি শিন ছি চলে যায়, তবে ওর জীবনের একটা অংশ নিয়ে চলে যাবে। জীবনের একটা অংশ নিঃশব্দে ঘটে চলবে অন্য কোথাও। যাতে ও অংশ নিতে পারবে না, যা ও খুঁজে পাবে না কখনো …

“আসলে শিন ছি তোমাকে পছন্দ করে।”

 হঠাৎ বলে উঠলো ঝৌ রু জি।

মিন হুয়ের মুখে বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো, মাথা ঝাঁকিয়ে প্রশ্ন করলো, “তাও কী সম্ভব?”

“যখন সু ছন হাসপাতালে ছিলো, একবার তুমি করিডরে নার্সের সঙ্গে কথা বলছিলে, শিন ছি বসে ছিলো দরজার পাশের সোফাতে। তুমি ওর দিকে পিঠ ফিরিয়ে ছিলে, কিন্তু ও তোমার থেকে চোখ সরায় নি, এক মূহুর্তের জন্যও না। তারপর তুমি সোজা নিচে নেমে গেলে, ওর চোখ তোমার পিছু নিলো এলিভেটর পর্যন্ত, যতক্ষণ না তোমার চেহারা পুরো অদৃশ্য হয়ে গেলো।”

“চুপ করো।”

“এক জন সার্জেনের পর্যবেক্ষণকে বিশ্বাস করো।”

“...”

“আরেক বার, আমি ওকে নেমতন্ন করে ছিলাম গলফ্‌ খেলার জন্য, আমাদের সাথে অন্যান্য ডাক্তাররাও ছিলো। সবাই কোনো একটা কারণে তোমার কথা বলাবলি করতে শুরু করে ছিলো, কারণ তুমি আমার বউ ছিলে। সবাই দেখেছে তোমাকে। … একজন ডাক্তার বলে উঠলো যে তোমার চেহারাটা দারুণ - অমনি শিন ছির মুখ কালো হয়ে গেলো, তাতে ডাক্তার এতো ভয় পেলো যে অনেক ক্ষণ আর কথা বলার সাহস করে নি। … শিন ছি নিশ্চয়ই তোমার ব্যাপারে খুব যত্নশীল, তাই অন্য কাউকে তোমার ব্যাপারে আলোচনা করতে শুনলে ও সেটা পছন্দ করে না …”

মিন হুয়ে তাকালো ঝৌ রু জির দিকে, হাসতে চাইছিলো, কিন্তু পারলো না, “তুমি সত্যিই জানো মানুষকে স্বান্তনা কী করে দিতে হয়।”

ঝৌ রু জির আরো কিছুক্ষণ কথা বলার ইচ্ছে ছিলো হয়তো, কিন্তু ওর সেল ফোন কেঁপে উঠলো। টেক্সট মেসেজের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে ঝৌ রু জি বললো, “আমাকে যেতে হবে, আমার একজন রুগি হঠাৎ মারা গেছেন …”

ও হাঁটলো না, প্রায় দৌড়োলো, ওর জামার হাতা লেগে কফিগুলো পড়ে যাচ্ছিলো আর কী। 



****

ঝি ঝুয়ের মৃত্যুর খবর শোনার দু সপ্তাহ পরে মিন হুয়ে আবার দেখতে পেলো শিন ছিকে। কাজের থেকে বেরিয়ে, এক ডজন গোলাপ কিনে নিয়ে যাচ্ছিলো ছিয়াঁ শ্যান চ্যাঙ্গল সমাধিক্ষেত্রে, সু তিয়াঁর কাছে। কিন্তু চেনঝঁ বিল্ডিং-এর ফটকে একটা পরিচিত চেহারা নজরে এলো ওর। 

চেহারার অধিকারী চেন জিয়া জুন। একজন লম্বা মহিলা দাঁড়িয়ে আছে জিয়া জুনের পাশে, মহিলার মাথার চুল ছোটো করে ছাঁটা। পরণের জামাকাপড় সবই পুরষ নারী আর সবাই পরতে পারে এমন। খুঁটিয়ে না দেখলে মিন হুয়ে মহিলাকে পুরুষ বলে ভুল করতো।

দুজনেরই পরণে ধূসর রঙের জাম্পার। দুজনের মাথাতেই খাড়া উঁচু টুপি, তাইতে ঢাকা পড়ে গেছে মুখের বেশির ভাগটাই। সময়টা কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার, অফিস থেকে ঘরে ফিরতে শুরু করার। তাই বিল্ডিং-টায় খুব ভিড় মানুষজনের। মিন হুয়ে ছাড়া কেউই ওদের নজরও করছে না।

“জিয়া জুন? তুমি এখানে কেনো?”

মিন হুয়ের চোখের দৃষ্টিতে ভীষণ ধার, দেখেই চিনতে পেরেছে ছেলেটাকে।

ওরা দুজনে যখন শুনতে পেলো যে ওদেরকে কেউ নাম ধরে ডাকছে, দুজনেই খুব চমকে উঠলো, কিন্তু যেই ওরা দেখতে পেলো যে ওদেরকে অন্য কেউ ডাকে নি, শুধু মিন হুয়ে ডেকেছে, দুজনেই একসাথে দীর্ঘশ্বাস ফেললো, যেনো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।

জিয়া জুন টান মেরে মিন হুয়েকে নিয়ে গেলো এক কোণে। নিচু গলায় আলাপ করিয়ে দিলো, “জিয়ে, ইনি ইয়াং লু, আমার নিফঙিয়ো।”

জিয়া জুনের ভঙ্গিটা শান্ত আর গর্বিত, আগের মতো লাজুক নয়।

“ওহ্‌!”

মিন হুয়ে ঝটপট মেয়েটির সাথে করমর্দন সেরে নিলো, “ইয়াং লু? আপনিও সাংবাদিক, তাই না? শিন ছি বলে ছিলো আমাকে।”

“হ্যাঁ।" শুকনো হাসি ইয়াং লুয়ের মুখে।

“জিয়া জুন আর আমি - আমরা দুজনেই কাজ করি সামাজিক খবরের পাতায়।”

মিন হুয়ে অনেক ক্ষণ ধরে দুজনকে মাপলো, তারপরে জানতে চাইলো, “তোমরা এখানে কী আমাকে খুঁজতে এসেছো? তোমরা এরকম ঘাপটি মেরে আছো কেনো?”

“আমরা এখানে খবরের তদন্ত করতে এসেছি।" ইয়াং লু জানালো।

“হুহ?”

“কাজের জায়গায় যৌন হেনস্থা আর লিঙ্গ বৈষম্য - এই দুটো বিষয়ে।”

জিয়া জুন জুড়ে দিলো, “আমাদের লক্ষ্য প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো।”

এক মূহুর্তের জন্য মিন হুয়ে চমকে উঠলো, তারপর দু হাতে তালি দিয়ে উঠলো, “দারুণ। আমি কী কোনো সাহায্য করতে পারি?”

“জিয়ে, তোমার সঙ্গে চেং ছিরাং-এর মামলাটা - ওটা আমরা আবার ঘুরে শুরু করতে চাই, দেখতে চাই যে নতুন কোনো প্রমাণ আছে কিনা। কিন্তু আমাদের তদন্ত শুধুমাত্র তোমাকে নিয়ে নয়।”

বললো জিয়া জুন।

মিন হুয়ে ঘাড় নাড়লো, “আমি তোমাদের একটা ফর্দ দিতে পারি। আমার অসংখ্য সহকর্মী একই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গেছে, যাচ্ছে।”

“দারুণ। তদন্ত চলছে বেশ কিছু দিন ধরে। আমরা অনেক সূত্র পেয়েছি, কিছু অভিযোগও পেয়েছি। গুয়ান ছাও-এর ভেতরে কাজের জায়গার সংস্কৃতি জঘন্য। ওপর তলার লোকগুলো সিধে নয়, তাই নিচের তলার লোকগুলোও বাঁকা। সিইও হিসেবে চেং ছিরাং এর দায় থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারবে না।”

ইয়াং লু চলতি ম্যান্ডারিন বলে, খুব দ্রুত বেগে আর উচ্চারণও সঠিক।

“ছিং, চোখ কান খোলা রেখে চলা ফেরা করো। চেং ছিরাং কিন্তু বদলা নেবে নিশ্চয়ই।”

“আমি জানি।”

জিয়া জুন মুঠো পাকিয়ে ফেললো, “আমি ভয় পাই না। আসলে আমি চাই ছিলাম যে ওকে ডেকে বাইরে নিয়ে এসে বেধড়ক মারবো। কিন্তু, জিয়ে, তুমি আমাকে সবসময়ে বলেছো যে মারপিট করে সমস্যার সমাধান হয় না। তাই আমি তোমাকে সাহায্য করবো সবার চোখের সামনে ওর ভেক খুলে ধরার কাজটাতে।”

মিন হুয়ে সন্দেহের চোখে তাকালো ওদের দিকে, মনে মনে নিশ্চিন্ত হলো, আবার আরো বেশি ভয় পেতে লাগলো যতো ভাবতে লাগলো ওদের কথা। যাই হোক, সেই সময়ে ও একা লড়াই করে ছিলো, আর তাতেই খুব হইচই হয়ে ছিলো, কিন্তু শেষে চেং ছিরাং-এর কিছুই বিগড়োতে পারে নি ও। কাজটা যদি অপরিচিত লোকের তরমুজ ফলানোর হোতো, তাহলে ও খুশি মনে ফলের অপেক্ষা করতো। কিন্তু যখন ওর পরিবারের মানুষ জড়িয়ে একটা বিপজ্জনক কাজে, তখন ও খুব বেশি আশা করতে পারে না।



চার বছর পরে, গুয়ান ছাও বেড়েছে অনেকটা। এর প্রভাব প্রতিপত্তিও আগে যেমন ছিলো এখন ঠিক তেমন আর নেই। 

কেবল মাত্র চেনঝঁ বিল্ডিং-এরই পার্কে, একটা সম্পূর্ণ তলা জুড়ে গণমাধ্যম বিভাগ, বিজ্ঞাপণ বিভাগ আর প্রচার বিভাগ।

হতে পারে যে পুরো সেনা বাহিনী ময়দানে নামলে ধুয়ে মুছে যাবে চেন জিয়া জুন ভারি হাতুড়ি নিয়ে লড়তে নামার আগেই।

এই মূহুর্তে ওদের উত্তপ্ত উৎসাহে ঠান্ডা জল ঢেলে দেওয়া সহজ হবে না, তাই মিন হুয়ে ওদেরকে বার বার বললো, “সবার আগে তোমাদের দুজনকে নিরাপদ থাকতে হবে। তারপর এদের পর্দা ফাঁস করে দিও।”

“নি ফাংশি, জিয়েজিয়ে। বদলোকের সাথে লড়াই করার অভিজ্ঞতা আছে আমাদের।” ইয়াং লুয়ের হাসি জুড়ে আত্মবিশ্বাস।

*****

দু জনের ফিরে যেতে থাকা পিঠ জোড়ার দিকে তাকিয়ে মিন হুয়ের হৃদয়ে প্রবল তোলপাড় শুরু হলো। গোলাপ নিয়ে সু তিয়াঁর সমাধিতে পৌঁছে, কাছে যাবার আগেই ও দেখতে পেলো শিন ছিকে।

এ আর অন্য কেউ হতেই পারে না।

কেবল দেঁ চেন, জিয়া জুন, শিন ছি আর ও - এই চার জন মাত্র জানে যে সু তিয়াঁকে এখানে কবর দেওয়া হয়েছে।

পরনে একটা কয়লার মতো কালো স্যুট, চেহারাটা লম্বা আর খাড়া, যেনো সামরিক প্রশিক্ষণ পাওয়া একটা মানুষ। দূর থেকে দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তিটা দেখে মনে হলো যেনো এক খোশনবিশ তুলির এক আঁচড়ে হাওয়ায় একটা দাগ টেনেছেন, সুদর্শন আর মর্যাদাপূর্ণ, মার্জিত কিন্ত বাঁধনছাড়া।

মিন হুয়ে দ্বিধায় পড়ে গেলো। ঠিক করলো যে শিন ছিকে বিরক্ত করবে না। ও একটা গাছের ছায়ায় লুকিয়ে পড়লো, অপেক্ষা করতে লাগলো।

সমাধিক্ষেত্রের পুব দিকে সু তিয়াঁর সমাধি। এলাকাটা অনেকটা, বিশাল একটা নজরকাড়া স্মৃতিফলকও আছে। শোনা যায় যে পুরো সমাধিক্ষেত্রে ওটাই সবচেয়ে দামী আর টেকসই সমাধি।

দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করার পরেও, শিন ছি স্থির দাঁড়িয়েই রইলো, চলে যাওয়ার কোনো লক্ষণই দেখালো না। মিন হুয়ে অবশেষে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলো, ওকে একটা নরম ‘নি হাও’ বললো।

ও মাথা ঘুরিয়ে এক পলক দেখে নিলো মিন হুয়েকে, কোনো কথা না বলে বাঁদিকে এক পা সরে দাঁড়ালো মিন হুয়েকে ফুলের উপহার রাখার জায়গা ছেড়ে দিতে।

বেশ খানিক ক্ষণের নৈঃশব্দ পার করে, মিন হুয়ে নিচু স্বরে প্রশ্ন করলো, “তুই সব কটা খুঁজে পেয়েছিস?”

“কী খুঁজে পেয়েছি আমি?”

“অবশেষের সব টুকু?”

গোপণে শিন ছির দিকে এক ঝলক দেখে নিয়ে, অনেক ক্ষণ ধরে কথা গুলো বিড়বিড় করলো মিন হুয়ে। তারপর ফিরে গেলো নিস্তব্ধতায়।

আরো আধঘন্টা অটুট নৈঃশব্দে কাটিয়ে, শেষে মিন হুয়ে বলেই ফেললো, “শিন ছি, তোর চোখ দুটো আমাকে দেখতে দে।”

এই সময়ে শিন ছি যেনো খুব বাধ্য, ঘুরে দাঁড়ালো, তাকালো মিন হুয়ের মুখের দিকে।

চোখের সাদা অংশের ওপরের পর্দায় যে লালচে দাগ হয়ে ছিলো সে সব মিলিয়ে গেছে। তবে চোখটা এখনো একটু ফোলা যেনো, চোখের পাতার ভাঁজটা যেনো একটু বেশি স্পষ্ট করে তুলেছে। 

মিন হুয়ে চাক বা না চাক, শিন ছি চিরকাল সু তিয়াঁর লোক। 

“দ্যুইবুচি।”

অস্ফুটে বললো মিন হুয়ে, তারপর হঠাৎ করেই হাত বাড়ালো শিন ছিকে জাপটে শক্ত করে ধরার জন্য, ঝটপট ছেড়েও দিলো।

“আমি কথা দিলাম, শিন ছি -” নরম স্বরে বললো মিন হুয়ে, “এই শেষ বার আমি তোর জীবনে বিরক্তি তৈরি করলাম। এক দিন, ভবিষ্যতে, যে কোনো সময়ে, যদি তোর আমাকে কখনো দরকার পড়ে, আমি সব ছেড়ে দেবো, এমন কি জীবনও, যদি তোর কাজে লাগে। যেমন সু তিয়াঁ সেই সময়ে দিয়ে ছিলো আমার জন্য।”

শিন ছি তাকালো মিন হুয়ের দিকে, অস্থির চাহনি, “কতো বার?”

“তুই বলেছিস কয়েক বার। কিন্তু শিন ছি - তোকে কথাটা স্পষ্ট করে বলতে হবে। সু তিয়াঁর মতো হয়ে যাস না, ও আমাকে বাঁচাতে এসে ছিলো আমি বাঁচার জন্য সাহায্য চাওয়ার আগেই।”

শিন ছির মুখে একটা বাঁকা হাসি জেগে উঠলো।

“চল, সু ছনকে একসাথে বড়ো করি। এখানে পরিস্থিতি এখন ভালো। তুই তিন বছর ওর সঙ্গে থাকতে পারিস নি, তাই এখন ও তোর সঙ্গেই থাকুক বেশিটা। আমি শুধু ওর সঙ্গে নিয়মিত দেখা করতে পারলেই হবে।”

মিন হুয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরলো নিজের, “অবশ্যই তুই যদি পরে বিনচেং ছেড়ে চলে যেতে চাস, বা আবার বিয়ে করার কথা ভাবিস,অথবা আমি আবার বিয়ে করি, আমরা তখন না হয় আবার সু ছনের ব্যবস্থাটা ভেবে দেখবো।”

“...”

“আমি আসছি।”

“দাঁড়া, আমার একটা প্রশ্ন আছে। কিছু বলার আছে।" দুম করে বলে উঠলো শিন ছি।

“...”

“তিয়াঁ তিয়াঁর মৃত্যুর সঙ্গে তোর কোনো সম্পর্ক নেই। তাই তোকে এতো অপরাধী হয়ে থাকতে হবে না। এই সমাধিক্ষেত্রে ছাড়া আমি কখনো আর ওর কথা তোর সামনে বলবো না এখন থেকে।”

অবাক হয়ে মাথা তুললো মিন হুয়ে, “এর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই? তাহলে কার সঙ্গে সম্পর্ক আছে?”

“কী যায় আসে?”

ঠান্ডা স্বরে বললো শিন ছি, “চেং ছিরাং।”



~~~~~~~~~~~~

সম্পূর্ণ বই বিনামূল্যে : https://dl.bookfunnel.com/lcj5vznt96

Link to Previous Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/10/jpda-chapter-66.html

Link to following Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/10/jpda-chapter-68.html

Friday, October 11, 2024

JPDA - Chapter 66

 ৬৬. মুখর



ওরা তিনজনেই বাইরে এলো। শিন ছি বললো যে ও একবার গাড়িতে ফিরে যেতে চায় কয়েকটা জিনিস সঙ্গে নেওয়ার জন্য। মিন হুয়ে ওর সঙ্গে চললো যেখানে ওরা গাড়িটা রেখেছে সেখানে। মিন হুয়ে দেখলো যে শিন ছি ট্রাঙ্ক খুলে তিনটে ফ্ল্যাশ লাইট নিলো আর নিলো কুমীরের চামড়ার একটা বাক্স। 

মিন হুয়ে আবার চলতে লাগলো শিন ছির সঙ্গে।

শু ঝি হুয়া হাঁটা দিলো নলখাগড়ার বনের দিকে।

নদীর ধারে হাওয়া বইছে তেজে, ঢেউয়ের আওয়াজের সঙ্গে যেনো গলা মিলিয়ে গান গাইছে। চাঁদের আলোয় নলখাগড়াগুলো চকচক করছে রুপোর মতো, হাওয়ায় নাচছে। দূরের খাড়া পাহাড়টা নিশ্চুপ। পাহাড়ের দিকে এক সারি সাদা খামার বাড়ি সার দিয়ে যেনো দাঁড়িয়ে আছে, কয়েকটায় এর মধ্যেই আলো জ্বলে উঠেছে, তাতে চারপাশটা আরো বেশি অন্ধকার দেখাচ্ছে।

রাস্তাটা ঢাকা বড়ো বড়ো ঘাসে। আর মিন হুয়ে নদীটাকে দেখতেপাচ্ছে না, কিন্তু পচা জোলো গাছের গন্ধ পাচ্ছে, শুঁকছে সেই গন্ধ। জলের ঘড়ঘড় শব্দে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে মিন হুয়েরা নদী বরাবরই চলছে।

কিন্তু মিন হুয়ে ভুল ভেবেছে। 

সু তিয়াঁর সমাধি মোটেই গ্রামের মুখের কাছে নলখাগড়া বনে নয়, আরো কোনো গভীর এলাকায়, দূরে কোথাও। শু ঝি হুয়া ওদেরকে নিয়ে নদীর ধারের একটা কাদায় পেছলা জায়গায় এলো, চল্লিশ মিনিট চলার পরে, অবশেষে থামার আগে।

চারপাশ দেখে নিয়ে ও উত্তরের একটা উঁচু জমির দিকে এগিয়ে গেলো।

শিন ছি আর মিন হুয়েও চললো ওর পিছন পিছন।

উঁচু এলাকাটা আসলে একটা জঙ্গল। আরো ওপরের দিকে একটা বড়ো পাহাড় আছে। নানা ধরণের ঘাস আর গাছপালা থেকে লতাপাতায় হাওয়া চলার আর পোকামাকড়ের শব্দ ভেসে আসছে। হাওয়াটা স্যাঁতস্যাঁতে, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আসতে থাকা হাওয়াটা ঠান্ডা আর মুখের ওপর চটচটে লাগছে। জঙ্গলের মধ্যে অনেক বিশাল বিশাল পাথর উঁচিয়ে আছে, গাছের শিকড়ও তাই মাটির গভীরে যেতে পারে না, সেগুলো প্রায় মাটির ওপর দিয়েই পাথরের পাশ কাটিয়ে এঁকে বেঁকে যায়। পা দিয়েই জঙ্গলটাতে মিন হুয়ে থমকে গেলো, ওর মনে হলো যেনো পায়ের নিচে একপাল সাপ কিলবিল করছে।

শু ঝি হুয়া একটা বড়ো পাথরের সামনে দাঁড়িয়ে পড়লো, মাটিটা বেলচা দিয়ে খোঁচালো, বললো, “এখানেই হবে।”

শিন ছি চারপাশ দেখলো। পাথরটা আশেপাশের পাথরগুলোর থেকে কিছুমাত্র আলাদা নয়। ভ্রূ না কুঁচকে ও থাকতে পারলো না, “তোমার চিহ্ন আছে তো।”

“দরকার নেই। আমি এখানে বড়ো হয়েছি। আমি এলাকাটা খুব ভালো চিনি। আমি তোমার নিফঙিয়োর জন্য একটা ভালো জায়গাও বেছেছি। দেখো -”

শু ঝি হুয়া আপন মনে বলে চললো, “সামনে জল আছে, পিছনেও জল আছে। একটা পাহাড়ও আছে, পাহাড়ের মাথাটা গোল। একে বলে, ‘নিমন্ত্রক আর নিমন্ত্রিত পরস্পরকে অভিবাদন জানাচ্ছে আর সুঝাকু ঘন্টি দোলাচ্ছে।’ ওকে যদি এখানে কবর দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যত প্রজন্ম তার আশীর্বাদ পাবে …”

হয়তো ওর মনে হচ্ছিলো যে আবহাওয়াটা বড্ডো খাপছাড়া, ও জোর করে হাসলো নিজেকে নিরুদ্বিগ্ন দেখাতে, কিন্তু শিন ছির চোখ ভরা ঘেন্না ওকে তাড়া করতে লাগলো। আর ওর মুখের হাসি দপ করে শুকিয়ে গেলো।

“এতোই যখন ভেবেছো তাহলে আমাকে আরো আগে খবর দাও নি কেনো? আমি ওকে আরেকটু সম্মানজনক পরিস্থিতিতে কবর দিতে পারতাম।" বললো শিন ছি।

“এখানে অনেক মেয়েয়ানুষের মরদেহই ভেসে আসে ওপরের খাত থেকে। জলে অনেক লতাপাতা। তাতে আটকে যায়। লোকে মনে করে যে ওসব দূর্ভাগ্য। তাই সবাই লতাপাতা কেটে নদীর স্রোতে যাতে ঐসব মরদেহ ভেসে চলে যেতে পারে তার ব্যবস্থা করে দেয় … আমিও তখন তাই করতেই গিয়ে ছিলাম। কিন্তু আমি আবার ভাবলাম ব্যাপারটা। ওকে দেখতে পাওয়াটাও ভাগ্যের ব্যাপার। তাই আমি ওকে টেনে নিয়ে এসে ছিলাম ওপরে। আর কবর দিয়ে ছিলাম যাতে আমি নিজের জন্য কিছু পুণ্য অর্জন করি।”

মানেটা দাঁড়ালো এই যে যদি ও দয়া না করতো, তবে শিন ছি কিছুতেই সু তিয়াঁকে খুঁজে পেতো না সারা জীবনে।

এমন সময় আকাশ থকে গুঁড়ো গুঁড়ো বৃষ্টির ফোঁটা নেমে এলো। বৃষ্টির ফোঁটা ক্রমশো বড়ো হতে লাগলো। 

“চটপট খোঁড়ো।” বললো মিন হুয়ে।

শু ঝি হুয়া মাটিতে বেলচার মাথা দিয়ে একটা বর্গাকার এলাকা চিহ্নিত করলো। তারপর শিন ছির সঙ্গে দুজনে মাটি খুঁড়তে লাগলো, একজন ডান দিক থেকে অন্য জন বাঁ দিক থেকে।

মিন হুয়ে দাঁড়িয়ে রইলো মধ্যিখানে, ফ্ল্যাশ লাইট হাতে। আলো দিতে লাগলো ওদের দুজনকে।

মাটি ভিজে আর আলগা। অল্পক্ষণের মধ্যেই দুজনে একটা বড়ো গর্ত খুঁড়ে ফেললো, প্রায় এক বর্গ মিটার পরিমাণ লম্বা-চওড়া। একটা ফ্ল্যাশ লাইট দিয়ে মিন হুয়ে দেখতে লাগলো ভেতরটা। ভেতরে প্রায় কিছুই নেই কাদা আর ঘাসের শিকড় ছাড়া।

“কত গভীরে পুঁতে ছিলে?" জানতে চাইলো শিন ছি।

“খুব গভীর নয়, এই এখানেই তো … আধ মিটারটাক নিচে। কী হচ্ছেটা কী?”

মাথা চুলকে ও বললো, “মানুষটা গায়েব হয়ে গেলো কী করে!”

“এটা কী ভুল জায়গা?”

মিন হুয়ে বললো, “খুব অন্ধকার বলে?”

“আমাকে একটু ভাবতে দাও।”

শু ঝি হুয়া মাটিতে রেখে দিলো বেলচাটা, দু চক্কর ঘুরে এলো পাথরটাকে, ডান দিক দেখলো, বাঁ দিকে দেখলো, দুম করে চাঁটি লাগালো নিজের মাথায়, “ভুল। ভুল। এই পাথরটাই নয়। তোমরা এখানে দাঁড়াও আমি আশেপাশে দেখে আসছি -”

শিন ছি কিছু করার আগেই লোকটা তড়িৎ বেগে উধাও হয়ে গেলো।

গর্ত ছেড়ে এগোনোর আগে দুজন মানুষ দেখলো একে অপরকে।

ঘন অন্ধকার ঘিরে আছে সব দিকে, বৃষ্টির দাপট কেবল বেড়েই চলেছে। 

“তুই কী ঠগের পাল্লায় পড়লি?”

মিন হুয়ে না বলে থাকতে পারলো না, “এই লোকটার ওপরে ভরসা করাই যায় না, চেকটা ওকে অতো তাড়াতাড়ি না দিলেও চলতো।”

ওর মনে আরো খারাপ চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিলো। শু ঝি হুয়া হয়তো সু তিয়াঁকে দেখেই নি, ও জানেও না সু তিয়াঁর অবশেষ কোথায় আছে। শুধু দশ লাখ য়ুআঁ পাবার জন্য ওদেরকে ছল করে এনেছে এখানে টাকার জন্য, ওদেরকে মেরে ফেলার জন্য।

মনে হয় শিন ছি বুঝতে পেরেছে মিন হুয়ের অনুমান, ও মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, “ওর সাহস হবে না।”

"কেনো হবে না? ও তো আগেও অপরাধ করেছে।”

“কাল দেঁ চেন এখানে আসবে। যদি ও কিছু ভয়ানক কিছু করে থাকে তো ও কিছুতেই পালাতে পারবে না।”

মিন হুয়ে কথা ভেবে দেখলো। ওর মনে হলো যে শিন ছির কথাটা ঠিকই।

যাই হোক, শু ঝি হুয়া নিশ্চয়ই সু তিয়াঁর শরীরটা দেখে ছিলো। চুনো মাছ লাগানো ব্রেসলেট আর মৃতদেহের ছবি তো আর জাল হতে পারে না। কিন্তু কী করে যে অবশেষে দেহাবশেষের নিষ্পত্তি হবে - দেহাবশেষ আদৌ পাওয়া যাবে না - সে কথা বলা মুস্কিল। 

এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই, নরম গলায় শু ঝি হুয়া ডাকলো, খুব দূর থেকেও নয়, “এদিকে এসো। এই পাথরটা হওয়া উচিৎ।”

দুজনে বেলচা উঠয়ে নিলো মাটি থেকে আর এগিয়ে গেলো যে দিক থেকে ডাক এসেছে সেদিকে।

একশো পা চলার পরে, ওরা দেখতে পেলো যে শু ঝি হুয়া আরেকটা পাথর দেখাচ্ছে।

“এই পাথরটাই হবে।”

শিন ছি যেনো একটু অধৈর্য হয়ে পড়েছে, “তুমি নিশ্চিত?”

শু ঝি হুয়া ঘাড় নাড়লো, “এখানে খোঁড়ো।”

একটা এক মিটার গভীর গর্ত খোঁড়া হলো আর ফ্ল্যাশ লাইটে তার মধ্যে কিছুই পড়ে নেই দেখা গেলো।

কোনো সূত্র যদি নজর এড়িয়ে যায় সেই আশঙ্কায় মিন হুয়ে মাটিতে শুয়ে পড়লো যাতে খুঁটিয়ে দেখতে পারে, শিন ছি আর শু ঝি হুয়া আলাদা আলাদা ভাবে মাটিটা খাবলে খাবলে দেখতে লাগলো। শেষে নিশ্চির হওয়া গেলো যে গর্তের মধ্যে সু তিয়াঁর কিছুই নেই।

“তাহলে এবারেও তুমি তোমার ভুল স্বীকার করছো?" ঠান্ডা স্বরে প্রশ্ন করলো শিন ছি।

“এমন করলে কেমন হয় - চলো আগে ফিরে যাই?”

শু ঝি হুয়াকে অপরাধীর মতো দেখাচ্ছে, “ভোর হবার পরে ফিরে এলে হয়। এখন আলো খুব কম, আশেপাশে দেখে কিছু ঠাহর করা যাচ্ছে না, সেই জন্য খুঁজে পাওয়া কঠিন হচ্ছে।”

“এতো অজুহাত খাড়া কোরো না!" উদ্বিগ্ন হয়ে হাঁটতে হাঁটতে বললো শিন ছি, ওর বুঝি এক্ষুণি হার্ট অ্যাটাক হবে, “তুমি জানো, নাকি জানো না?”

“আমি যদি নাই জানি, তবে আমার অতগুলো ‘ছেয়া’ নেবার সাহস হবে কী করে? ব্যাপারটা হলো যে এখন এতো অন্ধকার যে -”

“তুমি যদি আমাদের বোকা বানাবার সাহস দেখাও -”

দুজনে ঝগড়া শুরু করবে বুঝি, মিন হুয়ে ধড়ফড় করে থামালো দুজনকে, “শু গ্য, ভালো করে মনে করে দেখুন, তখন কেমন করে পুঁতে ছিলেন শরীরটা? এই জায়গাটা নদীর থেকে অনেক দূরে।”

মিন হুয়ের মনে হচ্ছিলো যে সু তিয়াঁর দেহটা শু ঝি হুয়া দেখতে পাবার পরে, ও এতো দূরে অতো ভারি দেহটা বয়ে নিয়ে আসবে কবর দেবার জন্য তেমন সম্ভাবনা ক্ষীণ। 

“এখন এটা দূর মনে হচ্ছে, কিন্তু দূর্ঘটনার দিনে ভীষণ বৃষ্টি পড় ছিলো। আর নদীটা এমন ফুলে ফেঁপে উঠে ছিলো যে ওটা পাহাড়ের নিচেটা ছাপিয়ে গিয়ে ছিলো।”

বললো শু ঝি হুয়া, “আমার মনে আছে, আমি ওকে কবর দিয়ে ছিলাম নদীর কাছে একটা পাথরের পাশে। তখন আমার একটু ভয় কর ছিলো। তাই আমি দৌড়ে বাড়ি গিয়ে একটা বেলচা নিয়ে আসি। কাছাকাছি একটা গর্ত খুঁড়ে ওকে কবর দি।”

“সেই থেকে একবারও জায়গাটাতে এসেছো তুমি?" প্রশ্ন করলো মিন হুয়ে।

“না, আমি কাজে গিয়ে ছিলাম, বাইরে।”

শু ঝি হুয়া বললো, “কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে আছে যে ওকে একটা উঁচু জায়গায় কবর দিয়ে ছিলাম, যেখানে সচরাচর জল ওঠে না। আমার ভয় ছিলো যদি মাটি ধসে দেহটা আবার ভেসে যায়।”

“একটা উঁচু জায়গা? এটাই তোমার কবরের জায়গা বলে মনে পড়লো?”

শিন ছি কলার চেপে ধরলো শু ঝি হুয়ার, চেঁচিয়ে উঠলো, “আমাকে তুমি খেলাবে?”

বলেই ও মুঠি ছুঁড়ে দিয়ে মারলো শু ঝি হুয়াকে, কিন্তু মিন হুয়ে ওকে চেপে ধরে রাখলো।

শু ঝি হুয়া জানতো যে ওর ভুল হয়েছে। ও কয়েক পা পিছু হঠলো, হাত তুললো সমর্পণের ভঙ্গিমায়, “আমি তোমাকে মিথ্যে বলি নি! আমি মিথ্যে বলি নি! দিব্যি গেলে বলছি যে ওকে এখানেই কাছে পিঠে কোথাও কবর দিয়ে ছিলাম। এলাকাটা আমার মনে আছে। জায়গাটা একটা বড়ো পাথরের ঠিক পাশে। উত্তরে, পাথরের ঠিক গায়েই একটা হয়াই শু আছে। যদি দিনের বেলা হোতো তবে আমি নিশ্চিত ওটা খুঁজে পেতাম একবারের চেষ্টায়। এখন বড্ডো অন্ধকার। যে জায়গাগুলো এখনো পর্যন্ত খুঁড়েছি, সেগুলো বাদে আর দুটো মাত্র পাথর আছে। সব থেকে ভালো হয়, যদি আমরা আলাদা আলাদা খুঁড়ি। ঐ দুটো পাথরের একটার নিচে ওকে নিশ্চিতভাবে কবর দিয়েছি।”

শিন ছির কোনো উপায় রইলো না বেলচা তুলে নিয়ে খুঁড়তে শুরু করা ছাড়া, শু ঝি হুয়া যে দিকটা দেখিয়ে দিয়ে দিলো সেই দিকে। আর মিন হুয়ে একটা ফ্ল্যাশ লাইট ধরে রইলো ওকে আলো দেবার জন্য।

আরো এক ঘন্টা খোঁড়ার পরে হঠাত থেমে গেলো শিন ছি। 

“আমাকে ফ্ল্যাশ লাইটটা দে।" বললো শিন ছি।

উবু হয়ে বসলো গর্তের নিচে ফ্ল্যাশ লাইটটা মুখে চেপে ধরে, খুব আলতো করে মাটিটা উল্টে পাল্টে দিতে লাগলো হাত দিয়ে।


শু ঝি হুয়া একটা বেলচা হাতে এসে জানতে চাইলো, “তুমি কী পেয়েছো কিছু?”

শিন ছি মাথা ঝুঁকিয়েই রইলো। একটু পরে চুপচাপ ঘাড় নাড়লো, সদর্থক।

“আমি আসছি তোমাকে সাহায্য করতে।”

শু ঝি হুয়া গর্তের পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বললো, “আমার ন্যানার একটা কফিন আছে, বাড়িতে, কিনে ছিলো নিজের জন্য। আমি ওঁর সাথে কথা বলবো পরে, অনুরোধ করবো যে উনি যদি কফিনটা আগে তোমার নিফঙিয়োর জন্য দেন …”

শিন ছি মাথা নিচু করে রইলো, অনেক ক্ষণ কোনো সাড়া শব্দ করলো না।

শু ঝি হুয়ার পিঠে চাপড় মেরে বললো মিন হুয়ে, “আগে ফিরে যাও, যন্ত্রপাতিগুলো রেখে যাও।”

“বু খেছি। আমি সাহায্য করতে চাই।”

বললো, শু ঝি হুয়া, “চেনদ্য।”

“দরকার নেই, শিয়া শিয়া।" বললো মিন হুয়ে।

বৃষ্টির তোড় বেড়েই চললো সমানে। গর্তের মধ্যে জল দুদ্দাড় করে বেড়ে প্রায় এক ফুট গভীর হয়ে গেলো।

শিন ছি হাঁটু মুড়ে গর্তের মেঝেতে বসে পড়লো, দু হাতে মাটি খাবলাতে লাগলো।

শেষ হেমন্তের আবহাওয়া, বৃষ্টিটা বরফের মতো ঠান্ডা। ওর ঠান্ডা লেগে যেতে পারে এমনটা আশঙ্কা করে মিন হুয়ে তুলে নিলো শু ঝি হুয়ার রেখে যাওয়া লোহার বালতিটা। গর্তের পাশে শুয়ে পড়ে জিজ্ঞেস করলো, “আমি কী নিচে আসব? জল ছেঁচে তুলে দেব?”

আদতে গর্তটা খুবই ছোট্টো। মধ্যিখানে শিন ছি হাঁটু মুড়ে বসে আছে। যদি মিন হুয়েও নিচে নামে, তাহলে কারুরই নড়াচড়া করার জায়গা থাকবে না।

শিন ছি মাথা তুলে ওকে দেখলো, মাথা নাড়লো, “দরকার নেই। বালতিটা আমার লাগবে। তুই গাড়িতে গিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করতে পারিস, বৃষ্টির হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য। আমি এখানে কাজটা নিজেই করতে পারবো।”

“তা কী করে হবে? আমরা একসাথে এসেছি।”

নরম সুরে বললো মিন হুয়ে, “আমরা আগে ফিরে যাই না কেনো,আর পরে ফিরে আসবো যখন বৃষ্টি থেমে যাবে, ভোর হবে।”

শিন ছির শরীর ভালো নয়। সর্দিকাশির অনেক ওষুধই ওর চলবে না, রক্ত জমাট না বাধার জন্য যে ওষুধটা খায় সেটার কার্যকারিতা যাতে না নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু উপস্থিত পরিস্থিতিতে মিন হুয়ে সাহস করলো না কোনো যুক্তি দিয়ে শিন ছিকে বোঝানোর, বরং, চুপচাপ, হাত বাড়িয়ে লোহার বালতিটা দিয়ে দিলো শিন ছির হাতে।

ও নিয়ে নিলো, রেখে দিলো ওর পাশে। কথা বন্ধ করে মন দিলো দু হাত দিয়ে মাটিটা খোঁড়ার কাজে। 

খানিক ক্ষণ পরে মিন হুয়ে শব্দ পেতে লাগলো, “ডিং ডং, ডিং ডং" হয়তো ও দেহাবশেষ খুঁজে পেয়েছে। আর এক এক করে তা তুলে রাখছে লোহার বালতিতে, নিয়ে যাওয়ার জন্য।

ডিং ডং ডিং ডিং শব্দটা ঘন্টির মতো বেজে চললো, মিন হুয়ের হৃদয়ে যেনো দুন্দুভি হয়ে বাজতে লাগলো। মিন হুয়ের পিঠ জুড়ে বয়ে গেলো একটা ঠান্ডা স্রোত। আর ওর সারা শরীর কেঁপে উঠলো। ও না ভেবে থাকতে পারলো না সেই বৃষ্টির দিনটার কথা যে দিন ওর সাথে সু তিয়াঁর প্রথম দেখা হয়ে ছিলো। বাসে ওর পাশে বসে সু তিয়াঁ অনেকবার ওর সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু মিন হুয়ে একবারও হাসে নি অবধি। যদি অন্য কেউ হোতো, মিন হুয়ে ভাবতেও পারে না যে সে কী ভীষণ রেগে যেতো। 

অপ্রত্যশিতভাবে, মানুষটা এতোই সাধারণ ছিলো, ওর সাথে কোনো লেনাদেনা ছিলো না, সে রাতে শুধু ওর প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে ও শুধু শুধু নিজের জীবনটা দিলো।

কতোগুলো অপূর্ণ ইচ্ছে এক সঙ্গে উবে গেলো এক লহমায়।

ওর আঙুলের আগায় লেগে থাকা খুশি, লেগে থাকা সুখ। হাত ধরাধরি করে ভাগ করে নেবার সুযোগটুকু পেলো না।

এক হিতকারী যাকে মিন হুয়ে সারা জীবনে ভুলবে না তার সঙ্গ মিন হুয়ের ভাগ্যে জুটে ছিলো মাত্র এক দিন।




যখন সু তিয়াঁ সবে মাত্র স্নান সেরে বেরিয়ে এলো, ওর মুখটা লাল হয়ে ছিলো, ওর গলার স্বরে আর হাসিতে প্রসন্নতা মাখামাখি হয়ে ছিলো, অন্তত মিন হুয়ের চোখে প্রসন্নতাই ধরা পড়ে ছিলো, কিন্তু এখন সে হারিয়ে গেছে, মানুষ আর স্বর্গের ব্যবধান তৈরি করে।

লোহার বালতিটা বড়ো নয়। তাড়াতাড়ি ভরে গেলো ওটা। মিন হুয়ে অবশেষগুলো নিয়ে নিলো, ওর অনুভবে কেবল ভীতি, ওর ভয় হচ্ছিলো খুঁটিয়ে দেখতে, তাই ও চাদরটা খুলে বিছিয়ে দিলো বালতির ওপরে, তারপর সবটা রেখে দিলো একটা গাছের নিচে, একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ খুঁজে নিয়ে বাড়িয়ে দিলো শিন ছিকে, যাতে শিন ছি ওর হাতে উঠে আসা অবশেষ গুছিয়ে তুলতে পারে।

আরো এক ঘন্টা পরে ও শুনতে পেলো যে শিন ছির ভারী শ্বাসের শব্দ আসছে গর্তের মধ্যে থেকে। ফ্ল্যাশ লাইট তুলে ধরে জানতে চাইলো, “সব ঠিক আছে তো?”

ও মাথা নেড়ে বললো, “এখনো কিছু কম।”

“মানুষের শরীরে দুশো ছটা হাড় থাকে। আমি মাত্র একশো বারোটা পেয়েছি। এখনো অনেক হাড় আছে।”

শিন ছি বিড়বিড় করতে করতে ঝুঁকে পড়লো, কাদা জল খাবলাতে লাগলো দু হাত দিয়ে।

মিন হুয়ে কালো আকাশের দিকে তাকালো যার থেকে ঝরে পড়ছে হৈমন্তী বৃষ্টি, একটা ফ্ল্যাশ লাইট নিয়ে লাফিয়ে নামলো গর্তে, “আমি তোর সাথে খুঁজি। দুজনে মিলে খুঁজলে তাড়াতাড়ি হবে।”

যদি প্রত্যেকটা হাড়ে আত্মার খানিকটা থাকে, তবে, যতো দূর মিন হুয়ে বুঝেছে, শিন ছি চায় সু তিয়াঁর আত্মার সবটা সঙ্গে করে নিয়ে যেতে। 

দুজনে পাশাপাশি হাঁটু মুড়ে বসলো কাদা জলে, ঠান্ডা বৃষ্টিতে ভিজে সপ সপ করতে লাগলো, যদিও দুজনেই কোট পরে আছে।

দুজনেই কেঁপে উঠতে লাগলো, ইচ্ছের লাগাম ছিলো না সেই কেঁপে ওঠায়, দাঁতে ঠোকাঠুকি লেগে গেলো ঠান্ডায়।

কিন্তু দুজনেই খুঁড়ে চললো, কেউই থামলো না।

মাটিতে একটা বিটকেল গন্ধ। মিন হুয়ে পেয়েছে গন্ধটা। আর অল্প কল্পনাতেই ওর গা বমি বমি করতে লাগলো।

আর ওর পাশে শিন ছি ওকে উপেক্ষা করেই চললো। মন দিয়ে খুঁজতে লাগলো।

মিন হুয়ে না কেশে পারলো না। জানতে চাইলো, “কোথায় ওকে কবর দিবি ভাবছিস? এখানে? বিনচেং-এ? নাকি ওর নিজের শহর গুয়াঁইশির হেচিতে?”

“বিনচেং-এ" বললো শিন ছি, “তাহলে আমি থেকে থেকে যেতে পারবো ওর কাছে।”

“বিনচেং বেশ ভালো।”

মিন হুয়ে মাথা নাড়লো, ও একমত শিন ছির সঙ্গে। ও একটা মসৃণ কঠিন বস্তু ছুঁলো। ওর ফ্ল্যাশ লাইট দিয়ে দেখলো। একটা ছোটো হাড়। ও জানে না মানুষের শরীরের কোথায় থাকে ঐ হাড়টা। ও তাড়াতাড়ি হাড়টা শিন ছিকে দিয়ে দিলো, “আমি একটা টুকড়ো পেয়েছি।”

ও খুঁটিয়ে দেখলো, ছুঁলো আবার, “তুই খুবই সাহসী।”

“নাস্তিক।”

মিন হুয়ে চাই ছিলো দুয়েকটা হালকা কথা বলে ভারি আবহাওয়াটায় একটু বদল আনতে। কিন্তু বার বার কথা বলাটা বেমানান হবে বলে মনে হলো। তাই ও চুপ করেই রইলো।

আরো এক ঘন্টার বেশি সময় ধরে দুজনে খুঁজে চললো। চুপচাপ। আরো সাতটা হাড় খুঁজে পেলো। দিনের আলো এলো। বৃষ্টি থেকে থেকে থেমে গেলো। গর্তটা থেকে থেকে বড়ো হলো।

শেষে শিন ছি বললো, “এই অবধি থাক। ওর কবরটা বড্ডো অগভীর। এতোগুলো হাড় খুঁজে পাওয়া সহজ নয়।”

দু জনে হামাগুড়ি দিয়ে বের হয়ে এলো গর্ত থেকে। অনেক ক্ষণ হাঁটু মুড়ে বসে থাকার ফলে হাঁটুর জোড়ে অসহ্য ব্যাথা। মিন হুয়ে অনেক ক্ষণ পর্যন্ত সোজা দাঁড়াতে পারলো না। দু জনে দু জনের ওপর ভর দিতে বাধ্য হলো, ঠেসান দিলো গাছের ডালে।

ভোরের রশ্মি দেখা দিলো আকাশে, সময় হলে ভোরের আলো ছুঁলো শিন ছির মুখ। আর মিন হুয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো, দৃষ্টিতে কোনো অনুভব নেই।

ওর সারা শরীর ভিজে জবজব করছে, ওর স্যুট আর শার্ট - দুটোতেই পুরু কাদার আস্তরন, মুখটা ফ্যাকাসে, ওকে ভীষণ অসুস্থ দেখাচ্ছে। চোখের পর্দার নিচের রক্তক্ষরণের দাগটা আরো বড়ো হয়েছে, আরো স্পষ্ট হয়েছে, চোখের সাদা অংশের পুরোটা প্রায় ঢেকে গেছে।

“তোর চোখ -”

“আমি দেখতে পাচ্ছি।”

ও বালতিটা আর প্লাস্টিক ব্যাগটা যাতে হাড়গুলো রাখা আছে, সেগুলো সব তুলে নিলো হাতে, মিন হুয়ে জিজ্ঞেস করলো, “তুই বাক্স এনেছিস, সব ওর মধ্যে পুরে দিবি তো?”

বাক্সটা রাখা আছে বালতিটার পাশে। দেখে মনে হচ্ছে ওটাতে জল লাগবে না এমন পুরু ঢাকা দেওয়া আছে। দেখে মনে হচ্ছে যেনো ওটার ওপরে এক ফোঁটাও জল পড়ে নি।

শিন ছি উত্তর দিলো না প্রশ্নটার, কিন্তু বললো, “তুই আগে যা।”

“তুই যাবি না?”

“আমি নদীতে যাবো। হাড়গুলো ধুয়ে পরিস্কার করবো।”

“তোর কী নিজে হাতে পরিস্কার করা একান্তই জরুরি?”

মিন হুয়ের মনে হচ্ছিলো যে দেহাবশেষ খুঁজে বার করাটাই মৃতের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা প্রকাশ করা। শিন ছির জন্য ব্যাপারটা নিষ্ঠুর। এই মূহুর্তে ওর ভেঙে পড়তে এক চুল বাকি। ও যে কোনো সময়ে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।

“সু তিয়াঁর বসত ভিটা যে শহরে সেখানে রীতি হলো হাড় ধুয়ে কবর দেওয়া, যাকে বলা হয় দ্বিতীয় সমাধি।”

বললো শিন ছি, “ও বলে ছিলো আমাকে আগে, ওর ঠাকুমা আর দিদিমাকে এরকম করেই কবর দেওয়া হয়ে ছিলো।”

মিন হুয়েকে অবাক হতে দেখে শিন ছির মুখে বাঁকা হাসি দেখা দিলো, একই সুরে বললো, “এতো বিশদে জানার প্রয়োজন তোর নেই। এই কাজটা আত্মীয়রাই করে।”

“তাহলে, আমিও তোর সাথে ধোবো হাড়গুলো।”

“তোর এ কাজে হাত লাগানোর দরকার নেই।”

"কেনো?”

“তুই ওর আত্মীয় নস।”

কথাটা সামান্য হলেও আহত করে, কিন্তু মিন হুয়ে তর্ক করতে চায় না, “তাহলে আমি নদীর পাড়ে তোর জন্য অপেক্ষা করবো। ধোয়া হয়ে গেলে একসাথে ফিরবো।”

“আমি একলা থাকতে চাই।”

“আমার কথা মাথাতেই নিস না, ঠিক আছে?" নরম স্বরে বললো মিন হুয়ে।

“তোর কথা মাথাতেই নেবো না?”

বিদ্রুপ করে উঠলো শিন ছি, “তাহলে, সব কিছুই তোকে ঘিরে ঘটছে? তুই মহাবিশ্বের কেন্দ্র?”

মিন হুয়ে গাড়িতে ফেরার পথে সারাটা পথ কাঁদলো।




নটা দশে দেঁ চেন আর জিয়া জুনের গাড়িও এসে পৌঁছোলো। ওদের ট্রেনে আসার কথা ছিলো, কিন্তু ওরাও ঠিক করেছে যে নিজেরাই গাড়ি চালিয়ে আসবে। ওদের দুশ্চিন্তা হচ্ছিলো যে শিন হয়তো দুঃখে খুবই ভেঙে পড়বে। তাই শিন ছিকে সাহায্য করার জন্য ওরা তড়িঘড়ি চলে এসেছে। 

“আমরা পুলিশে খবর দিয়ে দিয়েছি।”

হোটেলে পৌঁছে বললো দেঁ চেন, “যাই হোক ওরাও তো তদন্ত করে দেখবে। এটা যদি সত্যিই সু তিয়াঁ হয়, তাহলে ওদেরও তদন্তের খাতাটা বন্ধ করার দরকার।”

“শু ঝি হুয়া চায় না যে পুলিশ জানুক।”

“ওর দিকটা আমি বুঝে নেবো।”

এক ঘন্টা পরে শিন ছি ফিরলো হোটেলে, সঙ্গে কুমীরের চামড়ার স্যুটকেস। ও অনেক ক্ষণ ধরে স্নান করলো। একটা ঘন কালো স্যুট পরলো, রেস্টুরেন্টে গেলো সকালের খাবার খেতে।

মিন হুয়ে, দেঁ চেন, জিয়া জুন সবাই ওর দিকে তাকালো দুশ্চিন্তা নিয়ে।

“শিন ছি, ওষুধ খেয়েছিস?” মিন হুয়ে জানতে চাইলো, “ওয়ারফারিন?”

“আমি আনতে ভুলে গেছি।" জানালো শিন ছি।

“তা হলে চলবে কী করে!”

উদ্বিগ্ন হয়ে বলে উঠলো মিন হুয়ে, “আমরা তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যাই না হয়? তোর চোখটাও তো দেখাতে হবে ডাক্তারকে।”

“দু দিনের মধ্যে ফিরে যাবো।”

হালকা সুরে বললো ও, “আমি কিছু লোককে লাগাতে চাই, ওর অবশেষ খুব ভালো করে খুঁজে দেখার জন্য। যতোগুলো সম্ভব ততোগুলো হাড় খুঁজে পেতে চাই।”

“ব্যাপারটা কী? তোকে ফিরে যেতেই হবে! আমি থেকে যাচ্ছি অন্ত্যেষ্টির কাজ করার জন্য।”

“তুই কেনো থাকবি? সু তিয়াঁর অন্ত্যেষ্টির দায়িত্ব ওর আত্মীয়দের। তুই না থাকলেও চলবে।”

মিন হুয়ের দিকে একটা হিংস্র চাহনি দিয়ে বললো, “তোকে আমার কথা ভাবতে হবে না। তোর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। তুই যেতে পারিস।”

ওর গলার স্বর সামান্য কর্কশ। আর ওর চোখ রক্তাভ।

মিন হুয়ের হৃদয়েও হঠাৎ জ্বালা করে উঠলো যেনো অম্লতায়, চোখ ছাপিয়ে নেমে এলো অশ্রুধারা, “আমি জানি তুই আমাকে ঘেন্না করিস, শিন ছি। কিন্তু আমি তো ইচ্ছে করে কিছু করি নি। আমি তো সু তিয়াঁর ক্ষতি করতে চাই নি, আমার কোনো অসদুদ্দেশ্যও ছিলো না। দূর্ঘটনাটার পরে আমি রোজ দূর্ঘটনাটার কথাই ভেবেছি। আমি কী এমন করে ছিলাম যে সু তিয়াঁর মনোযোগ আমার ওপরে এসে পড়লো? যে কারণে ও ওর প্রাণটাই বিসর্জন দিলো আমার জন্য? - - আমি তো কিছু করি নি, সত্যিই, আমি সত্যি ওর কোনো ক্ষতি করি নি।”

মিন হুয়ে ফোঁপাতে লাগলো, “আমরা সবাই সকলের কাছে অপরিচিত। আমি তো ওর প্রতি সহানুভূতিও দেখিয়ে ছিলাম। বাসে ও বাথরুমে যেতে চাইলো। আমি ওর জিনিসপত্র পাহারা দিলাম। বাস থেকে নামার পরে তুমুল বৃষ্টি শুরু হলো। ও আমার সাথে হোটেলের ঘরে থাকতে চাইলো, আমি রাজি হয়ে ছিলাম। তুই আমাকে স্বার্থপর বলিস, আমি খারাপ, সত্যিই আমি খুব খারাপ। যদি যথেষ্ট বাজে হতাম তাহলে আমি কিছুতেই ওকে আমার সঙ্গে রাতে থাকতে দিতে রাজি হতাম না, ওর অনুরোধ উপেক্ষা করতাম। তাহলে ও কিছুতেই টের পেতো না যে আমি মুশুই হে-তে গেছি। আমাকে বাঁচাতোও না, আর ভালো ভাবে বেঁচে থাকতো! সারাটা পথ আমি ওর সাথে এক্কেবারে কথা বলি নি, মন দিই নি ওর কথায়, ওর দিকে ভয়ানক বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে ছিলাম, তাও ও আমাকে ঘেন্না করে নি … আমি জানি না ও আমাকে কেনো বাঁচিয়েছে, আমি সত্যিই জানি না কেনো!”

“কারণ ঐ দিন, বাসে, প্রত্যেকটা লোক জানতো যে তুই মরতে চাইছিলি!”

কথাগুলো কেটে কেটে বললো শিন ছি, “তুই কাঁদছিলি বাসে উঠে থেকে। অনেকেই দেখে ছিলো সেটা। পরে একটা ধস নেমে ছিলো। বাস থেকে সবাই নেমে পালানোর পথ খুঁজছিলো। কেবল মাত্র তুই বসে ছিলি বাসে, নামতে রাজি হোস নি কিছুতেই। নড়ে বসতে অবধি রাজি হোস নি, এমনকি ড্রাইভার তোকে ধরে টেনে নামাতে গিয়ে ছিলো, তুই তখনো নামিস নি! তোর মনে আছে সেই আইয়ে-কে যার সাথে সু তিয়াঁ গল্প করে ছিলো? সে সু তিয়াঁকে বলে ছিলো যে তুই যে রকম কান্নাকাটি করছিস, তাতে মনে হয় যে তোর জীবনে এমন কিছু ঘটেছে যা তোর দুরূহতম কল্পনাতেও ছিলো না। ওকে বলে ছিলো তোর সাথে আরো কথা বলতে যাতে তোর মনের ভার একটু হালকা হয়ে যায়। সু তিয়াঁ শুধু চেয়ে ছিলো তোকে বাঁচাতে, সেই জন্য ও যতো ভাবে পেরে ছিলো চেষ্টা করে ছিলো তোর ঘনিষ্ঠ হতে। নিজেকে ক্ষমা করার কারণ খুঁজিস না। যখন তুই শুধু নিজের কথাই ভেবেছিস, যখন তুই এক মনে নিজের যন্ত্রণার দুঃখে মজে থেকেছিস, তখন দয়া করে বাকিদের কথাও ভাবিস! ও হয়তো তোর মতো চালাকচতুর নয় বা ওকে দেখতে তোর মতো সুন্দর নয় অথবা ও তোর মতো মোহময়ী নয়, কিন্তু তোকে বাঁচানোর মূহুর্তে ও একবারও নিজের কথা ভাবে নি একটুও। আমি তোকে এ সব বলছি , এই জন্য নয় যে যাতে তুই কক্ষণো নিজেকে মহাবিশ্বের কেন্দ্র বলে মনে না করিস, বরং এইটা বোঝাতে কেউই মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়।”

“আমার কোনো অজুহাত নেই। আমি শুধু একটু ভালো করে বাঁচতে চাই। আমার জীবনের বাকিটার সবটাই সু তিয়াঁর আমাকে যা দিয়েছে তা, আমি সেটা নষ্ট করতে পারবো না। আমি নয়ছয় করে কাটাতে পারবো না, আমি সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে চাই, জীবনের আনন্দে, উত্তেজনায়, সুখে। আমি চাই না সু তিয়াঁ স্বর্গে বসে অনুশোচনা করুক আমাকে জীবন দান করার জন্য! তাই, শিন ছি -”

মিন হুয়ে নিজের চোখের জল মুছে নিলো, “আমি আমার জীবনের বাকিটা তোর মতো অসন্তোষ করে আর অনুশোচনা করে কাটাবো না।”

“ওয়াও, মিন হুয়ে, অবাক হওয়ার কিছুই নেই যে তুই এমন সুন্দর জীবন কাটাচ্ছিস। কারণ তোর নিজেকে ক্ষমা করে দেওয়ার ক্ষমতাটা চমৎকার!" বিদ্রুপ করে উঠলো শিন ছি। 

মিন হুয়ে ঝট করে উঠে দাঁড়ালো। দাঁতে দাঁত চেপে ধরে, বড়ো বড়ো পা ফেলে বেরিয়ে গেলো দরজা দিয়ে। 

দেঁ চেন আর জিয়া জুন পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো।

“ইথান, আমার মনে হয় -" দেঁ চেন সোজাসুজি বললেন, “এই মাত্র যা বললে, সেটা বেশ বাড়াবাড়িই হয়ে গেলো।”

“আমি তো খুব বেশি কিছু বলিই নি!" রাগ দেখিয়ে বললো শিন ছি।

“শিন ছি গ্য," লাজুক ভঙ্গীতে বললো জিয়া জুন, “আমারও মনে হয় যে আপনি মিন হুয়ে জিয়েজিয়ের সাথে বেশ খারাপ ব্যবহার করলেন। সু তিয়াঁ জিয়েজিয়ে যা করেছেন তার বদলে উনি তো কিছু চান না। তাঁর তো প্রয়োজন ছিলো না আপনাকে মেগুওয়া থেকে ফিরিয়ে আনার, সব ক্ষতি পূরণ করে দেবার জন্য, আর সু তিয়াঁ জিয়েজিয়ের যা পাওনা সেটা ওকে পাইয়ে দেবার জন্য। ও তো কখনো ভাবে নি যে আপনি ওকে একটা সুখের জীবন দেবেন। ও শুধু এই জানতে চেয়ে ছিলো যে আপনি ভালো আছেন কিনা, ও কেবল চেয়ে ছিলো আপনি যেনো সুখে থাকেন। তেমনই চার বছর আগের সেই রাতে কাঠের সেতু থেকে উনি যখন বাণের জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ছিলেন কাউকে বাঁচানোর জন্য, তখনও তার বদলে উনি কিছুই চান নি। কারণ এটা কোনো লেনদেন নয়, এটা একটা উপহার, উনি আপনাকে দিয়ে গেছেন নিজের জীবন দিয়ে। আপনি শুধু ভালো করে সেটা গ্রহণ করলেই হবে। মিন হুয়ে জিয়েজিয়ের কোনো ঋণ নেই সি তিয়াঁ জিয়েজিয়ের কাছে, আপনারও কোনো ঋণ নেই সি তিয়াঁ জিয়েজিয়ের কাছে। সু তিয়াঁ জিয়েজিয়ের কিছুই পাওনা নেই। মিন হুয়ে জিয়েজিয়ে আপনার কাছেও কিছু ধারেন না। আপনি অন্ততকাল ধরে ওঁকে দোষারোপ করে যেতে পারেন না, ওঁর অপরাধবোধটাকে আরো দগদগে করে তোলার কোনো দরকার নেই, কারণ উনি নিজেই ভীষণ রকম অপরাধবোধে জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে আছেন।”




~~~~~~~~~~~~

সম্পূর্ণ বই বিনামূল্যে : https://dl.bookfunnel.com/lcj5vznt96

Link to Previous Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/10/jpda-chapter-65.html

Link to following Post in the Series : https://projectionofnaught.blogspot.com/2024/10/jpda-chapter-67.html

Readers Loved