এক আঁজলা শিলাবতী
শুক্ল পক্ষের শুরু। আকাশটা যেন একটা কালো শিফনের উড়নি; তারাগুলো সেই শিফনে আঁটা নীলচে সাদা চুমকির গুঁড়ো। শিলাবতীর জলের আকুল বিকুল গানের আবহ, সামনের ঘন সবুজ জঙ্গলে আটকে পড়া নিকষ অন্ধকার, সব মিলিয়ে বসন্ত সন্ধেটা রুমকির শিরদাঁড়াতে শিরশিরানি এনে দিচ্ছে বারবার। মুখের মধ্যে মুচ মুচ করছে মূলোর কাটলেট আর গেঁড়ির চপের স্বাদ। সেটাকে ছাপিয়ে থেকেই থেকেই মনে হচ্ছে অন্ধকারে চিড় ধরিয়ে কালো চাদরে মুখ ঢেকে এক্ষুণি বুঝি কেউ আসবে কালো ঘোড়া টগবগিয়ে।
কিন্তু ঘোড়াটা আজ সকালেও সাদা ছিল। সেই কবে থেকে সাদা ঘোড়াটা আসে ঠিক করে আর মনেও পড়ে না রুমকির । বোধ হয় তবে থেকে আসে যবে থেকে বড়রা সবাই বলাবলি করতেন রুমকি খুব একটা সাংঘাতিক কিছু হবে একদিন; আর সে সব শুনে রুমকি ভাবত তাকেও বোধহয় বড়রা গুংগা বলে কাঁদতে শুনেছিল। কিন্তু সাংঘাতিক কিছু মানে কী – এরোপ্লেন নাকি চরকা; দাঁতখরকে না কানখুস্কি বোঝেনি সে। তার খুব জানতে ইচ্ছে হলে বড়দের কাছে জানতে চাইত যে সাংঘাতিক কিছু হওয়া মানে কি হওয়া। তাঁরা বলতেন, মাদার টেরেসা কিংবা ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গল কিংবা জোয়ান অব আর্কের মতো বিশাল না হলেও, রবি ঠাকুর বা আইনস্টাইনের মতো ব্যাপক না হলেও কিছু একটা হতেই পারে সে; আর পাঁচজনের থেকে আলাদা রকম; ভীষণ রকম নিজস্ব কিছু একটা। হয়ে ওঠার অস্পষ্টতায় এবং লাগাতার চেষ্টায় রুমকি একজন সাধারণ জীবিকানির্ভর গড়পড়তা মানুষ হয়ে উঠেছে।
তবে এই হয়ে ওঠার মধ্যে একান্ত নিজস্ব ছিল সেই ঘোড়ার যাতায়াত। যে সে ঘোড়া তো নয় পক্ষীরাজ একেবারে। পিঠে দুটো সাদা ডানা আছে যে। তবু কখনও রুমকিকে নিয়ে ঘোড়া উড়ে যায় নি। বরং একটা সবুজ ঘাসে ঢাকা পাহাড়ের মাথায়, যেখান থেকে দিগন্তে ঘন সবুজ গাছের জঙ্গল চোখে পড়ে শুধু, সেখানে ঘুরে বেড়াত রুমকির পায়চারির পাশে পাশে। কখনও হাঁটু মুড়ে বসা রুমকির কপাল, চিবুক, কাঁধ, ব্রহ্মতালুতে দিত তার ভিজে ঠোঁটের আস্কারা। কখনও পায়চারি করতে করতে কাঁধে ঘষে দিত তার থুতনি। কখনও এলোমেলো করে দিত রুমকির খোলা চুলের ঢল।
উটির শ্যুটিং স্পট দেখে বারবার রুমকির মনে হয়েছে ওখানেই ও ঘুরে বেড়ায় পক্ষীরাজের সাথে। কিন্তু সে দেখার সময় সঙ্গে ছিল শতেক লোকের মেলা। ঘোড়া তার ডানা মেলার জায়গাই পায় নি। তার ফলে ঘোড়া রয়ে গেছে নিজস্বতার নিভৃতিতে।
আজ সকালটা অবশ্য অন্য সব দিনের থেকে আলাদা। আজ রুমকি প্রথমবার ঘোড়ার পিঠে চেপে লাগাম ধরেছিল। সে এক ভীষণ ভালোলাগা। এই প্রথম ঘোড়া তার নিয়ন্ত্রণে এলো।
এদিকে ছিল নেমন্তন্ন ঠাকুরমণির ঘরে, শিলাবতীর তীরে। নেমন্তন্ন রাখতে যাওয়ার তাগিদে সকাল থেকে কাজগুলোও অন্যসব সব দিনের থেকে বেশ আলাদা হয়ে ছিল। ফলে গোটা দিনটাই রোজকার থেকে আলাদা হয়ে গেল।
রুমকির সাথে ঠাকুরমণির ভাব হয়েছিল বছর দশেক আগে; শালবনী ফডার ফার্মে। সেখানে ঠাকুরমণি ছিল বাগানমালির পার্টে; রুমকি ছিল আধিকারিকের পার্টে। কিন্তু পাঁচ বছরে ছবার বদলির ধাক্কায় পরিশ্রান্ত রুমকি ইস্তফা দিয়েছিল কাজে। তারপর রোজগারের ফিকিরে সে একটা কেক শপ খুলে বসেছে তার আদত শহরে। অদিতি আর টুম্পা দুই শাগরেদকে নিয়ে গড়গড়িয়ে চলছে রুমকির কেকের দোকান। তার অনুপস্থিতিতে সহকারিণী দুজন কেক কারখানার দিয়ে যাওয়া মাল বুঝে নেয়, গুছিয়ে তোলে, বিক্রির হিসেব রাখে। অবিশ্বাসের প্রশ্ন নেই; কোনো হিসেবে গরমিল হলে লাভের খাতায় তাদেরও ভাগে কম পড়বে যে। এজেন্সি থেকে মেয়ে দুটিকে নেওয়ার সময় চুক্তিপত্রই এমন করে বানিয়েছিল রুমকি। তারপর দায়িত্ব নিয়ে তাদের প্যান কার্ড বানানো, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে মাইনে ও লভ্যাংশ জমা পড়ার ব্যবস্থা এবং মাইনের সাথে চিকিৎসার বীমাও করিয়ে দিয়েছিল রুমকি। তবে তারপরেও দশ বছর কেটে গেছে। দিব্যি ঘর-বর-ছেলেকে নিজ নিজ ব্যবস্থায় আর দোকানটা দুই সহকারিণীর জিম্মায় রেখে আজকাল রুমকি হুটহাট বেরিয়ে পড়তে পারে বেড়াতে।
ঠাকুরমণির স্বামী মারা গেলে স্বামীর মালির কাজটাতেই তাকে বহাল করেন সরকার। তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে শ্বশুরের ভিটে ছেড়ে ঠাকুরমণি আস্তানা গাড়ে শালবনীতে। ছেলে লখীরামের পড়াশোনায় মন ছিল না মোটে। একটু বড় হলে সে ফিরে যায় বাপের ভিটেয়, জ্যাঠাদের সাথে জমিজিরেত দেখাশোনা করতে, বুঝে নিতে। বড় মেয়ে দূর্গা সেকেণ্ডারি ইস্কুলে ভূগোল পড়ায়। ছোট ছিল জবা। সে এখনও আছে কিনা সে কথা কেউ জানে না।
ছেলেমেয়ের সাথে একটা বিতণ্ডা হলেই, কিংবা না হলেও ঠাকুরমণি রুমকির সালিশি চায় প্রায়ই; ছেলেমেয়েরাও রুমকির বিবেচনার ওপর ভরসা করে যে। এই ভরসা ঠাকুরমণিরই হাতে গড়া। সেই শালবনীর দিনগুলোতে বাড়ন্ত ছেলেমেয়ের সামনে ঠাকুরমণি রুমকিকেই তুলে ধরতো আদর্শ হিসেবে। যদিও সেই দিনগুলোতে ঠাকুরমণি নিজে রুমকির কতবড় ভরসা ছিল তা কেবল রুমকি আর ঠাকুরমণিই জানে। তাই বারবার রুমকিকে ফিরে আসতে হয় ঠাকুরমণির ডাকে, ভরসায় গাঢ় হওয়া সম্পর্কের দাবিতে। যেমন এবার আসা দূর্গাকে বিয়ের জন্য রাজি করাতে।
রুমকি জানে নতুন সম্পর্ক, নতুন পরিবেশ - এসবে প্রবেশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শর্তের সাথে আপোষ করা নিয়ে একটা দ্বিধা এবং অনীহা তৈরি হয়েছে দূর্গার মনে। এর জন্য ওর চাকরিটাই দায়ী বলে মনে করে রুমকি। দূর্গা যখন ইস্কুলে চাকরিটা পায়, তখন ইস্কুল কর্তৃপক্ষ ওকে সাফ সাফ জানিয়ে দেয় যদি ও প্রথম মাসের মাইনে ইস্কুল কমিটিতে দেয় তবেই ওর কাজে যোগ দেওয়ার খবর কর্তৃপক্ষকেকে জানান হবে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় জেতা চাকরি দূর্গার; ইস্কুল কমিটির কোনো ভূমিকাই ছিল না তার এই জয়ে। তাই দূর্গার মোটেই ইচ্ছে ছিল না ইস্কুল কমিটির দাবি মানার। ইস্কুল কমিটির শর্তের মোকাবিলা করার জন্য একটা রাস্তা খুঁজে বের করার তাগিদে দূর্গাই রুমকিকে পুরো ঘটানাটা জানিয়েছিল। তারপর রুমকির এক উকিল মাসির পরামর্শে দূর্গা হেডমাস্টারের কাছে দেওয়া জয়েনিং রিপোর্টের কপি নিয়োগকর্তাকে পাঠিয়ে দেয়; জয়েনিং রিপোর্টের আরেকটা কপি পাঠিয়ে দেয় রাজ্যপালকেও, যেহেতু দূর্গা লোকসেবায় যোগদান করেছিল এবং রাজ্যপাল রাজ্যের সর্বোচ্চ জনপ্রতিনিধি। বলাবাহুল্য ইস্কুল কমিটির দাবিটা ধোপে টেকেনি এবং প্রথম আক্রমণেই দূর্গার জোরাল প্রতিরোধ দেখে ইস্কুলের সবাই ভেবে নেয় যে ওর হাত খুব লম্বা; পরে ওর সাথে কেউ কোনো বেয়াড়াপনা করে নি। কিন্তু ইস্কুলের সবার সাথে সম্পর্কটা পাঁচ বছরেও সহজ হয়ে ওঠে নি।
দূর্গার দ্বিধার অন্যদিকে আছে তিন বছর আগে, কলেজে পড়ার সময়, হোস্টেল থেকে জবার গায়েব হয়ে যাওয়া। জবা স্বেচ্ছায় গেছে বলে বাড়ির কেউ মেনে নিতে পারছে না। আবার অনিচ্ছার সপক্ষে কোনো প্রমাণও নেই। এই দূর্ঘটনার আগে থেকেই ঠাকুরমণির কাছে আসছিল কিছু উড়ো চিরকুট। চিরকুটে দাবি থাকত, ঠাকুরমণির বাড়িতে তিন-তিনটে রোজগেরে লোক; নাগরিক কর্তব্য হিসেবে ঠাকুরমণিদের উচিৎ তিনজনের শ্রমের ভাগ দিয়ে তাদের বাসভূমির স্বার্থে ঘটা মহান বিপ্লবকে পুষ্ট করা। দূর্গা চাকরিতে ঢোকার বছরখানেক পরে ঠাকুরমণি সরকারি কাজটায় ইস্তফা দিয়েছিল, তাই উড়ো চিরকুটকে ওরা কেউই আমল দেয় নি। কিন্তু জবা হারিয়ে যাওয়ার পরে, চিরকুটগুলো থেকে ওরা ভয় পেতে শুরু করে। আপোষহীনতার স্বাদ সেই সময়ে দূর্গার খুবই তেতো আর ভারি ঠেকে। সেই উদ্যোগ নেয় সপ্তায় সপ্তায় বিপ্লবের থলি ভরে দেওয়ার। পুরো ঘটনাটার গ্লানিতে মেয়েটা কুণ্ঠিত হয়ে আছে। একটা নতুন পরিবারের সঙ্গে বিয়ের মতো ঘনিষ্ঠ যোগাযোগে এসব প্রেক্ষিত ব্যাখ্যা করাও বেশ দূরুহ বলে মন হয় দূর্গার। সেটাও রুমকি বোঝে।
নিরবচ্ছিন্নভাবে দূর্গার জন্য একটা সমাধানের কথা ভাবতে চেষ্টা করছে রুমকি, সন্ধের ভালোমন্দ জলখাবার খেয়ে শিলাবতীর ধারে বসে; যেমন অন্য সব বার সে বসে ঠাকুরমণির বাড়ি এলেই, কারণে -অকারণে। যদিও মনে সাদা ঘোড়ায় লাগাম পরাবার আত্মবিশ্বাস আছে; তবুও যুক্তিজালকে সাজিয়ে নিতে চাইছে সে। এরমধ্যেও বাসন্তী হাওয়ার খামখেয়ালিপণায় কালোচাদর আর কালো ঘোড়া উঁকি দিয়ে গেল মনে। তারপর ঠাকুরমণির অপূর্ব চপ-কাটলেটের স্বাদ কেবলই ভাবাচ্ছে কেকশপের কোণে ট্র্যাডিশনাল স্ন্যাক্স-এর ঝাঁপ লাগালে বেশ হয়; আবার তাতে আলাদা করে করাতে লাগবে হাইজিন সার্টিফিকেশন; নির্ঝঞ্ঝাট ব্যবসায় সেধে ঝামেলা ডাকা হবে সেটা।
একটা পাতা পড়ল ওপাড়ের শালগাছ থেকে। অন্ধকারেও চোখ এড়াল না রুমকির। কে জানে কী কারণ; মাধ্যাকর্ষন কী গোড়ার পচন; কিংবা দুটোই; কিংবা আরও অনেক কিছু যা রুমকির বোধের বাইরের। তারপর সত্যিই জঙ্গল থেকে খানিকটা অন্ধকার বেরিয়ে এলো। নজর করে বুঝলো রুমকি, অন্ধকারের অবয়ব ঘোড়ার মতো মোটেই নয়। বরং হাতির মতো। মনে হওয়া মাত্রই রুমকি ভীষণ ভয় পেয়ে রুদ্ধশ্বাসে দৌড় লাগালো ঠাকুরমণির ঘরের দিকে। হাঁপাতে হাঁপাতে তাকে দাওয়ায় পৌঁছতে দেখেই রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো ঠাকুরমণি। লঙ্কা পোড়ার ধোঁয়া দিতে শুরু করল সবাই মিলে বাড়ির চারদিকে। গোলায় যদিও ধান নেই, তবুও হাতি যদি খিদের টানে গোলাটাই ভাঙচুর করে! তাই সাবধানতা। ততক্ষণে হাতি খ্যাদানে দল টিন পিটিয়ে ছুটে গেছে নদীর ধারে। কটা হাতি এসেছে, হাঁড়িয়ার লোভে না ধানের কেউ জানে না। মশালের আলোছায়ায় দেখা যায় শিলাবতীর পাড় ধরে হাতির পাল চলেছে উত্তর-পশ্চিমে। এ অঞ্চলে এসময়ে ফসল নেই। তাই হামলার আশঙ্কা কম। হয়তো পশ্চিমে কিছু খাবার পাবে এসময়। তাই যাচ্ছে। না হলে এখানেই ঘরদোর ভেঙে তছনছ করবে খাবারের খোঁজে; গৃহস্থের কলাটা, মূলোটাও বাদ দেবে না। মানুষ হলে কিছু টাকা ধরে দিয়ে নিস্তার পাওয়া যেত, কিন্তু পাশবিক বুভুক্ষার কাছে টাকা নিতান্তই অচল।
রাত আরেকটু বাড়তে নিশ্চিত হওয়া গেলো যে এ রাতের মতো হাতির উপদ্রব হবে না। লখীরাম ঘরে ফিরতে সবাই মিলে দাওয়ায় বসে ভাত, বিউলির ডাল, কুঁদরি ভাজা, কপি পোস্ত ঝিনুকের চচ্চড়ি আর রুমকির প্রিয় কুটকুটের চাটনি দিয়ে সেরে ফেলল রাতের খাওয়া। খাওয়ার পাতেই বিভিন্ন গুলতানি চলল। তার মধ্যে ছিল কুটকুট পুষে তার চাটনি টিনে ভরে চালান দিয়ে রোজগার বাড়াবার ফিকির থেকে ফডার ফার্মে ধান চাষ করে হাতির গরাস থেকে চাষীর ফসল বাঁচাবার ফিকির অবধি যাবতীয় কল্যাণমূলক আলোচনা।
আঁচাবার পরে বসা হলো দূর্গার মগজ ধোলাই-এ। লখীরামের বউ সরলাই পাড়ল কথাটা। দূর্গার গাল টিপে বলল এতো বড় ননদ নিয়ে সে আর ঘর করতে পারছে না; আর ননদ এমন বেহায়া সে কথাটা বুঝেও বোঝে না। দূর্গা ফোঁস করে উঠল যে সে রোজগেরে, ভাই-এর বোঝা নয়, ভাইবউ নেহাতই বেহায়া, তাই সে কথাটা মনে রাখে না। নানা তর্কাতর্কির শেষে রাজি করানো গেল দূর্গাকে; মায়ের কিংবা ভাই-এর ধরে আনা যেকোন লোককে নয়, মেয়ে যা হোক নিজে দেখে শুনে একজনকে বিয়ে করবে যাকে তার কুন্ঠার কথাটুকু নির্দ্বিধায় বলতে পারবে। এর মধ্যেও ঠাকুরমণিতে-রুমকিতে ব্যবসার কথা হয়ে গেলো কিছু।
ঠাকুরমণি খুব দ্বিধায় আছে। ঘরের পাশের পোড়ো জমিটা মুর্গিঘর বানাবার জন্য চাইছে একটা হ্যাচারি কোম্পনী। চারা ওদের, খাবার ওদের, ডাক্তার ওদের, ডিম, মাংস ওদের, এসব লেনা-দেনার খরচও ওদের। জমি আর মজুর ঠাকুরমণির। লাভ-ক্ষতিটা ভাগাভাগি হবে। প্রায় রুমকির কেক ব্যবসার মতোই। এদিকে তিন-তিনটে রোজগেরে লোকের কারণেই বাড়ি বয়ে এসে টাকা নিয়ে যাচ্ছে ভয় দেখিয়ে; তার ওপর মুর্গিঘর হলে ওদের দাবি বেড়ে যাবে হয়তো। ওদিকে আইন মোতাবেক খাজনা দিলেও, পার্টির লোক নজরানা চাইবেই। এদিকে চাষের জমি থেকে রোজগারও তেমন হয় না, সব বছরে ফলনও সমান যায় না। তার ওপর সব বছরই আছে হাতির হানা। লখীরামের ছেলেটাও বড় হচ্ছে। দূর্গার বিয়ের পর ওর পয়সা সংসারে আসুক এটা ঠাকুরমণির ইচ্ছে নয়। তাহলে ঠাকুরমণি চোখ বুজলে, পেনশন বন্ধ হলে ছেলে-বউ-নাতির আর্থিক সমস্যা বাড়বেই কিছু। সেদিনের কথা ভেবেই মুর্গিঘরের মতো একটা ব্যবসা করতে চায় ঠাকুরমণিও। কিন্তু চাঁদার চাপে ব্যবসা চালানো যাবে কিনা সেটাই ঠাকুরমণির ভাবনা। রুমকি তো বছর দশেক করছে ব্যবসা। ওর মতটা জানতে চায় ঠাকুরমণি।
এইবারে রুমকি টের পেলো পক্ষীরাজের বেয়াড়া ছুট। ও বলে বসে বিপ্লবের খরচা চাইতে আসা ছেলেগুলোকেই চাঁদার দ্বিগুণ মাথাপিছু মাইনে দিয়ে রাখার চেষ্টা করতে; অন্তত ওদের সাথে এরপরের মোলাকাতে কথাটা বলে দেখতে; সঙ্গে জীবনবিমার উপরি, ওদের কিছু হলে ঘরের লোকেদের ভাবার যেন কিছু না থাকে। রুমকির মতে এর ফলে এদের বিপ্লবের চাঁদার পয়সাটা কিছুদিন নাও দিতে হতে পারে। বাকি রইল পার্টির নজরানা; সেটা আগবাড়িয়ে না দিয়ে যে যেমন যখন চাইবে কিছু দরাদরি করে দিয়ে দিলেই ঝামেলা শেষ; ঠাকুরমণির গ্রামে যখন বিশ দলের উপদ্রব নেই, রুমকিদের শহরের মতো, তখন সে খরচটাও খুব বেশি পড়ার কথা নয়। সব কথা ঠাকুরমণি খুব মেনে নিতে পারল বলে রুমকির মনে হলো না।
তারপর কেটে গেল মাস তিনেক। একদিন দোকানে বসেই রুমকি খবর পেল মোবাইল ফোনে। তিনটে ছেলে ঠাকুরমণির প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেছে। ঠাকুরমণি খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছে মুর্গিঘর গেঁথে তোলায়।
তার মাস ছয়েক পরে দূর্গার বিয়ে হয়ে গেলো এক ভেটেরিনারি সার্জেনের সাথে। দূর্গার গ্রামের, পরিবারের সব কথা শুনে পাত্রপক্ষ প্রস্তাব দিয়েছিল কেরানিচটিতে দু পক্ষ মিলে একটা বাড়ি ভাড়া করে একসাথে বিয়ের অনুষ্ঠান সেরে ফেলতে। দিন তিনেক সপরিবারে রুমকি খুব হৈ হৈ করে এলো।
বছর প্রায় ঘুরে গেল। দোল পূর্ণিমার দুদিন আগে ঠাকুরমণির মুর্গিঘরে আগুন লেগে গেল। ভীষণ পুড়ে গেল তিন কর্মচারীই। দুজনকে প্রাণে বাঁচানোও মুশকিল বলে জানাল হাসপাতাল থেকে। তবে গ্রামের পাঁচজন মিলে এগিয়ে আসায় আগুন নিভিয়ে ফেলা গেল তাড়াতাড়িই; ভিটেতে আগুন পৌঁছোনোর আগেই। একজন কর্মচারী মারাও গেল দুদিন পরে। খুব মুষড়ে পড়ল ঠাকুরমণি।
মাস খানেকের মধ্যে বীমা কোম্পানি সব দেখেশুনে যা খেসারত দিল তাতে ঠাকুরমণির মুর্গিঘর আবার দাঁড়াল। এবার পার্টিই তিনজন মজুরের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। তার মধ্যে একজন আবার আগুনে পুড়ে মারা গেল যে ছেলেটা তার বোন। পুরোন দুজন মজুরও সুস্থ হলে কাজে লাগবে। নতুন করে গাঁথনি শুরু হলো বলে ঠাকুরমণি মুর্গিঘরটা খানিকটা বাড়িয়েও নিচ্ছে।
পরের বসন্তে শিলাবতীর হাওয়া খেতে খেতে রুমকি স্পষ্ট দেখল পক্ষীরাজ ডানা মেলেছে। সবুজ ঘাসের কার্পেট একটু একটু করে দূরে চলে গেল; মেঘেরা এল হাত মেলাতে। ঘোড়ার সাথে। রুমকি কিন্তু শিলাবতীর পাশেই বসে আছে।

No comments:
Post a Comment