কুটুসের কথা
বিকেল প্রায় শেষ। কুটুস আর রাঙি বাড়ির রাস্তা ধরেছে। এমন সময় জেম্মার সাথে দেখা। জেম্মা বলল, “চল, ওদিকটা একটু ঘুরে আসি।”
বড়োরা সঙ্গে থাকলে সন্ধের মধ্যে বাড়ি ফেরার নিয়মটা একটু শিথিল হয়ে যায়। তাই দুই বোনে জেম্মার সঙ্গী হলো নির্দ্বিধায়। কিন্তু বেশি দূর যাওয়ার আগেই ঝপ করে পাওয়ার কাট হলো। তাই জেম্মা বললেন, “আর গিয়ে কাজ নেই।”
তারপর যেই মুখ ফেরালেন বাড়ির দিকে অমনি একটা লোক ছুটে এসে ওদের তিনজনের গায়ের ওপর পড়ল। আর হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “ওদিকে যাবেন না। বিপদ হবে।”
তবু জেম্মা জোর দিয়ে বলল, “ওদিকেই যে আমাদের বাড়ি। আমাকে যে যেতেই হবে। মেয়েদুটোকে নিয়ে... সন্ধেবেলা বাইরে, তায় লোডশেডিং।”
তখন লোকটা বলল, “ওদিক দিয়ে চীনের সৈনিকগুলো আসছে অস্ত্র নিয়ে। আপনাদের আক্রমণ করতে পারে।”
তারপর সে ফস করে একটা দেশলাই জ্বালল। তাতে কুটুসের মনে হলো লোকটা যেন জ্যাকি চ্যান। কিন্তু রাঙিকে সে কথা ফিস ফিস করে বলতে যেতেই রাঙি মুখ বাঁকিয়ে বলল, “তোর তো সেলিব্রিটি দর্শনের মনের রোগ আছে!”
ম্রিয়মান হওয়ার সুযোগ পেল না কুটুস। ফটফট করে আওয়াজ হলো আর পায়ের সামনে এসে কীসব রাস্তার ওপর পড়তেই ঠং ঠং করে রাস্তার ইট ভেঙে ঠিকরে যেতে লাগল।
তখন জ্যাকি চ্যান তিনজনকে হাতের একধাক্কায় গলির মুখ থেকে ঠেলে গলির মুখের শেষ বাড়িটার আড়ালে সরিয়ে দিল। কুটুসের গাল টিপে বলল, “তুমি ঠিক চিনেছ!”
কিন্তু কুটুসের আনন্দ হলো না। কারণ ওর তখন ভূতের ভয় পেতে লাগল। ওরা তো বাড়ির কাছে মানে বোসপাড়ার ইটপাতা গলিতে হাঁটছিল। কিন্তু এখন যে পাড়াটায় সে, রাঙি আর জেম্মার সাথে দাঁড়িয়ে আছে, সেটা তো ভাকুণ্ডা।
চৌখুপি প্লটে সাজানো বাড়ির সারির পাশ দিয়ে চলে যাওয়া সোজাসুজি গোণাগুনতি রাস্তা তো শহরের নতুন পাড়া ভাকুণ্ডাতেই আছে। বোসপাড়ার মতো পুরোনো পাড়ায় তো কেবল বাঁকাচোরা ইটপাতা গলি আছে, দুধারে বিশ-বাইশ ইঞ্চি গাঁথনির শতখানেক থেকে শচারেক বছরের পুরোনো পাঁচিল নিয়ে। কী করে এলো ওরা এখানে? বুঝে উঠতে পারছিল না বলেই মেরুদণ্ড বেয়ে ঠাণ্ডা বরফ গলা জল নেমে যাচ্ছিল শিরশিরিয়ে।
সবাই ভীষণ চুপচাপ। জেম্মা পায়ে পায়ে পিছোতে শুরু করতেই জ্যাকি চ্যান কোমর থেকে একটা বন্দুক বার করে গলির দিকে গুড়ুম করে দেগে দিল। হাতে ফুলঝুরির মতো একটা আগুন নিয়ে একটা লোক লুটিয়ে পড়ে গেল। গলিতেই। জ্যাকি চ্যান তখন ফুলঝুরিটা থেকে একটা তার টেনে বার করল, আর অমনি সেটা নিভে গেল।
তারপর সে কানের পাশ দিয়ে ডানহাতটাকে বাঁইবাঁই করে ঘুরিয়ে উত্তর-পশ্চিম কোণে কী একটা ছুঁড়ে দিল। হাতটা প্যান্টে মুছতে মুছতে বলল, “দিলাম ওদের ওয়ালমার্ট উড়িয়ে। ঘাঁটি গাড়া? বোঝ এখন।”
কথাটা তার শেষ হতে পেল না, উত্তরপশ্চিমের আকাশ লাল হয়ে উঠল।
**********
ঘুম ভেঙে গেল একটানা ঘ্যানঘ্যানে একটা আওয়াজে। মোবাইল ফোনে তো অ্যালার্ম বাজছে না। তবু মোবাইলটা হাতে নিল কুটুস কটা বাজে তা দেখতে। রাত দুটো দশ।
পাশে অকাতরে ঘুমিয়ে যাচ্ছে গাবলু। গাবলুর দিকের বেড সাইড টেবিলের ওপর অল্প আলো ছড়িয়ে আছে মানে ওর ফোনে অ্যালার্ম বাজছে। কুটুস গাবলুকে এন্তার ঠেলাঠেলি করে বলল, “অ্যালার্মটা বন্ধ করো।”
“উঁঃ! আঁঃ” করে গাবলু বলল, “অ্যালার্ম বাজছে তো কী হয়েছে? ও তুমি শুনো না, ঘুমিয়ে পড়ো।”
অগত্যা কুটুস খাট থেকে নেমে পড়ল। গাবলুর দিকের টেবিলে গিয়ে অ্যালার্মটা বন্ধ করে দিল।
*******
মণিকোঠার দোতলায় পশ্চিমের ঘরের পশ্চিমের দেওয়ালে একটা গরাদহীন জানলা আছে। সেটা দিয়ে একটা ধরিয়াল এসে খাটে বসে। কখনো কখনো মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে উইলসন সাইকেল।
হয়ত মনে মনে গোণে কবে আরব আর মেক্সিকো উপদ্বীপ দুটো এক হয়ে যাবে। বা তাদের মধ্যে দিয়ে চলে যাবে একটা ভঙ্গিল পর্বত যার একপাশে ইউরোপ আরেক পাশে আমেরিকা।
কুটুস ধরিয়ালকে পাখিপড়া করে বোঝায় যে তখন ওরা দুজনেই থাকবে না। তাতে ধরিয়াল বিরক্ত হয়ে উড়ে যায়। জানলা পেরিয়ে বারান্দায়, তারপর কাঁঠাল গাছে ওর বাসায়। কুটুসও কিছুক্ষণ পেন্সিল চুষে গলে যায় কোনো চ্যুতিতে বা পুড়ে খাক হয়ে মিশে যায় ননকনফরমিটির পাথুরে তলে।
ফের বর্ষা নামলে গরাদহীন জানলা গলে নেমে আসে বারান্দায়। হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেয় পাঁচ বছরে পঁচিশ ফুট লম্বা হওয়া কাঁঠাল গাছের একটা পাতা।
এটাকে ওর ভাই মনে হয়। আর ধরিয়ালের বাড়ি। কী অদ্ভূত জন্ত বদলে গেলে, জীবন বদলে গেলে, বাস্তুতান্ত্রিক অবস্থাণ বদলে গেলে একই গাছকে অন্যরকম লাগে! ভাইকে ডেকে বলতে গেলে বলে, “জ্বালাস নি, টিভি দেখছি। তাছাড়া কালই তো তোর ই-মেলের জবাব দিলাম। রোজ রোজ মেল করলে জবাব দেব কী করে? আমারও যে আপিস আছে এখন...”।
*******
থর্নরান আর নর্থার্প অ্যাপার্টমেন্ট পাড়া দুটোর মধ্যে বাসস্টপ। কুটুস এসে দাঁড়ালো সেখানে। যাবে হালিশহর। নন্দিতার বাড়ি। বাসটা এলো গ্রিনল্যাণ্ড নার্সারি স্কুলের লোয়ার কেজির অক্সফোর্ড বইয়ের পাতা থেকে। কিন্তু হলে কী হবে তাতে বেজায় ভিড়।
মোটেও ঘাবড়াল না। টুয়েলভে পড়ার সময় ফিজিক্স টিচার ননীবাবু শিখিয়ে দিয়েছিলেন যে ভিড় বাস মাত্রই ইনফিনিটির উদাহরণ। তাই নিঃসঙ্কোচে সেই অসীমের বুকে নিজেকে সঁপে দিল সে।
বাসের মধ্যে গাদাগাদি করে যাচ্ছে একগাদা মোটামোটা মেক্সিকান। এস্পানিয়ল বলছে কিনা তাই কুটুস বুঝতে পারল। জানলা দিয়ে দেখল কুটুস দরজায় ঝুলছে বিগু সিং।
তিনবছর আগে হলে কুটুস বিগুকে বোঝাতে চাইত যে বিগুটা ঠিক নয়, ঠিক হলো ভৃগু। সরকারি কর্মচারি হয়ে বিগু নিজের নাম ভুল বললে জনতা কী শিখবে?
আজ এসব কুটুস বলবে না। কারণ আজ সে মনে করছে বিগু কী নামে নিজেকে পরিচিত করবে সেটা বিগুর ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন; নামের ঠিক ভুল, পছন্দ নিয়ে বিগুকে জ্ঞান দেওয়াটা কুটুসের অনধিকার চর্চা। তাছাড়া বিগু অর্ধশিক্ষিত হলেও শুক্র ছুটে যাবে সূর্যের বুক দিয়ে, সুশিক্ষিত হলেও তাই। কোনো অনিবার্যতাকে কুটুস কিংবা বিগু কেউই ঠেকাতে পারবে না বিগু ভৃগু হলে।
এসব গুরু গভীর সমাজ চিন্তা ছিঁড়ে দিল মীরাদির চিৎকার। “হালায়, দেইশডারে বাংলাদেশ পাইসে! নামার রাস্তা সব আটকে রেখেসে, সেনো কোনো নিয়ম নাই! হেই গেইটটা সাড় হারামসাদা... নাইমতে দে...”
তার এই নিতান্ত বাংলা গালি মেক্সিকানগুলো বুঝলো কিনা কে জানে। কিন্তু সে নেমে গেল কলোনি মোড়ে। আর গেটের মুখে প্রবল ভিড় রয়ে গেল আগের মতোই।
******
বাসটা ইটপাতা রাস্তা নিল। দুই মজুমদার বাড়ির বাঁকের মধ্যে জায়গাটা বোসপাড়া না সিসিলি না হাভানা না কলম্বিয়া বোঝা গেল না। তাই কুটুস নেমে পড়ল একটা কালিবাড়ির সামনে।
নেমে দেখল কালিবাড়িটা ক্লাব হয়ে গেছে। যা হোক তার পাশে আরেকটা ইটপাতা গলি পাওয়া গেল। সেটা ধরে দুমিনিট হাঁটতেই কাঙ্খিত জোড়া পুকুর দেখা দিল। পাশের বাড়িতেই নন্দিতা থাকে।
কোনো কড়া নাড়ানাড়ির বালাই নেই। ওদের বাড়ির উঠোনটাই গলিতে মিশেছে। নন্দিতার এন্ট্রাসটা এখনো বেড়া লাগানো, বাগান ঘেরা। উঠোন আর রাস্তা মেশা ওদের বাড়ির পুরোনো সদরের পথেই কুটুস ঢুকে পড়ল দালানে।
ভোরের আলো সবে ফুটছে। সারা বাড়িতে ঘুমের গাঢ় নিঃশ্বাসের তাল পড়ছে ঘরে ঘরে। একটা দরজা খুলে ঘরের একচিলতে হলদে আলো দালানে ফেলে কুটুসের সামনে এলেন নন্দিতার নাম-না-জানা এক দাদা। বললেন, “তুমি নাকি দারুণ চা বানাও? আমাকে এক কাপ ফাইন লিকার করে দাও এক্ষুনি।”
কুটুসও হাতের বড়ো কিটব্যাগ রেখে ঢুকে পড়ল রান্না ঘরে। স্পিরিট ল্যাম্প জ্বেলে চা বানাতে বানাতেই বৌদি এলেন হাঁপাতে হাঁপাতে। বললেন, “এই এই জামা-প্যাণ্টগুলো ইস্ত্রি করে দে এক্ষুনি, দাদা সকাল সকাল বেরোবে এগুলো পরে।”
কুটুস দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল, “চুতিয়া! বাড়িতে আইবুড়ো মেয়ে দেখলেই খাটাতে ইচ্ছে করে সব হারামির।”
এসব কথা বৌদি শুনতে পায় নি। সে “না” শুনতে চায় নি। তাই জামাকাপড়ের তাগাড়টা পুরোপুরি নামাবার আগেই ঘর ছেড়ে চলে গেছে।
“বালাই ষাট! কে বলল তুমি আইবুড়ো?” বলতে বলতে একজন টোপা গাল ঝোলা থুতনি, কোঁচকানো চামড়া বুড়িমা হুইল চেয়ার চেপে দেয়াল ভেদ করে ঢুকলেন। ফ্রিজ থেকে একটা শশা বার করে মাইক্রোওয়েভ ওভেনে দিলেন গরম করতে। ফোকলা হেসে বললেন, “ঠাণ্ডা শশা খেতে পারি না। রসগোল্লা অবশ্য চিল্ডই খাই। যখন ভিতরে রসটা জমে দানা হয়ে যাবে আর কনকন করবে ঠাণ্ডায়, তখন। তবে ছোটো বেলার মতো ফুটন্ত রসসুদ্ধ রসগোল্লা পেলেও খেতে পারি। আর জিলিপি আমি কোনোদিনই বাসি খাই না-।”
দুম করে একটা শব্দ হতেই বুড়িমা থেমে গেলেন। আসলে কথা বলতে বলতে উনি সমানে মাইক্রোওয়েভের “অ্যাড থার্টি সেকেন্ড” বোতামটা টিপে গেছেন লাগাতার। ফলে মাইক্রোওয়েভের ভেতরে শশাটা ফেটে গেছে। বুড়িমা অবশ্য একটা বাটিতে ফাটা শশার সব টুকরো চেঁছেপুছে তুলে নিয়ে বাটিটা ফ্রিজে রাখলেন খাওয়া যুগ্যি ঠাণ্ডা করতে।
চেয়ারের খাঁজে রাখা ক্যাথেটারে হাত বুলিয়ে বললেন, “এটা টয়লেটে মুক্ত করে আসি। অক্সিজেনটাও বদলাতে হবে।” আর গড়গড়িয়ে চলে গেলেন পর্দা ঠেলে।
*******
রান্নাঘরে বাধাকপি কুড়তে কুড়তে বুড়ো আঙুলের গাঁটটাও কোড়া হয়ে গেল। বিনবিন করে রক্ত বেরোতে লাগল। আর বাধাকপির পাপড়িগুলোর গায়ে লাল ছোপ লাগল। স্বাস্থ্য বাঁচাতে বাধাকপিটা ধুয়ে ফেলাই উচিৎ। কিন্তু স্বাদ বাড়াতে না ধোয়াটাই ঠিক। দ্বন্দ্বে মধ্যে কুটুস বুঝতে পারলো যে ও বাস্তবে বাস করছে।

No comments:
Post a Comment