Friday, March 27, 2026

Kathberali

 

কাঠাবেড়ালি



মুখের ওপর দিনের প্রথম রোদ এসে পড়ল। অনির্দেশকে খিঁচিয়ে উঠল কাঠবেড়ালি। এসময়টায় বড়ো বিরক্ত লাগে। চোখ খুলতে ইচ্ছে করে না। তবু রাজ্যের আলো মাখামাখি হয়ে যায় চোখে। আরও একটুক্ষণ গড়াতে ইচ্ছে করে ঠাণ্ডায়। এ সময়েই সব শান্তি খানখান করে ডেকে ওঠে বাজখাঁই কাক। ঘাপটি মেরে ঘুমিয়ে থাকার আর উপায় থাকে না।

উঠে পড়ে লি নামের কাঠবেড়ালি। আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলতে তুলতেই টের পায় পেটটা বড্ড খালি। গা-ঝাড়া দিয়ে বেরিয়ে পড়ে বাদামের খোঁজে। বাদাম যোগাড়ের সময়েই ঘুম ভাঙার দুঃখটা চলে যায়। বরং মনে হতে থাকে, ভোর ভোর ঘুম ভেঙেছিল ভাগ্যিস! না হলে বাদামগুলো সব ভাই, ভাদ্রবউরা মিলে সাবড়ে দিত এতোক্ষণে। তারপর বহুদুর গেলে তবে পাওয়া যেত বাদাম। তাই মনে মনে ক্ষমা চেয়ে নেয় কাকের কাছে বিরক্ত হয়েছিল বলে।

এমনিতে দূরে যেতে খারাপ লাগে না লির। দূরে গেলে তার নিজের হয়ত পেট ভরে খাওয়া জুটে যায় সারাদিন, কিন্তু দাদু বেচারাকে সারাদিনে অনেকটা উপোস দিতে হয়। যত উপোসের জ্বালা বাড়ে বেলা বাড়ার সাথে সাথে, দাদুর মুখে তত গালাগালির ছররা ফোটে। 

মানুষগুলোকে দুচোখে দেখতে পারে না দাদু। দাদু যখন জোয়ান ছিল তখন লির থেকেও অনেক বেশি শক্তি ধরত, পেতও বেশি, খেতও বেশি। তার ওপর দাদুকে তার অথর্ব দাদুর জন্য খাবার বয়ে বয়ে আনতে হতো না সারাদিনে চব্বিশবার। সারাদিন দাদু খেলত, খেলত আর খেলত। মাঝে মাঝে প্রেমও করত। 

লির কিন্তু সারাদিন কেটে যায় নিজের আর দাদুর খাবারের খোঁজে। দুর-দূরান্ত থেকেও লি দাদুর জন্য খাবার নিয়ে আসে। দাদু যে এক্কেবারে চলতে ফিরতে পারে না। এদিকে এমন কেউ নেই যে লির সাথে কাজটা ভাগ করে নিতে পারে। লির বাবা-মা লির ছোটবেলাতেই মোটর গাড়িতে চাপা পড়ে আর ইলেক্ট্রিক তারে পুড়ে মারা গেছে। এই জন্যই দাদু মানুষগুলোকে সহ্য করতে পারে না। ওদের কেবল নিজেদের ভালো থাকা নিয়েই কথা। জগতে আর বাকি কে  কেমন আছে তা নিয়ে কোনো মাথা ব্যাথা নেই। দাদুর মতে লির ভোগান্তির জন্য বজ্জাত মানুষগুলোই দায়ী। না শুধু ওর বাবা-মায়ের মৃত্যুর জন্যই নয়; দাদুর খাবার বয়ে আনার ঝক্কিটাই নাকি লির থাকত না যদি দাদুর ছোটবেলার মতো গাছ আর খেত থাকত এখন।

দাদুর ছোটবেলায় অনেক গাছ আর খেত ছিল। গাছে ছিল বাদুর, চিল, শকুন। বুড়ো কাঠবেড়ালিরা বসে বসে ঝিমোত যখন তখনই তাদের সদগতি করে দিত পাখিগুলো। এরকম করেই লির দাদুর দাদু, বাবা, মা, ঠানদি সবাই একে একে ইহকাল থেকে পরকালে পাড়ি দিয়েছিল। 

অথচ দাদুর বেলায় দেখ! গাছ, খেত, পাখি সব গায়েব। শুধু দাম্বা দাম্বা বাড়ি আর বাড়ি; সেসব বাড়ির দেয়ালে, তাকে, কোনায়, খাঁজে ফরসা, ফ্যাকাসে, দামড়া কালো, গুটকে, ভয়াল হাজার রকম মাকড়সা আর মাকড়সা। বাড়ি বানিয়ে মানুষগুলোর আর সাধ মেটে না। একপাল বাড়িতে ঢোকে আর পিলপিলিয়ে আরেকপাল আসে; লাউ মাচা বাঁধে খালপাড়ে। 

দাদুকে পাখিতে নিল না। এদিকে হাঁটুর বাতে চলচ্ছক্তিরহিত দাদু। কোথাও যেতে পারে না। তাই দাদুর মানুষের মোটরে কিংবা ইলেক্ট্রিক শকে মারা পড়ারও কোনো উপায় নেই। দাদু সারাদিন ঘ্যান ঘ্যান করে, কেন হাঁটুর মতো বুকের ধুক ধুকিটাও থেমে যাচ্ছে না যে।

এসব শুনতে শুনতেই লির পেটে হয় চাপ লাগে, ঝটপট মাটি খুঁড়ে হালকা হয়ে নিতে হয় তাকে; নয়তো খিদেতে পেটটা পাক দিয়ে ওঠে। তখনি ছুটতে হয় বাদামের খোঁজে। 

এতসব ব্যস্ততার মধ্যে তিন-চার দিনে অন্তত একবার চোখাচোখি হয়ে যায় লিনির সাথে। লিনি থাকে দু তিন পাড়া পরে। দাদু অনেকবার তাড়া দিয়েছে লিকে লিনির সাথে প্রেম পর্ব শুরু করার জন্য। কিন্তু খাবার খাবার করে দৌড়ে লিনিকে একলা পাওয়াই যায় না কখনও। কখনও কখনও লি ভাবে যে কি হবে লিনির সাথে প্রেম করে; লিলি আসবে। ব্যস; তারপর সেই দৌড় খাবার খাবার খাবার। 

একদিন দুপুরে লি দাদুর পাকা লোমের থেকে পোকা বাছছিল। সে সময় লিনিদের পাড়ার অনেকে এলো দৌড়ে দৌড়ে লিদের পাড়ায়। ওদের ওখানে নাকি সব গাছ উপড়ে ফেলা হচ্ছে। গাছের ওপর দিয়ে মানুষদের গাড়ি না রেলগাড়ি কিসব যেন যাবে । পুরো পাড়া থেকেই কাঠবেড়ালিদের বাস উঠে গেল। উঠে গেল যে কটা পাখ-পাখালি পরিবার ছিল সে সব্বাই। 

লিনিকে নতুন আস্তানায় থিতু হতে সাহায্য করতে এল লি। তখনই লি জানতে পারল যে লিনি একদম একা। ওর আর কেউ নেই। তারপর দাদুর সাথে লিনি যখন ভাব করতে এল, তখন দাদুই লিনিকে বললেন আলাদা আস্তানায় একা না থেকে ওঁদের সাথেই থেকে যেতে। লিনি খানিকক্ষণ লেজ খাড়া করে চোখ পিটপিটিয়ে রাজি হয়ে গেল।

কিছুদিন পরে খুব বৃষ্টি নামল। দাদু আপন মনে গুন গুন করতে করতে নাক ডাকাতে শুরু করল। লি লিনিকে খুব খুব আদর দিল। 

তারপর কিছু মাস, কিছু বছর কেটে গেল। সারাদিন অনেক দৌড়োদৌড়ি করে তবে লি আর লিনি দুজনের খোরাক জোটে। লিনি আসার পরে লিদের সাবেক আস্তানা ছাড়তে হয়েছিল। সে পাড়াতেও মানুষের কেঁচোকল মাটি খুঁড়ে সব গাছ উপড়ে ফেলছিল। 

বেচারা দাদুও এই সময়ে মুক্তি পায়। হুড়োহুড়ির মধ্যে গাছের ডালে না কোনো যন্তরের ঘায়ে, নাকি মানুষের পায়ে পিষে সত্যি সত্যিই থেমে যায় দাদুর বুকের ধুকধুকি। শুধু চুপি চুপি লিনিকে বলে যায় দাদু নাকি লিলি হয়ে ফিরে আসতে চায়। আজও খুব বৃষ্টি পড়লে লিনি ঘন হয়ে এসে লিকে মনে করিয়ে দেয় সে কথা।

লি জানে না ঠিক কি কারণ। লিলিকে আনার ফুরসত নেই তার নাকি সাহসে কুলোচ্ছে না। দাদু মারা গিয়ে ইস্তক পাঁচবার আস্তানা বদলাতে হয়েছে লি আর লিনিকে। বাদাম তো দূর; কোনো খাবারই আর পেট ভরার মতো পাওয়া যায় না। 

তার ওপর লিনির বুকে বাতাস ধরে না। বেচারি দৌড়ঝাঁপ করতেই পারে না মোটে। একটু চললেই বাতাসের অভাবে বেচারির চোখ ঠেলে গোঁফ খুলে বেরিয়ে আসে যেন। 

লি একলা দুজনের খোরাকি এনে ঝিম মেরে যায়। লিনিকে আদর সোহাগ করতেই পারে নি সেই বৃষ্টির রাতের পর থেকে আর একবারও। তবুও লিনি লিলির কথা পাড়লে মন ভালো হয়ে যায় লির। তারপর বুকে যেন একটা পাথর চেপে বসে। খাবে কি লিলি? থাকবে কোথায়? বুকে বাতাস পাবে তো?

সমস্ত উদ্বেগ নিয়েই ঘুমে ঢলে পড়ে লি। আবার ভোর হয়। আবার আস্তানার গোটানোর দিন আসে। এভাবে চলতে চলতে অবশেষে এক আস্তানায় পাঁচটা বর্ষা কাটিয়ে দিল তারা। লিনির বুকের বাতাসের কষ্টটাও একটু একটু করে কমে গেল। লিনি আবার বেরোতে লাগল খাবারের খোঁজ়ে। এবারের আস্তানার কাছে পিঠেই অনেক বাদাম পাওয়া যায়। 

পরের বর্ষায় লিলি এল। লি আর লিনি খুব যত্ন করে লিলিকে বাদাম চেনায়। কিন্তু এ জায়গাটা ছেড়ে যদি যেতে হয় ভেবে আজকাল ভোরের অনেক আগেই ঘুম ভেঙে যায় লির। 

পরদিন সকালেই তিনজনে তিনদিকে চলে যায়, দূরে দূরে। এবারের আস্তানাটা গোটাতে হলে কোথায় থাকবে সে জায়গাটা আগে থেকে দেখে রাখবে বলে। এ জায়গাটায় মানুষের বাড়ি কিংবা বাজার কিংবা রাস্তা কিংবা রেলগাড়ি হলে, সরাসরি চলে যাবে আগে থেকে দেখা রাখা এরকমই আরেকটা জ়ায়গায়, যেখানে খাবার নেই, বাতাস নেই নেই-নেইতে রাত জ়েগে কাটাতে হবে না। লি ঠিক করে ফেলেছে; উত্তরাধিকারে লিলিকে দিয়ে যাবে ঘুম ভেঙে আলসেমি মাখার ভোরটাই।

~~~~~
Written and published in 2010

No comments:

Post a Comment

Readers Loved