দেরী
“ওহ্ হো!” প্রজিতের গলায় স্পষ্ট আপশোশ। বাথরুম থেকে বেরোতে আজও সাড়ে আটটা বেজে গেল। ধড়ফড় করে জামা কাপড় পরে, আয়নায় চোখ রেখে, চুলে চিরুনী চালাতে চালাতে টের পেলেন দময়ন্তী টেবিলে ম্যাট সাজাচ্ছেন।
বারান্দায় ভিজে গামছাটা মেলে এসে প্রজিত তাঁর নির্দিষ্ট চেয়ারটিতে বসে পড়লেন। এই সময় একটা চাপা টেনশন হয়। বলে ওঠেন উতলা গলায় “দাও গো”।
রান্না ঘর থেকে দময়ন্তীর আশ্বাসমূলক সাড়া আসে, “এই যে”। জলের ঘটিটা রেখে দিয়ে যান টেবিলে। তারপর নিয়ে আসেন উচ্ছে ভাজা শুদ্ধু ধোঁয়া ওঠা ভাতের থালা। ছ্যাঁকা বাঁচিয়ে উচ্ছে ভাজা আর ভাত যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি গেলার চেষ্টা করেন প্রজিত। ততক্ষণে দময়ন্তীর তৎপরতায় পাতে ভাতের উপর ডাল আর পাশে আলু-ঢ্যাঁড়সের চচ্চড়ি পড়ে গেছে। বললেন, “খাও; মাছটা ভাজা হয়ে এসেছে”।
ক্ষেপে ওঠেন প্রজিত। “একে জানো গরম আমি খেতে পারি না; আপিসে যাওয়ার সময় মাছ ভাজা না খাওয়ালেই নয়? ভাত গরম, ডাল গরম, শুধু উচ্ছে আর ঢ্যাঁড়সটা যা ঠান্ডা”।
চটপটে হাতে দময়ন্তী ভাজা মাছের কাঁটা বেছে, দলা দলা মাছ পাতে দিতে থাকেন। প্রজিত বলেন “ধ্যাৎ! একেই দেরী হয়ে গেছে …..; এই বয়সে …; আর দুবছর চাকরী আছে; লেটে আপিসে ঢুকলেই ইনচার্জ বলবে , ‘আপনারা যদি এমনি করেন তবে জুনিয়রদের কি বলবো মশাই!’ ; মান-সম্মান ……..”
ফুঁসে ওঠেন দময়ন্তী, “ যত দেরী কি খেতে গেলেই ? এই যে বকে বকে এত দেরী করছ ?”
প্রজিত কোনরকমে মাছের শেষ টুকরোটা মুখে ফেলে তার ওপরই ঢেলে দিলেন ঘটির জল; গিলতে গিলতে বাকি জলটা ঢাললেন পাতে; গজগজ করতে করতে উঠে পড়লেন টেবিল থেকে, “আজও পঁয়তাল্লিশের লোকালটা হবে না ….. কাল থেকে আর ভাত রেঁধো না আমার জন্য।”
দময়ন্তীর তৎপর জবাব , “ কাল কেন ? আজ রাত থেকেই রাঁধব না …..”
আবহে চটপটে পানাসাজা হাতের চুড়ির ঠিন ঠিন; আঁচানোর কুলকুচির আওয়াজের ফাঁকে ফাঁকে কানে আসে প্রজিতের; প্রজিতের নীরবতায় স্বরে ও ভাষ্যে তীব্রতর হতে থাকেন দময়ন্তী ,“নিজের মান-সম্মানের পরোয়া খুব; আমি যে সকাল থেকে ধড়ফড় করে খেটে মরলাম, আমার সম্মানটা রাখছো কি?”
দময়ন্তীর হাত থেকে সাজা পানটা নিয়ে সংক্ষেপে সারেন প্রজিত ,“ বেরনোর সময় অশান্তি কোরো না । …. আসছি”।
প্রায় ছুটতে ছূটতে পল্লীশ্রী-র মুখে এসে একটা রিক্সা পেয়ে গেলেন প্রজিত। দমে স্টেশন। হাজরার দোকান থেকে সারা দিনের পানের পুঁটলিটা নিতে নিতেই অ্যানাউন্সমেন্ট।
যাঃ; লোকালটা পনের মিনিট লেট!
স্টেশন চত্বরেই দেখা হয়ে গেল সুশীল, সমীর, প্রণব, অতীশ, দীপেন, মণিময়দের সাথে। লেট-ফেট, টেনশন গায়েব। জমাটি আড্ডা; কখন যে লোকাল এল। কখন তাতে উঠলেন আর কখনই বা হাওড়া স্টেশন পৌঁছলেন প্রজিত স্পষ্ট করে টেরই পেলেন না।
হাওড়া স্টেশনে ঢুকতেই বিরক্তির একশেষ। দুই আর তিন নম্বর প্লাটফর্মে দুটো লোকাল একসঙ্গে ঢুকেছে। দুটোরই আপ লোকালের অ্যানাউন্সমেন্ট হয়ে গেছে। প্রচণ্ড রাশ; প্রজিতরা উলটো দিকে হেঁটে চলে যান প্লাটফর্মের শেষে। লাইনে নেমে পাশের ফাঁকা প্লাটফর্মে ওঠেন। হনহনিয়ে তাঁদের দল চলতে থাকে লঞ্চঘাটের দিকে। হঠাৎ সমীর হুমড়ি খেয়ে পড়েন। একটা লোক প্লাটফর্মে শুয়ে থকাতেই এই বিপত্তি। সবাই মিলে গালিগালাজ করতে শুরু করেন লোকটাকে। অথচ লোকটা জাগেও না; নড়েও না।
প্রথম প্রজিতই গন্ধটা পান। লোকটা মৃত। শবদেহ থেকে পচা গন্ধটা বের হচ্ছে। বাকি সকলকে প্রজিত অফিসের দিকে এগিয়ে যেতে বলে নিজে চললেন স্টেশন ম্যানেজারের ঘরে, এক নম্বর প্লাটফর্মে, মৃতদেহের খবর দিতে। স্টেশন ম্যানেজারের কথা মত আর. পি. এফ পোস্টে এফ. আই. আর লেখালেন। তারপর শববাহকেরা জুটতে, তাঁদের নিয়ে, পুলিশ নিয়ে এক নম্বর প্লাটফর্মে শবদেহের কাছে গেলেন। শববাহকেরা মৃতদেহ শববাহী গাড়িতে তুলে নিয়ে যেতে প্রজিত পা বাড়ালেন লঞ্চঘাটের দিকে।
লঞ্চের অপেক্ষায় জেটিতে দাঁড়িয়ে প্রজিত। আঙুলের ফাঁকে ধরা সিগারেট। উড়ন্ত পাফের দিকে তাকিয়ে প্রজিতের মনটা আফশোষে ভরে যায়, “সমীরদের কাউকে দিয়ে যদি সেকশনে একটা খবর দেওয়া যেত”। পরমূহুর্তেই মনে হল তাঁর, “কী-ই বা কারণ দেখাবে ওরা?” অবশেষে লঞ্চ এলো; বসার একটা সীটও পেয়ে গেলেন প্রজিত। তখনই মনে হল, “যাক গে, পড়ুক গে লেট মার্ক…”। ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাসও পড়ল দুরুদুরু বুক বেয়ে।
গিয়ে আর কিছুই করা যাবে না ভাবতে ভাবতে গঙ্গা পেরিয়ে, হাঁটতে হাঁটতে অফিসে পৌঁছে গেলেন।
সেকশনে পৌঁছে ঘড়িতে দেখলেন বাজে সাড়ে এগারটা। এগিয়ে গেলেন ইনচার্জের টেবিলের দিকে দিন খোয়ানো পদক্ষেপে। মন স্থির করে ফেলেছেন প্রজিত – লেটমার্ক না পড়লেও আজ আর অফিস করবেন না; ছুটির দরখাস্ত দিয়ে দেবেন। কারণ এত পরে এসে আর হাজিরা দেওয়া ঠিক না।
ইনচার্জ মনোতোষ দে; চশমার ফাঁক দিয়ে এক ঝলক প্রজিতকে দেখেই হাজিরা খাতার ওপর কলম ধরে খাতাটা বাড়িয়ে দিলেন ।
প্রজিত “ভাবছি, আজ আর ….” বলেই থমকে গেলেন, চোখ পড়েছে খাতাটার নির্দিষ্ট জায়গায়, সেখানেই মনোতোষ কলমটা রেখেছেন। প্রজিত “এ কী! কিন্তু ..” বলা মাত্রই মনোতোষ মুচকি হেসে বললেন “বনের মোষ তাড়ালেন …”; অপ্রস্তুত প্রজিত। মনোতোষই কথা বললেন, “সইটা করুন, মশাই”।

No comments:
Post a Comment