পাঁচপক্ষ
~~~~~~
প্রত্নপক্ষ
~~~~~~
বাবা গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলেন। তারপর চৌকি থেকে ঝুলে থাকা পা দুটোকে খানিকক্ষণ মন দিয়ে দেখেছিলেন। তারপর পায়ের একটা পাতা অন্য পাতাটায় ঘষতে ঘষতে বলি-কী-না-বলি করে বলে ফেলেছিলেন, “দিলীপের প্রেসের ঘরটার ব্যবস্থা করার জন্য ওকে কাউন্সিলর টুকুন রায়ের কাছে যাতায়াত করতে হয়েছিল। দিলীপের তখন বছর পঁচিশেক বয়স, টগবগে ছেলে। টুকুনের মনে ধরেছিল ওকে। তারপর ওর চ্যালারাও দিলীপের ওখানে আড্ডা দিতে শুরু করে। সবার মতো দিলীপও নিজের প্রেসে টুকুনদের পার্টির কাগজ রাখতে শুরু করে। তারপর ঘরটা পাইয়ে দিয়েছে বলে টুকুন দিলীপকে বলে ওদের লিফলেট ছাপিয়ে দিতে, ব্যানার বানিয়ে দিতে। তারপর বলে ওদের হয়ে কাগজ বিক্রি করতে।”
সুরচিতার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য প্রশ্ন তুলেছিল, “করল কেন? না করলে কী হতো?”
বাবা নিরুপায় স্বরে বলেছিলেন, “তুই বুঝবি না সে কথা।”
বুঝবি না বললে তখন বেশ গায়ে লাগত সুরচিতার। ফলে তৎক্ষণাৎ বলেছিল, “বুঝিয়ে বললে নিশ্চয়ই বুঝব।”
বাবা বলেছিলেন, “কারুর কথা--এমন সব কথা--আলোচনা করা ঠিক নয়।”
সুরচিতা তর্ক করেছিল, “বেঠিক তখন যখন তুমি পরচর্চায় সুখ পাবে--ধরো কিনা পাড়ার লোকের কাছে এসব কথা বলে নিজের বুদ্ধির বড়াই করবে আর অহঙ্কারে ঝলমলাবে। আমাকে বললে ব্যাপারটা শিক্ষামূলক জীবনীপাঠ হবে।”
বাবা একটু চুপ করে থেকে বলতে শুরু করেছিলেন, “দিলীপের অল্প বয়স তখন। সংসার করে ফেলেছে ... সংস্থান তো করতে হবে। ঘরটার জন্য টুকুন রায় মধ্যস্ততা করেছিল, না-হলে যে-দরে ও পেয়েছিল ঘরটা সেই দরে পাওয়া সম্ভব ছিল না। তাছাড়া ঘরটার মালিকানা নিয়েও অস্পষ্টতা ছিল। সব শরিক বা দাবিদারকে চেনাই দায় ছিল, তায় তুষ্ট করা তো দুরূহ কল্পনা। একজনের সাথে রফা হলে আরেকজন এসে বলে ‘আমিও শরিক। সুতরাং আমাকেও সমান টাকা দিতে হবে ঘরটা পেতে হলে।’ স্টেশন রোডের ওপর, বাজারের মধ্যে ব্যবসার জন্য একটা ঘর--বুঝতেই পারছিস অনেক লোকেরই নজর ছিল।”
খিক খিক করে হেসে সুরচিতা বলেছিল, “বোঝো, একে বলে দালালির দাম চোকাতে দাসত্ব! এঁরা আবার সমাজের বঞ্চনা বেচে রাজনীতি করেন!”
প্রত্যাশিত বিরক্তি প্রকাশ করে বাবা বলেছিলেন, “লেখাপড়া শিখে ভাষার এ কী অবস্থা! কাদের সঙ্গে মেশো আজকাল?”
সুরচিতা তখন উদ্ধত ছিল, তাই বলেছিল, “যাদের সঙ্গে মিশলে টুকুন রায়কে এড়িয়ে চলা যায় তাদের সাথে। এখনও তো ঝুড়ি থেকে বেড়াল বেরোল না। সেই ঘর ভাড়ার দালালি চোকাতে দিলীপকাকুর ব্যবসা বিকিয়ে গেল নাকি?”
~~~~~~
Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml
(চলবে)

No comments:
Post a Comment