পাঁচপক্ষ
~~~~~~
আত্মপক্ষ
~~~~~~
উদাস বলে গেল, “তাছাড়া অঞ্জনা বা যে-কোনো মেয়ে পালিয়ে যাওয়ার পর টানা একমাস করে সন্ন্যাসিনীরা সবাই মিলে প্রার্থনায় বসতেন। সেসব প্রার্থনায় তাঁরা শুধু চাইতেন মতিচ্ছন্ন মেয়েগুলো যেন ভালো থাকে, যেন সুস্থ থাকে, আনন্দে থাকে, তাদের যেন কোনো বিপদ না হয়। এঁদেরকে শুরুর থেকেই আমি দেখছি বিশ্লেষকের দৃষ্টিভঙ্গীতে, মিশেছি দ্বিধা আর সন্দেহ নিয়ে। এঁদেরকে বোঝার চেষ্টার থেকে অবিশ্বাস করেছি বেশি। কিন্তু সেসব জেনেও ওঁরা আমাকে ডেকে নিয়ে যেতেন অঞ্জনার জন্য প্রার্থনার সময়। কারণ সে আমার বড়ো আদরের ছিল। তাই আমি সে-সময়ে এঁদের কাছে বসে নিজের হতাশা, দুঃখ ভাগ করে নিয়েছি। তখন বুঝেছি যে তাঁদের প্রার্থনাটা বাইরে থেকে দেখলে একটা আচরণমাত্র, কিন্তু আন্তরিক পর্যায়ে সেটা যে মনকে স্থির করার, সহিষ্ণু করার অধ্যবসায়, অনুশীলন, তা চিনে ফেলা যায়।”
অভি এসব শুনে যে একসাথে অবাক আর বিরক্ত হচ্ছে সেটা টের পেয়ে চুপ করে গেল সুরচিতা।
কিন্তু বাকিটা শোনার জন্য অভি উদগ্রীবও হয়ে পড়েছিল। তাই সুরচিতা আবার বলতে লাগল, “অঞ্জনা ফেরার পর তাকে এক্কেবারে একটা নতুন মেয়ের মতো করে গ্রহণ করা হলো। অঞ্জনার পরিবর্তনের জন্য তার অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু এই নির্মলভাবে গ্রহণ করায় তার অনুতাপের জ্বালাটা চলে গেল। মননে ঋদ্ধ হলো, চরিত্রে সহিষ্ণু হলো, স্বভাবে স্নিগ্ধ হলো, আচরণে শান্ত হলো। বিবেচক হয়ে উঠল।”
স্বরে বিশ্বাস আর প্রত্য়য় জেগে উঠল, “তার মধ্যের তিন বছরে আমি শনিবারের গ্রামসেবা দলে যোগ দিয়েছিলাম। গ্রামে গিয়ে দেখতাম কত কত অঞ্জনা, তাদের না আছে পয়সাওয়ালা মা-বাবা, না আছে মঠের সন্ন্যাসিনীদের মতো সহিষ্ণু সংবেদনশীল পরিজন। তাদের দুরবস্থা কাটিয়ে উঠতে যে আত্মবিশ্বাস লাগবে, যে বিবেচনা লাগবে সে অব্দি পৌঁছোনোর কোনো উপায়ই তাদের নেই। ফলে তাদের ভাঙা মন কিছুতেই বল পায় না। তারা ক্রমশ তলিয়ে যেতে থাকে এক অসীম নরকযন্ত্রণায়। ভরণপোষণের ভরসাটুকু লোপ পেলে নিরক্ষর বা নামমাত্র সাক্ষর মেয়েগুলোর কেউ কেউ কাজ নেয় সমতল শহরের পতিতাপল্লীতে। কেউ কেউ বিদেশ-বিভুঁইতে।”
~~~~~~
Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml
(চলবে)

No comments:
Post a Comment