পাঁচপক্ষ
~~~~~~
প্রতিপক্ষ
~~~~~~
সুরচিতা তিনপাহাড়ি আসার পর থেকেই মা ভীষণ ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন তার বিয়ে দেওয়ার জন্য। সুরচিতা মাকে বোঝাবার চেষ্টা করে নি যে বিয়েটা মা দেবেন না, দরকার পড়লে সে নিজেই করবে; বরং সোজাসুজি বলে দিয়েছে অনেকবার। ততোবার, যতোবার মা প্রসঙ্গটা তুলেছিলেন।
তারমধ্যে একটা শুক্রবার সন্ধের মুখে ধৃতিকান্ত এসে পৌঁছেছিল। এতোদিন পর এসে ছিল যে ধৃতিকান্তকে চিনতে সুরচিতার কয়েক মিনিট সময় লেগেছিল। তারপর খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতে সাল কটা গাঁটে গুনে সে বলেছিল, “তের বছর! আমি তো ধরেই নিয়ে ছিলাম যে তুই আমাকে ভুলে গেছিস।”
ধৃতিকান্ত গোলাপ বাগান, পাথরের দেওয়াল, বাগানের কোণে রডোডেনড্রন দেখতে দেখতে বলেছিল, “ভুলে যে যাই নি তোকে সেটা প্রমাণ করে দিয়েছি বল?”
সুরচিতা খুশিতে মাথা নাড়তে নাড়তে বলেছিল, “পয়েন্ট। তর্কের সুযোগ নেই।”
তারপর বলেছিল, “ভিতরে চল, এখন আর এখানে বসে কিছু দেখা যাবে না।”
ধৃতিকান্ত বলেছিল, “কেন? না হয় অন্ধকারটাই দেখব!”
সুরচিতা বলেছিল, “তাহলে একলা বসে দেখ। আমি চা নিয়ে আসি। আরেকটা চেয়ার নিয়ে আসি।”
ধৃতিকান্ত বসে পড়েছিল খালি চেয়ারটাতে।
একটু পরে একটা বাটিতে করে কুচো পেঁয়াজ আর চানাচুর দিয়ে মাখা চিঁড়েভাজা আর ধোঁয়াওঠা চায়ের দুটো কাপ একটা তেপায়া টুলে বয়ে নিয়ে এসেছিল সুরচিতা। তারপর আবার ভেতর থেকে আরেকটা চেয়ার নিয়ে এসে বসেছিল ধৃতিকান্তর পাশে। চুপ করে দুজনে চা আর চিঁড়েভাজা খাচ্ছিল। ধৃতিকান্তই বেশিটা খেয়েছিল। মাঝে মাঝে একটু একটু নিচ্ছিল সুরচিতা।
ধৃতিকান্তই বলেছিল, “আমরা যেন প্রৌঢ় দম্পতি। বাগানে পাশাপাশি বসে চা খাচ্ছি।”
সুরচিতা বলেছিল, “আর অন্ধকার দেখছি, দুচোখে।”
বলে ধৃতিকান্তর দিকে তাকিয়ে বাঁ চোখটা টিপতে গিয়ে কী যেন একটা দেখে ফেলেছিল ধৃতিকান্তর চোখে, সেই আধো অন্ধকারে।
ধৃতিকান্ত লুকোনোর চেষ্টা করেনি। চেয়ারের হাতলে আলতো রাখা সুরচিতার বাঁ হাতের তালুটা নিজের ডান হাতের মুঠোয় নিয়ে বলেছিল, “যেন এটা সত্যি হয়।”
সুরচিতা শিউরে উঠেছিল যদিও, তবুও অকম্পিত গলায় বলেছিল, “বলিহারি তোর শখ, দু চোখে অন্ধকার দেখব বুড়ো বয়সে? কেন? চাওয়ার মতো আর কিছু ছিল না?”
ধৃতিকান্ত কিন্তু মুঠো আলগা করে নি। জবাবে বলেছিল, “তুই ভালো করেই বুঝেছিস আমি প্রৌঢ় দম্পতি হতে চেয়েছি তোর সাথে। কিন্তু...ভুলটা আমারই। এতোদিন পরে সব আবার নতুন করে শুরু করতে হতো।”
থেমে ছিল ধৃতিকান্ত। সুরচিতা চুপ করে শুনছিল, বলতে দিচ্ছিল ধৃতিকান্তকে।
~~~~~~
Published at পরবাস-৫৯, এপ্রিল ২০১৫ https://parabaas.com/PB59/LEKHA/gSanhita59.shtml
(চলবে)

No comments:
Post a Comment